রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০১৬

স্বাধীনচেতা এবং .....

"স্বাধীনচেতা এবং ....."
``````````````````````````````
(গল্পচ্ছলে অশান্ত সেই দিনগুলির কিছু ঘটনা জীবিতাবস্থায় আমার বাবা স্বর্গীয় ডঃ হরিপদ আচার্য আমায় বলেছিলেন । তারই কিয়দংশের সঙ্কলন করে এই ঘটনাটি আংশিক সত্য ও আংশিক কল্পনার বুননে সৃষ্ট ।কারোর জীবনের সাথে ঘটনাটির সামান্যতম মিল বা চরিত্রগুলির সাথে সামান্যতম মিল থাকলে তা সম্পূর্ণভাবেই অনিচ্ছাকৃত । অশান্ত সময়ের দলিলরূপ এই গল্পটি পাঠক-পাঠিকাদের মনোগ্রাহ্য হলেই আমার এই রচনার সম্পূর্ণ সার্থকতা ।)
--বিনীত
----------শিবাশিস্ আচার্য----------

আজ "নির্ভয়া" আন্দোলনের চতুর্থ দিন। দাঁড়িয়ে আছি রামলীলা ময়দানের মূল মঞ্চ থেকে হাত ত্রিশেক দূরে। মঞ্চে উপস্থিত তরুণ-তরুণীরা মুহূর্মুহূ "শেম্..শেম্" শ্লোগানে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলছে। আমার সামনে মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। গত কয়দিন ধরেই সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে । দুটি তরুণীকে প্রতিদিনই দেখি, ক্লান্তিহীনভাবে শ্লোগান দিয়ে যায়। কখনও মঞ্চে দাঁড়িয়ে, কখনও বা জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে। ওদের পাশেই থাকে আরও অনেক তরুণ-তরুণী। এখন অবশ্য মঞ্চের উপর দুই একজন নামী-দামী মানুষের উপস্থিতিও দেখতে পাচ্ছি। এতদিন তাঁরা কোথায় ছিলেন কে জানে! চারদিক থেকে মুহূর্মুহূ শ্লোগান উঠছে ধর্ষণাপরাধীদের বিরুদ্ধে, শ্লোগান উঠছে ধর্ষকমুক্ত দেশ আর ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পক্ষে। শ্লোগান চলছে ন্যূনতম নিরাপত্তার দাবীতে । তাদের একটাই দাবী, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির লিখিত প্রতিশ্রুতি...
...প্রতিটি শ্লোগানের সাথে সাথে আমার শরীরেও বিদ্যুত্ খেলে যাচ্ছে, শিহরণ টের পাচ্ছি। বার বার মনে হচ্ছে, ওদের সাথে আমিও গলা মেলাই। কিন্তু কেমন যেন আড়ষ্ট লাগছে! শত হলেও বয়সটা তো আর বশে নেই, কিশোরী মেয়ের বাবা, মেয়ের মত করে তো আর লাফালাফি করার বয়স নেই। কিন্তু মন মানে না। যতই হোক, আমিও তো মেয়ের বাবা । এইজন্যই অফিস ছুটি হতেই চলে আসি এই তারুণ্যের কর্মযজ্ঞে শামিল হতে। রাত দশটা পর্যন্ত থাকি। কাছেই বাড়ী । কিছুই করি না, শ্লোগানও দেই না, শুধু উপস্থিত থাকি। ভালো লাগে, শরীরে বিদ্যুত্ খেলে যায়।
আমি জন্মেছি এক দুঃখী মধ্যবিত্ত পরিবারে, বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে, অন্ধের যষ্টি। ছেলেবেলায় বাবা মায়ের চোখের আড়াল হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। জীবনে অনেক হারিয়েছেন বলেই তাঁদের সমস্ত মনোযোগ আমার উপরে ঢেলে দিয়েছেন। তাঁরা বুঝতেও পারেন নি, এতে করে আমার মনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় নি, মেধাবী হলেই যে সব সার্থক হয় না, এই ব্যাপারটি হয়তো বা তাঁদের বোধে আসেনি। বাবা মায়ের অধীনে থাকতে হতো বলেই বোধ হয় মনের গভীরে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করেছিল বয়ঃসন্ধি থেকেই। কিন্তু বিদ্রোহ করার মত পূর্ণ স্বাধীনতাটুকুও আমার ছিল না।
কলেজে ভর্তি হয়ে যোগ দিতে শুরু করি শাসন বিরোধী আন্দোলনের মিছিলে। বাবা-মাকে লুকিয়ে মিছিলে যেতাম, গলা চিরে শ্লোগান দিতাম। অপশাসনের বিরুদ্ধে মনের ভেতর একটা রাগ পোষা ছিল। সব সময় মনে হতো, সব ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবো। খুব বেশীদিন পারিনি মিছিলে যেতে। একেকদিন ছাত্র আন্দোলনের তাজা খবর পেয়েই বাসা থেকে সমন জারি হতো, অতি দ্রুত বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য। আমিও মাথা নীচু করে বাসায় ফিরে মায়ের আঁচলের নীচে মুখ লুকোতাম। কী করবো, বাবা মায়ের ভয়কেও অগ্রাহ্য করতে পারতাম না।
এরপর আর দশটি সাধারণ গেরস্তবাড়ীর লক্ষ্মীছেলের মত আমিও ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরেই চাকুরীতে ঢুকে গেলাম, রোজ সকাল-বিকেল অফিস করতে করতে একসময় অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। বাবা-মায়ের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করে দিব্বি সংসার পেতে বসলাম। ছেলেদেরও যে বিয়ের আগের জীবন আর বিয়ের পরের জীবন বলে কিছু থাকে, তা আর প্রকাশিতই হলো না। মাঝে মাঝেই আমার স্ত্রী আক্ষেপ করে বলে “ইস! বিয়ের আগের জীবনটা কত স্বাধীন ছিল, বিয়েটা করেই যেন সংসার শেকলে বন্দী হয়ে গেছি”। ওকে বলি কী করে, “ তোমার তো তাও বিয়ের আগে স্বাধীন জীবন ছিল, আমার তো তাও ছিল না”।
...
......
আজ বুকের ভেতর খুব অস্থিরতা টের পাচ্ছি। একজনের মুখ খুব বেশী করে মনে পড়ছে, তিনি আমার বউ-ঠাকুমা, সম্পর্কে আমার বাবার কাকীমা। চার বছর আগে আমাদের ছেড়ে শান্তি-নিলয়ে পাড়ি দিয়েছেন একা...। বয়স হয়েছিল প্রায় সাতাশির কাছাকাছি। কিছুটা ছিট্গ্রস্ত ছিলেন, ঠিক ‘পাগল’ বলা যাবে না, আবার সম্পূর্ণ সুস্থও বলা যাবে না। এলোমেলো মাথায় বিলাপ করে বারবার বলতেন, “ঠাকুর গো, এই পরাধীন জীবন আর ভাল লাগেনা, আমারে লইয়া যাও, তুমার ছিচরণে ঠাঁই দেও গো”। ছোট ছিলাম বলে স্বাধীন বা পরাধীনের পার্থক্য বুঝতাম না। ঠাকুমাকে দেখেছি, আমাদের মত করেই ভাত খায়, ঘুমায়, স্নান করে, তাহলে আবার স্বাধীনতা চায় কেন? এটুকু বুঝতাম, ঠাকুমা আমাদের মত সব কাজ করলেও তাঁর মনে অনেক দুঃখ। মাথা গরম হলেই ভগবানের কাছে নিজের মৃত্যু কামনা করতেন আর কেঁদে কেঁদে নিজের মনেই বিড়্ বিড়্ করতেন...
....“হগ্গলে কইল... দ্যাশ্ স্বাধীন হইব, দ্যাশ্ স্বাধীন হইব... স্বাধীন ত হইছেই দ্যাশ্, কই আমার সোনাইয়ে ত ফিরা আইয়ে নাই, যত সব মিছা কথা। ঐ রহমইত্যার ঘরের দরজা থিকা এক ধাক্কা দিয়া মাইয়াডারে বাইর কইরা দিল, তারপরেই ত শ্যাখের দল আইয়া আমার মাইয়াটারে টাইন্যা লইয়া গেল, মাইয়াটা কী জুরে জুরে কানতাছিল, বাঁচাউ গ...বাঁচাউ গ করতাছিল, ওরে নেপু রে! আমি ত তরে বাঁচাইতে পারলাম না রে মা, তোর মায়ের লগে দেখা হইলে কী জবাব দিমু, মা রে! আমারে এমুন কইরা দোষের ভাগী কইরা কই গেলি তুই!”।
...মাঝে মাঝে বাবা হয়তো বা ধমকে উঠতেন,
..“খুড়ীমা, ইডি কী কন? আপনেরে কত বার কইছি, মাইয়া আপ্নের স্বর্গে আছে, শান্তিতে আছে, এইভাবে কাইন্দেন না। মাইয়াটার আত্মা কষ্ট পাইব । হেইটা তো ’৬৪ সালেই শেষ হইয়া গ্যাছে। এখন আর পুরান দিনের কথা ভাইব্যা বিলাপ কইরেন না। দেশ স্বাধীন হইয়া গ্যাছে, এমুন কথা আর কইয়েন না”।
...আমি বড়দের কথা কিছুই বুঝতাম না, আবার কাউকে জিজ্ঞেস করার সাহসও হতো না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই সবাই বকা দিত, বড়দের কথায় থাকতে হয় না বলে। তবে এটুকু বুঝতাম, কোথাও কিছু গোলমাল আছে, আমি ছোট বলে আমাকে বলা হচ্ছে না।
..সোনাই পিসী হচ্ছে বউ-ঠাকুমার সৎ মেয়ে। বউ-ঠাকুমার এই বিলাপ শুনতে শুনতেই আমি বড় হয়েছি। একবার ঠাকুমার ছোটমেয়ে মণি পিসীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“ঠাকুমা এমন করে কাঁদে কেন? তুমি কাছে গিয়ে আসল কথাটা বুঝিয়ে বলতে পারো না? আর স্বাধীন দেশের কথা কী বলে গো? দেশ তো স্বাধীন হয়েছেই, এখন আর নতুন করে কী স্বাধীন হবে?"
পিসী বলে,“লাভ নাই কইয়্যা, মায়ের মাথা গোলমাল হইয়া গেছে, সোনাইয়ের ফিরা আসনের রাহা দ্যাহে”।
“সোনাই পিসীর কী হয়েছিল, কিভাবে মারা গেল?"
...
....“তোর জন্মের আগের ঘটনা এইডা, পাকিস্তান আমলে ঘটছিল,’৬৪ সালে একবার রায়েট হইছিল, নোয়াখালি আর মীরপুর থিক্যা মুসলমানেরা আইস্যা নারায়ণগঞ্জে অনেক হিন্দুরে কাইট্যা ফালাইছিল। শুধু সোনাই দিদিই না ত, আমাগো বাড়ীর আটজনরে মাইরা ফেলছিল। থাউক, আর কমু না, তুই ছোট, তোরে এগুলি বলা ঠিক না”।
...“আমি ছোট না, ক্লাস সিক্সে পড়ি। আমি কাউকে বলবো না। আমার জানতে ইচ্ছা করে”।
...“আমার সোনাই দিদি তখন পোয়াতী আছিল, নিয়ম আছে, প্রথম বাচ্চা বাপের বাড়ীত্ হইতে হয়, ঐজন্যই দিদিরে মায়ের কাছে আনছিল। রায়েটের সময় আমাগো গ্রামে অ্যাটাক হইছিল তো, তখনই সোনাই দিদি মারা যায়।"
“পুরো ঘটনা বল”।
“তুই বুঝবিনা ত, তরে এগুলি বলা ঠিকও না, তোর মায় জানলে আমারে অনেক বকবো”।
“মাকে কিছু বলবো না, কিরা কাটলাম, কিচ্ছু বলব না”।
“শোন, সোনাই দিদি আমার আপন বইন না, সৎ বইন। দিদিরে ছোট থুইয়া আমার বড়মা মারা গেছিল, তখন আমার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে। তোর বউ-ঠাকুমা হইতাছে আমার বাবার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। বুঝতে পারছস?”
“হ্যাঁ, তুমি তাড়াতাড়ি আসল গল্প বলো, মা এসে পড়লে আর বলতে পারবে না”।
“পুলারে! তুই বড় নাছোড়বান্দা। কী জানি কোন বিপদে ফেলবি আমারে! বড় বৌদিরে আমি অনেক ভয় পাই। আসলে অনেক কষ্টের গল্প তো, ছোট মানুষের শুনতে নাই। কাউরে কইস না। রায়েট মানে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা। ’৬৪ সালে রায়েট হইছিল। অনেক দিন পার হইয়া গেছে, তখন তো পাকিস্তান আমল আছিল, এখন স্বাধীন দ্যাশে এইসব পুরানো কথা কেউ মনে করতে চায় না।
- ঠাকুমা যে মাঝে মাঝে রহমইত্যার কথা বলে, রহমইত্যা কে?
-গ্রামে আমাদের প্রতিবেশী আছিল রহমত চাচা। আমাদের কাকা জ্যেঠাদের সাথে হ্যার খুব খাতির ছিল। রহমত চাচা ছাড়াও আরও কিছু মুসলমান পরিবার ছিল আমাদের সজ্জন প্রতিবেশী। রায়েটের সময় হিন্দুরা যে যেভাবে পারছে মুসলমান প্রতিবেশীদের বাড়ীতে লুকাইছে। আমরাও দল দল ভাগ কইরা একেক বাড়ীতে গিয়া আশ্রয় নিছিলাম। সোনাই দিদিরে আমার অন্য দুই কাকীমার সাথে পাঠানো হইছিল রহমত চাচার বাড়ীতে। দিদি মাত্র শ্বশুরবাড়ী থিক্যা আসছে, সাথে অনেক গয়না আনছিল, সেগুলি পোঁটলায় কইরা লইয়াই চাচার বাড়ীত্ গেছিল। আমার মায়ও তাদের পিছন পিছন রওনা দিছিল, কিন্তু কেমনে জানি একটু পিছনে পইরা গেছিল, ভিতর বাড়িতে ঢুকার আগেই কাছে পিঠে ‘আল্লাহু আকবর’ শুনতে পাইছে। আর কোন দিশা না পাইয়া ঐ বাড়ীর খড়ের গাদার পিছনে লুকায়ে পড়ছিল।
ঐখান থিক্যাই দেখতে পাইছে সব, একদল মানুষ চাচার বাড়ীর উঠানে আইসাই হিন্দুগোরে ঘর থিকা বাইর কইরা দিতে কইছে। ওগো হাতে আছিল দাউ, কুড়ালি, চাক্কু। ঘরের ভিতরে কী হইছে, সেইটা তো আর মায় দেখে নাই, শুধু দেখছে, পূব দিকের ঘর থিকা সোনাই দিদি, আর দুই কাকীমারে ধাক্কা দিয়া বাইরে বাইর কইরা ঘরের দরজা বন্ধ কইরা দিতে। দিদি আছিল ভরা পোয়াতী, ধাক্কা সামলাইতে না পাইরা উঠানে পইরা গেছিল। দলের অমাইনষেরা দিদিরে টানতে টানতে লইয়া গেছে, আর আমার দুই কাকীর চুলের মুঠি ধইরা নিতে দেখছে মায়। সবাই হাউ মাউ কইরা কানতাছিল, ছাইড়া দ্যান ছাইড়া দেন, আমরা মুসলমান, আমগোরে ছাইড়া দ্যান, করতাছিল। মায় আর স্থির থাকতে পারে নাই, খড়ের পেছন থিকা এক দৌড়ে ছুইট্টা বাইর হইছিল, চীৎকার কইরা কইছিল,
“অরা সবাই মুছলমান, অগোরে নিয়েন না। ও রহমত ভাইজান গো, আপনে কই আছেন গো, আমার মাইয়ারে লইয়া যাইতাছে গা ধইরা”।
রহমত চাচায় মনে লয় বাড়ীতে আছিল না, থাকলে এই আকাম হইতে দিত না। যাই হউক, তিনজনেরে লইয়া একদল সামুনে আউগাইয়া গ্যাছে, আরেক দল মায়েরে ধরছে।
--হায় হায়, বউ-ঠাকুমাকেও ধরেছিল? ঠাকুমা কিভাবে বাঁচলো?
জানিনা, মায় মনে হয় ঐ মুহূর্তেই পাগল হইয়া গেছিল। মা’রে ‘পাগল’ কইয়া অরা ছাইড়া দিছে।
-তাই নাকি? কী বল, আশ্চর্য তো!
হ, মায়েরে জিগাইছে, অই মাইয়্যা, তুই হিন্দু না মুছলমান? মা কইছে, আমি মুছলমান, আমার ভাইজানের বাড়ীত্ বেড়াইতে আইছি।
আরেকজন জিগাইছে, তুই মুছলমান হইলে কলমা ক। মায় ত কলমা জানতো না, জবাব দিছে, কলমা কি? আল্লাহু আল্লাহু? আমি ত আল্লাহু কইলাম।
তখনই একজন হাতের কুড়ালি উঠাইছিল ঘাড়ে কোপ দেওনের জইন্য।। কিন্তু মার কপাল ভাল, আরেকজন বাধা দিছে, কইছে, আরে! এই মাইয়্যা পাগল। হ্যায় মুছলমানই হইব, দেখস না পায়ে চামড়ার জুতা পইরা রইছে। এই তে মায় বাঁইচ্যা গ্যাছে”।
-চামড়ার জুতা মানে? হিন্দুরা জুতা পরতো না?
-না, গরুর চামড়া দিয়া জুতা বানায় ত, তাই হিন্দু মহিলারা চামড়ার জুতা পরতো না। বাড়ীর থিকা পলানের সময় কাকার চামড়ার স্যান্ডেল পইরা মনে হয় রওনা দিছিল।
-আচ্ছা, ঠাকুমা তো শুধু দেখেছে, সবাইকে টেনে নিয়ে যেতে, মারতে তো দেখে নি। এমনও তো হতে পারে, তারা বেঁচে আছে, হয়তো বা ঐ লোকগুলির বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করছে।
-নাহ্ ! ঐটা হইলে ত আর কোন কথা ছিল না। মানুষগুলি প্রাণে বাঁইচ্যা আছে, এইটাও একটা সান্ত্বনা থাকতো। তিনজনের গলাকাটা লাশ পাওয়া গেছিল। দুই কাকীরে নদীর পাড়ে নিয়া গিয়া ইজ্জৎ লুইট্যা নিয়া জবাই করছে। সোনাই দিদির গলা কাটা লাশ পাওয়া গেছিল পাশেই ধান ক্ষেতে..পচ্ছাবের জায়গায় তিন-চাইরটা মুটা-মুটা বাঁশের কইঞ্চি ঢুকানো আছিলো...গলা বুজে আসে পিসীর ।
....
.....আর কিছু জানিনা। ঐ ঘটনা দেখার পর থিক্যা মায়ের মাথায় গোলমাল দেখা দেয়।”
-তুমি কোথায় ছিলে? আর এত কথা জানলে কীভাবে?
- গ্রামের মানুষেই কইছে, তারা না কইলে জানতাম কই থিক্যা? আমারে লইয়া সোনা জ্যেঠিমায় ফটিক চাচার বাড়ীত্ আশ্রয় নিছিল।”।
-তাহলে তো ফটিক চাচারা অনেক ভাল মানুষ। তোমাদের জীবন যে বাঁচাল তাঁরা, তাঁদের কোন পুরস্কার দেয় নি দাদুরা?
-তাতো ঠিকই। দুনিয়ায় ভাল খারাপ সবই আছে। রহমত চাচা নিজে ভাল মানুষ, ওনার পরিবারের মানুষরা এই কাজ টা করছে, চাচা বাকী জীবন অপমানে মুখ লুকায়ে থাকছে। সোনা জ্যেঠার হাত ধইরা অনেক কান্দছে। সোনা জ্যেঠা নিজে ফটিক চাচারে তিন বিঘা ফসলী জমি দান কইরা দিছে। যাক, এই কথা আর কারোরে শুনাইস না, তাইলে কিন্তু আমারে মাইরা ফালাইবো তোর বাবায় ।"
....
.........
..............মণি পিসীর কাছে এই গল্প শুনেছি স্বাধীনতার অনেক পরে, ’৭৬ সালে। যখন বউ-ঠাকুমাকে ডাক্তার দেখানোর মত অবস্থা দাঁড়ালো।
একাত্তরে এতটাই ছোট ছিলাম যে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কোন আবেগ বা অনুভূতিই তৈরী হয় নি মনে। দুই একটা ঘটনা হয়তো স্পষ্টভাবেই মনে পড়ে, আবার অনেক কিছুই আবছা আবছা মনে পড়ে। এখনও মনে পড়ে, আমার হাত ধরে মা দৌড়াচ্ছেন, বাবার মাথায় একটা কাপড়ের বোঁচকা। ক্ষিদেয় পেট জ্বলতো, স্পষ্ট মনে আছে, একটা বিরাট বড় মাঠে অনেক অনেক মানুষ, দল বেঁধে বসে আছে, চুলা জ্বালিয়ে অনেকেই রান্না করছিল, আমি মায়ের আঁচল ধরে টানছিলাম আর বলছিলাম,
“মা, আমার ক্ষিদা লাগছে। ও মা, পেটের মধ্যে কেমন জানি জ্বলে”!
মা মুখটাকে অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখেছিলেন। আমি তো জানতাম না, ওদের কাছে টাকা পয়সা ছিল না। গভীর রাতে নৌকায় করে একটা ব্রীজের নীচে দিয়ে পার হওয়ার সময় কে যেন চেঁচিয়ে বলেছিল,“ সাবধান! মিলিটারী গাড়ী আসতাসে”। এই কথা শুনেই আমাদের সবাইকে নিয়ে বাবা নৌকার পাটাতনের নীচে ঢুকে গেছিল। কী কষ্ট হচ্ছিল, আমি সবার নীচে পড়ে গেছিলাম। আরেকটু হলে দম বেরিয়ে যেতে পারতো। বাবা শরীর ঝুঁকে চেপে বসেছিল, কোমরের কশি থেকে এক গোছা টাকা বোধ হয় তখনই নৌকার পাটাতনে পড়ে গেছিল। বাবা জানতেই পারেনি, কখন কোথায় টাকাগুলো পড়ে গেছে। এক ফাঁকে বোধ হয় মায়ের সাথে বাবার কথা কাটাকাটিও হয়ে গেছে। টাকার শোকে মা ‘নি-মুরাইদ্যা মানুষ’ বলে বাবাকে গালি দিয়েছিল। ‘নি-মুরাইদ্যা মানুষ’ কাকে বলে, তখন বুঝিনি, এখন এই মধ্য বয়সে এসে বুঝি, কী কঠিন গালি এটা! অন্য সময়ে বাবা কী করতো জানিনা, কিন্তু সেদিন মায়ের কথায় কোন উত্তর দেয় নি। কারণ, মায়ের গয়না বেচার টাকা ছিলো ওগুলো...
মায়ের কান্না দেখে আমি সাথে সাথে চুপ করে গেছিলাম। তার একটু বাদেই আমাদের বউ-ঠাকুমাকে একেবারে উন্মাদ অবস্থায় আমার বাবার সামনে নিয়ে আসা হলো। দুই কাকা দুই দিক থেকে ধরে রেখেছিল ঠাকুমা’কে। বাবা হচ্ছে গোষ্ঠীতে সবার বড়, তার সকল ভাই-বোনের চোখে ‘বড়দা’ হিসেবে পরিচিত। বউ-ঠাকুমা’কে বাবার সামনে এনে এক কাকা বললো,
“বড়দা, মায়েরে লইয়া কী করুম? কোনভাবেই বর্ডার পার হইতে চায় না। জোর জবরদস্তি কইরা কোনমতে বর্ডার পার করছি, বার বার খালি গ্রামে ফিরা যাইতে চায়। মিলিটারীর গুলি খাইয়া তো মরবো !!
ঠাকুমা একটা কথাই বার বার আওড়াচ্ছিল,
“আমি আমার ঘর ফালাইয়া কুনখানে যামু না। সোনাই ফিরা আইব, আমারে বাড়ীতে রাইখ্যা আয়”!
টাকার শোকে বাবার মন খারাপ ছিল, তার উপর মা বাবারে খোঁটা দিয়েছে, তবুও বাবা বউ-ঠাকুমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল,
“খুড়ীমা, আমরা গ্রামের বাড়ীতে সবাই মিলেই যামু। গ্রামের বাড়ীতে থাকা তো এখন নিরাপদ না, যুদ্ধ শুরু হইয়া গ্যাছে, যুদ্ধ শেষ হইয়া যাইব, দেশ স্বাধীন হইব, স্বাধীন দেশে আমরা সবাই মনের আনন্দে থাকুম। এখন এমন পাগলামী কইরেন না, সময় খুব খারাপ। এত ছুড পুলা মাইয়া গুলির লগে এমুন পাগলামী করলে ওরা কী করবো কন তো! পরাণ কাকাও বাঁইচ্যা নাই, এই ছেলেগুলারে আর কষ্ট দিয়েন না। চলেন আমরা সবাই আগে একটা নিরাপদ জায়গায় গিয়া পৌঁছাই, এরপরে এই বিষয়ে কথা কমু”।
বউ-ঠাকুমা শান্ত হয়ে গেছিল, নতুন প্রলাপ শুরু হয়েছিল,
“ভাসুরপো কইছে, দ্যাশ স্বাধীন হইলেই আমরা সবাই একসাথে বাড়ীতে থাকুম, আর কোনদিন হালার পুতেরা আইবো না, সোনাইরে ফিরা পামু। ওরে আর কেউর বাড়ীতে পাঠামু না”।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটু একটু করে বড় হতে হতে সব জেনেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাঁচ মাসেরও বেশী সময় আমরা কলকাতাতে ছিলাম। আমাদের এক দূর সম্পর্কের কাকার বাসায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেই কাকার আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে দুই বেলা রুটি আর ঝোলা গুড় যোগাড় করতেও কাকার দম ফুরিয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। আমি আটার রুটি দুই চক্ষে দেখতে পারতাম না, তার উপর কন্ট্রোলের দেওয়া আটার রুটির মধ্যে বালি কিচ্ কিচ্ করতো। ভয়ের চোটে ক্ষিদে পেলেও কিছু বলতাম না। কিছুটা কোনরকমে খেয়ে বাকি রুটি ছিঁড়ে কাকের দিকে ছুঁড়ে দিতাম। একদিন শুধু মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“মা, আমরা কী সারা জীবন এইখানেই থাকব?”
-না বাবা, দেশ স্বাধীন হলেই আমরা দেশে ফিরে যাব।
-কবে হবে দেশ স্বাধীন?
-দেশ স্বাধীন করার জন্যই তো যুদ্ধ করছে মুক্তিযোদ্ধারা।
-দেশ স্বাধীন হলে কি আমরা আবার ভাত খেতে পারব?
-হ্যাঁ রে বাবা! ভাত খেতে পারবে। এত খাই খাই করো কেন? আমার আর ভালো লাগে না। এইখানে তোর কাকার কত কষ্ট হচ্ছে এতগুলি মানুষের খাওয়ার যোগাড় করতে। এর মধ্যে তুই একটাও রুটি দাঁতে কাটতে চাস না। এমন করলে আমার ভাল লাগে?
-মা, রুটি মুখে দিলে দাঁতে সিরসির করে, সারা শরীরে সিরসির করে।।
-এখন আর কয়টা দিন মুখ বুজে থাক, দেশ স্বাধীন হয়ে গেলেই আমরা নিজেদের বাড়ী ঘরে ফিরে যেতে পারবো। তখন যত ইচ্ছে ভাত খাইস।
এই কলোনিতে আমার বাবার পরিচিত অনেক মানুষ থাকতো। রায়টের পরেই সবাই গ্রাম ছেড়ে দল বেঁধে চলে এসেছিল। তখন থেকেই এরা পাশাপাশি ঘর তুলে থাকতে শুরু করে। আমার সাথে মা যখন দেশ স্বাধীন হওয়ার গল্প করছিল, বউ-ঠাকুমা পাশের লাগোয়া ঘরের বারান্দায় বসে মাথা আঁচড়াচ্ছিল আর উকুন মারছিল। একটা করে উকুন মারে আর বলে,
“অ চঞ্চলের মা, পোলারে মিথ্যা কথা শোনাও ক্যান? দেশ স্বাধীন হইব না, আমার সোনাই রে অরা ধইরা লইয়া গেছে গা, আমি অভিশাপ দিতাছি, আমার বুকে যেই আগুন জ্বলতাছে, সেই আগুন না নিভা পর্যন্ত কুন স্বাধীনতা নাই”
-খুড়ীমা, কি কন এইসব! স্বাধীনতা আইব না কন ক্যান? স্বাধীনতা আনার লেইগ্যাই তো যুদ্ধ হইতাসে। আপনার সোনাইরে যারা ধইরা লইয়্যা গ্যাছে, তাদের সাজা দেওনের লেইগ্যাই যুদ্ধ। অন্তর থেকে আশীর্বাদ করেন যেন দেশ স্বাধীন হয়, আমরা যার যার বাড়ীতে ফিরা যাইতে পারি। পরের অন্ন ধ্বংস করতাছি, মনটা খারাপ থাকে সব সময়। পোলাটা রুটি খাইতে পারে না, এক মুঠ ভাতও যোগাড় করতে পারি না, অথচ দেশে গোলা ভরা ধান পইড়্যা আছে।
-হ, থাউক গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ! যেই খারাপ অরা, মুক্তিযুদ্ধারা অগো কিচ্ছু করতে পারব না। ইস রে, আমার চউক্ষের সামনে পোয়াতি মাইটার প্যাটের উপরে খাড়াইয়া লাফাইছে অরা! কত যন্ত্রণা দিয়া মারছে রে!!!!!
এমনটাই চলতো সারাদিন। আমি মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়াতাম। একদিন আমার বাবা দৌড়াতে দৌড়াতে কলোনির ভেতর আসছিল আর বলছিল,
“দ্যাশ স্বাধীন হইয়া গেছে, দ্যাশ স্বাধীন হইয়া গেছে! কই আমার খুড়ীমা কই, খুড়ীমা, আপনেরে কইছিলাম না? দ্যাশ ঠিকই স্বাধীন হইব, হালারা পলাইছে, পাকিস্তানী মিলিটারী গো অবস্থা কাহিল কইরা ফালাইছে মুক্তিযুদ্ধারা। সবাই শুন, এখন থিক্যা আর পাকিস্তান কইবা না, ভুইল্যাও কইবা না, এখন থিক্যা নতুন নাম, "বাংলাদেশ"। খুড়ীমা গো, আর চিন্তা নাই, এইবার যামু স্বাধীন দেশের নাগরিক হইয়্যা”।
১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো, আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলাম ২৬শে ডিসেম্বর সকালে। কলোনির অনেকেই বলেছিল,
“দেশে গিয়ে কাজ কি? আবার দৌড়াতে হবে। তার চেয়ে এখানেই থাকো, শান্তিতে থাকতে পারবে”।
বাবাকে আটকে রাখার সাধ্য কারোই ছিল না। বাবা প্রায়ই বর্ডার এলাকায় চলে যেত, খুব ইচ্ছে ছিল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার। কিন্তু আমাদের পরিবারে নারী ও কম বয়েসী কিশোর-কিশোরীর সংখ্যাই বেশী ছিল, সমর্থ পুরুষ বলতে একমাত্র আমার বাবাই ছিল। তাই ইচ্ছে থাকা সত্বেও মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেন নাই। মনের মধ্যে চাপা কষ্ট ছিলই। মাঝে মাঝেই বলতেন,
“দূর, এই পরাধীন জীবন আর ভাল্লাগে না। কবে যে দেশ স্বাধীন হইব!
...
.....
.........মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আমরা নারায়ণগঞ্জে থাকতাম, মণি পিসীরা থাকতো গ্রামের বাড়ীতে। দেশ স্বাধীন হতেই মণি পিসীরা গ্রামের বাড়ীতে চলে গেল, আমরা শহরের বাড়ীতে ফিরে এলাম। প্রথম প্রথম মনে বেশ ফূর্তি টের পেতাম, কিছুই বুঝতাম না, তবুও বড়দের সাথে তাল মিলিয়ে বলতাম,
“এখন আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক”।
তখন বউ-ঠাকুমাও মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। সোনাই পিসীর জন্য বিলাপ করতেন না। এভাবেই ’৭৫ এর ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত চলছিল, ১৫ই আগস্ট সকালেই সব কিছু বদলে যায়। আরেকবার দেশে খারাবি নেমে আসে। গ্রামের বাড়ী থেকে খবর আসতো, বউ-ঠাকুমা আবার প্রলাপ বকা শুরু করেছে। ভুলভাল বলতো না অবশ্য, মুজিবররে মাইরা ফেলছে যারা, তারাই নাকি তার মাইয়ারে লইয়া গেছে!
ধীরে ধীরে গ্রামের হাওয়া পাল্টাতে শুরু করে। রহমত চাচার ছেলেরা মাতব্বর হয়ে উঠে। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে রহমত চাচার ছেলেরা আমাদের বাড়ীর টিনের চাল, কাঠের পাটাতন সবই খুলে নিয়েছিল, এত তাড়াতাড়ি দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে, তারা ভাবে নাই। বাবার জ্ঞাতি পুরুষেরা গ্রামে ফিরে নতুন করে সব গড়ে নিয়েছিল। কিন্তু ’৭৫ এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সাথে সাথেই সব ওলোট পালোট হয়ে যায়। রহমত চাচা আরও অসহায় হয়ে পড়েন, ছেলেদের শাসনে থাকতে হতো বলে অন্যায় দেখেও চুপ থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর বছর খানেক পরেই উনিও মারা যান। মৃত্যুর আগে একদিন আমার বাবাকে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন দেখা করতে চান বলে, বাবাকে কাছে পেয়ে দুই হাত চেপে ধরে কেঁদেছিলেন। রায়টের সময় তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর বাড়ীতে আশ্রিত তিন নারীকে গয়নাগাঁটি রেখে বের করে দেয়া হয়েছিল, অসহায়ভাবে তাদের মৃত্যু হয়, ব্যাপারটি ওনাকে অনেক মানসিক কষ্ট দিচ্ছিল, এটা বলার জন্যই ডেকেছিলেন। শেষ মুহূর্তে বাবাকে চমকে দিয়ে একটি পোঁটলা বাবার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন,
“আমার সোনাই মায়েরে তো ফিরায় দিতে পারলাম না, তার গয়নাগুলি এই বাড়ীর সিন্দুকে আছিল, তোমার হাতে তুইলা দিয়া নিশ্চিন্তে মরতে চাই”।
বাবা ওনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন,
“চাচা, আমাদের বিশ্বাসটাই ভাইঙ্গা গেছে যেখানে, সেখানে এই গয়না দিয়া কী হইব। আপনি আমারে ডাকছেন, বুড়া মানুষ এইভাবে কান্দতাছেন, পুতেদের অপকর্মের দায় নিয়া জ্বলতাছেন, এইটা দেইখা আমার একটুও সুখ হইতাছে না। কয়টা গয়নার লোভে ওরা তিনটা নারীরে এইভাবে পশুগো হাতে তুইলা দিছিল, এই গয়না ওদেররেই দিয়া দেন। আপনে কাইন্দেন না, গত বারো বছর ধইরা নরকের আগুনে পুড়তাছেন আপনি। আপনের বিরুদ্ধে আমাদের কোন নালিশ নাই”।
’৭৭ সালের দিকের ঘটনা, রহমত চাচার ছেলেরা এক রাতে আমার দুই দাদুকে ডেকে শাসায়, প্রাণে বাঁচতে চাইলে যেন ওনারা বাড়ীঘর তাদের কাছেই বিক্রী করে দিয়ে ইন্ডিয়া চলে যায়। দাদুরা পালটা প্রশ্ন করতে সাহস পায় নি, কেন বাড়ীঘর বিক্রী করতে হবে। উড়ো খবর শুনেছে, আপোসে না দিলে নাকি বাড়ী জবরদখল করে নিয়ে যাবে।
বউ-ঠাকুমা আর মণি পিসীকে নিয়ে তরুণ কাকা কলকাতায় বউবাজারের এক অন্ধকার গলিতে বাসা ভাড়া নেয়, সেখানে থেকেই আমার কাকার রেজাল্ট ভালো থাকা সত্ত্বেও অনেক তদ্বির করে একটি বেসরকারী কলেজে অধ্যাপনার চাকুরী পেয়ে যায়। বাকী জ্ঞাতি-গুষ্টিও বেশির ভাগ এক কাপড়ে আগরতলা হয়ে কলকাতা চলে গিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে ।
--------
রহমত চাচার ছেলেরা দুই দাদুকে আদৌ টাকা পয়সা দিয়েছিল কিনা, কেউ জানে না। কলকাতা গিয়ে দাদুরা বেশীদিন বাঁচেন নি, আর বউ-ঠাকুমা কলকাতা এসেই পুরোদমে পাগল হয়ে যান। কাকার পকেটের জোরও তেমন ছিল না। তাই বড় ডাক্তার দেখানোর বদলে পাড়ার ডাক্তারের কাছ থেকে হোমিওপ্যাথির পুরিয়া, নাহলে মাদুলী, তাবিজ কবচেই চিকিৎসা সীমাবদ্ধ ছিল। আমার বাবাও খুব একটা সাহায্য করতে পারতেন না, ওনারও তো একই অবস্থা, দেশের বাড়ীর সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে গেছে, কলকাতা শহরের ভাড়া বাড়ীতে থেকে সওদাগরী আপিসে কেরাণীগিরি করে কত টাকাই বা আয় করেন! একমাত্র সন্তান আমাকে নিয়েই সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখেছেন। খুব একা হয়ে গেছিলেন বলেই আমাকে অমন আগলে রাখতেন।
এইসব দেখে দেখে কখন যেন আমি যুবক হয়ে উঠেছি, ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করে, কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমাদের তো আর কোন আত্মীয়-স্বজন ছিল না, কলকাতাতে বউ-ঠাকুমাকে নিয়ে তরুণ কাকা থাকতেন। প্রায়ই যেতাম ওনার বাসায়। লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করতাম, পয়সা বাঁচিয়ে বউ-ঠাকুমার জন্য টুকিটাকি জিনিস কিনে নিয়ে যেতাম। ঠাকুমা খুব খুশী হতেন। আমাকে ঠাকুমা খুব ভালোবাসতেন। শেষের দিকে আর পাগলামী করতেন না। হয়তো ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিলেন। মণি পিসীর বিয়েটাও খুব ভালো ঘরে হয়েছিল। পিসীর বর খুব বনেদী পরিবারের সন্তান। ওনাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ছিল অনেক। এতেই বউ-ঠাকুমার মাথা থেকে বাড়ী হারানোর শোকটা অনেকটা কেটে গিয়েছিল।
আমার পাশের খবর শুনে ঠাকুমা খুব খুশী হয়েছিলেন। কিন্তু এমন এক মন্তব্য করেছিলেন যে আমার বুকে ধাক্কা দিয়েছে,
“বাহ! আমাগো চঞ্চল বাবুর ভাইগ্যটা বড়ই ভাল, কেমুন ফাস্ট কেলাস পাইয়া গেছে। আমি ত মনে করছিলাম, তুমার নাম দেখলেই ফেল করাইয়া দিব।"
বলেছি, কেন, ফেল করিয়ে দেবে কেন?
-দ্যাশটা তো আর মুজিবরের দখলে নাই, রাজাকারের দখলে গেছে গা। হ্যারেও মারলো, আমাগোরেও মারলো। তোমার হিন্দু নাম দেইখা তোমারে ফেল করাইয়া দিল না, এইটা দেইখা অবাক হইছি।
-ঠাকুমা, তোমার দেখি মাথার পোকা আবার নড়তে শুরু করছে।
-ভাই রে,সাধে কি আর এই কথা কই! কত্ত বড় বাড়ী ঘর আছিল আমাগো, রাজাকারের পেটে গেছে গা। কত বড় বড় কথা শুনছিলাম, দেশ স্বাধীন হইব, স্বাধীন হইলেই আমরা মনের আনন্দে নিজের ভিটায় থাকতে পারুম। কী লাভ হইল রে ভাই, এক রায়েটে মাইয়াটারে দিলাম, আরেক রায়েটে দিলাম বাড়ী ঘর, জমাজমি। কেমনতর স্বাধীনতা পাইলাম আমরা? রহমইত্যার পুলাগো কোন বিচার হইল না”।
-ঠাকুমা, স্বাধীন দেশেই তো আছ। যা চলে গেছে, তা চলে গেছে। পুরানো দিনের কথা আর মনে করো না, আবার পাগল হয়ে যাবে। পাকিস্তান আমলের মত পরাধীন তো আর নাই তুমি। নিজেকে সব সময় স্বাধীন ভাববে।
-শুন্ চঞ্চল, তরে একটা কথা কই। মাইয়ালোকের জীবনে স্বাধীনতা বইলা কিছু থাকে না। এই যে ধর আমার কথা, আমারে তুই কী ডাকস? বউ-ঠাকুমা ডাকস। আমার পোলা মাইয়ায় ডাকে ‘মা’, তোর দাদু ডাকতো সোনাই-এর মা, শ্বশুর–শাশুড়ি ডাকতো বৌমা। আমার নাম ধইরা কেউ কোনদিন ডাকে নাই। নিজের নাম নিজেই ভুইলা গেছি।
জন্মের পরে মায় নাম দিছিল ‘শৈলবালা’, বাপ-ভাইয়েরা ডাকতো ‘শবি’ কইয়া, আমার নামটাও কেউ ঠিক মত ডাকতো না। বিয়ার পরে তো নামই হারায়া গেল।
কালা আছিলাম বইলা দোজবরে বিয়া হইছে, আমি দোজবরের লগে বিয়া করতে রাজী কিনা, এই প্রশ্নটাও কেউ করে নাই, নিজের মতামত দেওয়ার স্বাধীনতাও ছিল না। বুড়া স্বামীর সংসারে ঢুকছিই ‘মা’ হইয়া,মণি-তরুণরে নিজের মত কইরা আদর করার স্বাধীনতাও ছিল না, সোনাইরে আদর করা বা বকা দেওয়ার স্বাধীনতাও আছিল না, বকা দিলেই সবাই মনে করতো, সৎ মা তো, তাই মা-মরা মাইয়াটারে বকে আর আদরে ভাবতো নিজের নয় কইয়্যাই মাথাডা খাইতাসে। মাইয়াটারে হালার পুতেদের হাত থিকা বাঁচাইতেও পারলাম না। এরপরে তো কত কষ্ট গেল, মুক্তিযুদ্ধ হইল, দ্যাশ স্বাধীন হইল, নিজের ভিটায় উঠলাম, কিন্তু পাঁচ বছরের বেশী থাকতেও পারলাম না। এক কাপড়ে পলাইয়া আইলাম। নিজের ভিটামাটি থাকতেও ভাড়া বাড়ীতেই জীবন কাটায় দিলাম, মরতেও হইব পরের বাড়ীতেই। দ্যাখ এইবার চিন্তা কইরা, নিজের ঘরে মরুম, সেই স্বাধীনতাটাও আর থাকলো না”।
...
......ঠাকুমার সেদিনের কথা গুলো খুব মনে পড়ছে। কী কঠিন বাস্তব কথা! ‘পাগলের প্রলাপ’ বলার কোন কারণই নেই। প্রায় অশিক্ষিত এক নারী, অথচ স্বাধীনতা সম্পর্কে কী স্বচ্ছ ধারণা ছিল, ভেবেই অবাক হই।
আমার নিজের একটিমাত্র সন্তান, নাম রেখেছি ‘স্বাধীনচেতা’। আমিই রেখেছি নাম। এত বড় নাম কেউ বলতে চায় না। পরিবারে সবাইকে বলেছি, মেয়েকে ওর পুরো নামেই ডাকতে হবে। মেয়েকেও বলেছি, সবাইকে বলবে যেন পুরো নামেই ডাকে। নামকে ভাঙ্গতে দেবে না।
স্বাধীনচেতার বয়স এখন ঊনিশ বছর। মেধাবী, প্রচুর পড়াশোনা করে, এই বয়সেই নানা বিষয়ের উপর লেখা অনেক বই তার পড়া হয়ে গেছে। আমার মতই পড়ুয়া হয়েছে মেয়ে, কিন্তু আমার মত শৃঙ্খলে বাঁধা জীবন হয় নি ওর। স্বাধীনচেতা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে বড় হচ্ছে। আমার বাবা মা আমাকে আঁচলে ঢেকে রাখতেন, আর আমি মেয়েকে নিজের মত করে চলার সুযোগ দিয়েছি। গত শুক্রবার থেকে এই চত্বরেই সবার সাথে গলা তুলে শ্লোগান দিচ্ছিল। আমাকেও খুব বলছিল ওর সাথে গলা মেলাবার জন্য। আমি চোখ টিপে দিয়েছি। ও বুঝে গেছে, বাবা তার কর্মকান্ডে সায় দিচ্ছে।
চত্বরে তরুণ-তরুণীরা যেভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, দেখে মনে হয়, সুদিন বুঝি ফিরে আসি আসি করছে। ধর্ষকদের বিচার শুরু হয়েছে। একটি ধর্ষক নাবালক বলে মুক্তির কথা বলতেই সেই রায়ের বিরুদ্ধে সারা দেশ ফেটে পড়েছে, আমার বউ-ঠাকুমা বেঁচে থাকলে তাঁকে আমি কাঁধে চড়িয়ে হলেও এই চত্বরে নিয়ে আসতাম। অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে উনি পৃথিবী ছেড়েছেন! এই কষ্ট ওনার পাওনা ছিল না। কিছুই চান নি, নিজের ভিটেয় মরতে চেয়েছিলেন। আজ যদি এই চত্বরে আসতেন, দেখতেন, “চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়”! এই সুন্দর দেশটার গালে যারা চুনকালি লেপে দিয়েছে, আজ তারা তরুণদের জালে আটকা পড়েছে। আমরা যা পারিনি, আমাদের পরের প্রজন্ম তা করতে চলেছে। দেশের মাটিতে ওই নরপশুদের বিচার হবে। এই তারুণ্য, অনেক মেধাবী, অনেক সাহসী, অসাম্প্রদায়িক। এইজন্যই ওদের একটা মাত্র ডাকে আজ আকাশ কাঁপছে, মাটি কাঁপছে, দেশের সকল ধার্মিক, দেশপ্রেমিকের হৃদয় কাঁপছে! আমি ওদের দৃপ্ত কন্ঠে শ্লোগান শুনে শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে সম্মান করছি। আজ বড় বেশী মনে পড়ছে আমার ‘পরাধীন’ বউ-ঠাকুমা’কে। ঠাকুমা বেঁচে থাকলে হয়তো রহমত চাচার ছেলেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারতেন, আর কিছু না হোক, অপরাধীর বিচার হবে, এই সত্যিটুকু জেনে যেতেন।
“বাবা, ও বাবা! তুমি এভাবে কাঁদছো কেন”?
“আরে, মামনি তুই কখন এলি রে মা?”
“স্বাধীনচেতা একা একাই পথ চলতে পারে বাবা। আমি একা একাই এসেছি। শ্লোগান শেষে মঞ্চের ঐ দিকটাতে দাঁড়িয়েছিলাম। ওখান থেকেই তোমাকে দেখতে পেয়েছি। এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন, আমার হাত ধরো, চলো আমার সাথে, আর একটু সামনের দিকে এগিয়ে যাই”...
...........
..............
..................
.................................এখানেই শেষ নয়.... পথ চলা এখনও অনেক বাকি....

৩টি মন্তব্য: