রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০১৬

ঠাম্মা...

ঠাম্মা...
--------------------
শিবাশিস্ আচার্য
"""""""""""""""""""
এক
-----
সজল-ঘন মেঘের ছায়ে, মৃদু সুবাস বিছিয়ে দিয়ে এক অজানা শিল্পী সেদিন ভুবন-ক্যানভাসে আঁকা একটি ছবির একটু একটু করে রঙ্ মুছে চারিপাশে অন্ধকার নামিয়ে আনছে । পূব-হাওয়া উন্মনা হয়ে বয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে সেই হাওয়ার উচ্ছলতা। জানালার পর্দাগুলো ইতস্তত নড়াচড়া করছে। কখনো বা ফুলে উঠছে ।
..প্রকৃতিও যেন গাল ফুলিয়ে গোমড়া মুখে রয়েছে । গাছের পাতায়ও জেগেছে যেন ক্ষণিক খুশির হিল্লোল । শুরু হয়ে গেলো প্রকৃতির অভিমান শেষে অঝোরে কান্না।
....আজ মেঘলা আবহাওয়ায় সুনীতি দেবীর মন চঞ্চল হয়ে উঠছে । সদ্য ঘুম ভেঙে উঠে কিচ্ছু ভালো লাগছে না। বুকটা ধড়ফড় করছে।
--তিন্নি, এই তিন্নি ! ডাকতে ডাকতে তিনি হাঁপাতে থাকেন। হাতটা থরথর করে কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ ! “তিন্নি, এই তিন্নি” বলে আবার ডাকেন। কিন্তু, তার ক্ষীণ কন্ঠের ডাক তিন্নির কান পর্যন্তও যায় না। তিন্নি তো এইখানেই নেই।
ঘরে লাইট জ্বালানো নেই। বাইরে শুরু হয়েছে তাণ্ডব। ঝম্ ঝম্ শব্দে নূপুর বাজিয়ে কে যেন ছুটে আসছে। বাইরের বৃষ্টি-কোলাহল যেন বুকের ভেতরে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। আশেপাশে কেউ নেই। পাশের ঘরে আরেকজনের থাকার কথা। তিনি তো আছেন দিন-রাত কানে ইয়ারফোন নিয়ে মগ্ন। এ পাশে কেউ মরে পড়ে থাকলেও তার ধ্যান ভাঙবে না !
দুই
-----
“রাকা, বৃষ্টি পড়ছে। শিগগিরি তোর আম্মার ঘরের জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে আয় মা । সব তোষক ভিজে যাবে।” ঘুম জড়ানো গলায় কথাগুলো মেয়েকে বলে আবার পাশ ফিরে শুলেন সায়ন্তী।
“হ্যাঁ, যাই মা” পাশের ঘর থেকে জবাব এলো রাকার। মোবাইলের ক্যামেরায় তার ঘরের জানালার ভেতর হতেই বাইরের বৃষ্টির রূপ ধরার চেষ্টাটা মনোমত হচ্ছিলো না তার । কয়েকটা মনের মত ছবি তুলে নিয়ে ওর মনে পরলো ঠাম্মার কথা। ঠাম্মা ঘরে একা নেই তো? নাঃ..তিন্নি আছে তো !!--মনে মনে ভাবে সে ।“কি রে, যাস নি?"--ঘুম ভেঙে উঠে সায়ন্তী বলতে বলতে পা বাড়ালেন শাশুড়ী-মায়ের ঘরের দিকে।
“তুমি শোও। আমি যাচ্ছি !” বলে রাকা মোবাইল রেখে দ্রুত চলে গেলো ঠাম্মার ঘরে ।
তিন
------
সিঁড়ি ঘরের আলো জ্বেলে দিয়ে এগোয় সে। ঠাম্মার ঘরে দরজায় শব্দ করছে কে?
“তিন্--নি ! তি-ন্-নি-ই-ই ! এই তি-ন্-নি” বলে সুনীতিদেবীর কন্ঠ ভিজে আসতে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার মাথার কাছে দেখা দেয় একটি মুখ। মেয়ে মুখ। “কে ওটা?” মাথার কাছে থেকে মুখটা সরে গিয়ে জানালাগুলো বন্ধ করে দিয়ে আলো জ্বালিয়ে দিলো ঘরের। কোথাও তিনি তিন্নিকে দেখতে পেলেন না। মাথার কাছে ফিরে এলো মুখটা। তাঁর মেজ নাতনী রাকা ! “এই রকম ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছো কেন? ও আম্মা !” বলতে বলতে পাশে বসলো।
“তিন্, তিন্নি” বলে তিনি গোঙাতে থাকেন। রাকা আরো কাছে এসে বসে জড়িয়ে ধরে ঠাম্মাকে। একটু ঝুঁকে, শুয়ে থাকা ঠাম্মার গালে নিজের গাল লাগায়। পাতলা শরীরের অবয়বে ঢেকে দিতে চায় ঠাম্মার ভয়ে কাঁপতে থাকা চওড়া শরীরটাকে। “কি হয়েছে ও ঠাআআম্মা?” আদুরে অবোধ শিশুর মত সাতাত্তর বছর বয়সী ঠাম্মা অভিমানী কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন, “কই ছিলি? কতখন থিক্যা ডাকতাসি !! তিন্নি কই?”
ঠাম্মাকে লাগছে একেবারে বাচ্চাদের মত। বয়সের ভাঁজে মুখ কুঁচকে যাওয়া বৃদ্ধার মুখশ্রী আর অভিমানী কন্ঠস্বরে দ্বিধান্বিত হতে হয়। ঠাম্মার দিকে তাকিয়ে রাকার খুব কষ্ট হতে থাকে। মানুষটার ভেতরে কি চলছে কে জানে ! খানদানী জমিদার গিন্নির মত সারাদিন হাঁক-ডাক করতেন সুস্থ অবস্থায়। তাকে এই অবোধ অবস্থায় কল্পনাও করা যায় না। হঠাত্ই বছরখানেক ধরে রোগে ভুগে ভুগে এইরকম শিশু হয়ে গেছেন। আশ্বস্ত করার জন্য জবাব দিলো, “তিন্নি তো সারাদিনই তোমার কাছে থাকে। এইমাত্রই হয়তো উপরে গেছে। আসবে। বড়োকাকাকে হয়তো চা দিতে গেছে ।এখন আমি থাকি। তোমার কিছু লাগবে? আমাকে বলো।”
ক্রমাগত “আমারে তো নিয়া যাইতে আইতাসে! আমি যামু না! এই রাকা!” বলতে বলতে, আর জানালার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজে চোখে মুখে আরো বেশি ভয়ের ভাব ফুটে উঠছে তাঁর। রাকা ঠাম্মাকে আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ভয় দূর করার চেষ্টা করছে।
ঠাম্মার গোঙানি এইবার কান্নায় রূপ নিতে থাকে। রাকা পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে। ঠাম্মা বিছানা ছেড়ে নেমে পরতে চাইছে। রাকার একার পক্ষে সামলানো সম্ভব হয়ে উঠছে না। মাটিতে পরে গেলে এত ভারী শরীরে ব্যথা পাবেন। ডায়াবেটিসের পেশেন্ট পরে গিয়ে কেটে গেলে বিপদ বাড়বে। তাছাড়া ও একা তুলতেও পারবে না।
শাঁখের শব্দ ভেসে আসে । বড়োকাকীমণি সন্ধ্যাপ্রদীপ দিচ্ছে ।হাতজোড় করে প্রণাম করে দুইজনেই। মিনিট দশেক পেরিয়ে গেলো।মেজবউমা সায়ন্তী এসে ঘরে ঢোকে । রাকা চলে যায় ।তাঁর শাশুড়ী-মায়ের পাশে সবসময় একজনকে থাকতেই হয় ।
চার
------
সায়ন্তী গিয়ে দেখলেন শাশুড়ি-মা মেঝেতে দাঁড়িয়ে চটি পরার চেষ্টা করছেন। চটির আঙ্গুলের জায়গায় পা ঢোকান নি। কোনরকমে চটির উপরে পা চেপেই ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে এগোচ্ছেন। এভাবে হাঁটলে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবেন যে । জিজ্ঞেস করলেন, “কই যান? চটিটা ঠিকমত পরে নেন। নাইলে পরে যাবেন যে।” ভাঙ্গা টেপ রেকর্ডারের মত একটানা জবাব পেলেন, “হেই পাশে যামু! আমি হেইই পাশে যামু! আমি হেই পাশে যামু!”
“আচ্ছা, চলেন” বলে শাশুড়ি-মাকে এগিয়ে এসে ধরে ধরে নিয়ে চললেন নিজের ঘরের দিকে।
সুনীতি দেবী মেজবউয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কালকা এক তারিখ না? অনির জন্মদিন। অনিরে ভালো মন্দ খাওয়াইতে অইবো।” সায়ন্তী অবাক হন। শাশুড়ি-মায়ের এই জন্মদিনের কথাটা কিভাবে মনে আছে !! অনিতা তাঁর এক ননদের নাম । স্বামীর কাছে শুনেছেন, ছোটবেলায় তাকে ঘুমের মধ্যে বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে দম বন্ধ হয়েই এক বছরের বাচ্চা মারা যায় । তারপর শাশুড়ি আত্মগ্লানিতে ভুগে একটু অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে বাঁচাবার জন্য শ্বশুর মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলেন যে অনি ইংল্যান্ডে আছে....
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হুঁ, খাওয়াইবেন ক্যামনে? অনি তো ইংল্যান্ডে!”
“হ, ভালো মন্দ খাওয়াইতে অইব।” আবার একঘেয়ে জবাব। মনে করিয়ে দিলেও সেটা তিনি শুনলেন না সম্ভবতঃ!
ঘর ছেড়ে মেজছেলের ঘরের দরজার দিকে না গিয়ে তিনি বাইরের দিকে যাওয়ার জন্য নীচের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াচ্ছেন। শাশুড়ী-মায়ের এই কখনো ভালো থাকা, কখনো পাগলামী সায়ন্তী সব সময় সহ্য করতে পারেন না। তাঁর সার্বক্ষণিক দেখাশোনার ব্যাপারটাও তিনিই নিজে থেকেই করেন।ছেলেরা সবাই বলেছিলো আয়া-সেন্টারের আয়াদের নিয়োগ করার জন্য।কিন্তু তিনি আর সেজ দেওরের মেয়ে তিন্নি-ই রাজি না হয়ে নিজেদের হাতে সেবার ভার তুলে নিয়েছিলেন। তিন্নি শুধু সবসময় ঠাম্মার কাছে থাকে ।
তিনি কিছুটা ঝাঁঝের সাথে বলে উঠলেন, “বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। মুষলধারে। আপনি কই যাইতাছেন?”
“আমি অনির কাছে যামু !"--উত্তর দেন সুনীতিদেবী।
--পরে যাইয়েন ! আসেন এখন, ঘরে ঢোকেন।” বলে নিজের দরজার দিকে ঘোরাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু একা পেরে ওঠেন না। দুর্বল শাশুড়ি-মায়ের শরীরে কি অসম্ভব শক্তি !
“আমি অনির কাছে যামু ! ওরে লইয়া জন্মদিনের জিনিস কিনুম অনে !”
“আচ্ছা, আরেকদিন যাইয়েন। এখন না ! আপনের ছেলে কিন্যা দিব !”
সিঁড়ি ঘরে সামান্য উঁচু গলায় কথা বললেই বেশ জোরে শোনা যায়। সারা বাড়িতে গমগম করে। ভালো করে খেয়াল না করলে মনে হয় নীচে যেন কি না কি অঘটন হয়েছে ! রাকা নিজেদের ঘরের দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিলো। ঠাম্মার সাথে মায়ের টানাটানি দেখতে পেল।
এরমধ্যে হইচই শুনে দুই আর তিন তলা থেকে নেমে এলো তিন্নি, মিষ্টু আর তাদের বাবা-মায়েরা । সুনীতিদেবীর দুই নাতনি, ছেলে আর বউমা। উপরের দুটো ফ্লোরে থাকে। তিনি নিজে থাকেন একতলায়।
সবাই এক সাথে এগিয়ে এলো, “কি হয়েছে আম্মা?.... কি হয়েছে মা?... এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে কই যাও?”
“আমি অনির কাছে যামু! তোমরা সব এরকম কর্তাছো ক্যান্?” মারমুখী ভঙ্গীতে বলে উঠলেন সুনীতিদেবী।
“চলেন, টিভিতে "জন্মভূমি" সিরিয়াল দেখাচ্ছে। দেখবেন চলেন ।” বলে শাশুড়ি-মাকে বড় জায়ের ঘরের দিকে ঠেলে নিয়ে চললো সবাই। বড়ো ভাশুর-বড়ো জা আর তাদের ছেলে, ভাশুরের কর্মক্ষেত্র পুণেতে থাকে। মাঝে মধ্যে এসে আনন্দ করে যায় সবার সাথে ।
ঘরে নিয়ে সোফায় বসিয়ে দেওয়ার পরে সিরিয়াল দেখে আবার ওঠার জন্য অস্থির হয়ে পরলেন তিনি। সেজবউ ছায়া জিজ্ঞেস করলো, “কি হয়েছে? বাথরুমে যাবেন?”
--না!
--তাহলে?
--আমি চক্রবর্তীর কাছে যামু !
--ওনার কাছে যাবেন কেন? ওনাকেই আপনার ছেলে কল্ দিয়ে দিচ্ছে..বলে ওঠে ছোট বউ মিলি ।
--না অহনই যামু ! দাশু আমারে নিয়া চল্ !--সেজ ছেলের উদ্দ্যেশ্যে বলে ওঠেন তিনি ।
--এখনি যাইবা নাকি? গাড়ি আনুক আগে, তারপরে যাইও।
--আইচ্ছা...
মা শান্ত হয়েছে দেখে ধীরে ধীরে যে যার ঘরের দিকে পা বাড়ায় । ঠাম্মার কাছে শুধু বসে থাকে সুমিতা ওরফে তিন্নি...
পাঁচ
------
ছোটছেলের ঘরের মধ্যে কম্পিউটার টেবিল ঘিরে বসে আছে সুনীতিদেবীর দুই ছেলে--দাশরথি আর নৃপেন, তিন বউমা--সায়ন্তী,ছায়া আর মিলি, দুই নাতনি--সেবন্তী ওরফে রাকা আর জয়ন্তী ওরফে মিষ্টু ।মেজ ছেলে বিশ্বনাথ বেরিয়েছে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে।স্কাইপে আরেক ছেলে মণিশঙ্কর আর তার বউ অবন্তী এসে যোগ দিয়েছে এদের সাথে।তাদের ছেলে শুভেন্দু অন্য ঘরে টোয়েফেল্-এর পরীক্ষার প্রিপারেশনে ব্যস্ত ।মাঝে একবার এসে সবার সাথে হাই-হ্যালো করে চলে গেছে আবার পড়তে ।
সায়ন্তী-- খালি বলছে, আমি অনির কাছে যাবো ! কি জ্বালা বলো তো দিদিভাই !!
অবন্তী-- মৃত মানুষের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা ! একদম ভালো লক্ষণ না !
রাকা-- আজ আবার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দাদুকে স্বপ্নে দেখেছে আর আমি যেতেই ভয়ে ভয়ে বলছে আমায় নিয়ে যেতে এসেছে আমি যাব না । ও রাকা !!
মণিশঙ্কর-- হুঁ! চিন্তার ব্যাপার !
অবন্তী-- ডঃ চক্রবর্তী কি বলছেন? কোনো ইমপ্রুভমেন্ট নেই?
দাশরথি এবং নৃপেন-- না গো বউদি, ডঃ তো হার্ট অ্যান্ড সোল্ চেষ্টা করছেনই ! মাকেও তো একটু কো-অপারেট করতে হবে !! কি বলো?
মিষ্টু-- একদম ঠিক বলেছে গো জ্যেঠু !! আম্মা কারোর কথাই শুনতে চায় না !!
মণিশঙ্কর--তিন্নি কোথায়?
ছায়া--ওই তো সবসময় মায়ের কাছে কাছে থাকে ।
মিলি--আপনি ভাবতেই পারবেন না দাদাভাই !! ঐটুকু মেয়ের কি দারুণ দায়িত্ববোধ !!
অবন্তী-- তা তো হবেই !! কোন বংশের মেয়ে দেখতে হবে তো !!
মণিশঙ্কর--আচ্ছা রাখি এখন !! অবস্থার আপডেট দিও। সেরকম হলে না হয় ফ্লাইটেই চলে যাবো..ভালো থেকো সবাই..
..তোরাও ভালো থাকিস দাদা..আপনারাও ভালো থাকবেন দাদা..তোমরাও ভালো থেকো জ্যেঠু..
কম্পিউটার বন্ধ করে দেবার পরে সবাই মিলে ঠিক করলো, ডঃ চক্রবর্তীকে কল্ দেওয়া হোক,সেইমতো দাশু ফোনে কন্ট্যাক্ট করলো ।সামনে পুজো আসছে তার আগে মাকে ভালো করে তুলতে না পারলে বেড়াতে যাওয়ার টিকিট ক্যানসেল করতে হবে, আরো নানা সমস্যায় পরতে হবে।
ছয়
-----
বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ডঃ সুকল্যাণ চক্রবর্তী চেক আপ করে যাবার বেশ কয়েকদিন পরের এক সন্ধ্যা।
তিন্নি টেলিভিশনে সিরিয়াল দেখছিলো। উদ্বাস্তু মানুষগুলোর কি ভয়ঙ্কর অবস্থার কাহিনী দেখাচ্ছে চলচ্চিত্রায়ণে...
ঠাম্মা বিছানায় শুয়ে আছেন। ঠাম্মার দিকে চেয়ে দেখলো, তাঁর চোখ খোলা। দেখছেন বা শুনছেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। চুপ করে শুয়ে আছেন। কোন কথা বলছেন না। পুরোনো স্মৃতিগুলো হয়তো আবার মাথায় গিয়েছে কিনা ভেবে কিছুটা চিন্তিত হলো ও। বুড়ো বয়সে মানুষ অসুস্থতার-দুঃখের কথা শুনতে পারে না। আর ওর ঠাম্মার তো ব্রেইনের সমস্যা! কখনো সুস্থ। আবার কখনো বিগড়ে যান। হঠাত্ করে বোঝাও যায় না কেমন আছেন।
ও ঠাম্মার মাথায় চুলে বিলি কাটতে লাগলো।
সুনীতিদেবী বিছানায় শুয়ে বারান্দার দরজা দিয়ে কালো অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইলেন।
মনে পরে যায় ফেলে-আসা জীবনের কথা। এইরকম এক অন্ধকার রাত ছিলো সেইদিনও। বাইরে প্রচন্ড মুষলধারে বৃষ্টি। দরজায় কয়েকবার ধাক্কার শব্দটা কানে পৌঁছাতে বেশ দেরী হয়েছিলো। এমনিতে একা। সাথে রয়েছে নতুন প্রাণ ! মাত্র ষোলো বছর নয় মাস বয়সে নিজের শরীরে গড়ে উঠছে পাঁচমাসের ভাবী অস্তিত্ব ! বারো বছর বেশী বয়সী স্বামী পুলিশের এস্.আই.। সারারাজ্যের মানুষের নিরাপত্তার ডিউটি শেষ করে অত রাতে কিশোরী বউয়ের নিরাপত্তার কথা মনে পরতো। ঘরে ঢুকেই মুখের উপর একটা রিপোর্টের কাগজ ছুঁড়ে দিয়ে ঘুঁষি তুলে চোখ পাকিয়ে বলেছিলো-- মাইয়া !! মাইয়া !! কেডায় কইছিলো মাইয়া বিয়াইতে !! এখন আর সময় নাই !! নইলে এক্কেরে মাইরাই ফালাইতাম্ । লোকটার মধ্যে রোম্যান্টিকতার লেশমাত্রও ছিলো না। শুধু অধিকার করে রাখতে চাইতো সবকিছু। ঝুম বৃষ্টির কলতান, ভেজা মাটির ঘ্রাণ উপেক্ষা করে আরেকজনের ইচ্ছের হাতে সমর্পিত হতো তার ইচ্ছে-অনিচ্ছে। রাতের পর রাত। একটা যন্ত্রণাক্লিষ্ট রমণের আবেশে মথিত হয়ে যেতো তার রাতগুলো । একটু কবিতা, গল্প বা একটু গান তার কাছে বিলাসিতার সামিল । এইরকম ঝড় বৃষ্টির রাতে যখন স্বামীকে সাথে নিয়ে ভিজতে মন চাইতো তখন সে অনুরোধটা করারও সাহস পেত না। তার আগেই ওর উপর আদেশ বর্ষিত হতো চড়ের ইঙ্গিত সহযোগে-- “কাল কিন্তু অফিস আছে আমার। ভিইজ্যা যদি ঠাণ্ডা লাগে, তো দ্যাখামুনে মজা !! রান্নাডা কি তুমার মায়ে আইসা করবো ?”
কিশোরী বয়সের চঞ্চল মনে সবসময় একটা ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার এই কারাগার হতে প্রায়ই মুক্তি আশা করতো মনটা। মুক্তি তো মিললোই না। উপরন্তু, পাঁচ-পাঁচটি সন্তানের মায়ায় বাঁধা পরলো জীবন। কিশোরীত্ব থেকে তরুণীত্ব পেরিয়ে আজ বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত।
আজ এত বছর পরে, সব সন্তানের ঘরের নাতি-নাতনীদের সার্বক্ষণিক সেবায় নিয়োজিত থেকে এই মায়া ছেড়ে না-ফেরার দেশে যাবার ডাক আসতেই প্রাণপণ একটা কিছুর অবলম্বনে নিজেকে জড়াতে ইচ্ছে করে !! ইচ্ছা করে স্বামীর ভোগ-তৃষ্ণা মেটাবার কালে নিজেরই অনবধানতায় মায়া কাটিয়ে যাওয়া একমাত্র মেয়ে অনিতাকে ফিরে পেতে। কিন্তু সময় যে ঘনিয়ে আসছে। চাঁদের মতন দেখতে নাতির নাত-বউ আর তিন নাত-জামাই দেখার বড় সাধ ছিলো। তিন্নি-রাকারও বেশ বয়েস হয়ে যাচ্ছে ! কবে যে ভগবান মুখ তুলে চাইবেন। ইচ্ছেগুলো কি আদৌ পূরণ হবে! সামনের সোনালী দিনগুলো দেখার ! কষ্টে গুঙিয়ে ওঠে হৃদয়ের ভেতরটায় !
ঠাম্মার কান্নাজড়িত কণ্ঠের সামান্য অস্ফুট আওয়াজেই তিন্নি সামনে ঝুঁকে আসে, “কি হয়েছে ঠাম্মা? ক্ষিদে পেয়েছে?”
“আমি হেই পাশে যামু !! তর দাদুয়ে নিয়া যাইতে আইসে” বলে জোরে জোরে কাঁদতে কাঁদতে উঠে বসতে চেষ্টা করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর পেয়ে বাকিরা সবাই ছুটে এলো।
তিন্নি-রাকা এগিয়ে এসে ঠাম্মাকে আদর করতে করতে বলে, “চলো ঠাম্মা, আমরা সবাই ঐ পাশেই যাবো।কেউ তোমাকে নিয়ে যাবে না।নিতেই দেবো না।চলো তোমার ভাত খাওয়ার সময় হয়েছে যে।”
সারাদিন ঠাম্মার এই এক ব্যাপার শুরু হয়েছে ।
বৃষ্টি থেমেছে। বাইরের ঝমঝম শব্দটাও নেই আর। তিন্নি আর রাকা ধরে ধরে নিয়ে গেলো ডাইনিং টেবিলে। গিয়েই জেদ ধরলেন মাছ খাবেন বলে । সবাই এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো । বিধবা বলে তো এতদিন উনিই আপত্তি করতেন মাছ খাবেন না বলে..আজ কি হোলো ! সবাইকে চোখ টিপে আশ্বস্ত করে,--আচ্ছা !! তাই খাবে-- বলে তিন্নি ভালো করে সেদ্ধ-করা সয়াবিন দিয়ে ভাত মেখে মেখে খাইয়ে দিতে লাগলো আর সুনীতিদেবীও দন্তবিহীন মাড়িতে হাসতে হাসতে তা খেতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন,"ইডি কি মাছ? কেমুন ছিবরা ছিবরা লাগে..!!"
--ঠাম্মা এটা কাটাপোনা মাছ !!
--বাঃ বাঃ !! দারুণ স্বাদে রানছ মেজবউমা !! দারুণ !! দারুণ !!
....
.......ঠাম্মার সাথে নাতনির এই ছলনাপূর্ণ অভিনয় দেখে সবার চোখেই জল এসে গেলো..ছেলে-বউরা তা চাপতে চাপতে সরে গেলো সেখান থেকে আর রাকা-তিন্নি মশার ধূপের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করার অভিনয় করে নীরবে কাঁদতে লাগলো..মিষ্টু ছোট বলে সকলের কান্নার কারণ না বুঝে বাকিদের সাথে ওপরে উঠে গেলো ।
...সারাজীবন ঠাম্মা ঘরে বন্দী থাকলেন বলেই হয়তো এই শেষ বেলায় সবকিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে খুব স্বাধীন হবার ইচ্ছে প্রকাশ করছেন।
....তিন্নির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ডাকলেন,"তিন্নি দিদি !! অই দিদি !!"
--বলো আম্মা !!
--তুই বুধ অয় আগের জন্মে আমার মা আছিলি না রে দিদি !!"
তিন্নির চোখের জল আর বাঁধ মানে না । উপচে পড়ে দীঘল-কালো দু'কোল বেয়ে ।
সাত
------
আজ আঠেরোই জুন, দুই হাজার দুই সাল। শরীরটা বিশেষ ভালো নয় সুনীতিদেবীর । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি তাঁর । কেবলই মনে হয়েছে কখন সকাল হবে । সকাল হলেই একটু ভাগবত পড়া তার নিত্যকার অভ্যাস ।
বুড়ো হয়েছেন। মাঝে মাঝে মাথাটা কাজ করে না। কিন্তু, আশেপাশে সবার কথাবার্তাই কানে আসে। সব কথায় অংশ নিতে পারেন না ঠিকই। কিন্তু বোঝেন সবই। কাল রাতে ঘুমোবার ঠিক আগে শুনেছিলেন নাতনী তিন্নি ফোনে কাকে বলছিলো, "সু !! তোমাকে যেমন করেই হোক আমার ঠাম্মাকে ঠিক করে দিতেই হবে...
......
...না,না...আমি জানি না কিচ্ছু !!
.......
....আমি শুধু জানি আমার "সু"-এর অভিধানে ইমপসিবল্ শব্দটা নেই !!
.........
.....ধ্যাত্ !!
.........
....এই রাখছি !! ঠাম্মা জেগে যাবে । কাল তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু...বাই..গুড নাইট...
.......
(অস্ফুটে)....লাভ ইউ টু !!
......
.........
...ও !! তাইলে এই ব্যাপার !! ডাক্তারের লগে মাইয়ার !! হইল কহন? আইচ্ছা বুজছি, নার্সিং ট্রেনিং লওনের কালে..তা ভালা.. ভালা..।সু-ভালাভালি সব হউক । একখান নাত-জামাই তো তাইলে দেখা হইলো...--নিজের মনেই দোহরান তিনি...
....পাগল মাইয়া একডা..
...ও রে !! ঠাম্মা কি কারু চিরদিন থাহে রে মা !!--মনে মনে ভাবেন তিনি ।
ধীরে ধীরে বিছানার একধারে উঠে বসেন তিনি । কিছুক্ষণ আগে তিন্নি হাত-মুখ ধুইয়ে-ব্রাশ করিয়ে-চা খাইয়ে দিয়ে গেছে।
......
..........
...............
এ কি !! ভাগবতের পৃষ্ঠাগুলো এত অস্পষ্ট কেন?...চশমাটা এতো ঘোলা লাগছে কেন?
...চশমাটা মুছে নিয়ে আবার পড়লেন তিনি, কিন্তু যে-কে সেই !!
...খুব ক্লান্ত লাগছে !!
...চশমাটা খুলে পাশে রেখে মাথাটা একটু দেওয়ালে হেলান দিলেন ।
...দূর থেকে তাঁর একখানি প্রিয় গান ভেসে আসছে--পূজারিণী গো!! কেন যাও ফিরে !!...বেশ গাইছে !!...রাকার গলা নাকি?...ও মা!! ওই ছোট্ট বাচ্চাটা মিষ্টি সুরে গাইতে গাইতে আসছে..ও কে?...কি মিষ্টি দেখতে..আয় মা...আমার কোলে আয়...ও মা !! এতো আমার সোনা অনিতা মা..আয় বুকে আয় মা..ওই দেখ তোর বাবাও আসছে !!..আজ আর তোর বাবাকে ভয়ই পাইনা !!..তুই যে মা আছিস সাথে....কতদিন যেন ঘুমোস নি মায়ের কোলে...আয় তোকে মা ঘুম পাড়িয়ে দেই...আমি গান গাই, তুই ঘুমো কেমন--
.....ধীরে ধীরে আসে হাওয়া,ধীরে ধীরে যায়; মায়ের আঁচল-তলে খুকু-রাণী যে ঘুমায়.....ধী....রে.......ধী........রে....এ.....এ.
...........
..........
..............ঘরে ঢুকেই তিন্নি সুনীতিদেবীকে মাথা ঝুঁকে পড়া অবস্থায় দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ডাকে--"আম্মা !! তুমি এভাবে বসে আছো কেন? ও আম্মা !!" ডঃ চক্রবর্তী তখন এসে পড়েছিলেন...পালস্ চেক্ করে মাথাটা নাড়েন দু'দিকে....
.......বাড়ী কাঁপিয়ে জোরে কেঁদে ওঠে তিন্নি--
----------"আ--ম্--মা-- গো !!!!".......

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন