কালিমাটি অনলাইন
চতুর্থ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৩৬
অপরাধ
শিবাশিস্ আচার্য
ছিঃ! ছিঃ! প্রথম বিশ্বের দেশও যদি এই অনাচারকে প্রশ্রয় দেয়, তো তৃতীয়বিশ্বের দেশগুলো তো এইপথেই উচ্ছন্নে যাবে! গজগজ করতে করতে খবরেরকাগজটা আছড়ে টেবিলে ফেললেন অনলদা।
-- হলোটা কী! উৎসুক হয়ে খবরের কাগজটা নিয়ে দেখি গতকাল মার্কিনপ্রশাসনের সমকামীদের বিবাহকে মান্যতা দিয়ে সেনেটে পাশ করানো বিলের বিরুদ্ধে দাদার এই বিষোদগার!বললাম- ওরাও তো আমাদের মতোই মানুষ, দাদা! সমাজের কোনো ক্ষতি তো ওরা করছে না! অযথা ওদের নিয়ে মাথাব্যথার কারণ কেন? ওরাও তো গণতন্ত্রেরই অঙ্গ!
-- আপনারা বুদ্ধিমান হয়েও যদি এই কথা বলেন, তবে তো কোনোদিনবলবেন, উভলিঙ্গতেও দেশ চালাবে! ক্ষোভ ঝরে অনলদা'র গলায়।
-- দেখুন দাদা, আপাতদৃষ্টিতে এদেরকে আমরা সমাজ-বহির্ভূত জীব বলেভাবি, কিন্তু এরা তো যেচে সমাজের কারোকে প্রভাবিত করে না, তাদেরভাব-ভালোবাসা তো দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যা কিনা বিশ্ব-বহিরঙ্গে প্রভাবতেমন ফেলে না। আমার নিজের জীবনে প্রত্যক্ষ করা একটি ঘটনা শুনুনতাহলে--
-- বলুন, কিন্তু এ ব্যাপারে তেমন ইন্টারেস্ট আমার নেই...
-- হলোটা কী! উৎসুক হয়ে খবরের কাগজটা নিয়ে দেখি গতকাল মার্কিনপ্রশাসনের সমকামীদের বিবাহকে মান্যতা দিয়ে সেনেটে পাশ করানো বিলের বিরুদ্ধে দাদার এই বিষোদগার!বললাম- ওরাও তো আমাদের মতোই মানুষ, দাদা! সমাজের কোনো ক্ষতি তো ওরা করছে না! অযথা ওদের নিয়ে মাথাব্যথার কারণ কেন? ওরাও তো গণতন্ত্রেরই অঙ্গ!
-- আপনারা বুদ্ধিমান হয়েও যদি এই কথা বলেন, তবে তো কোনোদিনবলবেন, উভলিঙ্গতেও দেশ চালাবে! ক্ষোভ ঝরে অনলদা'র গলায়।
-- দেখুন দাদা, আপাতদৃষ্টিতে এদেরকে আমরা সমাজ-বহির্ভূত জীব বলেভাবি, কিন্তু এরা তো যেচে সমাজের কারোকে প্রভাবিত করে না, তাদেরভাব-ভালোবাসা তো দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যা কিনা বিশ্ব-বহিরঙ্গে প্রভাবতেমন ফেলে না। আমার নিজের জীবনে প্রত্যক্ষ করা একটি ঘটনা শুনুনতাহলে--
-- বলুন, কিন্তু এ ব্যাপারে তেমন ইন্টারেস্ট আমার নেই...
ঘটনাটি ঘটেছিল ছোটনাগপুরে। বেকারত্বের জ্বালামুক্ত হবার তাগিদে জীবনেরপ্রথম ভাগে সেখানকার অভ্রখনির অফিসারদের শিশুরা বেশির ভাগই পড়ত,এমন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পাই। জয়েন করারকিছুদিনের মধ্যেই পরিচয় হয় শারীরশিক্ষার শিক্ষক মি. সিংঘম ও নৃত্যকলারশিক্ষক মি. মায়াপ্পানের সাথে। প্রথম থেকেই দেখতাম ওরা দুজন একটুআলাদা... ঠিক অন্যান্যদের মতো নয়... ইন্ট্রোভার্ট... কিন্তু উভয়েই স্ব-স্ববিষয়ে তুখোড় ও শিশুদের মনোরঞ্জনকারী হওয়া সত্ত্বেও একে অপরকে দেখলেঅনুরাগের ছোঁয়ায় যেন লজ্জারুণ হয়ে উঠতেন; তাই দেখে বাকি শিক্ষকরাওদেরকে দেখলেই কেমন বিসদৃশ আচরণ করতেন। যেন দুজন মনুষ্যগোত্রীয়ইনয়।
যেচেই আলাপ করলাম একদিন। সতর্ক করে দিলেন কিছু শুভানুধ্যায়ী শিক্ষক।বললেন- ওদের সাথে মিশবেন না মশাই! নোংরা মানসিকতা... নইলে কে কবেশুনেছে ছেলেতে-ছেলেতে... বলে চোখ মটকান ওরা। সোমত্থ পুরুষমানুষ বিয়ে-শাদী কর্! তা নয়! দুটো পুরুষে মিলে...! জানেন একে অন্যকে খাইয়ে দেয়,মুখ মুছিয়ে দেয়, একে না খেলে অন্যে খায় না, আনন্দের খবরে একে অপরকেজড়িয়ে ধরে। আদরের কী ঘনঘটা! একই বাড়িতে থাকে তো, তাই রাতেদুজনে একাকার হয়ে... কী কেলেংকারি কান্ড... যত্তসব!তারপর গ্রীষ্মের ছুটির পরে স্কুলে ফিরে গিয়ে শুনি, শুধুমাত্র সমকামিতারঅপরাধে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং স্কুলের শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রী নির্বিশেষে তাদের সাথে মেলামেশা করতে বারণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়-কর্ত্তৃপক্ষ সবার মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে আশঙ্কিত হয়েই এই সিদ্ধান্তনিয়েছেন।
অনলদা বললেন, আর তাদের খোঁজ পান নি?শুনেছিলাম, স্কুল থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা আশ্রয় নেন খনি অঞ্চলে কাজেরআশায়। কিন্তু কি আশ্চর্য! এত দুঃখেও কেউ কারোকে ছেড়ে কিন্তু চলে যাননি। একের দুঃখে অন্যের ব্যথা আনজনে কী বুঝবে? তাদের ভালোবাসা কিন্তুশুধু শারীরিকই নয়, মানসিকও ছিল। সবদিক থেকে একে ছিল অন্যেরপরিপূরক। খনিতে শ্রমিকদের বাজার করা ও রান্না করার কাজ নিয়ে উভয়েশ্রমিক-বস্তিতেই একে-অন্যকে ভালোবেসে বাঁধলেন তাদের অবৈধ প্রেমের সুখেরনীড়। অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেও স্বীয় প্রত্যঙ্গের খামতিটা নরম প্রকৃতির মায়াপ্পননিজেকে নারী রূপে কল্পনা করে অপেক্ষাকৃত সমর্থ প্রকৃতির সিংঘমের দেহ-বন্ধনে নিষ্পেষিত হতে হতে ধর্ষকামের তুরীয় আনন্দে মগ্ন হতেন নিত্যই।
শ্রমিক সর্দারনী মেঘা বাজারের দায়িত্ব হাতছাড়া হওয়ায় রাগে তাদের এইভালোবাসা সুচোখে না দেখে বরং রটিয়ে দিল, একজন শয়তান ও অন্যজনতার উপাসক। তাই উভয়েই পুরুষ হয়েও নিবিড়-ভালোবাসায় এইভাবে জড়িত।
মেঘা মনে মনে সিংঘমকে ভালোবাসতো, সেটাই এক বর্ষার রাতে তাকে বলতেগিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বাড়ি ফেরার সময় স্থানীয় দেবতামাঠানবুরুর থানের কাছে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথায় জোর আঘাত পেয়েঅতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে মারা যাবার আগে অস্ফূটে সিংঘমের নাম উচ্চারণকরে যায়, যার ফলে ক্ষুব্ধ জনতা তাদের দুজনকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনোসুযোগ না দিয়েই ঘর থেকে হিঁচড়ে বের করে এনে চৌমাথায় বেঁধে জ্বালিয়েদেয়। খবরটি যখন আমার কানে আসে, পুলিশ তখন দুজনকে স্থানীয়হাসপাতালে নিয়ে গেছে। সিংঘম পথেই মারা যান। আর মায়াপ্পান মারা যাবারআগে আমার দিকে তাকিয়ে অস্ফূটে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,
-- আমাদের অপরাধটা কী ছিল?কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অনলদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, অসম ভালোবাসা!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন