রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০১৬

বকুল-বন্ধু

বকুল-বন্ধু
"""""""""""....................শিবাশিস্ আচার্য
"আপ্ জিস্ নম্বর পর্ কাঁল কিয়া হ্যায়..বো ফিলহাল ব্যস্ত্ হ্যায়..কৃপয়া থোড়ি দের বাদ কোশিশ্ করেঁ"
..বিইপ্...বিইইপ্....বিইইইপ্....একঘেয়ে টানা বিপিং সাউন্ড অস্থির করে তোলে নন্দাকে...
একবার..দু'বার...তিনবার....
অল্ওয়েজ্ বিজি টোন...
সকাল থেকে সমানে ফোন করছে সে স্বপ্নিলকে। ইদানীং বড্ড বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বপ্নিল। এই ব্যস্ততা কোথায় শেষ হবে কে জানে !! এক নিদারুণ হতাশা আর একাকীত্ব ঘিরে ধরেছে নন্দাকে গাঢ় কুয়াশার চাদরের মতো। হতাশাগ্রস্তের মতো নন্দা আকাশের দিকে তাকায়। নিজেকে খুব খেলো মনে হয় তার। যেন কুয়াশার ভেলায় চেপে ও চলে যাচ্ছে আকাশের রাজ্যে। চাঁদটা আজ ভীষণ রকম হলদেটে ফ্যাকাশে। কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যায় আকাশের চাঁদটা চোখের নোনা জলে। কেমন বড্ড পরিচিত একটা অবয়ব, কেমন যেন বেমানান একটা মানুষের অবয়ব হয়ে মিলিয়ে গেল হলদে হয়ে যাওয়া চাঁদের বুকে। মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলির কথা....
......
..........
নন্দন চত্বর..বৃষ্টি ভেজা কলেজ স্কোয়্যার..ময়দান..নেচার্স পার্ক....কোথায় নেই সেই দিনগুলির ছোঁয়া...
নীল বড্ড দুষ্টু ছিল। ক্লাস শেষে দেখা করতে একটু দেরী হলেই কৃত্রিম কপটতা ফুটিয়ে তুলত চেহারাতে। অবশ্য ও অনেক বেশি রোম্যান্টিকও ছিল। জোরে বৃষ্টি নামলে নিজে তো বৃষ্টিতে ভিজতোই নন্দাকেও ভিজিয়ে ছাড়তো। বাদলের বকুলফুল ছিল নন্দার সবচেয়ে প্রিয় ফুল। ওদের দেখা করার দিন,বৃষ্টির দিন হলেই একমুঠো বকুল কোত্থেকে যেন জোগাড় করে আনতো। শর্ত একটাই, নন্দাকেও ভিজতে হবে নীলের সাথে বৃষ্টিতে। নন্দা চোখে-মুখে কপট রাগ ফুটিয়ে তুলে আদুরে গলায় বলতো--"তোমার ঠান্ডা লাগবে তো !!"।
"তাই নাকি বকুল-বন্ধু !!" এই বলতে বলতে নীল যেন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠত। নন্দাকে জাপটে ধরে আরও বেশী কাছে নিতে চাইত। কখনো কখনো নন্দার গালে এঁকে দিত ভালবাসার উষ্ণ চিহ্ন...
.....
.......
....তীব্র যন্ত্রণা ফুটে ওঠে নন্দার চোখে-মুখে। কত দ্রুত মানুষ সবকিছু ভুলে যায়। কত দ্রুত হারিয়ে যায় সুখের সময়গুলো। মাত্র নয় মাসের মধ্যে স্বপ্নিলের এই পরিবর্তন নন্দাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তার এই অবহেলাগুলো নন্দা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না,সেগুলো মাথার মধ্যে গরম বিষাক্ত সীসার মতো অনুভূত হয় নন্দার। হাত থেকে তীব্র আক্রোশে ছুঁড়ে ফেলে দিতে যায় মোবাইলটাকে, হঠাৎ ওর কাঁধে স্পর্শ করে কারো একখানা হাত। দ্রুত চোখের জল মুছে নন্দা লুকোতে চায় নিজের না-বলা কষ্টগুলোকে। চোখ তুলে তাকায়। দেখতে পায় অনিন্দ্যকে। সে নন্দার বন্ধু..ভাই..গাইড...
ওর মাথাটা বুকের মধ্যে টেনে নেয় নন্দা। এবার আর চোখের জল বাঁধ মানে না। ঝর্ ঝর্ করে কেঁদে ফেলে সে। মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে অনিন্দ্য, "কি হয়েছে রে দিদি, নীলদার সাথে কিছু হয়েছে?" নন্দা কাঁদতে কাঁদতে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভাইকে।
--আচ্ছা !! আচ্ছা !! ঠিক আছে ভেতরে চল, এখন কিছু বলতে হবে না। কাল সকালে শুনব।
দিদির হাত ধরে টেনে বিছানায় নিয়ে গিয়ে অপটুহাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় ভাই। হাতে জ্বলজ্বল করছে সকালবেলায় দিদির পরানো রাখী।
--এই পাগলী !! আজকের দিনে কেউ কাঁদে রে ? তোর এই ভাইটা রয়েছে কি করতে ? আমায় বলতে পারিস নি তোর দুঃখের কথাগুলো !! আজ ঘুমো । কাল সব শুনবো কেমন !! গুড নাইট !!
ভাইয়ের কথায় সান্ত্বনা পেয়ে মুচকি হেসে ওঠে দিদি । কান্না মুছে ভাইয়ের চুলগুলো একটু ঘেঁটে দিয়ে বললো--যা !! তুইও যা ঘুমোতে । গুড নাইট !!....
প্রতিদিনের মতো সকাল বেলা নন্দা এক কাপ গরম কফি হাতে ভাইয়ের মাথার কাছে এসে দাঁড়ায়। তারপর মৃদু কণ্ঠে ভাইকে ঘুম থেকে ডাকে...
---ওঠ অনি, ওঠ না। কত্ত বেলা হলো। ওঠ লক্ষ্মী ভাই!!
দিদির ডাকে ভাই আড়মোড়া ভেঙে এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘুম থেকে ওঠে। তারপর কফির কাপ হাত থেকে নিয়ে বলে,"তুই আজ বেরোবি না ?"
--না, যাবো না রে-নন্দা উত্তর দেয়।
--কি হয়েছে বলতো তোর ?--ভাইয়ের গলায় প্রশ্নের সুর।
--মন ভালো নেই। আজ সারাদিন বাড়ীতে থাকতে চাই, প্লীজ-নন্দার কণ্ঠে অনুনয়ের সুর।
--দেখ, দিদি !! আমার জন্মের সময় যখন মা মারা গেল তারপর থেকে বাবাও কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। এ সবই ঠাম্মির মুখ থেকে শুনেছি। একটু বড় হবার সাথে সাথেই তোকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে জেনেছি আর হেন কথা নেই যা তোর সাথে শেয়ার করিনি !! কিন্তু কাল এমন কি ঘটল যে, তুই এভাবে কাঁদছিলি ? নীলদা কি তোর সাথে আর সম্পর্ক রাখতে চাইছে না? কি হয়েছে তোদের মধ্যে? আমি যতদূর জানতাম নীলদার ফ্যামিলিরও তোর সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তাহলে, তোদের হঠাৎ কী হলো? তুইও বলিস, ছোটবেলা থেকেই আমি তোর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তুই তো আমার কাছে কিছু লুকোসনি কখনো। আমাকে বল না, কী হয়েছে নীলদার সাথে? তুই তো জানিস বাবা-ঠাম্মি আজ কত্ত খুশী তোর বিয়ে হবে এটা জেনে। তাহলে আজ হঠাৎ কি হলো?....
.... নন্দা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
--কী হয়েছে বল্ দিদি?
--অনি, নীল আমাকে হয়তো আর বিয়ে করতে চায় না। আমি এখানে আর থাকবো না। পুণে চলে যাব একটা চাকরির অফার পেয়েছি। আমি আর এখানে থাকবোই না।
--তুই যে এখানে আর থাকবি না। তুই যে চলে যাবি তা কি নীলদা জানে?
--হুঁ, জানে ।
--ও কি বলেছে ?
--ও বলেছে আমার যা ইচ্ছে তাই আমি করতে পারি।
--তোদের মধ্যে সমস্যাটা কী?
--ও ইদানীং কিছু উল্টোপাল্টা কাজ করছে। আমি ওকে অনেক বুঝিয়েছি ও কিছুতেই আমার কথা শুনতে চাইছে না...
অনিন্দ্য এবার একটু নড়েচড়ে বসে।
--উল্টোপাল্টা বলতে তুই কী বোঝাতে চাইছিস? ও কী ড্রাগ অ্যাডিক্টেড্ ? না কি অন্য কারো সাথে ইনভলভ্ড? তুই কী বলতে চাইছিস আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না...
--না, না তা নয় !! আমি কিছুদিন আগে নীলকে চাকরি করতে বলেছিলাম। বলেছিলাম যে, ও যদি চাকরি না পায় তাহলে আমাদের বিয়ে কিভাবে সম্ভব ?
--হুঁ, তো নীলদা কী বলেছে ?
--ও ইদানীং মিডিয়া লাইনে ফ্রিল্যান্সিং করছে। জিঙ্গল্ বানানো, অ্যাড্ বানানো, মডেল নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এসব করে। আমাকেও সময় দিতে চায় না। ও যদি মিডিয়া লাইনে কাজ করে তাহলে বাবা কখনোই আমাদের বিয়ে মেনে নেবে না। এজন্য আমি ওকে বলেছিলাম যে, ও যদি মিডিয়া লাইনের কাজ না ছাড়ে তাহলে আমি ওর সাথে কোন যোগাযোগ রাখবো না। এখন ও আর আমার সাথেই যোগাযোগ রাখতে চাইছে না।
অনিন্দ্য এবার নন্দার মুখটা দুহাতে তুলে জিজ্ঞাসা করে,"তুই নীলদাকে সত্যি ভালোবাসিস তো, দিদি? ওর প্রতি তোর অগাধ বিশ্বাস আর আস্থা না থাকলে তুই সামনে এগোবি কিভাবে? আমি জানি আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ এখনও মিডিয়া লাইনে যারা কাজ করে তাদেরকে ঠিক মতো গ্রহণ করতে পারেনি। আমাদের গার্জিয়ানরা এখন ও মেনে নিতে পারে না ছেলে বা মেয়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে "অ্যাড্" বানাবে। কিন্তু নীলদাকে দেখেছি একটু ব্যতিক্রম। ও একটু আলাদা ঘরানার ছেলে। ওকে পেতে হলে তোকেও যে ব্যতিক্রম হতে হবে। ওকে ভালোবাসার পাশাপাশি ভালোবাসতে হবে ওর কাজকেও। ঝেড়ে ফেলতে হবে ইগো প্রবলেম। তবেই না তুই তোর ভালোবাসার মানুষটাকে পরিপূর্ণভাবে পাবি...
এতক্ষণ নন্দা চুপচাপ শুনছিল। এবার মৃদু প্রতিবাদ করতে চাইল।
--কিন্তু নীল মিডিয়ায় কাজ শুরু করার পর থেকে আর চাইছে না বোধহয় আমি ওর সাথে থাকি। তাই ও সারাক্ষণই আমাকে এড়িয়ে চলছে। তাই আমি ঠিক করেছি আর এখানেই থাকব না । বাবা আর ঠাম্মিকে জানিয়েছি...বাকি ছিলি তুই...
--যেতে চাইছিস যা, কিন্তু এটা কি জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয় ? তুই পালাতে চাইছিস কেন ?-- ভাই ওকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। নন্দা মাথা নাড়ে।
--না, আমি নীলের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাবো, অনেক দূরে।
অনি অসহায়ের মতো খানিকক্ষণ দিদির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আনমনেই বলে, "তার মানে তুই আমাকে ছেড়ে, ঠাম্মি-বাবা সবাইকে ছেড়ে শুধুমাত্র নীলদার জন্য অনেক দূরে চলে যাবি। আচ্ছা ঠিক আছে, যা...
....
......
পরদিন বিকেল বেলা । স্বপ্নিল আনমনে হাঁটছিল নন্দন চত্বরে । একটা অ্যাডের অফার ক্যানসেল হয়ে গেছে সে সম্বন্ধেই ভাবছিল । এমন সময় দূর থেকে কার যেন ডাক শোনা গেল। কেউ খুব ব্যস্ততার সুরে নীলদা, নীলদা বলে চিত্কার করছে।স্বপ্নিল পিছু ফিরে দেখল অনিন্দ্য। --কেমন আছ ভাই অনি ?-স্বপ্নিল স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করল।
--ভালো--অনেকটা আনমনা সুরে অনিন্দ্য উত্তর করল।
--তুমি কি অনেক ব্যস্ত? একটু বসবে আমার সাথে?--অনির গলায় কিছু একটা ছিল। স্বপ্নিল অনিন্দ্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
--চলো, অ্যাকাডেমির দিকে....
......
........
দু সপ্তাহ পরের ঘটনা। নন্দার বেডরুম। নন্দা তার ব্যাগ গোছাচ্ছে। অনিন্দ্য পিছনে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে। --তুই সত্যিই চলে যাবি দিদি ? রাখী পরাবে কে আর ভাইফোঁটাই বা কে দেবে আমায় ?
নন্দার নির্বাক দু’ চোখে তখন শ্রাবণধারা। আবছা চোখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে আকাশে মেঘ করেছে। বর্ষার প্রথম বৃষ্টি বোধহয় আজই হবে। অশ্রুসজল চোখে নন্দা সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়। ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে দেখে ওর ঘরের দরজা বন্ধ। বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাভেজা গলায় বলে, "আসি রে অনি !! সাবধানে থাকিস । বাবা আর ঠাম্মিকে দেখিস !! কেমন !!"
ট্রেনের সময় হয়ে আসছে। নন্দা বেরিয়ে পড়ে। খুব জোরে দরজা খুলে কান্না-ভেজা চোখে বেরিয়ে আসে অনি আর বলে ওঠে,"সেটা তোকে বুঝতে হবে না !! যা, তুই সেলফিসের মতো চলে যা !!"..তারপর দিদিকে চারিদিকে কোথাও দেখতে না পেয়ে কেঁদে ফেলে....
অটো থেকে নেমে বজবজ ষ্টেশনে লোকাল ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য পা বাড়াতেই হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন "বকুল-বন্ধু !! আমায় না নিয়ে একলা কোথায় যাচ্ছিস রে ?" বলে নন্দার হাত থেকে ট্রলি-ব্যাগটা কেড়ে নেয়। চমকে ফিরে তাকায় ও।
.....
........স্বপ্নিল...!!...ওর নীল...!!
"আমায় ছেড়ে যাস না নন্দা !!"--বলতে বলতে একমুঠো বকুল ফুল বাড়িয়ে দেয় ওর দিকে। নন্দার দু’ চোখে তখন আনন্দের পাগলাঝোরা...কিন্তু মুখে থমথমে রাগ নিয়ে পাগলের মতো এলোপাথাড়ি চড় মারতে মারতে নীলের বুকে আছড়ে পড়ে কান্নায় ভিজিয়ে দেয় নীলের জামা আর বলতে থাকে,"কেন..?..কেন..?"
--শান্ত হ !! শান্ত হ !! সব বলছি !!
....হঠাত্ কোত্থেকে যেন একটা লাজুক মেঘ উড়ে এসে ওদের দু’জনকে এমনভাবে দেখে লজ্জা পেয়ে ইলশেগুঁড়িতে দুজনকে ভিজিয়ে দেয়....

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন