রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০১৬

অ-তনু

অ-তনু
শিবাশিস্ আচার্য
ব্যালকনিতে এসে ফস্ করে দেশলাইটা জ্বাললো বিহান; ঝিমুনির একটা ভাব এসে গিয়েছিল, সিগারেটটায় আগুন জ্বালিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে দিলো সে, যেন একরাশ চিন্তা উড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টা...
মাথাটা বেশ হালকা লাগছে এবার...রাত তিনটে বাজে...মৃদু বাতাস বইছে, বাতাসের হালকা বেগে ধোঁয়াগুলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে।
এতরাত অবশ্য সে জেগে থাকতে পারে না, একটা হালকা তন্দ্রা ভাব আসছে মাঝে মাঝে, তাই বাইরে এসে সিগারেটটা ধরালো।
অনেক কষ্ট করে বাড়ী থেকে অনেকদূরের এক কলেজে বি.এড্.-এ সুযোগ পেয়েছে সে। গত দু'বছর বিভিন্ন কলেজে বি.এড্.-এ চান্স্ না পেতে পেতে এ'বছর দূরবর্তী এই কলেজে চান্স্ পেয়ে আর দেরী করেনি সে সেখানে ভর্তি হতে। কারণ, এইবছর চান্স্ না পেলে আগামী এস্.এস্.সি-তে তার পরীক্ষা দেওয়াই বন্ধ হয়ে যেতো। আগামীকাল কলেজে ফাইনাল টিচিং আছে। আর সেই জন্যই একটা মানবদেহবৈষয়িক মডেল-প্রজেক্ট সে নিজের হাতেই কম্পিউটারে তৈরী করছিলো। রাত দশটা থেকে সেটাকে নিয়ে কিছুটা ঘাঁটাঘাঁটি করছিলো সে, কিন্তু মনের মতো কিছুতেই আর হচ্ছিলো না। এখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে কিন্তু শেষটুকু মিলছে না, আবার একটু দেখতে হবে।
...
.....
বিহান যে বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে, সেটির ভাড়া নামমাত্র। প্রথমে এ বিষয়ে তার সন্দেহ হলেও পরে স্থান-অকুলানতার জন্য এখানেই দোতলায় থাকে সে। তার পাশেই বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট আছে, মুখোমুখি করে সবগুলো ফ্ল্যাট সাজানো, বেশ কাছাকাছি গায়ে গায়ে লেগে আছে উঁচু বাড়িগুলো।হঠাত্ পাশের ফ্ল্যাট থেকে বাচ্চার কান্না ভেসে এলো, বাচ্চাটার কতই বা বয়স? এক-দু বছরের বেশী হবে না মনে হয়।তার পাশের ফ্ল্যাটে নীলচে আলোয় আদিম প্রবৃত্তির সিল্যুট....
....সিগারেটটা শেষ করে ফিল্টারটা নীচে ফেলে দিতে গিয়ে দেখে দুটো কুকুর শুয়ে আছে। এবার মডেলটা ফাইনাল টাচ দিয়ে শুয়ে পড়বে...
....আ....হা....ই...আড়মোড়া ভাঙে সে !
রুমে এসে বেসিন থেকে জলের এক ঝাপটা দিল মুখে, ঘরের আলোটা নিভিয়ে ল্যাপটপের শাটারটা তুলে দিল বিহান, ল্যাপটপের ডিসপ্লের আলো কমিয়ে দিল, এবার মনোযোগ দিয়ে কাজে লেগে গেল আবার, ভুলগুলো ঠিক করা শুরু করলো সে…
...
....
কতক্ষণ হয়েছে ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারেনি বিহান, চোখের সামনে ল্যাপটপের ডিজিটাল ঘড়ি থাকা সত্ত্বেও...হঠাত্ সামনের ফ্ল্যাটের দিকে চোখ পড়ে যেতে সে ফ্ল্যাটের খোলা জানালা দিয়ে দেখে কেউ বারবার ঘরের আলোটা জ্বালাচ্ছে আর নেভাচ্ছে, ঠিক অনেকটা অনুষ্ঠানের এল.ই.ডি.লাইটের মত...বিহান কৌতূহলী হয়ে ব্যালকনিতে বেরিয়ে আসতেই লাইটের অন-অফেই দেখে ফ্যান থেকে ঝুলছে একটা ফাঁসির দড়ি......!!!
ঘড়িটা এবার দেখল...৪টা বেজে ২মিনিট।কিন্তু এত রাতে কি ব্যাপার? একটা ভাবী দুর্ঘটনার কথা ভেবে তার মেরুদণ্ড দিয়ে হিমেল স্রোত নেমে যায়...এভাবে লাইট অন-অফ করছে কে?
....
পায়ে স্যান্ডেলটা পরে বেরিয়ে আসে সে বাড়ির বাইরে...উপরে ফ্ল্যাটের দিকে তাকাতেই দেখে আলো এখন আর জ্বলছে-নিভছে না ! জানালাটাও বন্ধ !! আজ কিছু পরেই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা থাকায় ব্যাপারটি আর বেশী আমল না দিয়ে ঘরে ফিরে চুপচাপ শুয়ে পড়ে সে...
....
.......
কলেজ থেকে ফিরে একটু রিল্যাক্সড্ হয়ে ব্যালকনিতে সিগারেটটা ধরাল বিহান, ইজিচেয়ারে বসেই দেখল সামনের ফ্ল্যাটের জানালার দিকে..বন্ধই রয়েছে...ভীষণ খুশি আজ বিহান..ফাইনাল টিচিং-এ এক্সটার্নাল এগজামিনারের দারুণ লেগেছে তার প্রেশেন্টেশন্ । ফোনে মাকে আর রোশনীকে জানালো সে কথা। গতকাল ধকল গেছে খুব, তাড়াতাড়ি সামনের দোকান থেকে রুটি-তরকারি কিনে এনে খেয়ে শুয়ে পড়লো, আজ আর রাঁধতে ভালো লাগছে না। আগামীকাল সে বাড়ি চলে যাবে, আবার ফিরবে মাস দুয়েক পরে ফাইনাল পরীক্ষার সময়...শুয়ে শুয়ে ভাবী জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ হয়ে এলো। রোশনীকে নিয়ে, মাকে নিয়ে সাজানো সংসার...
.....
........
হঠাত্ আচমকা এক কিসের ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে গেল তার? কোন স্বপ্ন তো দেখেনি সে ! তাহলে? সামনের ফ্ল্যাটের দিকে চোখ পড়তে দেখে আলো জ্বলছে আর নিভছে ! আর ফ্যান থেকে....
....ঘড়িতে সময় দেখল ৪টা বেজে ২মিনিট...সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিল। কাল কলেজ থেকে ফিরে বাড়ী যাবার আগে সন্ধ্যায় ঘটনাটির ব্যাপারে জানতে যাবে ঠিক করল বিহান!!...
বাইরের গেটে কাউকে না দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একটু এগিয়ে গেলো সে। কলিংবেলের দিকে হাত বাড়াতেই দেখলো তিনতলার দুটো বেলের একটিতে লাল মার্কার পেন দিয়ে লেখা-"অ-তনু............", দেখে মনে হচ্ছে স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছে এমন বাচ্চার হাতে লেখা !! দু‘বার বেল চাপল বিহান।
বেশ কিছুক্ষণ পর উপর থেকে একটা ব্যাগ নেমে এলো যার ভেতর চাবি রয়েছে।কোলাপ্সিবল্ গেট খুলে আবার আটকে দিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় এলো বিহান, কালোমতো একটা ষণ্ডা লোক গেট খুলে দিয়ে বলল, "আসুন" এরপর সোফা দেখিয়ে বলল-"ওখানে বসুন....কি খাবেন?"
--না, না, কিছু খাব না ! একটা সমস্যার জন্য আমার…
কথাটা শেষ করতে না দিয়ে লোকটা বলল-
"বসুন, স্যারের একটু দেরী হবে..."
মিনিট বিশেক বসে আছে বিহান একা এদের ড্রয়িং রুমে, কেউ কি নেই এখানে, কোন সাড়াশব্দ নেই, নিস্তব্ধ নীরব।
কিছুক্ষণ পর স্লিপিং গাউন পড়া একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক এলেন খুক্ খুক্ করে কাশতে কাশতে। ভদ্রলোকের সাদা-কালো মেশানো চুল কাঁধ পর্যন্ত এসে নেমেছে। বিহান তাঁকে দেখে উঠে দাঁড়ালো। ভদ্রলোক শুধু হাত নেড়ে তাকে বসতে বললেন।সে বসলে তাকে দেখে বললেন, "কি সমস্যা?"
....আসলে কয়েকদিন ধরেই আপনার ঘর থেকে আমার ঘরে রাতে আলো চলে আসে, শুধু তাই নয় আলোটা জ্বলে আর নেভে !! আর ফ্যান থেকে একটা ফাঁসির দড়ি দেখা যায়। এর ফলে রাতে আমার ঘুমের সমস্যা হচ্ছে, বলতে গেলে তেমন ঘুমই হয় না, আলোটা যদি না জ্বালানো হয় তবে খুব খুশী হতাম।
.....
বিহানের কথা শুনে কয়েকবার কাশলেন তিনি, এর মাঝে কালো মতন লোকটা তাদের কফি দিয়ে গেল, মনোযোগ দিয়ে বিহান দেখল কফি দেওয়া কাপগুলো দুটোই একদম নতুন...
বিহানের মনোযোগ ভেস্তে দিয়ে হঠাত্ ভারী গলায় বললেন, দেখুন রাতে আমি কিছু লেখালিখি করি তাতে আলো জ্বালাতেই হয়, কিন্তু বাচ্চাদের মত আমি আলো জ্বালাই-নেভাই না ! আমি রাতে লিখি, দিনে খুব একটা লেখা হয়ে ওঠে না।স্যাম, আমার কাজের লোক সব দেখাশোনা করে আর অ-তনু রূপায়ণে সহায়তা করে ।
ভদ্রলোকের কথা শুনে বিহানের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করলো না ।
হঠাত্ ভদ্রলোক বিহানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, আমাকে খুব খারাপ ভাবছেন, তাই না?
....না,না। আপনি এমনটা কেন ভাবছেন?
--কারণ আপনার মত আরো যারা আপনার ঐ বাড়িতে উঠেছিল তারাও আপনার মত একই কথা ভাবতো আর এভাবেই জানতে আসতো অ-তনুর রহস্য !
--মানে?
--মানেটা খুব শিগগিরিই বুঝবেন !
--ঠিক আছে দেখি ! আচ্ছা, আপনি লেখেন বলছিলেন? আপনার নামটা তো জানা হলো না !
হা...হা...হা…হা...করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ভদ্রলোক বললেন, কেন নামটা দেখেন নি কলিংবেলে?
--হ্যাঁ, দেখেছি তো !
--এখনও বোঝেন নি,আমি কে?
--না তো !
--আমি "অ-তনু" র রূপায়ক।
--সে-টা কি?
--নিন কফি খান, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সব বুঝে যাবেন !
...
......
কফি খেতে খেতে কেমন বেশ ঘুম-ঘুম পেতে লাগলো বিহানের আর আচ্ছন্ন হতে হতে সে শুনলো--আরও...আরও এক অ-তনু...অ-ত-নু ...হা...হা..হা...হা....
....
......
পরদিন ভোররাতে, যথারীতি বিহানের ঘুম ভেঙ্গেছে...ঘড়ি দেখল ৪টা ৩মিনিট... সে অবাক না হয়ে পারলো না...প্রতিদিনই এমন হচ্ছে...কিন্তু আজকে যা দেখল তা অদ্ভুত ! পাশের কোন ফ্ল্যাটে কোন আলো জ্বলছে না ! কিন্তু তার ঘরে একটা লালচে নাইট ল্যাম্প জ্বালানো,যা কখনই ছিল না ! চারিদিক বেশ অন্ধকার ! আর তার সারাশরীর বেশ হালকা লাগছে ! এমনতো কখনও হয় না ! আচ্ছা, ঐ টেবিলের ওপরে কয়েকটা প্ল্যাস্টিক ব্যাগে লাল রঙের তরলটা কি?...ঐ ট্রে তে রাখা অর্ধডিম্বাকৃতি ঐ দুটো কি?...একটা কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছে...একটা বাচ্চা কাঁদছে...একটা সিগারেট খাওয়ার জন্য প্যাকেট খুঁজলো...জলতেষ্টায় কেমন ঝিম ধরে আছে মাথাটা...জলের বোতলটা কোথায় যে রাখে !...একি! জলের বোতলটা ধরতে পারছে না কেন সে!...বিরক্ত হয়ে বিছানা ছাড়ল সে...
....
.......
..........আর সাথে সাথেই "অ-তনু" শব্দের সঠিক অর্থ বুঝে গেলো বিহান......

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন