প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে...
------------------------------------স্বপ্নসন্ধানী
------------------------------------
------------------------------------
১
একটা অবাধ্য তর্জনী...
...বিভাজিকা থেকে নাভিগহ্বর... সেখান থেকে...
বিবাহোত্তর জীবনের একটা অনির্বচনীয় সুখের অকল্পনীয় আস্বাদে দেহ-মন শিহরিত হয়ে উঠছে বারবার....
...উফফ্ কি দুষ্টুমিই না করতে পারে দুষ্টুটা...
সুখের সাগরে ভাসতে ভাসতে আলিঙ্গনের ইশারা...
সুখ-ক্লান্ত কপোত-কপোতী বিশ্রম্ভালাপ শুরু করে...
চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলে," এই যে মশাই যখন সুদূরে বর্ডারে ডিউটিতে থাকো তখন আমায় মনে পড়ে ? তখন কোথায় থাকে তোমার এই দুষ্টুমি ?"
একটু চুপ করে থেকে আবার বলে,"খুব খারাপ লাগছে জানো।বিয়ের পর দু-সপ্তাহের বেশীও তোমায় পেলাম না।"
- কি করবো বলো? তুমি তো জানোই রিনি," ডিউটি টু দ্য মাদারল্যাণ্ড ইস দি মোস্ট প্রায়োরিটি টু মি "
আর আমি ?- কণ্ঠে অভিমানের সেতার বাজে ।
কোলে শোয়া মাথাটা তুলে কপালে একটা সোহাগ-চিহ্ন এঁকে দিয়ে বলে--
"যখন দূরে থাকো , তখন তুমি কাছে ;
তোমার সময় নাই বা হোলো , আমার সময় আছে ।
যখন কাছে থাকো , তখন তুমি নেই ;
দূরবীনে চোখ রাখব আমি , তোমাকে দেখতেই ।
যখন তুমি যাও , তখন আমি আসি ;
চোখের কোণে জলের ফোঁটা , ভাসায় তোমার হাসি ।
যখন তুমি আসো , তখন আমি ভাবি ;
এই তো আবার হচ্ছে শুরু , দূরে যাবার দাবী ।
যখন তুমি ছিলে , তখন আমার মনে ;
তোমার আমার দূরত্বটাই , জন্মালো নির্জনে ।
এখন তুমি নেই , এই তো আমি আছি ;
এখনও তোমার স্পন্দন পাই আমার কাছাকাছি ।"
......
...........
...............
...কুঁ..উউ..উউউ.....
ট্রেনের হুইসেলের তীক্ষ্ণ শব্দে রীণার মনটা এক ঝাঁকুনিতে বাস্তবের জমিতে এসে পড়লো।চোখটা ভিজে উঠেছে।হাতের তালুতে মুছে ফেলে সে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরাতে বসেও হঠাৎ তার মনে হল দার্জিলিং মেইলটা যেন বেশী ধীরে চলছে।এমনিতেই ট্রেনটা লেট করেছে।অরুণের সাথে হনিমুনে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েও এরকম মনে হয়নি।হাতঘড়িতে সময় দেখল নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছুতে আরও ৫ ঘণ্টা।ঝকঝকে নূতন কামরা।অন্যসময় হলে রীণা বাকি যাত্রীদের সাথে এই নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠত,কিন্তু এই মুহূর্তে কোনরূপ আলোচনার মানসিকতা তার নেই।মনটা ভারী হয়ে আছে।পুনরায় ভাবতে ভাবতে সে ভাবনার অতলে আবার ডুবে গেলো।যে চিঠির কারণে আজকের এই যাত্রা আর ভাবনা, রীণা হাতব্যাগ থেকে সেই চিঠিটা বের করে আবার মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করল।
‘শ্রদ্ধেয়া রীণা সেন,
আমায় আপনি চিনবেন না। কিন্তু যৎসামান্য হলেও আমি আপনাকে জানি। স্যাটেলাইট চ্যানেলের কল্যাণে।কিছুদিন আগে মে মাসে জি-টিভিতে কেদারনাথের বিধ্বংসী বন্যা সম্বন্ধে একটা ডকু-ফিচার চলছিল।সেখানে সেই বিধ্বংসী বন্যায় সাহায্যকারী অমর শহীদ জওয়ানদের স্ত্রীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল,আপনাকে প্রথম দেখি সেই অনুষ্ঠানে।খুব যে মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম তা নয়।ডিনার করছিলাম,সঙ্গ দেবার জন্য টিভিটাও চলছিল পাশাপাশি।হঠাৎ ‘ভুবনডাঙ্গা,অরুণ সেন’,শব্দদুটো শুনে উৎকর্ণ হই।
আপনি বলছিলেন,বিয়ের পর মাসখানেকের মধ্যেই কার্গিলে যাওয়ার আগে আপনার স্বামী অরুণের সাথে আপনার শেষ দেখা হওয়ার কথা।বলছিলেন বন্যা-বিধ্বস্ত মানুষগুলিকে সাহায্য করার জন্য আপনার স্বামীর ভূমিকার কথা।
আপনি যখন ওনার নামটি উচ্চারণ করলেন আর টিভি স্ক্রিনে জলপাই-রঙা পোশাক পড়া এক হাস্যোজ্জ্বল যুবকের ছবি ফুটে উঠলো,আমি চমকে উঠলাম। স্মৃতিমন্দিরে যেন অসংখ্য ঘন্টা বেজে উঠলো।
আপনি বলছিলেন ২০১৩ সালের জুন মাসের প্রথমদিকের ঘটনা। তারপর থেকে আর কোন খবর নেই।অনেকের মত আপনার স্বামীও বন্যাকবলিতদের উদ্ধার করার কাজে গিয়ে শেষে ফেরেননি।
আপনার কথাগুলো শোনার পর থেকে আমি একটা তীব্র অপরাধবোধ আর দায়বদ্ধতায় ভুগছি। আপনার স্বামীর একটা মূল্যবান সম্পদ আমার সংগ্রহে আছে। আর আছে কিছু সত্য উন্মোচনের দ্রুততা।
আপনি নিশ্চয় অবাক হচ্ছেন। ভাবছেন কে এই লোক? দু'বছর পর ইনি এসব কি বলছেন? অরুণের সঙ্গে এই লোকের কী সম্পর্ক? তখনই বা যোগাযোগ করেন নি কেন?
পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করবার জন্য আপনার সাথে সামনা সামনি দেখা হওয়াটা খুবই জরুরী। পারলে আমিই আসতাম। কিন্তু সমস্যাটা কি জানেন, আমার শরীর আর আগের মত লম্বা ভ্রমণের উপযোগী নয়। আমি প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত। গত অর্ধ শতকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন বিষম উন্নতি হয়েছে যে রোগীকে সারাতে না পারলেও রোগীর মৃত্যুর পূর্বাভাসটি এরা ঠিকই দিয়ে দিতে পারে। তাতে যন্ত্রণা বাড়ে বই কমে না। জীবনের শেষ আর মৃত্যুর মাঝে যে সময়ের সাঁকো, আমাকে তার দৈর্ঘ্য মেপে দেওয়া হয়েছে।আর একটি বছর। আমি সাঁকোর ঠিক মাঝে দাঁড়িয়ে আপনাকে এই চিঠি লিখছি।
আমি থিম্পুতে থাকি। এখানে আমার একটা ছোট রিসর্ট আছে। আপনার কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ একবার আমার এখানে আসুন। এক-দু’দিন বেড়িয়ে যান এই সুন্দর শহরটি। মৃত্যুর আগে আমাকে একটিবার দায়মোচনের সুযোগ দিন।
ধন্যবাদান্তে,সৌমিত্র রায়,অরুণাচল রিসর্ট,পারো হিল,থিম্পু,ভুটান,৭৪১২৩৫
ফোনঃ +৯১৮৪২০৫৬৪৬৫০
ফোনঃ +৯১৮৪২০৫৬৪৬৫০
থিম্পু,
১৯.০৬.২০১৬
রীণা চিঠিটা ভাঁজ করে আবার ব্যাগে ভরে রাখল। জীবন কখনো কখনো গল্পের চেয়েও অদ্ভুত,করুণ এবং কাকতালীয় হয়ে ওঠে। কে জানত তিন বছরের পুরনো স্মৃতির জখমে আরও একবার অস্ত্রোপচার চলবে? চিঠিটা পেয়ে রীণা কোন দ্বিধা করে নি। যত দ্রুত সম্ভব সৌমিত্রবাবুর সাথে সাক্ষাতের আয়োজন করেছে। জীবনের এই প্রান্তে এসে পাবার বা হারাবার কিছু নেই। কিন্তু তারপরও নূতন ঘটনার ঘনঘটা ঘটেই চলেছে।
২
পাহাড়ের ঢালে ছোট্ট ছবির মতো রিসর্টটি । অভ্যাস নেই,তাই সিঁড়ি বেয়ে উপরে পৌঁছুতে রীণা হাঁপিয়ে উঠল।প্রথমেই টাইল বিছানো বড় আঙ্গিনা। আঙ্গিনার এক পাশে দালান,বাকিটা রেলিং ঘেরা খোলা পাহাড়। রীণা রেলিং-এর কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল।বেয়ারার কাছে সৌমিত্রবাবুর কাছে তার পৌঁছ-সংবাদ পাঠাল।
ঘন কুয়াশার মত মেঘ কোথা থেকে ভেসে এসে গা ভিজিয়ে দিচ্ছে। নীচে মাছের আঁশের মত সারি বাঁধা সবুজ বাদামী পাহাড়। সাদা তুলোয় ঢাকা। আরও দূরে একটা নীলাভ সবুজ নদী নাকি একটা চঞ্চলা জরির সুতো ঠিকরে আসা আলোয় চক চক করছে।
মনটা কেমন কেমন লাগছে!
একদিন কাঞ্চনজঙ্ঘায় সোনা-গলানো দৃশ্য দেখে ফেরার সময় দার্জিলিং ম্যালে হাত হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে একটা গান শুনিয়েছিল অরুণ।সেটাই বারবার মনে পড়ছে--
"সোনার মেয়ে, তোমায় দিলাম ভুবন ডাঙ্গার হাসি...
তোমায় দিলাম মধ্য দিনের, টিনের চালের বৃষ্টি রাশি...
আরো দিলাম রৌদ্র ধোয়া, সবুজ ছোঁয়া পাতার বাঁশি...
মুখে বললাম না, বললাম না যে ভালোবাসি....
সোনার মেয়ে তোমায় দিলাম ভুবন ডাঙ্গার হাসি...
হারাবো হৃদয় টানে, ভালোবাসার একটু মানে...
ইচ্ছে করছে দু জন মিলেই খুঁজি...
আবেগী মেঘের ভেতর, পৃথিবীর সব আদর...
তুমি হবে আমার, ভেবে দু চোখ বুজি...
প্রজাপতি হৃদয়টা এ আমাকে নিয়ে, এ যে কি হল আমার কোথায় আমি ভাসি।
তোমাকেই; তোমায় দিলাম ভুবন ডাঙ্গার হাসি......"
.....
..........
..............
চোখের কোণ আবার ভিজে ওঠে-- কোথায় চলে গেলে অরুণ? তোমার রিনি যে তোমায় ছাড়া অসম্পূর্ণ। আর কি ফিরে পাবো না তোমায়?
.....
..........
‘কেমন লাগছে আমাদের শহর?’
সৌমিত্রবাবু কখন নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তারপর খুক খুক করে দু’বার কাশলেন। অনেকদিনের অসুস্থতায় সর্দি বসা কাশি। তারপর বললেন,
‘আমিই সেই পত্রলেখক,আমার উপর আস্থা রেখে এতদূর আসবার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ’
‘খুব সুন্দর শহর আপনাদের, এখানে আসার জন্য কোন উদ্দেশ্য থাকার প্রয়োজন নেই।আমি আর অরুণ যখন...’
--এইটুকু বলেই রীণা নার্ভাস বোধ করতে শুরু করল।একটা অজানা ঔৎসুক্য নিয়ে সে এখানে এসেছে। অরুণের শেষ দিনগুলোর সাথে তার কোন পরিচয় নেই। অরুণ তার জন্য কি কোন মেসেজ রেখে গিয়েছিল? সেটা কেন তাহলে আগে দেওয়া হলো না। এত বছর পরে দেওয়ার মানেটাই বা কি?সরকারী তরফে সমস্ত পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।কেবলমাত্র..
সৌমিত্রবাবু বোধহয় সেটা আঁচ করতে পারলেন। বললেন,
‘আপনি সবে এসেছেন। একটু বিশ্রাম করুন,অনেক কিছু জানানোর আছে। আমরা সন্ধ্যায় কথা বলব’।
৩
জানালার বাইরে ঘন অন্ধকার। মাঝে মধ্যে লালচে আলোর উড়ন্ত স্ফুলিঙ্গ জ্বলেই আবার নিভে যাচ্ছে। কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে।
রীণা সৌমিত্রের মাথার কাছে কাঠের চেয়ারটা টেনে বসেছে। একটু আগে গৃহকর্মী এসে জানিয়েছিলেন সৌমিত্রের অসুস্থতা বেড়েছে,উনি শোবার ঘরেই কথা বলবেন।
সৌমিত্র বার বার খুক্ খুক্ করে কাশছেন। শুকনো কাশি। কাশির দমক একটু কমে আসতেই কথা আরম্ভ করলেন,
‘আপনার স্বামী খুব উদার এবং সাহসী মানুষ ছিলেন’
একটু দম নিয়ে আবার বললন,
‘ওনাকে কোথায় দেখি জানেন ? উত্তরাখণ্ড মিলিটারী হসপিটালে’
রীণা বিস্ময়ে বলে ওঠে, ‘তাই?’
‘দু'হাজার তেরোর জুন মাসে। এই হাসপাতালটির জন্ম নব্বই সালে। অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এর যাত্রা আরম্ভ হয় ,সারা দেশ থেকে সেরা ডাক্তারদের নিয়ে আসা হয়েছিল ভালো মাইনে দিয়ে।’
‘আমার হাজব্যাণ্ড তখন ওখানে কীভাবে?আমি তো জানি কার্গিলে…’ রীণা এমনভাবে বলছিল যেন সবকিছু এখনই ঘটেছে, স্মৃতির রূপালী তটে এ যেন কোন দূর অতীতের জলতরঙ্গ।
‘আপনার হাজব্যাণ্ড ওখানে কেন ছিলেন সে কথাতেই আমি আসছি। আপনার স্বামীর লাস্ট পোস্টিং সম্বন্ধে তো আপনি জানেন। যে কথাটা হয়তো জানেন না তা হলো এর পরে কি ঘটেছিল’
‘বলুন আমি শুনছি’,রীণার হৃদকম্পন আবার ফিরে এসেছে।
‘অরুণবাবু ঐ হাসপাতালে এসেছিলেন ওনার উইংসের একজন অসুস্থ সহকর্মীর সাথে দেখা করতে,যিনি কিনা ঘটনাচক্রে আমারও পরিচিত।আমি ছিলাম ইন্ডিয়ান এয়ার উইংসের একজন কনফিডেন্সিয়াল কম্পিউটার ল্যাংগোয়েজ ডি-কোডার প্লাস প্রোগ্রামার।ঐ সময়ে কিন্তু এ দেশে আমার মত পোস্টে লোকের সংখ্যা ছিল একেবারেই হাতে গোনা।একারণেই হয়তো আমাদের বায়ুসেনা-প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এন. এ. কে. ব্রাউন-এর প্রিয় কিম্বা প্রয়োজনভাজন ছিলাম আমি।’,এ পর্যন্ত বলে সৌমিত্র একটু থামলেন।একটানা কথা বলে ওনার হাঁফ ধরে গেছে। অথচ মনের ভার লাঘবেরও তর সইছে না।
‘কিন্তু আমার একটা সমস্যা ছিল। সমস্যাটা শরীরঘটিত। অবস্থা এমন যে চিকিৎসা না হলে যে কোন সময় আমার মৃত্যু হতে পারে। সেই সময়ে এ দেশে এর চিকিৎসা সুলভ তো নয়ই সহজলভ্যও নয়। ব্যাপারটা ব্রাউন জানতেন। আমার যেন সুচিকিৎসা হয় তিনি তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।’
‘কী হয়েছিল আপনার?’ রীণার মনে হলো সবকিছু এখন আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
‘সে ব্যাপারে আসছি, আগে আপনার স্বামীর কথা বলি।আপনার স্বামীর সাথে আমি আলাপ করে এতটাই মুগ্ধ হই যে ওনাকে রুদ্রপ্রয়াগে আমার অফিসিয়াল গেষ্ট-হাউজে নিয়ে আসি এবং ঘটনাক্রমে জানতে পারি যে আমি যে অন্তর্জালের অন্তর্ভুক্ত , আপনার স্বামীও ছিলেন সেই অন্তর্জালেরই অংশ,পার্থক্য শুধু এটাই উনি ছিলেন আর্মি উইংসের। ওনার কর্মপন্থা ছিল এমনই যা ইন্ডিয়ান গভর্নমেণ্ট সরাসরি স্বীকৃতি দেয় না,কিন্তু বাধা দেবারও সুযোগ পায় না।
সেদিন ছিল ষোলোই জুন।উনি আমার ঘরে বসে আমাকে এমন এক প্রস্তাবের কথা বললেন যা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম।ঘটনাক্রমে আগে আমার জীবনের সব কথাই আর ওনার জীবনের প্রায় সব কথাই আমাদের গল্পচ্ছলে হয়েছিল।’
‘আপনি কি বলতে চাইছেন আমার স্বামী ভারত-বিরোধী কোন কাজ করেছিলেন? আর এটা বলার জন্যই কি আমাকে এত দূর এনেছেন?’ রুষ্টস্বর শোনা যায় রীণার কণ্ঠে।
"অরুণবাবুকে তাহলে আপনি এই চেনেন? আগে সবটা শুনুন তো!"একটু আগের অযথা উত্তেজনা রীণাকে লজ্জিত করল। রীণা সম্মতিসূচক দৃষ্টিতে সৌমিত্রের দিকে চাইল।
"ষোলো তারিখ ,রবিবার সন্ধ্যেবেলায় আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অরুণবাবু যাবার জন্য রেডি হচ্ছেন।আকাশ থেকে বাঁধভাঙা বৃষ্টি পড়ছে দেখে আমিই তাকে যেতে নিষেধ করলাম,কারণ পরদিন আমিও ফিরবো; একসাথে ফেরার জন্য।
রাত তখন বেশ গভীর।দুজনে গল্প করছিলাম।বাইরে সন্ধ্যে থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। হঠাত্ একটা চীত্কার-চেঁচামেচির শব্দ কানে এলো।বাইরে বেড়িয়ে দেখি...
....কেদারনাথ মন্দিরের দিক থেকে একটা বিশালাকৃতি জল-রাক্ষস সবকিছু গিলতে গিলতে ছুটে আসছে আমাদের বাড়িটার দিকে।বড় বড় পাথর আর বড় গাছ জলের স্রোতে এগিয়ে আসছে।
আমি আর অরুণ কি করবো বুঝে ওঠার আগেই জলের ধাক্কায় দুজনেই তলিয়ে গেলাম।
আমি হাবুডুবু খেতে খেতে একটা ল্যাম্পপোষ্ট পেয়ে আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করলাম।
কিন্তু পারলাম না...
জ্ঞান হারাবার আগে এটুকু বুঝতে পারলাম অরুণ আমায় পিছন থেকে আঁকড়ে ধরে টানতে টানতে সাঁতরাচ্ছে যাতে ভেসে দূরে না চলে যাই।
‘আর অরুণ?’
‘জ্ঞান ফিরলে দেখি একটা ভাঙাচোরা বাড়ীতে শুয়ে আছি।সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা।ওঠার ক্ষমতা নেই।বিকেলের দিকে আর্মির একটা রেসকিউ টিম আমায় উদ্ধার করে উখীমঠের অস্থায়ী হাসপাতালে নিয়ে আসে।অরুণকে দেখতে পাইনি’
‘তারপর’
‘আমার টিমের লোকজন খবর পেয়ে ছুটে এলো।কিন্তু জলের স্রোতে বেশী দূর আসতে পারছে না। এর চেয়েও অনেক ভয়ঙ্কর সময় পার করে এসেছি’
অরুণের কি হলো? বলুন...
উৎকণ্ঠায় এবার রীণার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
‘একে একে আহত-হত মানুষের স্তূপে ভরে গেলো হাসপাতাল। সন্ধ্যের দিকে আবার জলস্রোতের গর্জন।কিন্তু ভগবানের কি অপরিসীম করুণা।কোথা থেকে একটা বড় পাথর উখীমঠের সামনে গড়িয়ে এসে আটকে গেলো।আর জলস্রোত গতিপথ বদলে অন্যদিকে ঘুরে গেলো। গাদাগাদি করে পড়ে থাকা মানুষেরা তখন বিচ্ছিন্ন এবং দুর্বল। প্রতিরোধেরও কোন উপায় নেই’
'এটা পড়ে দেখুন।'একটা আনন্দবাজার পত্রিকার কাটিং এগিয়ে দিলেন....
.....
..........
৮ আষাঢ় ১৪২০ রবিবার ২৩ জুন ২০১৩
ছড়ানো দেহের পাশে টাকার বান্ডিল, মৃত্যুপুরী কেদারনাথ
নিজস্ব রিপোর্টার • কলকাতা
"রবিবার ষোলোই জুনের রাতে প্রকৃতির প্রথম মারটা সামলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন কেদারনাথে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের কর্মীরা। মহারাজের নির্দেশে যাত্রীদের সরিয়ে ফেলা হয়েছে। জলের তোড়ের সঙ্গে বড় বড় পাথর গড়িয়ে এসে রাতভর কড়া নেড়েছে অতিথি নিবাসের। কেঁপে কেঁপে উঠেছে কংক্রিটের দেওয়াল। বৃষ্টি মাথায় রাত জেগেছেন সবাই। ধীরে ধীরে দিনের আলো ফুটল। সোমবারের মেঘলা সকাল। এ যাত্রা বুঝি রেহাই মিলল বলাবলি করছিলেন সকলে।
আর ঠিক তখনই, নেমে এল মহাপ্রলয়।
প্রথমে একটা ভয়ানক শব্দ।
সে শব্দের গাম্ভীর্য, বিভীষিকা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। পাঁচ দিন মৃত্যু উপত্যকায় কাটিয়ে শনিবার কোনও মতে উখীমঠে ফেরা গৌতম-অর্ধেন্দুরাও তা মানছেন। এঁরা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের কর্মী। সারা জীবনই হয়তো ওই শব্দ অনুরণিত হবে তাঁদের কানে।
কেদারনাথের মন্দির পেরিয়ে যে রাস্তা উঠেছে, মন্দাকিনী হিমবাহ হয়ে তা গিয়েছে চোরাবারি তাল পর্যন্ত। পাহাড় চুড়োর এই হ্রদে মোহনদাস গাঁধীর চিতাভস্ম বিসর্জন দেওয়ার পর থেকে সেটিকে গাঁধী সরোবর বলেও ডাকা হয়। জলধারণ ক্ষমতা মাত্রা ছাড়ানোর পরে হ্রদটি ফেটে যাওয়াতেই শোনা গিয়েছিল ওই গগন-বিদারী শব্দ।
আর তার পরেই পেছনের আস্ত পাহাড়টা যেন নেমে এসে গিলে ফেলল সব কিছু। ফুট দশেক উঁচু বড় বড় বাড়ি নিমেষে ভিত থেকে উপড়ে এগিয়ে চলল জাহাজের মতো। শঙ্করাচার্যের সমাধি এসে ধাক্কা মারল ভারত সেবাশ্রমের ৪০ ঘরের বিরাট অতিথি নিবাসের পিঠে। সকলকে বার করে দিয়ে স্বামী জগদীশানন্দ মহারাজ তখনও ভেতরে। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস বার করার চেষ্টা করছেন। রয়েছেন আর এক কর্মীও। তাঁদের কী হল, দেখার সুযোগ পাননি গৌতমরা। শুধু দেখেছেন, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কয়েকশো ফুট নীচে খরস্রোতা মন্দাকিনীর বুকে তলিয়ে গেল লালচে গেরুয়া রঙের গোটা বাড়িটা।
আতঙ্কে মন্দিরের মধ্যেই আশ্রয় নিয়েছিলেন সকলে। কত ক্ষণ ছিলেন? মনে করতে পারেন না। কত ক্ষণ চলেছিল প্রকৃতির এই তাণ্ডব? তাও ঠিক ঠিক বলতে পারেন না কেউ। গৌতম বলেন ঘণ্টাখানেক, তো অপুর ধারণা মিনিট কুড়ি। কিন্তু সেই সময়টাতে তাঁরা যে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে সামনে থেকে দেখেছেন, সে ব্যাপারে দু’জনেই একমত।
বাইরে পাথরের দুদ্দাড় দৌড় কমছে। কিছু মানুষ বাইরে বেরিয়েছেন। শোনা যাচ্ছে আর্ত চিৎকার। বৃষ্টি কি একটু কমলো?
বাইরে আসতেই কাদায় ডুবে গেল পা। এত কাদা এল কোথা থেকে? মন্দিরের চাতালটাই বা গেল কোথায়?
পায়ের নীচে থেকে চোখ তুলতেই বুকটা ছাঁৎ করে উঠেছিল অর্ধেন্দুর। মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল। এ কোথায় দাঁড়িয়ে? কেদারনাথ মন্দিরকে ঘিরে ঘিঞ্জি বাজারটা কই? বিড়লা গেস্ট হাউস, ভারত সেবাশ্রম, তার আগে একের পর এক ধর্মশালা। কিছু ক্ষণ আগেও তো এখানেই ছিল সব। কোন এক ভোজবাজিতে যেন নিমেষে হারিয়ে গিয়েছে। স্রেফ মুছে গিয়েছে। খাঁ খাঁ উপত্যকায় শুধু মাথা তুলে দাঁড়িয়ে কেদারনাথের মন্দির। এক্কেবারে একা। আর তাকে ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে সার সার মৃতদেহ। বাচ্চা-বুড়ো-মেয়ে-মরদ। যেন এই মাত্র শেষ হয়েছে কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ।
বেঁচে রয়েছেন কী করে, বুঝতে গায়ে চিমটি কাটতে হয়নি। কারণ তার আগেই পিঠে পড়েছে পরিচিত হাত। একে একে বেরিয়ে এসেছেন গৌতম-অর্ধেন্দু। ওই তো অপু মাহাতো! ও-পু-উ!
কিন্তু মহারাজ কোথায়? স্বামী জগদীশানন্দ? গৌতমরা আঁতি-পাতি করে খুঁজেছেন। পাননি। তবে কি...?
উখীমঠের সুধীর মহারাজ বলছেন, “অনেক চেষ্টা করেও কোনও খোঁজ মেলেনি। তবে আশায় বুক বেঁধে আছি, কত অলৌকিক ঘটনাও তো ঘটে!”
আরও এক কর্মী নিখোঁজ। শেষ সময় পর্যন্ত তিনিও ছিলেন জগদীশানন্দ মহারাজের সঙ্গে।
শুধু তিনি কেন, গৌরীকুণ্ডের দুই মহারাজ স্বামী কেদারানন্দ ও স্বামী সর্বলোকানন্দজি...। শেষ সময় পর্যন্ত তাঁরা যাত্রীদের ধাক্কা মেরে মেরে নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়েছেন। তত ক্ষণে দেওয়াল ভেঙে গ্যালন গ্যালন জল সর্বস্ব ভাসিয়ে দিচ্ছে। তার পরেই চুর-চুর হয়ে গিয়েছে গৌরীকুণ্ডের বিশালাকায় আট তলা অতিথি নিবাস। উখীমঠে ভারত সেবাশ্রম স্কুলের অধ্যক্ষা চন্দ্রিমা সরকার জানিয়েছেন, আজও খোঁজ মেলেনি তাঁদের!
সোমবারের পরে পাঁচ-পাঁচটা দিন ধরে মৃত্যু উপত্যকা থেকে বেরোনোর চেষ্টা করেছেন গৌতমরা। কেদারনাথের মন্দিরেও আর থাকা যায়নি। অজস্র আহত যাত্রী সেখানে চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন। কারও কিচ্ছু করার নেই। পায়ে পায়ে শুধু দেহ আর দেহ।
মরা মানুষের পাশে তাড়া তাড়া নোটের বান্ডিল। একশো-পাঁচশো, রয়েছে হাজারের বান্ডিলও। ভিজে একসা সে টাকা থেকেও কোনও কাজে লাগছে না।
কোথা থেকে এল এত নোট? আগের দিনই একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে তোলা হয়েছিল কয়েক কোটি টাকা। ব্যাঙ্কের বাড়িটা মুছে গিয়েছে। প্রকৃতির মারে ভল্টও চুরমার। মন্দাকিনীর তোড়ে ভেসে গিয়েছে কোটি কোটি টাকা! জল নামায় আটকে রয়েছে এখানে-ওখানে। সন্ত্রস্ত মানুষ দেখেও দেখছেন না। খাঁচায় আটকে পড়া পশুর মতো তাঁরা তখন রাস্তা খুঁজছেন, মৃত্যুপুরী থেকে বেরোনোর রাস্তা। উত্তর থেকে ধস নেমে গড়িয়ে গিয়েছে দক্ষিণে। মানুষ দল বেঁধে আশ্রয় নিচ্ছেন পুব আর পশ্চিমের পাহাড়ের গায়ে। জঙ্গলের ফাঁকে। মৃতদেহ দেখে দেখে গা গুলিয়ে উঠছে। তাই বোধহয় খিদে পাচ্ছে না কারও। মাঝে মাঝে বৃষ্টি এসে চুপচুপে করে দিয়ে যাচ্ছে। গায়ের পোশাক শুকোচ্ছে গায়েই।
ডান দিকের জঙ্গলের পথ কি বাইরে গিয়েছে? বুধবার সে রাস্তা ধরেই চলতে শুরু করেন গৌতমরা। কয়েক কিলোমিটার গিয়ে রাস্তা মুখ থুবড়ে নেমে গিয়েছে সেই মন্দাকিনীতেই। হতাশ হয়ে ফিরে আসা।
বৃহস্পতিবার মনে হল ফের একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে। টানা গোঁ-গোঁ শব্দ। সমস্বরে কান্নাকে ছাপিয়ে ক্রমেই যেন স্পষ্ট হচ্ছে। জংলা ছাপ চপার একটা। পাক খাচ্ছে আকাশে। যে যেখানে ছিল সবাই বেরিয়ে এল। চলছে হাত নাড়া। ক’টা প্যাকেট পড়ল। খাবারের প্যাকেট। জলের পাউচও।
চপারটা কি নামছে?
নাঃ। বেশ কয়েক বার পাক খেয়ে ফিরে গেল সেটা। লোকের তুলনায় অতি সামান্য খাবার। গৌতমরা শুক্রবার সকালে বাঁ দিকের পাহাড়টার পথ ধরলেন। বহু লোক চলেছে সে পথ ধরে। অনিশ্চিত যাত্রা। এ বার একেবারে অন্য এক অভিজ্ঞতা।
শুক্রবারের রাস্তাও শেষ হল খাদে। গৌতমরা ফিরে এসে শুনলেন, বারে বারে চপার এসে নেমেছিল মন্দিরের সামনের মাঠে। অনেককে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছে। খাবার ও জল দিয়েছে। সেনারা আশ্বাস দিয়েছেন, ধৈর্য হারাবেন না। সকলকেই উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
শুক্রবার সারা দিনই বেরোনোর পথ খুঁজে ফিরেছেন অর্ধেন্দু-গৌতমরা। সন্ধ্যায় একটি চপারে ওঠার সুযোগ মেলে। অবশেষে উড়ে চলেছে আকাশযান। ধীরে ধীরে দৃষ্টিসীমার বাইরে সরে যাচ্ছে কেদার। এখনও দেখা যাচ্ছে দলা পাকানো দেহগুলো...
গুপ্তকাশীতে চপার যখন নামল, দিনের আলো নিভে গিয়েছে। কোথায় যাবেন তাঁরা? পাহাড়ের তীক্ষ্ণ ঢাল নেমে গিয়েছে মন্দাকিনীতে। উল্টো দিকে উখীমঠ। সেখানে আশ্রম রয়েছে ভারত সেবাশ্রমের। নীচে একটা পুল আছে ওঁরা জানেন। কিন্তু সে পুলও যে ভেসে গিয়েছে, তা বোধ হয় জানা ছিল না তাঁদের।
অন্ধকারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন অপু। কোথাও কোনও পাহাড়ের খাঁজে আটকে রয়েছে পা। বাকিরা টেনে তুলতে তিনি উঠলেন, কিন্তু গোড়ালির হাড় খুলে নেমে গিয়েছে। যন্ত্রণা ছাপিয়ে উদ্বেগ, আর তো হাঁটতে পারবেন না অপু! কোনও ক্রমে কাঁধে তুলে নদীর ধারে।
রাত সাড়ে বারোটার সময়ে স্থানীয় কিছু লোক এসে উখীমঠে খবর দেন সুধীর মহারাজকে। কয়েক জনকে নিয়ে নেমে যান তিনি। প্রায় দেড় হাজার ফুট সটান উৎরাই। গাঁয়ের মানুষ পেরোনোর জন্য একটা দড়ির সেতু গড়েছিলেন। জলের তোড়ে সেটা ডুবে গেলেও ভেসে যায়নি। সেটাই ভরসা। নদী পার করে অপুকে তুলে নিয়ে আসা হল কাঁধে করে। শনিবার ভোরের আলো তখন ফুটছে একটু একটু করে।
অবশেষে উখীমঠে স্বজনদের কাছে ছ’জন।"
.........................................................................................................এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললো রীণা.....
‘অরুণ কি তখনই--’ বাকি কথাটা রীণা আর উচ্চারণ করতে পারল না কণ্ঠ অবরুদ্ধ হয়ে আসার জন্য।
‘না। ছ'ঘন্টা পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটা গ্রুপ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।ভারত সেবাশ্রমের ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা লাশের স্তূপের মাঝে অচেতন অবস্থায় অরুণকে পাওয়া যায়।জলের মধ্যে নানা জায়গায় ধাক্কা লেগে শরীরে নানা জায়গায় ইনজুরি হয়েছে। তাছাড়া…’
‘তাছাড়া কি?’
‘মুখটা ফেটে বীভৎস আকার ধারণ করেছে’
রীণার চোখ দিয়ে টপ্ টপ্ করে জল ঝরছে।
‘যারা তখনও বেঁচে ছিল তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরাখণ্ড আর্মি হসপিটালে।তিন সপ্তাহ ধরে অরুণকে বাঁচানোর সবরকম চেষ্টাই করা হয়। মাল্টিপল্ ওয়াটার ইনজুরি কজিং মাল্টিপল্ অর্গ্যান ফেইলিওর। এ যেন যমে মানুষে এক অসম লড়াই’
এতগুলো কথা বলে সৌমিত্র নিজেও ক্লান্ত। বললেন,
‘আজ এটুকুই থাক। দু-দিন ঘুরে আসুন আশে-পাশে।আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। পরশুদিনের পরেরদিন সকালে বাকিটা বলব।’
একা বেড়িয়ে এলো রীণা।ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে।তাতে ভিজতে ভিজতেই রীণার দু চোখে জলের ধারা।বৃষ্টি খুব প্রিয় ছিল অরুণের।
কি ক্ষতি হত এগুলো না শুনলে?
দুজনে মিলে কত স্বপ্নই না দেখেছিলো ভবিষ্যতের।একবার একটা চিঠিতে লিখেছিল--
..............
.......................
............................
"ছোট্ট একটা ঘর, এক টুকরো উঠোন... রইল নিমন্ত্রণ ।
উত্তর জানলায় বৃষ্টি দেখব দুজন, এসো চাইলে ও মন।
আসবে বলে কাছে ............
মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে।
উঠোনে জুড়ে কৃষ্ণচূড়া চাই,ঘাস সবুজের আদর লাগে পায়।
দৃষ্টি অন্যরকম এ উঠোনে
বৃষ্টি সবই বোঝে সবই শোনে।
যাচ্ছি তারই কাছে.........মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে।
রইবে সাথে মেঘ মল্লার ধূন,
তুমি আর আমি টুপ্ টুপ্ গুন্ গুন্।
অপরূপা মেঘ মল্লার ধূন,
তুমি আর আমি টুপ্ টুপ্ গুন্ গুন্।
যাচ্ছি তারই কাছে.........
যাচ্ছি তারই কাছে.........
মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে।
ছোট্ট একটা ঘর, এক টুকরো উঠোন পেলাম নিমন্ত্রণ ,
ছোট্ট একটা ঘর, এক টুকরো উঠোন পেলাম নিমন্ত্রণ ,
উত্তর জানলায় বৃষ্টি দেখব দুজন, চাইলে ও মন।"
..............
...........................
.................................
৪
পাহাড়ের রেলিং ঘেঁষে গোল করে চেয়ার বসানো।মাঝে একটা গোল টেবিল। পুব আকাশ থেকে ছলকে পড়া সূর্যের আলোয় জায়গাটা রুপোর পাতের মত ঝক ঝক করছে।সৌমিত্রের হাতে আনন্দবাজার পত্রিকা। এই ভোরের আলোয় সৌমিত্রকে আরও দুর্বল ও অসুস্থ লাগছে। রীণার উদ্বেগ আঁচ করে সৌমিত্র বললেন,
‘আসলে একা মানুষ তো, অপারেশনের পরে চাকরি ছেড়ে দিয়েও নিজের শরীরের তেমন যত্ন করিনি। হাউএভার, ইটস টু লেইট নাও’
‘সৌমিত্র দা’,আমাকে দুপুরেই রওনা হতে হবে।’
‘হ্যাঁ জানি, খুব বেশী আর সময় নেব না। আমি তো বলেছিলাম হসপিটালটিকে মডেল হসপিটাল হিসেবে বানানো হয়েছিল। সারা দেশের সেরা মেধাগুলিকে জড়ো করা হয়েছিল এখানে। কিন্তু অরুণের অনেকগুলো অর্গ্যান ফেইল করছিল, কিছুতেই কিছু উপায় হচ্ছিল না।অরুণ ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। জ্ঞান থাকতে থাকতেই জড়ানো কণ্ঠে অরুণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্বার্থে তার দেহ দান করার ইচ্ছা ব্যক্ত করে।’
রীণা প্রশ্নটা না করেই পারল না,
‘ও না হোক; কর্তৃপক্ষই বা আমাদের সাথে কোন যোগাযোগ করল না কেন?’
‘আমি এই প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিলাম। আসলে অরুণ চায়নি যে তার "প্রাণের প্রিয় রিনি", এই নামই সে বলেছিল সেদিন; তার বিকৃত হয়ে যাওয়া অবয়ব এবং যন্ত্রণাঘন মৃত্যু প্রত্যক্ষ করুক। এমন কি নিজের ঠিকানাটা পর্যন্ত সে আমাদের কাউকে দিতে দেয়নি’
‘তো আপনার সাথে অরুণের সম্পর্ক এখানে কোথায়?’
‘মনে আছে আপনাকে বলেছিলাম আমি জন্মগতভাবেই শারীরিক ত্রুটিগ্রস্ত? ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট প্লাস হাইপোপ্লাস্টিক লেফট হার্ট।হৃদপিণ্ডের ঝুঁকিটা দিন কে দিন বাড়ছিল।উইংসের প্রধান আমার জন্য সব হাসপাতালগুলিতে খোঁজ নিয়ে রেখেছিলেন। অরুণ যখন তার দেহ দান করল, তখন তার রক্তগ্রুপ এবং আরও অনেক তথ্য কেন্দ্রীয় তথ্য ব্যাঙ্কে জমা হলো। এমন অনেকেরই থাকে। অরুণের সাথে আমারটা মিলে গেলো। এই কথাটাই সেদিন সে আমায় বলেছিল।বলেছিল,"সৌমিত্রদা আমার কাজের মাঝে মৃত্যু পায়ে পায়ে ঘোরে ।তাই কখনো যদি মৃত্যুমুখে পড়ি তবে আমার হৃদয়টা তোমায় দিয়ে যাব।যাতে তোমার মধ্যেও আমি আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারি।"
ভারতে তখনো হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি তেমন অগ্রগতি হয়নি। ঠিক হলো বাইরে থেকে সেরা এক্সপার্ট আনা হবে’
রীণা কি বলবে বুঝতে পারছে না।
‘মৃত্যুর পনেরো দিন আগে হসপিটালে অরুণের সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ। দোসরা জুলাই অরুণ কোমায় চলে যায়। দশই জুলাই ওর লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়। অরুণের হৃদপিণ্ড আমার শরীরে প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি আরম্ভ হয় এর পরপরই। ব্যাপারটা বলতে যত সহজ আসলে তত সহজ ছিল না। ডক্টর ক্রিস্টিয়ান বারনার্ডকে উড়িয়ে আনা হয় সাউথ আফ্রিকার কেইপ টাউন থেকে। ১৯৬৭ সালে তিনিই প্রথম মানুষের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করেছিলেন। তিনি বললেন এটা একটা ক্লিনিকাল এক্সপেরিমেন্ট।শরীরের স্বভাব হলো বাইরের কোষকে দেহে প্রবেশে বাঁধা দেওয়া।তখনো ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ড্রাগ সেভাবে চালু হয়নি ভারতে।এমন হতেই পারে যে আমি মাসখানেকের বেশী সারভাইভ করব না। তাই আমি যে এতদিন বেঁচে আছি সেটা সেই সময়ের প্রেক্ষিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক চরম বিস্ময়...!!’
গৃহকর্মী চা এনে রেখেছে। সৌমিত্র চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,
‘তিন বছর ধরে আপনার স্বামীকে আপনি হৃদয়ে ধারণ করে আছেন আর আমি আপনার স্বামীর হৃদপিণ্ডটি ধারণ করে আছি।’
‘না,আমার দিকের কথাটা অতিরঞ্জিত হয়ে গেল। আপনার স্বামীর হৃদপিণ্ডটি বরং আমার এই অক্ষম শরীরটার সঞ্চালক হয়েছে। এর শিরায় উপশিরায় আর কৌষিক জালিকায় রক্ত পাম্প করে এই তিনবছর ধরে একে জিইয়ে রেখেছে। কিন্তু এখন আমার নিজের সময়ও ফুরিয়ে এসেছে। আমি চলে যাওয়ার সাথে সাথে আপনার স্বামীর হৃদপিণ্ডটিও বন্ধ হয়ে যাবে। আমি তো আর এর মালিক নই। তারপর এর কী হবে সে সিদ্ধান্ত আপনার’
সৌমিত্র আর কথা বলতে পারছেন না। প্রচণ্ড কাশিতে মনে হচ্ছে ওনার দমবন্ধ হয়ে যাবে৷ রীণাও বাকরুদ্ধ, কিন্তু ভিন্ন কারণে।
৫
রীণা ঘরে ফিরে ব্যাগ গোছালো। তারপর সৌমিত্রের ঘরে এসে চেয়ার টেনে বসলো। সৌমিত্র ম্রিয়মাণ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন। রীণা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললো,
‘আমি আসি সৌমিত্রদা।'
'আমি আমার উত্তর পেলাম না যে?'
'অরুণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য তার শরীরটা দান করে গেছে। তাই ওই হৃৎপিণ্ডের অধিকার আপনারই। আপনার মৃত্যুর পর কী হবে সে সিদ্ধান্ত আপনিই নিন !’
রীণা যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো।
দরজার কাছে এসে রীণা একবার ঘুরে তাকালো।
‘সৌ..মি..ত্র.. দা’--আবেগে গলা কাঁপছে তার...
‘হুঁ’
একটু ইতস্তত করে রীণা বললো,
‘যাবার আগে একবার কি আপনার হার্ট বিটটা…’
রীণার কথা শেষ হবার আগেই সৌমিত্র মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
সৌমিত্রের বুকের উপর রীণার মাথা। দুই চোখ দিয়ে অঝোরে বরিষণ...
সৌমিত্রের বুকের ভেতর অরুণের হৃদপিণ্ড। হৃদপিণ্ডটা ছন্দে ছন্দে ওঠাপড়ার শব্দ করছে।
যেন লক্ষ যোজন দূর থেকে ভেসে আসছে---
.......
................
....................."সোনার মেয়ে, তোমায় দিলাম ভুবন ডাঙ্গার হাসি...
তোমায় দিলাম মধ্য দিনের, টিনের চালের বৃষ্টি রাশি...
আরো দিলাম রৌদ্র ধোয়া, সবুজ ছোঁয়া পাতার বাঁশি...
মুখে বললাম না, বললাম না যে ভালোবাসি...."

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন