সোমবার, ৪ জুলাই, ২০১৬

এরা কি মানুষ ?

এরা কি মানুষ ?
----------------------------------------------------------
স্বপ্নসন্ধানী
----------------------------------------------------------

এক

অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি। একটা ডিসপেন্সারিও বাদ দেইনি না, পেলাম না। সেই ক্লিনিক থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে সরকারী হাসপাতালগুলোর কাছে এসে পড়েছি। ক্লিনিকে কেবিন অ্যাটেন্ডার অবশ্য বলে দিয়েছিল স্যালাইনটা রেয়ার, সুরভী ঔষধালয়ে পাওয়া যেতে পারে। মহিলা যদি জোড় গলায় ‘পাওয়া যেতে পারে’ না বলে ‘ কেবল পাওয়া যাবে’ এই সত্যি কথাটা বলত তবে এতটা না হেঁটে রিকশা নিয়েই চলে আসতাম। এখন সুরভী ঔষধালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ছোট একটা দোকান। ভীড় বেশ। অনেক খদ্দেরকে দেখলাম আমার মতই ঘেমে-নেয়ে একাকার। ভীড়ের মাঝ দিয়ে এগিয়ে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনটা এগিয়ে দিলাম কাউন্টারের লোকটার দিকে। লোকটার মুখের দিকে তখনও তাকাই নি। পাশের একজনের কনুই বারবার আমাকে আঘাত করছিল। লোকটির সেদিকে কোন খেয়াল ছিল না, সে ব্যস্ত তার ওষুধগুলো বুঝে নিতে। তার রোগীর বোধহয় খুব তাড়া। বারবার ফোন আসছে। পকেটে হাত দিচ্ছে, কনুই আমাকে গুঁতোচ্ছে। আমি কনুই এড়িয়ে একটু সরে গেলাম। যার হাতে প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলাম তার দিকে এবার তাকালাম। লোকটাকে তো আমি চিনি।
চিনি মানে ঠিক পরিচয় নেই, তবে গত এক সপ্তাহে কমপক্ষে চার পাঁচবার তার সাথে আমার দেখা হয়েছে। দেখা হয়েছে বাসে। সকালে যখন বাসে উঠি ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে তখন লোকটাও ওঠে। ওর বাসাও মীরপুরে আমাদের ওদিকেই হবে। এক সপ্তাহ ধরে সকাল সন্ধ্যা ডিউটি আমার এই ক্লিনিকে যাওয়া আসা। আমার বড়দির শাশুড়ির একটা মেজর অপারেশন হয়েছে। কোন এক মেয়েলী রোগ, আমি অত বিস্তারিত জানার চেষ্টা করিনি। কিন্তু মা’র গোয়ার্তুমির কারণে দায়িত্ব এড়াতে পারিনি। মীরপুর থেকে মহম্মদপুর কাছে। বড়দি দের বাসা ঢাকার সেই অন্য প্রান্তে সূত্রপুর। রোজ খাবার নিয়ে যেতে হয়। মা’র ভাষায় আমি উড়নচন্ডী, আমাকেই ক্লিনিকে বড়দির শাশুড়ির সব ফাইফরমাস খেটে দিতে হচ্ছে। উড়নচন্ডী কথাটা তো মিথ্যেও নয়, কি উপায়। মানা করা যাচ্ছে না। যদিও আমি ক্ষুব্ধ মনে মনে ...
মানুষকে দেখে নাকি তার কর্মকান্ড বোঝা যায়। মিললো না। লোকটাকে আর তার বাসে রোজকার আচরণ দেখে মনে হয়েছিল ব্যাটা কোন সরকারী অফিসের কেরাণী। খোঁচা খোঁচা আধা কাঁচা আধা পাকা দাড়ি থাকে রোজ মুখে। মনে হয় ওর চেয়ে যেন আর বাড়েও না, কমেও না। ঢিলে ঢালা প্যান্ট। ইন না করা এক রঙা শার্ট গায়ে। হাতে একটা খাবারের থলে। থলেটা চটের তৈরী এবং ছেঁড়া। কন্ডাকটার ভাড়া চাইতে আসলেই শুরু হয় তার একই ডায়লগ- ‘রোজ আট টাকা দিয়া যাই, আজকা দশ টাকা হইলো ক্যামনে...’ সাথে সাথে আবার কিছু লোক তাল মেলায়। যারা তাল মেলায় তারাই আগে দশ টাকা বের করে দেয়। ঐ লোক আট টাকাই বের করে বুক পকেট থেকে গুণে গুণে। দু'টাকার নোট সব, তারপর কন্ডাক্টরকে হিসাব দেখায়, বলে, ‘সরকারী যে রেট তাতে আট টাকার বেশি ভাড়া হয় না আর তোমরা নিতাসো দশ টাকা। আট টাকার বেশি দিমুই না। জুলুম পাইসো। দেশে আইন আদালত আছে না। ’ আইন আদালতের কথা শুনে কেউ আবার মুখ খোলে, ‘আরে আইন, সে আছে খালি কাগজ কলমে, কলকাঠি নড়ে অন্যখানে। গরীবের লাইগ্যা কোন আইন নাই।’ আরেকজন বলে ওঠে, ‘নাই তো আমাগো লাইগ্যাই , আমরা জনগণ আইন ঠিক মতো মানলে ...’ এক দু’জন করে শুরু হয়ে যায়। কথা নদীর মত, চলে যায় রাজনৈতিক অস্থিরতায়। বাসে দু কান খুলে দাঁড়িয়ে থাকাই দায় হয়। লোকটা অবশ্য বসেই আছে। কন্ডাকটার তখনও তার সাথে ঝগড়া করছে। কেউ একজন বলে ওঠে, ‘ভাই সবাই দিতাসে, শুধু শুধু ক্যাচাল কইরা সাত সকালে মাথাটা নষ্ট কইরেন নাতো, একেতো রাস্তা ঘাটের নদী-নালার লাহান অবস্থা কখন কি হয় তার নাই ঠিক, তার উপর আপনাগো ক্যাচাল।’ লোকটাও খেপে ওঠে ,‘আপনাগো লাইগ্যাই তো ওরা পাইয়া বইসে’ অবশ্য দুটাকার নোটগুলো সাথে আরেকটি এক টাকার কয়েন যোগ করে লোকটি। কন্ডাকটার গজ গজ করতে করতে টাকাটা নেয় কিন্তু মুখে বলতে ছাড়ে না, ‘কাল থেইক্যা হাঁইট্যাই যাইয়েন।'
লোকটা কোনদিনই হাঁটে না। সে পরের দিনও তর্ক জোড়ে। এক টাকা ঠিকই কম দেয়। একটা গর্ব তার চেহারায় লক্ষ্য করা যায়। সেই একা বিজয়ী আর সবাই লুজার।

দুই

নিজেকেও আমার এখন বড্ড লুজার মনে হচ্ছে। সর্ব প্রথমে যে ডিসপেন্সারিতে জিজ্ঞেস করেছিলাম সেখানের একটা ভদ্র চেহারার ছেলে বলেছিল, ‘এ কোম্পানীর স্যালাইন পাবেন না আশেপাশে। অন্য কোম্পানীর দিই?’ আমি সম্মত হতে পারি নি। অন্যের শাশুড়ি আমি কেমন করে সিদ্ধান্ত দিই। ছেলেটি আরও বলেছিল, ‘আরে ভাই, সামান্য একটা স্যালাইন ইতো। এক কোম্পানীর নিলেই তো হয়।’ ‘ক্লিনিক অ্যাটেন্ডার দিদি বারণ করেছে অন্য কিছু নিতে’ জানাই। সে হাসে। বলে, ‘আরে দাদা, সব ব্যবসা!! ওষুধ কোম্পানী আর দোকানের সাথে ক্লিনিকের চুক্তি হয়েছে। আগে আমাদের সাথেও ঐ ক্লিনিকের চুক্তি ছিল। কিন্তু ওরা বেশি কমিশন চায়। আমরা চুক্তি করি নাই আর। শুধুশুধু হাঁটবেন, হাঁটেন। ’চিন্তা করলাম এর পর সব ওষুধ ঐ ছেলের কাছ থেকে নিলে কেমন হয়? আসলে ভালো হয় না, ক্লিনিক এটেন্ডার মানবে না। নিজের মা হলে আমি জোড় করতাম, অন্যের মা'র বিষয়। আমার জোরে হিতে বিপরীত হলেও হতে পারে।
..আমি বাসে চেনা সেই ওষুধওয়ালার হাত থেকে স্যালাইনের বোতল গুলো হাতে নিলাম। নেড়ে চেড়ে দেখলাম। নাম মেলালাম। ব্যাটা মুখ খুললো, ‘ভুল নেই, সকাল থেকে পঞ্চাশ পিস বেচেছি। আর কোথাও নেই এইটা। ’
আমি দাম হিসেব করছি। প্রতিটার দাম লেখা সত্তর টাকা। পাঁচটার মোট দাম হয় তিনশত পঞ্চাশ। পাঁচশ টাকার নোট এগিয়ে দিলাম। ব্যাটা ফেরত দিলো মাত্র পঁচাত্তর টাকা। বললাম, ‘কত করে?’
‘একশ পাঁচ টাকা।’‘কেন? গায়ে লেখা তো...’‘আরে ভাই, এইটা মার্কেট আউট আইটেম, কোনো দোকানে নেই। আমাদের বেশি দামে কিনে আনতে হয়েছে। নেবেন? কাস্টমার ডাকছে, নিলে নিন, না নিলে তাড়াতাড়ি বলুন।’অগত্যা আমি পঁচাত্তর টাকা নিয়েই ফিরে এলাম। শালা বাসে এক টাকা নিয়ে যা ক্যাচাল করে, সেই লোক এইখানে করছে পুকুর চুরি। হায় কি বিচিত্র! আমি একরাশ ক্ষোভ মনে পুষে হাঁটা শুরু করলাম। রিকশা নিয়ে খরচের পরিমাণ আর বেশি বাড়িয়ে বড়দির চোখে আর ছোট হবার চেষ্টা করলাম না। হঠাৎ মনে খচখচ করে উঠল- নিজেতো মেনে নিলাম। বড়দি আর জামাইবাবু না আবার আমাকে চোর ভাবে?

তিন

ক্লিনিকের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ই মোবাইলে ফোন এল। বড়দির ফোন। ফোন ধরেই বকল। আমি বকা-ঝকা শুনতে শুনতে তার সামনে গিয়ে বোতলগুলো হাতে দিলাম। জামাইবাবু এসেছেন অফিস থেকে। বললেন, ‘এতক্ষণ লাগলো?’‘আশেপাশে নেই, সেই অনেক দূর হেঁটে তবে..’'ঠিক আছে, ঠিক আছে !'অ্যাটেন্ডার আসায় আর বেশি বলতে হলো না, তবে মহিলা জিজ্ঞেস করে নিলেন সুযোগে, ‘কত করে নিলো সুরভী?’জানালাম। বললো ‘ঠিকই নিয়েছে।’ আমি বড়দির কাছে চোর হওয়া থেকে বাঁচলাম। পঁচাত্তর টাকাই ফেরত দিলাম। বড়দি রেখে দিতে বললো। রাখলাম।
সকাল আর দুপুরের খাবার আমি এক সাথেই নিয়ে আসি। সন্ধ্যায় বাসায় গিয়ে আবার রাতের খাবার নিয়ে আসি, তারপর বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় বারোটা। বেশ একটা রুটিন হয়ে গেছে আমার। এই রুটিনের মধ্যে মিনির বকা-ঝকাটাও অন্তর্ভূক্ত। মিনি আমার গার্লফ্রেন্ড। আমার মত বেকার ভবঘুরেরও গার্লফ্রেন্ড থাকতে পারে সেটা অনেকে মেনে নিতেই পারে না। চাকুরীজীবি বন্ধুরা তো মোটেও না। আমি বলি, ‘ কবিতা লিখি তো, কবিরা সহজেই মেয়ে পটাতে পারে।’ কিন্তু সত্যি কথা বলি না, বলি না যে আজও আমার একটা কবিতাও মিনি পড়ে নি। মেয়েরা ওসবে পটে না। পটে- কারণ ওরা পটতে চায়। বেকার, চাকুরে বা শিল্পপতি সেখানে কোন ফ্যাক্টরও নাই। যদি কোন ছেলে আবিষ্কার করে ফেলে কোন মেয়ে তার জন্য কেন পটেছে, তবেই হয়েছে, ও পথ তার জন্য শেষ। আর কেউ পটবে না। কেন? সে এ রহস্য...
মিনিও তাই কেন পটেছে আমি ভাবি না। আমি মিনিকে নিয়ে হ্যাপি। যদিও গত পাঁচদিন ধরে তার সাথে দেখা নেই। কথাও বলি হাসপাতালে ফাইফরমাশ খাটার ফাঁকে ফাঁকে। মিনি বারবার কথায় ছেদ পড়ায় খেপে যায়। বলে, ‘তুমি কি চাকর নাকি, তোমার মাসীমা’র আর কেউ নেই’।
‘মাসীমা আবার কে?’ ‘তোমার বড়দির শাশুড়ি তোমার কি হয়?...’আজ সন্ধ্যায় দেখা করব কথা দিয়েছি। এক বান্ধবীর বাসায় যাবে নোট নিতে। ফেরার সময় আমার থাকার কথা গুলশনের "হোলি আর্টিজান বেকারি"তে। আমি বেজায় খুশি। কিন্তু হাতে কোন টাকা পযসা নেই তেমন।
মা সারাক্ষণ বকে। মাষ্টার্স পাস করে বসে আছি। চাকুরীর চেষ্টা করি কিন্তু পাই না। আদৌ পাবো কিনা সেটা নিয়েই মা বেশি চিন্তিত। বলে মামার সাথে দোকানে বসতে। আমার বাবা নেই। বাবা মারা যাবার পর মামাই দেখাশোনা করেছেন। মীরপুরের বড় রাস্তার ধারে মামার দুটো দোকান। একটাতে নিজে বসে। ওটা একটা কনফেকশনারির দোকান। খুব চালু। আমার বসতে ইচ্ছে করে না। মামাও চায় না আমি দোকানদারি করি। মামার কাছ থেকে তেমন একটা টাকা পয়সা চাই না আমি। মাস ছয়েক আগে একদিন দোকানে গিয়ে হাজির হলাম সকাল সকাল। মামা তো অবাক। বললাম দোকানদারি করার টেস্ট দিতে এসেছি। মামা হাসলেন। দুপুর হতেই বললেন, ‘বাসায় যা, আর কি দরকার বল?’মামা বুঝতে পেরেছে তাতে আমি অবাক হই নি। বরং বললাম, ‘আমার হাজার পাঁচেক টাকা লাগবে।’ উনি বিনা বাক্যে দিয়ে দিলেন। কেবল বললেন, ‘তোর লেখালেখি কেমন চলছে? গল্প গুলো তো ভালোই লিখিস। একটা বই-টই বের কর। টাকা লাগলে আমি দেবো।’বললাম, ‘ সময় হয়নি এখনও।’টাকাটা দিয়েছিলাম শিবু নামে এক অটোওয়ালাকে। শিবু অ্যাকসিডেন্ট করেছিল। খারাপ রাস্তায় উল্টে গেছিল ওর অটো। আঘাত লেগেছিল ঠিক দুটো হাঁটুর মালাইচাকির উপর। হাসপাতালে শুয়ে ছিল বেশ কিছুদিন। ডাক্তার বলেছে আর কোনদিন ও অটোরিকশা চালাতে পারবে না।
শিবুর ছোট্ট একটা ছেলে আছে। চার বছর বয়স। আমি যেখানে রোজ চা খাই সেই দোকানের পেছনে একটা ঘিঞ্জি ভাড়াবাড়িতে ও থাকে। ছেলেটাকে নিয়ে দোকানে আসতো। আমি চকোলেট কিনে দিতাম। শুনলাম ওদের পরিবারে খাবার কোন সংস্থান নেই ক’দিন ধরে। এক অ্যাকসিডেন্টে এক পরিবার অনাহার- হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারি না! ওর জন্যই টাকাটা নিয়েছি মামার কাছ থেকে। যুবনেতার ভাই আমার পরিচিত। তাকে বলে একটা পান-বিড়ির দোকান ব্যবস্থা করেছি। আটশো টাকা ভাড়া আর রোজ কমিশন বিশ টাকা। বাড়তি তেমন অ্যাডভান্স দিতে হোলো না। কেবল এক হাজার ভাড়া অগ্রিম দিতে হলো। বাকী টাকা দিলাম পুঁজি হিসাবে। ব্যবসা ভালো হচ্ছে। ছ'মাসে জমিয়ে দোকান বানিয়েছে। শিবু পরিশ্রমী লোক। ও অবশ্য আমার কাছ থেকে সাহায্য নিতে চায় নি। শেষে আমি সমাধান করে দিয়েছি, বলেছি রোজ আমাকে পঞ্চাশ টাকা করে দিতে। ভালোই হয়েছে আমার চা সিগারেটের টাকাটা চলে আসে।...গত এক সপ্তাহে কোন টাকা নেওয়া হয়নি। দেশের যে অবস্থা কি জানি লাভ করতে পারছে কিনা। আমি তাই যাই না। লস হলেও সে আমাকে টাকা ঠিকই দেবে আমি জানি...যাক, বড়দির পঁচাত্তর টাকা আর সকালে মায়ের দেওয়া একশো টাকা থেকে এখন আছে আশি টাকা। "হোলিতে" কফি খাওয়ার টাকা হয়ে যাবে।
মনে বেশ আনন্দ। বিকেল হতেই সব খাবার পাত্র নিয়ে রওয়ানা হলাম। আগামী কাল আবার অবরোধ ডেকেছে, বড়দি বলল, ‘দেরী করিস না, তাড়াতাড়ি চলে আসিস’।
নিচে নেমে কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে সেই প্রথম ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। ছেলেটা একা দোকানে। ভীড় নেই। এগিয়ে গেলাম, ‘ভাই সুরভীতেই পেয়েছিলাম স্যালাইন, ব্যাটারা ডাকাত একটা...’
ছেলেটা হাসল। বলল, ‘আরে আপনারা যে ক্লিনিকে গেছেন ঐটাও ডাকাত। দেখুন না এমন সব ওষুধের নাম বলে একটাও অ্যাভেলেবল না। আর দেখুন ঐ পাশের ঐ ক্লিনিক, যা ওষুধ লেখে সব আমাদের এখানে পাওয়া যায়।’
বললাম, 'ওহ! তাই। তার মানে কি আপনাদের সাথে ঐ ক্লিনিকের চুক্তি আছে মনে হয়...’
‘তাতো আছেই কিন্তু আমরা দাম বেশি রাখি না।’"হোলি আর্টিজান বেকারি" তে বসে একটা কফি নিলাম।মিনি কিছু বাদেই এসে পড়বে। হঠাৎ একটা শোরগোল শোনা গেলো। বোম পড়ছে।লোকজন দৌড়োচ্ছে। ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের দল ছুটে বের হয়ে যাচ্ছে বেকারি থেকে।" আল্ লাহ্ আকবর" ধ্বনি দিতে দিতে ছ'টা সশস্ত্র ছেলে ঢুকলো দেখলাম দরজা দিয়ে।আমি ভেতরে ছিলাম।ছুটে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম।

চার

কি করব বুঝতে পারছিলাম না। আমি তো কলমা জানি না।বাঁচবো কিভাবে?সূর্যটা ঢলে পড়েছে আঁধার এসে শাসন করতে শুরু করেছে চারপাশে। পোড়া গন্ধ নাকে লাগছে। কানে আসছে -"কলমা পড়,নয়তো---" বা "হিজাব নেই কেন?" ঠকঠক করে কাঁপছি মৃত্যুভয়ে।মিনির সাথে আর হয়তো দেখা হবে না এ জীবনে। মা মাগো আর তোমায় দেখতে পেলাম না মা! ওপাশে জান্তব উচ্ছ্বাস ভেসে আসছে।মাঝেমাঝে মরণ আর্তনাদ।কারোর কাকুতি-আমি তো এ দেশেরই।তবে আমায় কেন--তার আগেই তরোয়ালের শাণিত ধ্বনি।বাথরুমের জানলার কাঁচ ধীরে সরিয়ে কোনমতে বাইরে দিলাম ঝাঁপ।পিঠটা কাঁচে লেগে চিরে গেলো।মাটিতে বেকায়দায় পড়ে পা টা ভেঙে গেল।পাশে ছিল একটা পচা অগভীর নর্দমা।তার মধ্যে গড়িয়ে পড়লাম।আর তারপাশে একটা ঝিল।গন্ধে টেঁকা যাচ্ছে না।আর পায়ে তেমন যন্ত্রণা।মুখটা একটু তুলে দেখলাম আশেপাশে অনেক পুলিশ। মিনির কথা মনে পড়ল। মোবাইলটা হাতে নিলাম। জল ঢুকে গেছে।ওর কল এসেছিল। টের পাইনি। দ্রুত মেসেজ করে দিলাম অবস্থান জানিয়ে।ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল।পরিশিষ্ট
কিছুপরে দুটো মুখ ঢাকা ছেলে একে-৪৭ হাতে নিয়ে দেখতে এসেছিল এদিকে কেউ আছে নাকি ! আমি কোনমতে নাকটা ভাসিয়ে সারা শরীর ডুবিয়ে রেখেছিলাম। দৌড়ে ভেতরে চলে যাবার আগে একবার গুলিবর্ষণ করল।ডানকাঁধে এসে একটা গুলি লাগলো।প্রাণের ভয়ে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করলাম।আর কিছুক্ষণ জ্ঞান ছিলো। ডানহাতটা নাড়াতে পারছিলাম না অবশ হয়ে গেছে।আমি কল্পনায় মিনির সুন্দর মুখটা দেখতে পাচ্ছিলাম , সেখানে সুন্দর দুখানি টানাটানা চোখে জল ঝরছিল আমি স্পষ্ট দেখছিলাম।মিনি মেসেজ পেয়ে একটুও দেরী করেনি। মামাকে জানানো মাত্রই মামা ছুটে এসেছিলেন। ততক্ষণে সেনারা আমায় উদ্ধার করেছেন।আমাকে কাছেই একটা ক্লিনিকে নেওয়া হয়েছিল। মিনি আসতে চেয়েছিল। মামা ওকে দোকানের এক কর্মচারীকে দিয়ে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন জোর করে। মামা বুঝেছিলেন বিষয়টি। উনি সব বোঝেন। উনি তো কর্তা। কেবল দেশের কর্তা-কর্ত্রীরা কিচ্ছু বোঝেন না। মিনি পরদিন সকালে এসেছিল।
একটু সুস্থ হয়ে দুদিন পরে ভাঙা হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে বাসায় ফিরলাম। বড়দি বা জামাইবাবু কেউ একবারও দেখতে এলো না। প্রথম রাতে মা একবার এসেছিলেন, খুব কেঁদেছিলেন।

পরিশিষ্ট

..ঘরে ঢুকে দেখি বড়দি এসেছেন। খুব মেজাজে মাকে বলছেন, ‘এইডা কোন্ দ্যাশ হইলো। কোন স্বাধীনতা নাই। ইণ্ডিয়ায় এমন হয় শুনছি। শালারা লোক মারনের আর সময় পাইলো না। আর ওই বা ক্যাবলাটার মতো বড়মাইনষের কাফেতে মরতে ঢুকছিল ক্যান?শাশুড়ির এদিকে এই অবস্থা! ওরে তোমরা কি কারণে যে এত টাকা পয়সা দাও?বুঝি না বাবা! ওরা কি ভাববো? এত কাছে আমার বাপের বাড়ী। একটু খাবারও ওর মার জন্য পাঠাইতে পারতাছো না। বলোতো মুখ থাকে আমার। তুমিও তো একটু কষ্ট করে নিয়ে গেলেই তো পারতা মা!!’বেজায় ক্ষুব্ধ হলাম। কিন্তু মায়ের মুখ চেয়ে বললাম, ‘বড়দি আজ থেকে আমি আবার নিয়ে যাব । ও কাজ তো এক হাতেও করা যায়।’
হঠাৎ মা বললেন, ‘আর কয়দিন থাকবো তোর শাশুড়ি হাসপাতালে?ঐ কয়দিন তুই ই দিস।আমরা আর পারুম না।'
চলে যাবার আগে বড়দি রোষকষায়িত দৃষ্টি আমাদের উপর হেনে দুম করে দরজাটা বন্ধ করে বেড়িয়ে গেলো !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন