রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০১৬

চাওয়াতে পাওয়ার শেষ নয়

চাওয়াতে পাওয়ার শেষ নয়

____________________শিবাশিস্ আচার্য

ফ্ল্যাশব্যাক...অনেকদূর থেকে একটা আবছা অবয়ব "রুদ্র! রুদ্র!!" বলে ডাকছে..না চিনতে পারার একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা....আধো-ঘুমে অনেকগুলো দৃশ্য যেন পরপর চলে গেল রুদ্রের মাথায় ঝিলিক্ দিয়ে...কোন ঘটনাই যেন কোনোটার সাথে যোগ করা যাচ্ছে না...প্রত্যেকটাই যেন অদৃশ্য কোন সুতো দিয়ে বাঁধা...উদভ্রান্তের মতো চিৎকার করে জেগে ওঠে সে,"যাও! চলে যাও!! চলে যাও বলছি!!"...তারপর আবার গোঙাতে গোঙাতে ঝিমিয়ে পড়ে সে....
....
......
রুদ্রাশিস ভট্টাচার্য,একজন মনোরোগী..এটাই তার এখন একমাত্র পরিচয়...সারাদিন কি যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে সে...আর দুলে দুলে কাগজে যেন কি আঁকিবুঁকি কেটে চলে আপনমনে..
...
একমাত্র ছেলের এই অবস্থা দেখে চোখে আঁচল দেন কান্তিময়ী দেবী।প্রথম যখন ধরা পড়ে এ মনোবিকার,দিশেহারা হয়ে গেছিলেন তিনি।স্বামীকে হারিয়েছেন গত বছর!! আর এক বছরের মাথাতে এ কি ঘটনা!! অথচ...
....
....."কেমন দেখলেন ডাক্তারবাবু?আমার রুদ্র সুস্থ হয়ে যাবে তো?ও ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই....!!!"বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েন কান্তি দেবী।
ডঃ জুবিন মেহ্তার তত্ত্বাবধানে রয়েছে রুদ্র।অবাঙালি হলেও বাংলাটা ভালোই বোঝেন তিনি কর্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গে থাকার সুবাদে।অভয় দেন তিনি কান্তিদেবীকে।
"এটা খুবই সিম্পল কেস ম্যাডাম।ঘাবড়াবেন না।রুদ্রের কেস হিস্ট্রিটা দেখেছি আমি।একটা ঠিকঠাক কাউন্সেলিং দরকার ওর।সব ঠিক হয়ে যাবে।ওর এই ঘটনাটা যেদিন ঘটে,তার আগের ঘটনা ডিটেইলসে বলুন দেখি আরেকবার।"...
....রুদ্ধকণ্ঠে বলতে থাকেন কান্তি দেবী....
.......
......
.......
"রুদ্র! রুদ্র!! মাই পুওর বয়!! ডু ইউ হিয়ার মি, ডিয়ার ?"....
ওহ!! আবার সেই ডাক!!...
চোখটা এতো ভারী লাগছে কেনো?....
সামনে সাদা অ্যাপ্রন পরা কে যেন দাঁড়িয়ে!!...
নাঃ!!তাকাতে খুব কষ্ট হচ্ছে!!...
এ কি!! ওখানে কে দাঁড়িয়ে আছে?...
না!না!!তুমি এখানে কেনো?...
যাও!চলে যাও!!...
আই কান্ট টলারেট ইউ!!....
.....অদম্য এক আক্রোশে চিৎকার করতে থাকে রুদ্র।
সিস্টার!!সিস্টার!! হারি আপ!! পুশ হিম দ্যাট ইঞ্জেকশন্!!....
রুদ্র!!রুদ্র!! প্লীজ,কাম ডাউন!! কাম ডাউন!! মাই চাইল্ড!! ডোন্ট প্যানিক!! দেখো এখানে তুমি আর আমি ছাড়া কেউ নেই।প্লীজ রুদ্র,কো-অপারেট উইদ আস!!....
....আস্তে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে সে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
....
.....
ধীরপদে ডঃ মেহ্তা বেরিয়ে আসেন অবজার্ভিং রুম থেকে,যেখানে মোহাচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছে রুদ্র।নিজের অফিসে এসে পাইপটা ধরিয়ে রিভলভিং চেয়ারটায় বসে দূরের দিকে তাকান তিনি।
...
....
কি বিচিত্র মানুষের এই মন...কত আবেগ ই না জমা হয়ে আছে সেখানে...তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে কখনো বসন্তের হিল্লোল আবার কখনো বা বর্ষার বারিধারা একাকী মনে...মন-সামিয়ানার তলায় কখন যে কাকে বৃণিতে ইচ্ছা জাগে তা একমাত্র সে ই জানে..এই আবেগের তাড়নেই মন সুন্দরের পূজারী...
....
....
রুদ্র ও বোধকরি তার প্রিয় কারোর কাছে আঘাত পেয়েই আজ এই অবস্থায়।কান্তিদেবীর বক্তব্য ও কেস হিস্ট্রি কিন্তু তেমন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে না।সেদিন কান্তিদেবীর কথাতেও তো তেমন কিছু পাওয়া গেলো না!!...
....
.....
রুদ্রাশিস্ ভট্টাচার্য,প্রেসিডেন্সী কলেজের ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ছেলে...ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে ইংরাজীতে মাস্টার্স করতে আসা,বন্ধুদের প্রিয় একটি ছটফটে যুবক...কত না আনন্দের দিনগুলো...ক্লাসশেষে আড্ডা..কোনদিন নন্দন তো কোনদিন কফি-হাউস কোনদিন বা কলেজের নস্ট্যালজিক সিঁড়িতে বসে গান-মাউথ অর্গ্যানে তোলা সুর-আড্ডা-গল্প-চা-ঝালমুড়ি-বাদামভাজা...দিনগুলো রাজহাঁসের মতো ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছিলো...পড়াশোনা-বন্ধুবান্ধব-পরিজন নিয়েই কেটে যাচ্ছিল...
....
......
মাঝে মাঝে কান্তিদেবী লক্ষ্য করতেন রুদ্র কেমন যেন আনমনা...এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করলে "ও কিছু নয়" বলে হেসে উড়িয়ে দিতো..বেশি জোরাজুরি করলে যদি রেগে যায় সেই ভয়েও আর তেমন কিছু বলতেন না...
মাঝে স্বামী হঠাৎ গত হলেন...বাবার হঠাৎ এইভাবে চলে যাওয়াটা খুব বেজেছিল রুদ্রের বুকে...আরো অন্তর্মুখী হয়ে পড়ে সে...চোখে আঁধার দেখলেন কান্তিদেবী...শেষে ছেলেকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচার স্বপ্ন দেখলেন....ছেলের এইধরনের অন্তর্মুখীতা দেখে মাঝে ছেলেকে একদিন বলেছিলেন,"হ্যাঁ রে!! মাঝে মাঝে বন্ধুদের ও ডেকে গল্প করতে পারিস তো,নাকি?"রুদ্র হেসে উত্তর দিয়েছিলো,"এই মফস্বলে কেউ আসবে না মা!!!"..."কি জানি বাবা,আজকালকার ছেলেদের যে কি মতিগতি!!!ভাবেন তিনি...
.....
.......
সেইদিন ছিল পয়লা মে...মহাজাতি সদনে নচিকেতার প্রোগ্রাম দেখে ফিরবে বলে দুপুরের দিকে বেরিয়েছিলো রুদ্র...বিকেল থেকে বাঁধভাঙা বৃষ্টি..কি জানি ছাতা নিয়ে বেরিয়েছে কিনা?...রাত দশটায় কাঁপতে কাঁপতে বাড়ী ফিরলো রুদ্র..যা ভয় করেছিলাম একেবারে ভিজে ফিরেছে...শিগগির ছাড় জামা-কাপড়, ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে...আমি কিছু খাবো না মা, বাইরে খেয়ে এসেছি--বলতে বলতে নিজের ঘরে ঢুকে ঘরের দরজা দিয়ে দেয় সে...ওষুধ খাবি কিছু...না আছে এখানে..কেমন অস্বাভাবিক শোনাচ্ছে গলাটা..ভিজেছে বোধহয় তাই..যাইহোক ঘুমোক এখন...পরদিন সকালে ন'টা বেজে গেছে তাও রুদ্র দরজা খোলে না দেখে কান্তিদেবী দরজায় হাত দিয়ে ঠেলতেই...এ কি!!দরজা তো খোলা!!রুদ্র উঠলো কখন?...এ..এ..এ..কি রুদ্র!!কি হয়েছে তোর?এ রকম করছিস কেনো?...কি হয়েছে বল?..কি বিড়বিড় করছিস?..কি হয়েছে?...কাগজে কি এগুলো?...চোখ তোর লাল কেনো?...বল বাবা বল!!! কি হয়েছে?..তোর গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে!!!...ছেলেকে ধরে ঝাঁকাতে থাকেন তিনি....
....
.......
কিছুদূরে থাকেন ডঃ নন্দী।তার বাড়ীতে গিয়ে তার নাম ধরে ডাকতেই বেরিয়ে এল ওনার মেয়ে শ্রীপর্ণা।...আসুন আসুন কাকীমা..কি হয়েছে?এই মা-মরা মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই তার কাছ-ঘেঁষা।তাকে দেখেই কেঁদে ফেলেন...কি হবে মা শ্রী?...রুদ্র!!!...আর বলতে পারেন না তিনি কান্নার আবেগে...ডঃ নন্দীকে ঘটনাটা বলতেই তিনি চলে এলেন বাড়ীতে...ভালো করে চেক করে বললেন,"বৌদি!! ইট ক্যুড বি আ কেস অফ মেন্টাল ডিসব্যালেন্স..আমি আপাততঃ জ্বর কমাবার ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি...আপনি ইমিডিয়েট ডঃ মেহ্তার সাথে দেখা করুন...আমার দৃঢ় ধারণা উনিই এ ব্যাপারটা ভালো বুঝবেন ও ট্রিট করবেন....উনি একজন বিলেত ফেরত নামজাদা কাউন্সেলার...আপনি বেশি দেরী করবেন না,এই ফোন নম্বরে ফোন করে ইমিডিয়েট ওনার সাথে কনসাল্ট করুন..."
....
......
ডঃ !! শিগগির আসুন ! পেশেন্ট কেমন করছে!! --সিস্টারের ডাকে সংবিৎ ফিরলো ডঃ মেহ্তার।কেনো কি হয়েছে?চল তো দেখি!! ও মাই গড!! এতো মাসল্ ক্র্যাম্প হয়েছে..সিস্টার কুইক্!! হট-কোল্ড কম্প্রেস ইন হিস্ রিউম্যাটিক্স.. হারি আপ!!!!....
.....
কিছুক্ষণ বাদে সুস্থ হয়ে ওঠে রুদ্র।
....
......দিন যায়...একটু একটু করে ডঃ মেহ্তার চিকিৎসায় সাড়া দিতে থাকে রুদ্র।কিন্তু আসল সিম্পটমস্ টাই তো এখনো জানা বাকি!!!কি রহস্য লুকিয়ে আছে ঐ পয়লা মে দিনটিতে জানতে তো হবেই তাকে নইলে সম্পূর্ণ সুস্থ রুদ্র কোনদিনই হবে না।
...
....
রুদ্র! রুদ্র!! আমার কথা শুনতে পাচ্ছো তুমি?...ব..বলুন শু..শুনছি আধোঘুম জড়ানো গলায় বলে রুদ্র...তুমি মাউথ অর্গ্যান বাজাতে ভালোবাসো?...হ্যাঁ...আর কে ভালোবাসতো?...অ..নে..কেই...যেমন?..পর্..পর্...আহ্!! আমি বলতে পারছি না!!..আশার আলো দেখলেন ডঃ।
তাকে প্রথম কোথায় বাজিয়ে শোনাও?...ই..ডে..ন..!!প্রথম কোথায় দেখেছিলে তাকে?..ই..উ..নি..!!ব..ই..মে..লা..!!নন্..দ..ন!!...
নাঃ!! এখন থাক।বিকেলে তার বিশেষ শেখা বিদ্যাটা কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করবেন।তাতেই বোধকরি অনেক কাজ হবে।যতদূর বোঝা যাচ্ছে কেসটা নারীঘটিত।কিন্তু ঘটেছে টা কি রুদ্রের সাথে?প্রতারণা নাকি অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যাওয়া?কিন্তু রুদ্রের মতো ব্রাইট ফিউচার ছেলের ভাগ্যে...সত্যিই কবিরা ঠিকই বলেছেন,"প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে"..নাঃ ইন্টারেস্টিং...বিকেলেই চেষ্টা করে দেখতে হচ্ছে.....
.....
.......
Washington Medical School-এ পড়াশোনা করার সময় প্রফেসর Richard Osterlind-এর সাহচর্য ডঃ মেহ্তাকে এই বিদ্যাশিক্ষায় সহায়তা করেছিল।মনস্তত্ত্ববিদ্যা নিয়ে রিসার্চ করার সময় Neuro-Hypnotism-এর কিছু কৌশল তার আয়ত্ত্বে এসেছিল।সেই বিদ্যাই আজ তিনি রুদ্রের উপর প্রয়োগ করে জানবেন তার ঐ দিনের ইতিহাস।সম্মোহন করে মানুষের মনের পুরোনো দুঃখের কথা জেনে চিকিৎসা করাই এই বিদ্যার উদ্দেশ্য...এই কথাই একা একা বসে ভাবছিলেন ডঃ মেহ্তা...
...."মে আই কাম ইন ডঃ মেহ্তা?"রুদ্রের ডাকে হুঁশ ফিরলো ডাক্তারের..
"ও!! এসো এসো, রুদ্র!! আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম..."
রুদ্র ঘরে ঢুকে দেখলো রেস্টরুমটাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।ঘরের এককোণায় একটি ছোট্ট টুলে একগোছা টাট্কা রজনীগন্ধা ফুলদানিতে সাজানো রয়েছে।ঘরের আরেক কোণায় খুব সুন্দর গন্ধের ধূপকাঠি জ্বলছে।আর সেন্টার টেবিলে মোহময় রাগসঙ্গীতের মূর্চ্ছনা যেন মনকে কেমন আবিষ্ট করে দিচ্ছে...
ডঃ মেহ্তা উঠে গিয়ে রুদ্রকে ধরে একটি ইজিচেয়ারে বসিয়ে দিলেন...
"আজ কেমন লাগছে তোমার,রুদ্র?"
"আই ফিল মাচ বেটার ডঃ!!"
"ভেরী গুড!! আই নো দ্যাট ইউ উইল ওভারকাম দ্যাট হ্যাজার্ড!!"
"আমায় এখানে ডাকলেন কেন ডাক্তারবাবু?"
"এমনি গল্প করার জন্যে..!! কেন গল্প করতে তোমার ভালো লাগে না?"
"আমার জীবনের আবার গল্প..."
"কেন এই হতাশা?শেয়ার করবে আমার সাথে?বলো না শুনি?"
"কি লাভ শুনে?"
"তবুও শুনি না...বলো বলো!!"
"না!! থাক আমি উঠি এখন!!!"
....ঠিক এমনটাই হবে জানতেন ডঃ মেহ্তা....এই পেশেন্টরা একটু অ্যারোগেন্ট স্বভাবের হয়...চট্ করে উঠে গিয়ে রুদ্রের কাঁধে হাত রেখে বললেন,"উঠো না প্লীজ!! ঠিক আছে ঐসব কথা বাদ দাও।অন্য গল্প করি আমরা,কেমন!!"..রুদ্র বসল..."আচ্ছা রুদ্র,তুমি নাকি ভালো হারমোণিকা বাজাও?তোমার মা বলছিলেন!!"মাউথ অর্গ্যানের শুদ্ধরূপ শুনে রুদ্র নড়েচড়ে বসল..."ওই একটু আধটু আর কি!!"...শিখেছো কোথাও?....না না!! শখে বাজাই!!...বাবাকে তোমার মনে পড়ে?...প্লীজ ডঃ মেহ্তা!! লিভ দ্যাট ম্যাটার!! প্লীজ!!..ওকে!ওকে!! তোমার শরীর কি খারাপ লাগছে,মাই বয়?...রুদ্রের কাঁধ ধরে ইজিচেয়ারে আধশোয়া করিয়ে দিলেন ডঃ..একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো,রুদ্র!!...ঘুম আসছে না ডঃ মেহ্তা...আচ্ছা এই দোলকটার দিকে তাকাও,মাই বয়!!ঘুম এমনিতেই এসে যাবে...এই বলে ডঃ মেহ্তা রুদ্রের চোখের সামনে দোলাতে লাগলেন দোলকটা..আস্তে আস্তে ফুল আর ধূপের গন্ধে-মোহময় মূর্চ্ছনায় আর ডঃ মেহ্তার "ঘুমিয়ে পড়...ঘুমিয়ে পড়" বারবার বলতে বলতে দোলক দোলানোতে চোখের পাতা ভারী হয়ে ঘুম নেমে এলো রুদ্রের...
.....
.......
........
"রুদ্র!! রুদ্র!! আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?"কোন উত্তর না পেয়ে বিন্দুবিন্দু ঘাম দেখা দেয় ডাক্তারের কপালে...তাহলে কি তিনি অকৃতকার্য!!!....আবার চেষ্টা করলেন তিনি..রুদ্রের শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠল...ক্ষীণস্বর শোনা গেলো--- বলুন ডঃ মেহ্তা...হারমোণিকা শুনতে বেশী ভালোবাসতো কে?...মধুপর্ণা...পুরো নাম...মধুপর্ণা মেহ্তা...
!!!!
!!!!!!!
!!!!!!!!!!!কানে কে যেন গরম সীসে ঢেলে দিলো ডঃ মেহ্তার কানে!!!....আকাশ ফাটিয়ে কাছাকাছি কোথাও যেন বাজ পড়লো!!!...নাঃ অধৈর্য হলে চলবে না...এই সেই স্কাউন্ড্রেল!!!...বাগে পেয়েছি আজ!!...মধু-র জীবনটা তাহলে এ-ই নষ্ট করেছে!!...অঝোরে বৃষ্টি নামলো.....
!!!!!!
!!!!!!!!!
তোমার সাথে ওর কোথায় দেখা হয়েছিল?..ও ছিলো সাইকোলজির স্টুডেন্ট....প্রেসিডেন্সির ফেস্টে প্রথম দেখা... বান্ধবী শাশ্বতীর সাহায্যে প্রথম কথা হওয়া... চলে যেতে যেতে আবার ফিরে তাকানো... মায়াময় সেই দৃষ্টি... আবার দেখা বইমেলায়...সুখস্মৃতি.... প্রথম তিনটি শব্দের ম্যাজিকাল বাক্য বলা... চোখে চোখ রেখে হারিয়ে যাওয়া...
একসাথে কাটানো মুহূর্তগুলোতে মধুপর্ণা কখনো হাত ছাড়তে চাইতো না... বাচ্চাদের মতো সারাক্ষণ হাত ধরে থাকতো....আমি মাঝে মাঝে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করতাম,
- " সমস্যাটা কি তোমার ? এভাবে বাচ্চাদের মতো সারাক্ষণ হাত ধরে থেকে কি মজা পাও বলো তো ? "
মধু দু'হাতে মুখ ঢেকে বলত,
- " সেটা যদি বুঝতে ! "
- " তো বুঝিয়ে বল ! "
দু'হাতে আমার মুখটা ধরে নিজের দিকে ফেরাতো মধু...
তাকিয়ে রইতো কিছুক্ষণ... অপলক...
- " তোমাকে হারানোর ভয়টা সারাক্ষণ আমার মধ্যে কাজ করে। তুমি বোঝো না?"
মৃদু হেসে এলো চুলগুলো সরিয়ে বলতাম-এতো ভয় কিসের তোমার ? এই তো আমি আছি। একদম তোমার কাছে !
....কাঁদতে কাঁদতে বলতো,তুমি তো জানো না, দাদা আমাদের সম্পর্কটা মানবে না!! অমত করলে দুজনকেই খুন করাবে বলেছে!!! আমার খুব ভয় করছে রুদ্র, কি হবে?
- " তুমি আমায় ভালোবাসো তো, রুদ্র?
গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরতাম তাকে...অভয় দিতাম ওকে..ওঃ!! একবার জানোয়ারটাকে যদি হাতের কাছে পেতাম..
.....অস্থির হয়ে উঠলো রুদ্র...
.....না একটু সময় দিতে হবে রাস্কেলটাকে...
....ধীরে ধীরে জানতে হবে পয়লা মে র কাহিনী...
.....ফিরিয়ে আনলেন তাকে ধীরে ধীরে বাস্তবের জগতে...
....অঘোরে ঘুমোচ্ছে রুদ্র...
ঘুমোক....
পাশের ঘরে গিয়ে বসলেন পাইপ ধরিয়ে...
.....আজ মধুর সাথে শেষ কথাগুলো খুব মনে পড়ছে....
...মধু তুই ঐ চালচুলোহীনটার সাথে মিশবি না...বলে দিলাম...কি আছে ওর...আর যদি কোনদিন ওর সাথে তোকে দেখি বা কারোর কাছে শুনি তোদের মেলামেশার কথা তবে কিন্তু "অনার কিল" করতেও আমার বাধবে না....ডঃ মেহ্তার জামাই হবে ঐ ভ্যাগাবন্ড!!! নো ওয়ে!!!
....ঠং...ঠং....ঠং.... একটা তীক্ষ্ণ ধাতব আওয়াজে সংবিৎ ফিরলো ডঃ মেহ্তার...কি হলো...পড়ে গেলো নাকি...একি রুদ্র কোথায় গেলো,এই বৃষ্টিতে?....ফুলদানিটা হাওয়ায় পড়ে গেছিলো...তুলে রাখলেন ডঃ....যাকগে মরুক গে!! এখন অনেক কাজ ওনার..জন্মের শোধ তুলতে হবে ওর ওপর...ভুলে যাবেন তার সাথে রুদ্রের সম্পর্ক....ভুলে যাবেন রুদ্রের মাকে দেয়া কথা....তার বোনের জীবন নষ্টকারীর তার কাছে কোন ক্ষমা নেই.....
চরাচরে প্লাবন এনে দেওয়ার মতো বৃষ্টি ঝরছে আজ...ঠিক সেদিন যেমন ঝরেছিলো...মনের আগুন কই আজও তো নিভলো না তার...বৃষ্টিভেজা শহরের রাস্তায় কান্নাভেজা মনে একাকী হেঁটে চলেছে রুদ্র...মনের আকাশও যে তার আজ উথাল-পাথাল...নেমেছে সেখানেও বৃষ্টি...ঝরছে দু'চোখ বেয়ে...
দুপুরে আজ ডঃ মেহ্তার ল্যাবের টেবিলে যা দেখেছে সে...!!! এতো সহজে ভুলতেও যে পারছে না সে, সেইদিনের কথা...আজকের দৃশ্যের সাথেও...
...
..সমকালীন কবির কয়েকটি ভালোলাগা পংক্তি আজ বারবার তার স্মৃতিদুয়ারে কড়া নাড়ছে...যা তাদের দুজনেরই প্রিয়...
....
......"আয়ুহীন ধাতু মেখে ছুটে আসে তীর,অশনি ছোঁয়ার আগে ছুঁই তবে,মধু ও মুহূর্ত ভরা তোমার শরীর !!"
...
..কেন?..কেন?..কেন চলে গেলে মধু...আমাকে এমন নিঃস্ব করে দিয়ে...
...
....."জগতের মায়াডোরের বাঁধনে বেঁধে লাভ কি পেলে সই?/তোমা বিহনে এ শূন্য পরাণে কেমন কইরা রই !!!"..সহজিয়া আউলিয়া গানের স্মরণে তার মনের চিতা নেভাতে চাইলো সে...!!!
....
কিন্তু "ভ্রূ-পল্লবের আহ্বানে" যার সাথে চিরমিলন সংঘটিত হত "চন্দনের বনে"...সে যে আজ....নাহ্!! আর ভাবতে পারছে না রুদ্র !!
...
...."প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস্ তোরা,ভেঙেছিস্ ঘর-বাড়ি;
সে কথা কি আমি জীবনে-মরণে,কখনো ভুলিতে পারি?
আদিম হিংস্র মানবিকতার,যদি আমি কেউ হই;
স্বজন-হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবোই !!!"....
.....বৃষ্টির মধ্যেই কান্নাভেজা মনেই অদম্য প্রতিজ্ঞা করে সে....
...পৃ...থ্বী...রা...জ.... মে...হ্তা!! তুমি সাবধান !! ক্ষমা নেই তোমার !!...দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস্ করে বলে ওঠে সে...
..বৃষ্টিস্নাত অবস্থায় বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ায় সে।দরজায় নক্ করতেই...কে?..আমি রুদ্র...মা !!..রুদ্র!! এতো রা...তে!!! "তুমি দাঁড়াও কাকীমা!! আমি দেখছি!!" একটি যুবতীর রিণরিণে কণ্ঠ ভেসে আসে।
....."কে?"....আমি রুদ্র !!
....
......ম্যাজিক আই দিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে দরজা খোলে সে।...ওহ্!! শ্রীপর্ণা তুমি!!আমি ভাবলাম কে এলো আবার?....
....অবাক তো আমাদের হওয়ার কথা রুদ্রদা!!এই বৃষ্টিতে?কি ব্যাপার?
....তুই রিসার্চ ল্যাবে যাওয়ার পর থেকে ওই আমার কাছে থাকে...ছাড়্!! ছাড়্!! জামাকাপড়টা শিগগির ছাড়্ বাবা!!ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে..দাঁড়া, শুকনো জামাকাপড় দিই আগে...পরে শুনছি সব!!
..না মা !! সময় নেই!! এখুনি আমায় চলে যেতে হবে!! শ্রীপর্ণা তুমি তোমার বাবা আই মিন্ ডঃ অমিতাভ নন্দীকে নিয়ে পোলিস্ স্টেশনে খবর দাও যে মধুপর্ণা মেহ্তার রেপ্ অ্যাকিউসড্-দের ধরতে হলে ডঃ জুবিন মেহ্তার রিসার্চ ল্যাবে পৌঁছে যেতে....
.....
.......
...কি বলছিস্ রুদ্র?...কে মধুপর্ণা মেহ্তা?...কেই বা তার রেপ্ অ্যাকিউসড্?...কি যা-তা বকছো রুদ্রদা!!...আহ্!! আমি বাজে কথা বলছি না!!...তোমরা পোলিস্ নিয়ে জলদি এসো!!...
....
.......
...শোন্ বাবা শোন্!! রুদ্র!! রুদ্র!!...রুদ্রদা....রুদ্রদা...কি হবে রে শ্রী?...আমার খুব ভয় করছে যে,মা!! কি আবোল তাবোল বকে গেলো ও!!...ও যে ঠিক হয়ে আসছে ডঃ মেহ্তা তা আমায় গতকাল বলেছিলেন..কিন্তু আবার কি হলো?....
....
......
.....চলো না কাকীমা!! রুদ্রদা যা বলে গেলো,তাই করে দেখি....দাঁড়াও বাবাকে ডাকি...
.....কিছুক্ষণ পরে হন্তদন্ত হয়ে ডঃ নন্দী এলেন...কি হয়েছে বৌদি?...শ্রী বলছিলো রুদ্র নাকি এসে কি সব বলে গেছে?...আর পোলিস্ স্টেশনে যেতে বলে গেছে?...হ্যাঁ ঠাকুরপো...কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না....আহ্!! তোমরা এখনো চুপ করে বসে আছো...চলো চলো....তাড়া লাগায় শ্রীপর্ণা...
...আরে,এসো,এসো রুদ্র!! কোথায় গিয়েছিলে এই কুকুরভেজা বৃষ্টিতে?তুমি অসুস্থ এখন।ভিজলে শরীর খারাপ করবে যে!!
...আপনাকে অনেক ধন্যবাদ,ডঃ মেহ্তা আমার পূর্বজীবন ফিরিয়ে দেবার জন্য।কিন্তু কি লাভ হলো দু'টো জীবন নষ্ট করে দিয়ে বলুন?--দাঁতে দাঁত পিষে বললো রুদ্র।
....কি বলছো রুদ্র?...আমি কি করেছি?...মধুপর্ণার দাদা তো আপনি!!....আর আপনিই মধুকে খুন করিয়েছেন...কেন....কেন...বলুন?...কি অপরাধ ছিল আমাদের...
....এই দেখো!!আবার উল্টোপাল্টা কথা বলে!!নাহ্ আবার ঘুমের ইঞ্জেকশনটা দিতে হবে দেখছি!!
...নাহ্ ডঃ মেহ্তা তার আর দরকার হবে না।ইউ আর এ রেপ্ অ্যাকিউসড্!!....
...হোয়াট্ ননসেন্স!! কি পাগলের মতো প্রলাপ বকছো,রুদ্র!!কিভাবে আমি রেপ্ অ্যাকিউসড্ হলাম বল?....
....ঐ টেবিলের দিকে তাকান...বলুন ঐ নিষ্পাপ ফুলের মতো যে মেয়েটা...মধুপর্ণা...আপনার বোন নয়?...আপনি তাকে আপনার দুজন ওয়ার্ডবয় সুধীন আর আপ্পাকে দিয়ে রেপ্ করান নি?...তারপর আমাকেও তারা শেষ করতে চেয়েছিল কিন্তু আমাকে মারার আগে লোকজন এসে পড়ায় জানোয়ার দুটো পালিয়ে যায়।...আজও চোখে ভাসে কিভাবে আমাদের দুজনকে এম.জি.রোড মেট্রো স্টেশনের পাশের অন্ধকার গলিতে নিয়ে গিয়ে আমাকে দড়ি দিয়ে হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে রাস্তায় ফেলে রেখে আমার চোখের সামনে...ওহ্!! ভগবান!!...
...একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হাঁপায় রুদ্র।
....
......
..হ্যাঁ হ্যাঁ আমি-ই!!আমি-ই তোকে খুন করতে ওদের লাগিয়েছিলাম।তোর মতো একটা ভ্যাগাবন্ড-রাস্কেলের সাথে সম্পর্ক হওয়ার চেয়ে তোকে মেরে ফেলা অনেক ভালো মধুর কাছে,তাই মনে হয়েছিলো আমার।কিন্তু ওরা যে বলেছিলো মধুকে খুব কষ্ট দিয়ে তুই মেরেছিস।তুই মধুর শরীরকে জোর করে ভোগ করতে চেয়েছিলি না পেয়ে ওকে খুন করেছিস...
...না..না...মিথ্যে..মিথ্যে...ঐ জানোয়ার দুটো মধুর ওপর পাশবিক অত্যাচার করে শেষে প্রমাণ লোপাটের জন্য ওর গলার নলিটা কেটে দিয়েছিলো.....
.....তুই মিথ্যে বলছিস...হুঙ্কার দিয়ে ছুটে রুদ্রের দিকে ছুটে যান ডঃ মেহ্তা।
....স্টপ...আই সে...পোলিস্ অফিসার ঢোকেন ঘরে।
না,ডঃ মেহ্তা রুদ্র ঠিকই বলেছে।এরাই দুজন রেপিস্ট অ্যান্ড মার্ডারার...পালাবার সময় ধরা পড়েছে..আর জেরায় ওদের দোষ স্বীকার করেছে ,আরও আপনার নির্দেশেই যে ওরা এ কাজ করেছে তা বলেছে--হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় দুজন ওয়ার্ডবয়কে দেখিয়ে বলেন অফিসার..তাই ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট,ডঃ মেহ্তা ফর ভিকটিমাইজিং অ্যান্ড প্রোভোকিং রেপ্ অফ মিস্ মধুপর্ণা মেহ্তা..
..ক্রাইম ডাসন্ট পে ডঃ মেহ্তা--ধরা গলায় বলে রুদ্র।
...নো!!...নো!!...বলতে বলতে দু'হাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে মাথা নীচু করে বসে পড়েন ডঃ মেহ্তা।
...
.....
....এসো মা!!...এসো শ্রীপর্ণা!!..আসুন নন্দীকাকু...!!
...মা, তুমি আমায় জিজ্ঞাসা করেছিলে না,কে মধুপর্ণা মেহ্তা?...
..হ্যাঁ,রুদ্র!! কে সে?...আমি তাকে ভালোবাসতাম মা..বাসতাম কেন,আজও বাসি যে...
...সমস্ত ঘটনা প্রথম থেকে মা'কে বললো রুদ্র...
....
......
....পয়লা মে তারিখে আমরা দু'জনে অনুষ্ঠান দেখে গল্প করতে করতে এম.জি.রোডের দিকে আসছিলাম।ঠিক সে সময় মেট্রো স্টেশনের পাশে অন্ধকারে আমাদের দু'জনকে দু'জন লোক জোর করে ধরে পাশেই অন্ধকার-গলিতে নিয়ে যায় এবং আমার সামনেই আমার মধুকে....কান্নায় ভেঙে পড়ে রুদ্র।
শ্রীপর্ণা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে--কি করবে বলো,রুদ্রদা?দোষীরা তো সাজা পাবেই।মধুপর্ণার আত্মা শান্তি পাক...
....চোখ মুছে রুদ্র বললো--ডঃ মেহ্তার ওষুধে কয়েক সপ্তাহ আগে আমার ধীরে ধীরে পূর্বস্মৃতি ফিরে এসেছিলো।আজ বিকেলে আমি ডঃ-এর ল্যাবে যখন আসি তখন উনি ছিলেন না।হঠাৎ করে ল্যাবের অফিস টেবিলে মধুর ঐ ছবিটা দেখে আমার সব মনে পড়ে যায়।বুঝতে পারি ডঃ মেহ্তা-ই,মধুর দাদা পৃথ্বীরাজ মেহ্তা;যিনি জুবিন্ নামও ব্যবহার করেন।আমি মধুর কাছে ওনার পৃথ্বীরাজ নামটাই শুনি।এমন সময় দু'জন লোককে এ ঘরে ঢুকতে দেখে চমকে উঠি...এরাই যে তারা...আমি ভিতরের দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়ি...আর শুনতে পাই ওরা দুজন একে অপরকে বলছে,"ডাক্তারবাবু বোধহয় জানে না,ঐ রুদ্র-ই...হেঃ!..হেঃ!..হেঃ!"চোখ মারে দু'জন দু'জনকে!!!...ভাগ্যিস কাজশেষে বুদ্ধি করে রাজ্যের বাইরে ছিলাম এতদিন,নইলে ঠিক চিনে ফেলতো!!...ধুর!! ওতো পাগল এখন!!...ডাক্তারবাবুকে আগেও যেমন এর নামে সব দোষ দিয়েছি তেমন এখন আবার বললেই...বল হরি...হরি বোল্....হ্যা..হ্যাহ্...হ্যাহ্....হ্যা...করে হাসতে হাসতে চলে যায় তারা...আমিও নিষ্ফল আক্রোশে আড়াল থেকে বেড়িয়ে আসি..বিকেলে ডঃ-এর কাছে পুরোটা অভিনয় করি এবং সম্মোহনের ভান করে ওনার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে মধুর নাম উচ্চারণ করা মাত্র ওনার চমকে ওঠা দেখে স্যাংগুইন হই...ইনিই মধুর দাদা।তারপর তোমাদের কাছে যাই আর বাকিটা তো তোমরা জানোই!!!...
...হঠাৎ রুদ্র লাফিয়ে উঠে ডঃ মেহ্তাকে এলোপাথাড়ি চড় মারতে মারতে বলে,"আই শ্যাল কিল ইউ বাস্টার্ড!! তুই আমার মধুকে কেড়েছিস!!"...পোলিস অফিসার তাড়াতাড়ি ধরে ফেলেন রুদ্রকে আর বলেন,"আইন নিজের হাতে নিও না রুদ্র!! ওনার শাস্তি তো উনি পেয়েইছেন!!"...
....ধীরপায়ে এগিয়ে যায় রুদ্র মধুপর্ণার ছবিটির দিকে...
....ভাবে এই তো সেদিনের কথা--হাতে হাত রাখলে সখা,বাঁধলে দুটি হৃদয়/এমন তো হতে পারে বঁধু,চাওয়াতে পাওয়ার শেষ নয়...মধুর মুখে এই কথা শুনে ছদ্মকোপ দেখিয়েছিলো সে...আর আজ...থরথর করে কেঁপে উঠে হাউহাউ করে কেঁদে বলে ওঠে..."ফিরে আয় মধু...ফিরে আয়...তোকে ছাড়া তোর রুদ্র আজও অসহায়...পারলে রক্ষা করার ব্যর্থতায় ক্ষমা করিস আমায়..."
শ্রীপর্ণাকে এগিয়ে দিয়ে কান্তিময়ী দেবী আর ডঃ নন্দী ঘর ছেড়ে বাইরের দিকে এগিয়ে যান।সে এগিয়ে গিয়ে পিঠে হাত রাখে,"রুদ্র দা!! রুদ্র দা!! দেখো মধু তো তোমার ভালোবাসাতেই বেঁচে থাকবে।তুমি এভাবে ভেঙে পড়ো না প্লীস।শক্ত হও একটু।তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে কাকীমার কি হবে ভাবো?..ওঠো!!..ওঠো!!..দেখো দুঃখ তো থাকবেই জীবনে...তাকে নিয়েই তো এগোতে হবে আমাদের সবাইকে...জীবনের সব চাওয়াই যে পাওয়াতে শেষ হয় না...
...ধীরে ধীরে মাথা তোলে রুদ্র..কিন্তু শ্রীপর্ণা মধুর এভাবে মৃত্যুটা যে মানতে পারছি না!!...তা তো সভ্যসমাজের মানুষ কেউই মানতে পারবে না...কিন্তু পশু আর মানুষ নিয়েই তো সমাজ,তাই না!!...দেখো না!! আবার নতুন করে সব শুরু করা যায় না?তোমার কেরিয়ার তো এখনও মাঝপথে,রুদ্রদা!! চলো না!! আমরা সবাই মিলে একটা নতুন সুন্দর সকাল নিয়ে আসি!!আলো আমরা দেখবোই একদিন,আঁধারের শেষ যেখানে...কি পারবে না তুমি?...দেখো না চেষ্টা করে!!...ঠিক পারবেই....
....
......
.........
....পরদিন....আনন্দবাজার পত্রিকায়....
বিখ্যাত মনোরোগবিশেষজ্ঞ ডঃ জুবিন্ মেহ্তার শোচনীয় আত্মহত্যা
নিজস্ব সংবাদদাতা :
দক্ষিণ কোলকাতার নিজস্ব রিসার্চ ল্যাবে ডঃ জুবিন্ মেহ্তাকে "অনার কিলিং"-এর অপরাধে অভিযুক্ত করে গ্রেফ্তার করে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার সময় তার দুই ওয়ার্ডবয়ের ঘাড়ে তিনি পটাশিয়াম সায়নাইড ভরা ইঞ্জেকশন ফুটিয়ে দেন এবং তারপরেই নিজের ঘাড়েতেও ফুটিয়ে দেন।ঘটনাটি পুলিশের সামনে ঘটলেও ঘটনার আকস্মিকতায় সকলে এতটাই হতভম্ব হয়ে পড়েন যে তাকে বাধাদানের আগেই তিনি ঘটনাটি ঘটিয়ে ফেলেন।তড়িঘড়ি নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তিনজনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন।
................................................(বিস্তারিত খবর ভিতরে)

...ভালোবেসে

...ভালোবেসে
----------------স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
- একটা গল্প বলো না ?
- বলো কি গল্প শুনবে ?
- তোমার যা ভালো লাগে তাই বল...
- আচ্ছা ,শোনো তবে এটা এক বৃষ্টি-কন্যার গল্প..
- দূর বাবা !! এই মেঘলা দিনে বৃষ্টির গল্প কেন.. তারচেয়ে বরং উষ্ণ রোদ্দুরের গল্প বলো না !!
- শোনোই না মন দিয়ে..
...এটা যে দুজনের না-বলা ভালোবাসার গল্প গো...
- তাই না কি ? কি রকম শুনি ?
- বলি তাহলে..
অনেক অনেক দিন আগের কথা...
...পৃথিবীর তখন শৈশব চলছে। সেই নির্জন পৃথিবীর যে সম্রাট্... তাঁর নাম ছিল দিবাকর। সে একলা একলাই চালিয়ে যাচ্ছিল তাঁর উষ্ণতার রাজত্ব। হঠাত্‍ একদিন...
- কি হল একদিন? বলো ,বলো !!
- সেই উত্তপ্ত পৃথিবীতে একদিন নেমে এলো এক মায়াবী রাজকন্যা ,নাম বৃষ্টিকণা.. যাঁর জলজ স্পর্শে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল স্নিগ্ধ এক শীতলতা। দিবাকরের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রায় শেষ হয় হয়.. দুজনের মাঝে প্রথমে ছিল চাপা রেষারেষি...
- তারপর ? তারপর ?
- এই যে বলছিলে শুনবে না ?
-আহ্ !! না থেমে বলই না ? বেশ ইন্টারেষ্টিং লাগছে....
- তারপর আর কি ভালোবাসা !!
- কি ভাবে হলো ? ডিটেইলসে বল না প্লীস্ !!
- আচ্ছা বলছি ,বলছি...
- মাঝে মাঝে কখনও একইপথে যেতে যেতে দেখা হয়ে যেত দিবাকর আর বৃষ্টিকণার.. ধীরে ধীরে মুগ্ধতা, ভালোলাগা এবং মৌন প্রণয়। একে অন্যকে তা জানাবার আগেই প্রকৃতি তাদের একে-অপরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় । নিজস্ব সময়ের ব্যবধানে পালাক্রমে আসা-যাওয়া চলতে থাকে দুজনের । ক্রমশঃ বদলে যেতে থাকে চারপাশ.. এককালের নির্জন পৃথিবীতে তখন অজস্র প্রাণের ব্যস্ততা । এতকিছুর পরও বদলে যায়নি কিন্ত দিবাকর আর বৃষ্টিকণার আসা-যাওয়া একইপথে । আজও নিঃশব্দে ভালোবেসে যায় তারা একে-অপরে ।
- তবে কি ওরা একে অন্যের ভালোবাসার কথা জানতেই পারেনি?
- কে বললো জানতে পারেনি.. বৃষ্টি জানে দিবাকরের ভালোবাসা কতটা উষ্ণ। আর দিবাকরও জানে বৃষ্টিকণার ভালোবাসা কতখানি সিক্ত। তাই আজও কখনও কখনও একসাথে যখনই দেখা হয়ে যায় তাদের তখন দিবাকরের না-পাওয়ার যন্ত্রণাক্লিষ্ট হাসিমুখ আর বৃষ্টিকণার না-মিলনের বিরহী অশ্রু-মুক্তোপাত...
তাদের ওই অধরা মিলনের উষ্ণ-শীতল সেই ভালোবাসার মিশ্রণে পরিবেশও হয়ে ওঠে স্বর্গীয়...ভালোবাসা মূর্ত হয়ে ওঠে রঙধনুর আকার নিয়ে । অবারিত আকাশে ক্ষণজন্মা রঙধনু তার সাতটি রঙ ছড়িয়ে জানিয়ে দেয় দিবাকর আর বৃষ্টিকণার ভালোবাসার প্রাচীন গল্প ,যা যুগ-যুগ পেরিয়ে আজও সমকালীন ।
....আর সেই গল্পই প্রজাপতির ডানায় ভর করে রূপকথা হয়ে উড়ে আসে আমাদের জন্য !!

হ্যাকিং

হ্যাকিং
-------শিবাশিস্ আচার্য
প্রথম পর্ব :
---------
----উফ্ !! আজ যা খাওয়া-দাওয়া হলো না,ফাটাফাটি !! বৌদিকে গিয়ে বলবি এর জন্য ওনার স্পেশাল গিফ্ট পাওনা রইলো, ইলিশ-পাতুরি আর চিংড়ি মালাইকারী সাথে কাশ্মীরি পোলাও...জাস্ট আনএক্সপেক্টেড্--এক চিমটি জোয়ান-মৌরী মুখে দিয়ে একটা নেভিকাট কিং সাইজ ধরাতে ধরাতে বললো আর্যদা ।
আমিও পেল্লায় এক ঢেঁকুর তুলে বললাম--গেলে না তো বাড়িতে ।তাই মা-ই সব পাঠিয়ে দিলো ।বাড়ীতে গেলে আরো কত আনন্দ করে খাওয়া যেত....
---তাহলে এই নতুন কেসটা সম্বন্ধে আলোচনা করতাম কিভাবে বুদ্ধু ?...
---হ্যাঁ, এবার বলো তো ঘটনাটা কি ?
---আমি-ই কি জানি না কি ? গতকাল রাত দশটা নাগাদ মোবাইলে এ-এই নম্বরটা থেকে ফোন আসে..তো আমি রিসিভ করতেই এক ভারিক্কী গলা ভেসে এলো--নমস্কার আর্য রুদ্র বাবু !! আমি অনিকেত দেববর্মা কথা বলছি । আপনি-ই আর্যবাবু তো?...
আমি সম্মতি জানাতেই ভদ্রলোক আবার বলা শুরু করলেন...আসলে একটা পার্সোনাল প্রবলেম নিয়ে আপনার দ্বারস্থ হয়েছি ।খুবই কনফিডেন্সিয়াল...তাই কাল যদি একটু আমার বাসাতে আসেন তো খুব বাধিত হবো । ঠিকানাটা হলো-.............
তাই আগামীকাল একসাথে যাবো বলে ডেকেছি !! যাবি তো ?
---যাবো না মানে !!!....
......
.........আমি বিনু...পুরো নাম বিনায়ক ভট্ট। কম্পারেটিভ লিটরেচারে মাস্টার্স করে বিভিন্ন কম্পিটিটিভ এগ্সাম দিচ্ছি । দু'বছর আগে এরিনাতে মাল্টিমিডিয়া কোর্স করার সময় একটি সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত ব্যাপারে হঠাৎ করে আর্যদার সাথে পরিচয় হয়েছিল আমাকে সাহায্যকারী হিসেবে নিয়ে, যা আজ পারিবারিক বন্ধুত্বের রূপ পরিগ্রহ করেছে ।আমার মা'য়ের হাতের রান্না খেতে ভীষণ ভালোবাসে আর্যদা ।বাড়ী বারুইপুরে। ডি.ও.ই.এ.সি.সি. থেকে বি লেভেল কমপ্লিট করে একটা কম্পিউটার ফার্মে চাকরী করতে করতে একঘেয়েমি কাজে বিরক্ত হয়ে চাকরী ছেড়ে আজ ক'মাস বাড়ীতে বসে আছে। ওর চাই একটু ইনোভেটিভ ওয়ার্ক আর এইজন্যই আমি আর্যদার সব কাজেরই ডাই হার্ড ফ্যান....
.....
........মেইন রোড থেকে কিছুটা ভিতরে অনিকেতবাবুর বাড়ি, উনি ফোনে যেমন বলেছিলেন...
দারোয়ানকে আগে থেকেই বোধহয় বলা ছিল। আমরা পরিচয় দিতেই দ্রুত গেট খুলে দিল। শৈল্পিক নক্সার কারুকার্য করা লোহার দরজা পেরিয়ে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম।
ডেনিশদের ধাঁচে তৈরি করা ম্যাজেন্টা কালারের বেশ বড় আকারের কটেজ বাড়িটা। গেট থেকে বাড়ি পর্যন্ত চওড়া পায়ে হাঁটা পথ মোরাম ঢাকা। পথের দু’ দিকেই অনেক খোলামেলা জায়গা। বাম পাশটা উঁচু-নীচু ঘাসের লন দিয়ে সাজানো। লনের ধার ঘেঁষে একদিকে একটা বকুল গাছ আর অপরদিকে একটা কদম গাছ প্রাকৃতিক শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। কদমগাছের ঠিক নিচে একটা বড়সড় দোলনা ঝুলছে। বাড়িটার মালিক ভদ্রলোক যে যথেষ্ট সুরুচি-সম্পন্ন আর উৎফুল্ল মনের অধিকারী, তা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমাদের অনুমানে অবশ্য কিছুটা ঘাটতি পড়ে গিয়েছিল। বাড়ির কর্তা কিছুটা ব্যতিক্রম রুচির ধারকও বটে। পায়ে হাঁটা পথটার অন্য পাশটা ভর্তি যতসব ঔষধি গাছ দিয়ে। অশ্বগন্ধা, বাসক, পিপুল, কালমেঘ, অর্জুন, দাড়িম, ঘৃতকুমারী.... আরো নাম না জানা কত কী !! সবগুলো গাছের গোড়ায় গোবর সার দেওয়া ।
.....
........
এপাশের বাগানটা আবার পার্টিশন করা। পার্টিশনের অন্য ভাগটা দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ !! কয়েক'শো প্রজাতির ক্যাকটাসের সবগুলোই বোধ হয় আছে এখানে। আর দু’চারটার কি সাইজ !! একেবারে মানুষ সমান। ওগুলোর দাম কম করে হলেও টাকায় লাখ দু'য়েক হবে। কতগুলো বিষাক্ত প্রজাতির ক্যাকটাসও চোখে পড়ল। আমার জীবনে কখনো ক্যাকটাসের এত বড় কালেকশন দেখি নি। আর্যদাকেও বেশ খুশি মনে হলো। দাদার ছোটবেলা থেকেই ক্যাকটাসের প্রতি বেশ দুর্বলতা আছে বলে জানি।
....কিন্তু বাগানটা ঠিক সুসজ্জিত নয়....
আমরা বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছি।
....
......"বুঝলি রে বিনু, মনে হয় আমরা পারিবারিক কোনো ঝামেলায় জড়াতে যাচ্ছি।"--গম্ভীর-চিন্তিত মুখে বললো আর্যদা....
..."চারদিকে এলোমেলো আর অগোছালো ভাব দেখে বলছো ?"
..."বাঃ !! তোর বুদ্ধিতে তো বেশ পাক ধরছে রে বিনু !!--পিঠ চাপড়ে বলে দাদা।
....
......
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে কলিংবেল বাজাতে একজন মধ্যবয়স্ক লোক এসে দরজা খুলে আমাদের বসিয়ে ভেতরে খবর দিতে গেলো।
...
ড্রয়িং রুমে টানা দশ মিনিট বসে থাকার পর ভদ্রলোক মহোদয় এলেন !! বয়স অনুমান চল্লিশের কাছাকাছি হবে। এতক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্য বেশ সৌজন্যতা দেখালেন ও দুঃখপ্রকাশ করলেন। বোধহয় পরখ করতে চাইছেন, ভুল লোককে ডেকেছেন কিনা !! খানিকটা কেশে আমাদের উপর পালাক্রমে দৃষ্টি বোলাতে বোলাতে বললেন, "আপনার কথা আমি আমার এক বন্ধুর মুখে শুনি, আর্যবাবু ।কিন্তু আপনাদের মধ্যে....।"
আর্যদা আমাদের পরিচয় দেবার পর ভদ্রলোক একটু ইতস্ততঃ করে বললেন,"ম্যাটারটা একটু গোপনীয়..."
"আমার মতোই ওকেও আপনি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারেন অনিকেতবাবু"--বেশ দৃঢ়তার সাথে বললো দাদা।
--ও আচ্ছা..আচ্ছা...
--আপনার প্রবলেমের যে লিস্টটা তৈরি করছিলেন এতক্ষণ, সেটা কিন্তু এখন আনতে পারেন...বললো আর্যদা।
প্রথম ধাক্কাতেই ভদ্রলোকের চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠল !! খুব অবাক হয়ে বললেন, "আশ্চর্য !! আমি এতক্ষণ প্রবলেমগুলো সাজিয়ে নিচ্ছিলাম তা বুঝলেন কী করে?"
"সহজ হিসাব, আপনার হাতে এখনো কলমটা ধরেই আছেন।"
তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
"আর ঠিক এই মুহূর্তে, যখন আমাদের আসার কথা, তখন আপনি কলম দিয়ে কি কাজ করবেন তা অনুমান করে নেওয়াই যায়।"
"অদ্ভুত, অদ্ভুত !!"-ভদ্রলোক নীচুস্বরে খানিকটা স্বগতোক্তি করলেন।
এমনসময় ভেতরের ঘর থেকে সেই মাঝবয়সী লোকটি একরাশ খাবার ও চা নিয়ে উপস্থিত হলো।
--এ সব কি করেছেন ? আমি শুধু চা নেবো আর কিচ্ছু না !! তুই কি খাবি, নে?
(খাবার দেখে মুখে জল চলে এলেও)বলে উঠলাম--না!! না!! আমিও ওই চা-ই খাবো !!
মুখে দিয়ে দেখলাম--আহ্ !! আসল দার্জিলিং...
..এই রে!! সিগারেট প্যাকেট টা আনতে ভুলে গেছি !!
..তাতে কি হয়েছে, দাঁড়ান..দয়াময়..! দয়াময়..!!
..আমায় ডাকছেন বাবু !!
..একটু বড় রাস্তায় গিয়ে যে দোকানটা আছে ওখান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে এসো তো !!
..ব্র্যান্ডটা...
..নেভি কাট কিং....
আর্যদা টাকাটা দিতে যেতেই অনিকেতবাবু বলে উঠলেন-এটা করবেন না, প্লীস্ !! আপনারা আমার গেস্ট..
...তবুও নেশার জিনিসটা...!!
...থাক্ না আর্যবাবু !!
আপাতত বাড়ি ফাঁকা। আমরা জাঁকিয়ে বসলাম।
--আচ্ছা এবার বলতে শুরু করুন। কোনো কিছু কিন্তু বাদ দেবেন না...বলতে বলতে আর্যদা আমায় চোখ দিয়ে ইশারা করলো..আমি তো রেডি নোটবুক আর পেন নিয়ে....
--আপনার নাম ?
--অনিকেত দেববর্মা...
--বয়স ?
--উঁ...সাঁইত্রিশ...
--পেশা ?
--পৈতৃক টেক্সটাইল গুডসের ব্যবসা...
--রিটার্নস্ ?
--ওয়ান টু ওয়ান অ্যান্ড হাফ ক্রোড় পার অ্যানাম্...
....বলে কি রে লোকটা !! কাপড় বেচেই কোটিপতি !! তা হবেই বা না কেনো ? রিলায়েন্সও তো একসময় তাই ছিলো....!!
--দেখুন আর্যবাবু আমি ব্যবসায়ী মানুষ, অত বেশি প্যাঁচানো আমার ভালো লাগে না। আমি প্রধান বিষয়গুলো বলব, যা যা দরকার আপনি এরপর জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন-বললেন অনিকেতবাবু।
--আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি বলতে শুরু করুন।
---আমার সমস্যাটা একেবারেই পারিবারিক। আমার..আমার...স্ত্রীকে নিয়ে। সো বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা খুবই সেনসেটিভ। সেই কারণে চারদিক থেকে খুবই গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে।
এমন সময় দয়াময় ফিরে এলো।তার কাছ থেকে সিগারেটের প্যাকেট টা নিয়ে আর্যদাকে দিলেন ভদ্রলোক।আর দয়াময়কে বললেন--তোমার তো এদিককার কাজ সব হয়ে গেছে, তুমি তোমার মেয়ের বাড়ী থেকে একটু ঘুরে এসো না এবেলায়। বিকেলের মধ্যেই চলে এসো কিন্তু..
--থাক না বাবু !! মা ও নেই। যদি কোন দরকার..টরকার..
--না, দয়াময় এ ব্যাপারে তোমায় টেনশন করতে হবে না।তুমি সাবধানে ঘুরে এসো...বলে তার হাতে একশো টাকার একটা নোট দিলেন..আর বললেন-জামাইবাড়ি একেবারে খালি হাতে যেও না কেমন !!
লোকটি নমস্কার করে চলে যেতেই দরজা বন্ধ করে এসে বসলেন অনিকেতবাবু।
--হ্যাঁ, কি যেন বলছিলাম..
--গোপনীয়তা...আমি বললাম।
আর্যদা একটা সিগারেট অনিকেতবাবুর দিকে এগিয়ে দিতেই--
--নমস্কার, আমার চলে না...স্যরি....আগে দিনে দু প্যাকেট লাগতো...বানির কথা রাখতে কয়েকবছর হলো সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দিয়েছি...
আর্যদা সিগারেট টা ধরিয়ে দেশলাই কাঠিটা অ্যাশট্রে তে ফেলতে ফেলতে বললো--এ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না, আপনি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
--আমার স্ত্রী সর্বাণী আজ গেছে ওর বাবার ওখানে বেড়াতে। এই সুযোগে আপনাদের ডেকেছি।
--আপনাদের বিয়ে হয়েছে কত বছর ?
--আমরা বিয়ে করেছি ছয় বছর হলো। আমাদের চার বছরের একটা মেয়েও আছে।কিন্তু...বলে একটা ঢোঁক গিললেন অনিকেতবাবু...
--কি হলো ? বলে যান..
--না...মানে...এতদিন কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যাটা শুরু হয়েছে মাস চারেক আগে থেকে। মাস চারেক আগে ওর এক বন্ধু আসে অষ্ট্রেলিয়া থেকে। সমস্যাটা সেখান থেকেই শুরু। ও ওর বন্ধুর ব্যাপারে আমাকে কোনদিন কিচ্ছু জানায় নি। আমি আমার এক ক্লায়েন্ট মারফত খবর পাই যে, ওরা গোপনে কয়েকবার দেখাও করেছে। কথাটা শুনে আমার বিশ্বাস না হওয়ায় আমি নিজে একদিন ওদেরকে ফলো করেছি এবং দেখেছি যে....
.....চুপ করে গেলেন ভদ্রলোক কিছুক্ষণের জন্য..তারপর জলভরা চোখে বললেন--ব্যাপারটা নিদারুণভাবে সত্যি...এবং এরপরও যা জানতে পেরেছি, তা হলো ওরা আমার অগোচরে নিয়মিত মেলামেশাও করছে। আরো মারাত্মক ব্যাপার হলো ওরা নাকি একসাথে অষ্ট্রেলিয়া পাড়ি দেবার পরিকল্পনাও করছে !!...
...বলতে বলতে গলাটা বুজে আসে অনিকেতবাবুর...
....স..র্..বা..ণী.. যাকে আমি প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি..সেই কি না..
......
.........চোখের জল আর বাঁধ মানে না ভদ্রলোকের..
......উপচে পড়তে থাকে দু'গাল বেয়ে...
...আমরা দু'জনেই এই ঘটনায় খুব অস্বস্তি বোধ করতে থাকি...
কিছুক্ষণ বাদে অনিকেতবাবুর হুঁশ ফেরে যে, আমরা বাইরের লোক বসে আছি..
তাড়াতাড়ি রুমাল দিয়ে চোখ মুছে একটু হাসার চেষ্টা করলেন..
--আমার কাছে আপনি এ ব্যাপারে কি ধরনের হেল্প চাইছেন...?
--আপনার কাজটা খুব ছোট না হলেও খুব বেশি বড়ও নয়। বুঝতেই পারছেন, আলটিমেটলি আমি ডিভোর্সের খপ্পরে পড়তে যাচ্ছি। যেটা আমার জন্য ভীষণ অপমানজনক। যার সুখের জন্য আমি দিন-রাত পরিশ্রম করে এতদূর এসেছি সে...ই !! মা-বাবা আমার কেউ বেঁচে নেই শুধু সর্বাণী আর ইন্দ্রাণী...আমি জানতে চাই ওরা কতদূর এগিয়েছে !! শুধু এই তথ্যটাই আমাকে উদ্ধার করে দেবেন। যদি বেশিদূর এগিয়ে থাকে, তাহলে সেটা নিশ্চিত হয়ে ওর আগে আমিই ওকে ডিভোর্স দিতে চাই। আমি কি বলতে চাচ্ছি আশা করি বুঝতে পারছেন। পারবেন ব্যাপারটা হাতে নিতে ?
--কিন্তু মেয়ের ব্যাপারে কি করবেন ?
--মেয়ে আমার কাছ-ঘেঁষা।ফিগার-কনসাস্ বানি ওকে তেমন কাছে ঘেঁষতেই দেয়নি কোনদিন।তাই মেয়ে একা একাই বেশি মানুষ হয়েছে।আর আমি মাঝেমাঝে সময় দিতাম পারলে...তাই বলে বানি মা হওয়ার কর্তব্যগুলো ঠিকই রোজ করেছে।কিন্তু তবুও...
--আশা করি বোঝেন বোধহয় যে, কারো মনের খবর বের করাটা অনেক কঠিন কাজ। ওরা মনে মনে কতদূর পরিকল্পনা করে ফেলেছে তা জানা কতটুকু সম্ভব জানি না, তবে আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট... এবার কয়েকটি প্রশ্ন করব, উত্তর দেবেন ?
--হ্যাঁ, নিশ্চয়ই !! বলুন।
--এই দয়াময় লোকটি কতদিন এখানে কাজ করছে ?
--এই দু'বছর হলো..ওকে রাখার জন্যও বানি আমায় বুঝিয়েছিলো..আসলে দয়াময় আমার স্পিনিং মিলেরই কর্মচারী ছিলো..দুবছর আগে দেশের বাড়ীতে অসুস্থ হয়ে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে এক দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে একটি কিডনি খোয়ায়..তারপর সংসারের একমাত্র অবলম্বন মেয়েকে নিয়ে এসে বানির কাছে কেঁদে পড়ে..কারণ,একটি কিডনি নিয়ে সে তখন মিলের কর্মক্ষমতা হারিয়েছে..ওর মেয়েটি যে ছেলেটিকে ভালোবাসতো তাকেই বানির কথায় দয়াময়ের পোস্টে রিক্রুট করি এবং ওদের বিয়ে বানিই দাঁড়িয়ে থেকে দেয়, নিজের গয়না দিয়ে..আর সেই থেকে দয়াময় আমাদের বাড়িতেই থাকে..ফাই-ফরমাশ খাটে..এই হলো ওর ইতিহাস...
--অদ্ভুত !! আশ্চর্য !! 
--আপনার মতো ফিলিংস্ও আমার প্রথম হয়েছিলো কিন্তু এখন..না..না..জোরে জোরে মাথা দুদিকে নাড়াতে থাকেন অনিকেত...
--আপনি তো বড় ব্যবসায়ী, স্ত্রীকে কেমন সময় দিতে পারেন ?
--ঠিকই ধরেছেন...আসলে সময় যে খুব বেশি দিতে পারি, তা নয়। বোঝেনই তো ব্যবসায়ের কাজে যথেষ্ট ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে খুব যে কম দিই, তাও না। সপ্তাহে তিন-চার দিন অন্তত আমি ওকে আর মেয়েকে নিয়ে বাইরে ডিনার করি। আর বাইরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য আমি বিকেলটা প্রায়ই ওর জন্য বরাদ্দ রাখি।
--কিছু যদি মনে না করেন, তবে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি...হেজিটেট্ করে শুধালো আর্যদা..
--বলুন ?
--আপনাদের ম্যারাইটাল লাইফ সম্পর্কে একটু জানতে চাইছি..আর কি...
--মানে ?
--মানে আপনাদের সেক্সুয়াল রিলেশনশিপ্ কেমন ?...দেখুন...এ ব্যাপারে ইতস্ততঃ করাটা ঠিক হবে না। তথ্যটা খুবই জরুরী। দু’জনেই কি স্যাটিসফায়েড নাকি কোনো পক্ষে অতৃপ্তি আছে ?
ভদ্রলোক তারপরেও খানিকটা ইতস্ততঃ করে তারপর বললেন--না..মানে..আসলে..মানে সেরকম কোনো সমস্যা নেই। বিয়ের এত সময় পরে তো আসলে এসব সমস্যা তেমন একটা থাকে বলে আমার মনে হয় না।
--আপনার স্ত্রী কী করেন ?
--ওর তো আসলে চাকরির করার দরকার-ই নেই, কিন্তু সময় কাটানোর জন্য একটা এন.জি.ও. সংস্থায় অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করছে।
--আপনি যেদিন ওদেরকে ফলো করেছিলেন, সেদিন কতটুকু সময় ফলো করেছিলেন, আই মিন পুরো সময় নাকি অল্প কিছু সময় ?
--না, পুরো সময়টাই ফলো করেছি।
--সেদিন কি ওদেরকে কোনো হোটেল বা কোনো আবাসিকে যেতে দেখেছেন ?
--না, সেরকম কোনো জায়গায় যায় নি। শুধু এক সাথে ঘুরেছে আর লাঞ্চ করেছে এক সাথে।
--যদি কিছু মনে না করেন তো জিজ্ঞাসা করছি, সর্বাণী দেবী কোন্ মডেলের মোবাইল সেট ইউজ করেন ?
--না, না মনে করার কি আছে...ও অ্যাপল্ আই-প্যাড্ ব্যবহার করছে এখন।
--উনি নেট ব্যবহার করেন কেমন ?
--ও তো পুরোপুরি নেটিজেন বলতে পারেন। নেট ছাড়া একদম থাকতেই পারে না। দিনের অনেকটা সময় নেট ব্যবহার করে। বাড়ি আর অফিসেও ওয়াই-ফাই রাউটার দিয়ে নেট ইউজ করে ফাস্ট স্পিডের জন্য...আর তাছাড়া ওর প্রফেশনের জন্যেও ওকে অনেকটা সময় নেটে থাকতে হয়।
--আচ্ছা আর আমার কিছু তেমন জানার নেই।ঠিক আছে আজকে আমরা উঠছি। কখন কী করতে হবে আমি আপনাকে ফোনেই জানাব বা জানব।আচ্ছা নমস্কার..চলি..
..আমরা উঠে ফিরতি পথ ধরলাম।
ফেরার সময় ট্যাক্সিতে আর্যদা একটাও কথা বললো না..বুঝলাম ব্যাপারটা নিয়ে খুব গভীরভাবে ভাবছে তাই আর ডিসটার্ব করলাম না...
.....
........
পরদিন দুপুরবেলা।
আর্যদা কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে--ঠিক আছে..না আর কিছু না..যা যা বলেছি শুধু সেগুলোই আমাকে মেইল না হলে এস্.এম্.এস্ করে দেবেন।...হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে ঠিক আছে।
আর্যদা ল্যাবে ঢুকে গেল। রাতের আগে অন্তত বের হবে না এটা অনেকটা নিশ্চিত। আপাতত "মস্কা মারকে হাওয়া" খাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই। ফ্রিজটা খুলে একটা "মাউন্টেন ডিউ" নিয়ে আমিও টি.ভি. খুলে বসে পড়লাম...
......
.........
আর্যদার ল্যাবের ঘরটাতে আমি ঢুকতে পেরেছি মাত্র কয়েক বার। ঘিঞ্জি টাইপের একটা ঘর। এক পাশে দু'টো পি.সি.-র এল্.ই.ডি. সেট করা আর একটা ল্যাপটপ। উল্টোপাশের টেবিলে হার্ডওয়্যারের যন্ত্রপাতি। এটা আবার আর্যদার শখের কাজগুলোর একটি। বড় একটা আলমারি। বইয়ের হিসাব নেই, কিন্তু কোনো গল্প বা উপন্যাস খুঁজলে একটাও পাওয়া যাবে না। যত্তোসব তত্ত্বকথার খটমটে বই। বিজ্ঞান, ধর্মশাস্ত্রের বই যেমন আছে, আবার সায়েন্স আর অপরাধ-তত্ত্বের ক্রিমিনোলজি টাইপের বইও অনেক।
আমি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, পৃথিবীর এমন কোনো ব্যাপার নেই যেটাতে আর্যদার কোনো আকর্ষণ নেই। এ জন্যই বোধ হয় সব ব্যাপারে আর্যদা এত দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আরেক পাশে বাহারি ডিজাইনের কয়েকটা দাবার বোর্ড। আর্যদার একমাত্র প্রিয় খেলা। দাদা বলে ও নাকি দাবা ছাড়া অন্য কোনো খেলা তেমন জানে না। দাদার কথায়, দাবা খেললে বুদ্ধি বাড়ে না অবশ্য, তবে বাড়ে ব্রেইনের গতি, আর অব্যবহৃত নিউরনগুলো চালু হয়।আর্যদাকে মাঝে মাঝেই দেখেছি সকাল বেলা ব্রাশ করতে করতে দাবার আসরে বসেছে, আর উঠেছে দুপুরের পর। সারা দিন খাওয়া-দাওয়ার কোনো বালাই নেই.....
.......
..........
বিকেলে আমি একবার উঁকি দিলাম দরজার ফাঁক দিয়ে। আর্যদা ফেসবুকের লগ-ইন পেজ খুলে বসে আছে। কিন্তু পেজটার বাম পাশের অংশগুলো নেই কেন? যাহোক আমি আর ওটা নিয়ে মাথা ঘামালাম না...
......
........ভেবেছিলাম দাদা বোধহয় রাতেই বের হবে। কিন্তু সেই যে ঢুকল আর তো বের হলই না !! আরেক বার আড়াল থেকে দেখে এলাম। ইয়াহুর লগ-ইন পেজ খুলে বসে আছে।..ধুর !! আর কাঁহাতক একা একা বসে থাকা যায়..বাড়ী চলে যাই..
.....
........
--দাদা আমি আসছি আজ !!
--হুঁ, সাবধানে যাস..আর পরশুদিন একবার দেখা করিস তো !! বুঝলাম দাদা ক'দিন একাকীত্ব চাইছে...বেরিয়ে এলাম...
....একটা কাজে ব্যস্ত থাকায় দাদার সাথে দেখা হল চার দিন পর।
--দাদা কতদূর এগুলে ?
--আটকে গেছি রে...
--কীভাবে কি করছো দাদা ? আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না। সেই যে কাকে কি যেন পাঠাতে বলে সেদিন কাজে ডুব দিলে, আজকে এসে বলছ আটকে গেছ। কোন পথে এগোচ্ছ একটু কিছু বলবে কি ?--অভিমান ঝরে পড়ে আমার গলায়..
অভিমানটা আন্দাজ করে দাদা আমার চুলগুলো একটু ঘেঁটে দিয়ে বললো--
--আন্দাজ কর্ তো দেখি ?
--উঁম্, বেশি কিছু বলতে পারব না। তবে এবার মনে হয় ইন্টারনেটকে কাজে লাগাতে যাচ্ছ।তাই তো ?
--কাজে লাগাতে চাইছি কিন্তু কাজ তো হচ্ছে না।
--তাহলে উপায় ?
--একটা উপায় আছে অবশ্য...!! বলতে বলতে দাদা একটা সিগারেট ধরাল। এটা ভোল্টেজ শেষ হবার লক্ষণ। কথা বলতে বলতে যখনই ভোল্টেজ শেষ হয়ে যায় তখনই দাদা একটা সিগারেট ধরাবেই। আর কোনো কথা বলবে না। আরো কিছু জানার আশা বাদ দিয়ে আমি জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে শুরু করলাম। এছাড়া উপায়ই বা কি !!
......
....
.........
গতদিনের মতো সেইদিনও বাড়ি ফিরে এলাম...আমায় এখন আর দরকার নেই এই কেসটায় এই ভেবে অভিমানে পরদিন দাদার বাড়িমুখোই হলাম না...তারপর শুরু হল বাঁধভাঙা বৃষ্টি...এক সপ্তাহ ঘরে জলবন্দী...কি জ্বালাতন !!! ছটফট করছি দাদা কি করছে জানার জন্য...জল একটু কমলে গেলাম আর্যদার বাড়িতে...
..যেদিন গেলাম,দেখি দাদা আমার গলার আওয়াজ পেয়ে লাফাতে লাফাতে ল্যাবের ঘর থেকে বের হয়ে এলো। খুশির সময় দাদা একেবারে ছোট মানুষটি হয়ে যায় অবলীলায়।
--পেরেছি রে বিনু, কাজ হয়েছে !! এখন এটাকে কাজে লাগাতে পারলেই হয়।
--তাই নাকি দাদা !! এখন তাহলে ওটা কাজে লাগাবে কীভাবে?
--দাঁড়া, একটা ফোন করি ভদ্রলোককে।
--হ্যালো অনিকেতবাবু...হ্যাঁ, ভালো আছি, আপনার কাজ অনেক দূর এগিয়েছে ...এখন বলুন আপনার স্ত্রী বই পড়েন কিংবা গান শোনেন কেমন ? ... ই-বুক পড়েন? ...বাঃ...আচ্ছা, অরণ্যের দিনরাত্রি অনেক দিন ধরে খুঁজছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না ? ... ওয়াও !! তাহলে তো আরো সহজ হয়ে গেল। এটা আমার কাছেই আছে। ...কালকে আমরা আপনার বাসায় আসছি। ...আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা অফিসেই আসব। ...হ্যাঁ, হ্যাঁ তিনটেয়।..আচ্ছা, নমস্কার...
....
......
...মেইন রোড থেকে অনিকেতবাবুর বাড়ী যাওয়ার সময় আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল কেউ বা কারা যেন আমাদের উপর নজর রাখছে । দাদাকে ব্যাপারটা ফিসফিস করে বলতেই ক্যাজুয়াল ভাবে তাকাল আমার দিকে...
..ঠিক তিনটায় পৌঁছে গেলাম ভদ্রলোকের অফিসে। বাড়ীর পিছনদিকেই অফিস ।দাদা ভদ্রলোকের স্ত্রীর জন্য সুন্দর কভারের "অরণ্যের দিনরাত্রি" ই-বুকের সিডি দিলো ভদ্রলোকের হাতে। আর একটু টুকটাক কথাবার্তার পর আমরা বেরিয়ে এলাম..
...মাঝপথে এসেছি, হঠাৎ মাথায় প্রচন্ড একটা আঘাত পেলাম। অজ্ঞান হবার আগে দেখলাম আর্যদা দুটো লোককে ক্যারাটের প্যাঁচে শুইয়ে দিচ্ছে...তারপর আর কিছু মনে নেই। নিজেকে আবিস্কার করলাম হসপিটালের বেডে। পাশে দাদা,মা,বাবা বসে আছে। দাদার বাম বাহুজুড়ে দীর্ঘ ব্যান্ডেজ।
ধীরে ধীরে মনে পড়ল সব। কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যেতেই দাদা ইশারায় নিষেধ করলো ।পরদিন একটু ধাতস্থ হবার পর রিলিজ করে দিলো হাসপাতাল থেকে..ট্যাক্সিতে বাড়ী ফেরার সময় দাদাকে বললাম--
--দেখলে তো দাদা ?
--কী ?
--তোমাকে বললাম সে দিন, দেখো কোনো লোক আমাদের ফলো করছে, তুমি কান দিলে না। আজ দেখলে তো !! আমাদেরকে টার্গেট করে ঠিকই মেরে দিলো।
--তোর ধারণা ভদ্রলোকের স্ত্রী লোক লাগিয়ে আমাদেরকে মেরেছে ?
--তাই তো, আবার কী ?
--সোজা-সাপ্টা হিসেব করতে শেখ বিনু, আমাদেরকে যখন ওরা এ্যাটাক্ করেছে তখন আমরা বাড়ি থেকে বের হয়ে এক ঘন্টা আর ভদ্রলোকের অফিসে থেকেছি আধ ঘন্টা। এর মাঝে অনেক বার থেমেছি, অনেক জায়গা পার হয়েছি যেখানে মারলে মারাটা অনেক সহজ হতো। কেউ পিছু নিলে বা টার্গেট করে মারলে এত সময় নেবে না। হিসেব মিলছে না তা বুঝতে পারছিস ?
--হিসেবটা ঠিক আছে, কিন্তু এটা তো তোমার অনুমান।
--উঁহু, আমি খবর নিয়েছি। ওই এলাকায় আমার লোক আছে। ইট ওয়াজ এ মিসটেক। অন্য লোক ভেবে আমাদের মেরেছে।
...অন্ধকার জগতের কিছু লোক যারা সমাজের মূলস্রোতে ফিরে এসেছে তাদের সাথে যোগাযোগ রাখে দাদা প্রায়ই এটা আজ প্রথম শুনলাম । সব এলাকারই শেল্টার হোল্ডারদের সাথে আর্যদার যোগাযোগ আছে। ভেলকির মত সব খবর পেয়ে যায়।
..হাসপাতাল থেকে বাড়ী ফেরার সাতদিন বাদে...
..আমি দাদার রুমে ঢুকে দেখলাম দাদা সুন্দর করে একটা সিডির কভার বানাচ্ছে। আমাকে দেখে বলল--
--চল, অনিকেতবাবুর বাড়ি যেতে হবে ।এই সিডিটা ভদ্রলোকের হাতে দিয়ে... আমার পারিশ্রমিকটা নিয়ে আসব..
--দেন, কেস ইস্ সলভড্ !!!-হতভম্বের মতো বলি আমি...
--চল কাজটা সেরে আসি তারপর গুছিয়ে বসে সব বলবো...
আমি সিডিটার উপর চোখ বোলালাম, তাতে লেখা, "সিডিটা দেখলে আপনার দুশ্চিন্তা কমবে না, কিন্তু এর ভেতরে যা আছে সেগুলো দেখলে আপনার মন অনেক আশ্বস্ত হবে।"
..অনিকেতবাবুরও আমার মতোই দশা হল..
দাদা শুধু বললো--সিডিটা দেখে যা ডিশিসন নেবার নেবেন আর আমাকে ফোনে জানাবেন..আশা করছি আপনার কথামতো অনেকটাই করতে পেরেছি...আচ্ছা আজ আসি...
....
......
--দাদা আমি তো পুরো অন্ধকারেই থাকলাম। কি করলে কীভাবে করলে কিছুই তো বুঝতে দিলে না আমাকে।
--দাঁড়া সব বলছি --সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললো দাদা ...আগে ওদের চ্যাট্ হিস্ট্রিটা দেখে নে।
আমি মনিটরে ওদের চ্যাট্ হিস্ট্রির দিকে চোখ রাখলাম....
....
......অনিমেষ গুছাইত ও সর্বাণী দেবীর ম্যাসেঞ্জার চ্যাট্....
....
......
26/08/2013 সকাল 10:13
-------------------------
--এই যে ম্যাডাম্ বানি হাই !!!
--দাঁড়া, একটু পরে আসছি, তোর সাথে বক্-বক্ করার আগে হাতের কাজটা সেরে নিই...
--আজ কি একটু বের হতে পারবি ? চল্ না একটু ভেসে আসি..
--না আজ বের হতে পারবো না। এত ঘন ঘন ঘুরলে তো ধরা পড়ে যাব। ও মনে হয় কিছু টের পেয়েছে...
--তাই নাকি ?..তো কি হলো ?..
--তুই জানিস না, ও আমাকে নিয়ে ভীষণ জেলাস্ !! ব্যবসায়ী মানুষ তো! অল্পতে অনেক কিছু বুঝে নেয়..
--হুঃ, কত দেখলাম !!
....
.......
14/09/2013 দুপুর 2:38
----------------------
--হ্যাল্লো গুল্লু গুল্লু, কী করিস্ ?
--কী করিস কোন প্রশ্ন হলো না, বল্ কী করছিলিস অথবা কী করছিস !!
--আচ্ছা বাবা আচ্ছা, দুটোরই উত্তর দে..
--কাজ করছিলাম, এখন চ্যাট্ করছি..
--কেমন আছিস্ ?
--ভালো !! তোকে একটা কথা বলি !!
--কি কথা, বল্ ...
--তুই আমাকে বানি বা গুল্লু গুল্লু বলতে পারিস্ না !!
--কেন ? ...কি হল আবার ?
--তোর এটা মনে রাখা দরকার যে আমি তোর প্রেমিকা না, জাস্ট ফ্রেন্ড..আগে যেমন সর্বাণী বলে ডাকতিস তেমনই ডাকবি...
--আচ্ছা ঠিক আছে বাবা, আর বলব না...
18/10/2013 দুপুর 1:52
...........................................
--আর মাত্র ক’টা দিন, আমি চলে যাচ্ছি !!
--হুমম্, মিস করবো তোকে..
--চল্ না আমার সাথে..
--কোথায় ?
--অষ্ট্রেলিয়া !!
--তুই কি বলছিস তুই জানিস্ !! আমার একটা মেয়ে আছে..
--ওকে সাথে নিয়ে চল্, আমার কোন প্রবলেম্ নেই..আমি ভিসা রেডি করছি..
--আর স্বামী, সংসার ?
--এগুলো তো ওখানে গিয়েও পাবি !!
--তোকে গতকাল বেড়াতে গিয়েও একই কথা বলেছি..ইউ আর জাস্ট মাই ফ্রেন্ড..আবোল-তাবোল কথা বলবি না, এত দিনের সাজানো সংসার দু'দিনে ভাঙ্গা কি কোনো মানুষের কাজ হতে পারে !!
--তুই ক্ষেপে যাচ্ছিস কেন ? একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখ !!
--না, ক্ষেপে যাচ্ছি না, তবে তোকেও কিছু কথা জানানো দরকার মনে করছি। তুই জাস্ট আমার বন্ধু, অন্য কিছু না। এটা ভুলে যাস্ কেন বারবার ? তুই আগেও বন্ধু ছিলি এখনো আছিস্, পরেও থাকবি। এর বেশি কিছু চাস না। আর এমন অসংলগ্ন কথা যদি ফারদার তুই বলেছিস তাহলে কিন্তু তোর সাথে আমি সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব..আই হ্যাভ্ এ রেপুটেশন্ !!
......
........
...........
কনভারসেশন্ গুলো দেখলাম। আলাদাভাবে কিছু বলার দরকার নেই তা বোঝাই যাচ্ছে। এবার দাদা শুরু করল।
--শোন, ভদ্রলোক আমাদের যে কাজ দিয়েছিলেন সেটা মনের খবর বের করে নিয়ে আসার মতো জটিল ব্যাপার। এটা সম্ভব নয় বুঝতেই পারছিস। একটা রাস্তা ছিল। ওদের কথোপকথনের উপর নজর রাখা। আমার কাছে GrabSky আছে। সফট্ওয়্যারটা মোবাইল ফোনে ইন্সটল্ করে দিলেই হলো। ও পুরোপুরি হিডেন থেকে সব কনভারসেশন্ রেকর্ড করে এক ঘন্টা পর পর সার্ভারে আপলোড করবে। ভদ্রলোককে দিয়ে সেটা করেও নিয়েছিলাম। কিন্তু কপাল খারাপ, সার্ভার বন্ধ। পদ্ধতিটা কাজে লাগে নি। তখন তোকে বলেছিলাম আটকে গেছি। বুঝলি ?
--তারপর, তারপর !! তারপরে কী করলে ?
--এরপর আর একটা পথ ছিল। ভদ্রমহিলা যেহেতু নেটিজেন, সুতরাং ফেসবুক আর মেসেঞ্জারে তারা নিশ্চয়ই আলাপ করে থাকবে। কিন্তু সেগুলো পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো এ্যাকাউন্টগুলো হ্যাক্ করতে হবে। তুই তো জানিস বায়োস্, ইউজার্, এ্যাডমিন্, ফাইল, ফোল্ডার যে কোন পাসওয়ার্ড ব্রেক করা আমার কাছে কোনো ব্যাপার না। কিন্তু সমস্যা হলো আমি অনলাইন হ্যাকিং এ পুরোটাই আনকোড়া। আমি সহজ রাস্তাটাই বেছে নিলাম। ফিশিং করতে শুরু করলাম এ্যাকাউন্টগুলোতে। ফেক লগ-ইন পেজ বানিয়ে এ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশনের নাম দিয়ে আর হিডেন লিংক দিয়ে সেগুলো পাঠিয়ে দিতে থাকলাম মেইল বক্সে। সেখানেও সমস্যা। এখনকার মেইল ফিল্টারিং সিস্টেম অনেক শক্তিশালী। আর ভদ্রমহিলাও মনে হয় যথেষ্ট সচেতন এসব লিংকের ব্যাপারে। ক্লিক্ই করলো না। পেজ স্ক্রিপ্টগুলো কোনো কাজে এলো না। শেষমেষ আর একটা উপায় বের করা গেল।
--কি দাদা ?
-- "কী লগার।"
-- "কী লগার" আবার কী ?
--কী বোর্ডে কী প্রেসের সব রেকর্ড রাখে। কিন্তু সেটা বানাতে গিয়ে ব্যাপক ঝামেলায় পড়ে গেলাম। কোনো প্রকার ধরা না পড়ে পাসওয়ার্ডগুলো হাতিয়ে নিতে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ঢোকাতে হবে ওটায়।
--যেমন ?
--আমি বলি তুই গুনতে থাক।
--বলো।
--এক - সবগুলো কী প্রেসের রেকর্ড নিতে হবে।...দুই - সেগুলো সার্ভারে আপলোড করবে।...তিন - অন্য একটা ফাইলের সাথে জয়েন করতে হবে।...চার - ওয়ান-ক্লিক্-ইন্সটল্ হতে হবে।...পাঁচ - হিডেন ইন্সটল্ হতে হবে, যাতে যে ফাইলের সাথে জয়েন করা হয়েছে সেটা চালু করা মাত্র এক বারেই ইন্সটল্ হয়ে যায়।...ছয় - ইন্সটল্ হবার সাথে সাথে ষ্টার্ট-আপে স্থান করে নিতে হবে যাতে প্রতিবার কম্পিউটার চালু হবার সাথে সাথেই ওটা চালু হয়।...সাত - এটা প্রোগ্রাম হিসেবে চলা যাবে না, প্রসেস হিসেবে চলতে হবে এবং সিস্টেম প্রসেস। যাতে সহজে বোঝা না যায় যে ওটা চালু আছে।...আট - অবশ্যই অবশ্যই এ্যান্টি-ভাইরাসকে ফাঁকি দিতে হবে। এবং ...এবং ...
...
.......তিন-চার দিন খেটে-খুটে বানিয়ে ফেললাম কী-লগারটা, সেটা ভদ্রমহিলার ল্যাপটপে গেল অরণ্যের দিনরাত্রির সাথে এবং তার রেজাল্ট এই চ্যাট হিস্ট্রিগুলো।
....
......কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম--
--দাদা তুমি কি তবে হ্যাকার হয়ে গেলে ?
--অবশ্যই হ্যাকার, তবে ব্ল্যাকহ্যাট না, হোয়াইট্ হ্যাট বলতে পারিস।
...
.....
আমি মুচকি হাসলাম। নিশ্চিন্ত হলাম। আশা করছি চ্যাট হিস্ট্রিগুলো দেখার পর ভদ্রলোকের ঘর ভাঙ্গার আর সম্ভাবনা থাকবে না।
....
.....
পরের সপ্তাহে অনিকেতবাবু নিজেই দাদাকে ফোন করে দাদার কাছে আসতে চাইলেন..
..দাদা সময় দিলে ভদ্রলোক ও সর্বাণী দেবী দুজনেই দাদার বাড়িতে এলেন...
....আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ দেবো মিঃ আর্য !!
--ইট্স মাই প্লেজার ম্যাম্ !!
..অনিকেতবাবু ভেজাচোখে বললেন--বানি আমার কাছে সব কনফেস্ করেছে..আমিই ওকে ভুল বুঝেছিলাম..আর্যবাবু আমাদের তরফ থেকে এই চেকটা আপনার জন্য..দাদা হাতে চেকটা নিলে সংখ্যাটা দেখে মাথা ঘুরে গেলো.....টেন ল্যাক্স..........
...কিন্তু আমার ফিস্ তো....
--বারণ করবেন না আর্যবাবু !! এটা আপনার প্রাপ্য...
--কিন্তু....
--কোন কিন্তু নয়..আমি বানিকে কি বলেছি জানেন--আমাদের আবার এক কে করে দিলো জানো ?
--কে আবার আর্যবাবু ?
--না হলো না !!
--তবে !!
-- "হ্যাকিং".....

অ সা মা জি ক

অ সা মা জি ক
--------------স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
বাতাসে কাদের ফিসফিস শুনি !!
কেবলি কারা আলাপ করে অস্পষ্ট স্বরে...
শুনি শব্দ..অ-সা-মা-জি-ক...
...
.....শোনার জন্য কান পেতে দিই,
...সেখানে শুধু ব্যঙ্গ-বাতাসের হাহাকার...
...
.....বহুদিনের ব্যস্ততা শেষে ভেবেছিলাম এখানে দু-দন্ড শান্তির অবসরে মেখে নেবো জীবন...
কিছু মানী-গুণীর সাথে টুকটাক কথা বলা শুরুও করেছিলাম...
মনের দরজা খুলে মিশেওছিলাম গানে-সুরে-গল্পে-কবিতায়..
চেনা পথের অচেনাকে জানা-ই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য..
ভাবতাম, চেনা পথিক কাউকে চমকে দিয়ে পুরনো কথা সুধাবো...
..কিন্তু...
...
.....সারাদিন একলা মনের ঘরেই থাকি,
কেউ আসে..
কেউ কেউ আসে..
দীর্ঘদিনের শূন্য মনের বন্ধু হতে...
...
.....তারা যদি জানতো !!
আমার রক্তে আর মগজের কোষে কোষে কি খেলা চলে...
মনের ঘরে সান্ত্বনার চিঠি আসে,
..জাগিয়ে যায় মুখে চিলতে হাসি..
....
.......
...সুষেণ-প্রতিম-ঝুম-অনুশ্রী-বিনীতা-জয়....আরো-আরো কতজন ছিলো সব সুখ-দুপুরে...
.....
........
এরা বোঝেনি কেউ আমায় নিদ্-এর মতোন...
তাই আজ আমার ললাট-লিখন...
...অ-সা-মা-জি-ক---
...আত্মগৃহবিধ্বংসী জীব---
...প্রচলিত পন্থার ধ্বংসাবশেষ---
....অবাঞ্ছিত-উদ্বাস্তু-মূর্তিমান এক বিভীষিকা---
...
.....
নিদ্ আমার দরজায় রোজ কড়া নেড়ে নেড়ে ক্লান্ত হয়ে ফিরে যায়...
মনের দেওয়ালের চারপাশে চলে অহরহ খোঁজ তার মিতার উৎকণ্ঠায়...
....
......
ঘুমের ঘোরে মগজের মধ্যে কে যেন নাম ধরে ধরে ডাক দেয় !!
জেগে দেখি নিক্কণ-নিদে ভরা মায়াময় এক পৃথিবী।
যেখানে ভীষণ একা ভাবা ভুল নিজেকে !!
...যতদিন আছি সুরে-নিদেই কাটিয়ে যাবো জীবন--
...
.....তোমরা যতই একবাক্যে বলে চলো না কেন,
...পরিযায়ীটা অ-সা-মা-জি-ক...

মেঘলা বাইশে শ্রাবণ...

মেঘলা বাইশে শ্রাবণ...

----------------স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্

--মেঘের ঘনত্ব দেখে বুঝেছি...
বৃষ্টি হয়েই ঝরবে বুঝি..
...আসছে যে বাইশে শ্রাবণ !!
--মনে এখন আঁধারের উৎসব। জানালায় ঝুলে আছে বিষণ্ন পর্দার ঢেউ।
-বাইরে বাড়িয়ে দিয়ে মুখ...
...দৃষ্টি খুঁজে পায় না দিগন্তের কালো মেঘ ছাড়া অন্যকিছু।
....বৃষ্টি নামবেই।
..বাইরে না হোক অন্দরে।
-কাঁদিয়ে সুখের দেখা পেতে চাও কেন বিরহপূজারী ?
-আসন্ন বাইশে বহিরঙ্গ-কোলাহলে কারও হৃদয় হাহাকার করেনা তোমার জন্য...
- একাকী এ পথচলা কি ফুরোবে না কখনো তোমার !!
- আড্ডার মধ্যমণি হয়েও আজ তুমি একা !!
জটিল জীবনের পথে, একাকীত্বই সম্বল। আসা যাওয়ার মত পথচলাও একা।
সমবেত বলে আজ কিছু নেই।
- স্মৃতির দালানগুলো মুছে যাক।
একাকী স্মৃতির আকাশে ভেসে উঠুক একখণ্ড খেয়ালী চাঁদের আলো !!
- কখনো আবেশে মেদুর হতে চায় মন তোমার সৃষ্টিতে আজন্ম লালিত সংস্কারে।
স্মৃতি হাতড়ে মানুষ তো আজ কেবল নিজেকেই খোঁজে...
তুমি শোভা পাও বিকৃত ইতিহাসে আর ব্যস্ত সরণির সাময়িক স্তব্ধ নাগরিকের মন ভোলাতে...
মেঘলা বাইশের ব্যর্থ হাতছানি, এর কষ্টটুকুও নিজস্ব।
রাগ কিংবা অভিমান সেও হাজির হয় নিজস্বতা নিয়ে।
অন্যের সাথে মিল বা মেলানো অর্থহীন।
- একমুঠো আঁধার জড়িয়ে যাচ্ছে আজ ভবিষ্যতের চোখে...
হেঁটে যাই বহুদূর...
শেষ আলোয় দেখি সব অর্থহীন।
ছেড়ে যেতে হয় সবই।
- আমার আকাশ আজ কোন রঙে রাঙিয়ে দেবো কবি !!
- আকাশ-বিহারী যদি হয় আজ দিগভ্রান্ত...
সব আকাশই আকাশ।
সব তুমিই তুমি।
সময়ের ফেরে হয়তো অন্য কেউ হয়ে যাও - সত্ত্বাধিকারীর পরিবর্তন নেই কোন। চৈতন্য না হারালে নিজেকে ঠিকই খুঁজে পাই ঠিক ঠিকানায়।
- যদি কখনো মনে হয় বুঝিনা কিছু জীবনের মানে;
অর্থ করে নিই তোমায় নিজের মত।
সেও আলাদা জগত।
নিজের মত জগত গড়ার আনন্দ ক'জনের মেলে !!
- মনে আজও অঝোর বরষায় থমকে আছে ইতিহাস।
তোমার মায়ার ঢেউ গ্রাস করবে অন্ধকার।
আর ইতিহাসের অপর পিঠে লেখা হবে সচল শিলালিপি।
- ভবিষ্যতের এই এক ঝলক সুখী বৃষ্টিতে মন রাঙিয়ে নেবার ভীষণ সখ আমার !!
- মুঠো মুঠো বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজিয়ে নিই আত্মা।
এক নিমিষে জ্বলে উঠবে অন্তর্গত সুখ। অঝোর বাইশে শ্রাবণে ধুয়ে যাক যাবতীয় দু:খের নকল সমীকরণ।
- আমাকে ডানা দাও! দূরে কোথাও উড়ে যাই সীমানা ছাড়িয়ে বকের সারির মতো।
- হৃদয়ে জলপ্রপাতের শব্দ পাচ্ছি !
- গহীনে ভাঙ্গার শব্দ বুনে যায় কারা ?
- কারা তোলে সমবেত প্রেতাত্মার সুর ?
- অলীক জীবনের মোহে সুখের স্বপ্ন দেখে যায় কোন অচেনা নাগরিক ?
- রূপের পসরা সাজিয়ে রূপহীন অক্ষম আক্রোশ আমার...
সময় সমরে লড়বে এবার নিয়তির সাথে পরাক্রান্ত বাস্তব।
তুমি আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখে যাও বিকার বিলাপ।
- তুমি আজীবন কি এমনই থেকে যাবে কবি...শুধু পটে লিখা...
- আমি তোমার দেখানো পথে হেঁটে গেছি বহুদূর।
পাইনি সুখের পথের হদিস।
উপরে জ্বলছো হয়ে জ্বলজ্বলে চাঁদ।
...নীচে আজ ঘোরে পথভ্রান্ত উন্মত্ত কিছু প্রলাপাচ্ছন্ন পথিক...

জন্মের আটষট্টি বছর বাদে...




জন্মের আটষট্টি বছর বাদে...

----------------স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্

স্বাধীনতা শব্দটা আজকাল বড় বেশী প্রশ্নবোধক ঠেকে...
যখন...
....রাত দুপুরে স্বাধীনতায় উল্লসিত হয়ে ওঠে..
অশালীনতা আর তাতে গা ভাসানো দিগভ্রষ্ট কিছু যুবন্ অশ্ব...
ভাবি তখন এও স্বাধীনতা বটে !!
...
.....
এই দেশে তো...
...সবাই স্বাধীন,
...সবই স্বাধীন,
...হত্যা-রক্ত-লাশও স্বাধীন,
...জ্বালা ও, পোড়া ও, ধ্বংস স্বাধীন;
...মজুতদার আর কালোবাজারী,
....নারী শিশুদের পাচারকারী,
এরা সবাই মহা স্বাধীন...
...
.....
মানচিত্রের কায়া জুড়ে সন্ত্রাসীদের সদর্প নগ্ন নৃত্য,
অবৈধ অস্ত্রের উন্মুক্ত মহড়া চলছে নিত্য;
এসব কিছুই চলছে স্বাধীন।
হাস্যমুখর বিবৃতি পাক খেয়ে ফেরে বাতাসে--"ছোট ঘটনা"...
...
...স্কুলের পথে ঘর ছেড়ে যায় কিশোরী,
ঘরে আর তার হয়না ফেরা।
তারপর একদিন.............,
কচুরিপানার ডোবায় চিৎ হয়ে পড়ে থাকে--"সাজানো ঘটনা বা পুরুষদের উস্কানিমূলক প্ররোচনা"...
গলির মোড়ে অন্ধকারে
একদল স্বাধীন..
হুল্লোড় তোলে বোতল ঠেকিয়ে ঠোঁটে,
তারা সবাই ছোট ছেলেদের মতোই স্বাধীন।
দুষ্ট গ্রহের নষ্ট ছায়ায়
স্বাধীনতা আজ বড় অসহায়।
....
.......
বড়ই আশ্চর্য জাতি আমরা...
চমৎকার আমাদের হজমশক্তি।
যত তাড়াতাড়ি সব হজম করি
ততই দ্রুত ভুলে যাই সবকিছু -
মা, মাতৃভাষা, জাতীয় সংগীত
ধীরে ধীরে সব হজম !!
বাহ্ রে আত্মভোলা !!
হয়তো এভাবেই এক সময় ভুলে যাবো -
একদিন বাঙালী ছিলাম রে !!
যখন প্রতিপক্ষের ক্রমাগত আগ্রাসনে
বিলীন হয়ে যাবে অস্তিত্বের শেষ চিহ্ন।
...
......যখন দেশ-মাতৃকার জন্য কোন প্রাণ বিসর্জিত হয়,
আমরা সান্ত্বনা পাই অন্তরে -
নিজের বাবা, ভাই কিংবা নিকট আত্মীয়ের তো আসে নি মৃত্যুর সমন !!
যখন কোনো মা কিংবা বোন লাঞ্ছিত হয়, ..হাঁফ ছাড়ি নিজের নয় বলে !! ...
......দিনেদিনে বড়ই বেহায়া হয়ে যাচ্ছি !!
নির্লজ্জতায় সীমাহীন -
স্বীয় নয়--স্বকীয় নয়--আত্ম নয় বলে
চরম আত্মকেন্দ্রিক কিংবা পশুতে রূপান্তরিত !!
এটা কোন জাতিসত্ত্বা হতে পারে না।
হিংস্র জানোয়ার বা শ্বাপদের ও
স্বজাতির প্রতি মমত্ববোধ থাকে,
অথচ আমরা!!
কি অবলীলায় ভুলে যাই স্বাজাত্যবোধ।
...
.....ভঙ্গুরপ্রায় বাঙালী জাতিসত্ত্বাকে তিরস্কার করে বলছি --
ঘুমন্ত যুব সমাজকে ধিক্কার দিয়ে বলছি --
কাপুরুষ, ঘরকুনো, আত্মকেন্দ্রিকদের
চরম ঘৃণাভরে বলছি --
এভাবে বেঁচে থাকাকে বেঁচে থাকা বলে না,
পিশাচ-শত্রুকে আলিঙ্গনে বাঁধাকে মহত্ত্ব বলে না,
পাশবিকতার সাথে নমনীয়তাকে আহম্মকি বলে !!
...
.....এখনও সময় আছে,
ঐক্যের হাতিয়ারে সুসজ্জিত হয়ে
আর একবার পথে নেমে এসো...
....
.......
উফ্ !! কখন নিজের মধ্যে ক্রোধ জন্মে যায় আমি টের পাই না,
আমি শুধু দেখে দেখে অস্থির হয়ে যাই নিজের মধ্যে স্বাধীন হয়ে ও, স্বাধীনতার স্বাদ না পেয়ে...
ভেঙে দেই ঘর বাড়ি শূন্যতা কবিতার খাতায় ঠুকরে ঠুকরে...
ইচ্ছা করে স্বাধীন দেশের বদরক্ত মোচন করে হয়ে যাই অচেনা স্বাধীন পুরুষ...
...আর চাই না তোমাকে স্বাধীন-স্বদেশ বিবর্ণ রূপে সাজানো দেখতে....

এ পতাকা কোন্ স্বাধীনতার...!!!

এ পতাকা কোন্ স্বাধীনতার...!!!
----------------স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
"জয় হিন্দ্" বলে সুবিধাভোগী এক,
দড়ি ধরে মারলো টান,
ঊর্ধ্বাকাশে তুলে হাত...
...তারপর আগডুম-বাগডুম বালখিল্য সজ্জায়-শব্দে-ক্রোধোন্মত্ত অশালীনতায়..
..নিমেষে কচি-কাঁচাদের মনের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলে এতদিনের লালিত তে-রঙ্গা দাগগুলো...
...অপসৃত শিক্ষামূর্তির মতো...
....
......
ধন-ধান্যে পুষ্পে ভরা..
কুশীলব সব,
গগন বিদারী শব্দে হৃদয় উদ্বেলিত করে...
বল,বল,বল সবে...
মৌমাছিদের অবিচ্ছিন্ন অনন্ত গুঞ্জনে...
ধান্য খসে-পুষ্প খসে...
....মন্দির সোপান-তলে,
দ্রৌপদীর বস্ত্রের মতন--
কৃষ্ণ বরণ হাল ধরে বেঁচে থাকে ধুঁকে ধুঁকে..
জলে ভাসা বঁড়শির শোলার মতন--
...
.....
মাতৃচিহ্ন তিরোহিত হয়ে মৃত্তিকা ও মানবের সমকক্ষ আজ...
স্বাধীনতার পতাকায় আজ ভ্রান্তমনা সবুজের অগ্রাধিকার...
যাদের কাছে পতাকার আবেগ,
বহুজাতিক সংস্থা কৃত অনিচ্ছাকৃত ভুলের মতো...
ধুলোয় লুটোয় কাজ-শেষে আবেগ আমার স্রেফ মুদ্রার মূল্যে ক্রীতের কারণে...
....
......
রাজপথ জনাকীর্ণ নতুন নতুন দেশপ্রেমিকে -
যাদের পবিত্র আবেগের মজা লুটে নেয়,মুখোশ সম্মুখে ধরে হাস্যমুখী কিছু নৃশংস জল্লাদ...
....
......
ধুলো ঢাকে আসল ইতিহাসকে,নতুন ইতিহাস সৃষ্টির আনন্দে...
রক্তে-রক্তে রক্তবীজের ঝাড় বাড়িয়ে তোলে সোয়াইন্ ভাইরাস...
আগত-অনাগত সন্তানেরা চোখ ঢাকে, ঐক্যহীন, ক্লীব অপবাদে;
বলপূর্বক-ত্যাগভ্রষ্টা জননী কাঁদে - অসহায় হয়ে নব-নব শিকারী-শিকারিনীর ফাঁদে...

স্বাধীনচেতা এবং .....

"স্বাধীনচেতা এবং ....."
``````````````````````````````
(গল্পচ্ছলে অশান্ত সেই দিনগুলির কিছু ঘটনা জীবিতাবস্থায় আমার বাবা স্বর্গীয় ডঃ হরিপদ আচার্য আমায় বলেছিলেন । তারই কিয়দংশের সঙ্কলন করে এই ঘটনাটি আংশিক সত্য ও আংশিক কল্পনার বুননে সৃষ্ট ।কারোর জীবনের সাথে ঘটনাটির সামান্যতম মিল বা চরিত্রগুলির সাথে সামান্যতম মিল থাকলে তা সম্পূর্ণভাবেই অনিচ্ছাকৃত । অশান্ত সময়ের দলিলরূপ এই গল্পটি পাঠক-পাঠিকাদের মনোগ্রাহ্য হলেই আমার এই রচনার সম্পূর্ণ সার্থকতা ।)
--বিনীত
----------শিবাশিস্ আচার্য----------

আজ "নির্ভয়া" আন্দোলনের চতুর্থ দিন। দাঁড়িয়ে আছি রামলীলা ময়দানের মূল মঞ্চ থেকে হাত ত্রিশেক দূরে। মঞ্চে উপস্থিত তরুণ-তরুণীরা মুহূর্মুহূ "শেম্..শেম্" শ্লোগানে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলছে। আমার সামনে মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। গত কয়দিন ধরেই সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে । দুটি তরুণীকে প্রতিদিনই দেখি, ক্লান্তিহীনভাবে শ্লোগান দিয়ে যায়। কখনও মঞ্চে দাঁড়িয়ে, কখনও বা জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে। ওদের পাশেই থাকে আরও অনেক তরুণ-তরুণী। এখন অবশ্য মঞ্চের উপর দুই একজন নামী-দামী মানুষের উপস্থিতিও দেখতে পাচ্ছি। এতদিন তাঁরা কোথায় ছিলেন কে জানে! চারদিক থেকে মুহূর্মুহূ শ্লোগান উঠছে ধর্ষণাপরাধীদের বিরুদ্ধে, শ্লোগান উঠছে ধর্ষকমুক্ত দেশ আর ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পক্ষে। শ্লোগান চলছে ন্যূনতম নিরাপত্তার দাবীতে । তাদের একটাই দাবী, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির লিখিত প্রতিশ্রুতি...
...প্রতিটি শ্লোগানের সাথে সাথে আমার শরীরেও বিদ্যুত্ খেলে যাচ্ছে, শিহরণ টের পাচ্ছি। বার বার মনে হচ্ছে, ওদের সাথে আমিও গলা মেলাই। কিন্তু কেমন যেন আড়ষ্ট লাগছে! শত হলেও বয়সটা তো আর বশে নেই, কিশোরী মেয়ের বাবা, মেয়ের মত করে তো আর লাফালাফি করার বয়স নেই। কিন্তু মন মানে না। যতই হোক, আমিও তো মেয়ের বাবা । এইজন্যই অফিস ছুটি হতেই চলে আসি এই তারুণ্যের কর্মযজ্ঞে শামিল হতে। রাত দশটা পর্যন্ত থাকি। কাছেই বাড়ী । কিছুই করি না, শ্লোগানও দেই না, শুধু উপস্থিত থাকি। ভালো লাগে, শরীরে বিদ্যুত্ খেলে যায়।
আমি জন্মেছি এক দুঃখী মধ্যবিত্ত পরিবারে, বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে, অন্ধের যষ্টি। ছেলেবেলায় বাবা মায়ের চোখের আড়াল হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। জীবনে অনেক হারিয়েছেন বলেই তাঁদের সমস্ত মনোযোগ আমার উপরে ঢেলে দিয়েছেন। তাঁরা বুঝতেও পারেন নি, এতে করে আমার মনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় নি, মেধাবী হলেই যে সব সার্থক হয় না, এই ব্যাপারটি হয়তো বা তাঁদের বোধে আসেনি। বাবা মায়ের অধীনে থাকতে হতো বলেই বোধ হয় মনের গভীরে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করেছিল বয়ঃসন্ধি থেকেই। কিন্তু বিদ্রোহ করার মত পূর্ণ স্বাধীনতাটুকুও আমার ছিল না।
কলেজে ভর্তি হয়ে যোগ দিতে শুরু করি শাসন বিরোধী আন্দোলনের মিছিলে। বাবা-মাকে লুকিয়ে মিছিলে যেতাম, গলা চিরে শ্লোগান দিতাম। অপশাসনের বিরুদ্ধে মনের ভেতর একটা রাগ পোষা ছিল। সব সময় মনে হতো, সব ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবো। খুব বেশীদিন পারিনি মিছিলে যেতে। একেকদিন ছাত্র আন্দোলনের তাজা খবর পেয়েই বাসা থেকে সমন জারি হতো, অতি দ্রুত বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য। আমিও মাথা নীচু করে বাসায় ফিরে মায়ের আঁচলের নীচে মুখ লুকোতাম। কী করবো, বাবা মায়ের ভয়কেও অগ্রাহ্য করতে পারতাম না।
এরপর আর দশটি সাধারণ গেরস্তবাড়ীর লক্ষ্মীছেলের মত আমিও ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরেই চাকুরীতে ঢুকে গেলাম, রোজ সকাল-বিকেল অফিস করতে করতে একসময় অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। বাবা-মায়ের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করে দিব্বি সংসার পেতে বসলাম। ছেলেদেরও যে বিয়ের আগের জীবন আর বিয়ের পরের জীবন বলে কিছু থাকে, তা আর প্রকাশিতই হলো না। মাঝে মাঝেই আমার স্ত্রী আক্ষেপ করে বলে “ইস! বিয়ের আগের জীবনটা কত স্বাধীন ছিল, বিয়েটা করেই যেন সংসার শেকলে বন্দী হয়ে গেছি”। ওকে বলি কী করে, “ তোমার তো তাও বিয়ের আগে স্বাধীন জীবন ছিল, আমার তো তাও ছিল না”।
...
......
আজ বুকের ভেতর খুব অস্থিরতা টের পাচ্ছি। একজনের মুখ খুব বেশী করে মনে পড়ছে, তিনি আমার বউ-ঠাকুমা, সম্পর্কে আমার বাবার কাকীমা। চার বছর আগে আমাদের ছেড়ে শান্তি-নিলয়ে পাড়ি দিয়েছেন একা...। বয়স হয়েছিল প্রায় সাতাশির কাছাকাছি। কিছুটা ছিট্গ্রস্ত ছিলেন, ঠিক ‘পাগল’ বলা যাবে না, আবার সম্পূর্ণ সুস্থও বলা যাবে না। এলোমেলো মাথায় বিলাপ করে বারবার বলতেন, “ঠাকুর গো, এই পরাধীন জীবন আর ভাল লাগেনা, আমারে লইয়া যাও, তুমার ছিচরণে ঠাঁই দেও গো”। ছোট ছিলাম বলে স্বাধীন বা পরাধীনের পার্থক্য বুঝতাম না। ঠাকুমাকে দেখেছি, আমাদের মত করেই ভাত খায়, ঘুমায়, স্নান করে, তাহলে আবার স্বাধীনতা চায় কেন? এটুকু বুঝতাম, ঠাকুমা আমাদের মত সব কাজ করলেও তাঁর মনে অনেক দুঃখ। মাথা গরম হলেই ভগবানের কাছে নিজের মৃত্যু কামনা করতেন আর কেঁদে কেঁদে নিজের মনেই বিড়্ বিড়্ করতেন...
....“হগ্গলে কইল... দ্যাশ্ স্বাধীন হইব, দ্যাশ্ স্বাধীন হইব... স্বাধীন ত হইছেই দ্যাশ্, কই আমার সোনাইয়ে ত ফিরা আইয়ে নাই, যত সব মিছা কথা। ঐ রহমইত্যার ঘরের দরজা থিকা এক ধাক্কা দিয়া মাইয়াডারে বাইর কইরা দিল, তারপরেই ত শ্যাখের দল আইয়া আমার মাইয়াটারে টাইন্যা লইয়া গেল, মাইয়াটা কী জুরে জুরে কানতাছিল, বাঁচাউ গ...বাঁচাউ গ করতাছিল, ওরে নেপু রে! আমি ত তরে বাঁচাইতে পারলাম না রে মা, তোর মায়ের লগে দেখা হইলে কী জবাব দিমু, মা রে! আমারে এমুন কইরা দোষের ভাগী কইরা কই গেলি তুই!”।
...মাঝে মাঝে বাবা হয়তো বা ধমকে উঠতেন,
..“খুড়ীমা, ইডি কী কন? আপনেরে কত বার কইছি, মাইয়া আপ্নের স্বর্গে আছে, শান্তিতে আছে, এইভাবে কাইন্দেন না। মাইয়াটার আত্মা কষ্ট পাইব । হেইটা তো ’৬৪ সালেই শেষ হইয়া গ্যাছে। এখন আর পুরান দিনের কথা ভাইব্যা বিলাপ কইরেন না। দেশ স্বাধীন হইয়া গ্যাছে, এমুন কথা আর কইয়েন না”।
...আমি বড়দের কথা কিছুই বুঝতাম না, আবার কাউকে জিজ্ঞেস করার সাহসও হতো না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই সবাই বকা দিত, বড়দের কথায় থাকতে হয় না বলে। তবে এটুকু বুঝতাম, কোথাও কিছু গোলমাল আছে, আমি ছোট বলে আমাকে বলা হচ্ছে না।
..সোনাই পিসী হচ্ছে বউ-ঠাকুমার সৎ মেয়ে। বউ-ঠাকুমার এই বিলাপ শুনতে শুনতেই আমি বড় হয়েছি। একবার ঠাকুমার ছোটমেয়ে মণি পিসীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“ঠাকুমা এমন করে কাঁদে কেন? তুমি কাছে গিয়ে আসল কথাটা বুঝিয়ে বলতে পারো না? আর স্বাধীন দেশের কথা কী বলে গো? দেশ তো স্বাধীন হয়েছেই, এখন আর নতুন করে কী স্বাধীন হবে?"
পিসী বলে,“লাভ নাই কইয়্যা, মায়ের মাথা গোলমাল হইয়া গেছে, সোনাইয়ের ফিরা আসনের রাহা দ্যাহে”।
“সোনাই পিসীর কী হয়েছিল, কিভাবে মারা গেল?"
...
....“তোর জন্মের আগের ঘটনা এইডা, পাকিস্তান আমলে ঘটছিল,’৬৪ সালে একবার রায়েট হইছিল, নোয়াখালি আর মীরপুর থিক্যা মুসলমানেরা আইস্যা নারায়ণগঞ্জে অনেক হিন্দুরে কাইট্যা ফালাইছিল। শুধু সোনাই দিদিই না ত, আমাগো বাড়ীর আটজনরে মাইরা ফেলছিল। থাউক, আর কমু না, তুই ছোট, তোরে এগুলি বলা ঠিক না”।
...“আমি ছোট না, ক্লাস সিক্সে পড়ি। আমি কাউকে বলবো না। আমার জানতে ইচ্ছা করে”।
...“আমার সোনাই দিদি তখন পোয়াতী আছিল, নিয়ম আছে, প্রথম বাচ্চা বাপের বাড়ীত্ হইতে হয়, ঐজন্যই দিদিরে মায়ের কাছে আনছিল। রায়েটের সময় আমাগো গ্রামে অ্যাটাক হইছিল তো, তখনই সোনাই দিদি মারা যায়।"
“পুরো ঘটনা বল”।
“তুই বুঝবিনা ত, তরে এগুলি বলা ঠিকও না, তোর মায় জানলে আমারে অনেক বকবো”।
“মাকে কিছু বলবো না, কিরা কাটলাম, কিচ্ছু বলব না”।
“শোন, সোনাই দিদি আমার আপন বইন না, সৎ বইন। দিদিরে ছোট থুইয়া আমার বড়মা মারা গেছিল, তখন আমার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে। তোর বউ-ঠাকুমা হইতাছে আমার বাবার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। বুঝতে পারছস?”
“হ্যাঁ, তুমি তাড়াতাড়ি আসল গল্প বলো, মা এসে পড়লে আর বলতে পারবে না”।
“পুলারে! তুই বড় নাছোড়বান্দা। কী জানি কোন বিপদে ফেলবি আমারে! বড় বৌদিরে আমি অনেক ভয় পাই। আসলে অনেক কষ্টের গল্প তো, ছোট মানুষের শুনতে নাই। কাউরে কইস না। রায়েট মানে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা। ’৬৪ সালে রায়েট হইছিল। অনেক দিন পার হইয়া গেছে, তখন তো পাকিস্তান আমল আছিল, এখন স্বাধীন দ্যাশে এইসব পুরানো কথা কেউ মনে করতে চায় না।
- ঠাকুমা যে মাঝে মাঝে রহমইত্যার কথা বলে, রহমইত্যা কে?
-গ্রামে আমাদের প্রতিবেশী আছিল রহমত চাচা। আমাদের কাকা জ্যেঠাদের সাথে হ্যার খুব খাতির ছিল। রহমত চাচা ছাড়াও আরও কিছু মুসলমান পরিবার ছিল আমাদের সজ্জন প্রতিবেশী। রায়েটের সময় হিন্দুরা যে যেভাবে পারছে মুসলমান প্রতিবেশীদের বাড়ীতে লুকাইছে। আমরাও দল দল ভাগ কইরা একেক বাড়ীতে গিয়া আশ্রয় নিছিলাম। সোনাই দিদিরে আমার অন্য দুই কাকীমার সাথে পাঠানো হইছিল রহমত চাচার বাড়ীতে। দিদি মাত্র শ্বশুরবাড়ী থিক্যা আসছে, সাথে অনেক গয়না আনছিল, সেগুলি পোঁটলায় কইরা লইয়াই চাচার বাড়ীত্ গেছিল। আমার মায়ও তাদের পিছন পিছন রওনা দিছিল, কিন্তু কেমনে জানি একটু পিছনে পইরা গেছিল, ভিতর বাড়িতে ঢুকার আগেই কাছে পিঠে ‘আল্লাহু আকবর’ শুনতে পাইছে। আর কোন দিশা না পাইয়া ঐ বাড়ীর খড়ের গাদার পিছনে লুকায়ে পড়ছিল।
ঐখান থিক্যাই দেখতে পাইছে সব, একদল মানুষ চাচার বাড়ীর উঠানে আইসাই হিন্দুগোরে ঘর থিকা বাইর কইরা দিতে কইছে। ওগো হাতে আছিল দাউ, কুড়ালি, চাক্কু। ঘরের ভিতরে কী হইছে, সেইটা তো আর মায় দেখে নাই, শুধু দেখছে, পূব দিকের ঘর থিকা সোনাই দিদি, আর দুই কাকীমারে ধাক্কা দিয়া বাইরে বাইর কইরা ঘরের দরজা বন্ধ কইরা দিতে। দিদি আছিল ভরা পোয়াতী, ধাক্কা সামলাইতে না পাইরা উঠানে পইরা গেছিল। দলের অমাইনষেরা দিদিরে টানতে টানতে লইয়া গেছে, আর আমার দুই কাকীর চুলের মুঠি ধইরা নিতে দেখছে মায়। সবাই হাউ মাউ কইরা কানতাছিল, ছাইড়া দ্যান ছাইড়া দেন, আমরা মুসলমান, আমগোরে ছাইড়া দ্যান, করতাছিল। মায় আর স্থির থাকতে পারে নাই, খড়ের পেছন থিকা এক দৌড়ে ছুইট্টা বাইর হইছিল, চীৎকার কইরা কইছিল,
“অরা সবাই মুছলমান, অগোরে নিয়েন না। ও রহমত ভাইজান গো, আপনে কই আছেন গো, আমার মাইয়ারে লইয়া যাইতাছে গা ধইরা”।
রহমত চাচায় মনে লয় বাড়ীতে আছিল না, থাকলে এই আকাম হইতে দিত না। যাই হউক, তিনজনেরে লইয়া একদল সামুনে আউগাইয়া গ্যাছে, আরেক দল মায়েরে ধরছে।
--হায় হায়, বউ-ঠাকুমাকেও ধরেছিল? ঠাকুমা কিভাবে বাঁচলো?
জানিনা, মায় মনে হয় ঐ মুহূর্তেই পাগল হইয়া গেছিল। মা’রে ‘পাগল’ কইয়া অরা ছাইড়া দিছে।
-তাই নাকি? কী বল, আশ্চর্য তো!
হ, মায়েরে জিগাইছে, অই মাইয়্যা, তুই হিন্দু না মুছলমান? মা কইছে, আমি মুছলমান, আমার ভাইজানের বাড়ীত্ বেড়াইতে আইছি।
আরেকজন জিগাইছে, তুই মুছলমান হইলে কলমা ক। মায় ত কলমা জানতো না, জবাব দিছে, কলমা কি? আল্লাহু আল্লাহু? আমি ত আল্লাহু কইলাম।
তখনই একজন হাতের কুড়ালি উঠাইছিল ঘাড়ে কোপ দেওনের জইন্য।। কিন্তু মার কপাল ভাল, আরেকজন বাধা দিছে, কইছে, আরে! এই মাইয়্যা পাগল। হ্যায় মুছলমানই হইব, দেখস না পায়ে চামড়ার জুতা পইরা রইছে। এই তে মায় বাঁইচ্যা গ্যাছে”।
-চামড়ার জুতা মানে? হিন্দুরা জুতা পরতো না?
-না, গরুর চামড়া দিয়া জুতা বানায় ত, তাই হিন্দু মহিলারা চামড়ার জুতা পরতো না। বাড়ীর থিকা পলানের সময় কাকার চামড়ার স্যান্ডেল পইরা মনে হয় রওনা দিছিল।
-আচ্ছা, ঠাকুমা তো শুধু দেখেছে, সবাইকে টেনে নিয়ে যেতে, মারতে তো দেখে নি। এমনও তো হতে পারে, তারা বেঁচে আছে, হয়তো বা ঐ লোকগুলির বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করছে।
-নাহ্ ! ঐটা হইলে ত আর কোন কথা ছিল না। মানুষগুলি প্রাণে বাঁইচ্যা আছে, এইটাও একটা সান্ত্বনা থাকতো। তিনজনের গলাকাটা লাশ পাওয়া গেছিল। দুই কাকীরে নদীর পাড়ে নিয়া গিয়া ইজ্জৎ লুইট্যা নিয়া জবাই করছে। সোনাই দিদির গলা কাটা লাশ পাওয়া গেছিল পাশেই ধান ক্ষেতে..পচ্ছাবের জায়গায় তিন-চাইরটা মুটা-মুটা বাঁশের কইঞ্চি ঢুকানো আছিলো...গলা বুজে আসে পিসীর ।
....
.....আর কিছু জানিনা। ঐ ঘটনা দেখার পর থিক্যা মায়ের মাথায় গোলমাল দেখা দেয়।”
-তুমি কোথায় ছিলে? আর এত কথা জানলে কীভাবে?
- গ্রামের মানুষেই কইছে, তারা না কইলে জানতাম কই থিক্যা? আমারে লইয়া সোনা জ্যেঠিমায় ফটিক চাচার বাড়ীত্ আশ্রয় নিছিল।”।
-তাহলে তো ফটিক চাচারা অনেক ভাল মানুষ। তোমাদের জীবন যে বাঁচাল তাঁরা, তাঁদের কোন পুরস্কার দেয় নি দাদুরা?
-তাতো ঠিকই। দুনিয়ায় ভাল খারাপ সবই আছে। রহমত চাচা নিজে ভাল মানুষ, ওনার পরিবারের মানুষরা এই কাজ টা করছে, চাচা বাকী জীবন অপমানে মুখ লুকায়ে থাকছে। সোনা জ্যেঠার হাত ধইরা অনেক কান্দছে। সোনা জ্যেঠা নিজে ফটিক চাচারে তিন বিঘা ফসলী জমি দান কইরা দিছে। যাক, এই কথা আর কারোরে শুনাইস না, তাইলে কিন্তু আমারে মাইরা ফালাইবো তোর বাবায় ।"
....
.........
..............মণি পিসীর কাছে এই গল্প শুনেছি স্বাধীনতার অনেক পরে, ’৭৬ সালে। যখন বউ-ঠাকুমাকে ডাক্তার দেখানোর মত অবস্থা দাঁড়ালো।
একাত্তরে এতটাই ছোট ছিলাম যে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কোন আবেগ বা অনুভূতিই তৈরী হয় নি মনে। দুই একটা ঘটনা হয়তো স্পষ্টভাবেই মনে পড়ে, আবার অনেক কিছুই আবছা আবছা মনে পড়ে। এখনও মনে পড়ে, আমার হাত ধরে মা দৌড়াচ্ছেন, বাবার মাথায় একটা কাপড়ের বোঁচকা। ক্ষিদেয় পেট জ্বলতো, স্পষ্ট মনে আছে, একটা বিরাট বড় মাঠে অনেক অনেক মানুষ, দল বেঁধে বসে আছে, চুলা জ্বালিয়ে অনেকেই রান্না করছিল, আমি মায়ের আঁচল ধরে টানছিলাম আর বলছিলাম,
“মা, আমার ক্ষিদা লাগছে। ও মা, পেটের মধ্যে কেমন জানি জ্বলে”!
মা মুখটাকে অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখেছিলেন। আমি তো জানতাম না, ওদের কাছে টাকা পয়সা ছিল না। গভীর রাতে নৌকায় করে একটা ব্রীজের নীচে দিয়ে পার হওয়ার সময় কে যেন চেঁচিয়ে বলেছিল,“ সাবধান! মিলিটারী গাড়ী আসতাসে”। এই কথা শুনেই আমাদের সবাইকে নিয়ে বাবা নৌকার পাটাতনের নীচে ঢুকে গেছিল। কী কষ্ট হচ্ছিল, আমি সবার নীচে পড়ে গেছিলাম। আরেকটু হলে দম বেরিয়ে যেতে পারতো। বাবা শরীর ঝুঁকে চেপে বসেছিল, কোমরের কশি থেকে এক গোছা টাকা বোধ হয় তখনই নৌকার পাটাতনে পড়ে গেছিল। বাবা জানতেই পারেনি, কখন কোথায় টাকাগুলো পড়ে গেছে। এক ফাঁকে বোধ হয় মায়ের সাথে বাবার কথা কাটাকাটিও হয়ে গেছে। টাকার শোকে মা ‘নি-মুরাইদ্যা মানুষ’ বলে বাবাকে গালি দিয়েছিল। ‘নি-মুরাইদ্যা মানুষ’ কাকে বলে, তখন বুঝিনি, এখন এই মধ্য বয়সে এসে বুঝি, কী কঠিন গালি এটা! অন্য সময়ে বাবা কী করতো জানিনা, কিন্তু সেদিন মায়ের কথায় কোন উত্তর দেয় নি। কারণ, মায়ের গয়না বেচার টাকা ছিলো ওগুলো...
মায়ের কান্না দেখে আমি সাথে সাথে চুপ করে গেছিলাম। তার একটু বাদেই আমাদের বউ-ঠাকুমাকে একেবারে উন্মাদ অবস্থায় আমার বাবার সামনে নিয়ে আসা হলো। দুই কাকা দুই দিক থেকে ধরে রেখেছিল ঠাকুমা’কে। বাবা হচ্ছে গোষ্ঠীতে সবার বড়, তার সকল ভাই-বোনের চোখে ‘বড়দা’ হিসেবে পরিচিত। বউ-ঠাকুমা’কে বাবার সামনে এনে এক কাকা বললো,
“বড়দা, মায়েরে লইয়া কী করুম? কোনভাবেই বর্ডার পার হইতে চায় না। জোর জবরদস্তি কইরা কোনমতে বর্ডার পার করছি, বার বার খালি গ্রামে ফিরা যাইতে চায়। মিলিটারীর গুলি খাইয়া তো মরবো !!
ঠাকুমা একটা কথাই বার বার আওড়াচ্ছিল,
“আমি আমার ঘর ফালাইয়া কুনখানে যামু না। সোনাই ফিরা আইব, আমারে বাড়ীতে রাইখ্যা আয়”!
টাকার শোকে বাবার মন খারাপ ছিল, তার উপর মা বাবারে খোঁটা দিয়েছে, তবুও বাবা বউ-ঠাকুমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল,
“খুড়ীমা, আমরা গ্রামের বাড়ীতে সবাই মিলেই যামু। গ্রামের বাড়ীতে থাকা তো এখন নিরাপদ না, যুদ্ধ শুরু হইয়া গ্যাছে, যুদ্ধ শেষ হইয়া যাইব, দেশ স্বাধীন হইব, স্বাধীন দেশে আমরা সবাই মনের আনন্দে থাকুম। এখন এমন পাগলামী কইরেন না, সময় খুব খারাপ। এত ছুড পুলা মাইয়া গুলির লগে এমুন পাগলামী করলে ওরা কী করবো কন তো! পরাণ কাকাও বাঁইচ্যা নাই, এই ছেলেগুলারে আর কষ্ট দিয়েন না। চলেন আমরা সবাই আগে একটা নিরাপদ জায়গায় গিয়া পৌঁছাই, এরপরে এই বিষয়ে কথা কমু”।
বউ-ঠাকুমা শান্ত হয়ে গেছিল, নতুন প্রলাপ শুরু হয়েছিল,
“ভাসুরপো কইছে, দ্যাশ স্বাধীন হইলেই আমরা সবাই একসাথে বাড়ীতে থাকুম, আর কোনদিন হালার পুতেরা আইবো না, সোনাইরে ফিরা পামু। ওরে আর কেউর বাড়ীতে পাঠামু না”।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটু একটু করে বড় হতে হতে সব জেনেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাঁচ মাসেরও বেশী সময় আমরা কলকাতাতে ছিলাম। আমাদের এক দূর সম্পর্কের কাকার বাসায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেই কাকার আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে দুই বেলা রুটি আর ঝোলা গুড় যোগাড় করতেও কাকার দম ফুরিয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। আমি আটার রুটি দুই চক্ষে দেখতে পারতাম না, তার উপর কন্ট্রোলের দেওয়া আটার রুটির মধ্যে বালি কিচ্ কিচ্ করতো। ভয়ের চোটে ক্ষিদে পেলেও কিছু বলতাম না। কিছুটা কোনরকমে খেয়ে বাকি রুটি ছিঁড়ে কাকের দিকে ছুঁড়ে দিতাম। একদিন শুধু মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“মা, আমরা কী সারা জীবন এইখানেই থাকব?”
-না বাবা, দেশ স্বাধীন হলেই আমরা দেশে ফিরে যাব।
-কবে হবে দেশ স্বাধীন?
-দেশ স্বাধীন করার জন্যই তো যুদ্ধ করছে মুক্তিযোদ্ধারা।
-দেশ স্বাধীন হলে কি আমরা আবার ভাত খেতে পারব?
-হ্যাঁ রে বাবা! ভাত খেতে পারবে। এত খাই খাই করো কেন? আমার আর ভালো লাগে না। এইখানে তোর কাকার কত কষ্ট হচ্ছে এতগুলি মানুষের খাওয়ার যোগাড় করতে। এর মধ্যে তুই একটাও রুটি দাঁতে কাটতে চাস না। এমন করলে আমার ভাল লাগে?
-মা, রুটি মুখে দিলে দাঁতে সিরসির করে, সারা শরীরে সিরসির করে।।
-এখন আর কয়টা দিন মুখ বুজে থাক, দেশ স্বাধীন হয়ে গেলেই আমরা নিজেদের বাড়ী ঘরে ফিরে যেতে পারবো। তখন যত ইচ্ছে ভাত খাইস।
এই কলোনিতে আমার বাবার পরিচিত অনেক মানুষ থাকতো। রায়টের পরেই সবাই গ্রাম ছেড়ে দল বেঁধে চলে এসেছিল। তখন থেকেই এরা পাশাপাশি ঘর তুলে থাকতে শুরু করে। আমার সাথে মা যখন দেশ স্বাধীন হওয়ার গল্প করছিল, বউ-ঠাকুমা পাশের লাগোয়া ঘরের বারান্দায় বসে মাথা আঁচড়াচ্ছিল আর উকুন মারছিল। একটা করে উকুন মারে আর বলে,
“অ চঞ্চলের মা, পোলারে মিথ্যা কথা শোনাও ক্যান? দেশ স্বাধীন হইব না, আমার সোনাই রে অরা ধইরা লইয়া গেছে গা, আমি অভিশাপ দিতাছি, আমার বুকে যেই আগুন জ্বলতাছে, সেই আগুন না নিভা পর্যন্ত কুন স্বাধীনতা নাই”
-খুড়ীমা, কি কন এইসব! স্বাধীনতা আইব না কন ক্যান? স্বাধীনতা আনার লেইগ্যাই তো যুদ্ধ হইতাসে। আপনার সোনাইরে যারা ধইরা লইয়্যা গ্যাছে, তাদের সাজা দেওনের লেইগ্যাই যুদ্ধ। অন্তর থেকে আশীর্বাদ করেন যেন দেশ স্বাধীন হয়, আমরা যার যার বাড়ীতে ফিরা যাইতে পারি। পরের অন্ন ধ্বংস করতাছি, মনটা খারাপ থাকে সব সময়। পোলাটা রুটি খাইতে পারে না, এক মুঠ ভাতও যোগাড় করতে পারি না, অথচ দেশে গোলা ভরা ধান পইড়্যা আছে।
-হ, থাউক গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ! যেই খারাপ অরা, মুক্তিযুদ্ধারা অগো কিচ্ছু করতে পারব না। ইস রে, আমার চউক্ষের সামনে পোয়াতি মাইটার প্যাটের উপরে খাড়াইয়া লাফাইছে অরা! কত যন্ত্রণা দিয়া মারছে রে!!!!!
এমনটাই চলতো সারাদিন। আমি মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়াতাম। একদিন আমার বাবা দৌড়াতে দৌড়াতে কলোনির ভেতর আসছিল আর বলছিল,
“দ্যাশ স্বাধীন হইয়া গেছে, দ্যাশ স্বাধীন হইয়া গেছে! কই আমার খুড়ীমা কই, খুড়ীমা, আপনেরে কইছিলাম না? দ্যাশ ঠিকই স্বাধীন হইব, হালারা পলাইছে, পাকিস্তানী মিলিটারী গো অবস্থা কাহিল কইরা ফালাইছে মুক্তিযুদ্ধারা। সবাই শুন, এখন থিক্যা আর পাকিস্তান কইবা না, ভুইল্যাও কইবা না, এখন থিক্যা নতুন নাম, "বাংলাদেশ"। খুড়ীমা গো, আর চিন্তা নাই, এইবার যামু স্বাধীন দেশের নাগরিক হইয়্যা”।
১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো, আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলাম ২৬শে ডিসেম্বর সকালে। কলোনির অনেকেই বলেছিল,
“দেশে গিয়ে কাজ কি? আবার দৌড়াতে হবে। তার চেয়ে এখানেই থাকো, শান্তিতে থাকতে পারবে”।
বাবাকে আটকে রাখার সাধ্য কারোই ছিল না। বাবা প্রায়ই বর্ডার এলাকায় চলে যেত, খুব ইচ্ছে ছিল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার। কিন্তু আমাদের পরিবারে নারী ও কম বয়েসী কিশোর-কিশোরীর সংখ্যাই বেশী ছিল, সমর্থ পুরুষ বলতে একমাত্র আমার বাবাই ছিল। তাই ইচ্ছে থাকা সত্বেও মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেন নাই। মনের মধ্যে চাপা কষ্ট ছিলই। মাঝে মাঝেই বলতেন,
“দূর, এই পরাধীন জীবন আর ভাল্লাগে না। কবে যে দেশ স্বাধীন হইব!
...
.....
.........মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আমরা নারায়ণগঞ্জে থাকতাম, মণি পিসীরা থাকতো গ্রামের বাড়ীতে। দেশ স্বাধীন হতেই মণি পিসীরা গ্রামের বাড়ীতে চলে গেল, আমরা শহরের বাড়ীতে ফিরে এলাম। প্রথম প্রথম মনে বেশ ফূর্তি টের পেতাম, কিছুই বুঝতাম না, তবুও বড়দের সাথে তাল মিলিয়ে বলতাম,
“এখন আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক”।
তখন বউ-ঠাকুমাও মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। সোনাই পিসীর জন্য বিলাপ করতেন না। এভাবেই ’৭৫ এর ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত চলছিল, ১৫ই আগস্ট সকালেই সব কিছু বদলে যায়। আরেকবার দেশে খারাবি নেমে আসে। গ্রামের বাড়ী থেকে খবর আসতো, বউ-ঠাকুমা আবার প্রলাপ বকা শুরু করেছে। ভুলভাল বলতো না অবশ্য, মুজিবররে মাইরা ফেলছে যারা, তারাই নাকি তার মাইয়ারে লইয়া গেছে!
ধীরে ধীরে গ্রামের হাওয়া পাল্টাতে শুরু করে। রহমত চাচার ছেলেরা মাতব্বর হয়ে উঠে। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে রহমত চাচার ছেলেরা আমাদের বাড়ীর টিনের চাল, কাঠের পাটাতন সবই খুলে নিয়েছিল, এত তাড়াতাড়ি দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে, তারা ভাবে নাই। বাবার জ্ঞাতি পুরুষেরা গ্রামে ফিরে নতুন করে সব গড়ে নিয়েছিল। কিন্তু ’৭৫ এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সাথে সাথেই সব ওলোট পালোট হয়ে যায়। রহমত চাচা আরও অসহায় হয়ে পড়েন, ছেলেদের শাসনে থাকতে হতো বলে অন্যায় দেখেও চুপ থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর বছর খানেক পরেই উনিও মারা যান। মৃত্যুর আগে একদিন আমার বাবাকে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন দেখা করতে চান বলে, বাবাকে কাছে পেয়ে দুই হাত চেপে ধরে কেঁদেছিলেন। রায়টের সময় তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর বাড়ীতে আশ্রিত তিন নারীকে গয়নাগাঁটি রেখে বের করে দেয়া হয়েছিল, অসহায়ভাবে তাদের মৃত্যু হয়, ব্যাপারটি ওনাকে অনেক মানসিক কষ্ট দিচ্ছিল, এটা বলার জন্যই ডেকেছিলেন। শেষ মুহূর্তে বাবাকে চমকে দিয়ে একটি পোঁটলা বাবার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন,
“আমার সোনাই মায়েরে তো ফিরায় দিতে পারলাম না, তার গয়নাগুলি এই বাড়ীর সিন্দুকে আছিল, তোমার হাতে তুইলা দিয়া নিশ্চিন্তে মরতে চাই”।
বাবা ওনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন,
“চাচা, আমাদের বিশ্বাসটাই ভাইঙ্গা গেছে যেখানে, সেখানে এই গয়না দিয়া কী হইব। আপনি আমারে ডাকছেন, বুড়া মানুষ এইভাবে কান্দতাছেন, পুতেদের অপকর্মের দায় নিয়া জ্বলতাছেন, এইটা দেইখা আমার একটুও সুখ হইতাছে না। কয়টা গয়নার লোভে ওরা তিনটা নারীরে এইভাবে পশুগো হাতে তুইলা দিছিল, এই গয়না ওদেররেই দিয়া দেন। আপনে কাইন্দেন না, গত বারো বছর ধইরা নরকের আগুনে পুড়তাছেন আপনি। আপনের বিরুদ্ধে আমাদের কোন নালিশ নাই”।
’৭৭ সালের দিকের ঘটনা, রহমত চাচার ছেলেরা এক রাতে আমার দুই দাদুকে ডেকে শাসায়, প্রাণে বাঁচতে চাইলে যেন ওনারা বাড়ীঘর তাদের কাছেই বিক্রী করে দিয়ে ইন্ডিয়া চলে যায়। দাদুরা পালটা প্রশ্ন করতে সাহস পায় নি, কেন বাড়ীঘর বিক্রী করতে হবে। উড়ো খবর শুনেছে, আপোসে না দিলে নাকি বাড়ী জবরদখল করে নিয়ে যাবে।
বউ-ঠাকুমা আর মণি পিসীকে নিয়ে তরুণ কাকা কলকাতায় বউবাজারের এক অন্ধকার গলিতে বাসা ভাড়া নেয়, সেখানে থেকেই আমার কাকার রেজাল্ট ভালো থাকা সত্ত্বেও অনেক তদ্বির করে একটি বেসরকারী কলেজে অধ্যাপনার চাকুরী পেয়ে যায়। বাকী জ্ঞাতি-গুষ্টিও বেশির ভাগ এক কাপড়ে আগরতলা হয়ে কলকাতা চলে গিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে ।
--------
রহমত চাচার ছেলেরা দুই দাদুকে আদৌ টাকা পয়সা দিয়েছিল কিনা, কেউ জানে না। কলকাতা গিয়ে দাদুরা বেশীদিন বাঁচেন নি, আর বউ-ঠাকুমা কলকাতা এসেই পুরোদমে পাগল হয়ে যান। কাকার পকেটের জোরও তেমন ছিল না। তাই বড় ডাক্তার দেখানোর বদলে পাড়ার ডাক্তারের কাছ থেকে হোমিওপ্যাথির পুরিয়া, নাহলে মাদুলী, তাবিজ কবচেই চিকিৎসা সীমাবদ্ধ ছিল। আমার বাবাও খুব একটা সাহায্য করতে পারতেন না, ওনারও তো একই অবস্থা, দেশের বাড়ীর সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে গেছে, কলকাতা শহরের ভাড়া বাড়ীতে থেকে সওদাগরী আপিসে কেরাণীগিরি করে কত টাকাই বা আয় করেন! একমাত্র সন্তান আমাকে নিয়েই সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখেছেন। খুব একা হয়ে গেছিলেন বলেই আমাকে অমন আগলে রাখতেন।
এইসব দেখে দেখে কখন যেন আমি যুবক হয়ে উঠেছি, ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করে, কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমাদের তো আর কোন আত্মীয়-স্বজন ছিল না, কলকাতাতে বউ-ঠাকুমাকে নিয়ে তরুণ কাকা থাকতেন। প্রায়ই যেতাম ওনার বাসায়। লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করতাম, পয়সা বাঁচিয়ে বউ-ঠাকুমার জন্য টুকিটাকি জিনিস কিনে নিয়ে যেতাম। ঠাকুমা খুব খুশী হতেন। আমাকে ঠাকুমা খুব ভালোবাসতেন। শেষের দিকে আর পাগলামী করতেন না। হয়তো ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিলেন। মণি পিসীর বিয়েটাও খুব ভালো ঘরে হয়েছিল। পিসীর বর খুব বনেদী পরিবারের সন্তান। ওনাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ছিল অনেক। এতেই বউ-ঠাকুমার মাথা থেকে বাড়ী হারানোর শোকটা অনেকটা কেটে গিয়েছিল।
আমার পাশের খবর শুনে ঠাকুমা খুব খুশী হয়েছিলেন। কিন্তু এমন এক মন্তব্য করেছিলেন যে আমার বুকে ধাক্কা দিয়েছে,
“বাহ! আমাগো চঞ্চল বাবুর ভাইগ্যটা বড়ই ভাল, কেমুন ফাস্ট কেলাস পাইয়া গেছে। আমি ত মনে করছিলাম, তুমার নাম দেখলেই ফেল করাইয়া দিব।"
বলেছি, কেন, ফেল করিয়ে দেবে কেন?
-দ্যাশটা তো আর মুজিবরের দখলে নাই, রাজাকারের দখলে গেছে গা। হ্যারেও মারলো, আমাগোরেও মারলো। তোমার হিন্দু নাম দেইখা তোমারে ফেল করাইয়া দিল না, এইটা দেইখা অবাক হইছি।
-ঠাকুমা, তোমার দেখি মাথার পোকা আবার নড়তে শুরু করছে।
-ভাই রে,সাধে কি আর এই কথা কই! কত্ত বড় বাড়ী ঘর আছিল আমাগো, রাজাকারের পেটে গেছে গা। কত বড় বড় কথা শুনছিলাম, দেশ স্বাধীন হইব, স্বাধীন হইলেই আমরা মনের আনন্দে নিজের ভিটায় থাকতে পারুম। কী লাভ হইল রে ভাই, এক রায়েটে মাইয়াটারে দিলাম, আরেক রায়েটে দিলাম বাড়ী ঘর, জমাজমি। কেমনতর স্বাধীনতা পাইলাম আমরা? রহমইত্যার পুলাগো কোন বিচার হইল না”।
-ঠাকুমা, স্বাধীন দেশেই তো আছ। যা চলে গেছে, তা চলে গেছে। পুরানো দিনের কথা আর মনে করো না, আবার পাগল হয়ে যাবে। পাকিস্তান আমলের মত পরাধীন তো আর নাই তুমি। নিজেকে সব সময় স্বাধীন ভাববে।
-শুন্ চঞ্চল, তরে একটা কথা কই। মাইয়ালোকের জীবনে স্বাধীনতা বইলা কিছু থাকে না। এই যে ধর আমার কথা, আমারে তুই কী ডাকস? বউ-ঠাকুমা ডাকস। আমার পোলা মাইয়ায় ডাকে ‘মা’, তোর দাদু ডাকতো সোনাই-এর মা, শ্বশুর–শাশুড়ি ডাকতো বৌমা। আমার নাম ধইরা কেউ কোনদিন ডাকে নাই। নিজের নাম নিজেই ভুইলা গেছি।
জন্মের পরে মায় নাম দিছিল ‘শৈলবালা’, বাপ-ভাইয়েরা ডাকতো ‘শবি’ কইয়া, আমার নামটাও কেউ ঠিক মত ডাকতো না। বিয়ার পরে তো নামই হারায়া গেল।
কালা আছিলাম বইলা দোজবরে বিয়া হইছে, আমি দোজবরের লগে বিয়া করতে রাজী কিনা, এই প্রশ্নটাও কেউ করে নাই, নিজের মতামত দেওয়ার স্বাধীনতাও ছিল না। বুড়া স্বামীর সংসারে ঢুকছিই ‘মা’ হইয়া,মণি-তরুণরে নিজের মত কইরা আদর করার স্বাধীনতাও ছিল না, সোনাইরে আদর করা বা বকা দেওয়ার স্বাধীনতাও আছিল না, বকা দিলেই সবাই মনে করতো, সৎ মা তো, তাই মা-মরা মাইয়াটারে বকে আর আদরে ভাবতো নিজের নয় কইয়্যাই মাথাডা খাইতাসে। মাইয়াটারে হালার পুতেদের হাত থিকা বাঁচাইতেও পারলাম না। এরপরে তো কত কষ্ট গেল, মুক্তিযুদ্ধ হইল, দ্যাশ স্বাধীন হইল, নিজের ভিটায় উঠলাম, কিন্তু পাঁচ বছরের বেশী থাকতেও পারলাম না। এক কাপড়ে পলাইয়া আইলাম। নিজের ভিটামাটি থাকতেও ভাড়া বাড়ীতেই জীবন কাটায় দিলাম, মরতেও হইব পরের বাড়ীতেই। দ্যাখ এইবার চিন্তা কইরা, নিজের ঘরে মরুম, সেই স্বাধীনতাটাও আর থাকলো না”।
...
......ঠাকুমার সেদিনের কথা গুলো খুব মনে পড়ছে। কী কঠিন বাস্তব কথা! ‘পাগলের প্রলাপ’ বলার কোন কারণই নেই। প্রায় অশিক্ষিত এক নারী, অথচ স্বাধীনতা সম্পর্কে কী স্বচ্ছ ধারণা ছিল, ভেবেই অবাক হই।
আমার নিজের একটিমাত্র সন্তান, নাম রেখেছি ‘স্বাধীনচেতা’। আমিই রেখেছি নাম। এত বড় নাম কেউ বলতে চায় না। পরিবারে সবাইকে বলেছি, মেয়েকে ওর পুরো নামেই ডাকতে হবে। মেয়েকেও বলেছি, সবাইকে বলবে যেন পুরো নামেই ডাকে। নামকে ভাঙ্গতে দেবে না।
স্বাধীনচেতার বয়স এখন ঊনিশ বছর। মেধাবী, প্রচুর পড়াশোনা করে, এই বয়সেই নানা বিষয়ের উপর লেখা অনেক বই তার পড়া হয়ে গেছে। আমার মতই পড়ুয়া হয়েছে মেয়ে, কিন্তু আমার মত শৃঙ্খলে বাঁধা জীবন হয় নি ওর। স্বাধীনচেতা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে বড় হচ্ছে। আমার বাবা মা আমাকে আঁচলে ঢেকে রাখতেন, আর আমি মেয়েকে নিজের মত করে চলার সুযোগ দিয়েছি। গত শুক্রবার থেকে এই চত্বরেই সবার সাথে গলা তুলে শ্লোগান দিচ্ছিল। আমাকেও খুব বলছিল ওর সাথে গলা মেলাবার জন্য। আমি চোখ টিপে দিয়েছি। ও বুঝে গেছে, বাবা তার কর্মকান্ডে সায় দিচ্ছে।
চত্বরে তরুণ-তরুণীরা যেভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, দেখে মনে হয়, সুদিন বুঝি ফিরে আসি আসি করছে। ধর্ষকদের বিচার শুরু হয়েছে। একটি ধর্ষক নাবালক বলে মুক্তির কথা বলতেই সেই রায়ের বিরুদ্ধে সারা দেশ ফেটে পড়েছে, আমার বউ-ঠাকুমা বেঁচে থাকলে তাঁকে আমি কাঁধে চড়িয়ে হলেও এই চত্বরে নিয়ে আসতাম। অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে উনি পৃথিবী ছেড়েছেন! এই কষ্ট ওনার পাওনা ছিল না। কিছুই চান নি, নিজের ভিটেয় মরতে চেয়েছিলেন। আজ যদি এই চত্বরে আসতেন, দেখতেন, “চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়”! এই সুন্দর দেশটার গালে যারা চুনকালি লেপে দিয়েছে, আজ তারা তরুণদের জালে আটকা পড়েছে। আমরা যা পারিনি, আমাদের পরের প্রজন্ম তা করতে চলেছে। দেশের মাটিতে ওই নরপশুদের বিচার হবে। এই তারুণ্য, অনেক মেধাবী, অনেক সাহসী, অসাম্প্রদায়িক। এইজন্যই ওদের একটা মাত্র ডাকে আজ আকাশ কাঁপছে, মাটি কাঁপছে, দেশের সকল ধার্মিক, দেশপ্রেমিকের হৃদয় কাঁপছে! আমি ওদের দৃপ্ত কন্ঠে শ্লোগান শুনে শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে সম্মান করছি। আজ বড় বেশী মনে পড়ছে আমার ‘পরাধীন’ বউ-ঠাকুমা’কে। ঠাকুমা বেঁচে থাকলে হয়তো রহমত চাচার ছেলেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারতেন, আর কিছু না হোক, অপরাধীর বিচার হবে, এই সত্যিটুকু জেনে যেতেন।
“বাবা, ও বাবা! তুমি এভাবে কাঁদছো কেন”?
“আরে, মামনি তুই কখন এলি রে মা?”
“স্বাধীনচেতা একা একাই পথ চলতে পারে বাবা। আমি একা একাই এসেছি। শ্লোগান শেষে মঞ্চের ঐ দিকটাতে দাঁড়িয়েছিলাম। ওখান থেকেই তোমাকে দেখতে পেয়েছি। এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন, আমার হাত ধরো, চলো আমার সাথে, আর একটু সামনের দিকে এগিয়ে যাই”...
...........
..............
..................
.................................এখানেই শেষ নয়.... পথ চলা এখনও অনেক বাকি....