শঙ্কা-মেঘ
**********
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
********************************
~এক~
এখন তাঁর পঁচাত্তর চলছে। সুঠাম দেহ টানটান ভাব হারালেও তেমন দুর্বল হয়ে যাননি তিনি। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে যান ঠিক বৌমার পুজোর ঘণ্টার আওয়াজে। কোনো অ্যালার্ম দরকার হয় না। রুটিন করে ঠিক ঘুম ভেঙ্গে যায়। স্ত্রী মারা গেছেন দশ বছর আগে। এরপর অনেকদিন ইম্সমনিয়া ছিল তাঁর। তারপর ক্রমেই এ অভ্যাস হয়ে গেছে তাঁর। যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে উঠে যেতে পারেন তিনি এখন। অথচ স্ত্রী সুষমা বেঁচে থাকতে ছিলো ঠিক উল্টো। স্ত্রীর ক্রমাগত ডাকে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ঘুম থেকে উঠতে হতো।
উঠেই কপট রাগে আঙুলের ইশারায় ডাকতেন, "সুমি শোনো"
- বলো ! কি বলবে। ওঠো বাজারে যাও।
- এদিকে এসো।
- বলো।
দুইহাতে গলা জড়িয়ে ধরে গালে এঁকে দিতেন ভালোবাসার চিহ্ন।
- উফ্ ! দস্যি কোথাকার ! ওঠো ! ওঠো !
বলে ঠেলে পাঠাতেন বাথরুমে।
....
........
তিনি বলদেব সেন,স্বাধীনতা সংগ্রামী।সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নিলেও পরোক্ষে তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে রাসবিহারী বসুর সাহায্যকারী হিসেবে স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ায় আজও খুব গর্ব হয় তাঁর। নরেন্দ্রপুরের এলাচি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এই বলদেব সেন। এখন থাকেন ছেলের সংসারে। খাঁচায় বন্দি বনের পাখি। সকালে যোগাসন শেষে রোজই তিরিশ মিনিট হাঁটেন তিনি। হালকা ডায়াবেটিস আছে তাঁর। উচ্চ রক্তচাপও আছে। রোজকার মতো হাঁটা শেষ করে বাড়ী ফিরে কলিংবেল চাপেন তিনি। দশ বছরের নাতনি সোমপ্রজ্ঞা দরজা খুলে দেয়-
" শুভ সকাল দাদুভাই।"
মন ভীষণ ভালো হয়ে যায় তাঁর। সোমপ্রজ্ঞাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ভেতরে ঢোকেন তিনি। মনে মনে প্রতিদিনই একমাত্র ছেলে সোমদেবকে ধন্যবাদ দেন এই জন্য যে, সন্তানকে তাঁরই শেখানো আদব-কায়দায় শিক্ষা দিয়েছে বলে।
~দুই~
ফুরফুরে মেজাজে চা শেষ করে আনন্দবাজার পত্রিকা হাতে নেন একটু ভয়ে-ভয়েই। কারণ প্রতিদিনই মনখারাপ করার মতো একাধিক খবর থাকে। আজ প্রথমেই খুব ভালো একটা খবর নজর কাড়ে তাঁর। অলিম্পিক্সে ভারতের জয় এবং তা নিয়ে সারাদেশের মানুষের উল্লাস। পতাকা নিয়ে মিছিল। আনন্দে চোখ ভিজে আসে তাঁর। চোখ বুজে সাতচল্লিশে ফিরে যান তিনি। আহা! কী আবেগ! কী ভালোবাসা পতাকা ঘিরে।তখন তাঁর বয়স মাত্র কুড়ি...
....
......
ভালোলাগার আবেশটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না তাঁর। চোখ আটকে যায় অন্য একটি খবরে- "প্রখ্যাত ব্যবসায়ীর বাড়ীতে পৌঁছোলো তাঁর অপহৃত শিশুপুত্রের লাশ" ।
পড়তে শুরু করেন তিনি।
....."দিন সাতেক আগে স্কুল থেকে ফেরার পথে বিখ্যাত ব্যবসায়ী অম্বরীশ লাহার শিশুপুত্র অপহৃত হওয়ার পর তাঁকে ফোন করে পাঁচ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন এবং নিউ ব্যারাকপুর থানায় এই বিষয়ে ডায়েরী করেন। উত্তর চব্বিশ পরগণার মাইকেলনগর এলাকায় বসবাসকারী অম্বরীশবাবুর একমাত্র পুত্রকে অপহরণকারীরা পুলিশে খবর দেওয়ার অপরাধে চার টুকরো করে কেটে একটি প্লাস্টিক বস্তায় ভরে গতকাল রাত পৌনে ১২টার দিকে বাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে যায় বলে জানান অম্বরীশবাবুর ভাই। নিহতের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলা যায় নি। বাড়ির বাকি লোকেরা বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দিচ্ছেন না। নিহত পদ্মনাভ লাহা মাইকেলনগরের সেন্ট অগাস্টিন বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র।.... --" আর এগোতে পারেন না তিনি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। খানিক আগের আনন্দাশ্রু এখন তাঁর বিষাদের কান্না। এমন অনেক খবরই তাঁর রোজ পড়তে হয়। ভেবে পান না তিনি দেশে কী হলো? মানুষ এতো নৃশংস হয়ে যাচ্ছে কেন?
.....
......
অন্য আরো অনেক খবরই তাঁকে বিচলিত করে। কষ্ট দেয় অনেক ঘটনা। সত্যের নির্বাসন আজ যেন অবধারিত সর্বস্তরে। মূল্যবোধের মূল্য নেই, মানবিকবোধ কেঁদে ফিরছে দ্বারে দ্বারে। মানুষের হঠাৎ গুম হয়ে যাওয়া আর অপরাধীর বড় সমাজপতি বনে যাবার বিষয়গুলো একজন নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেক পীড়া দেয় তাঁকে এই বয়সে। তিনি ভাবতেই পারেন না, সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কীভাবে ফাঁস হয়ে যেতে পারে ! পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নাকি মোবাইল ফোনে ঘুরে বেড়ায়। জাতি কি তাহলে মেধাশূন্য হয়ে যাবে?
"বাবা, আপনার স্নানের সময় হয়েছে।" - বউমা কাঁকনের কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ে তাঁর।
"এই যাচ্ছি মা।"
ভাবেন- এ যুগেও তাঁর ছেলে ও ছেলের বউ বেশ আন্তরিক; তাঁর যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে। ছেলে প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। সকালে বেরিয়ে যায়। ফেরে সেই রাত আটটার দিকে। তবু ফিরেই বাবার খোঁজ নেয় সে। সংসারে টানাটানি আছে, বুঝতে পারেন বলদেববাবু। কিন্তু তা নিয়ে কখনোই কেউ কোন অভিযোগ করেনি তাঁকে।
....
.......
সেদিন তাঁর এক সহযোদ্ধা মনীশ ফোন করেছিলো বনগাঁ থেকে। অনেক কষ্টের কথা জানালো- একমাত্র ছেলে ভালো চাকরি করে। থাকে কোলকাতায়। ছেলে খোঁজ খবর নেয় না বৃদ্ধ বাবা-মায়ের। শোনা যায়, মনীশের নাতি, উঠতি বয়সের ছেলেটি নাকি ড্রাগের নেশায় আসক্ত। হেরোইন, ব্রাউন সুগার ইত্যাদি খেয়ে ঝিম মেরে পড়ে থাকে সারাদিন। এসব শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গিয়েছিলেন বলদেব সেন।
....
.......
"দাদুভাই, দাদুভাই, দেখো আমি কেমন একটি ছবি এঁকেছি, গ্রামের ছবি। বলো তো কেমন হয়েছে?" নাতনি সোমপ্রজ্ঞা দৌড়ে এসে ছবিটি তাঁর হাতে দেয়।
"বাহ! খুব সুন্দর ছবি হয়েছে তো দিদিভাই। একেবারে আসল এক সবুজ গ্রাম।"
মেয়েটি সত্যি খুব সুন্দর ছবি আঁকে। অবসরের গল্প-সঙ্গী এই নাতনিটি তাঁর। কাছে টেনে কপালে চুমু খান তিনি সোমপ্রজ্ঞার। উঠে পড়েন স্নান সারার জন্য। তখনই বাইরে থেকে একটা মাইক অ্যানাউন্সের আওয়াজ পাওয়া যায়। কান খাড়া করেন তিনি, সাথে সোমপ্রজ্ঞাও।
....
......."জরুরী ঘোষণা...জরুরী ঘোষণা...
এ মহল্লারই দশ বছরের মেয়ে মুসকান্ কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে খেলতে বেড়িয়েছিল। ফেরেনি এখনো। পরনে ছিলো রেনবো কালারের ফ্রক। সন্ধান পেলে সোনারপুর থানায় অবশ্যই জানাবেন।"
বলদেব ভাবলেন, হয়তো আশেপাশেই কোথাও আছে। চলে আসবে মেয়েটি।
~তিন~
খাবার টেবিলে বসে বলদেব সবসময় নস্টালজিক হন। আগে কতো তাজা টাটকা খাবার পেতো তারা ! শাকসব্জি, ফলমূল, মাছ-মাংস স-অ-ব। তাঁদের বাড়ী ঘিরে আম, সবেদা, পেয়ারা, জামরুল, কাঁঠাল, কামরাঙা, বাতাবি, কলা, লেবু ইত্যাদির গাছ ছিলো। সেখানে আমগাছে প্রতিবছর মৌচাক হতো। মউলিরা মৌচাক কেটে নিয়ে যাবার সময় বড় এক কৌটো খাঁটি মধু দিয়ে যেত। সেটা থাকতো সবসময় ঘরে। আর এখন ! সবকিছুতে ভেজাল। ভেজাল খেয়ে নানা দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ইদানীং ওষুধেও ভেজাল দিচ্ছে। কী হচ্ছে স্বাধীনতা পেয়েও? এইরকম চিন্তা-দূষণে আক্রান্ত পরিবর্তনের দেশ কি চেয়েছিলেন তখনকার মুক্তিকামী মানুষ? কষ্ট হয় এই ভেবে যে, তাঁর নাতিরা বিশুদ্ধ বা খাঁটি জিনিস কেমন হয় দেখতেও পারছে না। আহা !!
....
......
আরো দুটি বিষয় তাঁকে যারপরনাই ব্যথিত করে।
প্রথমতঃ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে দলবাজি, তাঁদের সামান্য সাহায্য দেওয়া নিয়ে জালিয়াতি। সেই জালিয়াতিতে আবার জড়িত থাকে স্বাধীনতাসংগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্তাগণের নির্লজ্জতা !
দ্বিতীয়তঃ যাদের এই দেশ থেকে বিতাড়ণ করা হল, তারাই আবার বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা হিসেবে ভালমানুষ হয়ে নানা পণ্যসম্ভার নিয়ে প্রবেশ করছে। আর তাদের হাত ধরে এদেশে আনছেন রাষ্ট্রনেতারা। দুঃখে তাঁর মাথাটা হেঁট হয়ে আসে। ভাবনাটা আবার মনে আসায় কষ্টটা সহযোগী হয়ে আসে। বুকের বাঁ-পাশটা চিনচিন করে ওঠে। একটা দহন হতে থাকে মনের ভেতর বাড়িতে।
~চার~
সন্ধ্যা পরবর্তী সময়। টিভিতে খবর দেখছিলেন বলদেববাবু। হঠাৎ শোরগোল শুনে ব্যালকনিতে বেড়িয়ে আসে সবাই। অনেক মানুষের কোলাহল...হট্টগোল....কান্নাকাটি....
বলদেববাবুসহ বাড়ীর সবাই মনে করলো- হয়তো হারানো মুসকানকে খুঁজে পেয়েছে। এ কান্না হয়তো আনন্দের।
কিন্তু না। ক্রমশ পরিষ্কার হলো সব। জানা গেলো- অপ্রত্যাশিত নির্মম সত্য।
পাশেই নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের সেপ্টিক ট্যাঙ্কে পাওয়া গেছে মুসকানকে। তবে জীবিত নয়। মিলেছে গলাকাটা-পেটকাটা মুসকানের লাশ। বিভিন্ন বডি-অর্গ্যান নিখোঁজ। আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। মাত্র দশ বছরের এই শিশু মুসকানের কোনো শত্রু থাকতে পারে ভাবাই যায় না। কী কারণে এ রকম পরিণতি হল নিষ্পাপ মুসকানের !
অগ্নিযুগের বিপ্লবী-বীর বলদেব সেন অসহায়বোধ করেন। শরীর অবশ হয়ে আসে তাঁর। চোখের সামনে দশ বছরের নাতনি সোমপ্রজ্ঞার মুখ ভেসে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে সোমপ্রজ্ঞাকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। যেন লুকোবেন কোথাও। লুকিয়ে রাখবেন সোমপ্রজ্ঞাকে। সাতচল্লিশের সেই বীরযোদ্ধা আজ যেন ভীষণ শঙ্কিত। কাঁপছেন তিনি। শঙ্কার মেঘে ছেয়েছে আজ তাঁর মানস-আকাশ।
...
......
বৌমা কাঁকন দৌড়ে এসে শ্বশুরমশাইকে ধরেন।
"কী হলো বাবা? এমন করছেন কেন?"
বলদেববাবু শুধু কোনমতে মুখে উচ্চারণ করলেন - "প্রজ্ঞা, প্রজ্ঞা।"
বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হলো তাঁকে। জরুরী ফোন করা হলো সোমপ্রজ্ঞার বাবাকে এবং ডাক্তারকে।
মাথায় জল ঢালা হচ্ছে বলদেববাবুর মাথায়। পাশে বসা নাতনি সোমপ্রজ্ঞা। সোমদেবও চলে এসেছে।
...এখন ডাক্তার আসার প্রতীক্ষায় সবাই..
**********
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
********************************
~এক~
এখন তাঁর পঁচাত্তর চলছে। সুঠাম দেহ টানটান ভাব হারালেও তেমন দুর্বল হয়ে যাননি তিনি। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে যান ঠিক বৌমার পুজোর ঘণ্টার আওয়াজে। কোনো অ্যালার্ম দরকার হয় না। রুটিন করে ঠিক ঘুম ভেঙ্গে যায়। স্ত্রী মারা গেছেন দশ বছর আগে। এরপর অনেকদিন ইম্সমনিয়া ছিল তাঁর। তারপর ক্রমেই এ অভ্যাস হয়ে গেছে তাঁর। যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে উঠে যেতে পারেন তিনি এখন। অথচ স্ত্রী সুষমা বেঁচে থাকতে ছিলো ঠিক উল্টো। স্ত্রীর ক্রমাগত ডাকে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ঘুম থেকে উঠতে হতো।
উঠেই কপট রাগে আঙুলের ইশারায় ডাকতেন, "সুমি শোনো"
- বলো ! কি বলবে। ওঠো বাজারে যাও।
- এদিকে এসো।
- বলো।
দুইহাতে গলা জড়িয়ে ধরে গালে এঁকে দিতেন ভালোবাসার চিহ্ন।
- উফ্ ! দস্যি কোথাকার ! ওঠো ! ওঠো !
বলে ঠেলে পাঠাতেন বাথরুমে।
....
........
তিনি বলদেব সেন,স্বাধীনতা সংগ্রামী।সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নিলেও পরোক্ষে তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে রাসবিহারী বসুর সাহায্যকারী হিসেবে স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ায় আজও খুব গর্ব হয় তাঁর। নরেন্দ্রপুরের এলাচি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এই বলদেব সেন। এখন থাকেন ছেলের সংসারে। খাঁচায় বন্দি বনের পাখি। সকালে যোগাসন শেষে রোজই তিরিশ মিনিট হাঁটেন তিনি। হালকা ডায়াবেটিস আছে তাঁর। উচ্চ রক্তচাপও আছে। রোজকার মতো হাঁটা শেষ করে বাড়ী ফিরে কলিংবেল চাপেন তিনি। দশ বছরের নাতনি সোমপ্রজ্ঞা দরজা খুলে দেয়-
" শুভ সকাল দাদুভাই।"
মন ভীষণ ভালো হয়ে যায় তাঁর। সোমপ্রজ্ঞাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ভেতরে ঢোকেন তিনি। মনে মনে প্রতিদিনই একমাত্র ছেলে সোমদেবকে ধন্যবাদ দেন এই জন্য যে, সন্তানকে তাঁরই শেখানো আদব-কায়দায় শিক্ষা দিয়েছে বলে।
~দুই~
ফুরফুরে মেজাজে চা শেষ করে আনন্দবাজার পত্রিকা হাতে নেন একটু ভয়ে-ভয়েই। কারণ প্রতিদিনই মনখারাপ করার মতো একাধিক খবর থাকে। আজ প্রথমেই খুব ভালো একটা খবর নজর কাড়ে তাঁর। অলিম্পিক্সে ভারতের জয় এবং তা নিয়ে সারাদেশের মানুষের উল্লাস। পতাকা নিয়ে মিছিল। আনন্দে চোখ ভিজে আসে তাঁর। চোখ বুজে সাতচল্লিশে ফিরে যান তিনি। আহা! কী আবেগ! কী ভালোবাসা পতাকা ঘিরে।তখন তাঁর বয়স মাত্র কুড়ি...
....
......
ভালোলাগার আবেশটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না তাঁর। চোখ আটকে যায় অন্য একটি খবরে- "প্রখ্যাত ব্যবসায়ীর বাড়ীতে পৌঁছোলো তাঁর অপহৃত শিশুপুত্রের লাশ" ।
পড়তে শুরু করেন তিনি।
....."দিন সাতেক আগে স্কুল থেকে ফেরার পথে বিখ্যাত ব্যবসায়ী অম্বরীশ লাহার শিশুপুত্র অপহৃত হওয়ার পর তাঁকে ফোন করে পাঁচ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন এবং নিউ ব্যারাকপুর থানায় এই বিষয়ে ডায়েরী করেন। উত্তর চব্বিশ পরগণার মাইকেলনগর এলাকায় বসবাসকারী অম্বরীশবাবুর একমাত্র পুত্রকে অপহরণকারীরা পুলিশে খবর দেওয়ার অপরাধে চার টুকরো করে কেটে একটি প্লাস্টিক বস্তায় ভরে গতকাল রাত পৌনে ১২টার দিকে বাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে যায় বলে জানান অম্বরীশবাবুর ভাই। নিহতের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলা যায় নি। বাড়ির বাকি লোকেরা বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দিচ্ছেন না। নিহত পদ্মনাভ লাহা মাইকেলনগরের সেন্ট অগাস্টিন বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র।.... --" আর এগোতে পারেন না তিনি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। খানিক আগের আনন্দাশ্রু এখন তাঁর বিষাদের কান্না। এমন অনেক খবরই তাঁর রোজ পড়তে হয়। ভেবে পান না তিনি দেশে কী হলো? মানুষ এতো নৃশংস হয়ে যাচ্ছে কেন?
.....
......
অন্য আরো অনেক খবরই তাঁকে বিচলিত করে। কষ্ট দেয় অনেক ঘটনা। সত্যের নির্বাসন আজ যেন অবধারিত সর্বস্তরে। মূল্যবোধের মূল্য নেই, মানবিকবোধ কেঁদে ফিরছে দ্বারে দ্বারে। মানুষের হঠাৎ গুম হয়ে যাওয়া আর অপরাধীর বড় সমাজপতি বনে যাবার বিষয়গুলো একজন নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেক পীড়া দেয় তাঁকে এই বয়সে। তিনি ভাবতেই পারেন না, সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কীভাবে ফাঁস হয়ে যেতে পারে ! পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নাকি মোবাইল ফোনে ঘুরে বেড়ায়। জাতি কি তাহলে মেধাশূন্য হয়ে যাবে?
"বাবা, আপনার স্নানের সময় হয়েছে।" - বউমা কাঁকনের কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ে তাঁর।
"এই যাচ্ছি মা।"
ভাবেন- এ যুগেও তাঁর ছেলে ও ছেলের বউ বেশ আন্তরিক; তাঁর যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে। ছেলে প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। সকালে বেরিয়ে যায়। ফেরে সেই রাত আটটার দিকে। তবু ফিরেই বাবার খোঁজ নেয় সে। সংসারে টানাটানি আছে, বুঝতে পারেন বলদেববাবু। কিন্তু তা নিয়ে কখনোই কেউ কোন অভিযোগ করেনি তাঁকে।
....
.......
সেদিন তাঁর এক সহযোদ্ধা মনীশ ফোন করেছিলো বনগাঁ থেকে। অনেক কষ্টের কথা জানালো- একমাত্র ছেলে ভালো চাকরি করে। থাকে কোলকাতায়। ছেলে খোঁজ খবর নেয় না বৃদ্ধ বাবা-মায়ের। শোনা যায়, মনীশের নাতি, উঠতি বয়সের ছেলেটি নাকি ড্রাগের নেশায় আসক্ত। হেরোইন, ব্রাউন সুগার ইত্যাদি খেয়ে ঝিম মেরে পড়ে থাকে সারাদিন। এসব শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গিয়েছিলেন বলদেব সেন।
....
.......
"দাদুভাই, দাদুভাই, দেখো আমি কেমন একটি ছবি এঁকেছি, গ্রামের ছবি। বলো তো কেমন হয়েছে?" নাতনি সোমপ্রজ্ঞা দৌড়ে এসে ছবিটি তাঁর হাতে দেয়।
"বাহ! খুব সুন্দর ছবি হয়েছে তো দিদিভাই। একেবারে আসল এক সবুজ গ্রাম।"
মেয়েটি সত্যি খুব সুন্দর ছবি আঁকে। অবসরের গল্প-সঙ্গী এই নাতনিটি তাঁর। কাছে টেনে কপালে চুমু খান তিনি সোমপ্রজ্ঞার। উঠে পড়েন স্নান সারার জন্য। তখনই বাইরে থেকে একটা মাইক অ্যানাউন্সের আওয়াজ পাওয়া যায়। কান খাড়া করেন তিনি, সাথে সোমপ্রজ্ঞাও।
....
......."জরুরী ঘোষণা...জরুরী ঘোষণা...
এ মহল্লারই দশ বছরের মেয়ে মুসকান্ কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে খেলতে বেড়িয়েছিল। ফেরেনি এখনো। পরনে ছিলো রেনবো কালারের ফ্রক। সন্ধান পেলে সোনারপুর থানায় অবশ্যই জানাবেন।"
বলদেব ভাবলেন, হয়তো আশেপাশেই কোথাও আছে। চলে আসবে মেয়েটি।
~তিন~
খাবার টেবিলে বসে বলদেব সবসময় নস্টালজিক হন। আগে কতো তাজা টাটকা খাবার পেতো তারা ! শাকসব্জি, ফলমূল, মাছ-মাংস স-অ-ব। তাঁদের বাড়ী ঘিরে আম, সবেদা, পেয়ারা, জামরুল, কাঁঠাল, কামরাঙা, বাতাবি, কলা, লেবু ইত্যাদির গাছ ছিলো। সেখানে আমগাছে প্রতিবছর মৌচাক হতো। মউলিরা মৌচাক কেটে নিয়ে যাবার সময় বড় এক কৌটো খাঁটি মধু দিয়ে যেত। সেটা থাকতো সবসময় ঘরে। আর এখন ! সবকিছুতে ভেজাল। ভেজাল খেয়ে নানা দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ইদানীং ওষুধেও ভেজাল দিচ্ছে। কী হচ্ছে স্বাধীনতা পেয়েও? এইরকম চিন্তা-দূষণে আক্রান্ত পরিবর্তনের দেশ কি চেয়েছিলেন তখনকার মুক্তিকামী মানুষ? কষ্ট হয় এই ভেবে যে, তাঁর নাতিরা বিশুদ্ধ বা খাঁটি জিনিস কেমন হয় দেখতেও পারছে না। আহা !!
....
......
আরো দুটি বিষয় তাঁকে যারপরনাই ব্যথিত করে।
প্রথমতঃ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে দলবাজি, তাঁদের সামান্য সাহায্য দেওয়া নিয়ে জালিয়াতি। সেই জালিয়াতিতে আবার জড়িত থাকে স্বাধীনতাসংগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্তাগণের নির্লজ্জতা !
দ্বিতীয়তঃ যাদের এই দেশ থেকে বিতাড়ণ করা হল, তারাই আবার বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা হিসেবে ভালমানুষ হয়ে নানা পণ্যসম্ভার নিয়ে প্রবেশ করছে। আর তাদের হাত ধরে এদেশে আনছেন রাষ্ট্রনেতারা। দুঃখে তাঁর মাথাটা হেঁট হয়ে আসে। ভাবনাটা আবার মনে আসায় কষ্টটা সহযোগী হয়ে আসে। বুকের বাঁ-পাশটা চিনচিন করে ওঠে। একটা দহন হতে থাকে মনের ভেতর বাড়িতে।
~চার~
সন্ধ্যা পরবর্তী সময়। টিভিতে খবর দেখছিলেন বলদেববাবু। হঠাৎ শোরগোল শুনে ব্যালকনিতে বেড়িয়ে আসে সবাই। অনেক মানুষের কোলাহল...হট্টগোল....কান্নাকাটি....
বলদেববাবুসহ বাড়ীর সবাই মনে করলো- হয়তো হারানো মুসকানকে খুঁজে পেয়েছে। এ কান্না হয়তো আনন্দের।
কিন্তু না। ক্রমশ পরিষ্কার হলো সব। জানা গেলো- অপ্রত্যাশিত নির্মম সত্য।
পাশেই নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের সেপ্টিক ট্যাঙ্কে পাওয়া গেছে মুসকানকে। তবে জীবিত নয়। মিলেছে গলাকাটা-পেটকাটা মুসকানের লাশ। বিভিন্ন বডি-অর্গ্যান নিখোঁজ। আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। মাত্র দশ বছরের এই শিশু মুসকানের কোনো শত্রু থাকতে পারে ভাবাই যায় না। কী কারণে এ রকম পরিণতি হল নিষ্পাপ মুসকানের !
অগ্নিযুগের বিপ্লবী-বীর বলদেব সেন অসহায়বোধ করেন। শরীর অবশ হয়ে আসে তাঁর। চোখের সামনে দশ বছরের নাতনি সোমপ্রজ্ঞার মুখ ভেসে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে সোমপ্রজ্ঞাকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। যেন লুকোবেন কোথাও। লুকিয়ে রাখবেন সোমপ্রজ্ঞাকে। সাতচল্লিশের সেই বীরযোদ্ধা আজ যেন ভীষণ শঙ্কিত। কাঁপছেন তিনি। শঙ্কার মেঘে ছেয়েছে আজ তাঁর মানস-আকাশ।
...
......
বৌমা কাঁকন দৌড়ে এসে শ্বশুরমশাইকে ধরেন।
"কী হলো বাবা? এমন করছেন কেন?"
বলদেববাবু শুধু কোনমতে মুখে উচ্চারণ করলেন - "প্রজ্ঞা, প্রজ্ঞা।"
বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হলো তাঁকে। জরুরী ফোন করা হলো সোমপ্রজ্ঞার বাবাকে এবং ডাক্তারকে।
মাথায় জল ঢালা হচ্ছে বলদেববাবুর মাথায়। পাশে বসা নাতনি সোমপ্রজ্ঞা। সোমদেবও চলে এসেছে।
...এখন ডাক্তার আসার প্রতীক্ষায় সবাই..
ভাল লাগল। এতদিন পর সুযোগ পেলাম।
উত্তরমুছুন