অ-সুখ
---------
কাহিনীকার--স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
----------------------------------------------
এক
``````
"পেশেন্ট নম্বর ছয়। পাঁচ নম্বর পেশেন্ট ভেতরে আছে। এরপরই আপনি যাবেন কেমন !"
রজনীর সম্বিত্ ফেরে রিসেপ্সনিষ্টের ডাকে। এক অদ্ভুত অসুখে কিছুদিন যাবত্ ভুগছে সে। লাস্ট অ্যাপয়েন্টমেন্টে ডক্টর ম্যাডামকে আসল সমস্যাটার কথাটা বুঝিয়ে বলতেই পারেনি সে। কিছুকথা কি করে বলা সম্ভব ! অবশেষে ডাক্তার গোটা চারেক টেস্ট দিয়েছিলেন। রিপোর্ট হাতে নিয়ে আজ আবার এসে বসে আছে রজনী।
......
.........
"নম্বর ছয়, রজনী মিত্র..."
রিসেপ্সন থেকে ডাক পরে।
রজনীর রিপোর্ট গুলো ডাক্তার ম্যাডাম দেখছেন।
রজনী মিত্র বয়স আটচল্লিশ...
আরেক বার রক্তচাপ মেপে দেখলেন। একশো ষাট বাই একশো...হুম্ !!
ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন - রাতে ভালো ঘুম হয়?
- বেশী না ! দু থেকে তিন ঘন্টা।
- কোনরকম নেশা করেন?
- না, না।
- কোথায় কাজ করেন?
- একটা বেসরকারী স্কুলে শিক্ষিকা।
- চাকরী নিয়ে কোন ঝামেলা চলছে?
- না, না।
- ম্যানেজিং কমিটি বা ইন্সটিচিউশনাল হেড কি কোন খারাপ ব্যবহার করেন?
- না, না।
- যা বেতন পান তাতে কি সুখী? আই মিন্ কোনরূপ বেগ পেতে হয় কি?
- না, যা পাই আর হাসব্যান্ডের বিজনেসে যা ইনকাম তাতে বেশ সুন্দর চলে যায়।
- হুম্ ! আচ্ছা।
- কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে চাই।
- বলুন।
- বিয়ে করেছেন কতো বছর হলো?
- কুড়ি বছর।
- হাসব্যান্ডের সাথে সম্পর্ক কেমন?
- ভালোই।
- প্রেমের বিয়ে?
- হ্যাঁ।
- ছেলে মেয়ে ক'জন?
এই প্রশ্ন শুনে রজনীর বুকটা চমকে উঠে। এই বুঝি গোপন জায়গায় আঘাত দিয়ে ফেললেন ডাক্তার সাহেবা !
- একটিমাত্র মেয়ে। উত্তর দেয় সে।
- বয়স কতো?
- সতেরো বছর চলছে।
- কোন্ ক্লাসে পড়ে?
- ক্লাস ইলেভেনে পড়ে।
- মেয়ের কি কোন ছেলে বন্ধু আছে?আই মিন্ প্রেম-ট্রেম করে?
- না, না।
-খোঁজ নিয়েছেন?
- হ্যাঁ। তেমন কোন সমস্যা নেই।
- মেয়ে কি আপনাদের সাথে তর্ক করে?
- কখনো-সখনো।
- আপনার এই সমস্যা কতো দিন ধরে হচ্ছে?
- মাস খানেক হলো।
- আর্থিক দেনা আছে কারোর?
- না।
- ঠিক আছে। আপাতত এক মাসের ওষুধ দিলাম। এক মাস পর আবার আসবেন।
- কি বুঝলেন ডক্টর?
- একটু স্টাডি করতে হবে।তবে ঠিক হয়ে যাবে।কেস অফ হাইপারটেনশন মনে হচ্ছে।নো টেনশন।আনন্দে বাঁচুন।এই তো সামনে পুজো।চুটিয়ে আনন্দ করুন তো।ঠিক আছে...
- আচ্ছা, নমস্কার।আসি।
দুই
`````
অনীক ছোট সংসার নিয়ে বেশ সুখী। তেমন বাড়তি চাহিদা নেই। ছোট এই মফস্বল জেলা সদরে একটা দোতলা বাড়ি। নিজের বেতনের বাইরেও সাত হাজার টাকা বাড়ীভাড়া। বেশ স্বচ্ছল সংসার। একমাত্র মেয়ে পাখির যে কোন চাহিদা অনায়াসেই পূরণ করতে পারা বেশ সুখের। মেয়ের খুব সখ ছিলো মাধ্যমিকের পর একটা ল্যাপটপ্ সাথে ইন্টারনেট লাইন আর একটা স্যামসাং-এর স্মার্টফোন। বউ আর মেয়ের আবদারে শেষ পর্যন্ত কিনেই দেয়।
আজকাল বুঝতে পারে অনীক, যে রজনীর মন খুব বেশী ভালো যাচ্ছে না। সবসময় আনমনা থাকে। কিছু জিজ্ঞাসা করলে হেসে এড়িয়ে যায়। তবে নিজেরও ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকায় এই সব নিয়ে বেশী ঘাঁটাতেও চায় না সে। তবে শরীর খারাপ থাকলে বেশ চিন্তা হয়। রাতে ঘুম হয় না বলে রজনীর চুলে আঙ্গুল চালিয়ে বিলি কাটতে কাটতে নিজেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।
রজনী ভোর রাত পর্যন্ত ডান বাম করে। স্বামীর আদরে তেমনভাবে সাড়াও দিতে পারে না আবার স্বামীকে বলতেও পারছে না তার এই অসুখের কথা। সারা রাত ধরে তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় নানা জটিল হিসাব নিকাশ। ক্রমেই মানুষের মধ্যে থেকে ন্যায়-অন্যায় বোধ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে ভালো আর খারাপ কাজের সংজ্ঞা। সভ্যতা পশুসুলভ কর্মগুলোর বৈধতা দিচ্ছে।
বিকিনি-গার্লরা এখন নাকি নতুন হটকেক। মহল্লার মোড়ের দোকানে পাঁচ দশ টাকায় স্কুলের ছেলেমেয়েদের এক্সট্রা মেমোরি কার্ডে বিক্রি হচ্ছে ভিডিও। তারা খোঁজ রাখে কার হাতে নতুন রিলিজ পাওয়া ভিডিওটি আছে। মুহূর্তেই বিনা পয়সায় শেয়ার করে নিচ্ছে Share It এর মাধ্যমে। রাষ্ট্র কিছুদিন নজরদারি চালালেও সমাজের কলরোলে আবার সব নির্বিকার। কারো কোন মাথাব্যথা নেই। রজনীর মনে হচ্ছে সব মাথাব্যথা যেন তার একার।
....আচ্ছা,সে কি তবে লুনাটিক হয়ে যাচ্ছে!!
তিন
````````
ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন। রজনী কয়েকদিনের ছুটি নিয়েছে ডাক্তারের পরামর্শে। দিনের বেলাতেও ঘুম পাচ্ছে আজকাল ওষুধের প্রভাবে। শুক্রবার বিকেলে হঠাৎ এক চটুল গানের সুরে ঘুম ভেঙে যায়। পাশের রুমে গিয়ে দেখে আদরের পাখি তার ল্যাপটপে দেখছে -"ইয়ে দুনিয়া পিত্তলদি... ও বেবী ডল মে সোনেদি..."
পর্ণ সুপার স্টার সানি লিওন এর ফিল্ম সুপার স্টার হয়ে ওঠা নাকি নতুনদের বেশ আকর্ষণ করছে। এখন নাকি অনেকেই উল্টোপথে উপরে উঠে আসার সহজ পথ খুঁজছে।
আজ রাতে ঘুমের ওষুধ আর কাজ করবে না বলে মনে হচ্ছে রজনীর....
---------
কাহিনীকার--স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
----------------------------------------------
এক
``````
"পেশেন্ট নম্বর ছয়। পাঁচ নম্বর পেশেন্ট ভেতরে আছে। এরপরই আপনি যাবেন কেমন !"
রজনীর সম্বিত্ ফেরে রিসেপ্সনিষ্টের ডাকে। এক অদ্ভুত অসুখে কিছুদিন যাবত্ ভুগছে সে। লাস্ট অ্যাপয়েন্টমেন্টে ডক্টর ম্যাডামকে আসল সমস্যাটার কথাটা বুঝিয়ে বলতেই পারেনি সে। কিছুকথা কি করে বলা সম্ভব ! অবশেষে ডাক্তার গোটা চারেক টেস্ট দিয়েছিলেন। রিপোর্ট হাতে নিয়ে আজ আবার এসে বসে আছে রজনী।
......
.........
"নম্বর ছয়, রজনী মিত্র..."
রিসেপ্সন থেকে ডাক পরে।
রজনীর রিপোর্ট গুলো ডাক্তার ম্যাডাম দেখছেন।
রজনী মিত্র বয়স আটচল্লিশ...
আরেক বার রক্তচাপ মেপে দেখলেন। একশো ষাট বাই একশো...হুম্ !!
ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন - রাতে ভালো ঘুম হয়?
- বেশী না ! দু থেকে তিন ঘন্টা।
- কোনরকম নেশা করেন?
- না, না।
- কোথায় কাজ করেন?
- একটা বেসরকারী স্কুলে শিক্ষিকা।
- চাকরী নিয়ে কোন ঝামেলা চলছে?
- না, না।
- ম্যানেজিং কমিটি বা ইন্সটিচিউশনাল হেড কি কোন খারাপ ব্যবহার করেন?
- না, না।
- যা বেতন পান তাতে কি সুখী? আই মিন্ কোনরূপ বেগ পেতে হয় কি?
- না, যা পাই আর হাসব্যান্ডের বিজনেসে যা ইনকাম তাতে বেশ সুন্দর চলে যায়।
- হুম্ ! আচ্ছা।
- কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে চাই।
- বলুন।
- বিয়ে করেছেন কতো বছর হলো?
- কুড়ি বছর।
- হাসব্যান্ডের সাথে সম্পর্ক কেমন?
- ভালোই।
- প্রেমের বিয়ে?
- হ্যাঁ।
- ছেলে মেয়ে ক'জন?
এই প্রশ্ন শুনে রজনীর বুকটা চমকে উঠে। এই বুঝি গোপন জায়গায় আঘাত দিয়ে ফেললেন ডাক্তার সাহেবা !
- একটিমাত্র মেয়ে। উত্তর দেয় সে।
- বয়স কতো?
- সতেরো বছর চলছে।
- কোন্ ক্লাসে পড়ে?
- ক্লাস ইলেভেনে পড়ে।
- মেয়ের কি কোন ছেলে বন্ধু আছে?আই মিন্ প্রেম-ট্রেম করে?
- না, না।
-খোঁজ নিয়েছেন?
- হ্যাঁ। তেমন কোন সমস্যা নেই।
- মেয়ে কি আপনাদের সাথে তর্ক করে?
- কখনো-সখনো।
- আপনার এই সমস্যা কতো দিন ধরে হচ্ছে?
- মাস খানেক হলো।
- আর্থিক দেনা আছে কারোর?
- না।
- ঠিক আছে। আপাতত এক মাসের ওষুধ দিলাম। এক মাস পর আবার আসবেন।
- কি বুঝলেন ডক্টর?
- একটু স্টাডি করতে হবে।তবে ঠিক হয়ে যাবে।কেস অফ হাইপারটেনশন মনে হচ্ছে।নো টেনশন।আনন্দে বাঁচুন।এই তো সামনে পুজো।চুটিয়ে আনন্দ করুন তো।ঠিক আছে...
- আচ্ছা, নমস্কার।আসি।
দুই
`````
অনীক ছোট সংসার নিয়ে বেশ সুখী। তেমন বাড়তি চাহিদা নেই। ছোট এই মফস্বল জেলা সদরে একটা দোতলা বাড়ি। নিজের বেতনের বাইরেও সাত হাজার টাকা বাড়ীভাড়া। বেশ স্বচ্ছল সংসার। একমাত্র মেয়ে পাখির যে কোন চাহিদা অনায়াসেই পূরণ করতে পারা বেশ সুখের। মেয়ের খুব সখ ছিলো মাধ্যমিকের পর একটা ল্যাপটপ্ সাথে ইন্টারনেট লাইন আর একটা স্যামসাং-এর স্মার্টফোন। বউ আর মেয়ের আবদারে শেষ পর্যন্ত কিনেই দেয়।
আজকাল বুঝতে পারে অনীক, যে রজনীর মন খুব বেশী ভালো যাচ্ছে না। সবসময় আনমনা থাকে। কিছু জিজ্ঞাসা করলে হেসে এড়িয়ে যায়। তবে নিজেরও ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকায় এই সব নিয়ে বেশী ঘাঁটাতেও চায় না সে। তবে শরীর খারাপ থাকলে বেশ চিন্তা হয়। রাতে ঘুম হয় না বলে রজনীর চুলে আঙ্গুল চালিয়ে বিলি কাটতে কাটতে নিজেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।
রজনী ভোর রাত পর্যন্ত ডান বাম করে। স্বামীর আদরে তেমনভাবে সাড়াও দিতে পারে না আবার স্বামীকে বলতেও পারছে না তার এই অসুখের কথা। সারা রাত ধরে তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় নানা জটিল হিসাব নিকাশ। ক্রমেই মানুষের মধ্যে থেকে ন্যায়-অন্যায় বোধ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে ভালো আর খারাপ কাজের সংজ্ঞা। সভ্যতা পশুসুলভ কর্মগুলোর বৈধতা দিচ্ছে।
বিকিনি-গার্লরা এখন নাকি নতুন হটকেক। মহল্লার মোড়ের দোকানে পাঁচ দশ টাকায় স্কুলের ছেলেমেয়েদের এক্সট্রা মেমোরি কার্ডে বিক্রি হচ্ছে ভিডিও। তারা খোঁজ রাখে কার হাতে নতুন রিলিজ পাওয়া ভিডিওটি আছে। মুহূর্তেই বিনা পয়সায় শেয়ার করে নিচ্ছে Share It এর মাধ্যমে। রাষ্ট্র কিছুদিন নজরদারি চালালেও সমাজের কলরোলে আবার সব নির্বিকার। কারো কোন মাথাব্যথা নেই। রজনীর মনে হচ্ছে সব মাথাব্যথা যেন তার একার।
....আচ্ছা,সে কি তবে লুনাটিক হয়ে যাচ্ছে!!
তিন
````````
ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন। রজনী কয়েকদিনের ছুটি নিয়েছে ডাক্তারের পরামর্শে। দিনের বেলাতেও ঘুম পাচ্ছে আজকাল ওষুধের প্রভাবে। শুক্রবার বিকেলে হঠাৎ এক চটুল গানের সুরে ঘুম ভেঙে যায়। পাশের রুমে গিয়ে দেখে আদরের পাখি তার ল্যাপটপে দেখছে -"ইয়ে দুনিয়া পিত্তলদি... ও বেবী ডল মে সোনেদি..."
পর্ণ সুপার স্টার সানি লিওন এর ফিল্ম সুপার স্টার হয়ে ওঠা নাকি নতুনদের বেশ আকর্ষণ করছে। এখন নাকি অনেকেই উল্টোপথে উপরে উঠে আসার সহজ পথ খুঁজছে।
আজ রাতে ঘুমের ওষুধ আর কাজ করবে না বলে মনে হচ্ছে রজনীর....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন