বন্ধূনি....
--------------------শিবাশিস্ আচার্য
এক
-----
ছেলেটা হাসছে। শুকনো কিন্তু মিষ্টি হাসি। নির্জন একটা পথ, সে একা দাঁড়িয়ে আছে বাসের অপেক্ষায়। খোলা রাস্তায় সন্ধ্যার আঁধার ছুটে আসছে। সেই আঁধারের পথ ধরেই সূক্ষ্ম তীরের ফলার মত হঠাৎ নেমে এল ঝমঝম বৃষ্টি। আশেপাশে কোন ছাউনি নেই।
আ-ধোয়া, লাল-হলুদ রঙা টি-শার্টটার আড়ালে কোমরে প্যান্টের ভেতর গোঁজা বইটাও ভিজিয়ে দিচ্ছে বৃষ্টির জল। ছেলেটা ভাবছে...তবুও হাসছে এবং সে থমকেই আছে। বইটির পাতায় পাতায় জলের ধারা নদীর মত এঁকেবেঁকে ছুটছে। হঠাৎ একটা হাত এসে ছেলেটার হাত ধরল। কেউ ছিলনা আশেপাশে, তবুও কেউ এসে হাত ধরল, সে হাতটা...
...হঠাৎ সামনে সেই স্বচ্ছ নদীটা, সেই বইয়ের পাতায় যার নাম ছিল, যে কাহিনীটি পড়ে শেষ করব বলে বইটি কেনার মত পয়সা ছিল না কাছে বহুদিন। নদীটির নাম ভেসে উঠল চোখের সামনে -পাতালমণিগঙ্গা।...
...হঠাৎ কোন গর্তে চাকা পড়ে ভীষণভাবে দুলে উঠল বলেই ঝিমুনি কেটে গেলো। পয়সা খরচ করে রোলার কোষ্টারে চড়তে যেতে হয়না কোনো অ্যামিউজমেন্ট পার্কে কিংবা ফ্যান্টাসিতে। কোলকাতায় লোকাল বাসে চড়লেই হয়। তার ওপর যদি সিট না পাওয়া যায় তবে তো কথাই নেই। রোলার কোষ্টারের দুলুনি না হয়ে যদি সেই মণিনদীতে কোন নৌকার দুলুনি হয়ে উঠত। হলো না আর...
...কেবল অবস্থানগত তফাতের কারণে দুই মানুষের আচরণে কত পার্থক্য ! এ বিষয়টা ছন্দম্ খুব বোঝে। বাসে ঝুলে থাকার কঠোর কসরত নিয়মিতই করে চলেছে তার মতো এই কোলকাতা শহরের খেটে খাওয়া মানুষগুলো। মাঝে মাঝে কদাচিৎ সিটে বসার সুযোগ হয়। এই যেমন এখন বসে আছে সে। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর বিরক্তির মাত্রা এবং সে মাত্রার ডালপালা তার ঠিক বোঝা আছে। বর্ষাকাল, আকাল রাজধানীর পথে পথে অযুত-নিযুত চাকার সাথে মাটির রমণের ফলে যে কাদাময় ক্ষত; তার ছাপ জুতোয় জুতোয় ঘোরে ফেরে। দাঁড়িয়ে থাকা পাশের ব্যক্তিটির কাঁধে একটা বড় আকারের ব্যাগ, বেচারা একটু ঘুরে মাংসপেশীগুলোকে শান্তি দেওয়ার চেষ্টা করছিল, পাশেই কারও প্যান্টের ওপরে তার কাদামাখা স্যান্ডেলটার লজ্জাবিনম্র ছোঁয়া লাগতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন- "চোখের মাথা খেয়েছেন নাকি, বাস থেমে আছে, আপনার অতো ঘোরবার কি দরকার?? ঘুরেছেন ভালো ,কিন্তু দেখে ঘুরবেন না...যত্তোস্সব..."
ওদিকে কান দিয়ে লাভ নেই, এসব রোজকার বিষয়। বসার সুযোগ হয়েছে সুযোগের সদ্ব্যবহার করা দরকার। একটু গতি আবার একটু অনড় অবস্থা-এইতো ক্রমাগত, মাথাটা দুলে ওঠে, লেখক প্রাণটা জেগে ওঠে। দাঁড়িয়ে থাকলে শরীরের পেশীগুলো ব্যালেন্স বজায় রাখতে এতটাই শক্তিক্ষয় করে, মাথা আর তখন কাজ করেনা। বসে থাকলে কাজ করে। এখন কাজ করছে। নতুন একটা গল্পের ভেতর ঢোকার পরিকল্পনা করছে সে। চোখ দুটোও বন্ধ হতে চাইছে। ঝিমুনিটি উপভোগ করতে চাইছে মন।
....
আমি ছন্দম্...
.....
........
গল্প না আসুক , নদীটাও আসতে পারে , কিন্তু সাথে ছেলেটা যার কোমরে বইয়ের পাতা ভিজছিল, সে আসুক আমি চাইনা। অনেকদিন ভুলে ছিলাম। ইদানীং কেন আবার সেই ছেলেটা আসছে আধো-স্বপ্নে? আগে যখন আসত তখনই ভেবেছিলাম একটা গল্প লিখব, কিন্তু মন সাড়া দেয়নি। লিখবনা। বরং মন থেকে তাড়াব। তাড়িয়েছিলামও, লেখালেখির প্রতি ঝোঁক আর ভাবনা ক্রমাগত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তা সে উভয় ক্ষেত্রেই- সাহিত্য চর্চা আর স্কুলের একঘেয়ে পড়াবার জীবন...খাতা দেখা..প্রশ্ন তৈরী করা...স্কুল সার্ভিস কমিশনের মতো কিছু পরীক্ষা চালু হয়ে আমার মত বাউন্ডুলেদের খেয়ে পড়ে বাঁচার মত কিছু সুযোগ হয়েছে।
....অকারণ হর্ণ বাজাচ্ছে গাড়িগুলো। ফ্লাইওভারের কাজে রাস্তার কিয়দংশ তো অকেজোই , মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে দু'ধার দিয়ে পাইপ বসানোর হিড়িক পড়ে যাওয়ায়। গর্ত থেকে ওঠানো মাটির সাথে বৃষ্টির জল এসে মিশে থকথকে তালক্ষীর রেঁধেছে। কি দুর্বিষহ কষ্টে, দুর্দান্ত কসরতে রাস্তা পার হচ্ছে সকলে। স্কুল ফেরত ছেলেমেয়েগুলোও। জীবন হাতের মুঠোয় সবার। মুঠো খুললেই প্রাণ বায়ু উড়ে যাবে। এইসব বিসদৃশ নিয়ে খুব লিখতে ইচ্ছে হয়। চেষ্টাও করেছে কত। তারপর এগোতে এগোতে বৃত্ত আর পূরণ হয়না।
...আচ্ছা এই বৃষ্টিতে মানুষের কষ্ট নিয়েই একটা গল্পের প্লট শুরু করা যায়। বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়া পথের সমস্যা নিয়ে শুরু হবে। কিন্তু সাথে আসতে থাকবে রাস্তার বেহাল অবস্থার করুণ চিত্র, রাস্তা মেরামতের নামে টাকা লুটের এক মোচ্ছব, বিদেশি অর্থ সহায়তা রাস্তার মেরামতে বাস্তবে সামান্যই ঢালা হচ্ছে আর আছে মন্ত্রী-মিনিষ্টারদের শকুনি দৃষ্টি, দলীয় নেতা কর্মীদের আগ্রাসন--সমস্যার ডালপালা ছড়াতে থাকে, কোন স্থানে থামেনা, গল্পের নৌকা কোন নদীর ঘাটে ভেড়েনা। তাইতো শেষ-মেশ বরাবরই সমস্যা দিয়ে শুরু করেও গল্প প্রেমের জালে পা দেয়। গল্প লেখা হয়ে যায়, লেখা হয়ে যায় একসময় উপন্যাসও। সমস্যা নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে আর লেখা হয়না, যা লেখা হয় দু’একটা বৃত্ত-খোলা গল্পে, তাও পড়ে থাকে বিস্তৃত টেবিলে ডায়েরীর পাতায়।
দুই
----
আমি ছন্দম্ ব্যানার্জী....
বড় লেখক হয়ে উঠতাম যদি কোনদিন সমস্যা নিয়ে লেখা গল্পগুলোও প্রকাশকদের দিয়ে ছাপানো যেত। সেদিন হয়তো মন উজাড় করে কিছু গল্প লিখে ফেলতাম। মণি নদীটা নিয়ে একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম। স্বপ্নে দেখা সেই ছেলেটাকে মণি নদীটিতে নৌকায় চড়াতে চেয়েছিলাম। গল্পটার সূচনা করতে পারিনি। ছেলেটা বারবার কষ্ট দেয়, চোখে জল আনে। লেখক হবার যাতনা আর সুখ ঘিরে ধরে। কাকে সে জানাবে তার মনের কথা..ছেলেটাকে উপজীব্য করে গল্পটা লিখে ফেলে কাকে বলবে তার অকপট স্বীকারোক্তি...."সেই ছেলেটি আমি। ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ বইটি লুকিয়ে দোকান থেকে আমি বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। দোকানের কর্মচারী ছিলাম, কাজের ফাঁকে বইটি শেষ করতে পারিনি। বৃষ্টি এলো তখনই..."
...তবুও কেউ মজেছে। মজা ও হতে পারে। তবুও আমি রিস্কটা নিতে চাইছি। অতীত বড্ড কষ্ট দিচ্ছে। ইদানীং বৃষ্টি হলেই আমার অতীতের সেই সন্ধ্যাটা ফিরে আসে। একজন বন্ধুর সঙ্গ কি তবে একান্তই প্রয়োজন? সেটাও ভেবেছি। বন্ধনে বন্দী হতে চায়না আজও মন। কিন্তু তবুও বোধহয় প্রয়োজন।
সে আমার মোবাইল নম্বর যোগাড় করেছিল। বলেছিল, আমি আপনার লেখনীর গুণমুগ্ধা । কিছু গল্প-কবিতা-উপন্যাস প্রকাশেই সুকণ্ঠী গুণমুগ্ধার ফোন। আমি মুহূর্তে আকাশে মেঘে চড়ে বসেছিলাম। কেন জানি তবুও বলে ফেলেছিলাম, "আপনি কি আমার লেখা পড়ে মনে কোন কষ্ট পেয়েছেন বলে কি এই ফোন কল?"
সুকণ্ঠী প্রতি উত্তরে বলেছিল, "না, আমি মুগ্ধ হয়েছি , আমি আপনার চরিত্রের প্রেমে পড়েছি।"
আমি বোকার মত বললাম, "প্রেমে!"
--হ্যাঁ! তবে আপনার নয় কিন্তু , আপনার বইয়ের চরিত্রগুলোর।
তারপর কিছুক্ষণ হাসাহাসি। অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। কথা বৃষ্টির মত। যতক্ষণ ঘনীভূত মেঘ থাকে সে ঝরবেই। আমাদের দু’জন নর-নারীর মস্তিষ্কে মেঘ দ্রুত এবং ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছিলই। আমিও আমার প্রথম গুণমুগ্ধার প্রতি নিজেই মোহাচ্ছন্ন হচ্ছিলাম। প্রায়ই কথা হয় আজকাল।
নারী তার নাম বলেছে রূপা। বিশ্বাস করেছি আবার করিনিও বলা যেতে পারে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে ভুবন ভোলানো হাসি শুনিয়ে বলেছিল, নামটা নাকি সত্যিই। আমি বিশ্বাস করেছিলাম। নামটা আমাকে অগোচরে নারীর প্রতি আলাদা একটা মোহ সৃষ্টির ঘটনায় পর্যবসিত করেও থাকতে পারে। আমার সৃষ্ট রূপা চরিত্রটির প্রতি আমারও আলাদা একটা মোহ আছে। রূপা নামে মজব সেটাই তাই স্বাভাবিক।
রাতে কখনও কথা হয়নি। আমি ছ্যাবলামি করে একদিন রাতে মোবাইল বন্ধ রাখার কারণ জানতে চেয়েছিলাম। অকপটে বলেছিল, নারীদের নিয়ে গল্পে এত বিশ্লেষণ কর আর আমি বিবাহিত সেটা বুঝলে না !!
ততদিনে আমরা দু’জন দু’জনার প্রতি তুমি সম্বোধনে চলে গিয়েছিলাম। বিবাহিত শব্দটা একটা প্রচন্ড নাড়া দিলেও আমি সামলে নিলাম। কেন যেন এবার সত্যিকার ভাবে সম্পর্কটাতে একটা প্রশান্তি পেলাম। হতে পারে বন্ধনের বাধ্যবাধকতা মুক্ত হলাম বলে। তবে নিজের মাঝে নষ্ট একটা আপন ভুবন টের পেলাম। পরকীয়া নিয়ে একটা উপন্যাস যখন লিখছিলাম, ভাবনার সুতো মুক্ত আকাশে অবারিত ছড়াচ্ছিলাম তখন এই ভুবনটা সাড়া দেযনি। এখন দিচ্ছে। রূপা বলেছিল, "কী? বিবাহিত দেখে কি বন্ধুত্ব করবে না? পরকীয়া তো করতে বলছিনা। শুধু লেখকের একটু সান্নিধ্য চাইছি। সেটা কি খুব অন্যায়?"
কেন যেন আবার ছ্যাবলামি করে বলেই ফেলেছিলাম, "পরকীয়া করতে চাইলেই কি করা যায় সখী, সে যে হইয়া যায় গো মানস-বনে...হো...হো...হো...হো"।
সম্পর্ক কতদূর কি এগিয়েছে ভাবিনি। সংসারী মানুষ হলেও মুক্ত বিহঙ্গ। কল্পনার জগত আমার জীবনের অনেকাংশ জুড়ে। তার ওপর সেই বৃষ্টি ভেজা বই...সেই কষ্টের দৃশ্য। আমি ভুলতে চাই।
রূপা বলেছিল, দুপুরের সময়টাতে সে ফ্রি থাকে। লেখক চাইলে কোথাও এসে তার সাথে দেখা করতে পারে।
থার্ড পার্সনে বলা বাক্যের সে আমন্ত্রণে সাড়া দিতেই ছুটেছি আজ।
তিন
------
আমি ছন্দম্ লেখক....
আমি এলাকাটা চিনি। দক্ষিণ দাঁড়িয়ার ত্রিপুরাদেবীর মন্দির-সংলগ্ন এলাকা । শুনে রূপা বলেছিল, "তাই নাকি, আর কোন পরকীয়া সম্পর্ক আছে নাকি এদিকে..."
--থাকলে কি হবে?
--নেই সেটা জানি, লেখায় তুমি যত পটু নারীদের সাথে কথা বলায় তত পটু কিন্তু নও।
--তবে তুমি যে বন্ধু হতে চাইলে !!
--তাই নাকি? । কি জানি ??
...আমার কিন্তু চিরন্তন পুরুষালি আঁতে ঘা লেগেছিল। তারপরও কেন আমন্ত্রণে ছুটে এলাম !....
...যানজট এখন অসহ্য লাগছে। চোখ বুজে কত কিছু ভাবছিলাম। নেমে চলে যাব নাকি। যদি রূপার হাজব্যান্ড চলে আসে। যদি ধরা পড়ে যাই। আসলেই কি আমার মনে কোন নষ্ট ইচ্ছে সাড়া দিচ্ছে, নাকি কেবলই কৌতূহল। লেখকদের কত পাগলামি থাকে। আমি লেখক হতে চাই, একটুখানি হয়েছিও বটে, একটু পাগলামি করলে কি-ই বা যায় আসে। তবুও...এতো ঠিক নয়। ফোনের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাক না। যদি দেখতে খুবই কদাকার হয়। যদি একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। যদি বেশ বয়স্কা হয়। যদি মজা করার জন্য আরও দু’চারটে বান্ধবীকে নিয়ে বসে থাকে...
মোবাইল বাজছে। কিন্তু পকেট থেকে এই চাপাচাপির সিটে বসে সেটা বের করাটাই কষ্টসাধ্য। পাশের লোকটির সাথে কনুইয়ের গুঁতো লাগায় আড়চোখে তাকালে সে একবার। সে তাকানোর উত্তরে আমার "কি ভয় পেয়েছি !!" এমন কোন ভাব করা দরকার?
...রূপার কণ্ঠ ভেসে এল মোবাইলের তরঙ্গে, "তোমার জন্য অপেক্ষাতে চোখ করেছি কানা...ঘেমে-নেয়ে একাকার। তা কতদূর পৌঁছালে?
--এই তো শ্রীমতির মোড় । প্রচন্ড যানজট ।
--সে জানি। বাস থেকে নেমে দেখো, সকালের বৃষ্টিতে রাস্তার কি যে অবস্থা ভেতরে ঢুকলেই বুঝবে।
--ভয় দেখাচ্ছ।
--অচেনা নারীর সাথে দেখা করতে তুমিই আসছ। জল-কাদার ভয় তুমি পাবে, সে আমি বিশ্বাস করিনা। তবে তোমার কণ্ঠ কিন্তু কাঁপছে।
--সেটা কিন্তু বাসের দুলুনির কারণে রূপা। ভয় পেলে কি আর আসতাম !
--সত্যি তুমি আসছো তো ?
--হ্যাঁ রে বাবা, আসছি। এখন রাখ, বাস বড্ড বেশি দুলছে। না জানি উল্টেই যায়।
--ধ্যাত্ যত্তো সব উল্টোপাল্টা কথা..রাখছি !!
হাসতে হাসতে ফোন কেটে দিলাম। আরেকবার ভাবলাম, সত্যি কি আমি যাচ্ছি। হ্যাঁ যাচ্ছি-ই-ই।
সিগনালে থেমেছে বাস আবার। চোখ বন্ধ করলাম। অনেক নষ্টালজিক স্মৃতি মনে পড়ছে। প্রতিটি স্মৃতির পরতে পরতে ফিরে আসে সেই বৃষ্টি ভেজা বই। বইটির নাম ছিল আম আঁটির ভেঁপু। সম্ভবত ওইটা ছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপু-দুর্গাকে নিয়ে লেখা প্রথম বই।যে গল্পের উপর ভিত্তি করে সত্যজিত্ রায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র তৈরী করেছিলেন "পথের পাঁচালী" নাম দিয়ে। অরূপ করচৌধুরী সাহেবের বইয়ের দোকানে কর্মচারী ছিলাম। ভাড়াবাড়িতে অসুস্থ বাবা। খুব কষ্টে আমার দু'পয়সার আয়ে চলে যেত কিন্তু চিকিৎসা বাবার ঠিক মতো হতো না। তার ওপর রাতে নৈশ স্কুলে পড়তাম। পড়ালেখাটা ছাড়তে পারতাম না, কেনো জানি সেটা আমার নেশা ছিল। করচৌধুরী সাহেবের সেই ভয়ানক মার--এখনও যেন পিঠে ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক কষ্টে কেটেছে চাকরিটা চলে যাবার পরবর্তী অনেকটা দিন। বাবা’ও মারা গেলেন সেই সময়। একের পর এক যাতনা। দাঁড়িয়া এলাকার ভাড়াবাড়ি ছেড়ে চলে গেলাম। কৈশোরের স্মৃতি কত এই এলাকার। অরূপ করচৌধুরীও তখন শ্রীমতী এলাকায় থাকতেন। ভাড়া থাকতেন একটা বড় বাড়িতে। শুনেছিলাম এখানে তার একটা কেনা জায়গাও আছে।
ভাড়াবাড়িটাতে গিয়ে অনেকদিন আগে একবার খুঁজেছিলাম। থাকেনা সে এখন আর। কেউ খোঁজও দিতে পারল না। তার কেনা জায়গাটা চিনতামও না। দোকানটা ছিল মাথুর চক্-এ। এখন আর নেই। সেখানে এখন সু-উচ্চ দালান উঠেছে। করচৌধুরীকে আমি খুঁজি পথে ঘাটে। এত এত মানুষ, তাকে কোথায় পাব? তাকে খুঁজে পেলে কি করতে পারব জানিনা। কিন্তু মনে হয় ঐ যাতনার স্মৃতিটা কিছুটা হলেও লাঘব হবে...
....বইটা দোকান বন্ধ করার সময় কোমরে গুঁজে নিয়েছিলাম। দোকানের সব বই দোকানেই প্রতিদিন একটু একটু করে পড়ে ফেলতাম অন্যদের অগোচরে সময়ের সুযোগে। করচৌধুরী সাহেবের আরও ব্যবসা ছিল। উনি কমই আসতেন। বইটা খুব টেনেছিল। চার পাতা পড়ে তাই লোভ সামলানো সম্ভব হয়নি। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতেই বৃষ্টি চলে এসেছিল। করচৌধুরী সেই সময়ই সে দিক দিয়ে যাবেন কে জানত। কাকতলীয় ঘটনা এই ভাবেই বোধহয় ঘটে।
করচৌধুরী কি এখনও এই এলাকায় থাকেন?
চার
-----
আমি ছন্দম্ কাহিনী-কথক...
রূপা কমই বলেছে। কানুশশীপুর থেকে রিক্সা নেওয়ার পর বুঝলাম রাস্তা কতটা ভয়াবহ। দাঁড়িয়ার কে.সি.পি. হাই স্কুল পর্যন্ত পাকা হয়েছে, তারপর পুরোটা কাঁচাপথ। কাদা থিকথিক করছে। থলথলে ক্ষীরের মোটা স্তর যেন। একটু পরপরই বড় বড় গর্ত। কেউ বুঝি দেখার নেই এ দেশে এসব। সবাই মেনে নিচ্ছে। রিকশাওয়ালার অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে। রিক্সাওয়ালার কষ্ট দেখে আমারও কষ্ট হচ্ছে। নেমে যাব কিনা ভাবলাম। কিন্তু তাতে কার লাভ, বরং ক্ষতিটাই বেশি, হাঁটার মত জায়গা তো নেই। পায়ে কাদা লাগবেই, রিকশাওয়ালাও ভাড়া থেকে বঞ্চিত হবে। কিন্তু বেচারা আর টানতে পারছে না।
একটু শুকনো মত বালুচর দেখে নেমেই গেলাম । পুরো ভাড়াই দিলাম। অনেকদিন পরে এলেও এদিকের রাস্তা ঘাট আমার চেনা মোটামুটি। মন্দির চত্বরের কাছাকাছি গিয়ে ফোন করলেই হবে। অদূরেই ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পেলাম। সময় খেয়াল ছিলনা। এতক্ষণে খেয়াল করে দেখলাম রূপার ফোন রাখার পর থেকে এখানে আসতে দু'ঘন্টারও বেশি লেগে গেলো।
মোড়ের মাথায় গিয়ে ফোন করলাম। এগিয়ে এলো যে জন সে, ভালোই সুন্দরী।
--চিনতে অসুবিধা হয় নি তো?
--না, না !!
--ঠিক যেমন ভেবেছিলাম লেখকমশাই ঠিক তেমনই দেখছি!!
--তাই? তা কি ভেবেছিলে শুনি?
--সেটা নয় আমার কাছেই থাক।
--আচ্ছা থাক, পরে শুনবো।
....গল্পে-গল্পে অনেক সময় অতিবাহিত হলো। কাছেই ছোট একটা খাল আছে, তার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে নানারকম গাছ-পাখি চিনলো ও চেনালো উভয়-উভয়ে। কতদিনের স্মৃতি আবার হৃদয়পুরের উজানে খেয়া বাইলো।
রূপার স্বামী লোকটি নাকি বেশ বড় ব্যবসায়ী। ওষুধ আর কাপড়ের ব্যবসা। আগে বইয়ের ব্যবসা ছিল। অনেক টাকা। তবুও রূপা অসুখী। কারণ বলতে চায়নি প্রথমে। পড়ে বাধ্য হয়েছিল বলতে, লোকটির সময়াভাব...
...রূপার প্রতি একটা সহানুভূতি জেগেছিল। কিন্তু রূপা সহানুভূতি চায়নি। সে মানসিক সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু আমার গল্প তাকে কেন টানে, সে কথা একবারও বলেনি। আমার খুব রাগ হয়েছিল।
প্রথম দর্শনে কি বলব, একটা জড়তা কাজ করবে সেটা বুঝেছিলাম। ভাবছিলাম একবার সামনে গিয়ে বলব, "আজ বলতেই হবে আমার গল্প তোমার ভাল লাগে কেন?"
কিন্তু বলা হলোনা। ফোনে সে বলেছিল দেখতে খুব একটা সুন্দর সে নয়। বয়স পঁয়ত্রিশ বছর। আমার সমবয়স্ক। আমাদের মধ্যে কমিটমেন্ট হয়েছিল আমরা সত্য গোপন করতে পারব তবে মিথ্যে বলতে পারবোনা। তাই রাগ হলো, সে মোটেও অসুন্দর নয়, বিশেষ ভাবে আকর্ষণীয় তো বটেই।
আমার রাগের কথায় সে হাসল। সত্যি তার হাসি সুন্দর। উজ্জ্বল বর্ণের মুখশ্রীতে সে দারুণ লাগছিল। যত্সামান্য সাজ সে নিয়েছিল, যদিও সেটা মানা ছিল। সে কথা রাখেনি। হালকা লিপস্টিক লাগানোর দক্ষতায় তার নৈপুণ্য সত্যই প্রশংসার্হ।
আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে অকপটে রূপা বলে উঠল, "আমি জানি পুরুষের কোন দৃষ্টি আমাকে খোঁজে।"
আমি একটু লজ্জিত হলাম। এটা আমার স্বভাব জাত।
--তোমার লজ্জিত হবার দরকার নেই,তোমাকে আমি এত নির্জনে, এত রিস্ক নিয়েও যে ডেকেছি আর এতটুকু দৃষ্টি দেওয়ার অধিকার দেবো না তা কি হয়।
আমি এইবার একটু আনইজি বোধ করি।
পাঁচ
-----
আমি ছন্দম্ কাহিনীকার....
হঠাত্ রূপার পার্সটা হাত ফস্কে কাদায় পড়ে গেলো। আমি তাড়াতাড়ি সেটাকে তুলে নিয়ে কাছেই একটা নলকূপে ধুতে যাবার আগে রূপা মোবাইল, টাকা, দরকারী কাগজ বার করার সময় দেখলাম মোবাইলের ওয়ালপেপারে....এত দিনের প্রচেষ্টা হঠাৎ সফলতার মুখ দেখল।
...আমি চিনেছি। ঠিকই চিনেছি। সোনালী ফ্রেমের ছবিতে রূপার সাথে বিয়ের সাজে যে লোকটি ঐ তো সেই লোক, ওকেই তো আমি খুঁজে ফিরছি আজ এত বছর। ঐ তো সেই আমার পুরোনো মনিব অরূপ করচৌধুরী সাহেব। চোখের সামনে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই। কিন্তু এত টাকার মালিক তো সে ছিলনা। এ দেশে অবশ্য তার মত মানুষের পক্ষে রাতারাতি বিশিষ্ট বণিক বনে যাওয়া খুব কঠিন নয়। সেই কিশোর কালে যখন তার দোকানে কাজ করতাম জানতাম তার একটা ওষুধের দোকানও ছিল, এমন আলাপ শুনতাম দোকানের অন্যান্য কর্মচারীদের কণ্ঠে। হয়তো সেটাই সত্যি হয়ে থাকবে।
কিন্তু এখন আমি কি করব। এতদিন খুঁজেছি। খুঁজে পেলে কি করব সেটা তো ভাবিনি। আমার প্রকাশিত গল্পগুলো তার সামনে নিয়ে ছুঁড়ে মারব। সে কী সেটার যোগ্য? সে কী আমার লেখক হওয়াকে আরও উপহাস করবে ? পনেরো বছর আগে এক সন্ধ্যায় যখন কি ভীষণ মারটাই না মেরেছিল। একটা মাত্র বই দোকান থেকে নিয়ে আসার কি করুণ শাস্তি। আমি তো বইটা ফেরতও দিতাম।
টানতে টানতে দোকানে নিয়ে গিয়েছিল। স্কেলের সপাৎ সপাৎ শব্দ...পিঠ কেটে রক্ত বেরিয়েছিল। বৃষ্টি ভেজা বইটা একটানে কোমর থেকে টেনে নিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে মেরেছিল। সে কি দুর্বিষহ গালাগালি। রাগ হচ্ছিল, বইটা রাস্তায় ফেলে দিল! এত সুন্দর একটা বই, প্রিয় লেখকের বই। লোকটা তার কালো মোটা ঠোঁটটাকে বেঁকিয়ে বলেছিল, ‘হারামীর ছেলে চুরি করতে শিখেছো, বই-পড়া দেখাচ্ছো, ফকিরের ছেলে লেখক হবে।যা দূর হয়ে যা, দোকান থেকে।কাল থেকে আর আসবি না !!’
--আমার পাওনাটা মিটিয়ে দিন !!
--কিসের পাওনা?-বলেই এক থাপ্পড়। বইটার দাম নেই।নষ্ট করলি যে?আগেও এমন ভাবে আরও কত বই নিয়েছিস,সব জেনেছি।
--আপনিই তো রাস্তায় ফেললেন !!
--বেরো বেরো!! চোর কোথাকার- বলে চুলের মুঠি ধরে এক ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিলেন....
...একটা বইয়ের দাম ছুঁড়ে মারার জিদ সেই কিশোর বয়সে মানায়। এখন তো পরিণত মন।
হাঁটতে হাঁটতে মূল রাস্তায় এসে পড়লাম।
--চলো ছন্দম্ ! ঐ হোটেলটায় কিছু খাওয়া যাক। কি খাবে বলো?
--আমি তো তোমার জন্য কিছুই আনতে পারিনি বন্ধূনি...
--বাঃ, দারুণ একটা অভিধায় ভূষিত করলে তো আমায়। তুমি এসেছো, লেখক। আর কি চাই। এই নাও এই ডায়েরিতে একটা স্মারক দিও অটোগ্রাফের সাথে। সেরা উপহার হবে।
ভাবলাম উপন্যাসের ডায়লগের মত সিনেমাটিক ভাবে কিছু বলি, কিন্তু বলতে ইচ্ছে হয় না। পরক্ষণেই আবার মনে হয়, করচৌধুরীই যদি এই রূপার স্বামী হয়, তবে সেই অতীতের প্রতিশোধ নেয়ার এই তো কম সুযোগ নয়। রূপা আমার প্রতি অনুরক্ত সেটা তো স্পষ্ট। আমি চাইলে তাকে আরও উদ্বেলিত করতে পারি। সেটা কি করচৌধুরীর জন্য শাস্তি স্বরূপ হবে না। কিংবা আরও একধাপ....
--কি ভাবছ লেখক?
--হুঁ, কিছু না, তোমায় দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাবুক হয়ে উঠছি।
--তাই নাকি ? নাকি আমায় দেখে খুব বিমর্ষ হয়ে উঠেছো, মনকে অন্যদিকে রেখে আমাকে এড়াতে চাইছ। চাইলে বলতে পার। খাবার রেডি হয়ে আছে, খেয়ে চলে যেতে পারো। এখনই খাবে নাকি?
--কোন্ খাবার? যা আজ মন-পানসীকে কানায় কানায় ভরিয়েছে?
--এইবার দেখি সত্যিকারের লেখকের মত কথা বলছো। বইয়ের সুর আর কথার সুর মিলছে। মোবাইলে তবে কেন এত গম্ভীর লাগে?
--তাই নাকি? আচ্ছা তোমার মোবাইলের ছবির লোকটিই কি তোমার স্বামী?
--হুঁ।
--নাম কি?
--কেন, চেনো নাকি?
--চিনতেও পারি।
--অরূপ করচৌধুরী।
মনে মনে ভাবলাম, বলে দেবো নাকি ইতিহাস...বলা ঠিক হবেনা...
ছয়
-----
আমি....সুন্দর এক বন্ধূনি-প্রাপক...
একটা সুন্দর দুপুর কাটল। বেশ গল্প করতে জানে রূপা। কিন্তু কিছুতেই আমার গল্প পড়ার রহস্য সে জানালো না। বলল, যদি এটা জানার জন্য কিছুদিন হলেও আমাকে সময় দাও। জোর কোরো না জানার জন্য। আমিই জানাবো একদিন।
ফেরার আগে বলেছিল, ছন্দম্ তুমি খুব ভালো । অন্তত আর দশটা পুরুষের মত তোমার মনটা নষ্ট হয়ে যায়নি।
এত বড় কম্প্লিমেন্টের পরে আর কি বন্ধু ছাড়া কিছু হওয়া যায়। অনেকের কাছে কম্প্লিমেন্টটাই বড় , একজন লেখকের কাছে তো বটেই।
...বাসায় ফিরতে ফিরতে বারবার রূপার মুখটা মনে পড়ছিল। সেই বৃষ্টি ভেজা কিশোর, বইয়ের পাতায় পাতায় বৃষ্টির জল...কিছুটা বোধহয় ভুলে থাকা যাচ্ছে। করচৌধুরীকে খুঁজে পেলাম। কি চরম কাকতালীয়। রূপার হাজব্যান্ড্ ! সত্য সেলুকাস ! মণি নদীর তীরে বৃষ্টির মাঝে আমি রূপাকে পেলাম চোখ বোজা কল্পনায়....
আমরা মানে আমি আর রূপা কী সত্যি একে অপরের সত্যি বন্ধু হতে পারব?
পুরো সন্ধ্যায় রূপাকে নিয়ে ভেবেছি। একবার কথা হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন রাতেই ওর বর ফেরে এই বাসায়। সে কারণে রাতে কথা বলেনা। তবে কথা দিয়েছে এখন থেকে যে সব রাতে বর আসবে না রূপা আমার সাথে কথা বলবে। আসলে রূপার সাথে কথা না বললে কিছু ভাল লাগেনা। মনের জট খোলে না। আটটার দিকে একবার কল করলাম , "জানালো ওর স্বামী আসছে, পথে আছে। রাতে ফোন করতে মানা করলো।"
বাইরে এখন ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। চোখ বন্ধ করতেই দেখলাম মণি নদীটির তীরে আমি আর রূপা ঝিরঝিরি বৃষ্টিতে হাঁটছি। আমরা হাসছি । নদীর ওপারে হারিয়ে যাচ্ছে নৌকাটা , নৌকায় সেই আমার কিশোর স্মৃতি। আমি মণি নদীকে আমার মাঝে ধারণ করতে চাইছি রূপার ক্ষণ-সাহচর্যের মাধ্যমে। আমার ঠোঁটটা নড়ে ওঠে, আমি বলে উঠি আপনমনে, যা আজ লিখে দিয়ে এসেছি বন্ধূনি রূপাকে--
"বন্ধু,
তোমার লাবণ্য-নক্ষত্র প্রতিচ্ছবি বৃষ্টিঝরা শান্ত ছায়ার মতো,
নিশিদিন ভেসে উঠে প্রকৃতির হৃদয় মাঝে বারবার।
এমন করে স্বপ্ন দেখতে চাইনি, তবুও তো হৃদয়
ভুবনজয়ী ভালোবাসার এক সুকঠিন আবেশে দীর্ঘায়িত হয়।
পৃথিবীর সমস্ত অস্তপারের সন্ধ্যাতারা ও আত্মার নির্যাস,
থেমে থেমে চলতে শুরু করে স্বপ্নের দীপ জ্বেলে অজানায়।
কাঠবিড়ালী, হরিণরা প্রখর কিরণে গাছের ছায়ায় আশ্বাস খোঁজে,
গভীর স্তব্ধ রাতে অথবা রূঢ় রৌদ্রে সীমান্ত সংলগ্ন নীড়ে দুঃস্থ হৃদয়।
পৃথিবীর প্রেম-প্রলুব্ধ আদমের চারদিকে অশনি সংকেত,
গান্ধর্বী কন্যারা দুঃস্বপ্নের ছায়ায় প্রতারিত করে,
বিকেলের রোদ কেড়ে নিয়ে জীবন থেকে,
হারিয়ে যায় নদীর জলে একরাশ অতৃপ্তি ঢেলে বুকে,
প্রেমের শীর্ষে জীবনটা কঠিন অঙ্গার করে একান্তে গোপনে।
বন্ধু, এসব জেনে দেয়ালে সাজানো ছবিটাও পরিহাস করে,
ভালোবাসার লাবণ্য-নক্ষত্র প্রতিচ্ছবি;
দখিনা হাওয়ার সাথে--
পর্দার আড়ালে এক মেরুদণ্ডী প্রাণীর মতো সর্বদাই পড়ে থাকে।"
---------------------ছন্দম্ ব্যানার্জী।
--------------------শিবাশিস্ আচার্য
এক
-----
ছেলেটা হাসছে। শুকনো কিন্তু মিষ্টি হাসি। নির্জন একটা পথ, সে একা দাঁড়িয়ে আছে বাসের অপেক্ষায়। খোলা রাস্তায় সন্ধ্যার আঁধার ছুটে আসছে। সেই আঁধারের পথ ধরেই সূক্ষ্ম তীরের ফলার মত হঠাৎ নেমে এল ঝমঝম বৃষ্টি। আশেপাশে কোন ছাউনি নেই।
আ-ধোয়া, লাল-হলুদ রঙা টি-শার্টটার আড়ালে কোমরে প্যান্টের ভেতর গোঁজা বইটাও ভিজিয়ে দিচ্ছে বৃষ্টির জল। ছেলেটা ভাবছে...তবুও হাসছে এবং সে থমকেই আছে। বইটির পাতায় পাতায় জলের ধারা নদীর মত এঁকেবেঁকে ছুটছে। হঠাৎ একটা হাত এসে ছেলেটার হাত ধরল। কেউ ছিলনা আশেপাশে, তবুও কেউ এসে হাত ধরল, সে হাতটা...
...হঠাৎ সামনে সেই স্বচ্ছ নদীটা, সেই বইয়ের পাতায় যার নাম ছিল, যে কাহিনীটি পড়ে শেষ করব বলে বইটি কেনার মত পয়সা ছিল না কাছে বহুদিন। নদীটির নাম ভেসে উঠল চোখের সামনে -পাতালমণিগঙ্গা।...
...হঠাৎ কোন গর্তে চাকা পড়ে ভীষণভাবে দুলে উঠল বলেই ঝিমুনি কেটে গেলো। পয়সা খরচ করে রোলার কোষ্টারে চড়তে যেতে হয়না কোনো অ্যামিউজমেন্ট পার্কে কিংবা ফ্যান্টাসিতে। কোলকাতায় লোকাল বাসে চড়লেই হয়। তার ওপর যদি সিট না পাওয়া যায় তবে তো কথাই নেই। রোলার কোষ্টারের দুলুনি না হয়ে যদি সেই মণিনদীতে কোন নৌকার দুলুনি হয়ে উঠত। হলো না আর...
...কেবল অবস্থানগত তফাতের কারণে দুই মানুষের আচরণে কত পার্থক্য ! এ বিষয়টা ছন্দম্ খুব বোঝে। বাসে ঝুলে থাকার কঠোর কসরত নিয়মিতই করে চলেছে তার মতো এই কোলকাতা শহরের খেটে খাওয়া মানুষগুলো। মাঝে মাঝে কদাচিৎ সিটে বসার সুযোগ হয়। এই যেমন এখন বসে আছে সে। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর বিরক্তির মাত্রা এবং সে মাত্রার ডালপালা তার ঠিক বোঝা আছে। বর্ষাকাল, আকাল রাজধানীর পথে পথে অযুত-নিযুত চাকার সাথে মাটির রমণের ফলে যে কাদাময় ক্ষত; তার ছাপ জুতোয় জুতোয় ঘোরে ফেরে। দাঁড়িয়ে থাকা পাশের ব্যক্তিটির কাঁধে একটা বড় আকারের ব্যাগ, বেচারা একটু ঘুরে মাংসপেশীগুলোকে শান্তি দেওয়ার চেষ্টা করছিল, পাশেই কারও প্যান্টের ওপরে তার কাদামাখা স্যান্ডেলটার লজ্জাবিনম্র ছোঁয়া লাগতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন- "চোখের মাথা খেয়েছেন নাকি, বাস থেমে আছে, আপনার অতো ঘোরবার কি দরকার?? ঘুরেছেন ভালো ,কিন্তু দেখে ঘুরবেন না...যত্তোস্সব..."
ওদিকে কান দিয়ে লাভ নেই, এসব রোজকার বিষয়। বসার সুযোগ হয়েছে সুযোগের সদ্ব্যবহার করা দরকার। একটু গতি আবার একটু অনড় অবস্থা-এইতো ক্রমাগত, মাথাটা দুলে ওঠে, লেখক প্রাণটা জেগে ওঠে। দাঁড়িয়ে থাকলে শরীরের পেশীগুলো ব্যালেন্স বজায় রাখতে এতটাই শক্তিক্ষয় করে, মাথা আর তখন কাজ করেনা। বসে থাকলে কাজ করে। এখন কাজ করছে। নতুন একটা গল্পের ভেতর ঢোকার পরিকল্পনা করছে সে। চোখ দুটোও বন্ধ হতে চাইছে। ঝিমুনিটি উপভোগ করতে চাইছে মন।
....
আমি ছন্দম্...
.....
........
গল্প না আসুক , নদীটাও আসতে পারে , কিন্তু সাথে ছেলেটা যার কোমরে বইয়ের পাতা ভিজছিল, সে আসুক আমি চাইনা। অনেকদিন ভুলে ছিলাম। ইদানীং কেন আবার সেই ছেলেটা আসছে আধো-স্বপ্নে? আগে যখন আসত তখনই ভেবেছিলাম একটা গল্প লিখব, কিন্তু মন সাড়া দেয়নি। লিখবনা। বরং মন থেকে তাড়াব। তাড়িয়েছিলামও, লেখালেখির প্রতি ঝোঁক আর ভাবনা ক্রমাগত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তা সে উভয় ক্ষেত্রেই- সাহিত্য চর্চা আর স্কুলের একঘেয়ে পড়াবার জীবন...খাতা দেখা..প্রশ্ন তৈরী করা...স্কুল সার্ভিস কমিশনের মতো কিছু পরীক্ষা চালু হয়ে আমার মত বাউন্ডুলেদের খেয়ে পড়ে বাঁচার মত কিছু সুযোগ হয়েছে।
....অকারণ হর্ণ বাজাচ্ছে গাড়িগুলো। ফ্লাইওভারের কাজে রাস্তার কিয়দংশ তো অকেজোই , মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে দু'ধার দিয়ে পাইপ বসানোর হিড়িক পড়ে যাওয়ায়। গর্ত থেকে ওঠানো মাটির সাথে বৃষ্টির জল এসে মিশে থকথকে তালক্ষীর রেঁধেছে। কি দুর্বিষহ কষ্টে, দুর্দান্ত কসরতে রাস্তা পার হচ্ছে সকলে। স্কুল ফেরত ছেলেমেয়েগুলোও। জীবন হাতের মুঠোয় সবার। মুঠো খুললেই প্রাণ বায়ু উড়ে যাবে। এইসব বিসদৃশ নিয়ে খুব লিখতে ইচ্ছে হয়। চেষ্টাও করেছে কত। তারপর এগোতে এগোতে বৃত্ত আর পূরণ হয়না।
...আচ্ছা এই বৃষ্টিতে মানুষের কষ্ট নিয়েই একটা গল্পের প্লট শুরু করা যায়। বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়া পথের সমস্যা নিয়ে শুরু হবে। কিন্তু সাথে আসতে থাকবে রাস্তার বেহাল অবস্থার করুণ চিত্র, রাস্তা মেরামতের নামে টাকা লুটের এক মোচ্ছব, বিদেশি অর্থ সহায়তা রাস্তার মেরামতে বাস্তবে সামান্যই ঢালা হচ্ছে আর আছে মন্ত্রী-মিনিষ্টারদের শকুনি দৃষ্টি, দলীয় নেতা কর্মীদের আগ্রাসন--সমস্যার ডালপালা ছড়াতে থাকে, কোন স্থানে থামেনা, গল্পের নৌকা কোন নদীর ঘাটে ভেড়েনা। তাইতো শেষ-মেশ বরাবরই সমস্যা দিয়ে শুরু করেও গল্প প্রেমের জালে পা দেয়। গল্প লেখা হয়ে যায়, লেখা হয়ে যায় একসময় উপন্যাসও। সমস্যা নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে আর লেখা হয়না, যা লেখা হয় দু’একটা বৃত্ত-খোলা গল্পে, তাও পড়ে থাকে বিস্তৃত টেবিলে ডায়েরীর পাতায়।
দুই
----
আমি ছন্দম্ ব্যানার্জী....
বড় লেখক হয়ে উঠতাম যদি কোনদিন সমস্যা নিয়ে লেখা গল্পগুলোও প্রকাশকদের দিয়ে ছাপানো যেত। সেদিন হয়তো মন উজাড় করে কিছু গল্প লিখে ফেলতাম। মণি নদীটা নিয়ে একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম। স্বপ্নে দেখা সেই ছেলেটাকে মণি নদীটিতে নৌকায় চড়াতে চেয়েছিলাম। গল্পটার সূচনা করতে পারিনি। ছেলেটা বারবার কষ্ট দেয়, চোখে জল আনে। লেখক হবার যাতনা আর সুখ ঘিরে ধরে। কাকে সে জানাবে তার মনের কথা..ছেলেটাকে উপজীব্য করে গল্পটা লিখে ফেলে কাকে বলবে তার অকপট স্বীকারোক্তি...."সেই ছেলেটি আমি। ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ বইটি লুকিয়ে দোকান থেকে আমি বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। দোকানের কর্মচারী ছিলাম, কাজের ফাঁকে বইটি শেষ করতে পারিনি। বৃষ্টি এলো তখনই..."
...তবুও কেউ মজেছে। মজা ও হতে পারে। তবুও আমি রিস্কটা নিতে চাইছি। অতীত বড্ড কষ্ট দিচ্ছে। ইদানীং বৃষ্টি হলেই আমার অতীতের সেই সন্ধ্যাটা ফিরে আসে। একজন বন্ধুর সঙ্গ কি তবে একান্তই প্রয়োজন? সেটাও ভেবেছি। বন্ধনে বন্দী হতে চায়না আজও মন। কিন্তু তবুও বোধহয় প্রয়োজন।
সে আমার মোবাইল নম্বর যোগাড় করেছিল। বলেছিল, আমি আপনার লেখনীর গুণমুগ্ধা । কিছু গল্প-কবিতা-উপন্যাস প্রকাশেই সুকণ্ঠী গুণমুগ্ধার ফোন। আমি মুহূর্তে আকাশে মেঘে চড়ে বসেছিলাম। কেন জানি তবুও বলে ফেলেছিলাম, "আপনি কি আমার লেখা পড়ে মনে কোন কষ্ট পেয়েছেন বলে কি এই ফোন কল?"
সুকণ্ঠী প্রতি উত্তরে বলেছিল, "না, আমি মুগ্ধ হয়েছি , আমি আপনার চরিত্রের প্রেমে পড়েছি।"
আমি বোকার মত বললাম, "প্রেমে!"
--হ্যাঁ! তবে আপনার নয় কিন্তু , আপনার বইয়ের চরিত্রগুলোর।
তারপর কিছুক্ষণ হাসাহাসি। অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। কথা বৃষ্টির মত। যতক্ষণ ঘনীভূত মেঘ থাকে সে ঝরবেই। আমাদের দু’জন নর-নারীর মস্তিষ্কে মেঘ দ্রুত এবং ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছিলই। আমিও আমার প্রথম গুণমুগ্ধার প্রতি নিজেই মোহাচ্ছন্ন হচ্ছিলাম। প্রায়ই কথা হয় আজকাল।
নারী তার নাম বলেছে রূপা। বিশ্বাস করেছি আবার করিনিও বলা যেতে পারে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে ভুবন ভোলানো হাসি শুনিয়ে বলেছিল, নামটা নাকি সত্যিই। আমি বিশ্বাস করেছিলাম। নামটা আমাকে অগোচরে নারীর প্রতি আলাদা একটা মোহ সৃষ্টির ঘটনায় পর্যবসিত করেও থাকতে পারে। আমার সৃষ্ট রূপা চরিত্রটির প্রতি আমারও আলাদা একটা মোহ আছে। রূপা নামে মজব সেটাই তাই স্বাভাবিক।
রাতে কখনও কথা হয়নি। আমি ছ্যাবলামি করে একদিন রাতে মোবাইল বন্ধ রাখার কারণ জানতে চেয়েছিলাম। অকপটে বলেছিল, নারীদের নিয়ে গল্পে এত বিশ্লেষণ কর আর আমি বিবাহিত সেটা বুঝলে না !!
ততদিনে আমরা দু’জন দু’জনার প্রতি তুমি সম্বোধনে চলে গিয়েছিলাম। বিবাহিত শব্দটা একটা প্রচন্ড নাড়া দিলেও আমি সামলে নিলাম। কেন যেন এবার সত্যিকার ভাবে সম্পর্কটাতে একটা প্রশান্তি পেলাম। হতে পারে বন্ধনের বাধ্যবাধকতা মুক্ত হলাম বলে। তবে নিজের মাঝে নষ্ট একটা আপন ভুবন টের পেলাম। পরকীয়া নিয়ে একটা উপন্যাস যখন লিখছিলাম, ভাবনার সুতো মুক্ত আকাশে অবারিত ছড়াচ্ছিলাম তখন এই ভুবনটা সাড়া দেযনি। এখন দিচ্ছে। রূপা বলেছিল, "কী? বিবাহিত দেখে কি বন্ধুত্ব করবে না? পরকীয়া তো করতে বলছিনা। শুধু লেখকের একটু সান্নিধ্য চাইছি। সেটা কি খুব অন্যায়?"
কেন যেন আবার ছ্যাবলামি করে বলেই ফেলেছিলাম, "পরকীয়া করতে চাইলেই কি করা যায় সখী, সে যে হইয়া যায় গো মানস-বনে...হো...হো...হো...হো"।
সম্পর্ক কতদূর কি এগিয়েছে ভাবিনি। সংসারী মানুষ হলেও মুক্ত বিহঙ্গ। কল্পনার জগত আমার জীবনের অনেকাংশ জুড়ে। তার ওপর সেই বৃষ্টি ভেজা বই...সেই কষ্টের দৃশ্য। আমি ভুলতে চাই।
রূপা বলেছিল, দুপুরের সময়টাতে সে ফ্রি থাকে। লেখক চাইলে কোথাও এসে তার সাথে দেখা করতে পারে।
থার্ড পার্সনে বলা বাক্যের সে আমন্ত্রণে সাড়া দিতেই ছুটেছি আজ।
তিন
------
আমি ছন্দম্ লেখক....
আমি এলাকাটা চিনি। দক্ষিণ দাঁড়িয়ার ত্রিপুরাদেবীর মন্দির-সংলগ্ন এলাকা । শুনে রূপা বলেছিল, "তাই নাকি, আর কোন পরকীয়া সম্পর্ক আছে নাকি এদিকে..."
--থাকলে কি হবে?
--নেই সেটা জানি, লেখায় তুমি যত পটু নারীদের সাথে কথা বলায় তত পটু কিন্তু নও।
--তবে তুমি যে বন্ধু হতে চাইলে !!
--তাই নাকি? । কি জানি ??
...আমার কিন্তু চিরন্তন পুরুষালি আঁতে ঘা লেগেছিল। তারপরও কেন আমন্ত্রণে ছুটে এলাম !....
...যানজট এখন অসহ্য লাগছে। চোখ বুজে কত কিছু ভাবছিলাম। নেমে চলে যাব নাকি। যদি রূপার হাজব্যান্ড চলে আসে। যদি ধরা পড়ে যাই। আসলেই কি আমার মনে কোন নষ্ট ইচ্ছে সাড়া দিচ্ছে, নাকি কেবলই কৌতূহল। লেখকদের কত পাগলামি থাকে। আমি লেখক হতে চাই, একটুখানি হয়েছিও বটে, একটু পাগলামি করলে কি-ই বা যায় আসে। তবুও...এতো ঠিক নয়। ফোনের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাক না। যদি দেখতে খুবই কদাকার হয়। যদি একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। যদি বেশ বয়স্কা হয়। যদি মজা করার জন্য আরও দু’চারটে বান্ধবীকে নিয়ে বসে থাকে...
মোবাইল বাজছে। কিন্তু পকেট থেকে এই চাপাচাপির সিটে বসে সেটা বের করাটাই কষ্টসাধ্য। পাশের লোকটির সাথে কনুইয়ের গুঁতো লাগায় আড়চোখে তাকালে সে একবার। সে তাকানোর উত্তরে আমার "কি ভয় পেয়েছি !!" এমন কোন ভাব করা দরকার?
...রূপার কণ্ঠ ভেসে এল মোবাইলের তরঙ্গে, "তোমার জন্য অপেক্ষাতে চোখ করেছি কানা...ঘেমে-নেয়ে একাকার। তা কতদূর পৌঁছালে?
--এই তো শ্রীমতির মোড় । প্রচন্ড যানজট ।
--সে জানি। বাস থেকে নেমে দেখো, সকালের বৃষ্টিতে রাস্তার কি যে অবস্থা ভেতরে ঢুকলেই বুঝবে।
--ভয় দেখাচ্ছ।
--অচেনা নারীর সাথে দেখা করতে তুমিই আসছ। জল-কাদার ভয় তুমি পাবে, সে আমি বিশ্বাস করিনা। তবে তোমার কণ্ঠ কিন্তু কাঁপছে।
--সেটা কিন্তু বাসের দুলুনির কারণে রূপা। ভয় পেলে কি আর আসতাম !
--সত্যি তুমি আসছো তো ?
--হ্যাঁ রে বাবা, আসছি। এখন রাখ, বাস বড্ড বেশি দুলছে। না জানি উল্টেই যায়।
--ধ্যাত্ যত্তো সব উল্টোপাল্টা কথা..রাখছি !!
হাসতে হাসতে ফোন কেটে দিলাম। আরেকবার ভাবলাম, সত্যি কি আমি যাচ্ছি। হ্যাঁ যাচ্ছি-ই-ই।
সিগনালে থেমেছে বাস আবার। চোখ বন্ধ করলাম। অনেক নষ্টালজিক স্মৃতি মনে পড়ছে। প্রতিটি স্মৃতির পরতে পরতে ফিরে আসে সেই বৃষ্টি ভেজা বই। বইটির নাম ছিল আম আঁটির ভেঁপু। সম্ভবত ওইটা ছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপু-দুর্গাকে নিয়ে লেখা প্রথম বই।যে গল্পের উপর ভিত্তি করে সত্যজিত্ রায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র তৈরী করেছিলেন "পথের পাঁচালী" নাম দিয়ে। অরূপ করচৌধুরী সাহেবের বইয়ের দোকানে কর্মচারী ছিলাম। ভাড়াবাড়িতে অসুস্থ বাবা। খুব কষ্টে আমার দু'পয়সার আয়ে চলে যেত কিন্তু চিকিৎসা বাবার ঠিক মতো হতো না। তার ওপর রাতে নৈশ স্কুলে পড়তাম। পড়ালেখাটা ছাড়তে পারতাম না, কেনো জানি সেটা আমার নেশা ছিল। করচৌধুরী সাহেবের সেই ভয়ানক মার--এখনও যেন পিঠে ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক কষ্টে কেটেছে চাকরিটা চলে যাবার পরবর্তী অনেকটা দিন। বাবা’ও মারা গেলেন সেই সময়। একের পর এক যাতনা। দাঁড়িয়া এলাকার ভাড়াবাড়ি ছেড়ে চলে গেলাম। কৈশোরের স্মৃতি কত এই এলাকার। অরূপ করচৌধুরীও তখন শ্রীমতী এলাকায় থাকতেন। ভাড়া থাকতেন একটা বড় বাড়িতে। শুনেছিলাম এখানে তার একটা কেনা জায়গাও আছে।
ভাড়াবাড়িটাতে গিয়ে অনেকদিন আগে একবার খুঁজেছিলাম। থাকেনা সে এখন আর। কেউ খোঁজও দিতে পারল না। তার কেনা জায়গাটা চিনতামও না। দোকানটা ছিল মাথুর চক্-এ। এখন আর নেই। সেখানে এখন সু-উচ্চ দালান উঠেছে। করচৌধুরীকে আমি খুঁজি পথে ঘাটে। এত এত মানুষ, তাকে কোথায় পাব? তাকে খুঁজে পেলে কি করতে পারব জানিনা। কিন্তু মনে হয় ঐ যাতনার স্মৃতিটা কিছুটা হলেও লাঘব হবে...
....বইটা দোকান বন্ধ করার সময় কোমরে গুঁজে নিয়েছিলাম। দোকানের সব বই দোকানেই প্রতিদিন একটু একটু করে পড়ে ফেলতাম অন্যদের অগোচরে সময়ের সুযোগে। করচৌধুরী সাহেবের আরও ব্যবসা ছিল। উনি কমই আসতেন। বইটা খুব টেনেছিল। চার পাতা পড়ে তাই লোভ সামলানো সম্ভব হয়নি। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতেই বৃষ্টি চলে এসেছিল। করচৌধুরী সেই সময়ই সে দিক দিয়ে যাবেন কে জানত। কাকতলীয় ঘটনা এই ভাবেই বোধহয় ঘটে।
করচৌধুরী কি এখনও এই এলাকায় থাকেন?
চার
-----
আমি ছন্দম্ কাহিনী-কথক...
রূপা কমই বলেছে। কানুশশীপুর থেকে রিক্সা নেওয়ার পর বুঝলাম রাস্তা কতটা ভয়াবহ। দাঁড়িয়ার কে.সি.পি. হাই স্কুল পর্যন্ত পাকা হয়েছে, তারপর পুরোটা কাঁচাপথ। কাদা থিকথিক করছে। থলথলে ক্ষীরের মোটা স্তর যেন। একটু পরপরই বড় বড় গর্ত। কেউ বুঝি দেখার নেই এ দেশে এসব। সবাই মেনে নিচ্ছে। রিকশাওয়ালার অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে। রিক্সাওয়ালার কষ্ট দেখে আমারও কষ্ট হচ্ছে। নেমে যাব কিনা ভাবলাম। কিন্তু তাতে কার লাভ, বরং ক্ষতিটাই বেশি, হাঁটার মত জায়গা তো নেই। পায়ে কাদা লাগবেই, রিকশাওয়ালাও ভাড়া থেকে বঞ্চিত হবে। কিন্তু বেচারা আর টানতে পারছে না।
একটু শুকনো মত বালুচর দেখে নেমেই গেলাম । পুরো ভাড়াই দিলাম। অনেকদিন পরে এলেও এদিকের রাস্তা ঘাট আমার চেনা মোটামুটি। মন্দির চত্বরের কাছাকাছি গিয়ে ফোন করলেই হবে। অদূরেই ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পেলাম। সময় খেয়াল ছিলনা। এতক্ষণে খেয়াল করে দেখলাম রূপার ফোন রাখার পর থেকে এখানে আসতে দু'ঘন্টারও বেশি লেগে গেলো।
মোড়ের মাথায় গিয়ে ফোন করলাম। এগিয়ে এলো যে জন সে, ভালোই সুন্দরী।
--চিনতে অসুবিধা হয় নি তো?
--না, না !!
--ঠিক যেমন ভেবেছিলাম লেখকমশাই ঠিক তেমনই দেখছি!!
--তাই? তা কি ভেবেছিলে শুনি?
--সেটা নয় আমার কাছেই থাক।
--আচ্ছা থাক, পরে শুনবো।
....গল্পে-গল্পে অনেক সময় অতিবাহিত হলো। কাছেই ছোট একটা খাল আছে, তার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে নানারকম গাছ-পাখি চিনলো ও চেনালো উভয়-উভয়ে। কতদিনের স্মৃতি আবার হৃদয়পুরের উজানে খেয়া বাইলো।
রূপার স্বামী লোকটি নাকি বেশ বড় ব্যবসায়ী। ওষুধ আর কাপড়ের ব্যবসা। আগে বইয়ের ব্যবসা ছিল। অনেক টাকা। তবুও রূপা অসুখী। কারণ বলতে চায়নি প্রথমে। পড়ে বাধ্য হয়েছিল বলতে, লোকটির সময়াভাব...
...রূপার প্রতি একটা সহানুভূতি জেগেছিল। কিন্তু রূপা সহানুভূতি চায়নি। সে মানসিক সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু আমার গল্প তাকে কেন টানে, সে কথা একবারও বলেনি। আমার খুব রাগ হয়েছিল।
প্রথম দর্শনে কি বলব, একটা জড়তা কাজ করবে সেটা বুঝেছিলাম। ভাবছিলাম একবার সামনে গিয়ে বলব, "আজ বলতেই হবে আমার গল্প তোমার ভাল লাগে কেন?"
কিন্তু বলা হলোনা। ফোনে সে বলেছিল দেখতে খুব একটা সুন্দর সে নয়। বয়স পঁয়ত্রিশ বছর। আমার সমবয়স্ক। আমাদের মধ্যে কমিটমেন্ট হয়েছিল আমরা সত্য গোপন করতে পারব তবে মিথ্যে বলতে পারবোনা। তাই রাগ হলো, সে মোটেও অসুন্দর নয়, বিশেষ ভাবে আকর্ষণীয় তো বটেই।
আমার রাগের কথায় সে হাসল। সত্যি তার হাসি সুন্দর। উজ্জ্বল বর্ণের মুখশ্রীতে সে দারুণ লাগছিল। যত্সামান্য সাজ সে নিয়েছিল, যদিও সেটা মানা ছিল। সে কথা রাখেনি। হালকা লিপস্টিক লাগানোর দক্ষতায় তার নৈপুণ্য সত্যই প্রশংসার্হ।
আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে অকপটে রূপা বলে উঠল, "আমি জানি পুরুষের কোন দৃষ্টি আমাকে খোঁজে।"
আমি একটু লজ্জিত হলাম। এটা আমার স্বভাব জাত।
--তোমার লজ্জিত হবার দরকার নেই,তোমাকে আমি এত নির্জনে, এত রিস্ক নিয়েও যে ডেকেছি আর এতটুকু দৃষ্টি দেওয়ার অধিকার দেবো না তা কি হয়।
আমি এইবার একটু আনইজি বোধ করি।
পাঁচ
-----
আমি ছন্দম্ কাহিনীকার....
হঠাত্ রূপার পার্সটা হাত ফস্কে কাদায় পড়ে গেলো। আমি তাড়াতাড়ি সেটাকে তুলে নিয়ে কাছেই একটা নলকূপে ধুতে যাবার আগে রূপা মোবাইল, টাকা, দরকারী কাগজ বার করার সময় দেখলাম মোবাইলের ওয়ালপেপারে....এত দিনের প্রচেষ্টা হঠাৎ সফলতার মুখ দেখল।
...আমি চিনেছি। ঠিকই চিনেছি। সোনালী ফ্রেমের ছবিতে রূপার সাথে বিয়ের সাজে যে লোকটি ঐ তো সেই লোক, ওকেই তো আমি খুঁজে ফিরছি আজ এত বছর। ঐ তো সেই আমার পুরোনো মনিব অরূপ করচৌধুরী সাহেব। চোখের সামনে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই। কিন্তু এত টাকার মালিক তো সে ছিলনা। এ দেশে অবশ্য তার মত মানুষের পক্ষে রাতারাতি বিশিষ্ট বণিক বনে যাওয়া খুব কঠিন নয়। সেই কিশোর কালে যখন তার দোকানে কাজ করতাম জানতাম তার একটা ওষুধের দোকানও ছিল, এমন আলাপ শুনতাম দোকানের অন্যান্য কর্মচারীদের কণ্ঠে। হয়তো সেটাই সত্যি হয়ে থাকবে।
কিন্তু এখন আমি কি করব। এতদিন খুঁজেছি। খুঁজে পেলে কি করব সেটা তো ভাবিনি। আমার প্রকাশিত গল্পগুলো তার সামনে নিয়ে ছুঁড়ে মারব। সে কী সেটার যোগ্য? সে কী আমার লেখক হওয়াকে আরও উপহাস করবে ? পনেরো বছর আগে এক সন্ধ্যায় যখন কি ভীষণ মারটাই না মেরেছিল। একটা মাত্র বই দোকান থেকে নিয়ে আসার কি করুণ শাস্তি। আমি তো বইটা ফেরতও দিতাম।
টানতে টানতে দোকানে নিয়ে গিয়েছিল। স্কেলের সপাৎ সপাৎ শব্দ...পিঠ কেটে রক্ত বেরিয়েছিল। বৃষ্টি ভেজা বইটা একটানে কোমর থেকে টেনে নিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে মেরেছিল। সে কি দুর্বিষহ গালাগালি। রাগ হচ্ছিল, বইটা রাস্তায় ফেলে দিল! এত সুন্দর একটা বই, প্রিয় লেখকের বই। লোকটা তার কালো মোটা ঠোঁটটাকে বেঁকিয়ে বলেছিল, ‘হারামীর ছেলে চুরি করতে শিখেছো, বই-পড়া দেখাচ্ছো, ফকিরের ছেলে লেখক হবে।যা দূর হয়ে যা, দোকান থেকে।কাল থেকে আর আসবি না !!’
--আমার পাওনাটা মিটিয়ে দিন !!
--কিসের পাওনা?-বলেই এক থাপ্পড়। বইটার দাম নেই।নষ্ট করলি যে?আগেও এমন ভাবে আরও কত বই নিয়েছিস,সব জেনেছি।
--আপনিই তো রাস্তায় ফেললেন !!
--বেরো বেরো!! চোর কোথাকার- বলে চুলের মুঠি ধরে এক ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিলেন....
...একটা বইয়ের দাম ছুঁড়ে মারার জিদ সেই কিশোর বয়সে মানায়। এখন তো পরিণত মন।
হাঁটতে হাঁটতে মূল রাস্তায় এসে পড়লাম।
--চলো ছন্দম্ ! ঐ হোটেলটায় কিছু খাওয়া যাক। কি খাবে বলো?
--আমি তো তোমার জন্য কিছুই আনতে পারিনি বন্ধূনি...
--বাঃ, দারুণ একটা অভিধায় ভূষিত করলে তো আমায়। তুমি এসেছো, লেখক। আর কি চাই। এই নাও এই ডায়েরিতে একটা স্মারক দিও অটোগ্রাফের সাথে। সেরা উপহার হবে।
ভাবলাম উপন্যাসের ডায়লগের মত সিনেমাটিক ভাবে কিছু বলি, কিন্তু বলতে ইচ্ছে হয় না। পরক্ষণেই আবার মনে হয়, করচৌধুরীই যদি এই রূপার স্বামী হয়, তবে সেই অতীতের প্রতিশোধ নেয়ার এই তো কম সুযোগ নয়। রূপা আমার প্রতি অনুরক্ত সেটা তো স্পষ্ট। আমি চাইলে তাকে আরও উদ্বেলিত করতে পারি। সেটা কি করচৌধুরীর জন্য শাস্তি স্বরূপ হবে না। কিংবা আরও একধাপ....
--কি ভাবছ লেখক?
--হুঁ, কিছু না, তোমায় দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাবুক হয়ে উঠছি।
--তাই নাকি ? নাকি আমায় দেখে খুব বিমর্ষ হয়ে উঠেছো, মনকে অন্যদিকে রেখে আমাকে এড়াতে চাইছ। চাইলে বলতে পার। খাবার রেডি হয়ে আছে, খেয়ে চলে যেতে পারো। এখনই খাবে নাকি?
--কোন্ খাবার? যা আজ মন-পানসীকে কানায় কানায় ভরিয়েছে?
--এইবার দেখি সত্যিকারের লেখকের মত কথা বলছো। বইয়ের সুর আর কথার সুর মিলছে। মোবাইলে তবে কেন এত গম্ভীর লাগে?
--তাই নাকি? আচ্ছা তোমার মোবাইলের ছবির লোকটিই কি তোমার স্বামী?
--হুঁ।
--নাম কি?
--কেন, চেনো নাকি?
--চিনতেও পারি।
--অরূপ করচৌধুরী।
মনে মনে ভাবলাম, বলে দেবো নাকি ইতিহাস...বলা ঠিক হবেনা...
ছয়
-----
আমি....সুন্দর এক বন্ধূনি-প্রাপক...
একটা সুন্দর দুপুর কাটল। বেশ গল্প করতে জানে রূপা। কিন্তু কিছুতেই আমার গল্প পড়ার রহস্য সে জানালো না। বলল, যদি এটা জানার জন্য কিছুদিন হলেও আমাকে সময় দাও। জোর কোরো না জানার জন্য। আমিই জানাবো একদিন।
ফেরার আগে বলেছিল, ছন্দম্ তুমি খুব ভালো । অন্তত আর দশটা পুরুষের মত তোমার মনটা নষ্ট হয়ে যায়নি।
এত বড় কম্প্লিমেন্টের পরে আর কি বন্ধু ছাড়া কিছু হওয়া যায়। অনেকের কাছে কম্প্লিমেন্টটাই বড় , একজন লেখকের কাছে তো বটেই।
...বাসায় ফিরতে ফিরতে বারবার রূপার মুখটা মনে পড়ছিল। সেই বৃষ্টি ভেজা কিশোর, বইয়ের পাতায় পাতায় বৃষ্টির জল...কিছুটা বোধহয় ভুলে থাকা যাচ্ছে। করচৌধুরীকে খুঁজে পেলাম। কি চরম কাকতালীয়। রূপার হাজব্যান্ড্ ! সত্য সেলুকাস ! মণি নদীর তীরে বৃষ্টির মাঝে আমি রূপাকে পেলাম চোখ বোজা কল্পনায়....
আমরা মানে আমি আর রূপা কী সত্যি একে অপরের সত্যি বন্ধু হতে পারব?
পুরো সন্ধ্যায় রূপাকে নিয়ে ভেবেছি। একবার কথা হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন রাতেই ওর বর ফেরে এই বাসায়। সে কারণে রাতে কথা বলেনা। তবে কথা দিয়েছে এখন থেকে যে সব রাতে বর আসবে না রূপা আমার সাথে কথা বলবে। আসলে রূপার সাথে কথা না বললে কিছু ভাল লাগেনা। মনের জট খোলে না। আটটার দিকে একবার কল করলাম , "জানালো ওর স্বামী আসছে, পথে আছে। রাতে ফোন করতে মানা করলো।"
বাইরে এখন ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। চোখ বন্ধ করতেই দেখলাম মণি নদীটির তীরে আমি আর রূপা ঝিরঝিরি বৃষ্টিতে হাঁটছি। আমরা হাসছি । নদীর ওপারে হারিয়ে যাচ্ছে নৌকাটা , নৌকায় সেই আমার কিশোর স্মৃতি। আমি মণি নদীকে আমার মাঝে ধারণ করতে চাইছি রূপার ক্ষণ-সাহচর্যের মাধ্যমে। আমার ঠোঁটটা নড়ে ওঠে, আমি বলে উঠি আপনমনে, যা আজ লিখে দিয়ে এসেছি বন্ধূনি রূপাকে--
"বন্ধু,
তোমার লাবণ্য-নক্ষত্র প্রতিচ্ছবি বৃষ্টিঝরা শান্ত ছায়ার মতো,
নিশিদিন ভেসে উঠে প্রকৃতির হৃদয় মাঝে বারবার।
এমন করে স্বপ্ন দেখতে চাইনি, তবুও তো হৃদয়
ভুবনজয়ী ভালোবাসার এক সুকঠিন আবেশে দীর্ঘায়িত হয়।
পৃথিবীর সমস্ত অস্তপারের সন্ধ্যাতারা ও আত্মার নির্যাস,
থেমে থেমে চলতে শুরু করে স্বপ্নের দীপ জ্বেলে অজানায়।
কাঠবিড়ালী, হরিণরা প্রখর কিরণে গাছের ছায়ায় আশ্বাস খোঁজে,
গভীর স্তব্ধ রাতে অথবা রূঢ় রৌদ্রে সীমান্ত সংলগ্ন নীড়ে দুঃস্থ হৃদয়।
পৃথিবীর প্রেম-প্রলুব্ধ আদমের চারদিকে অশনি সংকেত,
গান্ধর্বী কন্যারা দুঃস্বপ্নের ছায়ায় প্রতারিত করে,
বিকেলের রোদ কেড়ে নিয়ে জীবন থেকে,
হারিয়ে যায় নদীর জলে একরাশ অতৃপ্তি ঢেলে বুকে,
প্রেমের শীর্ষে জীবনটা কঠিন অঙ্গার করে একান্তে গোপনে।
বন্ধু, এসব জেনে দেয়ালে সাজানো ছবিটাও পরিহাস করে,
ভালোবাসার লাবণ্য-নক্ষত্র প্রতিচ্ছবি;
দখিনা হাওয়ার সাথে--
পর্দার আড়ালে এক মেরুদণ্ডী প্রাণীর মতো সর্বদাই পড়ে থাকে।"
---------------------ছন্দম্ ব্যানার্জী।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন