রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৫

চেনা পথ...অচেনা পথ

চেনা পথ...অচেনা পথ
-----------------------------
শিবাশিস্ আচার্য
------------------------

হস্টেলের রুমের তালা খুলে ভিতরে ঢুকতেই মেঝেতে পড়ে থাকা পোস্টকার্ডটা নজরে এলো সাহেবের। সেটা তুলে হাতের লেখা দেখেই বুঝলো রাঙাকাকার চিঠি। ও কাপড় না ছেড়ে বিছানায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দুরু দুরু মন নিয়ে চিঠিটা পড়তে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে তার মুখমন্ডলে চিন্তার রেখা ফুটে উঠে। এই তো সবে আট-দশ দিন হল সে বাড়ী থেকে এসেছে। আবারও জরুরী তলব। তাও আবার আজকের মধ্যেই। সাহেব ভ্রু কোঁচকায় আর আঙুল দিয়ে কপাল চুলকোয়। কাকা তো সবই জানেন। চার মাস পর মাস্টার্স ফাইনাল। সেভাবে জানিয়েই সে এবার ফিরেছে। ইউনিভার্সিটিতে তুমুল ক্লাস হচ্ছে। সে আদা জল খেয়ে লেগেছে। দম ফেলার সুযোগ নেই। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক ঘষলো। মনে হয় কোন রহস্য আছে।
তার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে যায়। শেষ বিকাল। গাড়ী-ঘোড়া পাওয়া মুস্কিল। যাওয়া না যাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার তরীতে ভাসতে ভাসতে সামনে পরে থাকা চিঠিটার ঐ লাইন দুটো কয়েক বার পড়ে, লেখাপড়ার চাপ যতই থাকুক না কেন, অবশ্য অবশ্যই একুশে নভেম্বর শনিবারের মধ্যে বাড়ী আসিবে...।
সাহেব বরাবরই কাকার অনুগত। মা-বাবা অকালে গত হওয়ার পর অকৃতদার এই রাঙাকাকাই তার জীবনে সব...কিন্তু ...?
কপালে যা থাকে থাকুক। এক লাফে বিছানা ছেড়ে পাঁচ মিনিটে ব্যাগ গুছিয়ে একটা সাদা কাগজে খস্ খস্ করে বিষয়টি লিখে রুমমেট তমালের টেবিলে বইয়ের মধ্যে রেখে বেড়িয়ে পরে।

অবরোধের কারণে একটানা প্রায় পাঁচঘন্টা ট্রেন-নৌকা-মেশিনভ্যানের যাত্রাশেষে ভ্যান থেকে নামার আগে ভ্যানের ক্ষীণ আলোয় ঘড়ি দেখে তার মনের মধ্যে কেমন করে ওঠে। রাত বারোটা প্রায় বাজে। রাজমন্ডল মেইন রোড থেকে অশনিতলা গ্রাম প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মাইল। এখান থেকে শ্রীপুর বাজার পর্যন্ত প্রায় মাইল খানেক পাকা। বাকীটা মেটে এবং বিল বাদাড় পাড়ি দিয়ে যেতে হবে। এই রাত দুপুরে রিক্সা-ভ্যান তো দূরে থাক, মানুষের টিকিটার নিশানাও নাই।
নভেম্বর মাসের হালকা ঠাণ্ডাতেই জবুথবু অবস্থা। গাছের পাতা গুলো মনে হচ্ছে সবুজ রঙের সীসার পাত, একেবারে স্থির হয়ে আছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোন প্রকার সাড়া শব্দ নেই। যেন কোন নিষিদ্ধ এলাকা।
সাহেব ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে থু থু করে বার দুই তিনেক বুকের উপর থুতু ছেটায়। তারপর হাঁটতে শুরু করে। এ তো তার খুব চেনা পথ। অতএব তাকে আটকায় কে। এমনই একটা ভাব তার।
সরু পাকা রাস্তা। একটা বিশাল ফাঁকা ফসলী জমির ভিতর দিয়ে উত্তরে চলে গেছে। বাড়ী ঘর নেই। দুই ধারে ঝোপঝাড়। ডানে-বামে, এখানে-সেখানে, ছোট-বড় নানান জাতের শিশু, ইউক্যালিপটাস, দেবদারু, মেহগনি, শিমূল থেকে শুরু করে দুই একটা ফলের গাছও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্ধকারে বড় বড় গাছগুলো মনে হচ্ছে এক একটি দৈত্য। যেন তারা কোন শিকার ধরার জন্য ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে, বহু দূরে ঘন কালো দড়ির মত পাকানো গ্রামগুলো ঘুমন্ত পল্লীমায়ের রাত্রির ছবির মত মনে হয়। আকাশে সাদা-ছাই রঙের ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘ। ক্ষণে ঘনীভূত হয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে বৃষ্টির সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে গোল বিস্কুট দাঁতে কামড়ে খাওয়ার মত আধ ভাঙ্গা ত্রয়োদশীর চাঁদ মাঝে মাঝে উঁকি দেয় আবার মেঘের ভিতর লুকিয়ে পরে। যেন ঐ ভাঙ্গা চাঁদ সাহেবের এই নিঃসঙ্গ এবং দুঃসময়ের সাথী হয়ে তার সাথে লুকোচুরি খেলে চলেছে। সে নিজেকে চাঙ্গা রাখার জন্যে মনে মনে সুবীর সেনের বিখ্যাত গানটা গুনগুন করে-
"নয় থাকলে আরো কিছুক্ষণ, নয় রাখলে হাতে দুটি হাত,
নয় ডাকলে আরো কিছুকাছে, দেখো জ্যোত্স্না-ভেজা এই রাত"....

তার চলতি পথে একাকীত্বের ছলে নানা কথা মনে উঁকি-ঝুঁকি দেয়...কথাশিল্পী শরত্চন্দ্রের ভাষায়-"রাতের এক অসাধারণ রূপ আছে। বাস্তবের মুখোমুখি না হলে তার স্বাদ আস্বাদন করা যায় না।" আজকের রাতটা অন্যান্য রাতের মত নিকষ কালো নয়। এই রকম আবছায়া ভাবটা কখনও কখনও রহস্যময় হয়ে উঠে। তারপর যদি হয় ঝোপ-ঝাড়, বন-বাদাড় আর পাড়াগ্রাম, যেখানে বিদ্যুত্ নেই। রাতের সত্যিকার রূপ প্রকাশ পায় সন্ধ্যার পর। আটটা বাজতে না বাজতে সাধারণ মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে। সব ধরনের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়। ঝরা পাতা নীরবতা ভঙ্গ করে। তখন রজনী প্রকৃতির সাথে লীলায় মত্ত হয়। বাতাসে, গাছে, মাটিতে ওরা খেলে বেড়ায়। কৈশোরবেলায় কাকার কাছে শোনা সেই সব কথা হঠাৎ এখন মনে পড়ে যায়। আজকের রাতের সাথে সেসব রাতের অনেকটাই মিল, কেমন যেন ভূতুড়ে। সাহেবের বুকের ভেতর ঢিব-ঢিব করে উঠে। সে নিজেকে শুধরে নিতে মস্তিস্কের স্নায়ু নিয়ন্ত্রককে কষে ধমক দেয় এবং ভূত-টুত নেই বলে প্রচার প্রচারণা চালানোর জন্যে নির্দেশ দিয়ে কৃত্রিম খোস মেজাজ তৈরী করে গান ধরে আবার..।
হঠাত্ সাহেব নিজের কন্ঠের অপরিচিতি দশা দেখে ভড়কে যায়। কেমন যেন কাঁপা-কাঁপা গলা। ভূতের ভয় যদি একবার কাঁধে ভর করে আর ভূতুড়ে পরিবেশ যদি সঙ্গের সাথী হয় তবে তার হাত থেকে রেহাই পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এখন অন্ধকারে বড় বড় গাছ গুলোকেও অপরিচিত লাগছে। মনে হচ্ছে এক একটা বিরাট বিরাট...।

হঠাৎ বাম দিকে আলের মধ্যে কি যেন একটা নড়ে ওঠে। তার চিন্তা ভাবনা এলো মেলো হয়ে যায়। মনে হয় আবছা ছায়া ছায়া একটা সাদা থানকাপড় পড়া থুত্থুরে বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে তার দিকে হেঁটে আসছে। অনেকটাই জেলে পাড়ার শ্যামলের ঠাকুমার মত। কিন্তু তিনি তো...!! সাথে সাথে শ্যামলের ঠাকুমার চেহারাটা তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ধবধবে সাদা চুল। চোয়াল বসে গেছে। বসে যাওয়া চোখের কোটরে চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে। তার গা শিউরে উঠে। দু'হাতের রোমগুলো টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। দু’ কান দিয়ে গরম ভাপ বেরোচ্ছে। বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ করে। নিশ্বাস ঘন ঘন পড়ে। এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সে কি করবে স্থির করতে পারে না। হঠাৎ একটু দূরে ”ক্যা-হুয়া..ক্যা-হুয়া”...”হুক্কা-হুয়া” রব ওঠে। সাথে সাথে কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে সেদিকে ধাওয়া করে। সেদিকটা খেয়াল করে বামে তাকাতেই হতভম্ব। কোথায় সেই বুড়ী? ভোজ বাজির মত অদৃশ্য হয়ে গেছে। নিছক ভুল বোঝাবুঝি মনে করে সে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। ওসব সে থোড়াই-কেয়ার করে।
সাহেব একমনে হাঁটছে। হঠাৎ তার মনে হয় কে যেন তাকে অনুসরণ করছে। অস্পষ্ট পায়ের আওয়াজ পাচ্ছে- খস্ ... খস্ ...খস্ ...! প্রথম প্রথম পাত্তা দিলনা। কিন্তু আওয়াজ এখন অনেকটা স্পষ্ট।
মনে হয় কেউ ঠিক তার পিছনে। আর একটু হলেই তাকে ধরে ফেলবে। ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস ফেলছে। ভয়ে দম বন্ধ হবার যোগাড়। এ কি হলো? তার পা দু’টো যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোন অদৃশ্য শক্তি তার দেহকে সাপের মত পেঁচিয়ে ধরছে। সে প্রাণ পণ চেষ্টা করছে শ্রীপুরের দিকে যাওয়ার। কিন্তু কিছুতেই এগোতে পারছে না। এক একটা পা যেন এক মণ ওজন। পথ যেন শেষ হয় না। তবে কি সেই তার পিছু নিয়েছে ...? সাহেব রামনাম জপ করতে থাকে। সব কেমন যেন উল্টোপাল্টা হয়ে যাচ্ছে।উৎকন্ঠা নিয়ে সে পিছনে তাকায়। কই...? কিছুই তো নেই...। মনে মনে নিজেকে তিরস্কার করে। আর বিভ্রান্তিতে পড়বে না সে। যে কোন অবস্থাতেও।
এখন সাহেব শ্রীপুর বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মণি নদীর ব্রীজের উপর। ছোট্ট একটা ব্রীজ। রাস্তার দু’ পাশে দশ-বারোটা বাড়ী ঘর দেখা যায়। সামনে প্রায় পাঁচ’শ গজ এগোলেই ছোট্ট একটা বাজার। প্রায় সবই করোগেটেড টিনের তৈরী দোকান ঘর। একেবারেই গ্রামীণ পরিবেশ। মাথার উপর দিয়ে একটা বাদুর পত্ পত্ করে উড়ে গেল। বুকের মধ্যে ধক্ করে ওঠে। অন্ধকারে বাজারের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় দেখে দোকানপাট সব বন্ধ। একটা চায়ের দোকান লাগোয়া বেড়া বিহীন চালা ঘরে কয়েকটা বেঞ্চ। তার উপর একটা লোক নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। খুব সম্ভবতঃ পাহারাদার। লোকটাকে দেখেই গা রি-রি করে ওঠে। এলো মেলো লম্বা চুল। উস্কো-খুস্কো চেহারা। কাছে গিয়ে ইতস্ততঃ করে ডাকে- "ও ভাই ! এই যে শুনুন ! ও ভাই !"
লোকটা - এ্যাঁ ! এ্যাঁ ! করে ঢোক গিলতে গিলতে অন্যপাশে ফিরে শুয়ে নাক ডাকে।
বোঝাই যাচ্ছে ব্যাটা জুতসই নেশা করেছে। গাঁজা, ভাং এখন গ্রামে গঞ্জে ভরা। নেশাখোরকে ডাকা আর মরা মানুষকে ডাকা সমান। সে হতাশ হয়। ভেবেছিল ওর কাছ থেকে আশপাশের কোন ভ্যানওয়ালার বাড়ীর সন্ধান নিয়ে তাকে রাজি করিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাবে। ক্ষোভে তার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। টর্চ লাইটটা ও নিভু-নিভু হয়ে আসছে..একটা দেশলাই পর্যন্ত তার সাথে নেই। বিড়ি-সিগারেট না-খোরদের এই এক সমস্যা। নিঃসঙ্গ অন্ধকার রাত্রে একটা দেশলাইয়ের কাঠি যে কি উপকার করে তা ঠিক সময় মত বোঝা যায়। হতাশার একটা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে গেল। ক্লান্তি আর বিরক্তি উভয় তার চোখে মুখে তীব্র ভাবে ফুটে উঠেছে। পাশের বেঞ্চে মিনিট পাঁচেক হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকে।

শ্রীপুর বাজারটা পশ্চিম হয়ে বামে ঘুরে খানিকটা উত্তরে গিয়ে একটা গ্রামে গিয়ে শেষ হয়েছে। গ্রামের নাম রাণীগ্রাম। সে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের শেষ প্রান্তে চলে আসে। এখান থেকে মেটে সড়ক শুরু। তার দু’পাশে নানান জাতের ছোট বড় গাছ, ঝোপ-ঝাড়। ঐ সবের মধ্যে বাড়ী ঘর গুলো নিথর নিস্তব্ধ হয়ে ঘুমোচ্ছে। মনে হয় যেন কোন যাদুকর বহু বছর পূর্বে যাদু করে সব কিছুকে পাথর বানিয়ে বশ করে রেখেছে। হঠাৎ তার শমিতের কথা মনে পড়ে যায়। সে সাহেবের ছোট বেলার গ্রাম্যবন্ধু। এখানে তার নিজের মুদিখানার দোকানে দোকানদারী করে। রাণীগ্রামে শ্বশুর বাড়ীতে থাকে। মিনিট দশেকের রাস্তা।
নিকটেই কোন একটা গাছে কোঁ-কোঁ শব্দে একটা পাখি ডেকে উঠে। ঐ শব্দের ভিতর কেমন একটা পৈশাচিক ভাব আছে। মনের ভিতর আচমকা একটা ভীতি ভাব জন্মে। এসব ভাবনার মাঝে আবারও উঁকি দেয় খানিক আগে ঘটে যাওয়া সেসব কথা। ভয় ভয় ভাবটা থেকে থেকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সঙ্গে যোগ হয় সাপ, পোকার ভয়। এই গ্রাম পার হলে অনন্তের বিল। সে আর এক ইতিহাস। দিনে দুপুরেও লোক ভয় পায়। সাহেব নিজেকে অবশ্য সাহসী বলেই মনে করে। ওসব ভূত-টুত বিশ্বাস করে না। একটা বানিগাছের মোটা দেখতে ডাল ভেঙ্গে নেয়। হাত তিন-চারেক লম্বা। ভূত মোকাবিলা করার জন্য নয়, সাপ-পোকা মারার জন্য।
এই অন্ধকার রাত্রেও সাহেবের শমিতের শ্বশুর বাড়ী চিনতে অসুবিধা হয় না। বাড়ীর চার পাশে বড় বড় আম কাঁঠালের গাছ। মেহগনি, তাল, তেঁতুল আরও কত কি। ঘন গাছ গাছালির জন্য ঘুট ঘুটে অন্ধকার ভাব বিরাজ করে। একেবারে নিঃশব্দ বাড়ী। অবস্থা দেখে আঙ্গিনার বাইরেই তার গা ছম ছম করে ওঠে। তবুও শমিতকে ডাকার জন্যে সে আঙ্গিনায় প্রবেশ করে।
মূহুর্তের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে শোঁ-শোঁ শব্দে ঝড়ের বেগে বাতাস বইতে শুরু করে। গাছের শাখা-প্রশাখা, লতা-পাতা ছিঁড়ে লন্ড ভন্ড। বাঁশ ঝাড়ের গোটা তিনেক বাঁশ একবার বামে শুয়ে মাটি স্পর্শ করে আবার সরাত্ করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে।
ওরে বাবা রে ! মা রে ! কি সাংঘাতিক ব্যাপার?
আরও ভয়াবহ ব্যাপার ঝড় কেবল আঙ্গিনার মধ্যে ! আর সবখানে বাতাস স্তব্ধ।
হঠাৎ কোথা থেকে একগাদা শুকনো পাতা ঝপঝপ করে তার সামনে পড়ে জমা হতে থাকে। তার পর পরই বাতাসের ঘূর্ণিচক্রের খেলা শুরু হয়। তার চার পাশ দিয়ে বাতাস বন বন করে ঘুরতে থাকে। মনে হয় তাকে তুলে আছাড় মারবে। ধুলো-বালি, খড়-কুটো, শুকনো পাতা দিয়ে তার কান, মাথা, দেহ একাকার হয়ে যাচ্ছে। দম বন্ধ হবার উপক্রম। তার মনে হয় সে মারা যাবে। মাত্র বিশ পঁচিশ সেকেন্ড। যেন সব কিছু হাওয়ায় মিলে গেল। একে বারে সুনশান নীরব।
তার মনে নানান সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে- এসব কারও ইঙ্গিতে হচ্ছে না তো? না কি কোন অশরীরি আত্মা তার পিছু নিয়েছে? এসব কিসের সঙ্কেত? একি বিপদ হলো আজ?
সাহেব কাঁপতে কাঁপতে একটা চালা ঘরের কাছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়ায়। ঠিক ঘরটার পিছনে করুণ সুরে কে যেন কাঁদছে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত পা পাথরের মত স্থবির হয়ে গেল। মনে হচ্ছে তার পা হাঁটু পযন্ত মাটির ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। সে নিজের ভয় ধামা চাপা দেওয়ার জন্যে গর্জে ওঠে, কে কাঁদে?
কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না। মনে হয় কে যেন তার গলা টিপে ধরেছে। গলায় কাশি দিয়ে থুঃ করে কফ্ ফেলতে যায়। কিন্তু এক ফোঁটা থুতুও বেরুলো না। গলা শুকিয়ে কাঠ। আবারও চেষ্টা করে, কে ওখানে?
যেন ক্ষীণকন্ঠের ভূতুড়ে প্রতিধ্বনি হয়,
...আসছে ! ...সে আসছে !!
সেই সাথে কান্নার আওয়াজও থেমে যায়। কেমন যেন অস্বাভাবিক সব কিছু। হঠাৎ ঝড়! তারপর নীরবতা! এখন কান্নার শব্দ! এসব কি হচ্ছে? তবে কি সত্যি সত্যিই সেই সাদা শাড়ী পরা ছায়া মূর্তি তাকে অনুসরণ করে এখানে এসেছে?
সে ভয়ার্ত কন্ঠে আবারও বলে, কে আছেন? কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। এবার সাহেব পড়ি-মরি করে চীৎকার করে ওঠে, যেন ও মরে যাচ্ছে, শমিত ! এ শামু ! শিগগীর বের হ ! ওরা আমাকে...!
এবার চালা ঘরের মধ্যে থেকে কথার আওয়াজ পাওয়া গেল। মনে হল কোন অশীতিপর বৃদ্ধা রিন-রিনে নাকি কন্ঠে বলছে, "কে গো তুমি? সাহেব? শামু বিলে মাছ ধরতে গেছে। সাহেবের বুকের ভেতর ধড়াস করে ওঠে !
আরে ! সর্বনাশ !
অজানা অচেনা এক বৃদ্ধা তার নাম জানলো কি করে?
তারপর দেখলো ঐ চালা ঘরের জানালায় খানিক আগে রাস্তায় দেখা সেই থুত্থুরে বুড়ি দাঁড়িয়ে খিল খিল করে হাসছে। আচমকা ভূত দেখার মত পরিস্থিতি হয় তার। বে-হুঁশের মত, পাথরের মূর্তি হয়ে কতক্ষণ দঁড়িয়ে আছে বলতে পারবে না। হঠাৎ নারকেল গাছ থেকে কিছু একটা সর্ সর্ করে ছিঁড়ে ধপ করে মাটিতে পড়ার শব্দ হয়। তার হুঁশ ফেরে।
ওরে বাবারে! এ তো সত্যি সত্যিই পিশাচের আস্তানা! শিগগীর পালাও! বাঁচতে চাইলে এখানে আর এক মুহুর্তও নয়।
সে বিদ্যুত্ বেগে এক দৌড়ে মেটে রাস্তায় চলে আসে। তখনই ঘটে গেল আর এক কান্ড! ইয়া বড় একটা কি যেন থপ করে তার ডান পায়ের উপর আছড়ে পরে।
ওরে মা রে! মেরে ফেললো রে!
সে দু’ তিন পা হটে আসে। গাছের ডাল দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে শপাং শপাং করে মারে কয়েক ঘা। সম্ভবত কম্পমান হাতের জন্য আক্রমণ একশত ভাগ ব্যর্থ হয়।
ততক্ষণে নির্বিকার ব্যাঙ লাফাতে লাফাতে চলে গেল। এই দুঃসহ পরিস্থিতিতেও হাসি পেলো। এর পর আর সাহেবকে কে পায়। পড়ি কি মরি করে ছুটছে তো ছুটছে-ই। শমিতের আশা ত্যাগ করে মনে মনে রামনাম স্মরণ করে, হে রাম, এই বিপদে আমাকে রক্ষা কর, আমাকে ধৈর্য্য দাও...

সাহেব মাঝে মধ্যে গাছের ডাল দিয়ে ঠুক ঠুক করে মাটিতে আঘাত করছে আর মুখে হুস হুস করে শব্দ করে। উদ্দেশ্য সাপ-পোকা-মাকড়ের হাত থেকে বাঁচা। পিছনে কাল-মহিষের মত বীভৎস রূপ ধরে দাঁড়িয়ে আছে ভয়ংকর রাণীগ্রাম।
সে এখন অনন্তের বিলের পাশ দিয়ে সোজা উত্তরে চলে যাওয়া মেটে সড়ক দিয়ে হাঁটছে। নানা উৎকন্ঠা, শঙ্কায় মন ধুক ধুক করে। এই বিল এক সাংঘাতিক বিল। আশে পাশে কোন বাড়ী ঘর নাই। যতদূর চোখ যায় ধু-ধু মাঠ আর মাঠ। এখন ফসল বোনা হয়েছে। ভরা বর্ষায় থৈ থৈ করে। তখন এসব রাস্তাও ডুবে যায়। নৌকা ছাড়া চলাচল অসম্ভব। তখন যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল।
ও রূপাকে বলেছিলো, কোন এক ভরা বর্ষায় তাকে তাদের গ্রাম দেখতে নিয়ে আসবে। রূপা শর্ত দিয়েছিল; সারাদিন নৌকোতে ভাসবে, ভাসবে শুধুই ভাসবে। ক্ষিধে পেলে আউসের চালের লাল রঙের ভাতের সাথে কাঁচালঙ্কা-পেঁয়াজ, ডাল, আলু-বেগুনের ভর্তা। নৌকোর মাঝি হবে সাহেব এবং এক মাত্র সওয়ারী সে। শহরের মেয়ে রূপা আগামী কাল ক্যাম্পাসে গিয়ে যখন সাহেবের খবরটা তমালের কাছ থেকে পাবে, তখন নিশ্চয়....একটা লম্বা শ্বাস বেরিয়ে এলো সাহেবের।
এখন মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় মাটি ভেজা স্যাঁত সেঁতে। সড়কের দু’ এক জায়গায় গরুর গাড়ী চলাচলের জন্য গর্ত এবং তাতে কাদা জমেছে। দু’ ধারে ফসলী জমির মধ্যে মাঝে মাঝে ছোট বড় ডোবা। সেখানে এখনও লোকেরা মাছ ধরে। সড়কের দু’ ধারে জঙ্গল, ঝোপ-ঝাড়, হঠাৎ দু’ একটা ছোট বড় গাছ চোখে পড়ে। মূলতঃ চারিদিকে কেমন ফাঁকা ফাঁকা ভাব। তাতে চাঁদের ক্ষীণ আলো ফুটে উঠেছে। আবছা আলো-ছায়ার লুকোচুরি। প্রচন্ড তৃষ্ণা নিয়েও বেপরোয়া হাঁটছে।
বেশ দূরে আবছা ঘন কালো বড় বড় গাছের মত দুটো কি যেন দেখতে পেল সাহেব। আসলে ওগুলো প্রকান্ড দুটো বট গাছ। সবাই বলে ভাইটিতলা। ওটাই বিলের মাঝ ভাগ। এটাই এলাকার সবচাইতে ভয়ংকর জায়গা। ওখান থেকে আর মাইল দেড়েকের মত গেলেই ওদের গ্রাম। সে ঘড়ির দিকে চোখ রেখে অনুমান করলো রাত প্রায় তিনটা-সাড়ে তিনটা।
উহ্ যে ধকল গেল। জীবনে মনে থাকবে। হায় রে ! এই বিপদের দিনে টর্চ লাইট টাও ঠিক নেই। মনে থাকলে এমন বোকামি আর নয়। একটা কিনা গাছের ডাল সম্বল। এসব সাত-সতেরো ভাবতে ভাবতে এক সময় সে ঐ বট গাছের নিকটে পৌঁছে গেছে। হঠাৎ মনে হল দুই বট গাছের মাঝে রাস্তার ওপর কে যেন বসে আছে। দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে। সে জোরে চিৎকার করে বলতে যাবে, কে? কিন্তু তার আগেই লোকটা উঠে দাঁড়ায়। হাতে ত্রিকোণাকৃতির জালের মত কি একটা। মনে হয় জাল। সেটা কাঁধে নিয়ে হন হন করে সাহেবকে পেছনে ফেলে উত্তরে রাস্তা ধরে হাঁটা দেয়।
সাহেবের মনে হল ও নিশ্চয় শমিত। মাছ ধরতে এসে ক্লান্ত হয়ে এখানে বিশ্রাম করছে।
কিন্তু! সে তাকে না দেখার ভান করলো কেন? একটা চাপা দুঃখ দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এল। ধারণা করে হয়ত অন্ধকারে তাকে নাও দেখতে পারে বা চিনতে পারেনি। সাহেব বেশ উত্তেজিত। নতুন উদ্দীপনায় ডাকে, শামু! এ শামু!
কোন প্রত্যুত্তর নেই। শমিত এক মনে হাঁটে।
আবারও ডাকে, শামু! এ শামু, দাঁড়া।
মনে হল সে শুনতে পেয়েছে। তবে কথা না বলে ঘাড় বাঁকিয়ে হাতের ইশারায় আসতে বলল। দু’জনের দুরত্ব প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ গজ।
সাহেব ক্লান্ত দেহ হলেও আরও দ্রুত হাঁটতে থাকে। তৃষ্ণায় ক্ষুধায় দফা রফা হবার যোগাড়। তারপর ঘামে ভিজে চুপচুপে। তবুও প্রাণপণ হাঁটে। কিন্তু কিছুতেই ওর নাগালের মধ্যে আসতে পারে না। মাঝে মাঝেই সে ডাকে, শাম! এ শামু! শামু দাঁড়া না! শমিত একবারের জন্য হ্যাঁ বা না কিছুই বলে না। শুধু ধাঁ ধাঁ করে হেঁটে যায়।
সাহেব যত দ্রুত হাঁটে শমিত তত দ্রুত হাঁটে। দূরত্ব কিছুতেই কমে না।
সাহেব হাঁটছে তো হাঁটছেই ...। আর ঘেমে নেয়ে একাকার। অস্থির হয়ে গেল। আর কতক্ষণ? বিরক্তির শেষ পর্যায়ে। তবুও ডাকে, শামু দাঁড়া! এ শামু দাঁড়াবি তো! এভাবে কতোক্ষণ হেঁটেছে তা সে বলতে পারবে না।
তার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। শেষমেশ সাহেবের মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়; ব্যাপারটা কি? শত চেষ্টা করেও ওকে নাগালে না পাওয়ার কারণ কি?
সাহেব ওকে খুব ভাল করে লক্ষ্য করলো; সাথে সাথে ভয়ে প্রাণ উড়ে গেল।
সর্বনাশ ও তো শমিত নয়। একটা ছায়া মূর্তি। সে পায়ে হেঁটে চলছে না। মাটির এক হাত উপর দিয়ে হাঁটছে।
হায় ভগবান! এ কার পিছনে ছুটছি আমি?
মুহুর্তে হাত-পা অসাড় হয়ে গেল। মনে হচ্ছে গলা সমান পাঁকে ডুবে যাচ্ছে ও। রক্ত চলাচল বন্ধ হবার যোগাড় হয় তার।
ও রাস্তা খুঁজলো। কিন্তু এ কি? তাদের গ্রামের রাস্তা কোথায়? তাহলে আমি এতক্ষণ কোন পথে হাঁটছি? বুকের মধ্যে শ্যালো মেশিনের শব্দ। ধপ! ধপ! ধপ!
ইতিমধ্যে আকাশে কালো হয়ে মেঘ জমে উঠেছে। একটা বড় মাপের বিদ্যুৎ চমকালো। সেই আলোতে যা দেখলো তাতে তার বুকের ভেতর তোলপাড় আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল, যেন পাঁজর ভেঙ্গে কলজে বেরিয়ে আসবে।
ঐ তো সামনে অদূরেই সাহা পাড়ার শ্মশান ঘাট! পিশাচটা আমাকে গ্রাম থেকে এত দূরে নিয়ে এসেছে! আজ আমার মৃত্যু অনিবার্য!
তবে কি! ঐ প্রেতাত্মা আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে একের পর এক বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে যাচ্ছে?
সাহেবের দেহের রোম গুলো খাড়া হয়ে উঠে। দুই কান গরম হয়ে ভাব বেরুচ্ছে। তার সব কিছু তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এক্ষুণি সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। সে মরিয়া হয়ে সামনে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করে।
কি আশ্চর্য! এতো সেই বুড়ি! কটমট করে তার দিকে তাকাচ্ছে। দু চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। দুধের মত সাদা দুটি লম্বা দাঁতের মাঝ দিয়ে লিক লিকে লোলুপ জিভ নাড়াচ্ছে। অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে তার চোখ মুখ জিঘাংসায় ফোঁস ফোঁস করছে।
ওর রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে! আর হতে সময় নেই। এক্ষুণি কিছু একটা করতে হবে। শয়তানটা এক্ষুণি তার ঘাড় মটকে রক্ত পান করবে!
তখন তার রাঙাকাকার কথা মনে পড়ে, কাকা! তুমি আমায় ভুল বুঝো না। তোমার সাহেব অবাধ্য নয়। আজ আমার মৃত্যু হলে তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো। জীবনের শেষ মূহুর্তে শেষ বারের মত তোমার প্রিয় মুখটা দেখতে পেলাম না।
সে দ্রুত গাছের ডালটা হাতে নিয়ে তার চার পাশ দিয়ে একটা গোল বৃত্ত আঁকলো আর রূপার কাছে শেখা 'হনূমানচালিশা' চিত্কার করে উচ্চারণ করতে লাগলো-"জয় হনুমান জ্ঞানগুণসাগর..
জয় কপিশ তিহুঁ লোক-উজাগর..
রামদূত অতুলিত বলধামা..
অঞ্জনিপুত্র পবনসুতনামা"...

ঠিক তখনই পূব আকাশে কাল মেঘের আড়ালে মৃদু আলোর রেখা ফুটে উঠলো। দূরে কোথা থেকে শাঁখের শব্দ ভেসে আসে...।
মুহুর্তের মধ্যে সে জ্ঞান হারিয়ে বৃত্তের মাঝে পড়ে গেল।
সাহেব যখন চোখ মেলে তাকালো তখন দেখে সে একটা ভেজা ধান ক্ষেতের মধ্যে শুয়ে আছে। ভোরের মিষ্টি আলো আর ফুরফুরে শীতল হাওয়া পরশ বুলিয়ে রাত্রির সকল ক্লান্তি ভাব একে একে ঝরিয়ে দিচ্ছে। সে উঠে বসে। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। সারা দেহ ভিজে চুপসে গেছে। শরীরটা প্রচন্ড দুর্বল, ব্যথায় ভার হয়ে আছে। ভয়ানক পিপাসায় কাতর। এত দুঃখ দুর্দশার মধ্যেও তার মনের মধ্যে একটা তৃপ্তির মহাতরঙ্গ স্নায়ু থেকে দেহের প্রতিটি প্রান্তে, ধমনী হয়ে প্রতিটি কোষে কোষে প্রবাহিত হতে থাকে।
সাহেব উঠে দাঁড়ায়। দেখে তাদের গ্রামের সীমানাতেই সে দাঁড়িয়ে আছে।ভেজা ট্রাভেলিং ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা হয়। সে গত রাতের ঘটনা মনে করে আর ভাবে, উত্তেজিত স্নায়ু কত ঘটনারই তো জন্ম দেয় যার সত্যিকার ব্যাখ্যা আজও বিজ্ঞান দিতে পারেনি...।
...এমন সময় গ্রামের দশরথকাকার সাথে দেখা।
-একি দশা রে তুর? এত সকাইলে এলি কি করি রে বাপ?
তাঁকে সব কথা খুলে বললো সাহেব।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দাশুকাকা বললেন,
-এ তো হবারই ছ্যালো ! কতবার বারণ করিছি রাঙাদাদারে ! মোর কতাডা শোনলো নি !
-কি হয়েছে কাকা? বলেন আমায়?
-শ্যামু বাগ্দীর ঠাকমাডার নামে উয়াদের বাড়ির সব সম্পত্তি ছ্যালো।বয়স হওয়াতে সব নিখা-পড়া করি লিবার জন্যি ও ঠাগমাডারে চাপ দিতি থাকে।ইচ্ছা ছ্যালো নিজির নামে সব নিখি লিবে।কিন্তো ঠাকমাডার ইচ্ছা ছ্যালো নিজের মেয়াডারে অর্ধেক দিবার।তাই রাজি হয়নি।শেষে রাঙাদাদা যেহেতো পুজো-আচ্চাদি করে তাই তারে দিয়ি চান্দ্রায়ণবর্ত করাবার নাম করি হিমের রাতিতে বুড়িরে উডোনে ফেলি রাকলো...পরদিন ভুরবেলায় বুড়ি মরার সময় শাপ দিয়ি মরেছে যারা এই কাজের যোগে আছে তাদের বংশ নিব্বংশ হবে..শ্যামুডার বউ কাল ভেদবমিতে গ্যাছে..মাতম ছেয়ি গ্যাছে গাঁয়ে..
...বাড়ি ফিরতে রাঙাকাকা বললেন তিনি এখানকার বাস উঠিয়ে পাকাপাকি কলকাতায় চলে যেতে চান, তাই জরুরী তলব..
...ব্যবস্থা তিনি আগেই করে রেখেছিলেন,অল্প জমি আর বাস্তুটুকু বিক্রী করে দিয়ে সাহেবের সাথে রাঙাকাকা গ্রামে চলে আসেন গ্রামের কারোর বারণ না শুনেই।
..সবাইকে একটা কথাই বলেছিলেন,আমি চলে যাই দুনিয়া ছেড়ি ক্ষেতি নেই, কিন্তো এরে আমার জেবন থাকতি মরতি দেবো নে....
.......
..........
..............তারপর আর কখনো যাও নি ঠাকুর্দা অশনিতলায়--বৃদ্ধ সাহেববাবুকে ঘিরে বসে নাতি-নাতনিরা উত্সুক হয়ে জিজ্ঞাসা করে।ভয়ে সবাই ঠাকুর্দার গায়ের কাছে লেপ্টে বসে আছে...
--গেছিলাম আর একবারই তোর ঠাকুমাকে বিয়ে করার পর...গিয়ে সে যা কাণ্ড হয়েছিলো !!
...শুনে মুচকি হাসেন রূপাদেবী।
আরও একটা গল্পের গন্ধ পেয়ে চনমন করে ওঠে কুচো-কাঁচারা।
--বলো না ঠাকুর্দা! বলো না!
ছদ্মকোপ দেখান রূপাদেবী...অ্যাই তরুণ,করুণ,কিরণ আজ আর নয়...গল্প কাল হবে...আজ অনেক রাত হয়ে গেছে...সবাই খেতে এসো..
...চলো, চলো দাদুভাই-দিদিভাই..খেতে যাই..খেতে যাই...নইলে ঠাম্মা আবার বকবে...
--ঠাকুর্দা আমি তোমার পাশে বসবো কিন্তু।
--না আমি বসবো।
--শোন ! আমি তোদের দিদি, আমিই বসবো।
--আচ্ছা, আচ্ছা সব্বাই বসবে, সবাই তাড়াতাড়ি খেয়ে নেবে, তারপর হিতোপদেশের একটা গল্প বলবো কেমন !!...
--মা---ঠাকুমা--জলদি খেতে দাও গো !!

কলধ্বনি করতে করতে ঠাকুর্দা-ঠাকুমার তত্ত্বাবধানে ফুলকলিদের দল ভিতর-বাড়িতে চলে গেলো....
.....
.......
.........আজ বেশীরভাগ নিউক্লিয়াস ফ্যামিলিতেই এই সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে অপসৃয়মান....
...আর ঠাকুর্দা-ঠাকুমাদের এইসব গল্পগুলো শোনে "বৃদ্ধাশ্রমের" কংক্রীট দেওয়াল...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন