নষ্ট মেয়ে....
কাহিনীকার-স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
--------------------------------------------
এক
``````
দু'মাস আগে এই ঘরে একটা মেয়ে নিজের গলায় ছুরি বসিয়ে খুদখুশী করেছে। মালয়েশিয়ান শাবানা ছিলো অবিবাহিতা। সামনের ছুটিতে দেশে গেলে তার প্রেমিকের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। বুড়ো মোকসার আলম পুলিশের বড় কর্মকর্তা। তার বাড়িতে ঘটা এই মৃত্যু নিয়ে তাকে কোন জবাবদিহি করতে হয়নি। রান্না ঘরের পাশে ছোট্ট একটা ষ্টোর রুম। কাঠের কয়েকটি খালি বাক্স পরে আছে ঘরের কোণে। আরেক পাশে পুরোনো জামা কাপড়ের স্তুপ। মেঝেতে দুটি বিছানা। একটি বিছানা এখন শূন্য। সে বিছানায় শাবানা থাকতো। জাহানারা এই ঘরে এখন একা থাকে। জাহানারা এখন ঘরের আলো বন্ধ করে ঘুমোতে ভয় পায়। অন্ধকারে মনে হয় বিস্ফারিত চোখের মৃত শাবানার লাশ জাহানারাকে ফিসফিস করে বলছে - পালিয়ে যা জাহি। তুইও বাঁচবি না। পালিয়ে যা...
....প্রথম যে রাতে জাহানারা শাবানার কাছে এখানে আনার কারণ শুনে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে,বুড়ো দানবের ছেলে তখন তাদের ঘরে ঢুকে তার কোমরে লাথি কষায় আর অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। তারপর চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে গিয়ে....ওহ্!! কি যন্ত্রণা সারা শরীরে। এরপর থেকে যন্ত্রণার ভয়ে চিৎকার করতেও ভয় পায় জাহানারা।
বুড়ো দানবটা আজ রাতেও ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর। এর থাবা থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন পথই নেই। আজ তার খুব শরীর খারাপ। মাসের বিশেষ দিন। দানবটা সেই অজুহাত মানে না। পশুসুলভ যৌনাচারের একাধিক বিকল্প পথ জানা আছে তার। বুড়োর ছেলেটা তবু এইসব মানে। বুড়ো দানবটা তাও মানে না।
দুই
`````
গ্র্রামের শত শত পরিবার ডাক পিয়ন মফিজের অপেক্ষায় থাকে। চিঠির অপেক্ষায় থেকে অনেকেই মফিজের বাড়ি চলে আসে প্রিয় মানুষের চিঠির খোঁজ নিতে। ফজলুল মাষ্টারের মেয়ে মনোয়ারা প্রতিদিন বিকেলে বাসায় এসে কান্নাকাটি করে। দেড় মাস স্বামীর কোন চিঠি আসে না। গত মাসে পরিবারের খরচের টাকা আসে নি। মফিজ তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয় -"মা রে! অপেক্ষা কর। তোর জামাই আল্লার রহমতে ভালো আছে।"
যেদিন সত্যি সত্যি চিঠি আসে আনন্দে চোখে জল নিয়ে চিঠি খুলে পড়ে অজ্ঞান হয়ে সে মফিজের বাড়ির উঠোনে লুটিয়ে পড়ে। আগামী শুক্রবার বাগদাদে প্রকাশ্যে তার স্বামীর শিরশ্ছেদ করা হবে।
উনিশশো ছিয়াশি সাল। জাহানারা তখন ছয় বছরের শিশু। সেদিন বাবার চোখে জল দেখে কিছু না বুঝেই সেও কেঁদে ফেলে।
তিন
```````
আজ রাতে ঘুম হবে না জাহানারার। আজ রাত শুধু কেঁদেই কাটবে তার। সেই দিনগুলো মনে পড়ছে খুব। নীলশালুকের চরে ছোট্ট সেই গ্রাম। পাশে রূপনারায়ণ নদ। জবার বাগিচায় লাল হয়ে আছে নদের ধার। গোটা দশেক ছাগল নিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরে জাহানারা। বাড়ির উঠোনে চেয়ারে-বেঞ্চে বসে আছে চার পাঁচ জন লোক। এক দেখাতেই পছন্দ। বর ট্রাক ড্রাইভার।পরদিন সন্ধ্যায় আম্মা-আব্বা আর নিকট আত্মীয়েরা মিলে নিকাহ্ করিয়ে দেয় জাহানারাকে।বরের খুব তাড়া।বাগদাদে ফিরে যাবে, তাই তার পরেরদিন রাতেই বউকে নিয়ে চলে যায়।
এক জাতের পুরুষ আছে এরা মনে করে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পর নারীর আর দেওয়ার কিছু থাকে না।জাহানারার বর রফিক ড্রাইভার সেই জাতের পুরুষ। ঘাটে ঘাটে নানা রকম নারীর শরীর ছুঁয়ে চেখে দেখা রফিকের মন ধরে রাখতে পারেনি জাহানারা।
ছেলের জন্মের পর তাই তার গা থেকে, মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসতে থাকে রফিকের নাকে। মাস ছয়েকের মাথায় রফিক নতুন বউ নিয়ে বাড়িতে আসে। গায়ের রঙ তার চাইতে ঢের উজ্জ্বল। কেউ কেউ বলে পতিতালয় থেকে নিয়ে আসা মেয়েটিকে রফিক নিকাহ্ করেনি।
ছয় মাসের শিশুপুত্রকে নিয়ে জাহানারা দেশে বাপের বাড়ি ফিরে আসতে চায়। কিছু দিন আগে দেশ থেকে আসা শেষ চিঠিতে আম্মা মারা গেছে খবর পেয়েছে। তার বোন আমিনার বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামেই। বোনের জামাই খুব ভালো মানুষ। শম্ভুগঞ্জ বাজারে ফার্নিচারের দোকান। বছর তিনেক ধরে প্যারালাইজড্ শ্বশুরের সেবা-শুশ্রূষা করে । মফিজের ছেলে সন্তানের অভাব আমিনার জামাই জব্বর পূরণ করে দিয়েছে।কিন্তু....
....চোখ খুলে দেখে রাস্তায় এক ডাস্টবিনের পাশে সে পড়ে আছে।পাশে তার অর্ধমৃত শিশুপুত্র। হঠাত্ তার সামনে ফরিস্তার মতো উদয় হয় পুলিশের এক কর্মকর্তা। নাম তার মোকসার আলম। তার সাহায্যে নানা জায়গায় খুঁজেও সে তার স্বামীর সন্ধান পায় না। অবশেষে শিশুপুত্রকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার তাগিদে মোকসার আলমের বাড়ীতেই পরিচারিকার কাজ নিতে বাধ্য হয়....
চার
``````
গত ছয় বছরে ছেলেটা অনেক বড় হয়েছে। এর মধ্যে মফিজ মারা যায়। আব্বাকে শেষ দেখার সুযোগও হয়নি। ছেলেটা মোকসারের ছেলের বউকেই মা বলে ডাকে। জাহানারা জানে তাদের কাছে তার সন্তান নিরাপদে আছে। তার পরও এই ভেবে বুকটা হাহাকার করে -সন্তান পেটে ধরার পরও তার ভাগ্যে বুঝি মা ডাক শোনার সুযোগ হবে না।লুকিয়ে ছেলের সাথে কথা বলে একদিন অনেক কষ্টে। কিন্তু ছেলের মধ্যে তাকে নিয়ে কোন আবেগ নেই। মায়ের খুব শুনতে ইচ্ছে হয় ছেলে তাকে বলছে -মা তুমি কেমন আছো? কিন্তু ছেলে তাকে এমন কোন প্রশ্নই করে না। সে হয়তো জানেই না জাহানারা তার আসল মা। সেদিন ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে ছেলের নিঃস্পৃহ উত্তরে দুই চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। জাহানারা জানতে চায় -বাবা ভালো আছো?
-হুঁ... ছেলে উত্তর দেয়।
-ভাত খেয়েছো?
-হুঁ...
-ইস্কুলে যাও?
-হুঁ...
-আচ্ছা যাই এখন..তোমাদের মতো নষ্টমেয়েদের সাথে দেখলে আম্মু-আব্বু রাগ করবে।
....আকাশ ভেঙে পড়ে জাহানারার মাথায়....
.....ওরে আমি নষ্ট মেয়ে নই রে! আমি যে তোর মা!!...কান্নায় ভেঙে পড়তে গিয়েও ভয়ে গিলে ফেলে কান্নাটা আর কান্নাটা বুকে গুমরে ঘুরে মরে।
পাঁচ
```````
জাহানারা, মোকসার আর তার ছেলের নির্যাতনের কথা কাউকে বলতে পারে না। বলে কোন লাভ নেই। তার মনে হয় আব্বা বুঝি তার খতের অপেক্ষায় আছে। কাগজ কলম নিয়ে আব্বার কাছে লিখতে শুরু করে খত।
আব্বা গো,
আমি ভালো নেই আব্বা। তুমি তো বলেছিলে আব্বা আরব দেশে সোনার মানুষ থাকে, কই তোমার সোনার মানুষ? এই দেশে উল্টো নিয়ম। আমি এই দেশের আজ নষ্ট মেয়ে আমার ছেলের চোখে, যে কিনা নিজেকে আজ মোকসার আলমের নাতি বলে নিজের পরিচয় জানে।যার জন্য আজ পর্যন্ত আমি যার যেমন ইচ্ছা নির্যাতন সহ্য করে বেঁচেছিলাম। কোন বিচার নেই। প্রকাশ করলে উল্টো আমার বিচার হবে। আমি আল্লার কাছে বিচার চাইলাম আব্বা। আল্লাই যেন এর বিচার করেন।
মা-বোনের ইজ্জতের দাম যে দেশে কাণাকড়িও নয়,সেই দেশের ধ্বংস অনিবার্য...এইটা আমার মতো নষ্ট মেয়ে, এই দেশের জন্য বদদুয়া দিলো...
তুমি ভালো থেকো আব্বা যেখানেই থাকো।তোমার জাহি মা ভালো নেই।
ইতি--
তোমার আদরের জাহানারা।
.....
........
চোখের জল মুছতে মুছতে জাহানারা বাবার কাছে লেখা চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের নীচে রেখে দিয়ে ফ্যানের ব্লেডে ওড়না বাঁধে....।
কাহিনীকার-স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
--------------------------------------------
এক
``````
দু'মাস আগে এই ঘরে একটা মেয়ে নিজের গলায় ছুরি বসিয়ে খুদখুশী করেছে। মালয়েশিয়ান শাবানা ছিলো অবিবাহিতা। সামনের ছুটিতে দেশে গেলে তার প্রেমিকের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। বুড়ো মোকসার আলম পুলিশের বড় কর্মকর্তা। তার বাড়িতে ঘটা এই মৃত্যু নিয়ে তাকে কোন জবাবদিহি করতে হয়নি। রান্না ঘরের পাশে ছোট্ট একটা ষ্টোর রুম। কাঠের কয়েকটি খালি বাক্স পরে আছে ঘরের কোণে। আরেক পাশে পুরোনো জামা কাপড়ের স্তুপ। মেঝেতে দুটি বিছানা। একটি বিছানা এখন শূন্য। সে বিছানায় শাবানা থাকতো। জাহানারা এই ঘরে এখন একা থাকে। জাহানারা এখন ঘরের আলো বন্ধ করে ঘুমোতে ভয় পায়। অন্ধকারে মনে হয় বিস্ফারিত চোখের মৃত শাবানার লাশ জাহানারাকে ফিসফিস করে বলছে - পালিয়ে যা জাহি। তুইও বাঁচবি না। পালিয়ে যা...
....প্রথম যে রাতে জাহানারা শাবানার কাছে এখানে আনার কারণ শুনে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে,বুড়ো দানবের ছেলে তখন তাদের ঘরে ঢুকে তার কোমরে লাথি কষায় আর অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। তারপর চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে গিয়ে....ওহ্!! কি যন্ত্রণা সারা শরীরে। এরপর থেকে যন্ত্রণার ভয়ে চিৎকার করতেও ভয় পায় জাহানারা।
বুড়ো দানবটা আজ রাতেও ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর। এর থাবা থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন পথই নেই। আজ তার খুব শরীর খারাপ। মাসের বিশেষ দিন। দানবটা সেই অজুহাত মানে না। পশুসুলভ যৌনাচারের একাধিক বিকল্প পথ জানা আছে তার। বুড়োর ছেলেটা তবু এইসব মানে। বুড়ো দানবটা তাও মানে না।
দুই
`````
গ্র্রামের শত শত পরিবার ডাক পিয়ন মফিজের অপেক্ষায় থাকে। চিঠির অপেক্ষায় থেকে অনেকেই মফিজের বাড়ি চলে আসে প্রিয় মানুষের চিঠির খোঁজ নিতে। ফজলুল মাষ্টারের মেয়ে মনোয়ারা প্রতিদিন বিকেলে বাসায় এসে কান্নাকাটি করে। দেড় মাস স্বামীর কোন চিঠি আসে না। গত মাসে পরিবারের খরচের টাকা আসে নি। মফিজ তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয় -"মা রে! অপেক্ষা কর। তোর জামাই আল্লার রহমতে ভালো আছে।"
যেদিন সত্যি সত্যি চিঠি আসে আনন্দে চোখে জল নিয়ে চিঠি খুলে পড়ে অজ্ঞান হয়ে সে মফিজের বাড়ির উঠোনে লুটিয়ে পড়ে। আগামী শুক্রবার বাগদাদে প্রকাশ্যে তার স্বামীর শিরশ্ছেদ করা হবে।
উনিশশো ছিয়াশি সাল। জাহানারা তখন ছয় বছরের শিশু। সেদিন বাবার চোখে জল দেখে কিছু না বুঝেই সেও কেঁদে ফেলে।
তিন
```````
আজ রাতে ঘুম হবে না জাহানারার। আজ রাত শুধু কেঁদেই কাটবে তার। সেই দিনগুলো মনে পড়ছে খুব। নীলশালুকের চরে ছোট্ট সেই গ্রাম। পাশে রূপনারায়ণ নদ। জবার বাগিচায় লাল হয়ে আছে নদের ধার। গোটা দশেক ছাগল নিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরে জাহানারা। বাড়ির উঠোনে চেয়ারে-বেঞ্চে বসে আছে চার পাঁচ জন লোক। এক দেখাতেই পছন্দ। বর ট্রাক ড্রাইভার।পরদিন সন্ধ্যায় আম্মা-আব্বা আর নিকট আত্মীয়েরা মিলে নিকাহ্ করিয়ে দেয় জাহানারাকে।বরের খুব তাড়া।বাগদাদে ফিরে যাবে, তাই তার পরেরদিন রাতেই বউকে নিয়ে চলে যায়।
এক জাতের পুরুষ আছে এরা মনে করে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পর নারীর আর দেওয়ার কিছু থাকে না।জাহানারার বর রফিক ড্রাইভার সেই জাতের পুরুষ। ঘাটে ঘাটে নানা রকম নারীর শরীর ছুঁয়ে চেখে দেখা রফিকের মন ধরে রাখতে পারেনি জাহানারা।
ছেলের জন্মের পর তাই তার গা থেকে, মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসতে থাকে রফিকের নাকে। মাস ছয়েকের মাথায় রফিক নতুন বউ নিয়ে বাড়িতে আসে। গায়ের রঙ তার চাইতে ঢের উজ্জ্বল। কেউ কেউ বলে পতিতালয় থেকে নিয়ে আসা মেয়েটিকে রফিক নিকাহ্ করেনি।
ছয় মাসের শিশুপুত্রকে নিয়ে জাহানারা দেশে বাপের বাড়ি ফিরে আসতে চায়। কিছু দিন আগে দেশ থেকে আসা শেষ চিঠিতে আম্মা মারা গেছে খবর পেয়েছে। তার বোন আমিনার বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামেই। বোনের জামাই খুব ভালো মানুষ। শম্ভুগঞ্জ বাজারে ফার্নিচারের দোকান। বছর তিনেক ধরে প্যারালাইজড্ শ্বশুরের সেবা-শুশ্রূষা করে । মফিজের ছেলে সন্তানের অভাব আমিনার জামাই জব্বর পূরণ করে দিয়েছে।কিন্তু....
....চোখ খুলে দেখে রাস্তায় এক ডাস্টবিনের পাশে সে পড়ে আছে।পাশে তার অর্ধমৃত শিশুপুত্র। হঠাত্ তার সামনে ফরিস্তার মতো উদয় হয় পুলিশের এক কর্মকর্তা। নাম তার মোকসার আলম। তার সাহায্যে নানা জায়গায় খুঁজেও সে তার স্বামীর সন্ধান পায় না। অবশেষে শিশুপুত্রকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার তাগিদে মোকসার আলমের বাড়ীতেই পরিচারিকার কাজ নিতে বাধ্য হয়....
চার
``````
গত ছয় বছরে ছেলেটা অনেক বড় হয়েছে। এর মধ্যে মফিজ মারা যায়। আব্বাকে শেষ দেখার সুযোগও হয়নি। ছেলেটা মোকসারের ছেলের বউকেই মা বলে ডাকে। জাহানারা জানে তাদের কাছে তার সন্তান নিরাপদে আছে। তার পরও এই ভেবে বুকটা হাহাকার করে -সন্তান পেটে ধরার পরও তার ভাগ্যে বুঝি মা ডাক শোনার সুযোগ হবে না।লুকিয়ে ছেলের সাথে কথা বলে একদিন অনেক কষ্টে। কিন্তু ছেলের মধ্যে তাকে নিয়ে কোন আবেগ নেই। মায়ের খুব শুনতে ইচ্ছে হয় ছেলে তাকে বলছে -মা তুমি কেমন আছো? কিন্তু ছেলে তাকে এমন কোন প্রশ্নই করে না। সে হয়তো জানেই না জাহানারা তার আসল মা। সেদিন ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে ছেলের নিঃস্পৃহ উত্তরে দুই চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। জাহানারা জানতে চায় -বাবা ভালো আছো?
-হুঁ... ছেলে উত্তর দেয়।
-ভাত খেয়েছো?
-হুঁ...
-ইস্কুলে যাও?
-হুঁ...
-আচ্ছা যাই এখন..তোমাদের মতো নষ্টমেয়েদের সাথে দেখলে আম্মু-আব্বু রাগ করবে।
....আকাশ ভেঙে পড়ে জাহানারার মাথায়....
.....ওরে আমি নষ্ট মেয়ে নই রে! আমি যে তোর মা!!...কান্নায় ভেঙে পড়তে গিয়েও ভয়ে গিলে ফেলে কান্নাটা আর কান্নাটা বুকে গুমরে ঘুরে মরে।
পাঁচ
```````
জাহানারা, মোকসার আর তার ছেলের নির্যাতনের কথা কাউকে বলতে পারে না। বলে কোন লাভ নেই। তার মনে হয় আব্বা বুঝি তার খতের অপেক্ষায় আছে। কাগজ কলম নিয়ে আব্বার কাছে লিখতে শুরু করে খত।
আব্বা গো,
আমি ভালো নেই আব্বা। তুমি তো বলেছিলে আব্বা আরব দেশে সোনার মানুষ থাকে, কই তোমার সোনার মানুষ? এই দেশে উল্টো নিয়ম। আমি এই দেশের আজ নষ্ট মেয়ে আমার ছেলের চোখে, যে কিনা নিজেকে আজ মোকসার আলমের নাতি বলে নিজের পরিচয় জানে।যার জন্য আজ পর্যন্ত আমি যার যেমন ইচ্ছা নির্যাতন সহ্য করে বেঁচেছিলাম। কোন বিচার নেই। প্রকাশ করলে উল্টো আমার বিচার হবে। আমি আল্লার কাছে বিচার চাইলাম আব্বা। আল্লাই যেন এর বিচার করেন।
মা-বোনের ইজ্জতের দাম যে দেশে কাণাকড়িও নয়,সেই দেশের ধ্বংস অনিবার্য...এইটা আমার মতো নষ্ট মেয়ে, এই দেশের জন্য বদদুয়া দিলো...
তুমি ভালো থেকো আব্বা যেখানেই থাকো।তোমার জাহি মা ভালো নেই।
ইতি--
তোমার আদরের জাহানারা।
.....
........
চোখের জল মুছতে মুছতে জাহানারা বাবার কাছে লেখা চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের নীচে রেখে দিয়ে ফ্যানের ব্লেডে ওড়না বাঁধে....।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন