ফল্গুধারা
-------------
কাহিনী - স্বপ্নসন্ধানী
---------------------------
আশিস্ সকালবেলা বেশ আয়েস করে খবরের কাগজ নিয়ে বসেছিলেন। পায়ের কাছে জিমি, চুপটি করে।
এমন সময় দীপা এসে বললেন, ‘একটু বাজারে যাবে? কয়েকটা জিনিস আনতে হবে।’
আশিস্ কাগজ থেকে মুখ না সরিয়েই বললেন, ‘উহুঁ এখন যেতে পারব না।আমাকে একটু পরেই বেরোতে হবে।এখন বাজারে গেলেই দেরী হয়ে যাবে।’
- ‘তোমাকে আবার কোথায় বেরোতে হবে?’
- ‘আছে দরকার আছে। ক’টা বাজলো?যাই স্নানটা সেরে নিই’, দীপাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই আশিস্ উঠে পড়লেন।
দীপা বেশ অবাকই হলেন।
আজকাল আশিসের ব্যস্ততা যেন একটু বেশীই বেড়েছে। কলেজ থেকে অবসর গ্রহণের পর কখনো এতটা চোখে পড়ে নি। সকাল-বিকেল বেরোচ্ছেন রোজ। ফিরছেনও দেরী করে। যখন বাড়িতে থাকছেন তখনো যেন অন্য কোনো জগতে বিচরণ করছেন। দীপা লক্ষ্য করেছেন বেশীর ভাগ সময়েই অন্যমনস্ক, যেন কি গভীর ভাবনায় মগ্ন।
আশিস্ বন্দ্যোপাধ্যায় কে যাঁরা অনেকদিন থেকে চেনেন না তাঁদের পক্ষে বোঝা শক্ত তিন-চার বছর আগেও আশিস্ ঠিক কি রকম ছিলেন। তাঁর বাতিকের কথা সর্বজনবিদিত ছিল। তিনি পরপর দু'বার হাত না ধুয়ে কোনো কিছু খেতেন না। ডেটল সাবান ছাড়া অন্য কোনো সাবানের প্রবেশ তাঁর বাড়িতে নিষিদ্ধ ছিল। কুকুর, বেড়াল থেকে শত হস্ত দূরে থাকতেন। যেসব বাড়িতে কুকুর, বেড়াল আছে সেসব বাড়িতে তিনি পারতপক্ষে জলগ্রহণ অবধি করতেন না। রাস্তার ধারের দোকান থেকে তেলেভাজা বা অন্য কোন খাবার খাওয়া, লেবুজল খাওয়া আর আত্মহত্যা করা তাঁর কাছে প্রায় সমার্থক ছিল। এ হেন আশিস্ও বদলেছেন, অনেক পরিবর্তন হয়েছে তাঁর। এটা ঘটেছিল ওনাদের ছেলে উদয়নের বিয়ের পর। তৃষ্ণার খুব কুকুর প্রীতি। তার বাড়িতে সে ছোটোবেলা থেকেই কুকুর দেখে অভ্যস্ত। এ বাড়িতে আসার কিছুদিন পরই সে একটা ল্যাব্রাডর রিট্রিভারের বাচ্চা নিয়ে এল। তার নাম রাখা হল জিমি। এতে আশিসের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু জিমির কি ক্ষমতা ছিল ঈশ্বরই জানেন আশিস্ পালটে গেলেন, জিমিকে পছন্দ করতে শুরু করলেন।
কিন্তু সে অন্য গল্প। আপাতত আশিসের ব্যস্ততা সবারই বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। আশিসের বাতিক কমেছে এতে বাড়ির সবাই খুশী বিশেষ করে দীপা কারণ ঠ্যালাটা তাঁকেই বেশী সামলাতে হত। কিন্ত এখনকার এই অতি ব্যস্ততার কারণও তাঁর অজানা। আশিস্ এমনিতেই কম কথার মানুষ, কাজেই দু একবার জিজ্ঞেস করেও বিশেষ কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় নি।
সন্ধ্যেবেলা ড্রয়িংরুমে বসে দীপা একা একাই এল্.ই.ডি. টি.ভি.তে স্টার জলসায় মনপসন্দ্ একটা সিরিয়াল দেখছিলেন। টি.ভি.টা চলছে বটে কিন্তু দীপার মন মাঝে মাঝেই সেখান থেকে ছুটে যাচ্ছে। আশিস্ বিকেলবেলা আবার বেরিয়ে গেছেন, বলে গেছেন ফিরতে দেরী হতে পারে।
উদয়ন, তৃষ্ণা ফিরল অফিস থেকে।
- ‘তোর বাবা তো সকালেও বেরিয়েছিল, আবার এখনো বাড়ি নেই। কোথায় যাচ্ছে বলে নি কিচ্ছু,’ দীপা ছেলেকে দেখে না বলে আর থাকতে পারলেন না।
- ‘মা তুমি অল্পতেই বড্ড টেনশন করো। কি হয়েছে বাবা বেরোচ্ছে তো? ভালোই তো বরং। মন-টন ভালো থাকবে। সারাদিন বাড়িতে থাকতে কারোর ভালো লাগে? আর থাকলেই বরং এটা হয় নি কেন, ওটা করো নি কেন শুরু করবে,’ উদয়ন মাকে পাত্তাই দিল না।
- ‘কিন্তু কোথায় যাচ্ছে তাই তো বলছে না! এত ব্যস্তই বা কেন? সকালে দোকানে যেতে বললাম, গেলো না, বেরোতে দেরী হয়ে যাবে বলে।’
- ‘কোথায় আর যাবে মা? কাছাকাছিই আছে কোথাও। বাবা তো বরাবরই মর্নিং ওয়াকে বেরোতো আর কলেজ থেকে ফিরে সন্ধ্যেবেলাতেও বেরোতো। তুমি এমন করছো না, সত্যি !’
দীপা বুঝলেন ছেলেকে বলা বৃথা, তাই চুপ করে গেলেন।
আশিস্ কিন্তু সেদিন তাড়াতাড়িই ফিরে এলেন। আশিস্ কে ঢুকতে দেখে জিমি যথারীতি দৌড়ে এসে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ডাক ছেড়ে আনন্দ প্রকাশ করল। এ বাড়িতে আশিস্ কেই সে সবচেয়ে বেশী পছন্দ করে ফেলেছে বোঝা যায়।
তৃষ্ণা শ্বশুরমশাইকে দেখে খুশী খুশী গলায় বলল, ‘শার্টটার রঙ ডীপ হয়েছে বলে প্রথমে তুমি খুঁতখুঁত করছিলে বাবা কিন্তু শার্টটা তোমায় কিন্তু দারুণ মানিয়েছে। যাই বলো তোমাকে কিন্তু এখনো বেশ স্মার্ট আর হ্যাণ্ডসাম্ লাগে বাবা !’
এই প্রশংসা বাক্য শুনে আশিস্ মুখে কিছু বললেন না, মৃদু হেসে পুত্রবধূর দিকে তাকালেন। তারপর আড়চোখে দীপাকে এক ঝলক দেখে নিয়ে "চক্ষে আমার তৃষ্ণা...." গুণগুণ করতে করতে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। পেছন পেছন জিমি।
যদিও শার্টটা তৃষ্ণার কিনে দেওয়া এবং প্রশংসাটা তারই বাবার সম্পর্কে কিন্তু তাও উদয়নের মনে সূক্ষ্ম ঈর্ষার উদ্রেক হল। সেও তো আজ তৃষ্ণার পছন্দ করা শার্ট পরেই অফিসে গেছিল, কই তখন তো তৃষ্ণা এতটা উচ্ছ্বসিত হয় নি! অবশ্য এ তো হবেই, আশ্চর্য আর কি! তৃষ্ণা আসার পর থেকে তার বাবা-মা যে সব কিছুতে তৃষ্ণারই পক্ষ নেয় সে কি আর উদয়ন লক্ষ্য করে নি। হায় রে স্মৃতি !
পরের দিন শনিবার। উদয়ন, তৃষ্ণার কলেজ ছুটি। সকাল থেকে তাই রান্নাবান্না, কাজকর্মের তেমন তাড়া নেই। কিন্তু আশিসের রুটিনের কোনো পরিবর্তন নেই। তিনি স্নান টান করে জলখাবার খেয়ে যথারীতি বেরিয়ে গেলেন। তখনো দীপাদের খাওয়াও শেষ হয় নি।
- ‘বাব্বা কি তাড়া! আবার গুনগুন করে গানও গাওয়া হচ্ছে,’ দীপা বেশ বিরক্ত আজ।
- ‘গান গাইছিল বাবা? কোন গানটা?’ খাওয়া থামিয়ে তৃষ্ণার হঠাৎ ঔত্সুক্য।
- ‘চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত, যদি তারে নাই চিনি গো, সেকি আমায় নেবে চিনে....।’
- ‘কোন্ গান জেনে তোমার কি হবে? আর তার সঙ্গে বাবার বেরোনোরই বা কি সম্পর্ক?’ উদয়ন এতক্ষণ এসবে কান না দিয়ে খেয়ে-দেয়ে উঠে খবরের কাগজে ডুবে ছিল, এবার আর না বলে পারল না।
- ‘আছে গো মশাই আছে ! সম্পর্ক আছে। মনের সঙ্গে; আমরা কখন কি করছি তা দিয়ে আমাদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। আমাদের মন যখন উৎফুল্ল থাকে তখন আমরা ব্রাইট কালারের জামাকাপড় বাছি, ডিপ্রেসড্ থাকলে ডাল কালারের। তেমন গানও। আমি কিছুদিন আগে 'সুস্থ' নামে একটা ম্যাগাজিনে একটা লেখা পড়েছিলাম এই বিষয় নিয়ে।’ - বললো তৃষ্ণা।
- ‘চমৎকার! কে কোথায় কি লিখল আর তুমিও তা বেদবাক্য বলে মেনে নিলে ! কত লোক কত কিছু লিখছে সব মানতে গেলে বেঁচে থাকাই তো মুশকিল হবে, বুঝলে? জিমি আসার পর প্রথম প্রথম বাবা কি বিরক্ত ছিল। বাড়িতে ঝামেলা লেগেই থাকত। এখন সব ঠিক আছে, বাবাও ব্যস্ত আছে কিছু নিয়ে, তোমাদের তাও পোষাচ্ছে না,’ উদয়ন বেশ রেগে রেগেই বলে যায়।
তখনকার মতো দীপা, তৃষ্ণা দুজনেই চুপ করলেন। কিন্তু আশিসের ব্যস্ততার কারণ না জানা পর্যন্ত যে দীপার শান্তি নেই তা বলাই বাহুল্য।
রবিবার সন্ধ্যেবেলা। আশিস্ তখনো ফেরেন নি। উদয়নও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়েছিল।
ফিরে এসে নিজে থেকেই দীপাকে বলল, ‘একটু আগে জিৎকাকুর সঙ্গে দেখা হল। বললেন, বাবা নাকি অ-নেকদিন ওনাদের সঙ্গে গল্প-টল্প করতে যায়ই না,’ তারপরেই দীপার টেনশন আরো বাড়তে পারে ভেবে হালকা সুরে বলল, ‘আমার মনে হয় বাবা আমাদের পুরোনো পাড়ার আড্ডায় যাচ্ছে। কিছুদিন আগে ওখানকার ঊষারঞ্জনজেঠু,নব্যেন্দুজেঠুরা এসে খুব ধরেছিল না।মনে নেই?’
দিন কাটতে থাকে। আশিস্ মনে হয় দীপার কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়ে খুব মজা পাচ্ছেন।
সেদিন দীপার দিদির বাড়ি পুজো ছিল, উনি সারাদিন ওখানেই ছিলেন। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরলেন।
- দাদাবাবু কোথায় গো, দিদি ?
বাড়ির বহুদিনের পুরোনো পরিচারিকা আরতি দি দরজা আটকাতে আটকাতে বলল, ‘দাদাবাবু তো একটুকুন আগেই বেইরে গ্যালো।’
দীপা কিছু না বলে মুখ গম্ভীর করে ভেতরে ঢুকে গেলেন।
তৃষ্ণা বাড়িতেই ছিল, দীপা ফিরেছে বুঝতে পেরে দৌড়ে এসে বলল, ‘জানেন মা ! আজও বেরোবার সময় বাবা গুনগুন করে গান গাইছিল।’
- ‘অ্যাঁ?’
- ‘হ্যাঁ। আজও চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত। ভালোবাসি ভালোবাসি, এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি...’ থেমে থেমে বলল তৃষ্ণা।
দীপা আর কিছু না বলে এক গ্লাস জল ঢকঢক করে খেয়ে ফেলে ওখানেই একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন।
বোমাটা ফাটল পরেরদিন সন্ধ্যেবেলা।
আশিস্ সেদিন বাড়িতেই, নিজের ঘরে নিবিষ্ট মনে বই পড়ছেন। উদয়ন আর তৃষ্ণা ফিরল অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে।
- ‘বাবার এত ব্যস্ততা কিসের জন্যে জানো? বাবা কি কাণ্ড করেছে শুনবে?’ উদয়নের গলায় বিস্ময়, উত্তেজনা সব কিছু রয়েছে।
- ‘কি কাণ্ড করেছে?’ দীপার গলা অজানা আশঙ্কায় কেমন যেন শুকিয়ে গেল।
- ‘বাবা একটা গানের ব্যাণ্ড ক্রিয়েট করেছে। সবাই বাবাদের সমবয়সী। কাল রবীন্দ্রসদনে ফার্স্ট শো ছিল। ব্যাণ্ডের নাম ফল্গুধারা। বাবা ফল্গুধারার একজন মেইন ভোকালিস্ট ও মাউথ অর্গানিস্ট। আজ কলেজ থেকে ফেরার সময় সায়নের সঙ্গে দেখা। আমাকে এই মারে তো সেই মারে। বলে তোর বাবা এত ভালো গান করে, গানের ব্যাণ্ডে আছে এসব কথা আমি ওদের কেন কখনো বলি নি। কি করে বলি যে আমিই জানতাম না আমার বাবা ব্যাণ্ডে গান গায় ! কাল নাকি বেশ ভালো লোক হয়েছিল। সবাই খুব অ্যাপ্রিশিয়েটও করেছে বাবাদের এই বয়েসে এই এনার্জি, এই এফর্টকে।’
দীপা শুধু যে বাকশক্তিরহিত তা নয়, বোধহয় চিন্তাশক্তিরহিতও। কি বলবেন কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। ইতিমধ্যে এসব কানে যেতে আশিস্ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। দীপা বসে বসেই দেখলেন, আগে না জানার অভিমান ভুলে ছেলেও বাবাকে খুব উৎসাহ দিচ্ছে, ব্যাণ্ড সম্পর্কে নানান কথা জিজ্ঞেস করছে, কারা আছে, কবে তৈরী হল ইত্যাদি ইত্যাদি। আর তৃষ্ণার তো খুশীর সীমা নেই। সে ফোন করে তার পরিচিত সবাইকে ফল্গুধারার কথা জানাতে ব্যস্ত। জিমি কি বুঝেছে বলা মুশকিল, কিন্তু সেও বার দুয়েক ঘেউ ঘেউ করে আর লেজ নেড়ে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে তার আনন্দ প্রকাশ করেছে। ব্যতিক্রম শুধু দীপা। তিনি একটা কথাও বলেন নি।
আস্তে আস্তে সবই জানা গেল। মাস কয়েক আগে এক ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে উটি বেড়াতে গিয়ে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ। তিনিও একই সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন, বাড়িও খুব দূরে নয় গড়িয়ায়। ব্যাণ্ড তৈরী এনারই পরিকল্পনা। কথাপ্রসঙ্গে সঙ্গীতপ্রীতির কথা আশিস্ও জানিয়েছিলেন। এরপর ফোন নম্বর বিনিময়, তারপর ফিরে এসে আবার যোগাযোগ এবং আস্তে আস্তে ফল্গুধারার পত্তন।
প্রাথমিক উচ্ছ্বাসপর্ব শেষ হলে দীপা উঠলেন, নিজের ঘরে গেলেন। এবার সঙ্গে আশিস্ও।
দীপা গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হঠাৎ এত গানের ইচ্ছে হল যে?’
- ‘হঠাৎ তো নয়। গান তো বরাবরই ভালোবাসি। স্কুলে, কলেজে গাইতাম আর হারমণিকা বাজাতামও। তার পরেও। কিন্তু কেউ যদি সব ভুলে যায় তো আমি কি করব?’
দীপা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আশিস্ কে দেখছেন। শেষ কথাটা যে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা বুঝতে অসুবিধে হল না। স্মৃতিশক্তির ওপর বিশেষ অত্যাচারও করতে হল না। চোখের সামনে ভেসে উঠল ছেঁড়া ছেঁড়া ছবি। তখন সবে দুজন পরিণয় সূত্রে বাঁধা পড়েছেন, কোনো প্রগলভ নিভৃতে আশিসের গলায় ‘ভালোবেসে সখি নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে…’ মনে পড়া মাত্রই মুখের ভাব একটু হলেও বদলালো। কিন্তু আশিস্ তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছেন বলে দীপা দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন।
- ‘আমাদের মতো সাধারণ সাংসারিক লোকের জীবনে শখই বলো আর ইচ্ছেই বলো – স-অব অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো’ বললেন আশিস্, ‘কর্তব্য, দায়িত্ব, কার্য সবকিছুর নীচে চাপা পড়ে থাকে। কখনো খনন করলে তবেই জেগে ওঠে।’
- ‘তা খননটা কে করলো শুনি? আমি তো কোমর বেঁধে কোনো কিছু হাতে নিয়ে নেমে পড়েছিলাম বলে মনে পড়ে না,’ দীপাও অভিমানে পিছু হটবার পাত্রী নন।
- ‘কোনো কিছু হাতে নিয়ে নামার কি দরকার? কারুর সামনে অন্য কারুর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলে কোনো কিছু নিয়ে নামার থেকে ঢের বেশী কাজ হয়।’
- ‘আমি আবার কখন কার প্রশংসা করলাম?’ এবার দীপা হতবাক্।
- ‘মনে করে দেখো। গতবার দুর্গাপুজোয় 'আলমগীর' নাটক দেখে তুমি সোমবাবুর প্রশংসা করো নি? এই বয়েসেও আপনি দেখালেন বটে, এত ভালো অভিনয় ইত্যাদি ইত্যাদি। তখনই আমি ভেবেছিলাম আমাকেও কিছু করে দেখাতে হবে।’
- ‘বাব্বা ! তখনই তুমি ঠিক করে ফেলেছিলে! কিন্তু আমাকে না বলার কারণটা জানতে পারি কি ?’
- ‘সা-রপ্রা-ইজ! গান আর বাজনার ইচ্ছে তো বরাবরই ছিল। যোগাযোগ হয়ে গেল উটি বেড়াতে গিয়ে। তারপর এতদিন কত কাণ্ডের পর তৈরী হল আমাদের ব্যাণ্ড ফল্গুধারা। নামটা কেমন হয়েছে বলো তো? শরীরের বয়স নিয়ে কে আর মাথা ঘামায়? মনটা ইয়ং থাকলেই হল। আর তাতে বয়ে চলবে না-পাওয়া ইচ্ছেগুলোর ফল্গুধারা ! কি বলো?’
- ‘তা তো বটেই,’ দীপার মুখে এছাড়া আর কথা জোগায় না।
আশিস্ যে একেবারে বিয়ের আগে যেমন অনুষ্ঠান করতেন তেমনই আবার স্টেজে গান গাইতে উঠে যাবেন এ উনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। তাও আবার ব্যাণ্ডে!
- ‘আরো সারপ্রাইজ আছে বুঝলে? সামনে সপ্তাহে আমরা একটা কম্পিটিশনে যাচ্ছি নজরুল মঞ্চে। বাংলা গানের ব্যাণ্ডের কম্পিটিশন। তার জন্যে একটু অন্য রকম ড্রেস দরকার।’
- ‘কম্পিটিশনে যাচ্ছ তোমরা? তার জন্যে আবার অন্যরকম ড্রেসও দরকার?’ দীপার বিস্ময় যেন আর শেষ হচ্ছে না।
- ‘আরে দেখো না ব্যাণ্ডের গায়ক-টায়ক রা কি রকম ঝকমকে সব জামাকাপড় পরে? ছেলের ঘরে দেখো নি কত সব দেশী বিদেশী গায়কদের ছবি টাঙানো ছিল? সেই রকম। এই দেখো,’ আশিস্ খুব সাবধানে একটা ব্যাগের মধ্যে থেকে বার করলেন সি-গ্রিন কালারের একটা পাঞ্জাবী, যার বুকে সাদা ফেব্রিক কালার দিয়ে আঁকা বাউল বেশে বিশ্বকবি।
- ‘কেমন হয়েছে এটা? এটাই পরব। বহুদিনের ইচ্ছে ছিল বুঝলে এরকম একখানা পাঞ্জাবী পরে স্টেজে উঠে বেশ জমিয়ে গান গাইব আর প্রিলিউড আর ইণ্টারলিউডে থাকবে হারমণিকার সুর।’
- ‘বলিহারি ইচ্ছে ! তো এবার আমরা শুনতে যেতে পারি কি? নাকি তাও বলতে না বোধহয় ?’ বলে ছদ্মরাগ দেখিয়ে দীপা রাতের খাওয়ার ব্যবস্থার তদারকি করতে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলেন।
যাওয়ার সময় কিন্তু তাঁর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয় আর খুশীর হাসি আশিসের চোখ এড়াল না। আনন্দে মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলেই ফেললেন- 'তা-তাও আবার বলতে হবে...'
-------------
কাহিনী - স্বপ্নসন্ধানী
---------------------------
আশিস্ সকালবেলা বেশ আয়েস করে খবরের কাগজ নিয়ে বসেছিলেন। পায়ের কাছে জিমি, চুপটি করে।
এমন সময় দীপা এসে বললেন, ‘একটু বাজারে যাবে? কয়েকটা জিনিস আনতে হবে।’
আশিস্ কাগজ থেকে মুখ না সরিয়েই বললেন, ‘উহুঁ এখন যেতে পারব না।আমাকে একটু পরেই বেরোতে হবে।এখন বাজারে গেলেই দেরী হয়ে যাবে।’
- ‘তোমাকে আবার কোথায় বেরোতে হবে?’
- ‘আছে দরকার আছে। ক’টা বাজলো?যাই স্নানটা সেরে নিই’, দীপাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই আশিস্ উঠে পড়লেন।
দীপা বেশ অবাকই হলেন।
আজকাল আশিসের ব্যস্ততা যেন একটু বেশীই বেড়েছে। কলেজ থেকে অবসর গ্রহণের পর কখনো এতটা চোখে পড়ে নি। সকাল-বিকেল বেরোচ্ছেন রোজ। ফিরছেনও দেরী করে। যখন বাড়িতে থাকছেন তখনো যেন অন্য কোনো জগতে বিচরণ করছেন। দীপা লক্ষ্য করেছেন বেশীর ভাগ সময়েই অন্যমনস্ক, যেন কি গভীর ভাবনায় মগ্ন।
আশিস্ বন্দ্যোপাধ্যায় কে যাঁরা অনেকদিন থেকে চেনেন না তাঁদের পক্ষে বোঝা শক্ত তিন-চার বছর আগেও আশিস্ ঠিক কি রকম ছিলেন। তাঁর বাতিকের কথা সর্বজনবিদিত ছিল। তিনি পরপর দু'বার হাত না ধুয়ে কোনো কিছু খেতেন না। ডেটল সাবান ছাড়া অন্য কোনো সাবানের প্রবেশ তাঁর বাড়িতে নিষিদ্ধ ছিল। কুকুর, বেড়াল থেকে শত হস্ত দূরে থাকতেন। যেসব বাড়িতে কুকুর, বেড়াল আছে সেসব বাড়িতে তিনি পারতপক্ষে জলগ্রহণ অবধি করতেন না। রাস্তার ধারের দোকান থেকে তেলেভাজা বা অন্য কোন খাবার খাওয়া, লেবুজল খাওয়া আর আত্মহত্যা করা তাঁর কাছে প্রায় সমার্থক ছিল। এ হেন আশিস্ও বদলেছেন, অনেক পরিবর্তন হয়েছে তাঁর। এটা ঘটেছিল ওনাদের ছেলে উদয়নের বিয়ের পর। তৃষ্ণার খুব কুকুর প্রীতি। তার বাড়িতে সে ছোটোবেলা থেকেই কুকুর দেখে অভ্যস্ত। এ বাড়িতে আসার কিছুদিন পরই সে একটা ল্যাব্রাডর রিট্রিভারের বাচ্চা নিয়ে এল। তার নাম রাখা হল জিমি। এতে আশিসের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু জিমির কি ক্ষমতা ছিল ঈশ্বরই জানেন আশিস্ পালটে গেলেন, জিমিকে পছন্দ করতে শুরু করলেন।
কিন্তু সে অন্য গল্প। আপাতত আশিসের ব্যস্ততা সবারই বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। আশিসের বাতিক কমেছে এতে বাড়ির সবাই খুশী বিশেষ করে দীপা কারণ ঠ্যালাটা তাঁকেই বেশী সামলাতে হত। কিন্ত এখনকার এই অতি ব্যস্ততার কারণও তাঁর অজানা। আশিস্ এমনিতেই কম কথার মানুষ, কাজেই দু একবার জিজ্ঞেস করেও বিশেষ কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় নি।
সন্ধ্যেবেলা ড্রয়িংরুমে বসে দীপা একা একাই এল্.ই.ডি. টি.ভি.তে স্টার জলসায় মনপসন্দ্ একটা সিরিয়াল দেখছিলেন। টি.ভি.টা চলছে বটে কিন্তু দীপার মন মাঝে মাঝেই সেখান থেকে ছুটে যাচ্ছে। আশিস্ বিকেলবেলা আবার বেরিয়ে গেছেন, বলে গেছেন ফিরতে দেরী হতে পারে।
উদয়ন, তৃষ্ণা ফিরল অফিস থেকে।
- ‘তোর বাবা তো সকালেও বেরিয়েছিল, আবার এখনো বাড়ি নেই। কোথায় যাচ্ছে বলে নি কিচ্ছু,’ দীপা ছেলেকে দেখে না বলে আর থাকতে পারলেন না।
- ‘মা তুমি অল্পতেই বড্ড টেনশন করো। কি হয়েছে বাবা বেরোচ্ছে তো? ভালোই তো বরং। মন-টন ভালো থাকবে। সারাদিন বাড়িতে থাকতে কারোর ভালো লাগে? আর থাকলেই বরং এটা হয় নি কেন, ওটা করো নি কেন শুরু করবে,’ উদয়ন মাকে পাত্তাই দিল না।
- ‘কিন্তু কোথায় যাচ্ছে তাই তো বলছে না! এত ব্যস্তই বা কেন? সকালে দোকানে যেতে বললাম, গেলো না, বেরোতে দেরী হয়ে যাবে বলে।’
- ‘কোথায় আর যাবে মা? কাছাকাছিই আছে কোথাও। বাবা তো বরাবরই মর্নিং ওয়াকে বেরোতো আর কলেজ থেকে ফিরে সন্ধ্যেবেলাতেও বেরোতো। তুমি এমন করছো না, সত্যি !’
দীপা বুঝলেন ছেলেকে বলা বৃথা, তাই চুপ করে গেলেন।
আশিস্ কিন্তু সেদিন তাড়াতাড়িই ফিরে এলেন। আশিস্ কে ঢুকতে দেখে জিমি যথারীতি দৌড়ে এসে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ডাক ছেড়ে আনন্দ প্রকাশ করল। এ বাড়িতে আশিস্ কেই সে সবচেয়ে বেশী পছন্দ করে ফেলেছে বোঝা যায়।
তৃষ্ণা শ্বশুরমশাইকে দেখে খুশী খুশী গলায় বলল, ‘শার্টটার রঙ ডীপ হয়েছে বলে প্রথমে তুমি খুঁতখুঁত করছিলে বাবা কিন্তু শার্টটা তোমায় কিন্তু দারুণ মানিয়েছে। যাই বলো তোমাকে কিন্তু এখনো বেশ স্মার্ট আর হ্যাণ্ডসাম্ লাগে বাবা !’
এই প্রশংসা বাক্য শুনে আশিস্ মুখে কিছু বললেন না, মৃদু হেসে পুত্রবধূর দিকে তাকালেন। তারপর আড়চোখে দীপাকে এক ঝলক দেখে নিয়ে "চক্ষে আমার তৃষ্ণা...." গুণগুণ করতে করতে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। পেছন পেছন জিমি।
যদিও শার্টটা তৃষ্ণার কিনে দেওয়া এবং প্রশংসাটা তারই বাবার সম্পর্কে কিন্তু তাও উদয়নের মনে সূক্ষ্ম ঈর্ষার উদ্রেক হল। সেও তো আজ তৃষ্ণার পছন্দ করা শার্ট পরেই অফিসে গেছিল, কই তখন তো তৃষ্ণা এতটা উচ্ছ্বসিত হয় নি! অবশ্য এ তো হবেই, আশ্চর্য আর কি! তৃষ্ণা আসার পর থেকে তার বাবা-মা যে সব কিছুতে তৃষ্ণারই পক্ষ নেয় সে কি আর উদয়ন লক্ষ্য করে নি। হায় রে স্মৃতি !
পরের দিন শনিবার। উদয়ন, তৃষ্ণার কলেজ ছুটি। সকাল থেকে তাই রান্নাবান্না, কাজকর্মের তেমন তাড়া নেই। কিন্তু আশিসের রুটিনের কোনো পরিবর্তন নেই। তিনি স্নান টান করে জলখাবার খেয়ে যথারীতি বেরিয়ে গেলেন। তখনো দীপাদের খাওয়াও শেষ হয় নি।
- ‘বাব্বা কি তাড়া! আবার গুনগুন করে গানও গাওয়া হচ্ছে,’ দীপা বেশ বিরক্ত আজ।
- ‘গান গাইছিল বাবা? কোন গানটা?’ খাওয়া থামিয়ে তৃষ্ণার হঠাৎ ঔত্সুক্য।
- ‘চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত, যদি তারে নাই চিনি গো, সেকি আমায় নেবে চিনে....।’
- ‘কোন্ গান জেনে তোমার কি হবে? আর তার সঙ্গে বাবার বেরোনোরই বা কি সম্পর্ক?’ উদয়ন এতক্ষণ এসবে কান না দিয়ে খেয়ে-দেয়ে উঠে খবরের কাগজে ডুবে ছিল, এবার আর না বলে পারল না।
- ‘আছে গো মশাই আছে ! সম্পর্ক আছে। মনের সঙ্গে; আমরা কখন কি করছি তা দিয়ে আমাদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। আমাদের মন যখন উৎফুল্ল থাকে তখন আমরা ব্রাইট কালারের জামাকাপড় বাছি, ডিপ্রেসড্ থাকলে ডাল কালারের। তেমন গানও। আমি কিছুদিন আগে 'সুস্থ' নামে একটা ম্যাগাজিনে একটা লেখা পড়েছিলাম এই বিষয় নিয়ে।’ - বললো তৃষ্ণা।
- ‘চমৎকার! কে কোথায় কি লিখল আর তুমিও তা বেদবাক্য বলে মেনে নিলে ! কত লোক কত কিছু লিখছে সব মানতে গেলে বেঁচে থাকাই তো মুশকিল হবে, বুঝলে? জিমি আসার পর প্রথম প্রথম বাবা কি বিরক্ত ছিল। বাড়িতে ঝামেলা লেগেই থাকত। এখন সব ঠিক আছে, বাবাও ব্যস্ত আছে কিছু নিয়ে, তোমাদের তাও পোষাচ্ছে না,’ উদয়ন বেশ রেগে রেগেই বলে যায়।
তখনকার মতো দীপা, তৃষ্ণা দুজনেই চুপ করলেন। কিন্তু আশিসের ব্যস্ততার কারণ না জানা পর্যন্ত যে দীপার শান্তি নেই তা বলাই বাহুল্য।
রবিবার সন্ধ্যেবেলা। আশিস্ তখনো ফেরেন নি। উদয়নও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়েছিল।
ফিরে এসে নিজে থেকেই দীপাকে বলল, ‘একটু আগে জিৎকাকুর সঙ্গে দেখা হল। বললেন, বাবা নাকি অ-নেকদিন ওনাদের সঙ্গে গল্প-টল্প করতে যায়ই না,’ তারপরেই দীপার টেনশন আরো বাড়তে পারে ভেবে হালকা সুরে বলল, ‘আমার মনে হয় বাবা আমাদের পুরোনো পাড়ার আড্ডায় যাচ্ছে। কিছুদিন আগে ওখানকার ঊষারঞ্জনজেঠু,নব্যেন্দুজেঠুরা এসে খুব ধরেছিল না।মনে নেই?’
দিন কাটতে থাকে। আশিস্ মনে হয় দীপার কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়ে খুব মজা পাচ্ছেন।
সেদিন দীপার দিদির বাড়ি পুজো ছিল, উনি সারাদিন ওখানেই ছিলেন। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরলেন।
- দাদাবাবু কোথায় গো, দিদি ?
বাড়ির বহুদিনের পুরোনো পরিচারিকা আরতি দি দরজা আটকাতে আটকাতে বলল, ‘দাদাবাবু তো একটুকুন আগেই বেইরে গ্যালো।’
দীপা কিছু না বলে মুখ গম্ভীর করে ভেতরে ঢুকে গেলেন।
তৃষ্ণা বাড়িতেই ছিল, দীপা ফিরেছে বুঝতে পেরে দৌড়ে এসে বলল, ‘জানেন মা ! আজও বেরোবার সময় বাবা গুনগুন করে গান গাইছিল।’
- ‘অ্যাঁ?’
- ‘হ্যাঁ। আজও চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত। ভালোবাসি ভালোবাসি, এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি...’ থেমে থেমে বলল তৃষ্ণা।
দীপা আর কিছু না বলে এক গ্লাস জল ঢকঢক করে খেয়ে ফেলে ওখানেই একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন।
বোমাটা ফাটল পরেরদিন সন্ধ্যেবেলা।
আশিস্ সেদিন বাড়িতেই, নিজের ঘরে নিবিষ্ট মনে বই পড়ছেন। উদয়ন আর তৃষ্ণা ফিরল অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে।
- ‘বাবার এত ব্যস্ততা কিসের জন্যে জানো? বাবা কি কাণ্ড করেছে শুনবে?’ উদয়নের গলায় বিস্ময়, উত্তেজনা সব কিছু রয়েছে।
- ‘কি কাণ্ড করেছে?’ দীপার গলা অজানা আশঙ্কায় কেমন যেন শুকিয়ে গেল।
- ‘বাবা একটা গানের ব্যাণ্ড ক্রিয়েট করেছে। সবাই বাবাদের সমবয়সী। কাল রবীন্দ্রসদনে ফার্স্ট শো ছিল। ব্যাণ্ডের নাম ফল্গুধারা। বাবা ফল্গুধারার একজন মেইন ভোকালিস্ট ও মাউথ অর্গানিস্ট। আজ কলেজ থেকে ফেরার সময় সায়নের সঙ্গে দেখা। আমাকে এই মারে তো সেই মারে। বলে তোর বাবা এত ভালো গান করে, গানের ব্যাণ্ডে আছে এসব কথা আমি ওদের কেন কখনো বলি নি। কি করে বলি যে আমিই জানতাম না আমার বাবা ব্যাণ্ডে গান গায় ! কাল নাকি বেশ ভালো লোক হয়েছিল। সবাই খুব অ্যাপ্রিশিয়েটও করেছে বাবাদের এই বয়েসে এই এনার্জি, এই এফর্টকে।’
দীপা শুধু যে বাকশক্তিরহিত তা নয়, বোধহয় চিন্তাশক্তিরহিতও। কি বলবেন কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। ইতিমধ্যে এসব কানে যেতে আশিস্ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। দীপা বসে বসেই দেখলেন, আগে না জানার অভিমান ভুলে ছেলেও বাবাকে খুব উৎসাহ দিচ্ছে, ব্যাণ্ড সম্পর্কে নানান কথা জিজ্ঞেস করছে, কারা আছে, কবে তৈরী হল ইত্যাদি ইত্যাদি। আর তৃষ্ণার তো খুশীর সীমা নেই। সে ফোন করে তার পরিচিত সবাইকে ফল্গুধারার কথা জানাতে ব্যস্ত। জিমি কি বুঝেছে বলা মুশকিল, কিন্তু সেও বার দুয়েক ঘেউ ঘেউ করে আর লেজ নেড়ে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে তার আনন্দ প্রকাশ করেছে। ব্যতিক্রম শুধু দীপা। তিনি একটা কথাও বলেন নি।
আস্তে আস্তে সবই জানা গেল। মাস কয়েক আগে এক ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে উটি বেড়াতে গিয়ে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ। তিনিও একই সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন, বাড়িও খুব দূরে নয় গড়িয়ায়। ব্যাণ্ড তৈরী এনারই পরিকল্পনা। কথাপ্রসঙ্গে সঙ্গীতপ্রীতির কথা আশিস্ও জানিয়েছিলেন। এরপর ফোন নম্বর বিনিময়, তারপর ফিরে এসে আবার যোগাযোগ এবং আস্তে আস্তে ফল্গুধারার পত্তন।
প্রাথমিক উচ্ছ্বাসপর্ব শেষ হলে দীপা উঠলেন, নিজের ঘরে গেলেন। এবার সঙ্গে আশিস্ও।
দীপা গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হঠাৎ এত গানের ইচ্ছে হল যে?’
- ‘হঠাৎ তো নয়। গান তো বরাবরই ভালোবাসি। স্কুলে, কলেজে গাইতাম আর হারমণিকা বাজাতামও। তার পরেও। কিন্তু কেউ যদি সব ভুলে যায় তো আমি কি করব?’
দীপা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আশিস্ কে দেখছেন। শেষ কথাটা যে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা বুঝতে অসুবিধে হল না। স্মৃতিশক্তির ওপর বিশেষ অত্যাচারও করতে হল না। চোখের সামনে ভেসে উঠল ছেঁড়া ছেঁড়া ছবি। তখন সবে দুজন পরিণয় সূত্রে বাঁধা পড়েছেন, কোনো প্রগলভ নিভৃতে আশিসের গলায় ‘ভালোবেসে সখি নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে…’ মনে পড়া মাত্রই মুখের ভাব একটু হলেও বদলালো। কিন্তু আশিস্ তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছেন বলে দীপা দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন।
- ‘আমাদের মতো সাধারণ সাংসারিক লোকের জীবনে শখই বলো আর ইচ্ছেই বলো – স-অব অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো’ বললেন আশিস্, ‘কর্তব্য, দায়িত্ব, কার্য সবকিছুর নীচে চাপা পড়ে থাকে। কখনো খনন করলে তবেই জেগে ওঠে।’
- ‘তা খননটা কে করলো শুনি? আমি তো কোমর বেঁধে কোনো কিছু হাতে নিয়ে নেমে পড়েছিলাম বলে মনে পড়ে না,’ দীপাও অভিমানে পিছু হটবার পাত্রী নন।
- ‘কোনো কিছু হাতে নিয়ে নামার কি দরকার? কারুর সামনে অন্য কারুর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলে কোনো কিছু নিয়ে নামার থেকে ঢের বেশী কাজ হয়।’
- ‘আমি আবার কখন কার প্রশংসা করলাম?’ এবার দীপা হতবাক্।
- ‘মনে করে দেখো। গতবার দুর্গাপুজোয় 'আলমগীর' নাটক দেখে তুমি সোমবাবুর প্রশংসা করো নি? এই বয়েসেও আপনি দেখালেন বটে, এত ভালো অভিনয় ইত্যাদি ইত্যাদি। তখনই আমি ভেবেছিলাম আমাকেও কিছু করে দেখাতে হবে।’
- ‘বাব্বা ! তখনই তুমি ঠিক করে ফেলেছিলে! কিন্তু আমাকে না বলার কারণটা জানতে পারি কি ?’
- ‘সা-রপ্রা-ইজ! গান আর বাজনার ইচ্ছে তো বরাবরই ছিল। যোগাযোগ হয়ে গেল উটি বেড়াতে গিয়ে। তারপর এতদিন কত কাণ্ডের পর তৈরী হল আমাদের ব্যাণ্ড ফল্গুধারা। নামটা কেমন হয়েছে বলো তো? শরীরের বয়স নিয়ে কে আর মাথা ঘামায়? মনটা ইয়ং থাকলেই হল। আর তাতে বয়ে চলবে না-পাওয়া ইচ্ছেগুলোর ফল্গুধারা ! কি বলো?’
- ‘তা তো বটেই,’ দীপার মুখে এছাড়া আর কথা জোগায় না।
আশিস্ যে একেবারে বিয়ের আগে যেমন অনুষ্ঠান করতেন তেমনই আবার স্টেজে গান গাইতে উঠে যাবেন এ উনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। তাও আবার ব্যাণ্ডে!
- ‘আরো সারপ্রাইজ আছে বুঝলে? সামনে সপ্তাহে আমরা একটা কম্পিটিশনে যাচ্ছি নজরুল মঞ্চে। বাংলা গানের ব্যাণ্ডের কম্পিটিশন। তার জন্যে একটু অন্য রকম ড্রেস দরকার।’
- ‘কম্পিটিশনে যাচ্ছ তোমরা? তার জন্যে আবার অন্যরকম ড্রেসও দরকার?’ দীপার বিস্ময় যেন আর শেষ হচ্ছে না।
- ‘আরে দেখো না ব্যাণ্ডের গায়ক-টায়ক রা কি রকম ঝকমকে সব জামাকাপড় পরে? ছেলের ঘরে দেখো নি কত সব দেশী বিদেশী গায়কদের ছবি টাঙানো ছিল? সেই রকম। এই দেখো,’ আশিস্ খুব সাবধানে একটা ব্যাগের মধ্যে থেকে বার করলেন সি-গ্রিন কালারের একটা পাঞ্জাবী, যার বুকে সাদা ফেব্রিক কালার দিয়ে আঁকা বাউল বেশে বিশ্বকবি।
- ‘কেমন হয়েছে এটা? এটাই পরব। বহুদিনের ইচ্ছে ছিল বুঝলে এরকম একখানা পাঞ্জাবী পরে স্টেজে উঠে বেশ জমিয়ে গান গাইব আর প্রিলিউড আর ইণ্টারলিউডে থাকবে হারমণিকার সুর।’
- ‘বলিহারি ইচ্ছে ! তো এবার আমরা শুনতে যেতে পারি কি? নাকি তাও বলতে না বোধহয় ?’ বলে ছদ্মরাগ দেখিয়ে দীপা রাতের খাওয়ার ব্যবস্থার তদারকি করতে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলেন।
যাওয়ার সময় কিন্তু তাঁর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয় আর খুশীর হাসি আশিসের চোখ এড়াল না। আনন্দে মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলেই ফেললেন- 'তা-তাও আবার বলতে হবে...'