শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৫

শেষ পরিণতি

শেষ পরিণতি
-------------------
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-----------------------------------------------



ঘরের বাইরে ট্যাক্সিটা এসে দাঁড়াতেই হুড়মুড় করে ছুটে এসে দরজা খুলে এগিয়ে এল শাশ্বতী।
"সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশ ওজনদার হয়েছিস কিন্তু"; শাশ্বতীর ছেলে ইমনকে আদর করতে করতে বাড়ীতে ঢুকেই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে একথা বলতে বলতেই থেমে গেল শ্রীপর্ণা। শ্রীপর্ণাকে হঠাৎ করে থেমে যেতে দেখে শাশ্বতীও অবাক হয়ে গেল। শ্রীপর্ণার ফর্সা মুখটা এতদিন বিদেশে বসবাসের ফলে আরও চকচকে আর ফর্সা হয়েছে। সেই ফর্সা মুখটা আচমকাই টকটকে লাল হয়ে উঠল কেন !
‘কি হল রে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?’
‘না না, ঠিক আছে, একটু জল দিবি?’
শাশ্বতী ফ্রিজ খুলে জল বের করে কাঁচের গ্লাসে ঢালছিল, সেই ফাঁকেই শ্রীপর্ণা বড় করে একটা শ্বাস নিল। নিজেকে সামলানোর এটাই সবথেকে সহজ উপায়।
‘ঠিক করে বল, শরীর ঠিক আছে তো?’ জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিতে দিতে উদ্বিগ্ন শাশ্বতী প্রশ্ন করলো।
‘হঠাৎ করে কেমন যেন মাথাটা ঘুরে গেল রে। একটু চোখ বন্ধ করে থাকি, হয়ত ঠিক হয়ে যাবে এক্ষুণি।’ কিছু ভেবে না পেয়ে একথাটা বলতে বলতে চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা রাখল শ্রীপর্ণা।
‘ইমন, টুপুরদিদিকে আর্যদত্ত দাদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দাও।’ বসার ঘরের কোণায় ভিডিও গেম নিয়ে ব্যস্ত যুবকের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল শাশ্বতী।
'আমার মিষ্টিমাসির ছেলে আশিস্ কে মনে আছে তো, তার ছেলে।খুব ভালো ছেলে।আই.আই.টি. ক্র্যাক করেছে এবার।' তারপর শ্রীপর্ণাকে নিয়ে শোওয়ার ঘরে এসে জানলার ভারী পর্দাগুলো সব টেনে ঘরটা অন্ধকার করে দিল শাশ্বতী। ‘তার চেয়ে ঘরে একটু শুয়ে থাক ! আমি লেবু চা বানাই, দেখ খেয়ে আরাম পাবি।’
মনে মনে শাশ্বতীকে অনেক ধন্যবাদ দিল শ্রীপর্ণা। এখন একটু আড়াল, একটু অন্ধকার আর একটু নিজস্ব সময় দরকার ছিল ওর। কি যে হল ! নিজেকে এই বয়সেও কেন যে কিছুতেই সামলাতে পারছে না ! পঁচিশটা বছর !! হা ! ভগবান !! ক্লান্তির নিঃশ্বাস ফেলে ও চোখ বন্ধ করল। শাশ্বতী দরজাটাও টেনে দিয়ে গিয়েছে। চোখ বন্ধ করতেই সেই দিনগুলো ছবির মত ফুটে উঠছে একটা একটা করে। শ্রীপর্ণা একা হবে কি করে !



মধুমাসের আগমন শুরু তখন কলকাতার বুকে। বইমেলা শুরু হয়েছে।ইউনিভার্সিটির ক্লাস বাঙ্ক করে কয়েকজন বন্ধু মিলে ধাঁ ময়দান।শীতের দুপুরের আমেজ গায়ে মাখতে মাখতে এ ষ্টল থেকে ও স্টল ঘোরাঘুরি।‘কি রে মাম্পু! ক্লাস কেটে এখানে!!' ডাক শুনে শাশ্বতী ঘুরে তাকিয়ে দেখে আশিস্,ওর মিষ্টিমণির ছেলে, যে প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে ইউনিভার্সিটির আলাদা ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করছে।"বাব্বা তুই! আমি ভাবলাম কে ডাকছে রে বাবা ডাকনাম ধরে!" সব বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল শাশ্বতী।এ মোনালিসা..এ জয়ন্তী..এ মেখলা..এ সুমন..এ শান্ত..আর এ শ্রীপর্ণা..ব্ল্যাক জিন্সের সাথে বটল্ গ্রিন শার্ট পরে আছে আশিস্..কাঁধে একটা লেদার অফিস ব্যাগ..সবার সাথে শেকহ্যাণ্ড করল একে একে...বেশ হইহই করে ঘোরা হল..একটা ক্যুইজ কনটেস্টে প্রাইজ জিতল আশিস্..দারুণ আনন্দ হল।
বন্ধুর ভাইয়ের ওই একদিনের অ্যাটিট্যুড দেখে তার প্রেমে পড়ল শ্রীপর্ণা। ফেরার সময় একই বাসে ফিরল দুজনে..দুজনকে বাসে তুলে দিয়ে যায় আশিস্ ।কত কথা জানতে ইচ্ছা করছিল..কিন্তু যদি কিছু ভাবে!! রাতে ঘুম নেই, দিনেও জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে শ্রীপর্ণা। একদিন সুযোগও এসেও গেল।ইউনিভার্সিটির ফ্রেশার্স ওয়েলকাম ছিল।সেদিন আশিস্ও এসেছিল শাশ্বতীর ইনভিটেশানে আর প্রচ্ছন্নভাবে শ্রীপর্ণার ঔত্সুক্যে। সেইদিন কাঁচা হলুদ শাড়ি পরা, সুন্দর করে সাজা শ্রীপর্ণাকে দেখে আশিসেরও চোখে ধাঁধা লেগে গেল। এ যেন শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতিতে রূপান্তর। আর তারপরেই প্রেম শুরু হল দু'জনের, এমন কি শাশ্বতীকেও লুকিয়ে দুজনের বাইরে দেখা করা। যদিও ইউনিভার্সিটির অনেকেই ওদের রসায়নটা বুঝে গিয়েছিল।বছরখানেক এভাবেই কাটল। ইউনিভার্সিটির গণ্ডী ছাড়াল শ্রীপর্ণা। কিন্তু আশিস্ সে বছরের সেমিষ্টারটা ক্লিয়ার করতে পারল না।সদ্য বাবা গত হয়েছেন।অনেকেই কানাঘুষোয় বললো শ্রীপর্ণার জন্যই নাকি....
এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে আজও আশিসের জন্য বুকের ভেতর এমন একটা আকুলি বিকুলি ঝড় আটকে আছে শাশ্বতী জানত না। বুঝতে পেরে নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছে শ্রীপর্ণা। শাশ্বতীর বাড়িতে ঢুকেই ওর চোখে পড়েছে এক বছর একুশের যুবক। নিবিষ্ট মনে  ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। হুবহু আশিসের চেহারা। দেখেই সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। প্রথমে তো ভেবেছিল বুঝি আশিস্ ই। সেই এলোমেলো একমাথা কোঁকড়া চুল। সুঠাম চেহারা। থেকে থেকে চশমাটা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ঠেলে তুলছে। মাথা স্থির হতে বুঝতে পারল তা কি করে হয়! ওরও তো এখন অনেকটা বয়েস হয়েছে। ওটা তাহলে আশিসের ছেলেই হবে! তখনই শাশ্বতী পরিচয়টা দিল।সপ্রতিভ টুপুর আলাপ করতে এগিয়ে গেল।



‘কিরে, শিপু কেমন লাগছে এখন?’ ঘরে ঢুকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল শাশ্বতী।
‘ঠিক আছি। টুপুর কি করছে রে?’ চায়ের কাপে ছোট চুমুক দিল শ্রীপর্ণা।
‘ওকে নিয়ে চিন্তা করিস না। ইমন আর আর্যর সঙ্গে দিব্যি পটে গেছে। আশিস আর মনীষা সারাদিনের জন্য দক্ষিণেশ্বর গেছে। ফিরতে ফিরতে রাত হবে। আজকালকার ছেলে, মন্দির দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে নেই তাই আর্যটা থেকে গেল। মুম্বই থেকে দু'সপ্তাহের জন্য এসে ওরা অনেক জায়গায় যায় তো। তো মিষ্টিমণি,মা আর ওরা গেছে। বাবা আর মিষ্টিমেসো চলে যাওয়ার পর দু'বোন মিলেই এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়।আর্য সব জায়গায় যেতেও চায় না। এই শোন না, সেদিন কি হল...’ গল্পের ঝুড়ি খুলে বসল শাশ্বতী।
প্রশ্ন না করেই উত্তর পেয়ে গেল শ্রীপর্ণা। প্রায় চার বছর পর ব্রাজিল থেকে দেশে এসেছে সে। আঠেরো বছরের মেয়ে টুপুর আর বর সোমদেবও এসেছে। শেষবার শ্রীপর্ণা একাই এসেছিল। যখন মা মারা গিয়েছিলেন। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন বাবাকে হারিয়ে মা আর ভাই-ই শ্রীপর্ণার কাছে সব ছিল। তাই মায়ের মৃত্যুসংবাদের খবর পেয়ে আর কারোর ছুটির জন্য অপেক্ষা না করে একাই চলে এসেছিল শ্রীপর্ণা। ভাই তখন বেঙ্গালুরুতে। কলকাতার পাট চুকিয়ে শেষ জীবনটা মা ওখানেই ভাই উচ্ছল, ভাজ মঞ্জীর আর ভাইপো ছোট্টুর সঙ্গে থেকেছেন। দেশে এলে ওখানেই আসে শ্রীপর্ণা। তবে কয়েকদিনের জন্য হলেও টুপুরকে নিয়ে দমদমে মামার বাড়িতে একবার ঢুঁ মেরে যায়। তখন শাশ্বতীর সঙ্গেও দেখা করে যায়। ফোনে নিয়মিত কথা হলেও মুখোমুখি বসে দেখা হওয়ার মজাই আলাদা। এবারও তাই এসেছে শ্রীপর্ণা।
শাশ্বতী কলকল করে অনেক কথা বলে গেলেও শ্রীপর্ণা শুধু ‘হুঁ, হাঁ’ করে চলেছে।
‘তোর ফোনটা দে তো, ওকে একবার ফোন করি, আমারটা রোমিং এ আছে।’ গল্পের মাঝে হঠাৎ খাপছাড়া ভাবেই বলে উঠল শ্রীপর্ণা।
‘ও, তাই বলি ! বরের জন্য মন খারাপ করছে? নে, কথা বল, আমি রান্নাঘর থেকে আসছি।’ মুচকি হেসে ফোনটা এগিয়ে দিল শাশ্বতী।
এরপর গল্প আর জমল না। টুপুর বরং অনেক খুশি। টুপুরের চোখে কি একটু মুগ্ধতা দেখল শ্রীপর্ণা? কে জানে, হবেও বা! খাওয়া দাওয়ার পর বিকেলের দিকে ‘আরেকদিন আসার চেষ্টা করবো’, বলে একটু তাড়াতাড়িই বেড়িয়ে পড়ল শ্রীপর্ণা।



রাতে শুতেই টুপুর ঘুমে কাদা। শ্রীপর্ণার ঘুম আসছে না। অনেকক্ষণ নিজের ফোনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে আবার মনে পড়ে যাচ্ছে সেই দিনগুলোর কথা। ফোনের স্ক্রিনে নম্বরটার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে সে, যেন আশিসের দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই অবশ হয়ে তাকিয়ে থাকা। প্রথম প্রেম, প্রথম হাতধরা, প্রথম চুমু। ঘরের হাল্কা নীল আলোয় নিজের ডান হাতের মণিবন্ধে লাল তিলটার দিকে তাকিয়ে সে এক অদ্ভুত শিরশিরানি হল ওর। আশিস্ ওই তিলটাতেই প্রথম চুমু দিয়েছিল। তখন আশিস্ কে একটু চোখের দেখা দেখার জন্য কি না করত ও। পাগল করা, মাতাল করা সেইদিনগুলো আজ কেমন যেন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে শ্রীপর্ণার। মনে হচ্ছে আবার যদি ফিরে পাওয়া যেত সেই দিনগুলো !
শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিন আশিস্ জানিয়েছিল, "আমায় ক্ষমা কোরো পর্ণা ! আমার পক্ষে আর এগোনো সম্ভব নয়। বাবা চলে যাওয়ার আগে সব জেনে গেছিলেন।আমিই জানিয়েছিলাম।ইণ্টারকাস্টে বিয়ে তিনি একদমই মেনে নেবেন না।তাকে বোঝাবার আর সুযোগ পাইনি।বাবা যেহেতু মানা করে গেছেন তাই মাও মেনে নেবেন না অন্য কাস্টের মেয়ে বিয়ে করলে। অনেক বুঝিয়েও কিচ্ছু ফল পাইনি বিলিভ মি পর্ণা।আর বাবা নেই যেখানে সেখানে মায়ের মতের বিরুদ্ধে কিভাবে এগোই বলো! তাই এই সম্পর্ক টেনে নিয়ে যাওয়ার কোন মানেই নেই।"
তার এক সপ্তাহ আগেই বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াতে গিয়ে আশিসের পাগল করা ভালোবাসাই পাথেয় হয়ে রইল । সেদিন দুপুরে কি পাগলামিই না করেছিল ওরা ! সম্পর্ক প্রায় শেষ, সেটা জেনেই যেন আশিস্ পাগলামিটা বেশী করেছিল আর তাতে সাড়া দিয়ে যেন শেষ বারের মত দুজন দুজনকে পাগলের মত আদর করেছিল। সেই উদ্দাম দিনটার কথা ভেবে আজও সারা শরীর শিউরে উঠল শ্রীপর্ণার। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। সময়ের পলি সব কিছুই পেলব করে দেয়। দিনগুলো তো ও প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। আজ আর্যদত্তই আবার সেইসব স্মৃতি উসকে দিল !
ফোনের দিকে তাকিয়ে কতটা সময় যে পেরিয়ে গেল শ্রীপর্ণা নিজেও জানে না।ফোন নম্বর,ফেসবুক আই.ডি.,হোয়াটস্অ্যাপ নম্বর সবই নিয়ে এসেছিল শাশ্বতীর কাছ থেকে আজ এক অজানা ঔত্সুক্যে। অনেকক্ষণ পরে টুপুরটা পাশ ফিরতেই চমক ভাঙল ওর। হাতটা বাড়িয়ে টুপুরের মাথায় একবার বুলিয়ে দিল শ্রীপর্ণা। মায়ের কোমরটা জড়িয়ে ধরল মেয়েটা।মেয়েটা এখনো কেমন মা-ন্যাওটা।ভাবলো একটা শেষ পরিণতি যা সবার পক্ষেই মঙ্গল,তাই করাই ভালো।তারপর একটা বড় শ্বাস টেনে আঙ্গুলটা ছুঁইয়ে দিল ডিলিট লেখা বাটনে....

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন