স্বপ্নের ডানা
----------------
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-----------------------------------------------
একমাত্র মেয়ে মৌ'কে নিয়ে বাবা মায়ের অনেক স্বপ্ন ! তাদের মেয়ে উচ্চ ডিগ্রী নিতে বিদেশে যাবে । তারপর দেশে এসে মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেবে । আর কি চাই বাবা মা হয়ে ! যেভাবেই হোক সুস্নাত পত্রনবীশ মেয়ে মৌ'কে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেনই । পড়াশুনা না করলে যে জীবন সুন্দর হয় না তা বাবা হয়ে সুস্নাত খুব ভাল করেই টের পেয়েছেন ।মামা-কাকা-দাদা আর অঢেল টাকা কোনটাই যে তার নেই ! আর তাই কোন রকমে বি.এস্.সি. পাশ করেও জীবন হয়েছে তার কাছে বড় বেশী বৈরী ! তাছাড়া বর্তমানে যে প্রতিযোগিতার মাঝে সবার বসবাস তাতে বাঁচতে হলে সবার সেরা হতে হবে,মেধা আর সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে ।তাহলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে কেউ আর আটকাতে পারবে না! মৌ সেই চার বছর বয়স থেকে পড়াশুনায় মনোনিবেশ করেছে । যদিও তার আগেই তিনে হাতে খড়ি হয়েছে ।কিন্তু তা ছিল পেন্সিলে , স্টাইলো তে, স্টেনসিলে শব্দ খেলার ছলে কিছুটা সময় কাটানো। সে গানও শিখছে সেই ছোট বেলা থেকেই! এখন রীতিমত স্কুলে যাওয়া এবং বাসায়ও প্রশিক্ষকের কাছে হাতে কলমে শিক্ষা নিতে হয় । খেলার সাথী বই, রেডিও শোনা আর সঙ্গীতে তালিম নেয়া । এসব কিছুই যেন স্বপ্নে রাঙা । যা বয়ে আনে প্রতিটা দিনই নতুন নতুন এক অনন্য আনন্দ !
পাখীর ডানায় ভর করে একে একে বছর টপকাতে থাকে মৌ ! সে এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে । সবকিছুতেই একশোতে একশো ! আর পরের পর বছর সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বিদ্যালয়ে যখন পুরস্কারের ঝুলি উপচে পড়তে থাকে সোনামণি মৌ-এর।বাবা মায়ের খুশি আর ধরে না।
....
.......
.........
এরই মাঝে একদিন অসুস্থতার কারণে সুস্নাতের এক কাকা যিনি ঝুমা মানে মৌ-এর মায়েরও এক মামা হন; তিনি বেশ কয়েক মাসের জন্য এসে মৌ'দের বাসায় এসে থাকবেন বলেন । মৌ-এর বাবা-মা তো দুজনেই খুব খুশী; কারণ, ভদ্রলোক ছিলেন রিটায়ার্ড গণিতের প্রফেসর।ভালোই হল উনি মাঝেমাঝে মৌ'কে একটু পড়া বুঝিয়ে দিতে পারবেন।মৌও খুব খুশী হয়েছে দাদুকে পেয়ে !
কিন্তু একদিন যখন মৌ গানের ক্লাসে যাচ্ছে তখন দাদুকে দেখল থমথমে মুখে বসে থাকতে।মৌ এর সামনেই তার বাবা-মাকে ডেকে বললেন, "শোনো ঝুমা-সুস্নাত; মৌ মামণি তোমাদের সন্তান অবশ্যই তোমরা তার ভালো বুঝবে কিন্তু এগুলো কি শেখাচ্ছো মেয়েকে? এসব শিখে কি লাভ ওর পরবর্তী জীবনে?তোমরা কি বংশের পরম্পরা ভাঙতে চাইছো? এইসব না শিখিয়ে, অন্য ভাল কিছু শেখাও বুঝলে ! এমনিতেই তো.....” ব্যস , তারপর থেকে তার বাবা-মা আর সাহস করেননি । দাদুও অনেক খুশি হয়েছেন । কোলের কাছটিতে বসিয়ে শুধু পড়াশোনা ছাড়া আর অন্য কোনদিকে মন না দিতে বুঝিয়ে বললেন সাথে পরীক্ষা দেবার জন্য মৌকে একটা দামী স্টাইলো পেন কিনে দিলেন। এখন শুধু মায়ের সাথে সাথে স্কুল , কোচিং আর বাসায় যাওয়া আসা করে মৌ !
মৌ এর বন্ধুরা যখন ড্রেস,কস্মেটিক পার্লার,মুভি,গেম অথবা ডিস্কভারি চ্যানেলের কোন একটা বিষয় নিয়ে তর্কে রত ! কিংবা কে কি কিনেছে ,কোথায় গিয়েছে ,কে কাকে কি উপহার দিয়েছে, সবকিছু নিয়ে একে একে সবাই মেতে ওঠে আড্ডায় । সে তখন নীরবে বইয়ের মাঝে মুখ লুকিয়ে কান খাড়া করে সব কিছু শুনে যায়।তার মাঝে কিছুটা ভয় কাজ করে; সেটা হল , বন্ধুরা বইয়ের বাইরের কোন বিষয়ে কিছু যদি তাকে জিজ্ঞাসা করে বসে , তাহলে সে কিছুই বলতে পারবে না ।মৌ ভাবে “ইসসস্ ওদের কত মজা,কত খেলনা আছে,কত ধরনের গেম আছে কিন্তু তার ...!”সবাই বাবা মায়ের সাথে ফ্যান্টাসি পার্কে যায় । পিত্জা , ম্যাক্, ফ্রাই কত কি খায় ! আর মৌ শুধু এসব বইয়ের মাঝে পড়ে! অবশ্য মাঝে মাঝে বাবা মায়ের সাথে নিজের দাদুর বাড়ীতে যায় , তবে সেখানেও বোঝা হয়ে ঠিকই সাথে থাকে বইয়ের ব্যাগ !
মৌ এর বাড়ীতে পড়াতে আসেন যে স্যার তিনি খুব ভাল ।দু'দিন পর পর কোন বিষয় বোঝাতে গিয়ে একটা করে ছোটদের গল্পের বই এনে দেন আর সে তা পড়া শেষ করে আবার স্যারকে দিয়ে দেয় ! মৌ ভাবে তার এই বর্ণহীন জীবনে গল্পের বই পড়েও তো সে অনেক জ্ঞানার্জন করছে ! হয়তো বা আধুনিকতার কিছু কিছু দিক তার অজানাই রয়ে গেছে । কিছুটা পিছনে পড়ে আছে সে ! কিন্তু তার যে কি হয়েছে এখন, শুধু পড়তে ভাল লাগে না।বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে,গল্প করতে ইচ্ছে করে ,সাজতে ইচ্ছে করে । অথচ এসব কিছুতেই সে অংশ নিতে পারবে না !
একদিন রেডিওতে পরপর কয়েকটা জোকস্ শুনে ভীষণ হাসছিলো মৌ। বাবা এসে তাই দেখে মৌকে বকা দিয়ে বলেছিলেন
-“যাও পড়তে বস ! সারাদিন শুধু রেডিও শোনা আর হি হি করে অহেতুক হাসা ! পড়াশুনা কিচ্ছু নেই ! এবার পরীক্ষায় লাড্ডু পাবে! লাড্ডু”। সেই থেকে আর রেডিও শুনতে সাহস করেনি মৌ । তারপর একদিন রেডিও শুনতে গিয়ে দেখে ব্যাটরী গুলো সব খুলে রাখা হয়েছে !
মৌ এর এক জন্মদিনে বাবা-মা সুন্দর জামা , জুতো কিনে দেয় আর স্যার তাকে একটা বারবি ডল উপহার দেয় ! একদিন সে পুতুলটাকে নিয়ে গুন্ গুন্ করে মায়ের মুখে শোনা একটা গান গাইছিল , ওমনি মা ঘরে ঢুকে পুতুলটা কেড়ে নিয়ে রেগে বলে
- “এত্ত বড়ো মেয়ে,এই বয়সে পুতুল খেলে ! এখন কি পুতুল খেলার সময় ! যাও লেখাপড়া কর !” মৌ ভেবেই পায়না সে আর কত লেখা পড়া করবে ! আগে যে কোন জিনিস দু একবার পড়লেই মনে রাখতে পারতো কিন্তু এখন কত পড়ে তবু মনে রাখতে পারে না ! কিন্তু বাবা মাকে এই কথা কোন ভাবেই বলা যাবে না , তাহলে তাঁরা তাকে খুব বকবে ।
এভাবেই মৌ কেবলমাত্র পাঠ্য বইয়ের আধিক্যতা অর্জন করে এবং বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে এক রকম কুণ্ঠা বোধ আর জড়তা নিয়ে বেড়ে ওঠে । এমন করেই পার হয়ে যায় তিনটি বসন্ত !
বসন্তের কথা মনে উদয় হতেই তার চোখে ভেসে ওঠে ছোটবেলার হলুদ শাড়ী , হলুদ গাঁদা , কৃষ্ণচূড়া ইত্যাদি ; তখনও তার ভুবন এতটা বেরঙ্ হয়নি। এখন এগুলো তার জীবনে সবই বইয়ের দৌলতে আর কান পেতে শোনা , তার পরম স্বপ্নবিলাস ! শুধুই কল্পনার সোনা ঝরা ফাগুনের দিন ! যার স্পর্শ এই নব যৌবন ক্ষণে অলৌকিক অদৃশ্য শক্তির আকর্ষণে মৌকে কি এক রোমাঞ্চকর সোপানের দিকে যেতে বড় বেশী কাছে টানে ! তার এই অনুভূতি যেন চোখের পাতায় লেখা , আর তাই সে সব সময় লজ্জা বোধ করে ।
ইদানীং বন্ধুরা নতুন বিষয় নিয়ে আলোচনায় মুখরিত ঝড় তোলে ! টাচ্ ফোন , কম্পিউটার , ফেসবুক , হোয়াট্সঅ্যাপ ,কার কতজন বন্ধু হয়েছে , কে কটা এস্.এম্.এস্. পেয়েছে ইত্যাদি।মৌ একদিন স্কুল থেকে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে
-“মা আমাকে একটা টাচ্ ফোন কিনে দেবে ?” মা যেন আকাশ থেকে পড়ে।
- “তোর সাহস কত বড়! এই বয়সে টাচ্ ফোন কেনার কথা বলিস !”
“কেন মা ? আমাকে তো কম্পিউটারের ক্লাস করতে হয় । টাচ্ ফোনে নাকি কম্পিউটারের মতই শেখা যায় আর কম্পিউটারও তো বাসায় নেই বলে আমি অন্যদের মত করে শিখতে পারছি না ,তাই নম্বরও...”। -গাল ফুলিয়ে কথাগুলো বলে মৌ ।
-“থাক ! এই একটা বিষয়ে কম নম্বর পেলে অসুবিধা নেই ! ঐ মরবার যন্ত্র বাসায় এনে কি শিখবে তা আমার ভালোই জানা আছে । পেপারে যা খবর বের হচ্ছে দিন দিন তা আর...” মা শেষের কথাগুলো বিড়বিড় করে বলে তাই কিছুই শুনতে পায়না মৌ ।তাঁর আর মোবাইলের কথাটা বলার সামান্যতম ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই হয় না কিন্তু মনে প্রশ্ন থেকেই যায় “কি আছে খবরের কাগজে?” পেপার থাকে বাবার কাছে ।মৌকে কেউ পেপারটা পর্যন্ত পড়তে দেয় না । বাবা বলে,
-“ পেপারে শুধু ধর্ষণ , মারামারি ,খুন , সড়ক দুর্ঘটনা এই সব দিয়ে ভরা ! টাকা দিয়ে আর ভয় ,আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা কিনতে চাই না ! সকালটাই শুরু হয় মন খারাপ দিয়ে । ভয় হয় , এই যে বাসা থেকে বের হচ্ছি সুস্থ ভাবে ফিরে আসতে পারবো তো ! মেয়েটার কোন বিপদ হবে নাতো...!” মাকে বলা কথাগুলো মনে বেশ গেঁথে আছে তার ।
কখনো কখনো অযাচিতভাবেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় মৌকে! সেদিন যেমন ক্লাসের বন্ধুরা শাহরুখ খানের ছবি “রা–ওয়ান” নিয়ে ভীষণ ভাবে অপমান করে তাকে ! ওরা ভাবে ওতো শাহরুখ খান কে, তাই জানে না । সেখানে “রা–ওয়ান” কি, তা কিভাবে জানবে ! স্যারের এনে দেওয়া কোন বইতে তো এই নিয়ে সে কখনো পড়েনি ! সবাই তাকে কেমন যেন ভাবে ! ত্বিষা তো মুখ ভেংচে বলেই ফেলল
- “ওহ মাই গড, শি ইজ সো ডাম্ব !শি ডাজন্ট ইভেন নো দ্য লিট্ল সিম্পল থিংস্, শিট...!” মুখ দিয়ে বিশ্রী শব্দ করে সে । এই কথার মাঝে ঘি ঢালে জিনিয়া
-“ ইউ নো হোয়াট - সি’জ সো এনোইং…..আই বেট শি ডাজন্ট ইভেন নো হু বিন লাদেন ইজ ...?! হা হা হা এবার কথার রেশ ধরে লেখা বলে
-“ ছিঃ ! দিস ষ্টুপিড গার্ল ডাজন্ট নো এনিথিং অ্যাবাউট দিস্ ওয়ার্ল্ড ! সেভ মি গড্...হি হি হি হা হা হা " সবাই সে হাসিতে যোগ দেয় ! মৌ কিছুই বলে না মাথা নীচু করে মুখ ঢেকে রাখে; প্রিয় গল্পের স্টাইলাস বই দিয়ে ! আসলেই সে “বিন লাদেন” কি জানে না ! সবার দুচোখের সীমানা জুড়ে বয়ে চলে রঙিন বর্ণমালা ! যা দেখলেই অনায়াসে পড়ে ফেলা সম্ভব ! কিন্তু তার....!! মাঝেমাঝে ডাক্তার আঙ্কেল কে যখন দেখাতে যায় তখন বাবা আর মা কে দেখে বিমর্ষ হয়ে থাকতে...সীসের মতো কিছু কথা গরম হয়ে ঢোকে তার কানে,"...আর কিছুদিন...."
তাই সে লজ্জা আর ভয়ে মাথা নীচু করে চোখ মাটিতে রেখে সবাইকে পাশ কাটিয়ে চলে । পাছে সবাই তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলে ।যদিও তার হরিণী দু’চোখ জুড়ে মোটা কাঁচের দেয়াল !
নিজেকে অনেক বেশী বেমানান মনে হয় এই স্কুলটাতে , এই জগতের সমবয়সী মানুষগুলোর সাথে ! দু একজন যে ব্যতিক্রম নেই টা নয় ,আছে । তবে তাঁরাও নীরব থাকে ঠিক মৌ এর মত করেই ! পড়াশোনার প্রতি একেবারেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে মৌ । ক্লাসের পরীক্ষাগুলোতে মৌ আগের মত একশোতে একশো পায়না ! বাবা মা , বাড়ীর স্যার এমন কি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও মৌকে বকতে থাকে ! তাকে নিয়ে তাঁদের সবার অনেক আশা ,অনেক স্বপ্ন ! হেডস্যার বাবাকে ফোন করে ডেকে এনে কি সব যেন বলে । আর তাই বাড়ীতে ফিরেই বাবা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে -
-ছিঃ ছিঃ ! কোনদিন ভাবিনি আমার মেয়ের কারণে আমাকে কেউ ডেকে নিয়ে বলবে যে , আপনার মেয়ে এমন রেজাল্ট করলে এই স্কুলে রাখা সম্ভব নয় !
একধরণের অপমানিত বোধ করেন সুস্নাতবাবু । ভীষণভাবে মন খারাপ করে থাকেন তিনি । মৌ এর সাথে সাথে তার মাকেও ভীষণভাবে বকাবকি করেন !
মৌ এর মনে হয় বাবা বা মা খাবার সময়েই যেন একটু অতিরিক্ত আদর করেন ! দুজনেই মুখে তুলে খাইয়ে দেন ! বাবা মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে পড়াশুনা করলে কি হবে , না করলেও তার ফল কতটা ভয়ংকর হবে তাই নিয়ে খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলেন । কিন্তু রাগারাগির পরে কেউ আর মৌকে খেতে ডাকেন না ! দুজনেরই কথা “পড়াশুনা তাঁদের মনের মত না করলে তাকে কেউ খেতেও দেবে না !” সেও রাগ করে আর খেতে যায়নি ! না খেয়ে নির্ঘুম রাত কাটায় । ওদিকে সুস্নাতবাবু ও ঝুমাদেবী দুজনেই খাওয়াদাওয়া রেখে , মেয়ের ভবিষ্যতের আশংকায় ভাষাহীন নীরবে দীর্ঘ রাত পাড়ি দেন ।
ইদানীং মৌ এর জানালার কাছে নাম না জানা একটা পাখি এসে বসে ! সে অনেক খুশি হয় । মৌ মন খুলে পাখির সাথে অনেক কথা বলে ! ভালোবেসে পাখীটার নাম দেয় ভোরাই ।সেও তাকে দেখতে আসে প্রতিদিন । স্কুলে যাবার আগে ও স্কুল থেকে এসেই মৌ খাবার নিয়ে অপেক্ষা করে প্রিয় বন্ধুটির জন্য ! ভোরাই মৌকে একটুও ভয় পায়না ! সে মৌ এর বিছানায় বসে ,আর মৌ হাত বুলিয়ে আদর করে দেয় ভোরাই এর গায়ে আর লেজটাতে ! কিছুটা ভাললাগে মৌ এর । কিছুদিন ধরে অকারণেই তার দমবন্ধ হয়ে মরে যাবার একটা তীব্র জ্বালা ছিল মনে,এখন তা কিছুটা উপশম হয়েছে ! নিভে আসছে তার চারপাশের আলো বুঝতে পেরেই মৌ বাবা মা যাতে বুঝতে পারে সে ক্লাসের পড়াশুনা করছে , তাই মনের সব না বলা কথাগুলো ছোট্ট ছোট্ট স্টাইলো অক্ষরে জায়গা দেয় একটা খাতায় । এমনকি বাবা মায়ের অতিরঞ্জিত , অহেতুক শাসন , সামর্থ্য না থাকা স্বত্বেও কষ্ট করে অভিজাত স্কুলে ভর্তি করা , মৌ এর প্রতি বিশ্বাস নেই বলে সব সময় হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত থাকা , আরো অনেক বিষয় যা অন্য সবার ভাবনাকেও হার মানায় ! সব কথা অতি যত্নসহকারে সুন্দর করে লিখে রেখেছে ! এভাবেই তার শৈশব , কৈশোর সবকিছু শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য নিহিত থাকবে , এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না ! কিন্তু ভোরাইকে পেয়ে মৌ মনের অনুভূতি গুলো লিখতে ভুলে গেছে । সে এখন যেন এক বাধাহীন খুশীর ঝর্ণাধারা !
- “জানিস ভোরাই ! আমার না এত পড়তে ভাল লাগে না ! আমার সবার মত বেড়াতে ইচ্ছে করে , বাবা মায়ের হাত ধরে ফ্যান্টাসিয়াস-এর সব স্বাদ নিতে ইচ্ছে করে ! স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে ,আমিও তো বন্ধুদের মত বড় হয়েছি ! বাবা বলে আমাকে ডাক্তার হতে হবে । আর মা বলে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। কিন্তু জানিস -আমার না খুব শখ আমি একজন আর্টিস্ট হব ! সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকবো আর সারা দেশ ঘুরে ঘুরে অনেক অনেক ছবি তুলব ! প্রকৃতির লীলাভূমির সৌন্দর্য আমার হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখে ক্যানভাসে রং তুলির সজ্জায় জীবন দেব । নীলের মাঝে সাতরঙা ঘুড়ির ঢেউ খেলানো পালে সোনালী রোদের আলো ,আর ফুলের হাসিতে পৃথিবী সাজাবো ! কিন্তু কি করে তাই ভাবি! আমার জীবনে আলো যে খুবই অল্প !”কথাগুলো বলে হাঁপিয়ে যায় সে । আজ যেন বাঁধনহারার দিন ।অদম্য উৎফুল্লতার জোয়ারে মেঘের ভেলায় নেচে যায় মৌ! একটু দম নিয়ে আবার শুরু করে
-“সবাই যখন ইতিহাস ভুলে যাবার আদিমতায় মেতে উঠবে , আমার আঁকা ছবি তখন কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে ! এই দেখ আমি তোর ছবি এঁকেছি !” একটা কাগজ দেখিয়ে বলে “এই দেখ এইটা আমি আর আমার হাতের উপর এই দেখ দেখ , এইটা তুই বসে আছিস ! আমার যে তোর মত করে উড়তে ইচ্ছে করে !” মন এবার খারাপ হয়ে যায় ! মৌ এর কথার শব্দে ঘরে ঢোকে বাবা ! চিৎকার করে মাকে ডাকে
-“ঝুমা ! ঝুমা !” মা ঘরে ঢুকতেই বাবা রেগে বলে
-“এই পাখীটা কোথা থেকে এলো ! এই জন্য মেয়ে রেজাল্ট খারাপ করছে ! সারাদিন বাসায় থেকে কি কর ? একটা মেয়ে তার দিকেও খেয়াল দিতে পারো না ! সে পড়াশুনা বাদ দিয়ে কোথাকার একটা পাখীর সাথে বকবক করেই যাচ্ছে !" বাবাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই ভোরাই উড়ে চলে যায় । সেই সময়ই বাবা জানালাটা পর্দা দিয়ে ঢেকে দেয় , যেন পাখীটা আর না আসতে পারে । মৌ এর এখন আর কিছুই ভাল লাগে না । স্কুলে যেতে মন চায় না । ভোরাই এর জন্য আকুলতায় দিনগুলো হয় দীর্ঘায়িত ! নাওয়া-খাওয়া একরকম ছেড়েই দিয়েছে মৌ। উদাসী হাওয়ায় অনিচ্ছাকৃত ভাবেই সে তার ভারী মনটাকে বয়ে নিয়ে চলে !
কি ঝড় , অথবা বৃষ্টি , মৌ যেদিন থেকে স্কুলে যায় সেদিন থেকে আজ অব্দি একটা দিনও স্কুলে অনুপস্থিত থাকেনি ! স্কুলে ১০০% উপস্থিত থাকার সেরা সার্টিফিকেটটিও মৌ ই সব সময় পেয়ে এসেছে ! ভোরাই চলে যাওয়ার পরের সপ্তাহে একদিন সকালে মৌ এর খুব জ্বর এবং প্রচন্ড মাথায় ব্যথা ,তাই শুয়ে আছে । মা ঘরে ঢুকে তাকে শুয়ে থাকতে দেখে বলে ওঠে-
-“আরে তুই এখনো বিছানায় ! যা রেডি হয়ে স্কুলে যা”। কি এক অভিমানে কিছুই বলে না মৌ ! সে সত্যিই জ্বর নিয়ে স্কুলে যায় ।দুই ঘণ্টা যেতে না যেতেই এক শিক্ষিকার ফোনে মৌ এর অস্বাভাবিক আচরণের ও চোখের যন্ত্রণার জন্য "চোখের আলো" নামক আই ফাউণ্ডেশনে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে,যেখানে মৌকে চোখ দেখাতে প্রায়ই যেতে হতো সেখানে বাবা-মা ছুটে যায় । রিকশায় করে যেতে যেতে ঝুমা আর সুস্নাত বুকের ধন মৌ এর জন্য অস্থির হয়ে ওঠে । দুজনেই সিদ্ধান্ত নেয় নাহ্ আর নয় ! এবার থেকে মৌ এর মতো করেই তারা মৌকে চলতে দেবে। মেয়েকে কষ্ট করে হলেও একটা ভাল স্কুলে দিয়েছে কিন্তু আর কিছুই তো করতে পারছে না মেয়েটার জন্য ! যে বেতন তা দিয়ে বাবা মাকে টাকা পাঠিয়ে, মৌ এর পড়াশোনার জন্য খরচ করে ,যা থাকে তাতে মাসের পঁচিশ দিনও সংসারের খরচ যায় না ।দুজনেরই বড় সাধ মেয়ে তাদের লেখাপড়া শিখে যেন নিজের পরিবারটাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করতে পারে ! দুজনেই মেয়ের দুশ্চিন্তায় বারবার ভগবানের কাছে দুহাত তুলে করুণা ভিক্ষা চায় , যেন মৌকে তিনি সুস্থ রাখেন । দুজনেই ফাউণ্ডেশনে পৌঁছে সোজা মৌ আছে সেই রুমে দৌড়ে যায় আর তখন দেখে মৌ ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে কি যেন বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলছে ! সুস্নাত আদর মাখা কণ্ঠে ডাকে-
-“মৌ মামণি ! মাগো...” হাতটা ধরতেই ছাড়িয়ে নেয় মৌ ! বাবা মাকে চিনতেই পারে না সে ! শুধুই ভোরাইকে খুঁজে বেড়ায় আর তার বুকের মাঝে যখের ধনের মত আঁকড়ে ধরে রাখা সেই স্টাইলাস নোটবুকটি । যার প্রতিটি পাতায় জায়গা করে নিয়েছে মৌ এর অপূর্ণ ভালোবাসা । সুপ্ত মনের চাওয়া-পাওয়া , রূপকথার কাহিনী ! সে কাল রাতেও শেষ দুটি লাইন লিখেছে-
"ভোরাই , আমিও তোর মত স্বাধীন হব
মুক্ত ডানা মেলে,বিশ্বজগত দেখে নেব !"
ডঃ ভোরা এগিয়ে আসেন,সুস্নাত আর ঝুমাকে দেখে বিষাদে দুদিকে মাথা নেড়ে বলে ওঠেন - "শি ইজ টোটালি ব্লাইণ্ড নাও".....
----------------
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-----------------------------------------------
একমাত্র মেয়ে মৌ'কে নিয়ে বাবা মায়ের অনেক স্বপ্ন ! তাদের মেয়ে উচ্চ ডিগ্রী নিতে বিদেশে যাবে । তারপর দেশে এসে মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেবে । আর কি চাই বাবা মা হয়ে ! যেভাবেই হোক সুস্নাত পত্রনবীশ মেয়ে মৌ'কে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেনই । পড়াশুনা না করলে যে জীবন সুন্দর হয় না তা বাবা হয়ে সুস্নাত খুব ভাল করেই টের পেয়েছেন ।মামা-কাকা-দাদা আর অঢেল টাকা কোনটাই যে তার নেই ! আর তাই কোন রকমে বি.এস্.সি. পাশ করেও জীবন হয়েছে তার কাছে বড় বেশী বৈরী ! তাছাড়া বর্তমানে যে প্রতিযোগিতার মাঝে সবার বসবাস তাতে বাঁচতে হলে সবার সেরা হতে হবে,মেধা আর সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে ।তাহলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে কেউ আর আটকাতে পারবে না! মৌ সেই চার বছর বয়স থেকে পড়াশুনায় মনোনিবেশ করেছে । যদিও তার আগেই তিনে হাতে খড়ি হয়েছে ।কিন্তু তা ছিল পেন্সিলে , স্টাইলো তে, স্টেনসিলে শব্দ খেলার ছলে কিছুটা সময় কাটানো। সে গানও শিখছে সেই ছোট বেলা থেকেই! এখন রীতিমত স্কুলে যাওয়া এবং বাসায়ও প্রশিক্ষকের কাছে হাতে কলমে শিক্ষা নিতে হয় । খেলার সাথী বই, রেডিও শোনা আর সঙ্গীতে তালিম নেয়া । এসব কিছুই যেন স্বপ্নে রাঙা । যা বয়ে আনে প্রতিটা দিনই নতুন নতুন এক অনন্য আনন্দ !
পাখীর ডানায় ভর করে একে একে বছর টপকাতে থাকে মৌ ! সে এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে । সবকিছুতেই একশোতে একশো ! আর পরের পর বছর সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বিদ্যালয়ে যখন পুরস্কারের ঝুলি উপচে পড়তে থাকে সোনামণি মৌ-এর।বাবা মায়ের খুশি আর ধরে না।
....
.......
.........
এরই মাঝে একদিন অসুস্থতার কারণে সুস্নাতের এক কাকা যিনি ঝুমা মানে মৌ-এর মায়েরও এক মামা হন; তিনি বেশ কয়েক মাসের জন্য এসে মৌ'দের বাসায় এসে থাকবেন বলেন । মৌ-এর বাবা-মা তো দুজনেই খুব খুশী; কারণ, ভদ্রলোক ছিলেন রিটায়ার্ড গণিতের প্রফেসর।ভালোই হল উনি মাঝেমাঝে মৌ'কে একটু পড়া বুঝিয়ে দিতে পারবেন।মৌও খুব খুশী হয়েছে দাদুকে পেয়ে !
কিন্তু একদিন যখন মৌ গানের ক্লাসে যাচ্ছে তখন দাদুকে দেখল থমথমে মুখে বসে থাকতে।মৌ এর সামনেই তার বাবা-মাকে ডেকে বললেন, "শোনো ঝুমা-সুস্নাত; মৌ মামণি তোমাদের সন্তান অবশ্যই তোমরা তার ভালো বুঝবে কিন্তু এগুলো কি শেখাচ্ছো মেয়েকে? এসব শিখে কি লাভ ওর পরবর্তী জীবনে?তোমরা কি বংশের পরম্পরা ভাঙতে চাইছো? এইসব না শিখিয়ে, অন্য ভাল কিছু শেখাও বুঝলে ! এমনিতেই তো.....” ব্যস , তারপর থেকে তার বাবা-মা আর সাহস করেননি । দাদুও অনেক খুশি হয়েছেন । কোলের কাছটিতে বসিয়ে শুধু পড়াশোনা ছাড়া আর অন্য কোনদিকে মন না দিতে বুঝিয়ে বললেন সাথে পরীক্ষা দেবার জন্য মৌকে একটা দামী স্টাইলো পেন কিনে দিলেন। এখন শুধু মায়ের সাথে সাথে স্কুল , কোচিং আর বাসায় যাওয়া আসা করে মৌ !
মৌ এর বন্ধুরা যখন ড্রেস,কস্মেটিক পার্লার,মুভি,গেম অথবা ডিস্কভারি চ্যানেলের কোন একটা বিষয় নিয়ে তর্কে রত ! কিংবা কে কি কিনেছে ,কোথায় গিয়েছে ,কে কাকে কি উপহার দিয়েছে, সবকিছু নিয়ে একে একে সবাই মেতে ওঠে আড্ডায় । সে তখন নীরবে বইয়ের মাঝে মুখ লুকিয়ে কান খাড়া করে সব কিছু শুনে যায়।তার মাঝে কিছুটা ভয় কাজ করে; সেটা হল , বন্ধুরা বইয়ের বাইরের কোন বিষয়ে কিছু যদি তাকে জিজ্ঞাসা করে বসে , তাহলে সে কিছুই বলতে পারবে না ।মৌ ভাবে “ইসসস্ ওদের কত মজা,কত খেলনা আছে,কত ধরনের গেম আছে কিন্তু তার ...!”সবাই বাবা মায়ের সাথে ফ্যান্টাসি পার্কে যায় । পিত্জা , ম্যাক্, ফ্রাই কত কি খায় ! আর মৌ শুধু এসব বইয়ের মাঝে পড়ে! অবশ্য মাঝে মাঝে বাবা মায়ের সাথে নিজের দাদুর বাড়ীতে যায় , তবে সেখানেও বোঝা হয়ে ঠিকই সাথে থাকে বইয়ের ব্যাগ !
মৌ এর বাড়ীতে পড়াতে আসেন যে স্যার তিনি খুব ভাল ।দু'দিন পর পর কোন বিষয় বোঝাতে গিয়ে একটা করে ছোটদের গল্পের বই এনে দেন আর সে তা পড়া শেষ করে আবার স্যারকে দিয়ে দেয় ! মৌ ভাবে তার এই বর্ণহীন জীবনে গল্পের বই পড়েও তো সে অনেক জ্ঞানার্জন করছে ! হয়তো বা আধুনিকতার কিছু কিছু দিক তার অজানাই রয়ে গেছে । কিছুটা পিছনে পড়ে আছে সে ! কিন্তু তার যে কি হয়েছে এখন, শুধু পড়তে ভাল লাগে না।বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে,গল্প করতে ইচ্ছে করে ,সাজতে ইচ্ছে করে । অথচ এসব কিছুতেই সে অংশ নিতে পারবে না !
একদিন রেডিওতে পরপর কয়েকটা জোকস্ শুনে ভীষণ হাসছিলো মৌ। বাবা এসে তাই দেখে মৌকে বকা দিয়ে বলেছিলেন
-“যাও পড়তে বস ! সারাদিন শুধু রেডিও শোনা আর হি হি করে অহেতুক হাসা ! পড়াশুনা কিচ্ছু নেই ! এবার পরীক্ষায় লাড্ডু পাবে! লাড্ডু”। সেই থেকে আর রেডিও শুনতে সাহস করেনি মৌ । তারপর একদিন রেডিও শুনতে গিয়ে দেখে ব্যাটরী গুলো সব খুলে রাখা হয়েছে !
মৌ এর এক জন্মদিনে বাবা-মা সুন্দর জামা , জুতো কিনে দেয় আর স্যার তাকে একটা বারবি ডল উপহার দেয় ! একদিন সে পুতুলটাকে নিয়ে গুন্ গুন্ করে মায়ের মুখে শোনা একটা গান গাইছিল , ওমনি মা ঘরে ঢুকে পুতুলটা কেড়ে নিয়ে রেগে বলে
- “এত্ত বড়ো মেয়ে,এই বয়সে পুতুল খেলে ! এখন কি পুতুল খেলার সময় ! যাও লেখাপড়া কর !” মৌ ভেবেই পায়না সে আর কত লেখা পড়া করবে ! আগে যে কোন জিনিস দু একবার পড়লেই মনে রাখতে পারতো কিন্তু এখন কত পড়ে তবু মনে রাখতে পারে না ! কিন্তু বাবা মাকে এই কথা কোন ভাবেই বলা যাবে না , তাহলে তাঁরা তাকে খুব বকবে ।
এভাবেই মৌ কেবলমাত্র পাঠ্য বইয়ের আধিক্যতা অর্জন করে এবং বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে এক রকম কুণ্ঠা বোধ আর জড়তা নিয়ে বেড়ে ওঠে । এমন করেই পার হয়ে যায় তিনটি বসন্ত !
বসন্তের কথা মনে উদয় হতেই তার চোখে ভেসে ওঠে ছোটবেলার হলুদ শাড়ী , হলুদ গাঁদা , কৃষ্ণচূড়া ইত্যাদি ; তখনও তার ভুবন এতটা বেরঙ্ হয়নি। এখন এগুলো তার জীবনে সবই বইয়ের দৌলতে আর কান পেতে শোনা , তার পরম স্বপ্নবিলাস ! শুধুই কল্পনার সোনা ঝরা ফাগুনের দিন ! যার স্পর্শ এই নব যৌবন ক্ষণে অলৌকিক অদৃশ্য শক্তির আকর্ষণে মৌকে কি এক রোমাঞ্চকর সোপানের দিকে যেতে বড় বেশী কাছে টানে ! তার এই অনুভূতি যেন চোখের পাতায় লেখা , আর তাই সে সব সময় লজ্জা বোধ করে ।
ইদানীং বন্ধুরা নতুন বিষয় নিয়ে আলোচনায় মুখরিত ঝড় তোলে ! টাচ্ ফোন , কম্পিউটার , ফেসবুক , হোয়াট্সঅ্যাপ ,কার কতজন বন্ধু হয়েছে , কে কটা এস্.এম্.এস্. পেয়েছে ইত্যাদি।মৌ একদিন স্কুল থেকে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে
-“মা আমাকে একটা টাচ্ ফোন কিনে দেবে ?” মা যেন আকাশ থেকে পড়ে।
- “তোর সাহস কত বড়! এই বয়সে টাচ্ ফোন কেনার কথা বলিস !”
“কেন মা ? আমাকে তো কম্পিউটারের ক্লাস করতে হয় । টাচ্ ফোনে নাকি কম্পিউটারের মতই শেখা যায় আর কম্পিউটারও তো বাসায় নেই বলে আমি অন্যদের মত করে শিখতে পারছি না ,তাই নম্বরও...”। -গাল ফুলিয়ে কথাগুলো বলে মৌ ।
-“থাক ! এই একটা বিষয়ে কম নম্বর পেলে অসুবিধা নেই ! ঐ মরবার যন্ত্র বাসায় এনে কি শিখবে তা আমার ভালোই জানা আছে । পেপারে যা খবর বের হচ্ছে দিন দিন তা আর...” মা শেষের কথাগুলো বিড়বিড় করে বলে তাই কিছুই শুনতে পায়না মৌ ।তাঁর আর মোবাইলের কথাটা বলার সামান্যতম ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই হয় না কিন্তু মনে প্রশ্ন থেকেই যায় “কি আছে খবরের কাগজে?” পেপার থাকে বাবার কাছে ।মৌকে কেউ পেপারটা পর্যন্ত পড়তে দেয় না । বাবা বলে,
-“ পেপারে শুধু ধর্ষণ , মারামারি ,খুন , সড়ক দুর্ঘটনা এই সব দিয়ে ভরা ! টাকা দিয়ে আর ভয় ,আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা কিনতে চাই না ! সকালটাই শুরু হয় মন খারাপ দিয়ে । ভয় হয় , এই যে বাসা থেকে বের হচ্ছি সুস্থ ভাবে ফিরে আসতে পারবো তো ! মেয়েটার কোন বিপদ হবে নাতো...!” মাকে বলা কথাগুলো মনে বেশ গেঁথে আছে তার ।
কখনো কখনো অযাচিতভাবেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় মৌকে! সেদিন যেমন ক্লাসের বন্ধুরা শাহরুখ খানের ছবি “রা–ওয়ান” নিয়ে ভীষণ ভাবে অপমান করে তাকে ! ওরা ভাবে ওতো শাহরুখ খান কে, তাই জানে না । সেখানে “রা–ওয়ান” কি, তা কিভাবে জানবে ! স্যারের এনে দেওয়া কোন বইতে তো এই নিয়ে সে কখনো পড়েনি ! সবাই তাকে কেমন যেন ভাবে ! ত্বিষা তো মুখ ভেংচে বলেই ফেলল
- “ওহ মাই গড, শি ইজ সো ডাম্ব !শি ডাজন্ট ইভেন নো দ্য লিট্ল সিম্পল থিংস্, শিট...!” মুখ দিয়ে বিশ্রী শব্দ করে সে । এই কথার মাঝে ঘি ঢালে জিনিয়া
-“ ইউ নো হোয়াট - সি’জ সো এনোইং…..আই বেট শি ডাজন্ট ইভেন নো হু বিন লাদেন ইজ ...?! হা হা হা এবার কথার রেশ ধরে লেখা বলে
-“ ছিঃ ! দিস ষ্টুপিড গার্ল ডাজন্ট নো এনিথিং অ্যাবাউট দিস্ ওয়ার্ল্ড ! সেভ মি গড্...হি হি হি হা হা হা " সবাই সে হাসিতে যোগ দেয় ! মৌ কিছুই বলে না মাথা নীচু করে মুখ ঢেকে রাখে; প্রিয় গল্পের স্টাইলাস বই দিয়ে ! আসলেই সে “বিন লাদেন” কি জানে না ! সবার দুচোখের সীমানা জুড়ে বয়ে চলে রঙিন বর্ণমালা ! যা দেখলেই অনায়াসে পড়ে ফেলা সম্ভব ! কিন্তু তার....!! মাঝেমাঝে ডাক্তার আঙ্কেল কে যখন দেখাতে যায় তখন বাবা আর মা কে দেখে বিমর্ষ হয়ে থাকতে...সীসের মতো কিছু কথা গরম হয়ে ঢোকে তার কানে,"...আর কিছুদিন...."
তাই সে লজ্জা আর ভয়ে মাথা নীচু করে চোখ মাটিতে রেখে সবাইকে পাশ কাটিয়ে চলে । পাছে সবাই তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলে ।যদিও তার হরিণী দু’চোখ জুড়ে মোটা কাঁচের দেয়াল !
নিজেকে অনেক বেশী বেমানান মনে হয় এই স্কুলটাতে , এই জগতের সমবয়সী মানুষগুলোর সাথে ! দু একজন যে ব্যতিক্রম নেই টা নয় ,আছে । তবে তাঁরাও নীরব থাকে ঠিক মৌ এর মত করেই ! পড়াশোনার প্রতি একেবারেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে মৌ । ক্লাসের পরীক্ষাগুলোতে মৌ আগের মত একশোতে একশো পায়না ! বাবা মা , বাড়ীর স্যার এমন কি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও মৌকে বকতে থাকে ! তাকে নিয়ে তাঁদের সবার অনেক আশা ,অনেক স্বপ্ন ! হেডস্যার বাবাকে ফোন করে ডেকে এনে কি সব যেন বলে । আর তাই বাড়ীতে ফিরেই বাবা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে -
-ছিঃ ছিঃ ! কোনদিন ভাবিনি আমার মেয়ের কারণে আমাকে কেউ ডেকে নিয়ে বলবে যে , আপনার মেয়ে এমন রেজাল্ট করলে এই স্কুলে রাখা সম্ভব নয় !
একধরণের অপমানিত বোধ করেন সুস্নাতবাবু । ভীষণভাবে মন খারাপ করে থাকেন তিনি । মৌ এর সাথে সাথে তার মাকেও ভীষণভাবে বকাবকি করেন !
মৌ এর মনে হয় বাবা বা মা খাবার সময়েই যেন একটু অতিরিক্ত আদর করেন ! দুজনেই মুখে তুলে খাইয়ে দেন ! বাবা মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে পড়াশুনা করলে কি হবে , না করলেও তার ফল কতটা ভয়ংকর হবে তাই নিয়ে খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলেন । কিন্তু রাগারাগির পরে কেউ আর মৌকে খেতে ডাকেন না ! দুজনেরই কথা “পড়াশুনা তাঁদের মনের মত না করলে তাকে কেউ খেতেও দেবে না !” সেও রাগ করে আর খেতে যায়নি ! না খেয়ে নির্ঘুম রাত কাটায় । ওদিকে সুস্নাতবাবু ও ঝুমাদেবী দুজনেই খাওয়াদাওয়া রেখে , মেয়ের ভবিষ্যতের আশংকায় ভাষাহীন নীরবে দীর্ঘ রাত পাড়ি দেন ।
ইদানীং মৌ এর জানালার কাছে নাম না জানা একটা পাখি এসে বসে ! সে অনেক খুশি হয় । মৌ মন খুলে পাখির সাথে অনেক কথা বলে ! ভালোবেসে পাখীটার নাম দেয় ভোরাই ।সেও তাকে দেখতে আসে প্রতিদিন । স্কুলে যাবার আগে ও স্কুল থেকে এসেই মৌ খাবার নিয়ে অপেক্ষা করে প্রিয় বন্ধুটির জন্য ! ভোরাই মৌকে একটুও ভয় পায়না ! সে মৌ এর বিছানায় বসে ,আর মৌ হাত বুলিয়ে আদর করে দেয় ভোরাই এর গায়ে আর লেজটাতে ! কিছুটা ভাললাগে মৌ এর । কিছুদিন ধরে অকারণেই তার দমবন্ধ হয়ে মরে যাবার একটা তীব্র জ্বালা ছিল মনে,এখন তা কিছুটা উপশম হয়েছে ! নিভে আসছে তার চারপাশের আলো বুঝতে পেরেই মৌ বাবা মা যাতে বুঝতে পারে সে ক্লাসের পড়াশুনা করছে , তাই মনের সব না বলা কথাগুলো ছোট্ট ছোট্ট স্টাইলো অক্ষরে জায়গা দেয় একটা খাতায় । এমনকি বাবা মায়ের অতিরঞ্জিত , অহেতুক শাসন , সামর্থ্য না থাকা স্বত্বেও কষ্ট করে অভিজাত স্কুলে ভর্তি করা , মৌ এর প্রতি বিশ্বাস নেই বলে সব সময় হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত থাকা , আরো অনেক বিষয় যা অন্য সবার ভাবনাকেও হার মানায় ! সব কথা অতি যত্নসহকারে সুন্দর করে লিখে রেখেছে ! এভাবেই তার শৈশব , কৈশোর সবকিছু শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য নিহিত থাকবে , এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না ! কিন্তু ভোরাইকে পেয়ে মৌ মনের অনুভূতি গুলো লিখতে ভুলে গেছে । সে এখন যেন এক বাধাহীন খুশীর ঝর্ণাধারা !
- “জানিস ভোরাই ! আমার না এত পড়তে ভাল লাগে না ! আমার সবার মত বেড়াতে ইচ্ছে করে , বাবা মায়ের হাত ধরে ফ্যান্টাসিয়াস-এর সব স্বাদ নিতে ইচ্ছে করে ! স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে ,আমিও তো বন্ধুদের মত বড় হয়েছি ! বাবা বলে আমাকে ডাক্তার হতে হবে । আর মা বলে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। কিন্তু জানিস -আমার না খুব শখ আমি একজন আর্টিস্ট হব ! সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকবো আর সারা দেশ ঘুরে ঘুরে অনেক অনেক ছবি তুলব ! প্রকৃতির লীলাভূমির সৌন্দর্য আমার হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখে ক্যানভাসে রং তুলির সজ্জায় জীবন দেব । নীলের মাঝে সাতরঙা ঘুড়ির ঢেউ খেলানো পালে সোনালী রোদের আলো ,আর ফুলের হাসিতে পৃথিবী সাজাবো ! কিন্তু কি করে তাই ভাবি! আমার জীবনে আলো যে খুবই অল্প !”কথাগুলো বলে হাঁপিয়ে যায় সে । আজ যেন বাঁধনহারার দিন ।অদম্য উৎফুল্লতার জোয়ারে মেঘের ভেলায় নেচে যায় মৌ! একটু দম নিয়ে আবার শুরু করে
-“সবাই যখন ইতিহাস ভুলে যাবার আদিমতায় মেতে উঠবে , আমার আঁকা ছবি তখন কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে ! এই দেখ আমি তোর ছবি এঁকেছি !” একটা কাগজ দেখিয়ে বলে “এই দেখ এইটা আমি আর আমার হাতের উপর এই দেখ দেখ , এইটা তুই বসে আছিস ! আমার যে তোর মত করে উড়তে ইচ্ছে করে !” মন এবার খারাপ হয়ে যায় ! মৌ এর কথার শব্দে ঘরে ঢোকে বাবা ! চিৎকার করে মাকে ডাকে
-“ঝুমা ! ঝুমা !” মা ঘরে ঢুকতেই বাবা রেগে বলে
-“এই পাখীটা কোথা থেকে এলো ! এই জন্য মেয়ে রেজাল্ট খারাপ করছে ! সারাদিন বাসায় থেকে কি কর ? একটা মেয়ে তার দিকেও খেয়াল দিতে পারো না ! সে পড়াশুনা বাদ দিয়ে কোথাকার একটা পাখীর সাথে বকবক করেই যাচ্ছে !" বাবাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই ভোরাই উড়ে চলে যায় । সেই সময়ই বাবা জানালাটা পর্দা দিয়ে ঢেকে দেয় , যেন পাখীটা আর না আসতে পারে । মৌ এর এখন আর কিছুই ভাল লাগে না । স্কুলে যেতে মন চায় না । ভোরাই এর জন্য আকুলতায় দিনগুলো হয় দীর্ঘায়িত ! নাওয়া-খাওয়া একরকম ছেড়েই দিয়েছে মৌ। উদাসী হাওয়ায় অনিচ্ছাকৃত ভাবেই সে তার ভারী মনটাকে বয়ে নিয়ে চলে !
কি ঝড় , অথবা বৃষ্টি , মৌ যেদিন থেকে স্কুলে যায় সেদিন থেকে আজ অব্দি একটা দিনও স্কুলে অনুপস্থিত থাকেনি ! স্কুলে ১০০% উপস্থিত থাকার সেরা সার্টিফিকেটটিও মৌ ই সব সময় পেয়ে এসেছে ! ভোরাই চলে যাওয়ার পরের সপ্তাহে একদিন সকালে মৌ এর খুব জ্বর এবং প্রচন্ড মাথায় ব্যথা ,তাই শুয়ে আছে । মা ঘরে ঢুকে তাকে শুয়ে থাকতে দেখে বলে ওঠে-
-“আরে তুই এখনো বিছানায় ! যা রেডি হয়ে স্কুলে যা”। কি এক অভিমানে কিছুই বলে না মৌ ! সে সত্যিই জ্বর নিয়ে স্কুলে যায় ।দুই ঘণ্টা যেতে না যেতেই এক শিক্ষিকার ফোনে মৌ এর অস্বাভাবিক আচরণের ও চোখের যন্ত্রণার জন্য "চোখের আলো" নামক আই ফাউণ্ডেশনে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে,যেখানে মৌকে চোখ দেখাতে প্রায়ই যেতে হতো সেখানে বাবা-মা ছুটে যায় । রিকশায় করে যেতে যেতে ঝুমা আর সুস্নাত বুকের ধন মৌ এর জন্য অস্থির হয়ে ওঠে । দুজনেই সিদ্ধান্ত নেয় নাহ্ আর নয় ! এবার থেকে মৌ এর মতো করেই তারা মৌকে চলতে দেবে। মেয়েকে কষ্ট করে হলেও একটা ভাল স্কুলে দিয়েছে কিন্তু আর কিছুই তো করতে পারছে না মেয়েটার জন্য ! যে বেতন তা দিয়ে বাবা মাকে টাকা পাঠিয়ে, মৌ এর পড়াশোনার জন্য খরচ করে ,যা থাকে তাতে মাসের পঁচিশ দিনও সংসারের খরচ যায় না ।দুজনেরই বড় সাধ মেয়ে তাদের লেখাপড়া শিখে যেন নিজের পরিবারটাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করতে পারে ! দুজনেই মেয়ের দুশ্চিন্তায় বারবার ভগবানের কাছে দুহাত তুলে করুণা ভিক্ষা চায় , যেন মৌকে তিনি সুস্থ রাখেন । দুজনেই ফাউণ্ডেশনে পৌঁছে সোজা মৌ আছে সেই রুমে দৌড়ে যায় আর তখন দেখে মৌ ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে কি যেন বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলছে ! সুস্নাত আদর মাখা কণ্ঠে ডাকে-
-“মৌ মামণি ! মাগো...” হাতটা ধরতেই ছাড়িয়ে নেয় মৌ ! বাবা মাকে চিনতেই পারে না সে ! শুধুই ভোরাইকে খুঁজে বেড়ায় আর তার বুকের মাঝে যখের ধনের মত আঁকড়ে ধরে রাখা সেই স্টাইলাস নোটবুকটি । যার প্রতিটি পাতায় জায়গা করে নিয়েছে মৌ এর অপূর্ণ ভালোবাসা । সুপ্ত মনের চাওয়া-পাওয়া , রূপকথার কাহিনী ! সে কাল রাতেও শেষ দুটি লাইন লিখেছে-
"ভোরাই , আমিও তোর মত স্বাধীন হব
মুক্ত ডানা মেলে,বিশ্বজগত দেখে নেব !"
ডঃ ভোরা এগিয়ে আসেন,সুস্নাত আর ঝুমাকে দেখে বিষাদে দুদিকে মাথা নেড়ে বলে ওঠেন - "শি ইজ টোটালি ব্লাইণ্ড নাও".....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন