আত্ম-অতীত
------------------
কাহিনীকার-স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
--------------------------------------------
বর্ষণ-ঝঞ্ঝামুখর রাত । না, কথাটা যথার্থ হলো না । বাইরে যা হচ্ছে তার নাম মহাপ্রলয় । সামনে প্রহরীর মতো কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছদুটি নুয়ে পড়েছে । আমগাছটাও গতাসু হয়েছে পশ্চিমের টিনের চালার ঘরের উপর । কোত্থেকে একটা টিন উড়ে এসে নতুন মোচা আসা কলাগাছটাকে চিরে দুভাগ করে দিল ।
এমন ঝড় বৃষ্টির রাতে আমাকে একা ফেলে সবাই চলে গেছে ! হতবিহ্বল আমি ছুটতে আরম্ভ করলাম । ছুটতে ছুটতে একসময় চলে এলাম একটা খোলা মাঠে । চিৎকার করে ডাকতে লাগলাম বিভিন্ন প্রিয়জনের নাম ধরে । কিন্তু বাতাসের গায়ে ধাক্কা পেয়ে বারবার ফিরে আসছিলো আমার চিৎকার ।
আবার ছুটতে শুরু করলাম । সামনে একটা গহীন সবুজ অরণ্য । এখানে আকাশ ছোঁয়া সব গাছ । দীর্ঘ থেকে
দীর্ঘতর বনপথ । আকাশ জুড়ে বাজছে ঝড়ের জগঝম্প; তবলার মত । তানপুরার মত জলে জলে শব্দ তুলছে বৃষ্টিসঙ্গীত । সবুজের বুক চিরে রক্তাক্ত পায়ে এসে থামলাম একটা প্রকান্ড বাড়ির দরজার সামনে । ভয়ে আড়ষ্ট অভিভূত আমি ক্রমাগত করাঘাত করতে করতে দরজায়। একসময় দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম ।
শান্ত সৌম্য চেহারার একজন বয়স্কা দাঁড়িয়ে দরজার ওপাশে । সাদা তাঁতের ওপর গাঢ় সবুজ শাল গায়ে । এমন বিমর্ষ অনবদ্য নীল চোখ, মজবুত চোয়াল, এমন সুগঠিত শরীর । যেন সামনে দাঁড়ানো কোন গ্রীক দেবী ।
- ভেতরে এসো কল্যাণী ।
এর আগেও অনেকে আমার নাম ধরে ডেকেছে আমাকে । কিন্তু একি অদ্ভুত অনুরণন তার কন্ঠস্বরে, একি সীমাহীন স্বপ্নজাগানো ধ্বনি ! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত বাড়ির ভেতরে চলে এলাম ।
ঢুকতেই মুখোমুখি একটা বড় আয়না । মৃদু আলোয় আয়নায় আমি আমার যেন একখন্ড সবুজ অবয়ব দেখলাম ।
হাজার বছরের বেশি আমি হেঁটেছি তার ছায়ার সঙ্গে মনে হল। খুব ইচ্ছে হলো তাকে বলি মনের এই কথাটা । কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না ।
- আপনি একাই থাকেন ?
চোখ তুলে তাকালো সে । মিষ্টি করে হাসলো । কি জানি কি অর্থ এই রহস্যময় হাসির ? একটু আগে যে ভয় আমাকে গ্রাস করে, বিমূঢ় করে রেখেছিলো, মনের কোণে এখন তার কোন অস্তিত্বই নেই । মনে হলো যা
কিছু ঘটছে এর সবকিছুই স্বাভাবিক ; পূর্বনির্ধারিত ।
- আমি জানতাম তুমি আসবে । তাই এতো আয়োজন ।
- আর কি কি জানতেন ?
- অনেক কিছু ।
- যেমন?
- প্রায় তোমার ইচ্ছে করে কোন গহীন অরণ্যে হারিয়ে যেতে । তোমার ইচ্ছে করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পৃথিবী দেখতে । একদিন সব কিছু ছেড়ে কোন এক উঁচু, অতিকায়, মহান এক পাহাড়ের টানে তুমি চলে যাবে বলে ভেবেছো।সে দিনটি হবে তোমার জন্মদিন ।
- তোমাকে কি এর আগেও আমি দেখেছি কোথাও ?
- দেখেছো । কোজাগরীর জ্যোৎস্না ভাসা রাতে, চৈত্রের ভয়ঙ্কর নির্জন দুপুরে, একাকীত্বে।প্রতিটা জন্মদিনে যখন তুমি শহরের সবচেয়ে উঁচু ছাদে বসে একা কাঁদতে । খুব সকালে তোমার জানালার গায়ে যে মেঘ জমতো, সে সব মেঘের গায়ে । একাকীত্বের বিষণ্ণতায় অনেকগুলো ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছিলে যখন।মনে হয়েছিলো, জীবনের সে কি অপার পাওয়া, সুখের কি অফুরন্ত সম্ভারময় এই জীবন । ভুলের অনুশোচনায় বারবার ইচ্ছে করছিলো পৃথিবীতে ফিরে আসতে । তখন জীবনে ফিরে আসার পথটা জুড়ে আমারই হাত আঁকড়েছিলে ।
এখন চিনতে পেরেছি তাকে । চিনতে পারার সাথে সাথে ভয়ঙ্কর একধরনের ভালোলাগা ছুঁয়ে গেলো আমাকে ।সে এত বেশিবার আমার সাথে হেঁটেছে, কথা বলেছে আমার ছায়ার সাথে;আমি ভুলে গেছি বাস্তব-অবাস্তব-স্বপ্নের পার্থক্য।
- তুমি কেমন করে এলে এখানে ?
- যেমন করে তুমি এসেছো । ইঁট-কাঠের কদর্য পৃথিবীতে একটু নিশ্বাসের জায়গা হয়নি । এক রত্তি সবুজের অভাবে মরে যায় যে হৃদয়, যে প্রাণ ছেড়ে আসে জীবনের হাত, তারা তোমার-আমার মত অরণ্যের সবুজে আসে পুনর্জনমে ।
....
.......
.........
- এই যে শুনুন ; শুনতে পাচ্ছেন ? ভিজে
গেলেন তো ! এই যে আপনাকে বলছি ...
এভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানি না । ট্রেনের জানালায় হাতের উপর চিবুক রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । বাইরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে । বাতাসে উড়ছে ভেজা বিস্রস্ত চুল । চোখে এখনো লেগে আছে সেই বিনোদিনী স্বপ্ন । হাজার রাতের অন্ধকার নেমেছে বাইরে, ভয়ঙ্কর কালো জলের মত স্থির । ছুটছে শুধু ট্রেন । ভাসছি কেবল আমি । ট্রেনের সাথে সাথে ছুটে চলছে বত্রিশটি বছরের অতীত । কিংবা অতীত খুলে দিয়েছে বর্তমানের দুয়ার ।
ছোটবেলায় খুব ছোট একটা বাড়িতে থাকতাম । সেখানে কোন বারান্দা, কোন ছাদ ছিল না, ছিল না একটু উঠানও । এসবের বদলে বাবার হাত-মায়ের আঁচলকে আকাশ ভেবে জড়িয়ে ধরে থাকতাম সারাক্ষণ । তাদের সাথে বৃষ্টির ফোঁটার মত অবিরাম ঝরতো আমার কথার মেঘমালা ।
বিয়ের পরে বড় একটা বাড়ীতে এলাম । এখানের সব কিছুই বেশি রকমের বড়, প্রয়োজনের তুলনায়। চারদিকে খোলা বারান্দা, দিগন্তের মত মস্ত বড় ছাদ। এতো কিছুর মাঝে ধীরে ধীরে আমি হারিয়ে ফেললাম সব পুরোনো । এতো বড় বাড়িতে একা ছুটোছুটি করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম । এতটুকু আমি, এক রত্তি , আকাশের মত বিরাট ছাদে বড্ড একা লাগতো আমার । আমার সমস্ত গল্প একে একে জমতে শুরু করলো আমার ঘরের দেয়ালে, জানালার কাঁচে, দামী আসবাবপত্রের স্তুপে ।
বিয়ে হয়েছে ছ'বছর হয়েছে । ও একটা কর্পোরেট ফার্ম চালায়। তাই ছুটি পায়না একদম ।
আমার সামনের সীটে যে মেয়েটি বসে আছে, সাধারণ একটা মেয়ে । কি সুখী চেহারা মেয়েটির !
আমাদের প্রকাণ্ড বাড়ি আমাকে কখনো সুখী করতে পারেনি । শহরের ব্যস্ততম সড়কের পাশে আকাশের কাছাকাছি একটা বিশাল ফ্ল্যাট আমাকে এতটুকু স্বস্তি দিতে পারেনি । ছোটবেলায় পাশের বাড়ির টুসির মতো একটা খেলনা গাড়ির খুব লোভ হয়েছিল । বাবা আমার
জন্মদিনের উপহার হিসেবে গাড়িটি কিনে দিয়েছিলেন । সেদিনের আনন্দের কথা আমার অহোরাত্র জানে । তারপর প্রতি বছর নতুন নতুন মডেলের গাড়ি কেনা হত আমার জন্য । কিন্তু সেই লাল-সবুজ খেলনা গাড়ি, আমার আনন্দ দেখে বাবার চোখের সেই মুগ্ধতা আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না । প্রায় রাতে বাবার কোলে গল্প শুনে গভীর আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে থাকার মত নিরবিচ্ছিন্ন ভালবাসার দিন-রাত আমাকে কেউ ফিরিয়ে দেবে না ।
দুঃখগুলো পেকে ঝুনো নারকেল হয়েও খসে পড়ে না কেন ? অথচ সুখের বেলায় ঠিক উল্টোটা । টুসটুসে হওয়ার আগেই অবেলায় আঁকশিতে হ্যাঁচকা টান । জীবন এমন কেন ? প্রাণটাকে একলা ফেলে সুখের হাত ধরে পালিয়ে যায় স্বার্থপরের মত ।
- কোথায় যাবেন আপনি ?
সামনের সীটে বসা মেয়েটি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । নিবিড়ভাবে তাকিয়ে দেখছে আমার অবয়ব । বাইরে যে ঝড় বইছে তার প্রলয় এলোমেলো করে দিচ্ছে আমার চুলের বিন্যাস ।ট্রেনের জানালাটা তারপরও বন্ধ করতে ইচ্ছে করছে না ।
- কি জানি? একেবারে দক্ষিণে গিয়ে থামবো । শুনেছি সাগরে পা ভেজালে মন শান্ত হয় ।
মেয়েটা অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছে। থাকুক, অবিশ্বাসের সম্মুখীন হলেই মানুষের বিশ্বাস দৃঢ় হয় । আমি আবার জানালার বাইরে মাথা বের করে দিয়ে বসলাম । এটা আমার দ্বিতীয় জীবন । কাল রাতের ঘটনার গ্লানি মুছে যেত যদি আমার প্রাণটা সতের তলায় নিঃশেষ হয়ে যেত। কিংবা পাখির পালকের মত উড়ে উড়ে মাটিতে এসে মিশত শরীরটা।
জানি না কি হলো আমার । মনে হলো মৃত্যু মানেই তো হারিয়ে যাওয়া । আড়াল হয়ে যাওয়া । অপরিচিত পৃথিবীতে জন্ম নেয়া । মন্দ কি, আমি যদি আর না ফিরি এই গুরুত্বহীন জগতে ।
অনেক সময় নিয়ে স্নান করলাম । শরীরের যেখানে যেখানে জানোয়ারের ছোঁয়া লেগেছে সেখানে ধুয়ে মুছে সাফ করার ব্যর্থ চেষ্টা । শাওয়ারের নীচে
কিছুক্ষণ মন হালকা করে কাঁদলাম । শেষ যেবার ভ্রমণে প্যারিস গিয়েছিলাম সেখান থেকে কিছু দামী সুগন্ধী কিনেছিলাম । সেগুলো সারা শরীরে ছড়িয়ে দিলাম । যেন সেই সমুদ্রপারের কাহিনী । জীবনানন্দের একটা কবিতা মনে পড়লো-
....যতবার মন ছিঁড়ে গেছে, হয়েছে দেহের মতো হৃদয় আহত,
যতবার উড়ে গেছে শাখা, পাতা পড়ে গেছে যত—
পৃথিবীর বন হয়ে — ঝড়ের গতির মতো হয়ে,
বিদ্যুতের মতো হয়ে আকাশের মেঘে ইতস্তত;
একবার মৃত্যু লয়ে — একবার জীবনের লয়ে
ঘূর্ণির মতন বয়ে যে বাতাসে ছেঁড়ে — তার মতো গেছি বয়ে !
কাল রাতে যে লোকটি আমার সারা শরীর তরতাজা গোলাপের পাঁপড়ি ছিঁড়ে চটকানোর মত রগড়েছে তার সরীসৃপীয় আঙুল আর কামার্ত দৃষ্টি দিয়ে, সে আমার স্বামীর ব্যবসায়ী বন্ধু । সে ফ্ল্যাটে এসেছিলো স্বামীর খোঁজে, যদিও সে জানত এইসময় সে থাকে না । সে জানত এখানে আমার শত চিত্কারেও কোন প্রতিকার হবে না । এর আগেও আমি তার কামনার্ত কুৎসিত দৃষ্টি দেখেছি । দেখেছি আমার বুকে তার দৃষ্টির লালা গড়াতে । আমি জেনে গেছি এই শহরের মানুষ আমার শরীরই দেখেছে কেবল।
বাইরে
তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে । আমার শরীর অনেকটাই ভিজে গেছে । হাওয়ার বেগে ছুটছে ট্রেন । আর ট্রেনের গতির বিপরীতে আমি ফেলে আসছি আমার অতীত ।
------------------
কাহিনীকার-স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
--------------------------------------------
বর্ষণ-ঝঞ্ঝামুখর রাত । না, কথাটা যথার্থ হলো না । বাইরে যা হচ্ছে তার নাম মহাপ্রলয় । সামনে প্রহরীর মতো কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছদুটি নুয়ে পড়েছে । আমগাছটাও গতাসু হয়েছে পশ্চিমের টিনের চালার ঘরের উপর । কোত্থেকে একটা টিন উড়ে এসে নতুন মোচা আসা কলাগাছটাকে চিরে দুভাগ করে দিল ।
এমন ঝড় বৃষ্টির রাতে আমাকে একা ফেলে সবাই চলে গেছে ! হতবিহ্বল আমি ছুটতে আরম্ভ করলাম । ছুটতে ছুটতে একসময় চলে এলাম একটা খোলা মাঠে । চিৎকার করে ডাকতে লাগলাম বিভিন্ন প্রিয়জনের নাম ধরে । কিন্তু বাতাসের গায়ে ধাক্কা পেয়ে বারবার ফিরে আসছিলো আমার চিৎকার ।
আবার ছুটতে শুরু করলাম । সামনে একটা গহীন সবুজ অরণ্য । এখানে আকাশ ছোঁয়া সব গাছ । দীর্ঘ থেকে
দীর্ঘতর বনপথ । আকাশ জুড়ে বাজছে ঝড়ের জগঝম্প; তবলার মত । তানপুরার মত জলে জলে শব্দ তুলছে বৃষ্টিসঙ্গীত । সবুজের বুক চিরে রক্তাক্ত পায়ে এসে থামলাম একটা প্রকান্ড বাড়ির দরজার সামনে । ভয়ে আড়ষ্ট অভিভূত আমি ক্রমাগত করাঘাত করতে করতে দরজায়। একসময় দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম ।
শান্ত সৌম্য চেহারার একজন বয়স্কা দাঁড়িয়ে দরজার ওপাশে । সাদা তাঁতের ওপর গাঢ় সবুজ শাল গায়ে । এমন বিমর্ষ অনবদ্য নীল চোখ, মজবুত চোয়াল, এমন সুগঠিত শরীর । যেন সামনে দাঁড়ানো কোন গ্রীক দেবী ।
- ভেতরে এসো কল্যাণী ।
এর আগেও অনেকে আমার নাম ধরে ডেকেছে আমাকে । কিন্তু একি অদ্ভুত অনুরণন তার কন্ঠস্বরে, একি সীমাহীন স্বপ্নজাগানো ধ্বনি ! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত বাড়ির ভেতরে চলে এলাম ।
ঢুকতেই মুখোমুখি একটা বড় আয়না । মৃদু আলোয় আয়নায় আমি আমার যেন একখন্ড সবুজ অবয়ব দেখলাম ।
হাজার বছরের বেশি আমি হেঁটেছি তার ছায়ার সঙ্গে মনে হল। খুব ইচ্ছে হলো তাকে বলি মনের এই কথাটা । কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না ।
- আপনি একাই থাকেন ?
চোখ তুলে তাকালো সে । মিষ্টি করে হাসলো । কি জানি কি অর্থ এই রহস্যময় হাসির ? একটু আগে যে ভয় আমাকে গ্রাস করে, বিমূঢ় করে রেখেছিলো, মনের কোণে এখন তার কোন অস্তিত্বই নেই । মনে হলো যা
কিছু ঘটছে এর সবকিছুই স্বাভাবিক ; পূর্বনির্ধারিত ।
- আমি জানতাম তুমি আসবে । তাই এতো আয়োজন ।
- আর কি কি জানতেন ?
- অনেক কিছু ।
- যেমন?
- প্রায় তোমার ইচ্ছে করে কোন গহীন অরণ্যে হারিয়ে যেতে । তোমার ইচ্ছে করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পৃথিবী দেখতে । একদিন সব কিছু ছেড়ে কোন এক উঁচু, অতিকায়, মহান এক পাহাড়ের টানে তুমি চলে যাবে বলে ভেবেছো।সে দিনটি হবে তোমার জন্মদিন ।
- তোমাকে কি এর আগেও আমি দেখেছি কোথাও ?
- দেখেছো । কোজাগরীর জ্যোৎস্না ভাসা রাতে, চৈত্রের ভয়ঙ্কর নির্জন দুপুরে, একাকীত্বে।প্রতিটা জন্মদিনে যখন তুমি শহরের সবচেয়ে উঁচু ছাদে বসে একা কাঁদতে । খুব সকালে তোমার জানালার গায়ে যে মেঘ জমতো, সে সব মেঘের গায়ে । একাকীত্বের বিষণ্ণতায় অনেকগুলো ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছিলে যখন।মনে হয়েছিলো, জীবনের সে কি অপার পাওয়া, সুখের কি অফুরন্ত সম্ভারময় এই জীবন । ভুলের অনুশোচনায় বারবার ইচ্ছে করছিলো পৃথিবীতে ফিরে আসতে । তখন জীবনে ফিরে আসার পথটা জুড়ে আমারই হাত আঁকড়েছিলে ।
এখন চিনতে পেরেছি তাকে । চিনতে পারার সাথে সাথে ভয়ঙ্কর একধরনের ভালোলাগা ছুঁয়ে গেলো আমাকে ।সে এত বেশিবার আমার সাথে হেঁটেছে, কথা বলেছে আমার ছায়ার সাথে;আমি ভুলে গেছি বাস্তব-অবাস্তব-স্বপ্নের পার্থক্য।
- তুমি কেমন করে এলে এখানে ?
- যেমন করে তুমি এসেছো । ইঁট-কাঠের কদর্য পৃথিবীতে একটু নিশ্বাসের জায়গা হয়নি । এক রত্তি সবুজের অভাবে মরে যায় যে হৃদয়, যে প্রাণ ছেড়ে আসে জীবনের হাত, তারা তোমার-আমার মত অরণ্যের সবুজে আসে পুনর্জনমে ।
....
.......
.........
- এই যে শুনুন ; শুনতে পাচ্ছেন ? ভিজে
গেলেন তো ! এই যে আপনাকে বলছি ...
এভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানি না । ট্রেনের জানালায় হাতের উপর চিবুক রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । বাইরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে । বাতাসে উড়ছে ভেজা বিস্রস্ত চুল । চোখে এখনো লেগে আছে সেই বিনোদিনী স্বপ্ন । হাজার রাতের অন্ধকার নেমেছে বাইরে, ভয়ঙ্কর কালো জলের মত স্থির । ছুটছে শুধু ট্রেন । ভাসছি কেবল আমি । ট্রেনের সাথে সাথে ছুটে চলছে বত্রিশটি বছরের অতীত । কিংবা অতীত খুলে দিয়েছে বর্তমানের দুয়ার ।
ছোটবেলায় খুব ছোট একটা বাড়িতে থাকতাম । সেখানে কোন বারান্দা, কোন ছাদ ছিল না, ছিল না একটু উঠানও । এসবের বদলে বাবার হাত-মায়ের আঁচলকে আকাশ ভেবে জড়িয়ে ধরে থাকতাম সারাক্ষণ । তাদের সাথে বৃষ্টির ফোঁটার মত অবিরাম ঝরতো আমার কথার মেঘমালা ।
বিয়ের পরে বড় একটা বাড়ীতে এলাম । এখানের সব কিছুই বেশি রকমের বড়, প্রয়োজনের তুলনায়। চারদিকে খোলা বারান্দা, দিগন্তের মত মস্ত বড় ছাদ। এতো কিছুর মাঝে ধীরে ধীরে আমি হারিয়ে ফেললাম সব পুরোনো । এতো বড় বাড়িতে একা ছুটোছুটি করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম । এতটুকু আমি, এক রত্তি , আকাশের মত বিরাট ছাদে বড্ড একা লাগতো আমার । আমার সমস্ত গল্প একে একে জমতে শুরু করলো আমার ঘরের দেয়ালে, জানালার কাঁচে, দামী আসবাবপত্রের স্তুপে ।
বিয়ে হয়েছে ছ'বছর হয়েছে । ও একটা কর্পোরেট ফার্ম চালায়। তাই ছুটি পায়না একদম ।
আমার সামনের সীটে যে মেয়েটি বসে আছে, সাধারণ একটা মেয়ে । কি সুখী চেহারা মেয়েটির !
আমাদের প্রকাণ্ড বাড়ি আমাকে কখনো সুখী করতে পারেনি । শহরের ব্যস্ততম সড়কের পাশে আকাশের কাছাকাছি একটা বিশাল ফ্ল্যাট আমাকে এতটুকু স্বস্তি দিতে পারেনি । ছোটবেলায় পাশের বাড়ির টুসির মতো একটা খেলনা গাড়ির খুব লোভ হয়েছিল । বাবা আমার
জন্মদিনের উপহার হিসেবে গাড়িটি কিনে দিয়েছিলেন । সেদিনের আনন্দের কথা আমার অহোরাত্র জানে । তারপর প্রতি বছর নতুন নতুন মডেলের গাড়ি কেনা হত আমার জন্য । কিন্তু সেই লাল-সবুজ খেলনা গাড়ি, আমার আনন্দ দেখে বাবার চোখের সেই মুগ্ধতা আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না । প্রায় রাতে বাবার কোলে গল্প শুনে গভীর আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে থাকার মত নিরবিচ্ছিন্ন ভালবাসার দিন-রাত আমাকে কেউ ফিরিয়ে দেবে না ।
দুঃখগুলো পেকে ঝুনো নারকেল হয়েও খসে পড়ে না কেন ? অথচ সুখের বেলায় ঠিক উল্টোটা । টুসটুসে হওয়ার আগেই অবেলায় আঁকশিতে হ্যাঁচকা টান । জীবন এমন কেন ? প্রাণটাকে একলা ফেলে সুখের হাত ধরে পালিয়ে যায় স্বার্থপরের মত ।
- কোথায় যাবেন আপনি ?
সামনের সীটে বসা মেয়েটি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । নিবিড়ভাবে তাকিয়ে দেখছে আমার অবয়ব । বাইরে যে ঝড় বইছে তার প্রলয় এলোমেলো করে দিচ্ছে আমার চুলের বিন্যাস ।ট্রেনের জানালাটা তারপরও বন্ধ করতে ইচ্ছে করছে না ।
- কি জানি? একেবারে দক্ষিণে গিয়ে থামবো । শুনেছি সাগরে পা ভেজালে মন শান্ত হয় ।
মেয়েটা অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছে। থাকুক, অবিশ্বাসের সম্মুখীন হলেই মানুষের বিশ্বাস দৃঢ় হয় । আমি আবার জানালার বাইরে মাথা বের করে দিয়ে বসলাম । এটা আমার দ্বিতীয় জীবন । কাল রাতের ঘটনার গ্লানি মুছে যেত যদি আমার প্রাণটা সতের তলায় নিঃশেষ হয়ে যেত। কিংবা পাখির পালকের মত উড়ে উড়ে মাটিতে এসে মিশত শরীরটা।
জানি না কি হলো আমার । মনে হলো মৃত্যু মানেই তো হারিয়ে যাওয়া । আড়াল হয়ে যাওয়া । অপরিচিত পৃথিবীতে জন্ম নেয়া । মন্দ কি, আমি যদি আর না ফিরি এই গুরুত্বহীন জগতে ।
অনেক সময় নিয়ে স্নান করলাম । শরীরের যেখানে যেখানে জানোয়ারের ছোঁয়া লেগেছে সেখানে ধুয়ে মুছে সাফ করার ব্যর্থ চেষ্টা । শাওয়ারের নীচে
কিছুক্ষণ মন হালকা করে কাঁদলাম । শেষ যেবার ভ্রমণে প্যারিস গিয়েছিলাম সেখান থেকে কিছু দামী সুগন্ধী কিনেছিলাম । সেগুলো সারা শরীরে ছড়িয়ে দিলাম । যেন সেই সমুদ্রপারের কাহিনী । জীবনানন্দের একটা কবিতা মনে পড়লো-
....যতবার মন ছিঁড়ে গেছে, হয়েছে দেহের মতো হৃদয় আহত,
যতবার উড়ে গেছে শাখা, পাতা পড়ে গেছে যত—
পৃথিবীর বন হয়ে — ঝড়ের গতির মতো হয়ে,
বিদ্যুতের মতো হয়ে আকাশের মেঘে ইতস্তত;
একবার মৃত্যু লয়ে — একবার জীবনের লয়ে
ঘূর্ণির মতন বয়ে যে বাতাসে ছেঁড়ে — তার মতো গেছি বয়ে !
কাল রাতে যে লোকটি আমার সারা শরীর তরতাজা গোলাপের পাঁপড়ি ছিঁড়ে চটকানোর মত রগড়েছে তার সরীসৃপীয় আঙুল আর কামার্ত দৃষ্টি দিয়ে, সে আমার স্বামীর ব্যবসায়ী বন্ধু । সে ফ্ল্যাটে এসেছিলো স্বামীর খোঁজে, যদিও সে জানত এইসময় সে থাকে না । সে জানত এখানে আমার শত চিত্কারেও কোন প্রতিকার হবে না । এর আগেও আমি তার কামনার্ত কুৎসিত দৃষ্টি দেখেছি । দেখেছি আমার বুকে তার দৃষ্টির লালা গড়াতে । আমি জেনে গেছি এই শহরের মানুষ আমার শরীরই দেখেছে কেবল।
বাইরে
তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে । আমার শরীর অনেকটাই ভিজে গেছে । হাওয়ার বেগে ছুটছে ট্রেন । আর ট্রেনের গতির বিপরীতে আমি ফেলে আসছি আমার অতীত ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন