এক্সট্রা ম্যারাইটাল
-------------------------
কাহিনীকার-স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
---------------------------------------------
ঋষিলা অপেক্ষা করছে। সন্ধে নামছে। অন্ধকার ঠেলে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রেটার ক্যালকাটার এই গলিতে ঢুকবে সে। পুণে থেকে আসছে। তার বাড়ীতেই উঠবে। দু’জনের গত একবছর যাবৎ প্রায় সবই হয়েছে, শুধু সামনাসামনি দেখাটাই হয়নি। ফেসবুকে যখন প্রথম কথা হয়, তখন তাকে আকৃষ্ট করেছিল "একস্ট্রা ম্যারাইটাল" নামটি। প্রোফাইলের ছবিটি এক কাউবয় পোষাক পরা এক মাচো পুরুষের। এরকম এক পুরুষের সঙ্গে কী বিষয়ে কথা বলা যায় ভাবতেই গেলো তার কয়েকদিন ! কিছুদিন এই সেই কথার পর ঋষিলা যৌনজীবন সম্পর্কে কথা বলার আভাস দিতেই সে নিজেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ঋষিলার নিজের যৌনসম্পর্কহীন জীবন বড় দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। শহরে এত যুবকের ভিড়, আর তার মতো সুন্দরী বিদুষী মেয়ের জন্য কোনো প্রেমিক জোটে না ! সত্যিই জোটে না। অংশুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার, সেটিও হয়েছিল বাবার ঠিক করে দেওয়ায়। কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু অংশু নিজের কেরিয়ার নিয়ে আর সেই সংক্রান্ত ঘনঘন ট্যুর নিয়েই এত মশগুল যে ঋষিলাকে দেওয়ার মতো কয়েকটি রাতের সময়টুকু ছাড়া আর কোন সময়ই নেই তার,তাও নিজের মর্জি-মাফিক।কিন্তু বাচ্চার কথা তুললেই অংশু খালি কেরিয়ারের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যায়।এক কলিগ শিমূলের সঙ্গে খুব গোপনে প্রায় একমাস মতো একটা সম্পর্ক ছিল ঋষিলার,শারীরিক নয়। কিন্তু তার বিয়ের পর ওই সম্পর্কটা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয় সে। ঋষিলা চায়নি ঘরে তরুণী স্ত্রীকে ডিচ্ করে তার সঙ্গে গোপনে শুতে আসুক সে। একটি প্রখ্যাত ইংরেজি দূরদর্শন চ্যানেলে চাকরি করে ঋষিলা। অনেকদিনের চাকরি। অনেক দায়িত্ব। কিন্তু কোনো অফিসের কোনো বোঝা সে বাড়ি বয়ে আনতে চায় না। বাড়িতে থাকতে চায় সে ভাবনাহীন। সামান্য কিছুক্ষণ সময় নিজের জন্য রাখতেই তো হয়, কিছুক্ষণই তো সময় ! অফিস তো অফিস, সে না থাকলেও অফিস থাকবে। অফিস থেকে ফিরে সে আগে একটা বই নিয়ে বসতো পড়তে। এখন ফেসবুক নিয়ে বসে। ফেসবুক যে কী ভয়ঙ্কর এক নেশার মতো! আসলে, ফেসবুক নয়, এক্সট্রা ম্যারাইটাল প্রতিদিন যে বলছে তার সঙ্গে বিছানায় সে কী কী করবে, কী করে তার সারা শরীরে চুমু খাবে, কী করে ঠোঁটে, বুকে আদর করবে আর তাকে ঘন ঘন শীর্ষসুখ দেবে… সেসব পড়ার নেশা। এই নেশাটা তাকে প্রচুর অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখন সে রাস্তাঘাটে বা অফিসের যুবকগুলোর দিকে আগের মতো চাই চাই চোখে তাকায় না। সে ঋষিলার দৈনন্দিন জীবনকে অনেক পূর্ণ এবং তৃপ্ত করেছে। মনে মনে সে কৃতজ্ঞ তার কাছে। ফেসবুকে সম্পর্কটা এখন আটকে নেই। দু’মাস যাবৎ প্রায় প্রতিদিন কথা হচ্ছে ফোনে, আর শেষ কয়েকদিন স্কাইপেতে দু’জনের সেক্সও ঘটেছে। একস্ট্রা ম্যারাইটালের আসল নাম রোহন, মহারাষ্ট্রীয়, আর্টিস্ট, বয়স বত্রিশ। এর চেয়ে চমৎকার জুটি আর কী হতে পারে! পুণে থেকে উড়ে এসে তার সঙ্গে সত্যিকার সেক্সের প্রস্তাবটি ঋষিলাই দিয়েছিল রোহনকে। শুধু তাই নয়, পুণে কলকাতা আসা যাওয়ার টিকিটও ইমেইল করেছিল। টিকিট পেয়ে ‘লেটস ফাক হোল উইক’ বলে লাফিয়ে উঠেছিল রোহন। রোহনকে ছুঁয়ে দেখতে চায় ঋষিলা। সত্যিকার মৈথুন চাই, হস্তমৈথুন শরীর আর নিতে চায় না।
সাতদিনের ছুটি নিয়েছে সে, আজ বিকেলেই শিমূল জিজ্ঞেস করেছে, ‘হঠাৎ এতদিনের ছুটি কেন? কোথাও যাচ্ছো?’ ঋষিলা হেসে বলেছে,
- ‘একস্ট্রা ম্যারাইটাল’ যাওয়ার জন্য মরিশাসে ফ্লাইট বুক করেছি। যাবি?
- ‘বিয়েটা না করলে ঠিক ঠিকই যেতাম। ঋষিলার ঠোঁটে একচিলতে হাসি। শিমূলের জন্য সেই আকর্ষণ আর নেই ঋষিলার, রোহন এসে শিমূলের জায়গা কবেই দখল করে নিয়েছে। শিমূলের বিয়ের পর রোহনের মতো একজন পুরুষেরই দরকার ছিল তার জীবনে, এরকম বানের জলের মতো কেউ, সব কষ্ট-স্মৃতি ভাসিয়ে নেবে, স্নিগ্ধ শীতল নতুনতা ছড়িয়ে তাকে আরও উজ্জ্বল করবে, যেন সে জন্ম নিল এইমাত্র, অতীত বলে কিছু ছিল না কখনও তার। শিমূল অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছে, ‘কী কারও প্রেমে পড়েছ নাকি, দেখতে আরও উজ্জ্বল হয়েছ।’ মিষ্টি হেসে ঋষিলা বলেছে, ‘এই, মুন কেমন আছে? চলছে তো সব ঠিকঠাক? বলে, শিমূলের উত্তরের জন্য না অপেক্ষা করেই অফিস থেকে বেরিয়ে গেছে ঋষিলা। প্রতিদিন যখন বেরোয় তার চেয়ে খানিক আগেই বেরিয়েছে। শরীর জুড়ে রোহন ডাকছে তাকে। সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে।
বাড়িতে এসে গান গাইতে গাইতে স্নান করেছে। এত সময় নিয়ে সে স্নান করে না খুব। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সেজেছে। পারফিউম মেখেছে। শোবার ঘরটা সাজিয়েছে রজনীগন্ধার স্টিকে। নতুন চাদর বিছিয়েছে বিছানায়। দুটো শুধু বালিশ ছিল, নতুন দুটো বালিশ যোগ করেছে। বড় বাড়ী। তিনটে শোবার ঘর। একটা অংশু আর তার। আরেকটা অতিথির জন্য। আরেকটা ফাঁকা। আরতিদি পুরোনো কাজের লোক। সে জিজ্ঞেস করেছে, ‘আজ দাদাবাবু আসছে নাকি গো, এত সাজগোজ করছ যে?’ শুনে বিরক্ত কণ্ঠে সে বলেছে, ‘তুমি যে দিদি কী আবোল-তাবোল বকো, ও এক্ষুণি হঠাত্ আসতে যাবে কেন?আমার কয়েকজন কলিগ আসবে !’
আরতিদি প্রচুর রান্না করেছে আজ।
মাটন বিরিয়ানি,কাশ্মীরী পোলাও,চিকেন টিক্কা,মুর্গ্ মসল্লম্,মটন হাণ্ডি কাবাব,ভেটকি-প্রণ মালাইকারী...ইত্যাদি। রোহন আর সে ক্যান্ডেল-লাইট ডিনার করবে। তারপর শোবার ঘরে চলে যাবে, দরজা বন্ধ করে দেবে ঘরের। জানালার পর্দাটা সরিয়ে দেওয়া। বিছানা থেকেই জানালার ওপারের চাঁদটা দেখতে পাবে। জ্যোৎস্নায় ঘর ভরে যাবে, আর ওই আলোয় তারা শরীরে শরীর ডুবিয়ে স্নান করবে সারা রাত। শোবার ঘরটায় ঋষিলা জুঁইয়ের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে রাখে। নিজের গায়েও সুগন্ধী। বাড়িটায় যেন ফুলের উৎসব হচ্ছে। হেমন্তর রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি চালিয়ে দেয়। ‘হৃদয়বাসনা পূর্ণ হলো’ গানটি বাজতে থাকে। সে গুনগুন করে গাইতে থাকে। কখনই খুব ভালো গাইতে জানে না। কিন্তু গান ভালোবাসতে জানে। ঋষিলা একটা নীল রঙের শাড়ি পরেছে। ইচ্ছে করেই খুব বড় গলার ব্লাউজ পরেছে। স্তনজোড়া উঁকি দিচ্ছে,তা দিক। লরিয়েলের কালো রঙ তার চুলে। সামান্যই পেকেছে যদিও, সে মুছে ফেলেছে সাদার চিহ্ন। সাঁইত্রিশের টান টান শরীর, কিন্তু চুলে পাকন, ঠিক মেলে না। এমনিতে কালো সাদায় তার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু রোহনের সঙ্গে সাতটা দিন ঘনিষ্ঠ সময় কাটাবে, বয়সের চিহ্নটিহ্ন এসে না হয় এই সাতটা দিন নাই জ্বালাক।
রোহন ফোন করেছে দমদমে নেমেই। রেড লেবেলের একটা বোতল আর দুটো গ্লাস এনে শোবার ঘরের খাটের পাশের টেবিলে রাখে ঋষিলা। এরকম অ্যাডভেঞ্চার আগে কখনও করেনি সে। একটা অচেনা মানুষের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হলো, তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কে যাওয়ার জন্যই সব আয়োজন দু’জন করছে, কোনো প্রেম হলো না, কেউ কারও জন্য "ভালোবাসি" শব্দটা উচ্চারণ করলো না, কিছুদিন মামুলি আলোচনার পর যৌনতা ছাড়া জগতের অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হলো না ! দু’জনের কিন্তু কারওরই মনে হচ্ছে না খুব বিচ্ছিরি কোনো কাজ তারা করছে। দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক। দু’জনই একা থাকে। শরীর চাইলে শরীর তারা তবে কেন মেলাবে না!
সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে। ঋষিলার মনে হতে থাকে সে নিতান্তই ষোলো বছর বয়সী এক কিশোরী। না হয় সে ষোলো বছর বয়সীই। ষোলো বছর যখন বয়স, তখন সে কঠিন কঠিন বই পড়ে কাটিয়েছে, চল্লিশ বা পঞ্চাশ বয়সীরা যা করে। সেই ষোলোটা ফেরত পাওয়ার যদি সুযোগ হয়, তবে ফেরত সে নেবে না কেন! কাউকে তো দিব্যি দেয়নি যে ফেলে আসা কোনো বয়স সে কোনোদিন ফেরত নেবে না।
ঋষিলার কাছে রোহন সম্ভবত আস্ত একটি পুরুষ ছাড়া আর কিছু নয়। সে বলে-কয়েই সাতদিন শুতে আসছে তার সঙ্গে। শুধু শরীরের আকর্ষণকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে একটা সম্পর্ক। ঋষিলা ভাবে, সবসময় যে আগে মন, পরে শরীর হতে হবে তারই বা কী মানে? শরীর আগে, মন পরে হওয়াটাই বরং বেশি ভালো। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চয়ই রোহন ওকে জড়িয়ে ধরে গভীর করে চুমু খাবে। তারপর সোজা শোবার ঘরে। দৃশ্যগুলো কল্পনা করে সে। আবেগে চোখ বোজে। শরীরের নিভৃতে গর্জন করে সুখের স্রোত। আরতিদি রান্না করে চলে গেছে,সার্ভ করার জন্য থাকবে বলেছিলো,কিন্তু ঋষিলাই চায়নি সে থাকুক।অংশু তো তিনমাসের আগে ট্যুর থেকেই ফিরবে না।সকালে আর রাতে রুটিনলি দুবার কথা হয়।আরতিদিকে সাতদিনের ছুটি দিয়েছে ঋষিলা। আরতিদি ঋষিলার বিয়ের আগে থেকে এই বাড়িতে আছে। কিন্তু নিজের সংসারের চেয়েও মনিব-মনিবানির পরিবারকে বেশী আপন করে দেখে।
২.
ঠিক সাতটায় রোহন এল। ফোটো দেখে বা স্কাইপেতে দেখে যেমন অনুমান করেছিল, তার চেয়ে অন্যরকম, যতটুকু লম্বা ভেবেছিল, তার চেয়ে বরং খানিকটা বেশি, যতটা বাল্কি লাগছিল, তার চেয়েও স্লিম, যতটা সুদর্শন ভেবেছিল, তার চেয়েও বেশি সুদর্শন রোহন। দু’জনেই হাই-হ্যালো বলে হাত মেলাল। শোবার ঘরে নেওয়ার বদলে বসার ঘরে নিয়ে এল রোহনকে। দু’সোফায় মুখোমুখি বসল দু’জন। একটুখানি দৃষ্টি বিনিময়। একটুখানি হাসি দু’জনের ঠোঁটে। ঋষিলা বসে আছে রোহন উঠে এসে ঠিক স্কাইপেতে যেমন বলত, ‘ইউ লুক্ সো হট্ হানি। কাম অন্, লেটস্ হ্যাভ্ সেক্স’ বলে কিনা। রোহন নিজেই ক্যামেরাকে নামিয়ে দিত উরুসন্ধির দিকে আর ঋষিলাও খুলত বুকের কাপড়। দুটো যৌনকাতর নারী-পুরুষ আজ মুখোমুখি বসে আছে। দু’টো শরীরের বাসনা আজ পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে দু’জনের কথোপকথনে যৌনতার তিলমাত্র কিছু নেই।
- একটু জল খাবো।
- আই অ্যাম্ সরি। জল আগেই দেওয়া উচিত ছিল। চা বা কফি কিছু খাবে?
- না। আমি খাই না ওসব।
- তবে কি, হুইস্কি খাবে?
- হুইস্কি তো আমি খাই-ই না।
- ও
- ক’টার সময় রাতের খাবার খাও?
- ঠিক নেই। বেশ সুন্দর সাজানো তো বাড়িটা। এত বই কার? সব তোমার?
- হ্যাঁ আমার।
রোহন উঠে বইয়ের তাকগুলোর দিকে যায়, মগ্ন হয়ে বই দেখতে থাকে। অনেকক্ষণ কেটে যায় এভাবে। ঋষিলা জল এনে দিলে বই দেখতে দেখতেই জল খায়।
- ইফ ইউ ডোন্ট্ মাইন্ড্, আমি কি কিছু বই বের করতে পারি এখান থেকে?
- হ্যাঁ নিশ্চয়ই, গো এহেড।
রোহন তিনটে বই নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। সোফায় এসে বলল, তুমিও দেখছি জীবনানন্দের বই পছন্দ কর। বনলতা সেন পড়েছ?
ঋষিলা হেসে বলল, সেটা কে না পড়েছে?ওঁর শুধু তিনখণ্ড কবিতার বই-ই আছে সংগ্রহে।
- তোমার অসাধারণ কালেকশন।
- ক্লাসিকস্ বেশ কিছু আছে।
- ক্লাসিকসের কথা বাদ দাও। ওগুলো ছোটবেলায় পড়েছি। ইদানীং জয় গোস্বামী,শ্রীজাত ছাড়া কিছু ভালো লাগে না।
- আছে বেশ কটা- যেমন পাগলী তোমার সাথে।
চোখেমুখে খুশি উপচে ওঠে রোহনের।
- তুমি জয় গোস্বামীও পছন্দ কর? বাহ! কোনগুলো আছে বল না। ওনার শেষটা আমার এখনও পড়া হয়নি।
- আমার সবচেয়ে পছন্দ এটাই। পাগলী তোমার সাথে।
- ও বইটার তুলনা হয় না।
- বধ্যভূমি একাদশটা তো এখনও বেরোয়নি বোধহয়।
- এই অক্টোবরে বেরিয়েছে শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায়।
রোহনের মধ্যে একটা কিশোর বাস করে। দেখে ভালো লাগে ঋষিলার। ঋষিলার মতোই সে উজ্জ্বল উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে সময় সময়। বইয়ের গল্পে মেতে ওঠে রোহন। যেন দু’জনে কোনো বুক ক্লাবের মেম্বার। বইয়ের পছন্দে এত মিল আর কারও সঙ্গে নেই ঋষিলার। তারপর কথায় কথায় বেড়ানোর কথা উঠল, ভারতের কোথায় কোথায় কে গেছে। তাতেও মিল, দু’জনে বর্ণনা করতে থাকে দু’জনের পছন্দের জায়গাগুলোয় নিজেদের অভিজ্ঞতা। এক সময় খাবারের প্রসঙ্গ ওঠে, ওতেও মিল। দু’জনই বাঙালি খাবার পছন্দ করে।
দশটা বেজে যায় গল্প করতে করতে। জল ছাড়া কেউ আর কিছু পান করে না।মাঝে একবার মিরিণ্ডা জাতীয় সফ্টড্রিংক্স নিয়েছে রোহন। তারপর টেবিলে খাবার সাজিয়ে দেয়। না, মোমবাতি জ্বালানোর প্রয়োজন মনে করে না ঋষিলা। খেতে খেতে রোহন বলে, ‘বাহ, বেশ কম তেলে, কম মশলায় রান্না তো। আমার মা’র রান্নার মতো। ‘আরতিদি ভালো রাঁধে'। রান্নার বেশ প্রশংসা করল রোহন।ঋষিলা থালায় নিজে খাবার বেড়ে নিল। রোহনের খাওয়া বেশ পরিপাটি। পরিপূর্ণ ভদ্রলোক। দেখে বেশ ভালো লাগে তার। কলকাতায় কেন আজ অবধি তার বাড়িতেও এমন ভদ্রলোক সে দেখেনি।চারিদিকে ফেলে ছড়িয়ে। খেয়ে ওঠার পর রোহন বলল,
- কাল তোমায় ডিনারে নিয়ে যাব কেমন! কলকাতার সবচেয়ে ভালো বাঙালি খাবারের রেস্টুরেন্টে।
- তোমার মা কী কী রাঁধেন, শুধু মারাঠী রান্না, নাকি বাঙালি রান্নাও? রোহন অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে যে তার মা মারা গেছেন এক বছর হলো। সড়ক দুর্ঘটনায়। দু'ভাই মায়ের সঙ্গেই থাকত। বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে দাদা। গাড়িটা সেদিন চালাচ্ছিল রোহন নিজে। দাদার বাড়ি থেকে ডিনার খেয়ে ফিরছিল নিজেদের বাড়িতে। মদ্যপান করেছিল খুব। বোমার মতো একটা ট্রাক ছুটে আসছিল তার গাড়ির দিকে, দেখতে পায়নি। ট্রাক এসে ধাক্কা মারল, আর গাড়িটা গড়াতে গড়াতে খাদে পড়ে গেল। ওখানেই মারা যায় মা। রোহন চোট পেয়েছিল, তবে হাসপাতালে দিন কুড়ি থাকার পর তা সেরে যায়। সেদিনের পর থেকে রোহন আর মদ ছোঁয়নি। মায়ের কথায় মায়ের কথা আসে। ঋষিলাও মায়ের গল্পে যোগ দেয়।অনেকদিন ভুলে ছিল নিজের মাকে। আজ যেন মা তার সামনে এসে বসেছেন। স্মৃতির ঝাঁপি দুজনেই খুলে বসে। দুজনের চোখই ভিজে ওঠে। রোহন তার মায়ের প্রসঙ্গ না তুললে সম্ভবত এভাবেই ঋষিলা ভুলে থাকত মাকে। বারোটা বেজে যায়। রোহন বলে, ‘আমি কোথায় ঘুমোব?’
ঋষিলা কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর হেসে বলে, ‘একটু দাঁড়াও। গেস্টরুমের বিছানাটা ঠিক করে দিই। চাদরটা চেঞ্জ করে দিই। আমার ঘরে এক্সট্রা বালিশ আছে, দিয়ে দিই।’
রোহন আগে কখনও কলকাতায় আসেনি। ঋষিলা বলে, কাল তোমাকে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে নিয়ে যাব। আর প্যানোরামায়। তোমার ভালো লাগবে।
রোহন ‘যে জন আছে নির্জনে’ বইটি হাতে নিয়ে মিষ্টি হেসে বলে, ‘এই বইটা কি রাতে পড়ার জন্য নিতে পারি? এটা আমার পড়া হয়নি।’
৩.
যে কটা দিন ছিল রোহন, কিশোর-কিশোরীর মতো ঋষিলা আর রোহন কলকাতার রাস্তায় টই টই করে ঘুরেছে, রাস্তার ধারের তেলেভাজা থেকে "ভজহরি মান্না" র খাবার কিছু বাদ দেয়নি। হাতেটানা রিকশায় চড়েছে গঙ্গায় নৌকো চড়েছে, যেদিকে খুশি সেদিকে চলে গেছে। ঋষিলা ভুলে গেছে তার চাকরি-বাকরি, তার সংসার, তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। যেন সে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, সবার নাগালের বাইরে, কোনো অচেনা আকাশে উড়েছে। সত্যিকার ‘ভালোলাগা’ বোধহয় একেই বলে। ঋষিলাকে রোহন উপহার দিয়েছে দু’টো চমৎকার কিউরিও আর গণেশ পাইনের একটা পেইন্টিং। প্রথম একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, যার সঙ্গে ভাবনা চিন্তার প্রায় সম্পূর্ণই মিল পেল ঋষিলা। জীবনের অনেক কথা বলেছে সে রোহনকে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার কথা, শিমূলের কথা, একরাশ দুঃখ-সুখের কথা। সব মন দিয়ে শুনেছে রোহন। রোহনও বলেছে, তবে বলার চেয়ে রোহন শুনতেই বেশি পছন্দ করেছে। মাত্র ক’টা দিনে কী অসম্ভব আপন হয়ে উঠেছে রোহন। যেন রোহন তার ছোটবেলার কোনো বন্ধু। যেন রোহনের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর জুড়ে সে এক্কা-দোক্কা খেলেছে, মার্বেল লাট্টু খেলেছে, পুকুরে মাছ ধরেছে, ঘুড়ি উড়িয়েছে। মাঝে মধ্যে বিয়ের পরের অতীতের কোনো ঘটনা বলতে গিয়ে তার চোখে জল এসেছে। আলতো করে বুকে টেনে তাকে শান্ত করেছে রোহন। রোহনের ওইটুকু স্পর্শই পেয়েছে ঋষিলা গোটা সাতদিনে। চুমু খেতে একবার দু’বার চেয়েছিল, কিন্তু বারণ করেছে নিজেকে। ভেবেছে, রোহন তো বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু ভাবছে না।
রোহন চলে যায়, ঋষিলাকে দিয়ে যায় ঋষিলার শ্রেষ্ঠ সময়। ঋষিলার আর জিজ্ঞেস করা হয়নি, ফেসবুকে "এক্সট্রা ম্যারাইটাল" নামের আড়ালে রোহনের চরিত্র কেন তার ফেসবুকের বাইরের রোহনের চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত? জিজ্ঞেস করেনি, অনুমান করে নিয়েছে, মায়ের মৃত্যুর কারণে যে ভীষণ গ্লানি আর শোকে ভুগছে রোহন, তা থেকে মুক্তি পেতেই আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে, ভিন্ন চরিত্রে। ঋষিলা কেন আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে! কিছু হয়ত তার ভেতরেও আছে, সে নিজেও জানে না। রোহন জানে কি? জিজ্ঞেস করা হয়নি রোহন জানে কি না। এ ক’দিনে একবারও ঋষিলার শরীরে বান ডাকেনি। শুধু মনেই ঝরেছে ফোঁটায় ফোঁটায় ভালোলাগার বৃষ্টি। ঋষিলার ফেসবুকের চরিত্রটা কি তার সত্যিকারের চরিত্র নয়! সে ভাবে, কোন রোহন সত্যিকারের রোহন! যে রোহনের সঙ্গে নেটে দেখা হয়, নাকি যে রক্তমাংসের রোহনের সঙ্গে বাড়িতে দেখা হলো! রক্তমাংসের রোহনই তো ফেসবুকের "এক্সট্রা ম্যারাইটাল", যার সঙ্গে রাতে রাতে তার শারীরিক উৎসব হয়। কত যে রহস্য একজন মানুষের ভেতর। সম্ভবত কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে বাস করে একজন মানুষের মধ্যে। একজন আরেকজনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
রোহনকে এয়ারপোর্টে "সি-অফ" করে যখন বাড়ি ফিরছিল, উদাস তাকিয়েছিল গাড়ির জানালায়, তখন এস্.এম্.এস্. আসে।
রোহন লিখেছে, "আই লাভ ইউ।এত সুন্দর একটা সম্পর্ক উপহার দেওয়ার জন্য।"
বুক কাঁপে ঋষিলার। তীব্র ভালো লাগা মন থেকে শরীরে ছড়িয়ে যায়।থরথর করে কাঁপা কাঁপা হাতে সে লিখল, "মি টু।"
শ্রাবণধারা দুচোখে।
গাড়ির পেনড্রাইভে সংরক্ষিত মোহরদির কণ্ঠে তখন বেজে চলেছে,‘চিরসখা হে ছেড়ো না মোরে…’
-------------------------
কাহিনীকার-স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
---------------------------------------------
ঋষিলা অপেক্ষা করছে। সন্ধে নামছে। অন্ধকার ঠেলে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রেটার ক্যালকাটার এই গলিতে ঢুকবে সে। পুণে থেকে আসছে। তার বাড়ীতেই উঠবে। দু’জনের গত একবছর যাবৎ প্রায় সবই হয়েছে, শুধু সামনাসামনি দেখাটাই হয়নি। ফেসবুকে যখন প্রথম কথা হয়, তখন তাকে আকৃষ্ট করেছিল "একস্ট্রা ম্যারাইটাল" নামটি। প্রোফাইলের ছবিটি এক কাউবয় পোষাক পরা এক মাচো পুরুষের। এরকম এক পুরুষের সঙ্গে কী বিষয়ে কথা বলা যায় ভাবতেই গেলো তার কয়েকদিন ! কিছুদিন এই সেই কথার পর ঋষিলা যৌনজীবন সম্পর্কে কথা বলার আভাস দিতেই সে নিজেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ঋষিলার নিজের যৌনসম্পর্কহীন জীবন বড় দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। শহরে এত যুবকের ভিড়, আর তার মতো সুন্দরী বিদুষী মেয়ের জন্য কোনো প্রেমিক জোটে না ! সত্যিই জোটে না। অংশুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার, সেটিও হয়েছিল বাবার ঠিক করে দেওয়ায়। কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু অংশু নিজের কেরিয়ার নিয়ে আর সেই সংক্রান্ত ঘনঘন ট্যুর নিয়েই এত মশগুল যে ঋষিলাকে দেওয়ার মতো কয়েকটি রাতের সময়টুকু ছাড়া আর কোন সময়ই নেই তার,তাও নিজের মর্জি-মাফিক।কিন্তু বাচ্চার কথা তুললেই অংশু খালি কেরিয়ারের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যায়।এক কলিগ শিমূলের সঙ্গে খুব গোপনে প্রায় একমাস মতো একটা সম্পর্ক ছিল ঋষিলার,শারীরিক নয়। কিন্তু তার বিয়ের পর ওই সম্পর্কটা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয় সে। ঋষিলা চায়নি ঘরে তরুণী স্ত্রীকে ডিচ্ করে তার সঙ্গে গোপনে শুতে আসুক সে। একটি প্রখ্যাত ইংরেজি দূরদর্শন চ্যানেলে চাকরি করে ঋষিলা। অনেকদিনের চাকরি। অনেক দায়িত্ব। কিন্তু কোনো অফিসের কোনো বোঝা সে বাড়ি বয়ে আনতে চায় না। বাড়িতে থাকতে চায় সে ভাবনাহীন। সামান্য কিছুক্ষণ সময় নিজের জন্য রাখতেই তো হয়, কিছুক্ষণই তো সময় ! অফিস তো অফিস, সে না থাকলেও অফিস থাকবে। অফিস থেকে ফিরে সে আগে একটা বই নিয়ে বসতো পড়তে। এখন ফেসবুক নিয়ে বসে। ফেসবুক যে কী ভয়ঙ্কর এক নেশার মতো! আসলে, ফেসবুক নয়, এক্সট্রা ম্যারাইটাল প্রতিদিন যে বলছে তার সঙ্গে বিছানায় সে কী কী করবে, কী করে তার সারা শরীরে চুমু খাবে, কী করে ঠোঁটে, বুকে আদর করবে আর তাকে ঘন ঘন শীর্ষসুখ দেবে… সেসব পড়ার নেশা। এই নেশাটা তাকে প্রচুর অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখন সে রাস্তাঘাটে বা অফিসের যুবকগুলোর দিকে আগের মতো চাই চাই চোখে তাকায় না। সে ঋষিলার দৈনন্দিন জীবনকে অনেক পূর্ণ এবং তৃপ্ত করেছে। মনে মনে সে কৃতজ্ঞ তার কাছে। ফেসবুকে সম্পর্কটা এখন আটকে নেই। দু’মাস যাবৎ প্রায় প্রতিদিন কথা হচ্ছে ফোনে, আর শেষ কয়েকদিন স্কাইপেতে দু’জনের সেক্সও ঘটেছে। একস্ট্রা ম্যারাইটালের আসল নাম রোহন, মহারাষ্ট্রীয়, আর্টিস্ট, বয়স বত্রিশ। এর চেয়ে চমৎকার জুটি আর কী হতে পারে! পুণে থেকে উড়ে এসে তার সঙ্গে সত্যিকার সেক্সের প্রস্তাবটি ঋষিলাই দিয়েছিল রোহনকে। শুধু তাই নয়, পুণে কলকাতা আসা যাওয়ার টিকিটও ইমেইল করেছিল। টিকিট পেয়ে ‘লেটস ফাক হোল উইক’ বলে লাফিয়ে উঠেছিল রোহন। রোহনকে ছুঁয়ে দেখতে চায় ঋষিলা। সত্যিকার মৈথুন চাই, হস্তমৈথুন শরীর আর নিতে চায় না।
সাতদিনের ছুটি নিয়েছে সে, আজ বিকেলেই শিমূল জিজ্ঞেস করেছে, ‘হঠাৎ এতদিনের ছুটি কেন? কোথাও যাচ্ছো?’ ঋষিলা হেসে বলেছে,
- ‘একস্ট্রা ম্যারাইটাল’ যাওয়ার জন্য মরিশাসে ফ্লাইট বুক করেছি। যাবি?
- ‘বিয়েটা না করলে ঠিক ঠিকই যেতাম। ঋষিলার ঠোঁটে একচিলতে হাসি। শিমূলের জন্য সেই আকর্ষণ আর নেই ঋষিলার, রোহন এসে শিমূলের জায়গা কবেই দখল করে নিয়েছে। শিমূলের বিয়ের পর রোহনের মতো একজন পুরুষেরই দরকার ছিল তার জীবনে, এরকম বানের জলের মতো কেউ, সব কষ্ট-স্মৃতি ভাসিয়ে নেবে, স্নিগ্ধ শীতল নতুনতা ছড়িয়ে তাকে আরও উজ্জ্বল করবে, যেন সে জন্ম নিল এইমাত্র, অতীত বলে কিছু ছিল না কখনও তার। শিমূল অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছে, ‘কী কারও প্রেমে পড়েছ নাকি, দেখতে আরও উজ্জ্বল হয়েছ।’ মিষ্টি হেসে ঋষিলা বলেছে, ‘এই, মুন কেমন আছে? চলছে তো সব ঠিকঠাক? বলে, শিমূলের উত্তরের জন্য না অপেক্ষা করেই অফিস থেকে বেরিয়ে গেছে ঋষিলা। প্রতিদিন যখন বেরোয় তার চেয়ে খানিক আগেই বেরিয়েছে। শরীর জুড়ে রোহন ডাকছে তাকে। সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে।
বাড়িতে এসে গান গাইতে গাইতে স্নান করেছে। এত সময় নিয়ে সে স্নান করে না খুব। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সেজেছে। পারফিউম মেখেছে। শোবার ঘরটা সাজিয়েছে রজনীগন্ধার স্টিকে। নতুন চাদর বিছিয়েছে বিছানায়। দুটো শুধু বালিশ ছিল, নতুন দুটো বালিশ যোগ করেছে। বড় বাড়ী। তিনটে শোবার ঘর। একটা অংশু আর তার। আরেকটা অতিথির জন্য। আরেকটা ফাঁকা। আরতিদি পুরোনো কাজের লোক। সে জিজ্ঞেস করেছে, ‘আজ দাদাবাবু আসছে নাকি গো, এত সাজগোজ করছ যে?’ শুনে বিরক্ত কণ্ঠে সে বলেছে, ‘তুমি যে দিদি কী আবোল-তাবোল বকো, ও এক্ষুণি হঠাত্ আসতে যাবে কেন?আমার কয়েকজন কলিগ আসবে !’
আরতিদি প্রচুর রান্না করেছে আজ।
মাটন বিরিয়ানি,কাশ্মীরী পোলাও,চিকেন টিক্কা,মুর্গ্ মসল্লম্,মটন হাণ্ডি কাবাব,ভেটকি-প্রণ মালাইকারী...ইত্যাদি। রোহন আর সে ক্যান্ডেল-লাইট ডিনার করবে। তারপর শোবার ঘরে চলে যাবে, দরজা বন্ধ করে দেবে ঘরের। জানালার পর্দাটা সরিয়ে দেওয়া। বিছানা থেকেই জানালার ওপারের চাঁদটা দেখতে পাবে। জ্যোৎস্নায় ঘর ভরে যাবে, আর ওই আলোয় তারা শরীরে শরীর ডুবিয়ে স্নান করবে সারা রাত। শোবার ঘরটায় ঋষিলা জুঁইয়ের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে রাখে। নিজের গায়েও সুগন্ধী। বাড়িটায় যেন ফুলের উৎসব হচ্ছে। হেমন্তর রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি চালিয়ে দেয়। ‘হৃদয়বাসনা পূর্ণ হলো’ গানটি বাজতে থাকে। সে গুনগুন করে গাইতে থাকে। কখনই খুব ভালো গাইতে জানে না। কিন্তু গান ভালোবাসতে জানে। ঋষিলা একটা নীল রঙের শাড়ি পরেছে। ইচ্ছে করেই খুব বড় গলার ব্লাউজ পরেছে। স্তনজোড়া উঁকি দিচ্ছে,তা দিক। লরিয়েলের কালো রঙ তার চুলে। সামান্যই পেকেছে যদিও, সে মুছে ফেলেছে সাদার চিহ্ন। সাঁইত্রিশের টান টান শরীর, কিন্তু চুলে পাকন, ঠিক মেলে না। এমনিতে কালো সাদায় তার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু রোহনের সঙ্গে সাতটা দিন ঘনিষ্ঠ সময় কাটাবে, বয়সের চিহ্নটিহ্ন এসে না হয় এই সাতটা দিন নাই জ্বালাক।
রোহন ফোন করেছে দমদমে নেমেই। রেড লেবেলের একটা বোতল আর দুটো গ্লাস এনে শোবার ঘরের খাটের পাশের টেবিলে রাখে ঋষিলা। এরকম অ্যাডভেঞ্চার আগে কখনও করেনি সে। একটা অচেনা মানুষের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হলো, তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কে যাওয়ার জন্যই সব আয়োজন দু’জন করছে, কোনো প্রেম হলো না, কেউ কারও জন্য "ভালোবাসি" শব্দটা উচ্চারণ করলো না, কিছুদিন মামুলি আলোচনার পর যৌনতা ছাড়া জগতের অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হলো না ! দু’জনের কিন্তু কারওরই মনে হচ্ছে না খুব বিচ্ছিরি কোনো কাজ তারা করছে। দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক। দু’জনই একা থাকে। শরীর চাইলে শরীর তারা তবে কেন মেলাবে না!
সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে। ঋষিলার মনে হতে থাকে সে নিতান্তই ষোলো বছর বয়সী এক কিশোরী। না হয় সে ষোলো বছর বয়সীই। ষোলো বছর যখন বয়স, তখন সে কঠিন কঠিন বই পড়ে কাটিয়েছে, চল্লিশ বা পঞ্চাশ বয়সীরা যা করে। সেই ষোলোটা ফেরত পাওয়ার যদি সুযোগ হয়, তবে ফেরত সে নেবে না কেন! কাউকে তো দিব্যি দেয়নি যে ফেলে আসা কোনো বয়স সে কোনোদিন ফেরত নেবে না।
ঋষিলার কাছে রোহন সম্ভবত আস্ত একটি পুরুষ ছাড়া আর কিছু নয়। সে বলে-কয়েই সাতদিন শুতে আসছে তার সঙ্গে। শুধু শরীরের আকর্ষণকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে একটা সম্পর্ক। ঋষিলা ভাবে, সবসময় যে আগে মন, পরে শরীর হতে হবে তারই বা কী মানে? শরীর আগে, মন পরে হওয়াটাই বরং বেশি ভালো। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চয়ই রোহন ওকে জড়িয়ে ধরে গভীর করে চুমু খাবে। তারপর সোজা শোবার ঘরে। দৃশ্যগুলো কল্পনা করে সে। আবেগে চোখ বোজে। শরীরের নিভৃতে গর্জন করে সুখের স্রোত। আরতিদি রান্না করে চলে গেছে,সার্ভ করার জন্য থাকবে বলেছিলো,কিন্তু ঋষিলাই চায়নি সে থাকুক।অংশু তো তিনমাসের আগে ট্যুর থেকেই ফিরবে না।সকালে আর রাতে রুটিনলি দুবার কথা হয়।আরতিদিকে সাতদিনের ছুটি দিয়েছে ঋষিলা। আরতিদি ঋষিলার বিয়ের আগে থেকে এই বাড়িতে আছে। কিন্তু নিজের সংসারের চেয়েও মনিব-মনিবানির পরিবারকে বেশী আপন করে দেখে।
২.
ঠিক সাতটায় রোহন এল। ফোটো দেখে বা স্কাইপেতে দেখে যেমন অনুমান করেছিল, তার চেয়ে অন্যরকম, যতটুকু লম্বা ভেবেছিল, তার চেয়ে বরং খানিকটা বেশি, যতটা বাল্কি লাগছিল, তার চেয়েও স্লিম, যতটা সুদর্শন ভেবেছিল, তার চেয়েও বেশি সুদর্শন রোহন। দু’জনেই হাই-হ্যালো বলে হাত মেলাল। শোবার ঘরে নেওয়ার বদলে বসার ঘরে নিয়ে এল রোহনকে। দু’সোফায় মুখোমুখি বসল দু’জন। একটুখানি দৃষ্টি বিনিময়। একটুখানি হাসি দু’জনের ঠোঁটে। ঋষিলা বসে আছে রোহন উঠে এসে ঠিক স্কাইপেতে যেমন বলত, ‘ইউ লুক্ সো হট্ হানি। কাম অন্, লেটস্ হ্যাভ্ সেক্স’ বলে কিনা। রোহন নিজেই ক্যামেরাকে নামিয়ে দিত উরুসন্ধির দিকে আর ঋষিলাও খুলত বুকের কাপড়। দুটো যৌনকাতর নারী-পুরুষ আজ মুখোমুখি বসে আছে। দু’টো শরীরের বাসনা আজ পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে দু’জনের কথোপকথনে যৌনতার তিলমাত্র কিছু নেই।
- একটু জল খাবো।
- আই অ্যাম্ সরি। জল আগেই দেওয়া উচিত ছিল। চা বা কফি কিছু খাবে?
- না। আমি খাই না ওসব।
- তবে কি, হুইস্কি খাবে?
- হুইস্কি তো আমি খাই-ই না।
- ও
- ক’টার সময় রাতের খাবার খাও?
- ঠিক নেই। বেশ সুন্দর সাজানো তো বাড়িটা। এত বই কার? সব তোমার?
- হ্যাঁ আমার।
রোহন উঠে বইয়ের তাকগুলোর দিকে যায়, মগ্ন হয়ে বই দেখতে থাকে। অনেকক্ষণ কেটে যায় এভাবে। ঋষিলা জল এনে দিলে বই দেখতে দেখতেই জল খায়।
- ইফ ইউ ডোন্ট্ মাইন্ড্, আমি কি কিছু বই বের করতে পারি এখান থেকে?
- হ্যাঁ নিশ্চয়ই, গো এহেড।
রোহন তিনটে বই নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। সোফায় এসে বলল, তুমিও দেখছি জীবনানন্দের বই পছন্দ কর। বনলতা সেন পড়েছ?
ঋষিলা হেসে বলল, সেটা কে না পড়েছে?ওঁর শুধু তিনখণ্ড কবিতার বই-ই আছে সংগ্রহে।
- তোমার অসাধারণ কালেকশন।
- ক্লাসিকস্ বেশ কিছু আছে।
- ক্লাসিকসের কথা বাদ দাও। ওগুলো ছোটবেলায় পড়েছি। ইদানীং জয় গোস্বামী,শ্রীজাত ছাড়া কিছু ভালো লাগে না।
- আছে বেশ কটা- যেমন পাগলী তোমার সাথে।
চোখেমুখে খুশি উপচে ওঠে রোহনের।
- তুমি জয় গোস্বামীও পছন্দ কর? বাহ! কোনগুলো আছে বল না। ওনার শেষটা আমার এখনও পড়া হয়নি।
- আমার সবচেয়ে পছন্দ এটাই। পাগলী তোমার সাথে।
- ও বইটার তুলনা হয় না।
- বধ্যভূমি একাদশটা তো এখনও বেরোয়নি বোধহয়।
- এই অক্টোবরে বেরিয়েছে শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায়।
রোহনের মধ্যে একটা কিশোর বাস করে। দেখে ভালো লাগে ঋষিলার। ঋষিলার মতোই সে উজ্জ্বল উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে সময় সময়। বইয়ের গল্পে মেতে ওঠে রোহন। যেন দু’জনে কোনো বুক ক্লাবের মেম্বার। বইয়ের পছন্দে এত মিল আর কারও সঙ্গে নেই ঋষিলার। তারপর কথায় কথায় বেড়ানোর কথা উঠল, ভারতের কোথায় কোথায় কে গেছে। তাতেও মিল, দু’জনে বর্ণনা করতে থাকে দু’জনের পছন্দের জায়গাগুলোয় নিজেদের অভিজ্ঞতা। এক সময় খাবারের প্রসঙ্গ ওঠে, ওতেও মিল। দু’জনই বাঙালি খাবার পছন্দ করে।
দশটা বেজে যায় গল্প করতে করতে। জল ছাড়া কেউ আর কিছু পান করে না।মাঝে একবার মিরিণ্ডা জাতীয় সফ্টড্রিংক্স নিয়েছে রোহন। তারপর টেবিলে খাবার সাজিয়ে দেয়। না, মোমবাতি জ্বালানোর প্রয়োজন মনে করে না ঋষিলা। খেতে খেতে রোহন বলে, ‘বাহ, বেশ কম তেলে, কম মশলায় রান্না তো। আমার মা’র রান্নার মতো। ‘আরতিদি ভালো রাঁধে'। রান্নার বেশ প্রশংসা করল রোহন।ঋষিলা থালায় নিজে খাবার বেড়ে নিল। রোহনের খাওয়া বেশ পরিপাটি। পরিপূর্ণ ভদ্রলোক। দেখে বেশ ভালো লাগে তার। কলকাতায় কেন আজ অবধি তার বাড়িতেও এমন ভদ্রলোক সে দেখেনি।চারিদিকে ফেলে ছড়িয়ে। খেয়ে ওঠার পর রোহন বলল,
- কাল তোমায় ডিনারে নিয়ে যাব কেমন! কলকাতার সবচেয়ে ভালো বাঙালি খাবারের রেস্টুরেন্টে।
- তোমার মা কী কী রাঁধেন, শুধু মারাঠী রান্না, নাকি বাঙালি রান্নাও? রোহন অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে যে তার মা মারা গেছেন এক বছর হলো। সড়ক দুর্ঘটনায়। দু'ভাই মায়ের সঙ্গেই থাকত। বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে দাদা। গাড়িটা সেদিন চালাচ্ছিল রোহন নিজে। দাদার বাড়ি থেকে ডিনার খেয়ে ফিরছিল নিজেদের বাড়িতে। মদ্যপান করেছিল খুব। বোমার মতো একটা ট্রাক ছুটে আসছিল তার গাড়ির দিকে, দেখতে পায়নি। ট্রাক এসে ধাক্কা মারল, আর গাড়িটা গড়াতে গড়াতে খাদে পড়ে গেল। ওখানেই মারা যায় মা। রোহন চোট পেয়েছিল, তবে হাসপাতালে দিন কুড়ি থাকার পর তা সেরে যায়। সেদিনের পর থেকে রোহন আর মদ ছোঁয়নি। মায়ের কথায় মায়ের কথা আসে। ঋষিলাও মায়ের গল্পে যোগ দেয়।অনেকদিন ভুলে ছিল নিজের মাকে। আজ যেন মা তার সামনে এসে বসেছেন। স্মৃতির ঝাঁপি দুজনেই খুলে বসে। দুজনের চোখই ভিজে ওঠে। রোহন তার মায়ের প্রসঙ্গ না তুললে সম্ভবত এভাবেই ঋষিলা ভুলে থাকত মাকে। বারোটা বেজে যায়। রোহন বলে, ‘আমি কোথায় ঘুমোব?’
ঋষিলা কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর হেসে বলে, ‘একটু দাঁড়াও। গেস্টরুমের বিছানাটা ঠিক করে দিই। চাদরটা চেঞ্জ করে দিই। আমার ঘরে এক্সট্রা বালিশ আছে, দিয়ে দিই।’
রোহন আগে কখনও কলকাতায় আসেনি। ঋষিলা বলে, কাল তোমাকে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে নিয়ে যাব। আর প্যানোরামায়। তোমার ভালো লাগবে।
রোহন ‘যে জন আছে নির্জনে’ বইটি হাতে নিয়ে মিষ্টি হেসে বলে, ‘এই বইটা কি রাতে পড়ার জন্য নিতে পারি? এটা আমার পড়া হয়নি।’
৩.
যে কটা দিন ছিল রোহন, কিশোর-কিশোরীর মতো ঋষিলা আর রোহন কলকাতার রাস্তায় টই টই করে ঘুরেছে, রাস্তার ধারের তেলেভাজা থেকে "ভজহরি মান্না" র খাবার কিছু বাদ দেয়নি। হাতেটানা রিকশায় চড়েছে গঙ্গায় নৌকো চড়েছে, যেদিকে খুশি সেদিকে চলে গেছে। ঋষিলা ভুলে গেছে তার চাকরি-বাকরি, তার সংসার, তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। যেন সে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, সবার নাগালের বাইরে, কোনো অচেনা আকাশে উড়েছে। সত্যিকার ‘ভালোলাগা’ বোধহয় একেই বলে। ঋষিলাকে রোহন উপহার দিয়েছে দু’টো চমৎকার কিউরিও আর গণেশ পাইনের একটা পেইন্টিং। প্রথম একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, যার সঙ্গে ভাবনা চিন্তার প্রায় সম্পূর্ণই মিল পেল ঋষিলা। জীবনের অনেক কথা বলেছে সে রোহনকে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার কথা, শিমূলের কথা, একরাশ দুঃখ-সুখের কথা। সব মন দিয়ে শুনেছে রোহন। রোহনও বলেছে, তবে বলার চেয়ে রোহন শুনতেই বেশি পছন্দ করেছে। মাত্র ক’টা দিনে কী অসম্ভব আপন হয়ে উঠেছে রোহন। যেন রোহন তার ছোটবেলার কোনো বন্ধু। যেন রোহনের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর জুড়ে সে এক্কা-দোক্কা খেলেছে, মার্বেল লাট্টু খেলেছে, পুকুরে মাছ ধরেছে, ঘুড়ি উড়িয়েছে। মাঝে মধ্যে বিয়ের পরের অতীতের কোনো ঘটনা বলতে গিয়ে তার চোখে জল এসেছে। আলতো করে বুকে টেনে তাকে শান্ত করেছে রোহন। রোহনের ওইটুকু স্পর্শই পেয়েছে ঋষিলা গোটা সাতদিনে। চুমু খেতে একবার দু’বার চেয়েছিল, কিন্তু বারণ করেছে নিজেকে। ভেবেছে, রোহন তো বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু ভাবছে না।
রোহন চলে যায়, ঋষিলাকে দিয়ে যায় ঋষিলার শ্রেষ্ঠ সময়। ঋষিলার আর জিজ্ঞেস করা হয়নি, ফেসবুকে "এক্সট্রা ম্যারাইটাল" নামের আড়ালে রোহনের চরিত্র কেন তার ফেসবুকের বাইরের রোহনের চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত? জিজ্ঞেস করেনি, অনুমান করে নিয়েছে, মায়ের মৃত্যুর কারণে যে ভীষণ গ্লানি আর শোকে ভুগছে রোহন, তা থেকে মুক্তি পেতেই আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে, ভিন্ন চরিত্রে। ঋষিলা কেন আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে! কিছু হয়ত তার ভেতরেও আছে, সে নিজেও জানে না। রোহন জানে কি? জিজ্ঞেস করা হয়নি রোহন জানে কি না। এ ক’দিনে একবারও ঋষিলার শরীরে বান ডাকেনি। শুধু মনেই ঝরেছে ফোঁটায় ফোঁটায় ভালোলাগার বৃষ্টি। ঋষিলার ফেসবুকের চরিত্রটা কি তার সত্যিকারের চরিত্র নয়! সে ভাবে, কোন রোহন সত্যিকারের রোহন! যে রোহনের সঙ্গে নেটে দেখা হয়, নাকি যে রক্তমাংসের রোহনের সঙ্গে বাড়িতে দেখা হলো! রক্তমাংসের রোহনই তো ফেসবুকের "এক্সট্রা ম্যারাইটাল", যার সঙ্গে রাতে রাতে তার শারীরিক উৎসব হয়। কত যে রহস্য একজন মানুষের ভেতর। সম্ভবত কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে বাস করে একজন মানুষের মধ্যে। একজন আরেকজনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
রোহনকে এয়ারপোর্টে "সি-অফ" করে যখন বাড়ি ফিরছিল, উদাস তাকিয়েছিল গাড়ির জানালায়, তখন এস্.এম্.এস্. আসে।
রোহন লিখেছে, "আই লাভ ইউ।এত সুন্দর একটা সম্পর্ক উপহার দেওয়ার জন্য।"
বুক কাঁপে ঋষিলার। তীব্র ভালো লাগা মন থেকে শরীরে ছড়িয়ে যায়।থরথর করে কাঁপা কাঁপা হাতে সে লিখল, "মি টু।"
শ্রাবণধারা দুচোখে।
গাড়ির পেনড্রাইভে সংরক্ষিত মোহরদির কণ্ঠে তখন বেজে চলেছে,‘চিরসখা হে ছেড়ো না মোরে…’
Ekdam tantan lekha. Rishila aar rohaner bhalolagar muhurtogulo manke chue gelo....
উত্তরমুছুনধন্যবাদ অচেনা বন্ধু...
উত্তরমুছুনধন্যবাদ অচেনা বন্ধু...
উত্তরমুছুন