সিদ্ধান্ত
-------
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
---------------------------------
ঐশী বড় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।
কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয় ! অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত একজন প্রফেসরের সঙ্গে ঐশীর বিয়ের কথা চলছে । আর এখানেই তার যত বিপত্তি ! যদিও সে আজও তার বাবার আদর্শে অবিচল, কিন্তু বিয়ের বেলায় বাবার মতের সাথে বনিবনা না হওয়ায় ভেতরে ভেতরে সে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে । অথচ বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দ্রোহের মানসিকতা কখনও সে পোষণ করবে না।সেও বাবার মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রী ধারী,গুণী ও ধৈর্য্যশীলা ।
....
......
ঐশীর জন্মের কয়েকদিন পরেই তার বাবা আশুতোষ বাবু শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে “রাষ্ট্রপতি পুরস্কার” পেয়েছিলেন বলে তিনি তাঁর মেয়ের নাম রেখেছিলেন ঐশী ,তাঁর স্ত্রী ঈশানী দেবীর নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। তার পরপরই আশুবাবুর কাছ থেকে তত্কালীন সরকার জনগণের জন্য আরও ভাল সেবা পাবার আশায় পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে অন্যত্র বদলী করে দিয়েছিল । সে কারণেই তাঁর সাথে শিক্ষা জগতের একটা ব্যবধান রচিত হয়ে গিয়েছিল । মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে শিক্ষা জগতের অপ্রত্যাশিত অবক্ষয়টা তিনি মোটেই আঁচ করতে পারেননি । বর্তমানে তাঁর বড় ছেলে শিবতোষের আচরণে তিনি কিছুটা হলেও বিব্রত এবং আশাহত !
....
.......
আশুবাবুর বড় দুই সন্তান, শিবতোষ এবং দেবতোষের ধারণা, তাদের বাবার সততার বিনিময়ে তাদের কাঙ্খিত প্রাপ্য থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে । বিশেষ করে, ঐশীর বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাদের মায়ের মৃত্যু তাদের মনে অনটনের স্মৃতিটা এখনও খচ্-খচ্ করে ব্যথা জাগায় । তাদের ধারণা, অনেক অর্থ যোগানোর সামর্থ্য থাকলে তাদের মায়ের মৃত্যুকে ঠেকানো যেত, যেটা ইচ্ছা করলেই বাবা পারতেন ! এই না পারার ব্যর্থতার জন্য তাদের বাবার সততাকেই তারা আজও দায়ী করে থাকে ! কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আজ অবধি ঐশী তার বাবাকে সব সময় এতটাই কাছে পেয়েছে যে, সে তার মায়ের অভাবটাকে কখনও বুঝতেই পারেনি, বরং কিছুটা বুঝতে শেখার পর থেকে তাদের জন্য তাদের বাবার ত্যাগটাকেই সে সবচেয়ে বেশী করে উপলব্ধি করেছে এবং যতই উপলব্ধি করেছে ততই বাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েছে ।
....
.......
একজন মহান শিক্ষকের সন্তান হিসেবে ঐশী তার বাবার জন্য দারুণ ভাবেই গর্বিত, কিন্তু তার বাবার মহান পেশার অবনমনকে আজ আর সে আগের মত মহৎ বলে মেনে নিতে পারছে না বলে মাঝে-মধ্যেই খুব হতাশায় ভোগে ! যদিও তার বাবার মনে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আজও সেই শ্রদ্ধাবোধ আগের মতই বিরাজমান । সে কারণেই তিনি তাঁর বড় ছেলেকে শিক্ষকতার প্রতি উৎসাহিত করেছিলেন এবং চেয়েছিলেন ছোট ছেলেও যেন এ পেশাতেই আত্মনিয়োগ করে । সেই সাথে মেয়ের বিয়েও তিনি একজন শিক্ষকের সাথে দেবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ।
.....
.......
শিবতোষ সবেমাত্র শিক্ষা জীবন শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বেড়িয়েছে । তখন তারই একজন সহপাঠী স্থানীয় রাজনীতির মাঠ কাঁপানো উঠতি নেতা ! তাদের বাড়ীর অনতিদূরেই শহরতলীতে একটা নতুন বি.এড্. কলেজ প্রতিষ্ঠার তোড়-জোড় চলছে । শিবতোষ চায়, সে সেই কলেজের সাধারণ কোন শিক্ষক হিসেবে নয়, একেবারে অধ্যক্ষ হিসেবেই যোগ দিয়ে কর্ম জীবন শুরু করতে ! তার বাবা আশুতোষবাবু খুবই একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ! আবালবৃদ্ধবণিতার সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে । আর শিবতোষ সে কারণেই তার বাবাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে নিজের অন্যায্য ইচ্ছা পূরণ করতে চায় ! আসলে দুর্বল মনের মানুষের আত্মবিশ্বাস যে কম হয়, শিবতোষই তার নিকৃষ্ট উদাহরণই বটে !
....
......
আশুবাবু বিষয়টাকে মোটেই ভাল ভাবে মেনে নিতে পারেন নি । তিনি চেয়েছিলেন, শিবতোষ আরও কিছুটা সময় নিয়ে ভাল ভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সরকারী কলেজের শিক্ষকতায় যোগদান করবে । তাতো হ’লোই না বরং তাঁর মত একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এমন একটা চাকরীর জন্য ছেলের পক্ষে সুপারিশ করতে গিয়ে খুবই ব্যথিত হলেন ! কারণ, তিনি এবং শিবতোষ দুজনেই জানতেন, উপরমহলে আজও তাঁর কথা কেউই ফেলতে পারবে না। তিনি জানতেন যে, তাঁর দুই পুত্রই তাদের মায়ের মৃত্যুর জন্য তাঁর আর্থিক সংকটকেই দায়ী করে । তাই তাঁর প্রতি তাদের অভিমান ও মনের ক্ষোভটাকে প্রশমিত করতেই তিনি এমন একটা অন্যায্য পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন !
....
......
ঐশী যতটাই গর্বিত তার বাবার জন্য, ঠিক ততটাই লজ্জিত তার বড় দুই ভাইয়ের জন্যও ! তার বড় ভাই শিবতোষের আয়ের চাইতে ব্যয়ের পাল্লাটা অনেক বেশী ভারী হওয়াটা মোটেই প্রত্যাশিত না । বিশেষ করে অধ্যক্ষ নামের সাথে কবি-সাহিত্যিক বিশেষণ টা যুক্ত করতে সে যে ভাবে অর্থের অপচয় করে, সেটা মোটেও দৃষ্টিনন্দন নয় ! ঐশী তার বড় ভাইয়ের পত্র-পত্রিকায় ছাপানো গল্প-কবিতাগুলো মাঝেমাঝে পড়ে । এইধরনের লেখা তার একেবারেই না-পসন্দ। তদুপরি শিবতোষ তার অপছন্দের একজন লেখককে হেয় করার জন্য, তার চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে, সেই লেখকের নামকে চরিত্র হিসাবে তৈরী করে এমন একটা গল্প লিখে পত্রিকায় প্রকাশ করলো, যাকে রীতিমত একটা পর্ণোগ্রাফী বলাই যুক্তিযুক্ত!
....
......
আর ছোট ভাই দেবতোষ ! সে তো আরও একধাপ এগিয়ে ! সে এখন মাঠের রাজনীতিতে নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টায় যেমন উৎসাহী তেমনি মনোযোগী ! সে মনে মনে প্রতিজ্ঞাই করেছে যে, সে এতদিন চৌত্রিশ বছর বিজয়ী অধুনা পরাজিতদের সাথে থেকে যেই আখের গোছাতে পারেনি, বর্তমান বিজয়ীদের সাথে থেকে সবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলবে ! নেতৃত্ব পাওয়ার ব্যাপারে সে তার বাবার নামকে ব্যবহার করে প্রতিপত্তি অর্জনের দৌড়ে সামিল হয়েছে বর্তমান ভোটে ! যা দেখে তাদের বাবা এখন শুধু বেদনাক্রান্তই নয়, ধরণীর প্রতি বীতশ্রদ্ধও হয়ে উঠেছেন ! সে কারণেই তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আদরের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে জাগতিক সংসার থেকে পালিয়ে বাঁচতে চান !
.....
.......
বরপক্ষ অনেকটা সময় ধরে ঐশীকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান ।বর বা কনের কারোরই ছবি না থাকার দরুণ আজ এই সামনাসামনি দেখাবার আয়োজন করা হয়েছে উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে।ঐশীর মনে এখনও সংশয় ! পাত্র ড: রমণীমোহন সেন তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের শিক্ষক ডঃ সেন নয় তো ! তখনই শুনেছিল, তিনি নাকি পি.এইচ্.ডি. করার জন্য দেশের বাইরে যাবেন । তিনিই ফিরে এসে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন নি তো ! নিজেকেই সে প্রশ্ন করে আবার স্বাভাবিক হবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । আবার ভাবছে, যদি তিনিই হয়ে থাকেন তাহলে কিভাবে বাবাকে বোঝাবে, ভেবে পাচ্ছে না । এমনই এলোমেলো ভাবনার মাঝে পাত্রপক্ষের সামনে এসে পাত্রের দিকে তাকাতেই ঐশীর সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেল ! মাথাটা একটা চক্কর দিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবার উপক্রম ! কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে সোফায় বসবার অনুমতি নিয়ে আর করুণাময়ের কৃপায় যে কোন ভাবেই হোক, এ যাত্রায় বেঁচে যাবার জন্য তাঁরই কাছে সাহায্য কামনা করতে করতে প্রায় টলতে টলতে সোফায় বসে পড়ল ।
- কি মামণি তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? পাত্রের বাবার উত্সুক জিজ্ঞাস্য।
- হুঁ - মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয় ঐশী।
- আচ্ছা, তুমি তাহলে ভেতরে গিয়ে রেস্ট নাও কেমন !
- আচ্ছা - বলে প্রতিনমস্কার জানিয়ে ভেতরে চলে আসে সে।
- আচ্ছা আশুবাবু........কথাবার্তা চলতেই থাকে....
....
.......
শোবার ঘরে এসে বসামাত্রই তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল তারই শিক্ষক রমণীমোহন সেনের সেই বিব্রত চেহারাটা । ঐশী তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের শেষ বর্ষের ছাত্রী আর সদ্য আগত রমণীমোহন সেন তাদেরই দারুণ হ্যান্ডসাম শিক্ষক । চূড়ান্ত পরীক্ষার আর বেশী বাকী নেই । ঐশীকে একদিন ক্লাসশেষে রমণীমোহন ডেকে বললেন,
- তোমাকে নিয়ে আমরা সবাই খুব আশাবাদী । তুমি এক সময় আমার বাড়িতে এসো, তোমাকে কিছু টিপস্ দেয়া উচিত্ বলে মনে করছি । - বলে তাঁর বাড়ির ঠিকানা লেখা কার্ডখানা এগিয়ে দেন।
অবশ্য ঐশী আসলে সবার মনেই আশা-জাগানিয়া ধরণেরই ছাত্রীও বটে । কথা মত ঐশী একদিন যাদবপুরে রমণীমোহন সেনের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই বাসীফুলের মত কুঁকড়ে যাওয়া তারই সহপাঠী সমাজতত্ত্বের আরেকজন ছাত্রী অনুশ্রীকে অবিন্যস্তভাবে রমণীমোহনের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে যেতে দেখে তার ভ্রু'টা কিছুটা কুঁচকে গিয়েছিল । কিন্তু কী মনে করে শেষ পর্যন্ত সে তার শিক্ষকের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেল ।
....
.......
কলিংবেল বাজাতে গিয়ে লোডশেডিং থাকায় নক করতে যেতেই ভেজিয়ে রাখা দরজাটা ঠেলা লেগে খুলে যেতেই রমণীমোহন সেন সামনে ঐশীকে দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়ে কি করবে ভেবে না পেয়ে শুধু তাকে বসতে বলে ত্রস্ত পায়ে ওয়াশ রুমের আড়ালে গিয়ে নিজেকে আড়াল করবার ব্যর্থ চেষ্টা করল মাত্র ।বসতে বসতে ঐশী বিছানায় এমন কিছু দেখে ফেলে, যা দেখার পর ঐশীর পক্ষে সেখানে আর এক মুহুর্তও অপেক্ষা করা সমীচীন ছিল না । ক্ষোভে-দুঃখে-ঘৃণায় তড়িত্গতিতে রমণীমোহনের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে সে রাস্তায় নেমে এলো !
.....
........
এই সেই রমণীমোহন সেন যিনি ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করে আজ তারই সাথে বিয়ের গাঁটছড়া বাঁধতে এসেছেন ! একেই বলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ! মানুষ কতটা বে-শরম আর নির্লজ্জ হলে এমনি করে তার কদর্য চেহারাটা মানুষের সমাজে তুলে ধরতে পারে ! ঐশীর বাবাও শিক্ষক ছিলেন, যিনি তাঁর ছাত্র-ছাত্রীকে সন্তান ভেবেই তাদের সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন । আর এই রমণীমোহন সেনও শিক্ষক, যিনি স্বয়ং বিষবৃক্ষে পরিণত হয়ে সমাজকে সমাজতত্ত্বের পাঠ না দিয়ে ধ্বংসতত্ত্বের পাঠ দেওয়ার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন !
ঐশীর মনে আর কোন দ্বন্দ্ব নেই।মনে মনে তৈরী হয়ে সে তার আসল সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে....
ঐ তো তার বাবা আশুতোষবাবু পাত্রপক্ষকে বিদায় জানিয়ে এদিকেই আসছেন।
- কি রে ঐশী মা? শরীরটা এখন ভালো লাগছে তো মা? কেমন লাগলো পাত্রকে দেখে?
- বাবা ! তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে.....
-------
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
---------------------------------
ঐশী বড় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।
কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয় ! অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত একজন প্রফেসরের সঙ্গে ঐশীর বিয়ের কথা চলছে । আর এখানেই তার যত বিপত্তি ! যদিও সে আজও তার বাবার আদর্শে অবিচল, কিন্তু বিয়ের বেলায় বাবার মতের সাথে বনিবনা না হওয়ায় ভেতরে ভেতরে সে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে । অথচ বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দ্রোহের মানসিকতা কখনও সে পোষণ করবে না।সেও বাবার মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রী ধারী,গুণী ও ধৈর্য্যশীলা ।
....
......
ঐশীর জন্মের কয়েকদিন পরেই তার বাবা আশুতোষ বাবু শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে “রাষ্ট্রপতি পুরস্কার” পেয়েছিলেন বলে তিনি তাঁর মেয়ের নাম রেখেছিলেন ঐশী ,তাঁর স্ত্রী ঈশানী দেবীর নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। তার পরপরই আশুবাবুর কাছ থেকে তত্কালীন সরকার জনগণের জন্য আরও ভাল সেবা পাবার আশায় পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে অন্যত্র বদলী করে দিয়েছিল । সে কারণেই তাঁর সাথে শিক্ষা জগতের একটা ব্যবধান রচিত হয়ে গিয়েছিল । মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে শিক্ষা জগতের অপ্রত্যাশিত অবক্ষয়টা তিনি মোটেই আঁচ করতে পারেননি । বর্তমানে তাঁর বড় ছেলে শিবতোষের আচরণে তিনি কিছুটা হলেও বিব্রত এবং আশাহত !
....
.......
আশুবাবুর বড় দুই সন্তান, শিবতোষ এবং দেবতোষের ধারণা, তাদের বাবার সততার বিনিময়ে তাদের কাঙ্খিত প্রাপ্য থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে । বিশেষ করে, ঐশীর বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাদের মায়ের মৃত্যু তাদের মনে অনটনের স্মৃতিটা এখনও খচ্-খচ্ করে ব্যথা জাগায় । তাদের ধারণা, অনেক অর্থ যোগানোর সামর্থ্য থাকলে তাদের মায়ের মৃত্যুকে ঠেকানো যেত, যেটা ইচ্ছা করলেই বাবা পারতেন ! এই না পারার ব্যর্থতার জন্য তাদের বাবার সততাকেই তারা আজও দায়ী করে থাকে ! কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আজ অবধি ঐশী তার বাবাকে সব সময় এতটাই কাছে পেয়েছে যে, সে তার মায়ের অভাবটাকে কখনও বুঝতেই পারেনি, বরং কিছুটা বুঝতে শেখার পর থেকে তাদের জন্য তাদের বাবার ত্যাগটাকেই সে সবচেয়ে বেশী করে উপলব্ধি করেছে এবং যতই উপলব্ধি করেছে ততই বাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েছে ।
....
.......
একজন মহান শিক্ষকের সন্তান হিসেবে ঐশী তার বাবার জন্য দারুণ ভাবেই গর্বিত, কিন্তু তার বাবার মহান পেশার অবনমনকে আজ আর সে আগের মত মহৎ বলে মেনে নিতে পারছে না বলে মাঝে-মধ্যেই খুব হতাশায় ভোগে ! যদিও তার বাবার মনে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আজও সেই শ্রদ্ধাবোধ আগের মতই বিরাজমান । সে কারণেই তিনি তাঁর বড় ছেলেকে শিক্ষকতার প্রতি উৎসাহিত করেছিলেন এবং চেয়েছিলেন ছোট ছেলেও যেন এ পেশাতেই আত্মনিয়োগ করে । সেই সাথে মেয়ের বিয়েও তিনি একজন শিক্ষকের সাথে দেবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ।
.....
.......
শিবতোষ সবেমাত্র শিক্ষা জীবন শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বেড়িয়েছে । তখন তারই একজন সহপাঠী স্থানীয় রাজনীতির মাঠ কাঁপানো উঠতি নেতা ! তাদের বাড়ীর অনতিদূরেই শহরতলীতে একটা নতুন বি.এড্. কলেজ প্রতিষ্ঠার তোড়-জোড় চলছে । শিবতোষ চায়, সে সেই কলেজের সাধারণ কোন শিক্ষক হিসেবে নয়, একেবারে অধ্যক্ষ হিসেবেই যোগ দিয়ে কর্ম জীবন শুরু করতে ! তার বাবা আশুতোষবাবু খুবই একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ! আবালবৃদ্ধবণিতার সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে । আর শিবতোষ সে কারণেই তার বাবাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে নিজের অন্যায্য ইচ্ছা পূরণ করতে চায় ! আসলে দুর্বল মনের মানুষের আত্মবিশ্বাস যে কম হয়, শিবতোষই তার নিকৃষ্ট উদাহরণই বটে !
....
......
আশুবাবু বিষয়টাকে মোটেই ভাল ভাবে মেনে নিতে পারেন নি । তিনি চেয়েছিলেন, শিবতোষ আরও কিছুটা সময় নিয়ে ভাল ভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সরকারী কলেজের শিক্ষকতায় যোগদান করবে । তাতো হ’লোই না বরং তাঁর মত একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এমন একটা চাকরীর জন্য ছেলের পক্ষে সুপারিশ করতে গিয়ে খুবই ব্যথিত হলেন ! কারণ, তিনি এবং শিবতোষ দুজনেই জানতেন, উপরমহলে আজও তাঁর কথা কেউই ফেলতে পারবে না। তিনি জানতেন যে, তাঁর দুই পুত্রই তাদের মায়ের মৃত্যুর জন্য তাঁর আর্থিক সংকটকেই দায়ী করে । তাই তাঁর প্রতি তাদের অভিমান ও মনের ক্ষোভটাকে প্রশমিত করতেই তিনি এমন একটা অন্যায্য পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন !
....
......
ঐশী যতটাই গর্বিত তার বাবার জন্য, ঠিক ততটাই লজ্জিত তার বড় দুই ভাইয়ের জন্যও ! তার বড় ভাই শিবতোষের আয়ের চাইতে ব্যয়ের পাল্লাটা অনেক বেশী ভারী হওয়াটা মোটেই প্রত্যাশিত না । বিশেষ করে অধ্যক্ষ নামের সাথে কবি-সাহিত্যিক বিশেষণ টা যুক্ত করতে সে যে ভাবে অর্থের অপচয় করে, সেটা মোটেও দৃষ্টিনন্দন নয় ! ঐশী তার বড় ভাইয়ের পত্র-পত্রিকায় ছাপানো গল্প-কবিতাগুলো মাঝেমাঝে পড়ে । এইধরনের লেখা তার একেবারেই না-পসন্দ। তদুপরি শিবতোষ তার অপছন্দের একজন লেখককে হেয় করার জন্য, তার চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে, সেই লেখকের নামকে চরিত্র হিসাবে তৈরী করে এমন একটা গল্প লিখে পত্রিকায় প্রকাশ করলো, যাকে রীতিমত একটা পর্ণোগ্রাফী বলাই যুক্তিযুক্ত!
....
......
আর ছোট ভাই দেবতোষ ! সে তো আরও একধাপ এগিয়ে ! সে এখন মাঠের রাজনীতিতে নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টায় যেমন উৎসাহী তেমনি মনোযোগী ! সে মনে মনে প্রতিজ্ঞাই করেছে যে, সে এতদিন চৌত্রিশ বছর বিজয়ী অধুনা পরাজিতদের সাথে থেকে যেই আখের গোছাতে পারেনি, বর্তমান বিজয়ীদের সাথে থেকে সবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলবে ! নেতৃত্ব পাওয়ার ব্যাপারে সে তার বাবার নামকে ব্যবহার করে প্রতিপত্তি অর্জনের দৌড়ে সামিল হয়েছে বর্তমান ভোটে ! যা দেখে তাদের বাবা এখন শুধু বেদনাক্রান্তই নয়, ধরণীর প্রতি বীতশ্রদ্ধও হয়ে উঠেছেন ! সে কারণেই তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আদরের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে জাগতিক সংসার থেকে পালিয়ে বাঁচতে চান !
.....
.......
বরপক্ষ অনেকটা সময় ধরে ঐশীকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান ।বর বা কনের কারোরই ছবি না থাকার দরুণ আজ এই সামনাসামনি দেখাবার আয়োজন করা হয়েছে উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে।ঐশীর মনে এখনও সংশয় ! পাত্র ড: রমণীমোহন সেন তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের শিক্ষক ডঃ সেন নয় তো ! তখনই শুনেছিল, তিনি নাকি পি.এইচ্.ডি. করার জন্য দেশের বাইরে যাবেন । তিনিই ফিরে এসে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন নি তো ! নিজেকেই সে প্রশ্ন করে আবার স্বাভাবিক হবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । আবার ভাবছে, যদি তিনিই হয়ে থাকেন তাহলে কিভাবে বাবাকে বোঝাবে, ভেবে পাচ্ছে না । এমনই এলোমেলো ভাবনার মাঝে পাত্রপক্ষের সামনে এসে পাত্রের দিকে তাকাতেই ঐশীর সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেল ! মাথাটা একটা চক্কর দিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবার উপক্রম ! কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে সোফায় বসবার অনুমতি নিয়ে আর করুণাময়ের কৃপায় যে কোন ভাবেই হোক, এ যাত্রায় বেঁচে যাবার জন্য তাঁরই কাছে সাহায্য কামনা করতে করতে প্রায় টলতে টলতে সোফায় বসে পড়ল ।
- কি মামণি তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? পাত্রের বাবার উত্সুক জিজ্ঞাস্য।
- হুঁ - মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয় ঐশী।
- আচ্ছা, তুমি তাহলে ভেতরে গিয়ে রেস্ট নাও কেমন !
- আচ্ছা - বলে প্রতিনমস্কার জানিয়ে ভেতরে চলে আসে সে।
- আচ্ছা আশুবাবু........কথাবার্তা চলতেই থাকে....
....
.......
শোবার ঘরে এসে বসামাত্রই তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল তারই শিক্ষক রমণীমোহন সেনের সেই বিব্রত চেহারাটা । ঐশী তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের শেষ বর্ষের ছাত্রী আর সদ্য আগত রমণীমোহন সেন তাদেরই দারুণ হ্যান্ডসাম শিক্ষক । চূড়ান্ত পরীক্ষার আর বেশী বাকী নেই । ঐশীকে একদিন ক্লাসশেষে রমণীমোহন ডেকে বললেন,
- তোমাকে নিয়ে আমরা সবাই খুব আশাবাদী । তুমি এক সময় আমার বাড়িতে এসো, তোমাকে কিছু টিপস্ দেয়া উচিত্ বলে মনে করছি । - বলে তাঁর বাড়ির ঠিকানা লেখা কার্ডখানা এগিয়ে দেন।
অবশ্য ঐশী আসলে সবার মনেই আশা-জাগানিয়া ধরণেরই ছাত্রীও বটে । কথা মত ঐশী একদিন যাদবপুরে রমণীমোহন সেনের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই বাসীফুলের মত কুঁকড়ে যাওয়া তারই সহপাঠী সমাজতত্ত্বের আরেকজন ছাত্রী অনুশ্রীকে অবিন্যস্তভাবে রমণীমোহনের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে যেতে দেখে তার ভ্রু'টা কিছুটা কুঁচকে গিয়েছিল । কিন্তু কী মনে করে শেষ পর্যন্ত সে তার শিক্ষকের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেল ।
....
.......
কলিংবেল বাজাতে গিয়ে লোডশেডিং থাকায় নক করতে যেতেই ভেজিয়ে রাখা দরজাটা ঠেলা লেগে খুলে যেতেই রমণীমোহন সেন সামনে ঐশীকে দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়ে কি করবে ভেবে না পেয়ে শুধু তাকে বসতে বলে ত্রস্ত পায়ে ওয়াশ রুমের আড়ালে গিয়ে নিজেকে আড়াল করবার ব্যর্থ চেষ্টা করল মাত্র ।বসতে বসতে ঐশী বিছানায় এমন কিছু দেখে ফেলে, যা দেখার পর ঐশীর পক্ষে সেখানে আর এক মুহুর্তও অপেক্ষা করা সমীচীন ছিল না । ক্ষোভে-দুঃখে-ঘৃণায় তড়িত্গতিতে রমণীমোহনের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে সে রাস্তায় নেমে এলো !
.....
........
এই সেই রমণীমোহন সেন যিনি ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করে আজ তারই সাথে বিয়ের গাঁটছড়া বাঁধতে এসেছেন ! একেই বলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ! মানুষ কতটা বে-শরম আর নির্লজ্জ হলে এমনি করে তার কদর্য চেহারাটা মানুষের সমাজে তুলে ধরতে পারে ! ঐশীর বাবাও শিক্ষক ছিলেন, যিনি তাঁর ছাত্র-ছাত্রীকে সন্তান ভেবেই তাদের সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন । আর এই রমণীমোহন সেনও শিক্ষক, যিনি স্বয়ং বিষবৃক্ষে পরিণত হয়ে সমাজকে সমাজতত্ত্বের পাঠ না দিয়ে ধ্বংসতত্ত্বের পাঠ দেওয়ার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন !
ঐশীর মনে আর কোন দ্বন্দ্ব নেই।মনে মনে তৈরী হয়ে সে তার আসল সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে....
ঐ তো তার বাবা আশুতোষবাবু পাত্রপক্ষকে বিদায় জানিয়ে এদিকেই আসছেন।
- কি রে ঐশী মা? শরীরটা এখন ভালো লাগছে তো মা? কেমন লাগলো পাত্রকে দেখে?
- বাবা ! তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে.....
ভাবনাটি বেশ। আরো একটু খুলে অর্থাৎ বিস্তার করে লেখা যেত।
উত্তরমুছুনOishee r mato meyera er beshi ar protibaad korte pare na go didi...
মুছুনবুঝতে পারছি না , সিদ্ধান্ত টা নেবার জন্য পাত্র চলে যাওয়া পর্যন্ত সময় কেন নিতে হল ঐশীকে . চরিত্র টাকে ঘটনাটা যেন দুর্বল করে দেয় . পাত্রের সামনেই বলার সাহস কবে খুঁজে পাবে ঐশী ???
উত্তরমুছুন