আয়না
--------
কাহিনীকার : স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
--------------------------------
*এক*
আজ অত্যন্ত ভ্যাপসা গরম । আর এই গরমে ঘাম মুছতে মুছতে বন্যা রাস্তা দিয়ে মলের দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ বন্যার চোখ পড়ে যায় মলের বাইরে একটা দোকানের দিকে। আজ অনেক বছর হলো এই দোকানটা চালাচ্ছে এক বুড়ীমা। নানা রঙের চুড়ি, ক্লিপ, আয়না এগুলো তার দোকানের পণ্য। ছাত্র ছাত্রী পথিক তার দোকানের ক্রেতা। বন্যা ভ্যানিটি খুঁজে দেখলো সেখানে কোনো আয়না নেই। তাছাড়া নতুন জায়গা, নিজেকে একটু পরিপাটি রাখা দরকার। একটা আয়না ব্যাগে থাকলে কাজটা সহজ হয়ে যায়। পাশের দোকান থেকে একটা আয়না কিনে তাতে চোখ রাখে বন্যা। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় শেষবারের মতো আয়নাতে চোখ রেখেছিল যে বন্যা, এ আয়নাতে সে যেন অন্য এক। রোদে পোড়া, কয়েক ঘণ্টা জার্নির ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট আয়নার মাঝে বন্যার মুখের ছাপে। মুখটা ব্যাগের মধ্যে বোতলে থাকা জল দিয়ে ধুয়ে আবার একবার আয়নায় মুখ দেখে বন্যা। তারপর আয়নাটা ব্যাগে ঢুকিয়ে আবার চলতে শুরু করে।
**দুই**
কুশল এম্.টেক্. করবার সময় থেকে চার বছরের ক্যাম্পাস জীবনের প্রতিদিনই প্রায় এই জায়গাটাতে এসে বসেছে তারা।মলের পাশের পাকা করা জায়গাটাতে বসতে ভালোই লাগে। কুশল আর বন্যা এইচ্.এস্. পর্যন্ত একই ব্যাচে পড়েছে। সেখান থেকেই মন দেওয়া-নেওয়া শুরু। একদিন যার কিনা একটা বুশশার্ট আর একটা ফেডেড্ জিনস্ ছাড়া আর কিছু ছিল না বললেই চলে ; আজ তারই কিনা নামী ব্র্যান্ডের থ্রি পিস্ স্যুট, নামী ব্র্যান্ডের শ্যু চকচক করে। চশমার ফ্রেমটা পরিবর্তন হয়ে নামী ব্র্যান্ডের হয়ে গেছে। ভালো চাকরীর সাথে সাথে নতুন ফ্ল্যাটও পেয়ে গেছে। দুজনে বিয়ে করবে আর কয়েক মাসের মধ্যেই। আজ নতুন দামী গাড়ি কিনেছে কুশল, তাই বন্যাকে আজ চড়িয়ে দুজনের স্বপ্ন-সওয়ারী হওয়ার দিন । একদিন যে কিনা বন্যার সুন্দর মুখের প্রেমে পড়েছিল বলে বন্যা বারবার আয়নায় মুখ দেখতো, এখন সেই কুশলই কিনা আর তার দিকে তাকাবার সময়ই পায় না। কুশলকে বন্যা দেখতে পাচ্ছে, পুরোনো বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। কুশল আসার আগে একবার আয়নাটা বের করে মুখটা দেখে নেয় বন্যা। কুশলের প্রথম দেখা বন্যার সাথে এই আয়নায় দেখা বন্যা যেন একদম আলাদা। কলসীর পেটের মত ফোলা চোয়াল, চুলগুলো আর আগের মত নেই। পার্লারের কৃত্রিম তাপে চুলের রংটা বদলে লাল হয়ে গেছে। আফগানী কামিজের মলিন কাপড়ের বদলে নতুন শাড়িতে কত জেল্লা দেখা যাচ্ছে।
- কি এত দেখছো বলতো?
....আয়না থেকে চোখ না ওঠাবার ফলে কুশলকে দেখতে পায় নি সে।
- বি মর্ডান বন্যা ! কি সেই আদ্যিকালের আয়না নিয়ে বসে আছো?
- না , মানে আমি মানে একটু ইয়ে...
....বলতে বলতে কুশল এসে বন্যার হাতের আয়নাটা কেড়ে নিয়ে একটা দামী মোবাইল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো-
- কেমন হয়েছে দেখোতো?নিজেকে একটু পাল্টাও বন্যা।
...কথাটা বলে কুশল আয়নাটা পাশের ময়লা ফেলার স্তূপে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।আর দুজনে এগিয়ে চললো নতুন কেনা গাড়ির দিকে...
***তিন***
মাঝ দুপুর, রাজু একটা বড়ো ব্যাগ নিয়ে ময়লা ফেলার স্তূপের মধ্যে প্লাস্টিক,কাগজ,ভাঙাচোরা জিনিস ইত্যাদি কুড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। কুশলদের গাড়ীটা স্টার্ট নিতেই গাড়ীর পিছনে এগজস্ট পাইপ কিভাবে বাতাস ছাড়ে নীচু হয়ে পরীক্ষা করতে গেল একটা প্লাস্টিক আটকে এগজস্ট পাইপের মুখে। গাড়ীর ড্রাইভার দেখতে পেয়ে এক ধমক দিতেই পাঁচিলের ভাঙা অংশের দিকে দৌড়াতে শুরু করে সে। সূর্যের আলো আয়নাটার উপর পড়ে আলোর চমক তার চোখে লাগে। রাজু আয়নাটা তুলে তাতে মুখ দেখতে গিয়ে দেখতে পায় রোদে-পোড়া,কালি-মাখা মায়ের কাছে শোনা ভূতের এক রুপ। ওতো মানুষ, তাহলে আয়নাতে এমন দেখাচ্ছে কেন? ট্যাপের জল দিয়ে মুখ পরিস্কার করে আবার আয়নাতে মুখ দেখে। মুখের কিছু অংশ ওই সাহেব বাড়ির ওর বয়সি আকাশের মতো লাগছে, কিন্তু কিছু অংশে যে এখনো কালি লেগে আছে ওর। যেভাবে হোক কালি তুলতে হবে, কাজ খুব সহজ। বড় রাস্তার মোড়ে মোটরসাইকেলের ওয়ার্কশপে গিয়ে নিজামত চাচার কাছ থেকে কালি তোলার তেল নিয়ে পরিস্কার করে ফেললে সাহেব হয়ে যেতে পারবে । তাই সময় নষ্ট না করে নিজামত চাচার দোকানে গিয়ে দাঁড়ায় রাজু।
- চাচা একটু তেল দেবেন, কালি তুলবো ।
- কে রে তুই ছোকরা ? পথে পথে নোংরা ঘেঁটে ঘুরিস সারাদিন। কি দরকার? মাগনা কি তেল দেওয়া যায়? ওই মোটরসাইকেলটা পরিস্কার করে দে, তেল পাবি ।
রাজু কাপড় নিয়ে বাইক পরিস্কার করতে শুরু করে, মাঝে মাঝে ছেঁড়া প্যান্ট এর পকেটে বারবার হাত দিতে থাকে, আয়নাটা যত্ন করে পকেটে রেখেছে তো? বাইক পরিস্কার শেষে উঠে দাঁড়ায় সে।
এবারে তেল দিতে পিছপা হয়না নিজামত মেকার। কিন্তু জিজ্ঞাসা করে আবার তেল দিয়ে কি হবে? রাজু উত্তর দেয়-মুখের কালি পরিস্কার করে সাহেব হব। নিজামত মেকার হাঃ হাঃ করে হেসে বলে ওঠে- আমার এখানে কাজ করবি ? আমি তোকে সাহেব বানিয়ে দেবো, আমার দোকান দেখাশোনা করবি, আমার ছেলের সাথে সময় কাটাবি। সে রাজি হয়ে যায়। দোকানের প্রায় সব কাজই ওকে দেখতে হয়। এমন কি নিজামত মিয়ার দোকানের ও বাড়ীর বাজার থেকে অনেক কাজই করতে হয় ওকে। প্রতিদিনই কাজ শেষে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আয়নায় চোখ রাখে রাজু। আয়নাটা পাবার প্রথম দিনের সেই রাজুর চেহারা আর আজকের রাজুর চেহারার অনেক পরিবর্তন। এখন রাজুর হাত এতবড়ো হয়ে গেছে যে হাতের কালি আর মুখে লাগে না। তাই সেটা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন হয়না রাজুর।
****চার****
আজ নিজামত চাচা তার ছেলে ববিকে নিয়ে এয়ারপোর্টে গেছে। ববি দেশের বাইরে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে যাচ্ছে।রাজুকেও নিজামত মিয়া আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিয়ে গেছে। দেশের বাইরে থেকে আসা বাইকের পার্টসের চালান বুঝে নেবার দায়িত্ব রাজুর। চালান বুঝে নিয়ে গাড়ি থেকে দোকানে ঢোকাতে একটা বাক্স হাতে তুলতে গিয়ে রাজু থমকে দাঁড়ায়। বাইকের পার্টসের বাক্স সেটার ভার এত হবে কেন?
কৌতূহলী হয়ে রাজু বাক্সটা খুলে একটা পার্টস হাতে নিতে গিয়ে হাত থেকে মাটিতে পড়ে যায় আর পার্টসটার রঙ্ চটে গেলে সে চমকে ওঠে। পার্টসের নাম করে সোনার বারের সোনালী রঙ্ চকচক করছে, রাজুর বুঝতে বাকি থাকে না তার মালিক নিজামত মিঞার দু'নম্বরি ব্যবসা আছে। এটাও বুঝতে পারে মোটরসাইকেলের দোকানের ব্যবসা করে কিভাবে এত অর্থসম্পদের মালিক হয়েছে নিজামত। সোনা চোরাচালানের মাধ্যমে সে এত ধনী হয়েছে। নিজামত মিঞা তো ওকে সাহেব বানাবে বলে কথা দিয়েছিল সে তো তার কথা রাখেনি। দোকানের এক কর্মচারী ছাড়া ওকে আর কিছু ভাবে না সে। আর ভাবার সময় নেই রাজুর কাছে। নিজামত মিয়া যে কোনো সময় ফিরে আসবে। নিজের কাঁধে ঝোলানো ঝুলিটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায় রাজু। এর মধ্যেই আছে তার সাহেব হবার আশা জাগানোর আয়নাটা, তার জীবনের সাথে জায়গা করে আছে এটা । দ্রুত বাক্সটা নিয়ে রেলস্টেশনের দিকে রওনা হ্য় রাজু।নিজামত তাকে যে মাস-মাইনে দিতো তা সঙ্গে নিয়ে নেয় সে। পথে দোকান থেকে একটা ব্রিফকেস কিনে সোনার বার গুলো তাতে সাজিয়ে নেয়। গায়ের পোষাক পাল্টিয়ে সাহেবদের মত পোষাক পরে নেয় রাজু । যে শহর রাজুর কালিঝুলি মাখা ভূত রূপ দেখেছে সেই শহরের মানুষ ওকে সাহেব হতে দেবে না। তাই এ শহর ছেড়ে অন্য কোন শহরের উদ্দেশ্যে যাবে বলে ট্রেনে উঠতেই, ট্রেন ছুটে চলে। তখন ট্রেনটি একটা নদীর ওপর ব্রিজে কান ফাটানো শব্দ করে ছুটে চলেছে। রাজু দেখতে পায় ট্রেনের টি.টি. আসছে ওর দিকে। রাজুর গায়ের পোষাক আর হাতের ব্রিফকেস এর সাথে কাঁধের ঝোলাটা সাহেবি ভাবের মধ্যে একটা প্রশ্ন বোধক চিহ্ন তৈরি করে । টি.টি. যদি প্রশ্ন করে ফেলে। হঠাৎ রাজুর বুদ্ধি কাজ করে মাথায়। বাম হাতটা দিয়ে কাঁধের ঝোলাটা টেনে নিয়ে নদীর উপচে পড়া জলেতে ছুঁড়ে দেয় আর দেখতে পায় আয়নাটি ঝোলা থেকে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে নীচে পড়ছে...
--------
কাহিনীকার : স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
--------------------------------
*এক*
আজ অত্যন্ত ভ্যাপসা গরম । আর এই গরমে ঘাম মুছতে মুছতে বন্যা রাস্তা দিয়ে মলের দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ বন্যার চোখ পড়ে যায় মলের বাইরে একটা দোকানের দিকে। আজ অনেক বছর হলো এই দোকানটা চালাচ্ছে এক বুড়ীমা। নানা রঙের চুড়ি, ক্লিপ, আয়না এগুলো তার দোকানের পণ্য। ছাত্র ছাত্রী পথিক তার দোকানের ক্রেতা। বন্যা ভ্যানিটি খুঁজে দেখলো সেখানে কোনো আয়না নেই। তাছাড়া নতুন জায়গা, নিজেকে একটু পরিপাটি রাখা দরকার। একটা আয়না ব্যাগে থাকলে কাজটা সহজ হয়ে যায়। পাশের দোকান থেকে একটা আয়না কিনে তাতে চোখ রাখে বন্যা। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় শেষবারের মতো আয়নাতে চোখ রেখেছিল যে বন্যা, এ আয়নাতে সে যেন অন্য এক। রোদে পোড়া, কয়েক ঘণ্টা জার্নির ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট আয়নার মাঝে বন্যার মুখের ছাপে। মুখটা ব্যাগের মধ্যে বোতলে থাকা জল দিয়ে ধুয়ে আবার একবার আয়নায় মুখ দেখে বন্যা। তারপর আয়নাটা ব্যাগে ঢুকিয়ে আবার চলতে শুরু করে।
**দুই**
কুশল এম্.টেক্. করবার সময় থেকে চার বছরের ক্যাম্পাস জীবনের প্রতিদিনই প্রায় এই জায়গাটাতে এসে বসেছে তারা।মলের পাশের পাকা করা জায়গাটাতে বসতে ভালোই লাগে। কুশল আর বন্যা এইচ্.এস্. পর্যন্ত একই ব্যাচে পড়েছে। সেখান থেকেই মন দেওয়া-নেওয়া শুরু। একদিন যার কিনা একটা বুশশার্ট আর একটা ফেডেড্ জিনস্ ছাড়া আর কিছু ছিল না বললেই চলে ; আজ তারই কিনা নামী ব্র্যান্ডের থ্রি পিস্ স্যুট, নামী ব্র্যান্ডের শ্যু চকচক করে। চশমার ফ্রেমটা পরিবর্তন হয়ে নামী ব্র্যান্ডের হয়ে গেছে। ভালো চাকরীর সাথে সাথে নতুন ফ্ল্যাটও পেয়ে গেছে। দুজনে বিয়ে করবে আর কয়েক মাসের মধ্যেই। আজ নতুন দামী গাড়ি কিনেছে কুশল, তাই বন্যাকে আজ চড়িয়ে দুজনের স্বপ্ন-সওয়ারী হওয়ার দিন । একদিন যে কিনা বন্যার সুন্দর মুখের প্রেমে পড়েছিল বলে বন্যা বারবার আয়নায় মুখ দেখতো, এখন সেই কুশলই কিনা আর তার দিকে তাকাবার সময়ই পায় না। কুশলকে বন্যা দেখতে পাচ্ছে, পুরোনো বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। কুশল আসার আগে একবার আয়নাটা বের করে মুখটা দেখে নেয় বন্যা। কুশলের প্রথম দেখা বন্যার সাথে এই আয়নায় দেখা বন্যা যেন একদম আলাদা। কলসীর পেটের মত ফোলা চোয়াল, চুলগুলো আর আগের মত নেই। পার্লারের কৃত্রিম তাপে চুলের রংটা বদলে লাল হয়ে গেছে। আফগানী কামিজের মলিন কাপড়ের বদলে নতুন শাড়িতে কত জেল্লা দেখা যাচ্ছে।
- কি এত দেখছো বলতো?
....আয়না থেকে চোখ না ওঠাবার ফলে কুশলকে দেখতে পায় নি সে।
- বি মর্ডান বন্যা ! কি সেই আদ্যিকালের আয়না নিয়ে বসে আছো?
- না , মানে আমি মানে একটু ইয়ে...
....বলতে বলতে কুশল এসে বন্যার হাতের আয়নাটা কেড়ে নিয়ে একটা দামী মোবাইল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো-
- কেমন হয়েছে দেখোতো?নিজেকে একটু পাল্টাও বন্যা।
...কথাটা বলে কুশল আয়নাটা পাশের ময়লা ফেলার স্তূপে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।আর দুজনে এগিয়ে চললো নতুন কেনা গাড়ির দিকে...
***তিন***
মাঝ দুপুর, রাজু একটা বড়ো ব্যাগ নিয়ে ময়লা ফেলার স্তূপের মধ্যে প্লাস্টিক,কাগজ,ভাঙাচোরা জিনিস ইত্যাদি কুড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। কুশলদের গাড়ীটা স্টার্ট নিতেই গাড়ীর পিছনে এগজস্ট পাইপ কিভাবে বাতাস ছাড়ে নীচু হয়ে পরীক্ষা করতে গেল একটা প্লাস্টিক আটকে এগজস্ট পাইপের মুখে। গাড়ীর ড্রাইভার দেখতে পেয়ে এক ধমক দিতেই পাঁচিলের ভাঙা অংশের দিকে দৌড়াতে শুরু করে সে। সূর্যের আলো আয়নাটার উপর পড়ে আলোর চমক তার চোখে লাগে। রাজু আয়নাটা তুলে তাতে মুখ দেখতে গিয়ে দেখতে পায় রোদে-পোড়া,কালি-মাখা মায়ের কাছে শোনা ভূতের এক রুপ। ওতো মানুষ, তাহলে আয়নাতে এমন দেখাচ্ছে কেন? ট্যাপের জল দিয়ে মুখ পরিস্কার করে আবার আয়নাতে মুখ দেখে। মুখের কিছু অংশ ওই সাহেব বাড়ির ওর বয়সি আকাশের মতো লাগছে, কিন্তু কিছু অংশে যে এখনো কালি লেগে আছে ওর। যেভাবে হোক কালি তুলতে হবে, কাজ খুব সহজ। বড় রাস্তার মোড়ে মোটরসাইকেলের ওয়ার্কশপে গিয়ে নিজামত চাচার কাছ থেকে কালি তোলার তেল নিয়ে পরিস্কার করে ফেললে সাহেব হয়ে যেতে পারবে । তাই সময় নষ্ট না করে নিজামত চাচার দোকানে গিয়ে দাঁড়ায় রাজু।
- চাচা একটু তেল দেবেন, কালি তুলবো ।
- কে রে তুই ছোকরা ? পথে পথে নোংরা ঘেঁটে ঘুরিস সারাদিন। কি দরকার? মাগনা কি তেল দেওয়া যায়? ওই মোটরসাইকেলটা পরিস্কার করে দে, তেল পাবি ।
রাজু কাপড় নিয়ে বাইক পরিস্কার করতে শুরু করে, মাঝে মাঝে ছেঁড়া প্যান্ট এর পকেটে বারবার হাত দিতে থাকে, আয়নাটা যত্ন করে পকেটে রেখেছে তো? বাইক পরিস্কার শেষে উঠে দাঁড়ায় সে।
এবারে তেল দিতে পিছপা হয়না নিজামত মেকার। কিন্তু জিজ্ঞাসা করে আবার তেল দিয়ে কি হবে? রাজু উত্তর দেয়-মুখের কালি পরিস্কার করে সাহেব হব। নিজামত মেকার হাঃ হাঃ করে হেসে বলে ওঠে- আমার এখানে কাজ করবি ? আমি তোকে সাহেব বানিয়ে দেবো, আমার দোকান দেখাশোনা করবি, আমার ছেলের সাথে সময় কাটাবি। সে রাজি হয়ে যায়। দোকানের প্রায় সব কাজই ওকে দেখতে হয়। এমন কি নিজামত মিয়ার দোকানের ও বাড়ীর বাজার থেকে অনেক কাজই করতে হয় ওকে। প্রতিদিনই কাজ শেষে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আয়নায় চোখ রাখে রাজু। আয়নাটা পাবার প্রথম দিনের সেই রাজুর চেহারা আর আজকের রাজুর চেহারার অনেক পরিবর্তন। এখন রাজুর হাত এতবড়ো হয়ে গেছে যে হাতের কালি আর মুখে লাগে না। তাই সেটা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন হয়না রাজুর।
****চার****
আজ নিজামত চাচা তার ছেলে ববিকে নিয়ে এয়ারপোর্টে গেছে। ববি দেশের বাইরে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে যাচ্ছে।রাজুকেও নিজামত মিয়া আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিয়ে গেছে। দেশের বাইরে থেকে আসা বাইকের পার্টসের চালান বুঝে নেবার দায়িত্ব রাজুর। চালান বুঝে নিয়ে গাড়ি থেকে দোকানে ঢোকাতে একটা বাক্স হাতে তুলতে গিয়ে রাজু থমকে দাঁড়ায়। বাইকের পার্টসের বাক্স সেটার ভার এত হবে কেন?
কৌতূহলী হয়ে রাজু বাক্সটা খুলে একটা পার্টস হাতে নিতে গিয়ে হাত থেকে মাটিতে পড়ে যায় আর পার্টসটার রঙ্ চটে গেলে সে চমকে ওঠে। পার্টসের নাম করে সোনার বারের সোনালী রঙ্ চকচক করছে, রাজুর বুঝতে বাকি থাকে না তার মালিক নিজামত মিঞার দু'নম্বরি ব্যবসা আছে। এটাও বুঝতে পারে মোটরসাইকেলের দোকানের ব্যবসা করে কিভাবে এত অর্থসম্পদের মালিক হয়েছে নিজামত। সোনা চোরাচালানের মাধ্যমে সে এত ধনী হয়েছে। নিজামত মিঞা তো ওকে সাহেব বানাবে বলে কথা দিয়েছিল সে তো তার কথা রাখেনি। দোকানের এক কর্মচারী ছাড়া ওকে আর কিছু ভাবে না সে। আর ভাবার সময় নেই রাজুর কাছে। নিজামত মিয়া যে কোনো সময় ফিরে আসবে। নিজের কাঁধে ঝোলানো ঝুলিটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায় রাজু। এর মধ্যেই আছে তার সাহেব হবার আশা জাগানোর আয়নাটা, তার জীবনের সাথে জায়গা করে আছে এটা । দ্রুত বাক্সটা নিয়ে রেলস্টেশনের দিকে রওনা হ্য় রাজু।নিজামত তাকে যে মাস-মাইনে দিতো তা সঙ্গে নিয়ে নেয় সে। পথে দোকান থেকে একটা ব্রিফকেস কিনে সোনার বার গুলো তাতে সাজিয়ে নেয়। গায়ের পোষাক পাল্টিয়ে সাহেবদের মত পোষাক পরে নেয় রাজু । যে শহর রাজুর কালিঝুলি মাখা ভূত রূপ দেখেছে সেই শহরের মানুষ ওকে সাহেব হতে দেবে না। তাই এ শহর ছেড়ে অন্য কোন শহরের উদ্দেশ্যে যাবে বলে ট্রেনে উঠতেই, ট্রেন ছুটে চলে। তখন ট্রেনটি একটা নদীর ওপর ব্রিজে কান ফাটানো শব্দ করে ছুটে চলেছে। রাজু দেখতে পায় ট্রেনের টি.টি. আসছে ওর দিকে। রাজুর গায়ের পোষাক আর হাতের ব্রিফকেস এর সাথে কাঁধের ঝোলাটা সাহেবি ভাবের মধ্যে একটা প্রশ্ন বোধক চিহ্ন তৈরি করে । টি.টি. যদি প্রশ্ন করে ফেলে। হঠাৎ রাজুর বুদ্ধি কাজ করে মাথায়। বাম হাতটা দিয়ে কাঁধের ঝোলাটা টেনে নিয়ে নদীর উপচে পড়া জলেতে ছুঁড়ে দেয় আর দেখতে পায় আয়নাটি ঝোলা থেকে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে নীচে পড়ছে...