শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৫

আয়না

আয়না
--------
কাহিনীকার : স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
--------------------------------

*এক*

আজ অত্যন্ত ভ্যাপসা গরম । আর এই গরমে ঘাম মুছতে মুছতে বন্যা রাস্তা দিয়ে মলের দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ বন্যার চোখ পড়ে যায় মলের বাইরে একটা দোকানের দিকে। আজ অনেক বছর হলো এই দোকানটা চালাচ্ছে এক বুড়ীমা। নানা রঙের চুড়ি, ক্লিপ, আয়না এগুলো তার দোকানের পণ্য। ছাত্র ছাত্রী পথিক তার দোকানের ক্রেতা। বন্যা ভ্যানিটি খুঁজে দেখলো সেখানে কোনো আয়না নেই। তাছাড়া নতুন জায়গা, নিজেকে একটু পরিপাটি রাখা দরকার। একটা আয়না ব্যাগে থাকলে কাজটা সহজ হয়ে যায়। পাশের দোকান থেকে একটা আয়না কিনে তাতে চোখ রাখে বন্যা। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় শেষবারের মতো আয়নাতে চোখ রেখেছিল যে বন্যা, এ আয়নাতে সে যেন অন্য এক। রোদে পোড়া, কয়েক ঘণ্টা জার্নির ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট আয়নার মাঝে বন্যার মুখের ছাপে। মুখটা ব্যাগের মধ্যে বোতলে থাকা জল দিয়ে ধুয়ে আবার একবার আয়নায় মুখ দেখে বন্যা। তারপর আয়নাটা ব্যাগে ঢুকিয়ে আবার চলতে শুরু করে।

**দুই**

কুশল এম্.টেক্. করবার সময় থেকে চার বছরের ক্যাম্পাস জীবনের প্রতিদিনই প্রায় এই জায়গাটাতে এসে বসেছে তারা।মলের পাশের পাকা করা জায়গাটাতে বসতে ভালোই লাগে। কুশল আর বন্যা এইচ্.এস্. পর্যন্ত একই ব্যাচে পড়েছে। সেখান থেকেই মন দেওয়া-নেওয়া শুরু। একদিন যার কিনা একটা বুশশার্ট আর একটা ফেডেড্ জিনস্ ছাড়া আর কিছু ছিল না বললেই চলে ; আজ তারই কিনা নামী ব্র্যান্ডের থ্রি পিস্ স্যুট, নামী ব্র্যান্ডের শ্যু চকচক করে। চশমার ফ্রেমটা পরিবর্তন হয়ে নামী ব্র্যান্ডের হয়ে গেছে। ভালো চাকরীর সাথে সাথে নতুন ফ্ল্যাটও পেয়ে গেছে। দুজনে বিয়ে করবে আর কয়েক মাসের মধ্যেই। আজ নতুন দামী গাড়ি কিনেছে কুশল, তাই বন্যাকে আজ চড়িয়ে দুজনের স্বপ্ন-সওয়ারী হওয়ার দিন । একদিন যে কিনা বন্যার সুন্দর মুখের প্রেমে পড়েছিল বলে বন্যা বারবার আয়নায় মুখ দেখতো, এখন সেই কুশলই কিনা আর তার দিকে তাকাবার সময়ই পায় না। কুশলকে বন্যা দেখতে পাচ্ছে, পুরোনো বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। কুশল আসার আগে একবার আয়নাটা বের করে মুখটা দেখে নেয় বন্যা। কুশলের প্রথম দেখা বন্যার সাথে এই  আয়নায় দেখা বন্যা যেন একদম আলাদা। কলসীর পেটের মত ফোলা চোয়াল, চুলগুলো আর আগের মত নেই। পার্লারের কৃত্রিম তাপে চুলের রংটা বদলে লাল হয়ে গেছে। আফগানী কামিজের মলিন কাপড়ের বদলে নতুন শাড়িতে কত জেল্লা দেখা যাচ্ছে।
- কি এত দেখছো বলতো?
....আয়না থেকে চোখ না ওঠাবার ফলে কুশলকে দেখতে পায় নি সে।
- বি মর্ডান বন্যা ! কি সেই আদ্যিকালের আয়না নিয়ে বসে আছো?
- না , মানে আমি মানে একটু ইয়ে...
....বলতে বলতে কুশল এসে বন্যার হাতের আয়নাটা কেড়ে নিয়ে একটা দামী মোবাইল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো-
- কেমন হয়েছে দেখোতো?নিজেকে একটু পাল্টাও বন্যা।
...কথাটা বলে কুশল আয়নাটা পাশের ময়লা ফেলার স্তূপে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।আর দুজনে এগিয়ে চললো নতুন কেনা গাড়ির দিকে...

***তিন***

মাঝ দুপুর, রাজু একটা বড়ো ব্যাগ নিয়ে ময়লা ফেলার স্তূপের মধ্যে প্লাস্টিক,কাগজ,ভাঙাচোরা জিনিস ইত্যাদি কুড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। কুশলদের গাড়ীটা স্টার্ট নিতেই গাড়ীর পিছনে এগজস্ট পাইপ কিভাবে বাতাস ছাড়ে নীচু হয়ে পরীক্ষা করতে গেল একটা প্লাস্টিক আটকে এগজস্ট পাইপের মুখে। গাড়ীর ড্রাইভার দেখতে পেয়ে এক ধমক দিতেই পাঁচিলের ভাঙা অংশের দিকে দৌড়াতে শুরু করে সে। সূর্যের আলো আয়নাটার উপর পড়ে আলোর চমক তার চোখে লাগে। রাজু আয়নাটা তুলে তাতে মুখ দেখতে গিয়ে দেখতে পায় রোদে-পোড়া,কালি-মাখা মায়ের কাছে শোনা ভূতের এক রুপ। ওতো মানুষ, তাহলে আয়নাতে এমন দেখাচ্ছে কেন? ট্যাপের জল দিয়ে মুখ পরিস্কার করে আবার আয়নাতে মুখ দেখে। মুখের কিছু অংশ ওই সাহেব বাড়ির ওর বয়সি আকাশের মতো লাগছে, কিন্তু কিছু অংশে যে এখনো কালি লেগে আছে ওর। যেভাবে হোক কালি তুলতে হবে, কাজ খুব সহজ। বড় রাস্তার মোড়ে মোটরসাইকেলের ওয়ার্কশপে গিয়ে নিজামত চাচার কাছ থেকে কালি তোলার তেল নিয়ে পরিস্কার করে ফেললে সাহেব হয়ে যেতে পারবে । তাই সময় নষ্ট না করে নিজামত চাচার দোকানে গিয়ে দাঁড়ায় রাজু।
- চাচা একটু তেল দেবেন, কালি তুলবো ।
- কে রে তুই ছোকরা ? পথে পথে নোংরা ঘেঁটে ঘুরিস সারাদিন। কি দরকার? মাগনা কি তেল দেওয়া যায়? ওই মোটরসাইকেলটা পরিস্কার করে দে, তেল পাবি ।
রাজু কাপড় নিয়ে বাইক পরিস্কার করতে শুরু করে, মাঝে মাঝে ছেঁড়া প্যান্ট এর পকেটে বারবার হাত দিতে থাকে, আয়নাটা যত্ন করে পকেটে রেখেছে তো? বাইক পরিস্কার শেষে উঠে দাঁড়ায় সে।

এবারে তেল দিতে পিছপা হয়না নিজামত মেকার। কিন্তু জিজ্ঞাসা করে আবার তেল দিয়ে কি হবে? রাজু উত্তর দেয়-মুখের কালি পরিস্কার করে সাহেব হব। নিজামত মেকার হাঃ হাঃ করে হেসে বলে ওঠে- আমার এখানে কাজ করবি ? আমি তোকে সাহেব বানিয়ে দেবো, আমার দোকান দেখাশোনা করবি, আমার ছেলের সাথে সময় কাটাবি। সে রাজি হয়ে যায়। দোকানের প্রায় সব কাজই ওকে দেখতে হয়। এমন কি নিজামত মিয়ার দোকানের ও বাড়ীর বাজার থেকে অনেক কাজই করতে হয় ওকে। প্রতিদিনই কাজ শেষে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আয়নায় চোখ রাখে রাজু। আয়নাটা পাবার প্রথম দিনের সেই রাজুর চেহারা আর আজকের রাজুর চেহারার অনেক পরিবর্তন। এখন রাজুর হাত এতবড়ো হয়ে গেছে যে হাতের কালি আর মুখে লাগে না। তাই সেটা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন হয়না রাজুর।

****চার****

আজ নিজামত চাচা তার ছেলে ববিকে নিয়ে এয়ারপোর্টে গেছে। ববি দেশের বাইরে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে যাচ্ছে।রাজুকেও নিজামত মিয়া আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিয়ে গেছে। দেশের বাইরে থেকে আসা বাইকের পার্টসের চালান বুঝে নেবার দায়িত্ব রাজুর। চালান বুঝে নিয়ে গাড়ি থেকে দোকানে ঢোকাতে একটা বাক্স হাতে তুলতে গিয়ে রাজু থমকে দাঁড়ায়। বাইকের পার্টসের বাক্স সেটার ভার এত হবে কেন?
কৌতূহলী হয়ে রাজু বাক্সটা খুলে একটা পার্টস হাতে নিতে গিয়ে হাত থেকে মাটিতে পড়ে যায় আর পার্টসটার রঙ্ চটে গেলে সে চমকে ওঠে। পার্টসের নাম করে সোনার বারের সোনালী রঙ্ চকচক করছে, রাজুর বুঝতে বাকি থাকে না তার মালিক নিজামত মিঞার দু'নম্বরি ব্যবসা আছে। এটাও বুঝতে পারে মোটরসাইকেলের দোকানের ব্যবসা করে কিভাবে এত অর্থসম্পদের মালিক হয়েছে নিজামত। সোনা চোরাচালানের মাধ্যমে সে এত ধনী হয়েছে। নিজামত মিঞা তো ওকে সাহেব বানাবে বলে কথা দিয়েছিল সে তো তার কথা রাখেনি। দোকানের এক কর্মচারী ছাড়া ওকে আর কিছু ভাবে না সে। আর ভাবার সময় নেই রাজুর কাছে। নিজামত মিয়া যে কোনো সময় ফিরে আসবে। নিজের কাঁধে ঝোলানো ঝুলিটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায় রাজু। এর মধ্যেই আছে তার সাহেব হবার আশা জাগানোর আয়নাটা, তার জীবনের সাথে জায়গা করে আছে এটা । দ্রুত বাক্সটা নিয়ে রেলস্টেশনের দিকে রওনা হ্য় রাজু।নিজামত তাকে যে মাস-মাইনে দিতো তা সঙ্গে নিয়ে নেয় সে। পথে দোকান থেকে একটা ব্রিফকেস কিনে সোনার বার গুলো তাতে সাজিয়ে নেয়। গায়ের পোষাক পাল্টিয়ে সাহেবদের মত পোষাক পরে নেয় রাজু । যে শহর রাজুর কালিঝুলি মাখা ভূত রূপ দেখেছে সেই শহরের মানুষ ওকে সাহেব হতে দেবে না। তাই এ শহর ছেড়ে অন্য কোন শহরের উদ্দেশ্যে যাবে বলে ট্রেনে উঠতেই, ট্রেন ছুটে চলে। তখন ট্রেনটি একটা নদীর ওপর ব্রিজে কান ফাটানো শব্দ করে ছুটে চলেছে। রাজু দেখতে পায় ট্রেনের টি.টি. আসছে ওর দিকে। রাজুর গায়ের পোষাক আর হাতের ব্রিফকেস এর সাথে কাঁধের ঝোলাটা সাহেবি ভাবের মধ্যে একটা প্রশ্ন বোধক চিহ্ন তৈরি করে । টি.টি. যদি প্রশ্ন করে ফেলে। হঠাৎ রাজুর বুদ্ধি কাজ করে মাথায়। বাম হাতটা দিয়ে কাঁধের ঝোলাটা টেনে নিয়ে নদীর উপচে পড়া জলেতে ছুঁড়ে দেয় আর দেখতে পায় আয়নাটি ঝোলা থেকে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে নীচে পড়ছে...

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৫

শঙ্কা-মেঘ

শঙ্কা-মেঘ
**********

কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
********************************

~এক~

এখন তাঁর পঁচাত্তর চলছে। সুঠাম দেহ টানটান ভাব হারালেও তেমন দুর্বল হয়ে যাননি তিনি। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে যান ঠিক বৌমার পুজোর ঘণ্টার আওয়াজে। কোনো অ্যালার্ম দরকার হয় না। রুটিন করে ঠিক ঘুম ভেঙ্গে যায়। স্ত্রী মারা গেছেন দশ বছর আগে। এরপর অনেকদিন ইম্সমনিয়া ছিল তাঁর। তারপর ক্রমেই এ অভ্যাস হয়ে গেছে তাঁর। যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে উঠে যেতে পারেন তিনি এখন। অথচ স্ত্রী সুষমা বেঁচে থাকতে ছিলো ঠিক উল্টো। স্ত্রীর ক্রমাগত ডাকে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ঘুম থেকে উঠতে হতো।
উঠেই কপট রাগে আঙুলের ইশারায় ডাকতেন, "সুমি শোনো"
- বলো ! কি বলবে। ওঠো বাজারে যাও।
- এদিকে এসো।
- বলো।
দুইহাতে গলা জড়িয়ে ধরে গালে এঁকে দিতেন ভালোবাসার চিহ্ন।
- উফ্ ! দস্যি কোথাকার ! ওঠো ! ওঠো !
বলে ঠেলে পাঠাতেন বাথরুমে।
....
........
তিনি বলদেব সেন,স্বাধীনতা সংগ্রামী।সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নিলেও পরোক্ষে তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে রাসবিহারী বসুর সাহায্যকারী হিসেবে স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ায় আজও খুব গর্ব হয় তাঁর। নরেন্দ্রপুরের এলাচি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এই বলদেব সেন। এখন থাকেন ছেলের সংসারে। খাঁচায় বন্দি বনের পাখি। সকালে যোগাসন শেষে রোজই তিরিশ মিনিট হাঁটেন তিনি। হালকা ডায়াবেটিস আছে তাঁর। উচ্চ রক্তচাপও আছে। রোজকার মতো হাঁটা শেষ করে বাড়ী ফিরে কলিংবেল চাপেন তিনি। দশ বছরের নাতনি সোমপ্রজ্ঞা দরজা খুলে দেয়-
" শুভ সকাল দাদুভাই।"
মন ভীষণ ভালো হয়ে যায় তাঁর। সোমপ্রজ্ঞাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ভেতরে ঢোকেন তিনি। মনে মনে প্রতিদিনই একমাত্র ছেলে সোমদেবকে ধন্যবাদ দেন এই জন্য যে, সন্তানকে তাঁরই শেখানো আদব-কায়দায় শিক্ষা দিয়েছে বলে।

~দুই~

ফুরফুরে মেজাজে চা শেষ করে আনন্দবাজার পত্রিকা হাতে নেন একটু ভয়ে-ভয়েই। কারণ প্রতিদিনই মনখারাপ করার মতো একাধিক খবর থাকে। আজ প্রথমেই খুব ভালো একটা খবর নজর কাড়ে তাঁর। অলিম্পিক্সে ভারতের জয় এবং তা নিয়ে সারাদেশের মানুষের উল্লাস। পতাকা নিয়ে মিছিল। আনন্দে চোখ ভিজে আসে তাঁর। চোখ বুজে সাতচল্লিশে ফিরে যান তিনি। আহা! কী আবেগ! কী ভালোবাসা পতাকা ঘিরে।তখন তাঁর বয়স মাত্র কুড়ি...
....
......
ভালোলাগার আবেশটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না তাঁর। চোখ আটকে যায় অন্য একটি খবরে- "প্রখ্যাত ব্যবসায়ীর বাড়ীতে পৌঁছোলো তাঁর অপহৃত শিশুপুত্রের লাশ" ।
পড়তে শুরু করেন তিনি।
....."দিন সাতেক আগে স্কুল থেকে ফেরার পথে বিখ্যাত ব্যবসায়ী অম্বরীশ লাহার শিশুপুত্র অপহৃত হওয়ার পর তাঁকে ফোন করে পাঁচ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন এবং নিউ ব্যারাকপুর থানায় এই বিষয়ে ডায়েরী করেন। উত্তর চব্বিশ পরগণার মাইকেলনগর এলাকায় বসবাসকারী অম্বরীশবাবুর একমাত্র পুত্রকে অপহরণকারীরা পুলিশে খবর দেওয়ার অপরাধে চার টুকরো করে কেটে একটি প্লাস্টিক বস্তায় ভরে গতকাল রাত পৌনে ১২টার দিকে বাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে যায় বলে জানান অম্বরীশবাবুর ভাই। নিহতের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলা যায় নি। বাড়ির বাকি লোকেরা বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দিচ্ছেন না। নিহত পদ্মনাভ লাহা মাইকেলনগরের সেন্ট অগাস্টিন বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র।.... --" আর এগোতে পারেন না তিনি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। খানিক আগের আনন্দাশ্রু এখন তাঁর বিষাদের কান্না। এমন অনেক খবরই তাঁর রোজ পড়তে হয়। ভেবে পান না তিনি দেশে কী হলো? মানুষ এতো নৃশংস হয়ে যাচ্ছে কেন?
.....
......
অন্য আরো অনেক খবরই তাঁকে বিচলিত করে। কষ্ট দেয় অনেক ঘটনা। সত্যের নির্বাসন আজ যেন অবধারিত সর্বস্তরে। মূল্যবোধের মূল্য নেই, মানবিকবোধ কেঁদে ফিরছে দ্বারে দ্বারে। মানুষের হঠাৎ গুম হয়ে যাওয়া আর অপরাধীর বড় সমাজপতি বনে যাবার বিষয়গুলো একজন নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেক পীড়া দেয় তাঁকে এই বয়সে। তিনি ভাবতেই পারেন না, সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কীভাবে ফাঁস হয়ে যেতে পারে ! পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নাকি মোবাইল ফোনে ঘুরে বেড়ায়। জাতি কি তাহলে মেধাশূন্য হয়ে যাবে?
"বাবা, আপনার স্নানের সময় হয়েছে।" - বউমা কাঁকনের কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ে তাঁর।
"এই যাচ্ছি মা।"
ভাবেন- এ যুগেও তাঁর ছেলে ও ছেলের বউ বেশ আন্তরিক; তাঁর যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে। ছেলে প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। সকালে বেরিয়ে যায়। ফেরে সেই রাত আটটার দিকে। তবু ফিরেই বাবার খোঁজ নেয় সে। সংসারে টানাটানি আছে, বুঝতে পারেন বলদেববাবু। কিন্তু তা নিয়ে কখনোই কেউ কোন অভিযোগ করেনি তাঁকে।
....
.......
সেদিন তাঁর এক সহযোদ্ধা মনীশ ফোন করেছিলো বনগাঁ থেকে। অনেক কষ্টের কথা জানালো- একমাত্র ছেলে ভালো চাকরি করে। থাকে কোলকাতায়। ছেলে খোঁজ খবর নেয় না বৃদ্ধ বাবা-মায়ের। শোনা যায়, মনীশের নাতি, উঠতি বয়সের ছেলেটি নাকি ড্রাগের নেশায় আসক্ত। হেরোইন, ব্রাউন সুগার ইত্যাদি খেয়ে ঝিম মেরে পড়ে থাকে সারাদিন। এসব শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গিয়েছিলেন বলদেব সেন।
....
.......
"দাদুভাই, দাদুভাই, দেখো আমি কেমন একটি ছবি এঁকেছি, গ্রামের ছবি। বলো তো কেমন হয়েছে?" নাতনি সোমপ্রজ্ঞা দৌড়ে এসে ছবিটি তাঁর হাতে দেয়।
"বাহ! খুব সুন্দর ছবি হয়েছে তো দিদিভাই। একেবারে আসল এক সবুজ গ্রাম।"
মেয়েটি সত্যি খুব সুন্দর ছবি আঁকে। অবসরের গল্প-সঙ্গী এই নাতনিটি তাঁর। কাছে টেনে কপালে চুমু খান তিনি সোমপ্রজ্ঞার। উঠে পড়েন স্নান সারার জন্য। তখনই বাইরে থেকে একটা মাইক অ্যানাউন্সের আওয়াজ পাওয়া যায়। কান খাড়া করেন তিনি, সাথে সোমপ্রজ্ঞাও।
....
......."জরুরী ঘোষণা...জরুরী ঘোষণা...
এ মহল্লারই দশ বছরের মেয়ে মুসকান্ কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে খেলতে বেড়িয়েছিল। ফেরেনি এখনো। পরনে ছিলো রেনবো কালারের ফ্রক। সন্ধান পেলে সোনারপুর থানায় অবশ্যই জানাবেন।"
বলদেব ভাবলেন, হয়তো আশেপাশেই কোথাও আছে। চলে আসবে মেয়েটি।

~তিন~

খাবার টেবিলে বসে বলদেব সবসময় নস্টালজিক হন। আগে কতো তাজা টাটকা খাবার পেতো তারা ! শাকসব্জি, ফলমূল, মাছ-মাংস স-অ-ব। তাঁদের বাড়ী ঘিরে আম, সবেদা, পেয়ারা, জামরুল, কাঁঠাল, কামরাঙা, বাতাবি, কলা, লেবু ইত্যাদির গাছ ছিলো। সেখানে আমগাছে প্রতিবছর মৌচাক হতো। মউলিরা মৌচাক কেটে নিয়ে যাবার সময়  বড় এক কৌটো খাঁটি মধু দিয়ে যেত। সেটা থাকতো সবসময় ঘরে। আর এখন ! সবকিছুতে ভেজাল। ভেজাল খেয়ে নানা দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ইদানীং ওষুধেও ভেজাল দিচ্ছে। কী হচ্ছে স্বাধীনতা পেয়েও? এইরকম চিন্তা-দূষণে আক্রান্ত পরিবর্তনের দেশ কি চেয়েছিলেন তখনকার মুক্তিকামী মানুষ? কষ্ট হয় এই ভেবে যে, তাঁর নাতিরা বিশুদ্ধ বা খাঁটি জিনিস কেমন হয় দেখতেও পারছে না। আহা !!
....
......
আরো দুটি বিষয় তাঁকে যারপরনাই ব্যথিত করে।
প্রথমতঃ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে দলবাজি, তাঁদের সামান্য সাহায্য দেওয়া নিয়ে জালিয়াতি। সেই জালিয়াতিতে আবার জড়িত থাকে স্বাধীনতাসংগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্তাগণের নির্লজ্জতা !
দ্বিতীয়তঃ যাদের এই দেশ থেকে বিতাড়ণ করা হল, তারাই আবার বিভিন্ন  বহুজাতিক সংস্থা হিসেবে ভালমানুষ হয়ে নানা পণ্যসম্ভার নিয়ে প্রবেশ করছে। আর তাদের হাত ধরে এদেশে আনছেন রাষ্ট্রনেতারা। দুঃখে তাঁর মাথাটা হেঁট হয়ে আসে। ভাবনাটা আবার মনে আসায় কষ্টটা সহযোগী হয়ে আসে। বুকের বাঁ-পাশটা চিনচিন করে ওঠে। একটা দহন হতে থাকে মনের ভেতর বাড়িতে।

~চার~

সন্ধ্যা পরবর্তী সময়। টিভিতে খবর দেখছিলেন বলদেববাবু। হঠাৎ শোরগোল শুনে ব্যালকনিতে বেড়িয়ে আসে সবাই। অনেক মানুষের কোলাহল...হট্টগোল....কান্নাকাটি....
বলদেববাবুসহ বাড়ীর সবাই মনে করলো- হয়তো হারানো মুসকানকে খুঁজে পেয়েছে। এ কান্না হয়তো আনন্দের।
কিন্তু না। ক্রমশ পরিষ্কার হলো সব। জানা গেলো- অপ্রত্যাশিত নির্মম সত্য।
পাশেই নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের সেপ্টিক ট্যাঙ্কে পাওয়া গেছে মুসকানকে। তবে জীবিত নয়। মিলেছে গলাকাটা-পেটকাটা মুসকানের লাশ। বিভিন্ন বডি-অর্গ্যান নিখোঁজ। আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। মাত্র দশ বছরের এই শিশু মুসকানের কোনো শত্রু থাকতে পারে ভাবাই যায় না। কী কারণে এ রকম পরিণতি হল নিষ্পাপ মুসকানের !
অগ্নিযুগের বিপ্লবী-বীর বলদেব সেন অসহায়বোধ করেন। শরীর অবশ হয়ে আসে তাঁর। চোখের সামনে দশ বছরের নাতনি সোমপ্রজ্ঞার মুখ ভেসে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে সোমপ্রজ্ঞাকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। যেন লুকোবেন কোথাও। লুকিয়ে রাখবেন সোমপ্রজ্ঞাকে। সাতচল্লিশের সেই বীরযোদ্ধা আজ যেন ভীষণ শঙ্কিত। কাঁপছেন তিনি। শঙ্কার মেঘে ছেয়েছে আজ তাঁর মানস-আকাশ।
...
......
বৌমা কাঁকন দৌড়ে এসে শ্বশুরমশাইকে ধরেন।
"কী হলো বাবা? এমন করছেন কেন?"
বলদেববাবু শুধু কোনমতে মুখে উচ্চারণ করলেন - "প্রজ্ঞা, প্রজ্ঞা।"
বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হলো তাঁকে। জরুরী ফোন করা হলো সোমপ্রজ্ঞার বাবাকে এবং ডাক্তারকে।
মাথায় জল ঢালা হচ্ছে বলদেববাবুর মাথায়। পাশে বসা নাতনি সোমপ্রজ্ঞা। সোমদেবও চলে এসেছে।
...এখন ডাক্তার আসার প্রতীক্ষায় সবাই..

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৫

অ-সুখ

অ-সুখ
---------

কাহিনীকার--স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
----------------------------------------------

এক
``````
"পেশেন্ট নম্বর ছয়। পাঁচ নম্বর পেশেন্ট ভেতরে আছে। এরপরই আপনি যাবেন কেমন !"
রজনীর সম্বিত্ ফেরে রিসেপ্সনিষ্টের ডাকে। এক অদ্ভুত অসুখে কিছুদিন যাবত্ ভুগছে সে। লাস্ট অ্যাপয়েন্টমেন্টে ডক্টর ম্যাডামকে আসল সমস্যাটার কথাটা বুঝিয়ে বলতেই পারেনি সে। কিছুকথা কি করে বলা সম্ভব ! অবশেষে ডাক্তার গোটা চারেক টেস্ট দিয়েছিলেন। রিপোর্ট হাতে নিয়ে আজ আবার এসে বসে আছে রজনী।
......
.........
"নম্বর ছয়, রজনী মিত্র..."
রিসেপ্সন থেকে ডাক পরে।
রজনীর রিপোর্ট গুলো ডাক্তার ম্যাডাম দেখছেন।
রজনী মিত্র বয়স আটচল্লিশ...
আরেক বার রক্তচাপ মেপে দেখলেন। একশো ষাট বাই একশো...হুম্ !!
ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন - রাতে ভালো ঘুম হয়?
- বেশী না ! দু থেকে তিন ঘন্টা।
- কোনরকম নেশা করেন?
- না, না।
- কোথায় কাজ করেন?
- একটা বেসরকারী স্কুলে শিক্ষিকা।
- চাকরী নিয়ে কোন ঝামেলা চলছে?
- না, না।
- ম্যানেজিং কমিটি বা ইন্সটিচিউশনাল হেড কি কোন খারাপ ব্যবহার করেন?
- না, না।
- যা বেতন পান তাতে কি সুখী? আই মিন্ কোনরূপ বেগ পেতে হয় কি?
- না, যা পাই আর হাসব্যান্ডের বিজনেসে যা ইনকাম তাতে বেশ সুন্দর চলে যায়।
- হুম্ ! আচ্ছা।
- কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে চাই।
- বলুন।
- বিয়ে করেছেন কতো বছর হলো?
- কুড়ি বছর।
- হাসব্যান্ডের সাথে সম্পর্ক কেমন?
- ভালোই।
- প্রেমের বিয়ে?
- হ্যাঁ।
- ছেলে মেয়ে ক'জন?
এই প্রশ্ন শুনে রজনীর বুকটা চমকে উঠে। এই বুঝি গোপন জায়গায় আঘাত দিয়ে ফেললেন ডাক্তার সাহেবা !
- একটিমাত্র মেয়ে। উত্তর দেয় সে।
- বয়স কতো?
- সতেরো বছর চলছে।
- কোন্ ক্লাসে পড়ে?
- ক্লাস ইলেভেনে পড়ে।
- মেয়ের কি কোন ছেলে বন্ধু আছে?আই মিন্ প্রেম-ট্রেম করে?
- না, না।
-খোঁজ নিয়েছেন?
- হ্যাঁ। তেমন কোন সমস্যা নেই।
- মেয়ে কি আপনাদের সাথে তর্ক করে?
- কখনো-সখনো।
- আপনার এই সমস্যা কতো দিন ধরে হচ্ছে?
- মাস খানেক হলো।
- আর্থিক দেনা আছে কারোর?
- না।
- ঠিক আছে। আপাতত এক মাসের ওষুধ দিলাম। এক মাস পর আবার আসবেন।
- কি বুঝলেন ডক্টর?
- একটু স্টাডি করতে হবে।তবে ঠিক হয়ে যাবে।কেস অফ হাইপারটেনশন মনে হচ্ছে।নো টেনশন।আনন্দে বাঁচুন।এই তো সামনে পুজো।চুটিয়ে আনন্দ করুন তো।ঠিক আছে...
- আচ্ছা, নমস্কার।আসি।

দুই
`````
অনীক ছোট সংসার নিয়ে বেশ সুখী। তেমন বাড়তি চাহিদা নেই। ছোট এই মফস্বল জেলা সদরে একটা দোতলা বাড়ি। নিজের বেতনের বাইরেও সাত হাজার টাকা বাড়ীভাড়া। বেশ স্বচ্ছল সংসার। একমাত্র মেয়ে পাখির যে কোন চাহিদা অনায়াসেই পূরণ করতে পারা বেশ সুখের। মেয়ের খুব সখ ছিলো মাধ্যমিকের পর একটা ল্যাপটপ্ সাথে ইন্টারনেট লাইন আর একটা স্যামসাং-এর স্মার্টফোন। বউ আর মেয়ের আবদারে শেষ পর্যন্ত কিনেই দেয়।
আজকাল বুঝতে পারে অনীক, যে রজনীর মন খুব বেশী ভালো যাচ্ছে না। সবসময় আনমনা থাকে। কিছু জিজ্ঞাসা করলে হেসে এড়িয়ে যায়। তবে নিজেরও ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকায় এই সব নিয়ে বেশী ঘাঁটাতেও চায় না সে। তবে শরীর খারাপ থাকলে বেশ চিন্তা হয়। রাতে ঘুম হয় না বলে রজনীর চুলে আঙ্গুল চালিয়ে বিলি কাটতে কাটতে নিজেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।
রজনী ভোর রাত পর্যন্ত ডান বাম করে। স্বামীর আদরে তেমনভাবে সাড়াও দিতে পারে না আবার স্বামীকে বলতেও পারছে না তার এই অসুখের কথা। সারা রাত ধরে তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় নানা জটিল হিসাব নিকাশ। ক্রমেই মানুষের মধ্যে থেকে ন্যায়-অন্যায় বোধ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে ভালো আর খারাপ কাজের সংজ্ঞা। সভ্যতা পশুসুলভ কর্মগুলোর বৈধতা দিচ্ছে।
বিকিনি-গার্লরা এখন নাকি নতুন হটকেক। মহল্লার মোড়ের দোকানে পাঁচ দশ টাকায় স্কুলের ছেলেমেয়েদের এক্সট্রা মেমোরি কার্ডে বিক্রি হচ্ছে ভিডিও। তারা খোঁজ রাখে কার হাতে নতুন রিলিজ পাওয়া ভিডিওটি আছে। মুহূর্তেই বিনা পয়সায় শেয়ার করে নিচ্ছে Share It এর মাধ্যমে। রাষ্ট্র কিছুদিন নজরদারি চালালেও সমাজের কলরোলে আবার সব নির্বিকার। কারো কোন মাথাব্যথা নেই। রজনীর মনে হচ্ছে সব মাথাব্যথা যেন তার একার।
....আচ্ছা,সে কি তবে লুনাটিক হয়ে যাচ্ছে!!

তিন
````````
ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন। রজনী কয়েকদিনের ছুটি নিয়েছে ডাক্তারের পরামর্শে। দিনের বেলাতেও ঘুম পাচ্ছে আজকাল ওষুধের প্রভাবে। শুক্রবার বিকেলে হঠাৎ এক চটুল গানের সুরে ঘুম ভেঙে যায়। পাশের রুমে গিয়ে দেখে আদরের পাখি তার ল্যাপটপে দেখছে -"ইয়ে দুনিয়া পিত্তলদি... ও বেবী ডল মে সোনেদি..."
পর্ণ সুপার স্টার সানি লিওন এর ফিল্ম সুপার স্টার হয়ে ওঠা নাকি নতুনদের বেশ আকর্ষণ করছে। এখন নাকি অনেকেই উল্টোপথে উপরে উঠে আসার সহজ পথ খুঁজছে।
আজ রাতে ঘুমের ওষুধ আর কাজ করবে না বলে মনে হচ্ছে রজনীর....

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৫

নষ্ট মেয়ে

নষ্ট মেয়ে....

কাহিনীকার-স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
--------------------------------------------

এক
``````
দু'মাস আগে এই ঘরে একটা মেয়ে নিজের গলায় ছুরি বসিয়ে খুদখুশী করেছে। মালয়েশিয়ান শাবানা ছিলো অবিবাহিতা। সামনের ছুটিতে দেশে গেলে তার প্রেমিকের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। বুড়ো মোকসার আলম পুলিশের বড় কর্মকর্তা। তার বাড়িতে ঘটা এই মৃত্যু নিয়ে তাকে কোন জবাবদিহি করতে হয়নি। রান্না ঘরের পাশে ছোট্ট একটা ষ্টোর রুম। কাঠের কয়েকটি খালি বাক্স পরে আছে ঘরের কোণে। আরেক পাশে পুরোনো জামা কাপড়ের স্তুপ। মেঝেতে দুটি বিছানা। একটি বিছানা এখন শূন্য। সে বিছানায় শাবানা থাকতো। জাহানারা এই ঘরে এখন একা থাকে। জাহানারা এখন ঘরের আলো বন্ধ করে ঘুমোতে ভয় পায়। অন্ধকারে মনে হয় বিস্ফারিত চোখের মৃত শাবানার লাশ জাহানারাকে ফিসফিস করে বলছে - পালিয়ে যা জাহি। তুইও বাঁচবি না। পালিয়ে যা...
....প্রথম যে রাতে জাহানারা শাবানার কাছে এখানে আনার কারণ শুনে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে,বুড়ো দানবের ছেলে তখন তাদের ঘরে ঢুকে তার কোমরে লাথি কষায় আর অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। তারপর চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে গিয়ে....ওহ্!! কি যন্ত্রণা সারা শরীরে। এরপর থেকে যন্ত্রণার ভয়ে চিৎকার করতেও ভয় পায় জাহানারা।
বুড়ো দানবটা আজ রাতেও ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর। এর থাবা থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন পথই নেই। আজ তার খুব শরীর খারাপ। মাসের বিশেষ দিন। দানবটা সেই অজুহাত মানে না। পশুসুলভ যৌনাচারের একাধিক বিকল্প পথ জানা আছে তার। বুড়োর ছেলেটা তবু এইসব মানে। বুড়ো দানবটা তাও মানে না।

দুই
`````
গ্র্রামের শত শত পরিবার ডাক পিয়ন মফিজের অপেক্ষায় থাকে। চিঠির অপেক্ষায় থেকে অনেকেই মফিজের বাড়ি চলে আসে প্রিয় মানুষের চিঠির খোঁজ নিতে। ফজলুল মাষ্টারের মেয়ে মনোয়ারা প্রতিদিন বিকেলে বাসায় এসে কান্নাকাটি করে। দেড় মাস স্বামীর কোন চিঠি আসে না। গত মাসে পরিবারের খরচের টাকা আসে নি। মফিজ তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয় -"মা রে! অপেক্ষা কর। তোর জামাই আল্লার রহমতে ভালো আছে।"
যেদিন সত্যি সত্যি চিঠি আসে আনন্দে চোখে জল নিয়ে চিঠি খুলে পড়ে অজ্ঞান হয়ে সে মফিজের বাড়ির উঠোনে লুটিয়ে পড়ে। আগামী শুক্রবার বাগদাদে প্রকাশ্যে তার স্বামীর শিরশ্ছেদ করা হবে।
উনিশশো ছিয়াশি সাল। জাহানারা তখন ছয় বছরের শিশু। সেদিন বাবার চোখে জল দেখে কিছু না বুঝেই সেও কেঁদে ফেলে।

তিন
```````
আজ রাতে ঘুম হবে না জাহানারার। আজ রাত শুধু কেঁদেই কাটবে তার। সেই দিনগুলো মনে পড়ছে খুব। নীলশালুকের চরে ছোট্ট সেই গ্রাম। পাশে রূপনারায়ণ নদ। জবার বাগিচায় লাল হয়ে আছে নদের ধার। গোটা দশেক ছাগল নিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরে জাহানারা। বাড়ির উঠোনে চেয়ারে-বেঞ্চে বসে আছে চার পাঁচ জন লোক। এক দেখাতেই পছন্দ। বর ট্রাক ড্রাইভার।পরদিন সন্ধ্যায় আম্মা-আব্বা আর নিকট আত্মীয়েরা মিলে নিকাহ্ করিয়ে দেয় জাহানারাকে।বরের খুব তাড়া।বাগদাদে ফিরে যাবে, তাই তার পরেরদিন রাতেই বউকে নিয়ে চলে যায়।
এক জাতের পুরুষ আছে এরা মনে করে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পর নারীর আর দেওয়ার কিছু থাকে না।জাহানারার বর রফিক ড্রাইভার সেই জাতের পুরুষ। ঘাটে ঘাটে নানা রকম নারীর শরীর ছুঁয়ে চেখে দেখা রফিকের মন ধরে রাখতে পারেনি জাহানারা।
ছেলের জন্মের পর তাই তার গা থেকে, মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসতে থাকে রফিকের নাকে। মাস ছয়েকের মাথায় রফিক নতুন বউ নিয়ে বাড়িতে আসে। গায়ের রঙ তার চাইতে ঢের উজ্জ্বল। কেউ কেউ বলে পতিতালয় থেকে নিয়ে আসা মেয়েটিকে রফিক নিকাহ্ করেনি।
ছয় মাসের শিশুপুত্রকে নিয়ে জাহানারা দেশে বাপের বাড়ি ফিরে আসতে চায়। কিছু দিন আগে দেশ থেকে আসা শেষ চিঠিতে আম্মা মারা গেছে খবর পেয়েছে। তার বোন আমিনার বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামেই। বোনের জামাই খুব ভালো মানুষ। শম্ভুগঞ্জ বাজারে ফার্নিচারের দোকান। বছর তিনেক ধরে প্যারালাইজড্ শ্বশুরের সেবা-শুশ্রূষা করে । মফিজের ছেলে সন্তানের অভাব আমিনার জামাই জব্বর পূরণ করে দিয়েছে।কিন্তু....
....চোখ খুলে দেখে রাস্তায় এক ডাস্টবিনের পাশে সে পড়ে আছে।পাশে তার অর্ধমৃত শিশুপুত্র। হঠাত্ তার সামনে ফরিস্তার মতো উদয় হয় পুলিশের এক কর্মকর্তা। নাম তার মোকসার আলম। তার সাহায্যে নানা জায়গায় খুঁজেও সে তার স্বামীর সন্ধান পায় না। অবশেষে শিশুপুত্রকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার তাগিদে মোকসার আলমের বাড়ীতেই পরিচারিকার কাজ নিতে বাধ্য হয়....

চার
``````
গত ছয় বছরে ছেলেটা অনেক বড় হয়েছে। এর মধ্যে মফিজ মারা যায়। আব্বাকে শেষ দেখার সুযোগও হয়নি। ছেলেটা মোকসারের ছেলের বউকেই মা বলে ডাকে। জাহানারা জানে তাদের কাছে তার সন্তান নিরাপদে আছে। তার পরও এই ভেবে বুকটা হাহাকার করে -সন্তান পেটে ধরার পরও তার ভাগ্যে বুঝি মা ডাক শোনার সুযোগ হবে না।লুকিয়ে ছেলের সাথে কথা বলে একদিন অনেক কষ্টে। কিন্তু ছেলের মধ্যে তাকে নিয়ে কোন আবেগ নেই। মায়ের খুব শুনতে ইচ্ছে হয় ছেলে তাকে বলছে -মা তুমি কেমন আছো? কিন্তু ছেলে তাকে এমন কোন প্রশ্নই করে না। সে হয়তো জানেই না জাহানারা তার আসল মা। সেদিন ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে ছেলের নিঃস্পৃহ উত্তরে দুই চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। জাহানারা জানতে চায় -বাবা ভালো আছো?
-হুঁ... ছেলে উত্তর দেয়।
-ভাত খেয়েছো?
-হুঁ...
-ইস্কুলে যাও?
-হুঁ...
-আচ্ছা যাই এখন..তোমাদের মতো নষ্টমেয়েদের সাথে দেখলে আম্মু-আব্বু রাগ করবে।
....আকাশ ভেঙে পড়ে জাহানারার মাথায়....
.....ওরে আমি নষ্ট মেয়ে নই রে! আমি যে তোর মা!!...কান্নায় ভেঙে পড়তে গিয়েও ভয়ে গিলে ফেলে কান্নাটা আর কান্নাটা বুকে গুমরে ঘুরে মরে।

পাঁচ
```````
জাহানারা, মোকসার আর তার ছেলের নির্যাতনের কথা কাউকে বলতে পারে না। বলে কোন লাভ নেই। তার মনে হয় আব্বা বুঝি তার খতের অপেক্ষায় আছে। কাগজ কলম নিয়ে আব্বার কাছে লিখতে শুরু করে খত।

আব্বা গো,
আমি ভালো নেই আব্বা। তুমি তো বলেছিলে আব্বা আরব দেশে সোনার মানুষ থাকে, কই তোমার সোনার মানুষ? এই দেশে উল্টো নিয়ম। আমি এই দেশের আজ নষ্ট মেয়ে আমার ছেলের চোখে, যে কিনা নিজেকে আজ মোকসার আলমের নাতি বলে নিজের পরিচয় জানে।যার জন্য আজ পর্যন্ত আমি যার যেমন ইচ্ছা নির্যাতন সহ্য করে বেঁচেছিলাম। কোন বিচার নেই। প্রকাশ করলে উল্টো আমার বিচার হবে। আমি আল্লার কাছে বিচার চাইলাম আব্বা। আল্লাই যেন এর বিচার করেন।
মা-বোনের ইজ্জতের দাম যে দেশে কাণাকড়িও নয়,সেই দেশের ধ্বংস অনিবার্য...এইটা আমার মতো নষ্ট মেয়ে, এই দেশের জন্য বদদুয়া দিলো...
তুমি ভালো থেকো আব্বা যেখানেই থাকো।তোমার জাহি মা ভালো নেই।

ইতি--
তোমার আদরের জাহানারা।
.....
........
চোখের জল মুছতে মুছতে জাহানারা বাবার কাছে লেখা চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের নীচে রেখে দিয়ে ফ্যানের ব্লেডে ওড়না বাঁধে....।

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৫

অসভ্য

অসভ্য....
----------
শিবাশিস্ আচার্য
-----------------------

এক
----
-‘তাহলে আই.ডি কার্ডটা আমাকে দিয়ে যাও’
-‘আমার সময় হবে না,তুমি এসে নিয়ে যাও’
-‘এখন যাব?’
-‘এখন না,আমি বাইরে। কাল সকালে এস।’
-‘কিন্তু,আমি তো রাতে ওবাড়ি চলে যাচ্ছি’
-‘তাতে কি ? সকালে এসে নিয়ে নেবে’
-‘এক্সট্রিম নর্থ থেকে এক্সট্রিম সাউথে আসতে হবে আমায়। স্কুলটা তো ঐ দিকেই’
-‘তার আমি কি করতে পারি? নিজের ছেলের জন্য এইটুকু করতে পারবে না?’
...
.....
রাগে গা’টা জ্বলে যাচ্ছিল সমন্বিতার। সাথে তীব্র অপমানবোধ। ভিড় মেট্রোতে দাঁড়িয়ে জবজবে ঘামে ভিজে যাচ্ছে শরীর,সাথে কিছু কৌতূহলী চোখের দৃষ্টি,বুঝতে পারছিল অনুমিতা, অনেকেই কান খাড়া করে শুনছে তার একতরফা সেলফোনে কথোপকথন আর সেই সঙ্গে মনগড়া কল্পনাও হয়ত করে ফেলছে অনেকেই। আরো অস্বস্তি হচ্ছিল সেই কারণে। কিন্তু, কিছুই করার নেই। কথা তাকে এখনই বলতে হবে। পিকুকে হস্টেল থেকে কাল নিয়ে আসবে অনুমিতা, ওর স্কুলের ছুটি পড়ছে। অপরাজিতের সাথে ঠিক হওয়া কোর্টের শর্ত অনুযায়ী এই ছুটিটা পিকু কাটাবে অনুমিতার সাথে। কিন্তু, অপরাজিতটা এতই অসভ্য, ইচ্ছে করে হ্যারাস করছে ওকে, বুঝতে পারছে অনুমিতা। কিন্তু, কিছু উপায় নেই। ছেলেকে কাছে পেতে ঐ অসভ্য লোকটার অসভ্যতামি সহ্য করে যেতেই হবে। যথাসম্ভব সহজ গলায় অনুমিতা বলল –‘তুমি বললে সেটাই করতে হবে।কিন্তু, কার্ডটা আজ পেয়ে গেলে আমার সত্যিই খুব সুবিধা হত। কোন উপায়ই কি নেই?’
ওপাশে নীরবতা ক্ষণিকের। অনুমিতার মনে হল যেন অদৃশ্য চোখদুটো সেলফোন ভেদ করেই জরিপ করছে তাকে। অবশেষে উত্তর মিলল –‘ঠিক আছে,ন’টা নাগাদ এস,আমি ফিরে আসব।’
-‘ন’টা! তাহলে আমি ওবাড়ি যাব কখন?’
-‘সেটা তোমার হেডেক, আমার নয়’
কট করে কেটে গেল ফোনটা।
-‘কি অসভ্য লোক রে বাবা’। বেশ জোরেই বলে ফেলল অনুমিতা। কৌতূহলী লোকজন আবার ফিরে তাকিয়েছে। কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে গেল ও। মনে হল যেন ওর সব কথাই প্রকাশ হয়ে পড়েছে এই অচেনা মানুষগুলোর কাছে। ব্যাগের চেন খুলে ফোনটা ঢুকিয়ে রাখল অনুমিতা,ভিড় মেট্রোতে ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়ানোই মুশকিল। সামনের সিটের ভদ্রমহিলা অকাতরে ঘুমোচ্ছেন,মুখটা হাঁ হয়ে আছে অনেকটা।কাছাকাছি খালি হওয়ার আশা আছে বলে মনে হয়না। এই ভিড় গরম চ্যাঁচামেচিতে কি করে ঘুম আসে কে জানে! আধঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেও বসার জায়গা পেল না অনুমিতা,স্টপেজ এসে পড়াতে ঠেলেঠুলে নেমে পড়ল কোনক্রমে। মনটা বিরক্তিতে ভরে আছে। রাত ন’টায় অপরাজিতের ওখানে গেলে আর কি ও বাড়িতে যাওয়া হবে আজ! অথচ যাওয়াটা খুব দরকার ছিল, কাল সকালে মা’কে নিয়ে ব্যাঙ্কে যাওয়া আছে একদম ফার্স্ট আওয়ারে, সেখান থেকে পিকুর হস্টেল। দেখা যাক যাওয়া যায় কি না। না হলে কাল ভোরে বেড়িয়ে পড়তে হবে। এলোমেলো ভাবনাতেই ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ল অনুমিতা। এখন সবে পাঁচটা বাজে। এত তাড়াতাড়ি কোনদিনই বাড়ি ফেরে না ও। আজ অফিসে হাফ ডে নিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হয়েছে, তাই এত জলদি। অপরাজিতের ওখানে রাত ন’টায় যাওয়া, সাড়ে সাতটাতে বেরোলেই হবে। হাতে এখনও সাড়ে তিন ঘন্টা সময়। চায়ের জল বসিয়ে হাত মুখ ধুয়ে এল। বারান্দার বেতের চেয়ারে শরীর এলিয়ে চায়ের কাপ হাতে কেটে গেল আধঘন্টা। এবার ঘর গোছানোর পালা। কাল ছেলে আসছে মাস সাতেক পরে। মাঝে দেখা হয়েছিল কয়েকবার, কিন্তু সে তো ত্রিশ মিনিট করে হস্টেলের গার্ডিয়ান্স মিট রুমে। টুকটাক ছুটিছাটায় অপরাজিতের ওখানেই যায় ও। কোর্টের অর্ডার সেরকমই। অনুমিতা বছরে দু’বার এক সপ্তাহের জন্য ছেলেকে কাছে রাখতে পারে শুধু। বছরের এই দু’টো সপ্তাহের অপেক্ষাতেই কেটে যায় দিনের পর দিন। পিকুর ঘরটা ভাল করে পরিস্কার করা হল। গোলাপি রং পিকুর ভীষণ প্রিয়। এই ঘরটার রং তাই গোলাপি, একটা গোলাপি আর লালের প্রিন্টেড বেডকভার পাতল অনুমিতা। পিকুর জন্য কেনা নতুন জামাকাপড়গুলো গুছিয়ে রাখল আলমারিতে। বাথরুমে নতুন গোলাপি টাওয়েল রাখল একটা। কাজ সেরে ঘরের দরজা ভেজিয়ে রেখে নিজের ঘরে গেল ও। জামাকাপড় পাল্টে বিশ্রাম নিল কিছুক্ষণ। পৌনে সাতটা বাজে প্রায়,চোখটা লেগে এসেছিল, ঘোর কাটল সেলফোনের আওয়াজে, ওপাশে অপরাজিত।
-‘বল’
-‘আজ আমি ফিরতে পারছি না, স্যরি!’
-‘মানে! তাহলে আমি কার্ডটা নেব কি করে?’
-‘নেবে না’
-‘মানে?’
-‘মানে এই উইকটা ও আমার সাথেই কাটাবে’
মাথাটা দপ করে উঠল অনুমিতার –‘এ আবার কি ইয়ার্কি হচ্ছে?’
-‘ইয়ার্কি না,সত্যি। এই উইকটা ও যাচ্ছে না তোমার কাছে’
-‘অসভ্যতামোর একটা লিমিট আছে। কোর্টের অর্ডার তুমি অস্বীকার করতে পারো না!’
-‘অর্ডারে বলা ছিল তেমন বিশেষ কারণবশত আমি ছেলেকে নাও ছাড়তে পারি’
-‘হ্যাঁ,কিন্তু, যথাযথ কারণটা কোর্টে বলতে হবে’
-‘বলব’
-‘কি বলবে?’
-‘কারণটা’
-‘তুমি এরকম করতে পারো না!’
চিৎকার করে উঠল অনুমিতা, অনেকটা আর্তনাদের মত শোনালো যেন নিজের কানেই।
-‘স্যরি মিতা, এই উইকটা ও আমার কাছেই থাক’
ফোনটা কেটে গেল। কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি বসে রইল অনুমিতা, তারপর ভেঙে পড়ল কান্নায়।লোকটা সারাটা জীবনে শান্তি দিল না একদণ্ড। কতদিন ধরে অপেক্ষা করে আছে সপ্তাহটার জন্য। প্রচণ্ডভাবে আকাঙ্খিত কোন বস্তু না পাওয়া গেলে কষ্টটা আরো তীব্র রূপ নেয়। কিছুতেই মেনে নিতে পারে না অনুমিতা এই অসহায়তা। বারবার ফোন করে অপরাজিতের সেলে,কিন্তু সুইচড্ অফ! বাড়িতে গিয়েও লাভ নেই কোন, জানে অনুমিতা, লোকটা বাড়িতে থাকবে না। নিঝুম বসে থাকে সে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ভাবে। চোখের জল শুকিয়ে আসে একসময়।ক্রোধের মাত্রা বাড়তে থাকে ক্রমশঃ।ইচ্ছে করে এই খেলাটা খেলল লোকটা, শুধুমাত্র তাকে আরো অসহায় করে দেওয়ার জন্য। তাকে কষ্ট দিয়ে চিরকালই লোকটা সুখ পেয়ে এসেছে। এতটা নির্দয়, এতটা ক্রূর, একটা মানুষ; এই মানুষটার সাথে পাঁচ পাঁচটা বছর কাটিয়েছে সে,ভাবলেই ঘৃণায় কুঁকড়ে যায় শরীর। এত সহজে ব্যাপারটা ছেড়ে দেবে না অনুমিতা,কোর্টে অ্যাপিল করবে কজ ভেরিফিকেশানের জন্য। তেমন বিশেষ কারণ ছাড়া অপরাজিত ছেলেকে ছাড়তে বাধ্য। আবোল-তাবোল চিন্তার মাঝে কখন যেন চোখটা লেগে এসেছিল। ঘুম ভাঙল ভোরের নরম আলোয়। সারারাত জানলাটা হাট করে খোলা, পর্দাটাও দেওয়া হয়নি। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে হাতমুখ ধুয়ে নিল। চা খেতে খেতে কি যেন ভাবল একবার, চটপট উঠে রেডি হয়ে নিল, ঘড়িতে তখন সাড়ে ছ’টা। এই সকালে অপরাজিত বাড়িতে থাকবে নিশ্চয়ই।একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। অনুমিতার ফ্ল্যাট থেকে অপরাজিতের বাড়ি মেট্রোতে মিনিট ত্রিশ লাগে। ব্যাগ কাঁধে বেড়িয়ে পড়ল অনুমিতা। অটো থেকে নেমে পাঁচ মিনিটের হাঁটা রাস্তা পেরিয়ে এসে দাঁড়াল অনমিত ভবনের সামনে,বহুকাল বাদে। বাড়িটার সামনে এসে কেমন যেন একটা কষ্টের অনুভূতি ছড়িয়ে গেল শরীরে। পাঁচ বছর সময়টা হয়ত খুব বেশি নয়, খুব কমও কি? দুঃখের হোক, অপমানের হোক, বিষাদের হোক, অথবা সুখের, তবু তো স্মৃতি। সময়ের ঘেরাটোপে আটকে পড়া প্রায় ভুলে যাওয়া অনুভূতিগুলো আবার জীবন্ত হয়ে উঠল যেন এই বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে। অবশ হয়ে আসা শরীরটা টেনে নিয়ে অনুমিতা এগিয়ে গেল গেটের দিকে। বড় একটা তালা ঝুলছে গ্রিলের দরজায়, ভেতরের কাঠের দরজাটাও তালা বন্ধ। নাহ্, আর কোন উপায় নেই। মোরামের রাস্তা ধরে ফিরে চলল সে। পিছনে বাড়িটা দাঁড়িয়ে রইল একা। একা সেও। জমে থাকা ক্রোধ পরিণত হল অদ্ভুত এক বিষণ্ণতায়।

দুই
----
কেটে গেল মাসখানেক। অনুমিতা আবার ফিরে এসেছে নিজস্ব ছন্দে। কোর্টে ভেরিফিকেশানের অ্যাপিল করা হয়েছে, এখনও উত্তর মেলেনি,উত্তরের আশা যদিও দুরাশা,তবু সে একেবারে নিরাশাবাদী নয়।অফিসে প্রচুর খাটনি গেছে আজ, মাথাটা ধরে আছে। একটা স্যারিডন খেয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল সে। রান্না করতে ইচ্ছে করছে না আর,রাতে ইচ্ছে হলে একটু আলুসেদ্ধ ভাত ফুটিয়ে নেওয়া যাবে। মিনিট কুড়ি পর মাথাব্যথাটা কমতে শুরু করল আস্তে আস্তে, ওষুধটা কাজ করছে। ঘণ্টাখানেক পর, প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছে, হঠাৎ করে বেজে উঠল সেলফোনটা, একরাশ বিরক্তিতে হাতে নিল অনুমিতা, অচেনা একটা নম্বর। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না একফোঁটাও,সাইলেন্ট করে দিল কলটা। কিন্তু,কেউ একজন যোগাযোগের জন্য ব্যগ্র,একের পর এক কল করেই চলেছে, চারটে মিসড্ কল হয়ে গেল। আবার বাজছে ফোনটা। নাহ্, কারো তো বিশেষ কোন দরকারও হতে পারে, ফোনটা এবার ধরল অনুমিতা –‘বলছি’
-‘মা!’
ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হৃদযন্ত্র। এ কার গলা শুনছে ওপারে! ধড়মড় করে উঠে বসল ও –‘পিকু!!’
-‘হ্যাঁ মা’
-‘তুই! কোথা থেকে!’
-‘হসপিটাল’
-‘কেন? ওখানে কেন!’
-‘বাবা এখানে ভর্তি মা’
-‘সেকি! কি হয়েছে বাবার?’
হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল ছেলেটা।
-‘হ্যালো হ্যালো! পিকু কথা বল বাবা! কি হয়েছে বাবার?’
কিছুক্ষণ পর ওপাশে একটা ভারি কন্ঠস্বর শোনা গেল –‘নমস্কার মিসেস মুখার্জী, আমি ডঃ অশ্রুময় সিনহা কথা বলছি। আপনার হাজব্যান্ড, ইয়ে মানে, এক্স-হাজব্যান্ড আমার আন্ডারে ভর্তি আছেন। আপনি হয়ত জানেন ওনার অসুখটা। মিস্টার মুখার্জি আমাকে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে বলেছেন আপনাদের ছেলের ব্যাপারে। আপনার নম্বরটা আমি ওনার কাছ থেকেই পেয়েছি’
-‘আমি জানি না। কি হয়েছে ওঁর !’
-‘ওহ স্যরি ম্যাডাম। উনি তাহলে আপনাকে ইচ্ছে করেই জানান নি। আসলে ওনার প্যাংক্রিয়াটিক ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ, অসুখটা আজকের দিনে অনেকাংশেই কিয়োরেবল, কিন্তু ওনারটা এতটাই দেরিতে ধরা পড়েছে যে আর কিছুই করার নেই। আপনি কাল একবার চলে আসুন প্লিজ’
-‘আমি এখনই যাব’
-‘কিন্তু,এখন তো প্রায় ন’টা বাজে। আপনার বাড়ি তো নর্থে। এটা কিন্তু এক্সট্রিম সাউথ’
-‘আপনি জায়গাটা বলুন,আমি আসছি’
লোকেশানটা বুঝে নিয়ে ফোনটা রেখে হতভম্বের মত বসে রইল অনুমিতা। মিনিট দুয়েক। সময় নেই আর। অফিসের শাড়িটা ছাড়া হয়নি ফিরে, ব্যাগ গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। রাতের দিকে একা ট্যাক্সিতে ওঠা নিরাপদ নয়, তবু আজ আর উপায় নেই। বড়রাস্তার মোড়ে একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল। উঠে বসল সে। দ্বিধাবিভক্ত মন আর অসাড় শরীরটা নিয়ে ছুটে চলেছে ট্যাক্সি রাতের শহর পেরিয়ে। নিয়নবাতিগুলো হুশহুশ করে ছুটে চলেছে অতীতে। শহর এখন জমজমাট। ফুটপাতে ব্যস্ত মানুষজন, রাস্তায় ব্যস্ত যানবাহন,এগিয়ে চলেছে নিজস্ব গন্তব্যে। সার সার হেডলাইটের আলো ছুটে চলেছে আপন কক্ষপথ ধরে। শুধু দ্বিধাবিভক্ত অনুমিতার একাংশ বারবার পিছিয়ে পড়ছে পনের বছর আগের ফেলে আসা সময়ের কাছে, যে সময়ের সবটাই স্বপ্ন, সবটাই সুন্দর,সবটাই জীবনে পরিপূর্ণ। একুশের অনুমিতা আর পঁচিশের অপরাজিত হেঁটে চলেছে কলেজস্ট্রিটের বইপাড়া ধরে, বাঁ হাতের তর্জনী জড়িয়ে রেখেছে ডানহাতের তর্জনীকে। আরো একটু এগিয়ে চলে সময়। অনুমিতা ছাব্বিশ, নতুন বউ এসেছে বাড়ীতে, শাঁখ-উলু-পাড়াপড়শি- আত্মীয়স্বজনে বাড়িটা সরগরম। শাশুড়িমায়ের হাত ধরে লাল পায়ে এগিয়ে চলা ভিতরবাড়িতে। তারপরের দু’টো বছর কেটে যায় স্বপ্নের মত। কোলজুড়ে আসা ছোট্ট ছেলেটাকে ঘিরে তাদের সুখী দাম্পত্য। দিনগুলো এগিয়ে চলে ঝড়ের গতিতে, যেন স্পর্শ করার আগেই ফুরিয়ে যায়। পাঁচটা বছরের স্মৃতিতে পরিপূর্ণ মন। কিন্তু,অদ্ভুত! তার পরের স্মৃতিগুলো আর মনেও নেই সে ভাবে। কত বিতৃষ্ণা,কত অপমান, লাঞ্ছনা, কত হতাশা, কিন্তু কই সেভাবে তো মনে করতে পারছেনা অনুমিতা। বি.এ. পড়ার সময় দর্শনশাস্ত্রে পড়েছিল, মানুষ যা মনে রাখতে চায়না, অবচেতন মন সেগুলোকে মুছে ফেলে স্মৃতি থেকে। সত্যিই তাই। খারাপ সময়টা সত্যিই মুছে গেছে, সেই সময় পেরিয়ে কাছে চলে এসেছে ঐ পাঁচটা বছরই। ভাবনার জালে আটকে থাকা মন আবার ফিরে আসে বাস্তবে, ট্যাক্সি এসে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালের গেটে। টাকা মিটিয়ে নেমে পড়ে অনুমিতা। ডঃ সিনহা অপেক্ষা করছিলেন চেম্বারে –‘আসুন ম্যাডাম,বসুন’
যন্ত্রচালিতের মত বসে পড়ে অনুমিতা।
-‘পিকুকে খেতে পাঠিয়েছি সিস্টারের সাথে,চলে আসবে এখুনি’
-‘ও কেমন আছে’
-‘ভাল না ম্যাডাম,আপনাকে তো বললাম, লাস্ট স্টেজ। এখন সেন্স প্রায় নেই বললেই চলে’
-‘আমার সাথে তো মাসখানেক আগেই কথা হয়েছিল’
-‘তখন অনেকটা ভাল ছিলেন। অবশ্য জানতেন নিজের শরীরের কথা। আমি বলেছিলাম ওনাকে, "ডেইজ্ আর নাম্বারড্"। তারপর তো দিন পনের কোথায় উধাও হয়ে গেলেন ছেলেকে নিয়ে,বললেন জীবনের সব আনন্দ একবারেই শুষে নিতে হবে ডাক্তার,আর তো সময় নেই।আমি যেতে বারণ করেছিলাম,কিন্তু শুনলেন না। ছেলের সাথে পাহাড় সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে যখন আর শরীর সায় দিচ্ছে না একেবারেই,তখন ফিরে এলেন কলকাতায়। আমাকে অবশ্য বলেছিলেন আপনার সাথে যোগাযোগ করতে ওনার অবর্তমানে। কিন্তু,এখন ওনার যা অবস্থা, আমার মনে হল আপনাকে জানানো উচিত। কতরকম সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে থাকে এক একটা সম্পর্কে’
কিছুক্ষণের নীরবতা। অনুমিতা বসে রয়েছে মাথা নীচু করে। ফোঁটা ফোঁটা জল ভিজিয়ে দিচ্ছে কোলের ওপর রাখা হ্যান্ডব্যাগটাকে।
-‘আপনি কি একবার দেখবেন ওনাকে?’
চোখ তুলে তাকাল অনুমিতা।
-‘আসুন,আসুন আমার সঙ্গে’
ডঃ সিনহার পিছন পিছন অনুমিতা এগিয়ে চলল আই.সি.ইউর দিকে। কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চারবেডের কামরায়। ৩০৪ নম্বর পেশেন্ট অপরাজিত মুখার্জি। অক্সিজেন মাস্ক,রাইস টিউব,স্যালাইন, আরো হাজারটা নলে বেষ্টিত শরীরটা দেখে চেনা যায় না হঠাৎ করে। শরীরটা শুকিয়ে যেন মিশে গেছে বিছানার সঙ্গে। ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া শীর্ণ হাতের আঙ্গুলগুলো কেঁপে উঠছে মাঝে মাঝে। কি অসহায় মানুষটা। শুষ্ক চোখে তাকিয়ে রইল অনুমিতা। বুকটা ফেটে যাচ্ছে কেন! কেন কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে! কেন মনে হচ্ছে সারাটা পৃথিবী একটা শূন্যস্থান ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষটা তো ছিলই না তার কাছে, আজ না হয় পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে যাওয়ার সময় আসন্ন, তাতে অনুমিতার কি আসে যায়! কত মানুষই তো চলে যাচ্ছে পৃথিবী ছেড়ে প্রতিমুহূর্তে। আরও একটা সংখ্যা বাড়বেই না হয়। অনুমিতার জীবনে তো কোন বদল আসা উচিত নয় এই কারণে। তবু কেন মনে হচ্ছে জীবনটা অর্থহীন হয়ে গেল হঠাৎ করে!
-‘চলুন ম্যাডাম,বেশিক্ষণ থাকা উচিত হবে না’
অনুমিতা বেরিয়ে এল কামরা থেকে। ডাক্তারের চেম্বারে বসে রয়েছে পিকু। মা’কে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল কোমর, কেঁদে ভাসাচ্ছে ছেলেটা। ছেলের মাথায় হাত দিতেই কান্নার দমক বেড়ে গেল আরো।
-‘আপনি ওকে আপনার সাথে নিয়ে যান ম্যাডাম’
-‘কিন্তু...’
-‘অনেক রাত হয়ে গেছে অবশ্য,আমি আপনাদের ফেরার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি’
ব্যস্ত হাতে ফোন লাগালেন ডঃ সিনহা। নিজের ড্রাইভারকে ডেকে পাঠালেন।
-‘আমার আজ নাইট শিফট। আমার ড্রাইভার আপনাদের পৌঁছে দেবে’
-‘আমি মায়ের কাছে যাব। ওখান থেকে যাওয়া আসার সুবিধা হবে, কাছেই একদম’
-‘বেশ। ড্রাইভারকে রাস্তাটা বলে দেবেন একটু’
ছেলেকে সঙ্গে করে অনুমিতা বেরিয়ে পড়ল হাসপাতাল থেকে। হঠাৎ করে সব কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। এত একাকীত্ব, এত শূন্যতা কার কাছে বন্ধক দেওয়া ছিল কে জানে!
পিকুকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে ওর দিম্মা। সকাল আটটা বেজে গেছে, ছেলে এখনও ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক। যতক্ষণ থাকতে পারে থাক, স্বপ্নের জগতে। ঘুমই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে সাংসারিক শোক দুঃখ থেকে,সাময়িক মুক্তি অন্তত। অনুমিতা স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিচ্ছে, যেতে হবে হাসপাতালে। ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ -‘হ্যালো’
-‘হ্যালো ম্যাডাম,আমি রেমিডি থেকে বলছি’
-‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বলুন’
-‘৩০৪ নম্বর পেশেন্ট ডিটরিয়রেট করছে। আপনি এখুনি চলে আসুন’
ফোন রেখে দিল অনুমিতা। প্রচন্ড এক তোলপাড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে অন্তর। এবার বোধহয় শেষবেলা আসন্ন। যেই মানুষটাকে গত দশবছর ধরে কেবল ঘৃণাই করে গেল, আজ তার মৃত্যুচিন্তায় নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে যাচ্ছে কেন! অদ্ভুত মানুষের চরিত্র! দরজা খুলে বেরতে যাবে, আবার ফোন কল।অচেনা নম্বর। ধরবে কি ধরবে না ভেবে ধরেই ফেলল অনুমিতা –‘হ্যালো’
-‘নমস্কার। আমি অ্যাডভোকেট বিপ্রতীপ রায় কথা বলছি’
-‘বলুন’
-‘মিস্টার মুখার্জি আমাকে অ্যাপয়েন্ট করেছেন। আপনাদের ছেলে পিকু মুখার্জির কাস্টডি উনি ট্রান্সফার করতে চান আপনার নামে। কাগজপত্র সব রেডি। আপনার বাড়িতে গিয়ে একদিন সই করিয়ে নিয়ে আসতে হবে শুধু। কবে যাব একটু বলবেন প্লিজ। হ্যালো ম্যাডাম, আপনি শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো হ্যালো হ্যালো .........’

রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৫

চেনা পথ...অচেনা পথ

চেনা পথ...অচেনা পথ
-----------------------------
শিবাশিস্ আচার্য
------------------------

হস্টেলের রুমের তালা খুলে ভিতরে ঢুকতেই মেঝেতে পড়ে থাকা পোস্টকার্ডটা নজরে এলো সাহেবের। সেটা তুলে হাতের লেখা দেখেই বুঝলো রাঙাকাকার চিঠি। ও কাপড় না ছেড়ে বিছানায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দুরু দুরু মন নিয়ে চিঠিটা পড়তে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে তার মুখমন্ডলে চিন্তার রেখা ফুটে উঠে। এই তো সবে আট-দশ দিন হল সে বাড়ী থেকে এসেছে। আবারও জরুরী তলব। তাও আবার আজকের মধ্যেই। সাহেব ভ্রু কোঁচকায় আর আঙুল দিয়ে কপাল চুলকোয়। কাকা তো সবই জানেন। চার মাস পর মাস্টার্স ফাইনাল। সেভাবে জানিয়েই সে এবার ফিরেছে। ইউনিভার্সিটিতে তুমুল ক্লাস হচ্ছে। সে আদা জল খেয়ে লেগেছে। দম ফেলার সুযোগ নেই। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক ঘষলো। মনে হয় কোন রহস্য আছে।
তার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে যায়। শেষ বিকাল। গাড়ী-ঘোড়া পাওয়া মুস্কিল। যাওয়া না যাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার তরীতে ভাসতে ভাসতে সামনে পরে থাকা চিঠিটার ঐ লাইন দুটো কয়েক বার পড়ে, লেখাপড়ার চাপ যতই থাকুক না কেন, অবশ্য অবশ্যই একুশে নভেম্বর শনিবারের মধ্যে বাড়ী আসিবে...।
সাহেব বরাবরই কাকার অনুগত। মা-বাবা অকালে গত হওয়ার পর অকৃতদার এই রাঙাকাকাই তার জীবনে সব...কিন্তু ...?
কপালে যা থাকে থাকুক। এক লাফে বিছানা ছেড়ে পাঁচ মিনিটে ব্যাগ গুছিয়ে একটা সাদা কাগজে খস্ খস্ করে বিষয়টি লিখে রুমমেট তমালের টেবিলে বইয়ের মধ্যে রেখে বেড়িয়ে পরে।

অবরোধের কারণে একটানা প্রায় পাঁচঘন্টা ট্রেন-নৌকা-মেশিনভ্যানের যাত্রাশেষে ভ্যান থেকে নামার আগে ভ্যানের ক্ষীণ আলোয় ঘড়ি দেখে তার মনের মধ্যে কেমন করে ওঠে। রাত বারোটা প্রায় বাজে। রাজমন্ডল মেইন রোড থেকে অশনিতলা গ্রাম প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মাইল। এখান থেকে শ্রীপুর বাজার পর্যন্ত প্রায় মাইল খানেক পাকা। বাকীটা মেটে এবং বিল বাদাড় পাড়ি দিয়ে যেতে হবে। এই রাত দুপুরে রিক্সা-ভ্যান তো দূরে থাক, মানুষের টিকিটার নিশানাও নাই।
নভেম্বর মাসের হালকা ঠাণ্ডাতেই জবুথবু অবস্থা। গাছের পাতা গুলো মনে হচ্ছে সবুজ রঙের সীসার পাত, একেবারে স্থির হয়ে আছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোন প্রকার সাড়া শব্দ নেই। যেন কোন নিষিদ্ধ এলাকা।
সাহেব ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে থু থু করে বার দুই তিনেক বুকের উপর থুতু ছেটায়। তারপর হাঁটতে শুরু করে। এ তো তার খুব চেনা পথ। অতএব তাকে আটকায় কে। এমনই একটা ভাব তার।
সরু পাকা রাস্তা। একটা বিশাল ফাঁকা ফসলী জমির ভিতর দিয়ে উত্তরে চলে গেছে। বাড়ী ঘর নেই। দুই ধারে ঝোপঝাড়। ডানে-বামে, এখানে-সেখানে, ছোট-বড় নানান জাতের শিশু, ইউক্যালিপটাস, দেবদারু, মেহগনি, শিমূল থেকে শুরু করে দুই একটা ফলের গাছও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্ধকারে বড় বড় গাছগুলো মনে হচ্ছে এক একটি দৈত্য। যেন তারা কোন শিকার ধরার জন্য ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে, বহু দূরে ঘন কালো দড়ির মত পাকানো গ্রামগুলো ঘুমন্ত পল্লীমায়ের রাত্রির ছবির মত মনে হয়। আকাশে সাদা-ছাই রঙের ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘ। ক্ষণে ঘনীভূত হয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে বৃষ্টির সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে গোল বিস্কুট দাঁতে কামড়ে খাওয়ার মত আধ ভাঙ্গা ত্রয়োদশীর চাঁদ মাঝে মাঝে উঁকি দেয় আবার মেঘের ভিতর লুকিয়ে পরে। যেন ঐ ভাঙ্গা চাঁদ সাহেবের এই নিঃসঙ্গ এবং দুঃসময়ের সাথী হয়ে তার সাথে লুকোচুরি খেলে চলেছে। সে নিজেকে চাঙ্গা রাখার জন্যে মনে মনে সুবীর সেনের বিখ্যাত গানটা গুনগুন করে-
"নয় থাকলে আরো কিছুক্ষণ, নয় রাখলে হাতে দুটি হাত,
নয় ডাকলে আরো কিছুকাছে, দেখো জ্যোত্স্না-ভেজা এই রাত"....

তার চলতি পথে একাকীত্বের ছলে নানা কথা মনে উঁকি-ঝুঁকি দেয়...কথাশিল্পী শরত্চন্দ্রের ভাষায়-"রাতের এক অসাধারণ রূপ আছে। বাস্তবের মুখোমুখি না হলে তার স্বাদ আস্বাদন করা যায় না।" আজকের রাতটা অন্যান্য রাতের মত নিকষ কালো নয়। এই রকম আবছায়া ভাবটা কখনও কখনও রহস্যময় হয়ে উঠে। তারপর যদি হয় ঝোপ-ঝাড়, বন-বাদাড় আর পাড়াগ্রাম, যেখানে বিদ্যুত্ নেই। রাতের সত্যিকার রূপ প্রকাশ পায় সন্ধ্যার পর। আটটা বাজতে না বাজতে সাধারণ মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে। সব ধরনের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়। ঝরা পাতা নীরবতা ভঙ্গ করে। তখন রজনী প্রকৃতির সাথে লীলায় মত্ত হয়। বাতাসে, গাছে, মাটিতে ওরা খেলে বেড়ায়। কৈশোরবেলায় কাকার কাছে শোনা সেই সব কথা হঠাৎ এখন মনে পড়ে যায়। আজকের রাতের সাথে সেসব রাতের অনেকটাই মিল, কেমন যেন ভূতুড়ে। সাহেবের বুকের ভেতর ঢিব-ঢিব করে উঠে। সে নিজেকে শুধরে নিতে মস্তিস্কের স্নায়ু নিয়ন্ত্রককে কষে ধমক দেয় এবং ভূত-টুত নেই বলে প্রচার প্রচারণা চালানোর জন্যে নির্দেশ দিয়ে কৃত্রিম খোস মেজাজ তৈরী করে গান ধরে আবার..।
হঠাত্ সাহেব নিজের কন্ঠের অপরিচিতি দশা দেখে ভড়কে যায়। কেমন যেন কাঁপা-কাঁপা গলা। ভূতের ভয় যদি একবার কাঁধে ভর করে আর ভূতুড়ে পরিবেশ যদি সঙ্গের সাথী হয় তবে তার হাত থেকে রেহাই পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এখন অন্ধকারে বড় বড় গাছ গুলোকেও অপরিচিত লাগছে। মনে হচ্ছে এক একটা বিরাট বিরাট...।

হঠাৎ বাম দিকে আলের মধ্যে কি যেন একটা নড়ে ওঠে। তার চিন্তা ভাবনা এলো মেলো হয়ে যায়। মনে হয় আবছা ছায়া ছায়া একটা সাদা থানকাপড় পড়া থুত্থুরে বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে তার দিকে হেঁটে আসছে। অনেকটাই জেলে পাড়ার শ্যামলের ঠাকুমার মত। কিন্তু তিনি তো...!! সাথে সাথে শ্যামলের ঠাকুমার চেহারাটা তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ধবধবে সাদা চুল। চোয়াল বসে গেছে। বসে যাওয়া চোখের কোটরে চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে। তার গা শিউরে উঠে। দু'হাতের রোমগুলো টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। দু’ কান দিয়ে গরম ভাপ বেরোচ্ছে। বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ করে। নিশ্বাস ঘন ঘন পড়ে। এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সে কি করবে স্থির করতে পারে না। হঠাৎ একটু দূরে ”ক্যা-হুয়া..ক্যা-হুয়া”...”হুক্কা-হুয়া” রব ওঠে। সাথে সাথে কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে সেদিকে ধাওয়া করে। সেদিকটা খেয়াল করে বামে তাকাতেই হতভম্ব। কোথায় সেই বুড়ী? ভোজ বাজির মত অদৃশ্য হয়ে গেছে। নিছক ভুল বোঝাবুঝি মনে করে সে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। ওসব সে থোড়াই-কেয়ার করে।
সাহেব একমনে হাঁটছে। হঠাৎ তার মনে হয় কে যেন তাকে অনুসরণ করছে। অস্পষ্ট পায়ের আওয়াজ পাচ্ছে- খস্ ... খস্ ...খস্ ...! প্রথম প্রথম পাত্তা দিলনা। কিন্তু আওয়াজ এখন অনেকটা স্পষ্ট।
মনে হয় কেউ ঠিক তার পিছনে। আর একটু হলেই তাকে ধরে ফেলবে। ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস ফেলছে। ভয়ে দম বন্ধ হবার যোগাড়। এ কি হলো? তার পা দু’টো যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোন অদৃশ্য শক্তি তার দেহকে সাপের মত পেঁচিয়ে ধরছে। সে প্রাণ পণ চেষ্টা করছে শ্রীপুরের দিকে যাওয়ার। কিন্তু কিছুতেই এগোতে পারছে না। এক একটা পা যেন এক মণ ওজন। পথ যেন শেষ হয় না। তবে কি সেই তার পিছু নিয়েছে ...? সাহেব রামনাম জপ করতে থাকে। সব কেমন যেন উল্টোপাল্টা হয়ে যাচ্ছে।উৎকন্ঠা নিয়ে সে পিছনে তাকায়। কই...? কিছুই তো নেই...। মনে মনে নিজেকে তিরস্কার করে। আর বিভ্রান্তিতে পড়বে না সে। যে কোন অবস্থাতেও।
এখন সাহেব শ্রীপুর বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মণি নদীর ব্রীজের উপর। ছোট্ট একটা ব্রীজ। রাস্তার দু’ পাশে দশ-বারোটা বাড়ী ঘর দেখা যায়। সামনে প্রায় পাঁচ’শ গজ এগোলেই ছোট্ট একটা বাজার। প্রায় সবই করোগেটেড টিনের তৈরী দোকান ঘর। একেবারেই গ্রামীণ পরিবেশ। মাথার উপর দিয়ে একটা বাদুর পত্ পত্ করে উড়ে গেল। বুকের মধ্যে ধক্ করে ওঠে। অন্ধকারে বাজারের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় দেখে দোকানপাট সব বন্ধ। একটা চায়ের দোকান লাগোয়া বেড়া বিহীন চালা ঘরে কয়েকটা বেঞ্চ। তার উপর একটা লোক নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। খুব সম্ভবতঃ পাহারাদার। লোকটাকে দেখেই গা রি-রি করে ওঠে। এলো মেলো লম্বা চুল। উস্কো-খুস্কো চেহারা। কাছে গিয়ে ইতস্ততঃ করে ডাকে- "ও ভাই ! এই যে শুনুন ! ও ভাই !"
লোকটা - এ্যাঁ ! এ্যাঁ ! করে ঢোক গিলতে গিলতে অন্যপাশে ফিরে শুয়ে নাক ডাকে।
বোঝাই যাচ্ছে ব্যাটা জুতসই নেশা করেছে। গাঁজা, ভাং এখন গ্রামে গঞ্জে ভরা। নেশাখোরকে ডাকা আর মরা মানুষকে ডাকা সমান। সে হতাশ হয়। ভেবেছিল ওর কাছ থেকে আশপাশের কোন ভ্যানওয়ালার বাড়ীর সন্ধান নিয়ে তাকে রাজি করিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাবে। ক্ষোভে তার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। টর্চ লাইটটা ও নিভু-নিভু হয়ে আসছে..একটা দেশলাই পর্যন্ত তার সাথে নেই। বিড়ি-সিগারেট না-খোরদের এই এক সমস্যা। নিঃসঙ্গ অন্ধকার রাত্রে একটা দেশলাইয়ের কাঠি যে কি উপকার করে তা ঠিক সময় মত বোঝা যায়। হতাশার একটা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে গেল। ক্লান্তি আর বিরক্তি উভয় তার চোখে মুখে তীব্র ভাবে ফুটে উঠেছে। পাশের বেঞ্চে মিনিট পাঁচেক হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকে।

শ্রীপুর বাজারটা পশ্চিম হয়ে বামে ঘুরে খানিকটা উত্তরে গিয়ে একটা গ্রামে গিয়ে শেষ হয়েছে। গ্রামের নাম রাণীগ্রাম। সে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের শেষ প্রান্তে চলে আসে। এখান থেকে মেটে সড়ক শুরু। তার দু’পাশে নানান জাতের ছোট বড় গাছ, ঝোপ-ঝাড়। ঐ সবের মধ্যে বাড়ী ঘর গুলো নিথর নিস্তব্ধ হয়ে ঘুমোচ্ছে। মনে হয় যেন কোন যাদুকর বহু বছর পূর্বে যাদু করে সব কিছুকে পাথর বানিয়ে বশ করে রেখেছে। হঠাৎ তার শমিতের কথা মনে পড়ে যায়। সে সাহেবের ছোট বেলার গ্রাম্যবন্ধু। এখানে তার নিজের মুদিখানার দোকানে দোকানদারী করে। রাণীগ্রামে শ্বশুর বাড়ীতে থাকে। মিনিট দশেকের রাস্তা।
নিকটেই কোন একটা গাছে কোঁ-কোঁ শব্দে একটা পাখি ডেকে উঠে। ঐ শব্দের ভিতর কেমন একটা পৈশাচিক ভাব আছে। মনের ভিতর আচমকা একটা ভীতি ভাব জন্মে। এসব ভাবনার মাঝে আবারও উঁকি দেয় খানিক আগে ঘটে যাওয়া সেসব কথা। ভয় ভয় ভাবটা থেকে থেকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সঙ্গে যোগ হয় সাপ, পোকার ভয়। এই গ্রাম পার হলে অনন্তের বিল। সে আর এক ইতিহাস। দিনে দুপুরেও লোক ভয় পায়। সাহেব নিজেকে অবশ্য সাহসী বলেই মনে করে। ওসব ভূত-টুত বিশ্বাস করে না। একটা বানিগাছের মোটা দেখতে ডাল ভেঙ্গে নেয়। হাত তিন-চারেক লম্বা। ভূত মোকাবিলা করার জন্য নয়, সাপ-পোকা মারার জন্য।
এই অন্ধকার রাত্রেও সাহেবের শমিতের শ্বশুর বাড়ী চিনতে অসুবিধা হয় না। বাড়ীর চার পাশে বড় বড় আম কাঁঠালের গাছ। মেহগনি, তাল, তেঁতুল আরও কত কি। ঘন গাছ গাছালির জন্য ঘুট ঘুটে অন্ধকার ভাব বিরাজ করে। একেবারে নিঃশব্দ বাড়ী। অবস্থা দেখে আঙ্গিনার বাইরেই তার গা ছম ছম করে ওঠে। তবুও শমিতকে ডাকার জন্যে সে আঙ্গিনায় প্রবেশ করে।
মূহুর্তের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে শোঁ-শোঁ শব্দে ঝড়ের বেগে বাতাস বইতে শুরু করে। গাছের শাখা-প্রশাখা, লতা-পাতা ছিঁড়ে লন্ড ভন্ড। বাঁশ ঝাড়ের গোটা তিনেক বাঁশ একবার বামে শুয়ে মাটি স্পর্শ করে আবার সরাত্ করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে।
ওরে বাবা রে ! মা রে ! কি সাংঘাতিক ব্যাপার?
আরও ভয়াবহ ব্যাপার ঝড় কেবল আঙ্গিনার মধ্যে ! আর সবখানে বাতাস স্তব্ধ।
হঠাৎ কোথা থেকে একগাদা শুকনো পাতা ঝপঝপ করে তার সামনে পড়ে জমা হতে থাকে। তার পর পরই বাতাসের ঘূর্ণিচক্রের খেলা শুরু হয়। তার চার পাশ দিয়ে বাতাস বন বন করে ঘুরতে থাকে। মনে হয় তাকে তুলে আছাড় মারবে। ধুলো-বালি, খড়-কুটো, শুকনো পাতা দিয়ে তার কান, মাথা, দেহ একাকার হয়ে যাচ্ছে। দম বন্ধ হবার উপক্রম। তার মনে হয় সে মারা যাবে। মাত্র বিশ পঁচিশ সেকেন্ড। যেন সব কিছু হাওয়ায় মিলে গেল। একে বারে সুনশান নীরব।
তার মনে নানান সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে- এসব কারও ইঙ্গিতে হচ্ছে না তো? না কি কোন অশরীরি আত্মা তার পিছু নিয়েছে? এসব কিসের সঙ্কেত? একি বিপদ হলো আজ?
সাহেব কাঁপতে কাঁপতে একটা চালা ঘরের কাছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়ায়। ঠিক ঘরটার পিছনে করুণ সুরে কে যেন কাঁদছে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত পা পাথরের মত স্থবির হয়ে গেল। মনে হচ্ছে তার পা হাঁটু পযন্ত মাটির ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। সে নিজের ভয় ধামা চাপা দেওয়ার জন্যে গর্জে ওঠে, কে কাঁদে?
কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না। মনে হয় কে যেন তার গলা টিপে ধরেছে। গলায় কাশি দিয়ে থুঃ করে কফ্ ফেলতে যায়। কিন্তু এক ফোঁটা থুতুও বেরুলো না। গলা শুকিয়ে কাঠ। আবারও চেষ্টা করে, কে ওখানে?
যেন ক্ষীণকন্ঠের ভূতুড়ে প্রতিধ্বনি হয়,
...আসছে ! ...সে আসছে !!
সেই সাথে কান্নার আওয়াজও থেমে যায়। কেমন যেন অস্বাভাবিক সব কিছু। হঠাৎ ঝড়! তারপর নীরবতা! এখন কান্নার শব্দ! এসব কি হচ্ছে? তবে কি সত্যি সত্যিই সেই সাদা শাড়ী পরা ছায়া মূর্তি তাকে অনুসরণ করে এখানে এসেছে?
সে ভয়ার্ত কন্ঠে আবারও বলে, কে আছেন? কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। এবার সাহেব পড়ি-মরি করে চীৎকার করে ওঠে, যেন ও মরে যাচ্ছে, শমিত ! এ শামু ! শিগগীর বের হ ! ওরা আমাকে...!
এবার চালা ঘরের মধ্যে থেকে কথার আওয়াজ পাওয়া গেল। মনে হল কোন অশীতিপর বৃদ্ধা রিন-রিনে নাকি কন্ঠে বলছে, "কে গো তুমি? সাহেব? শামু বিলে মাছ ধরতে গেছে। সাহেবের বুকের ভেতর ধড়াস করে ওঠে !
আরে ! সর্বনাশ !
অজানা অচেনা এক বৃদ্ধা তার নাম জানলো কি করে?
তারপর দেখলো ঐ চালা ঘরের জানালায় খানিক আগে রাস্তায় দেখা সেই থুত্থুরে বুড়ি দাঁড়িয়ে খিল খিল করে হাসছে। আচমকা ভূত দেখার মত পরিস্থিতি হয় তার। বে-হুঁশের মত, পাথরের মূর্তি হয়ে কতক্ষণ দঁড়িয়ে আছে বলতে পারবে না। হঠাৎ নারকেল গাছ থেকে কিছু একটা সর্ সর্ করে ছিঁড়ে ধপ করে মাটিতে পড়ার শব্দ হয়। তার হুঁশ ফেরে।
ওরে বাবারে! এ তো সত্যি সত্যিই পিশাচের আস্তানা! শিগগীর পালাও! বাঁচতে চাইলে এখানে আর এক মুহুর্তও নয়।
সে বিদ্যুত্ বেগে এক দৌড়ে মেটে রাস্তায় চলে আসে। তখনই ঘটে গেল আর এক কান্ড! ইয়া বড় একটা কি যেন থপ করে তার ডান পায়ের উপর আছড়ে পরে।
ওরে মা রে! মেরে ফেললো রে!
সে দু’ তিন পা হটে আসে। গাছের ডাল দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে শপাং শপাং করে মারে কয়েক ঘা। সম্ভবত কম্পমান হাতের জন্য আক্রমণ একশত ভাগ ব্যর্থ হয়।
ততক্ষণে নির্বিকার ব্যাঙ লাফাতে লাফাতে চলে গেল। এই দুঃসহ পরিস্থিতিতেও হাসি পেলো। এর পর আর সাহেবকে কে পায়। পড়ি কি মরি করে ছুটছে তো ছুটছে-ই। শমিতের আশা ত্যাগ করে মনে মনে রামনাম স্মরণ করে, হে রাম, এই বিপদে আমাকে রক্ষা কর, আমাকে ধৈর্য্য দাও...

সাহেব মাঝে মধ্যে গাছের ডাল দিয়ে ঠুক ঠুক করে মাটিতে আঘাত করছে আর মুখে হুস হুস করে শব্দ করে। উদ্দেশ্য সাপ-পোকা-মাকড়ের হাত থেকে বাঁচা। পিছনে কাল-মহিষের মত বীভৎস রূপ ধরে দাঁড়িয়ে আছে ভয়ংকর রাণীগ্রাম।
সে এখন অনন্তের বিলের পাশ দিয়ে সোজা উত্তরে চলে যাওয়া মেটে সড়ক দিয়ে হাঁটছে। নানা উৎকন্ঠা, শঙ্কায় মন ধুক ধুক করে। এই বিল এক সাংঘাতিক বিল। আশে পাশে কোন বাড়ী ঘর নাই। যতদূর চোখ যায় ধু-ধু মাঠ আর মাঠ। এখন ফসল বোনা হয়েছে। ভরা বর্ষায় থৈ থৈ করে। তখন এসব রাস্তাও ডুবে যায়। নৌকা ছাড়া চলাচল অসম্ভব। তখন যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল।
ও রূপাকে বলেছিলো, কোন এক ভরা বর্ষায় তাকে তাদের গ্রাম দেখতে নিয়ে আসবে। রূপা শর্ত দিয়েছিল; সারাদিন নৌকোতে ভাসবে, ভাসবে শুধুই ভাসবে। ক্ষিধে পেলে আউসের চালের লাল রঙের ভাতের সাথে কাঁচালঙ্কা-পেঁয়াজ, ডাল, আলু-বেগুনের ভর্তা। নৌকোর মাঝি হবে সাহেব এবং এক মাত্র সওয়ারী সে। শহরের মেয়ে রূপা আগামী কাল ক্যাম্পাসে গিয়ে যখন সাহেবের খবরটা তমালের কাছ থেকে পাবে, তখন নিশ্চয়....একটা লম্বা শ্বাস বেরিয়ে এলো সাহেবের।
এখন মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় মাটি ভেজা স্যাঁত সেঁতে। সড়কের দু’ এক জায়গায় গরুর গাড়ী চলাচলের জন্য গর্ত এবং তাতে কাদা জমেছে। দু’ ধারে ফসলী জমির মধ্যে মাঝে মাঝে ছোট বড় ডোবা। সেখানে এখনও লোকেরা মাছ ধরে। সড়কের দু’ ধারে জঙ্গল, ঝোপ-ঝাড়, হঠাৎ দু’ একটা ছোট বড় গাছ চোখে পড়ে। মূলতঃ চারিদিকে কেমন ফাঁকা ফাঁকা ভাব। তাতে চাঁদের ক্ষীণ আলো ফুটে উঠেছে। আবছা আলো-ছায়ার লুকোচুরি। প্রচন্ড তৃষ্ণা নিয়েও বেপরোয়া হাঁটছে।
বেশ দূরে আবছা ঘন কালো বড় বড় গাছের মত দুটো কি যেন দেখতে পেল সাহেব। আসলে ওগুলো প্রকান্ড দুটো বট গাছ। সবাই বলে ভাইটিতলা। ওটাই বিলের মাঝ ভাগ। এটাই এলাকার সবচাইতে ভয়ংকর জায়গা। ওখান থেকে আর মাইল দেড়েকের মত গেলেই ওদের গ্রাম। সে ঘড়ির দিকে চোখ রেখে অনুমান করলো রাত প্রায় তিনটা-সাড়ে তিনটা।
উহ্ যে ধকল গেল। জীবনে মনে থাকবে। হায় রে ! এই বিপদের দিনে টর্চ লাইট টাও ঠিক নেই। মনে থাকলে এমন বোকামি আর নয়। একটা কিনা গাছের ডাল সম্বল। এসব সাত-সতেরো ভাবতে ভাবতে এক সময় সে ঐ বট গাছের নিকটে পৌঁছে গেছে। হঠাৎ মনে হল দুই বট গাছের মাঝে রাস্তার ওপর কে যেন বসে আছে। দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে। সে জোরে চিৎকার করে বলতে যাবে, কে? কিন্তু তার আগেই লোকটা উঠে দাঁড়ায়। হাতে ত্রিকোণাকৃতির জালের মত কি একটা। মনে হয় জাল। সেটা কাঁধে নিয়ে হন হন করে সাহেবকে পেছনে ফেলে উত্তরে রাস্তা ধরে হাঁটা দেয়।
সাহেবের মনে হল ও নিশ্চয় শমিত। মাছ ধরতে এসে ক্লান্ত হয়ে এখানে বিশ্রাম করছে।
কিন্তু! সে তাকে না দেখার ভান করলো কেন? একটা চাপা দুঃখ দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এল। ধারণা করে হয়ত অন্ধকারে তাকে নাও দেখতে পারে বা চিনতে পারেনি। সাহেব বেশ উত্তেজিত। নতুন উদ্দীপনায় ডাকে, শামু! এ শামু!
কোন প্রত্যুত্তর নেই। শমিত এক মনে হাঁটে।
আবারও ডাকে, শামু! এ শামু, দাঁড়া।
মনে হল সে শুনতে পেয়েছে। তবে কথা না বলে ঘাড় বাঁকিয়ে হাতের ইশারায় আসতে বলল। দু’জনের দুরত্ব প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ গজ।
সাহেব ক্লান্ত দেহ হলেও আরও দ্রুত হাঁটতে থাকে। তৃষ্ণায় ক্ষুধায় দফা রফা হবার যোগাড়। তারপর ঘামে ভিজে চুপচুপে। তবুও প্রাণপণ হাঁটে। কিন্তু কিছুতেই ওর নাগালের মধ্যে আসতে পারে না। মাঝে মাঝেই সে ডাকে, শাম! এ শামু! শামু দাঁড়া না! শমিত একবারের জন্য হ্যাঁ বা না কিছুই বলে না। শুধু ধাঁ ধাঁ করে হেঁটে যায়।
সাহেব যত দ্রুত হাঁটে শমিত তত দ্রুত হাঁটে। দূরত্ব কিছুতেই কমে না।
সাহেব হাঁটছে তো হাঁটছেই ...। আর ঘেমে নেয়ে একাকার। অস্থির হয়ে গেল। আর কতক্ষণ? বিরক্তির শেষ পর্যায়ে। তবুও ডাকে, শামু দাঁড়া! এ শামু দাঁড়াবি তো! এভাবে কতোক্ষণ হেঁটেছে তা সে বলতে পারবে না।
তার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। শেষমেশ সাহেবের মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়; ব্যাপারটা কি? শত চেষ্টা করেও ওকে নাগালে না পাওয়ার কারণ কি?
সাহেব ওকে খুব ভাল করে লক্ষ্য করলো; সাথে সাথে ভয়ে প্রাণ উড়ে গেল।
সর্বনাশ ও তো শমিত নয়। একটা ছায়া মূর্তি। সে পায়ে হেঁটে চলছে না। মাটির এক হাত উপর দিয়ে হাঁটছে।
হায় ভগবান! এ কার পিছনে ছুটছি আমি?
মুহুর্তে হাত-পা অসাড় হয়ে গেল। মনে হচ্ছে গলা সমান পাঁকে ডুবে যাচ্ছে ও। রক্ত চলাচল বন্ধ হবার যোগাড় হয় তার।
ও রাস্তা খুঁজলো। কিন্তু এ কি? তাদের গ্রামের রাস্তা কোথায়? তাহলে আমি এতক্ষণ কোন পথে হাঁটছি? বুকের মধ্যে শ্যালো মেশিনের শব্দ। ধপ! ধপ! ধপ!
ইতিমধ্যে আকাশে কালো হয়ে মেঘ জমে উঠেছে। একটা বড় মাপের বিদ্যুৎ চমকালো। সেই আলোতে যা দেখলো তাতে তার বুকের ভেতর তোলপাড় আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল, যেন পাঁজর ভেঙ্গে কলজে বেরিয়ে আসবে।
ঐ তো সামনে অদূরেই সাহা পাড়ার শ্মশান ঘাট! পিশাচটা আমাকে গ্রাম থেকে এত দূরে নিয়ে এসেছে! আজ আমার মৃত্যু অনিবার্য!
তবে কি! ঐ প্রেতাত্মা আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে একের পর এক বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে যাচ্ছে?
সাহেবের দেহের রোম গুলো খাড়া হয়ে উঠে। দুই কান গরম হয়ে ভাব বেরুচ্ছে। তার সব কিছু তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এক্ষুণি সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। সে মরিয়া হয়ে সামনে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করে।
কি আশ্চর্য! এতো সেই বুড়ি! কটমট করে তার দিকে তাকাচ্ছে। দু চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। দুধের মত সাদা দুটি লম্বা দাঁতের মাঝ দিয়ে লিক লিকে লোলুপ জিভ নাড়াচ্ছে। অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে তার চোখ মুখ জিঘাংসায় ফোঁস ফোঁস করছে।
ওর রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে! আর হতে সময় নেই। এক্ষুণি কিছু একটা করতে হবে। শয়তানটা এক্ষুণি তার ঘাড় মটকে রক্ত পান করবে!
তখন তার রাঙাকাকার কথা মনে পড়ে, কাকা! তুমি আমায় ভুল বুঝো না। তোমার সাহেব অবাধ্য নয়। আজ আমার মৃত্যু হলে তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো। জীবনের শেষ মূহুর্তে শেষ বারের মত তোমার প্রিয় মুখটা দেখতে পেলাম না।
সে দ্রুত গাছের ডালটা হাতে নিয়ে তার চার পাশ দিয়ে একটা গোল বৃত্ত আঁকলো আর রূপার কাছে শেখা 'হনূমানচালিশা' চিত্কার করে উচ্চারণ করতে লাগলো-"জয় হনুমান জ্ঞানগুণসাগর..
জয় কপিশ তিহুঁ লোক-উজাগর..
রামদূত অতুলিত বলধামা..
অঞ্জনিপুত্র পবনসুতনামা"...

ঠিক তখনই পূব আকাশে কাল মেঘের আড়ালে মৃদু আলোর রেখা ফুটে উঠলো। দূরে কোথা থেকে শাঁখের শব্দ ভেসে আসে...।
মুহুর্তের মধ্যে সে জ্ঞান হারিয়ে বৃত্তের মাঝে পড়ে গেল।
সাহেব যখন চোখ মেলে তাকালো তখন দেখে সে একটা ভেজা ধান ক্ষেতের মধ্যে শুয়ে আছে। ভোরের মিষ্টি আলো আর ফুরফুরে শীতল হাওয়া পরশ বুলিয়ে রাত্রির সকল ক্লান্তি ভাব একে একে ঝরিয়ে দিচ্ছে। সে উঠে বসে। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। সারা দেহ ভিজে চুপসে গেছে। শরীরটা প্রচন্ড দুর্বল, ব্যথায় ভার হয়ে আছে। ভয়ানক পিপাসায় কাতর। এত দুঃখ দুর্দশার মধ্যেও তার মনের মধ্যে একটা তৃপ্তির মহাতরঙ্গ স্নায়ু থেকে দেহের প্রতিটি প্রান্তে, ধমনী হয়ে প্রতিটি কোষে কোষে প্রবাহিত হতে থাকে।
সাহেব উঠে দাঁড়ায়। দেখে তাদের গ্রামের সীমানাতেই সে দাঁড়িয়ে আছে।ভেজা ট্রাভেলিং ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা হয়। সে গত রাতের ঘটনা মনে করে আর ভাবে, উত্তেজিত স্নায়ু কত ঘটনারই তো জন্ম দেয় যার সত্যিকার ব্যাখ্যা আজও বিজ্ঞান দিতে পারেনি...।
...এমন সময় গ্রামের দশরথকাকার সাথে দেখা।
-একি দশা রে তুর? এত সকাইলে এলি কি করি রে বাপ?
তাঁকে সব কথা খুলে বললো সাহেব।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দাশুকাকা বললেন,
-এ তো হবারই ছ্যালো ! কতবার বারণ করিছি রাঙাদাদারে ! মোর কতাডা শোনলো নি !
-কি হয়েছে কাকা? বলেন আমায়?
-শ্যামু বাগ্দীর ঠাকমাডার নামে উয়াদের বাড়ির সব সম্পত্তি ছ্যালো।বয়স হওয়াতে সব নিখা-পড়া করি লিবার জন্যি ও ঠাগমাডারে চাপ দিতি থাকে।ইচ্ছা ছ্যালো নিজির নামে সব নিখি লিবে।কিন্তো ঠাকমাডার ইচ্ছা ছ্যালো নিজের মেয়াডারে অর্ধেক দিবার।তাই রাজি হয়নি।শেষে রাঙাদাদা যেহেতো পুজো-আচ্চাদি করে তাই তারে দিয়ি চান্দ্রায়ণবর্ত করাবার নাম করি হিমের রাতিতে বুড়িরে উডোনে ফেলি রাকলো...পরদিন ভুরবেলায় বুড়ি মরার সময় শাপ দিয়ি মরেছে যারা এই কাজের যোগে আছে তাদের বংশ নিব্বংশ হবে..শ্যামুডার বউ কাল ভেদবমিতে গ্যাছে..মাতম ছেয়ি গ্যাছে গাঁয়ে..
...বাড়ি ফিরতে রাঙাকাকা বললেন তিনি এখানকার বাস উঠিয়ে পাকাপাকি কলকাতায় চলে যেতে চান, তাই জরুরী তলব..
...ব্যবস্থা তিনি আগেই করে রেখেছিলেন,অল্প জমি আর বাস্তুটুকু বিক্রী করে দিয়ে সাহেবের সাথে রাঙাকাকা গ্রামে চলে আসেন গ্রামের কারোর বারণ না শুনেই।
..সবাইকে একটা কথাই বলেছিলেন,আমি চলে যাই দুনিয়া ছেড়ি ক্ষেতি নেই, কিন্তো এরে আমার জেবন থাকতি মরতি দেবো নে....
.......
..........
..............তারপর আর কখনো যাও নি ঠাকুর্দা অশনিতলায়--বৃদ্ধ সাহেববাবুকে ঘিরে বসে নাতি-নাতনিরা উত্সুক হয়ে জিজ্ঞাসা করে।ভয়ে সবাই ঠাকুর্দার গায়ের কাছে লেপ্টে বসে আছে...
--গেছিলাম আর একবারই তোর ঠাকুমাকে বিয়ে করার পর...গিয়ে সে যা কাণ্ড হয়েছিলো !!
...শুনে মুচকি হাসেন রূপাদেবী।
আরও একটা গল্পের গন্ধ পেয়ে চনমন করে ওঠে কুচো-কাঁচারা।
--বলো না ঠাকুর্দা! বলো না!
ছদ্মকোপ দেখান রূপাদেবী...অ্যাই তরুণ,করুণ,কিরণ আজ আর নয়...গল্প কাল হবে...আজ অনেক রাত হয়ে গেছে...সবাই খেতে এসো..
...চলো, চলো দাদুভাই-দিদিভাই..খেতে যাই..খেতে যাই...নইলে ঠাম্মা আবার বকবে...
--ঠাকুর্দা আমি তোমার পাশে বসবো কিন্তু।
--না আমি বসবো।
--শোন ! আমি তোদের দিদি, আমিই বসবো।
--আচ্ছা, আচ্ছা সব্বাই বসবে, সবাই তাড়াতাড়ি খেয়ে নেবে, তারপর হিতোপদেশের একটা গল্প বলবো কেমন !!...
--মা---ঠাকুমা--জলদি খেতে দাও গো !!

কলধ্বনি করতে করতে ঠাকুর্দা-ঠাকুমার তত্ত্বাবধানে ফুলকলিদের দল ভিতর-বাড়িতে চলে গেলো....
.....
.......
.........আজ বেশীরভাগ নিউক্লিয়াস ফ্যামিলিতেই এই সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে অপসৃয়মান....
...আর ঠাকুর্দা-ঠাকুমাদের এইসব গল্পগুলো শোনে "বৃদ্ধাশ্রমের" কংক্রীট দেওয়াল...

মন-মন্থন

মন-মন্থন
-------------
স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
----------------------------

চোখটা সরিয়ে নাও তোমার,
ওই অনেক মেগাপিক্সেল ইমেজে;
কৃপণতা গেল না তোমার !
এখানেও এসেছো আজ সস্তা প্যাকেজে?

আয়ত গুগল আর্থ, মাঝখানে বর্ত্তুল পৃথ্বী নিয়ে;
ওয়েব-ক্যামের সাধ্য কি, ধরে তাকে চোখ দুটো দিয়ে;

..আর হ্যাঁ, শোন..
কোন এক প্যাকেজে আছি, তাই আজ নয় কি বেশী?
..জানালা খোল, নীচে দাঁড়াবো,
দেখবো বিভাঁজে মাংসল পেশী।

কী লাভ বলো?
দেখতে পাবো কি তোমায়
কাঁচঢাকা ছোট্ট নজরে?
মাইনাস টু পয়েন্ট ফাইভ আর খোলা চুল,
খোলা চোখে আছড়ে পড়ে যে সজোরে।

শুধু কি দূরের মানুষ অদেখা ! কাছের জন কি বাইফোকাল ! হাহ্…হিংসে সেই গেল না, হাতড়ায় বিষণ্ণ সকাল।

‘গৃহস্থালি নেটে ব্যস্ত’ স্ট্যাটাস মুখর অস্ফূট-কথনে..
আমি আছি আমার মতন..
নিজ ওয়ালে
বন্দী মন-মন্থনে !

গ্রীষ্মের শুষ্কতা নিয়ে মনে,
ঊষর আন্তর্জালে ব্যর্থতার চলে তল্লাশি..
স্মিত হেসেও অন্তর্জ্বালার সাকিন আজ আউল-উদাসী !

গাইতি, কোদাল, হাতুড়ি আঘাতে,
খুঁড়ে চলে ফসিল প্রত্নতত্ববিদ্;
কখনও নরম ব্রাশের আঁচড়ে,
সময়ের পরতে জমা স্মৃতি-ধুলো ফিঁকে করে আনে না সংবিত্ !

স্বাধীনতা ছুঁতে চাই,
তবু আজও ছোঁয়া কি তা হয়?
বলতে চাই নিরালম্বে,
তবু আড়ষ্ট স্বর টুকরো বাসনার স্পষ্ট ইমেজে ইথারেই হারিয়ে যায়।

বন্ধূনি

বন্ধূনি....
--------------------শিবাশিস্ আচার্য

এক
-----
ছেলেটা হাসছে। শুকনো কিন্তু মিষ্টি হাসি। নির্জন একটা পথ, সে একা দাঁড়িয়ে আছে বাসের অপেক্ষায়। খোলা রাস্তায় সন্ধ্যার আঁধার ছুটে আসছে। সেই আঁধারের পথ ধরেই সূক্ষ্ম তীরের ফলার মত হঠাৎ নেমে এল ঝমঝম বৃষ্টি। আশেপাশে কোন ছাউনি নেই।
আ-ধোয়া, লাল-হলুদ রঙা টি-শার্টটার আড়ালে কোমরে প্যান্টের ভেতর গোঁজা বইটাও ভিজিয়ে দিচ্ছে বৃষ্টির জল। ছেলেটা ভাবছে...তবুও হাসছে এবং সে থমকেই আছে। বইটির পাতায় পাতায় জলের ধারা নদীর মত এঁকেবেঁকে ছুটছে। হঠাৎ একটা হাত এসে ছেলেটার হাত ধরল। কেউ ছিলনা আশেপাশে, তবুও কেউ এসে হাত ধরল, সে হাতটা...
...হঠাৎ সামনে সেই স্বচ্ছ নদীটা, সেই বইয়ের পাতায় যার নাম ছিল, যে কাহিনীটি পড়ে শেষ করব বলে বইটি কেনার মত পয়সা ছিল না কাছে বহুদিন। নদীটির নাম ভেসে উঠল চোখের সামনে -পাতালমণিগঙ্গা।...

...হঠাৎ কোন গর্তে চাকা পড়ে ভীষণভাবে দুলে উঠল বলেই ঝিমুনি কেটে গেলো। পয়সা খরচ করে রোলার কোষ্টারে চড়তে যেতে হয়না কোনো অ্যামিউজমেন্ট পার্কে কিংবা ফ্যান্টাসিতে। কোলকাতায় লোকাল বাসে চড়লেই হয়। তার ওপর যদি সিট না পাওয়া যায় তবে তো কথাই নেই। রোলার কোষ্টারের দুলুনি না হয়ে যদি সেই মণিনদীতে কোন নৌকার দুলুনি হয়ে উঠত। হলো না আর...

...কেবল অবস্থানগত তফাতের কারণে দুই মানুষের আচরণে কত পার্থক্য ! এ বিষয়টা ছন্দম্ খুব বোঝে। বাসে ঝুলে থাকার কঠোর কসরত নিয়মিতই করে চলেছে তার মতো এই কোলকাতা শহরের খেটে খাওয়া মানুষগুলো। মাঝে মাঝে কদাচিৎ সিটে বসার সুযোগ হয়। এই যেমন এখন বসে আছে সে। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর বিরক্তির মাত্রা এবং সে মাত্রার ডালপালা তার ঠিক বোঝা আছে। বর্ষাকাল, আকাল রাজধানীর পথে পথে অযুত-নিযুত চাকার সাথে মাটির রমণের ফলে যে কাদাময় ক্ষত; তার ছাপ জুতোয় জুতোয় ঘোরে ফেরে। দাঁড়িয়ে থাকা পাশের ব্যক্তিটির কাঁধে একটা বড় আকারের ব্যাগ, বেচারা একটু ঘুরে মাংসপেশীগুলোকে শান্তি দেওয়ার চেষ্টা করছিল, পাশেই কারও প্যান্টের ওপরে তার কাদামাখা স্যান্ডেলটার লজ্জাবিনম্র ছোঁয়া লাগতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন- "চোখের মাথা খেয়েছেন নাকি, বাস থেমে আছে, আপনার অতো ঘোরবার কি দরকার?? ঘুরেছেন ভালো ,কিন্তু দেখে ঘুরবেন না...যত্তোস্সব..."

ওদিকে কান দিয়ে লাভ নেই, এসব রোজকার বিষয়। বসার সুযোগ হয়েছে সুযোগের সদ্ব্যবহার করা দরকার। একটু গতি আবার একটু অনড় অবস্থা-এইতো ক্রমাগত, মাথাটা দুলে ওঠে, লেখক প্রাণটা জেগে ওঠে। দাঁড়িয়ে থাকলে শরীরের পেশীগুলো ব্যালেন্স বজায় রাখতে এতটাই শক্তিক্ষয় করে, মাথা আর তখন কাজ করেনা। বসে থাকলে কাজ করে। এখন কাজ করছে। নতুন একটা গল্পের ভেতর ঢোকার পরিকল্পনা করছে সে। চোখ দুটোও বন্ধ হতে চাইছে। ঝিমুনিটি উপভোগ করতে চাইছে মন।
....
আমি ছন্দম্...
.....
........
গল্প না আসুক , নদীটাও আসতে পারে , কিন্তু সাথে ছেলেটা যার কোমরে বইয়ের পাতা ভিজছিল, সে আসুক আমি চাইনা। অনেকদিন ভুলে ছিলাম। ইদানীং কেন আবার সেই ছেলেটা আসছে আধো-স্বপ্নে? আগে যখন আসত তখনই ভেবেছিলাম একটা গল্প লিখব, কিন্তু মন সাড়া দেয়নি। লিখবনা। বরং মন থেকে তাড়াব। তাড়িয়েছিলামও, লেখালেখির প্রতি ঝোঁক আর ভাবনা ক্রমাগত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তা সে উভয় ক্ষেত্রেই- সাহিত্য চর্চা আর স্কুলের একঘেয়ে পড়াবার জীবন...খাতা দেখা..প্রশ্ন তৈরী করা...স্কুল সার্ভিস কমিশনের মতো কিছু পরীক্ষা চালু হয়ে আমার মত বাউন্ডুলেদের খেয়ে পড়ে বাঁচার মত কিছু সুযোগ হয়েছে।

....অকারণ হর্ণ বাজাচ্ছে গাড়িগুলো। ফ্লাইওভারের কাজে রাস্তার কিয়দংশ তো অকেজোই , মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে দু'ধার দিয়ে পাইপ বসানোর হিড়িক পড়ে যাওয়ায়। গর্ত থেকে ওঠানো মাটির সাথে বৃষ্টির জল এসে মিশে থকথকে তালক্ষীর রেঁধেছে। কি দুর্বিষহ কষ্টে, দুর্দান্ত কসরতে রাস্তা পার হচ্ছে সকলে। স্কুল ফেরত ছেলেমেয়েগুলোও। জীবন হাতের মুঠোয় সবার। মুঠো খুললেই প্রাণ বায়ু উড়ে যাবে। এইসব বিসদৃশ নিয়ে খুব লিখতে ইচ্ছে হয়। চেষ্টাও করেছে কত। তারপর এগোতে এগোতে বৃত্ত আর পূরণ হয়না।

...আচ্ছা এই বৃষ্টিতে মানুষের কষ্ট নিয়েই একটা গল্পের প্লট শুরু করা যায়। বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়া পথের সমস্যা নিয়ে শুরু হবে। কিন্তু সাথে আসতে থাকবে রাস্তার বেহাল অবস্থার করুণ চিত্র, রাস্তা মেরামতের নামে টাকা লুটের এক মোচ্ছব, বিদেশি অর্থ সহায়তা রাস্তার মেরামতে বাস্তবে সামান্যই ঢালা হচ্ছে আর আছে মন্ত্রী-মিনিষ্টারদের শকুনি দৃষ্টি, দলীয় নেতা কর্মীদের আগ্রাসন--সমস্যার ডালপালা ছড়াতে থাকে, কোন স্থানে থামেনা, গল্পের নৌকা কোন নদীর ঘাটে ভেড়েনা। তাইতো শেষ-মেশ বরাবরই সমস্যা দিয়ে শুরু করেও গল্প প্রেমের জালে পা দেয়। গল্প লেখা হয়ে যায়, লেখা হয়ে যায় একসময় উপন্যাসও। সমস্যা নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে আর লেখা হয়না, যা লেখা হয় দু’একটা বৃত্ত-খোলা গল্পে, তাও পড়ে থাকে বিস্তৃত টেবিলে ডায়েরীর পাতায়।

দুই
----
আমি ছন্দম্ ব্যানার্জী....

বড় লেখক হয়ে উঠতাম যদি কোনদিন সমস্যা নিয়ে লেখা গল্পগুলোও প্রকাশকদের দিয়ে ছাপানো যেত। সেদিন হয়তো মন উজাড় করে কিছু গল্প লিখে ফেলতাম। মণি নদীটা নিয়ে একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম। স্বপ্নে দেখা সেই ছেলেটাকে মণি নদীটিতে নৌকায় চড়াতে চেয়েছিলাম। গল্পটার সূচনা করতে পারিনি। ছেলেটা বারবার কষ্ট দেয়, চোখে জল আনে। লেখক হবার যাতনা আর সুখ ঘিরে ধরে। কাকে সে জানাবে তার মনের কথা..ছেলেটাকে উপজীব্য করে গল্পটা লিখে ফেলে কাকে বলবে তার অকপট স্বীকারোক্তি...."সেই ছেলেটি আমি। ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ বইটি লুকিয়ে দোকান থেকে আমি বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। দোকানের কর্মচারী ছিলাম, কাজের ফাঁকে বইটি শেষ করতে পারিনি। বৃষ্টি এলো তখনই..."

...তবুও কেউ মজেছে। মজা ও হতে পারে। তবুও আমি রিস্কটা নিতে চাইছি। অতীত বড্ড কষ্ট দিচ্ছে। ইদানীং বৃষ্টি হলেই আমার অতীতের সেই সন্ধ্যাটা ফিরে আসে। একজন বন্ধুর সঙ্গ কি তবে একান্তই প্রয়োজন? সেটাও ভেবেছি। বন্ধনে বন্দী হতে চায়না আজও মন। কিন্তু তবুও বোধহয় প্রয়োজন।

সে আমার মোবাইল নম্বর যোগাড় করেছিল। বলেছিল, আমি আপনার লেখনীর গুণমুগ্ধা । কিছু গল্প-কবিতা-উপন্যাস প্রকাশেই সুকণ্ঠী গুণমুগ্ধার ফোন। আমি মুহূর্তে আকাশে মেঘে চড়ে বসেছিলাম। কেন জানি তবুও বলে ফেলেছিলাম, "আপনি কি আমার লেখা পড়ে মনে কোন কষ্ট পেয়েছেন বলে কি এই ফোন কল?"

সুকণ্ঠী প্রতি উত্তরে বলেছিল, "না, আমি মুগ্ধ হয়েছি , আমি আপনার চরিত্রের প্রেমে পড়েছি।"
আমি বোকার মত বললাম, "প্রেমে!"
--হ্যাঁ! তবে আপনার নয় কিন্তু , আপনার বইয়ের চরিত্রগুলোর।

তারপর কিছুক্ষণ হাসাহাসি। অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। কথা বৃষ্টির মত। যতক্ষণ ঘনীভূত মেঘ থাকে সে ঝরবেই। আমাদের দু’জন নর-নারীর মস্তিষ্কে মেঘ দ্রুত এবং ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছিলই। আমিও আমার প্রথম গুণমুগ্ধার প্রতি নিজেই মোহাচ্ছন্ন হচ্ছিলাম। প্রায়ই কথা হয় আজকাল।

নারী তার নাম বলেছে রূপা। বিশ্বাস করেছি আবার করিনিও বলা যেতে পারে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে ভুবন ভোলানো হাসি শুনিয়ে বলেছিল, নামটা নাকি সত্যিই। আমি বিশ্বাস করেছিলাম। নামটা আমাকে অগোচরে নারীর প্রতি আলাদা একটা মোহ সৃষ্টির ঘটনায় পর্যবসিত করেও থাকতে পারে। আমার সৃষ্ট রূপা চরিত্রটির প্রতি আমারও আলাদা একটা মোহ আছে। রূপা নামে মজব সেটাই তাই স্বাভাবিক।

রাতে কখনও কথা হয়নি। আমি ছ্যাবলামি করে একদিন রাতে মোবাইল বন্ধ রাখার কারণ জানতে চেয়েছিলাম। অকপটে বলেছিল, নারীদের নিয়ে গল্পে এত বিশ্লেষণ কর আর আমি বিবাহিত সেটা বুঝলে না !!

ততদিনে আমরা দু’জন দু’জনার প্রতি তুমি সম্বোধনে চলে গিয়েছিলাম। বিবাহিত শব্দটা একটা প্রচন্ড নাড়া দিলেও আমি সামলে নিলাম। কেন যেন এবার সত্যিকার ভাবে সম্পর্কটাতে একটা প্রশান্তি পেলাম। হতে পারে বন্ধনের বাধ্যবাধকতা মুক্ত হলাম বলে। তবে নিজের মাঝে নষ্ট একটা আপন ভুবন টের পেলাম। পরকীয়া নিয়ে একটা উপন্যাস যখন লিখছিলাম, ভাবনার সুতো মুক্ত আকাশে অবারিত ছড়াচ্ছিলাম তখন এই ভুবনটা সাড়া দেযনি। এখন দিচ্ছে। রূপা বলেছিল, "কী? বিবাহিত দেখে কি বন্ধুত্ব করবে না? পরকীয়া তো করতে বলছিনা। শুধু লেখকের একটু সান্নিধ্য চাইছি। সেটা কি খুব অন্যায়?"

কেন যেন আবার ছ্যাবলামি করে বলেই ফেলেছিলাম, "পরকীয়া করতে চাইলেই কি করা যায় সখী, সে যে হইয়া যায় গো মানস-বনে...হো...হো...হো...হো"।

সম্পর্ক কতদূর কি এগিয়েছে ভাবিনি। সংসারী মানুষ হলেও মুক্ত বিহঙ্গ। কল্পনার জগত আমার জীবনের অনেকাংশ জুড়ে। তার ওপর সেই বৃষ্টি ভেজা বই...সেই কষ্টের দৃশ্য। আমি ভুলতে চাই।
রূপা বলেছিল, দুপুরের সময়টাতে সে ফ্রি থাকে। লেখক চাইলে কোথাও এসে তার সাথে দেখা করতে পারে।
থার্ড পার্সনে বলা বাক্যের সে আমন্ত্রণে সাড়া দিতেই ছুটেছি আজ।

তিন
------
আমি ছন্দম্ লেখক....

আমি এলাকাটা চিনি। দক্ষিণ দাঁড়িয়ার ত্রিপুরাদেবীর মন্দির-সংলগ্ন এলাকা । শুনে রূপা বলেছিল, "তাই নাকি, আর কোন পরকীয়া সম্পর্ক আছে নাকি এদিকে..."
--থাকলে কি হবে?
--নেই সেটা জানি, লেখায় তুমি যত পটু নারীদের সাথে কথা বলায় তত পটু কিন্তু নও।
--তবে তুমি যে বন্ধু হতে চাইলে !!
--তাই নাকি? । কি জানি ??

...আমার কিন্তু চিরন্তন পুরুষালি আঁতে ঘা লেগেছিল। তারপরও কেন আমন্ত্রণে ছুটে এলাম !....
...যানজট এখন অসহ্য লাগছে। চোখ বুজে কত কিছু ভাবছিলাম। নেমে চলে যাব নাকি। যদি রূপার হাজব্যান্ড চলে আসে। যদি ধরা পড়ে যাই। আসলেই কি আমার মনে কোন নষ্ট ইচ্ছে সাড়া দিচ্ছে, নাকি কেবলই কৌতূহল। লেখকদের কত পাগলামি থাকে। আমি লেখক হতে চাই, একটুখানি হয়েছিও বটে, একটু পাগলামি করলে কি-ই বা যায় আসে। তবুও...এতো ঠিক নয়। ফোনের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাক না। যদি দেখতে খুবই কদাকার হয়। যদি একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। যদি বেশ বয়স্কা হয়। যদি মজা করার জন্য আরও দু’চারটে বান্ধবীকে নিয়ে বসে থাকে...

মোবাইল বাজছে। কিন্তু পকেট থেকে এই চাপাচাপির সিটে বসে সেটা বের করাটাই কষ্টসাধ্য। পাশের লোকটির সাথে কনুইয়ের গুঁতো লাগায় আড়চোখে তাকালে সে একবার। সে তাকানোর উত্তরে আমার "কি ভয় পেয়েছি !!" এমন কোন ভাব করা দরকার?

...রূপার কণ্ঠ ভেসে এল মোবাইলের তরঙ্গে, "তোমার জন্য অপেক্ষাতে চোখ করেছি কানা...ঘেমে-নেয়ে একাকার। তা কতদূর পৌঁছালে?
--এই তো শ্রীমতির মোড় । প্রচন্ড যানজট ।
--সে জানি। বাস থেকে নেমে দেখো, সকালের বৃষ্টিতে রাস্তার কি যে অবস্থা ভেতরে ঢুকলেই বুঝবে।
--ভয় দেখাচ্ছ।
--অচেনা নারীর সাথে দেখা করতে তুমিই আসছ। জল-কাদার ভয় তুমি পাবে, সে আমি বিশ্বাস করিনা। তবে তোমার কণ্ঠ কিন্তু কাঁপছে।
--সেটা কিন্তু বাসের দুলুনির কারণে রূপা। ভয় পেলে কি আর আসতাম !
--সত্যি তুমি আসছো তো ?
--হ্যাঁ রে বাবা, আসছি। এখন রাখ, বাস বড্ড বেশি দুলছে। না জানি উল্টেই যায়।
--ধ্যাত্ যত্তো সব উল্টোপাল্টা কথা..রাখছি !!

হাসতে হাসতে ফোন কেটে দিলাম। আরেকবার ভাবলাম, সত্যি কি আমি যাচ্ছি। হ্যাঁ যাচ্ছি-ই-ই।

সিগনালে থেমেছে বাস আবার। চোখ বন্ধ করলাম। অনেক নষ্টালজিক স্মৃতি মনে পড়ছে। প্রতিটি স্মৃতির পরতে পরতে ফিরে আসে সেই বৃষ্টি ভেজা বই। বইটির নাম ছিল আম আঁটির ভেঁপু। সম্ভবত ওইটা ছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপু-দুর্গাকে নিয়ে লেখা প্রথম বই।যে গল্পের উপর ভিত্তি করে সত্যজিত্ রায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র তৈরী করেছিলেন "পথের পাঁচালী" নাম দিয়ে। অরূপ করচৌধুরী সাহেবের বইয়ের দোকানে কর্মচারী ছিলাম। ভাড়াবাড়িতে অসুস্থ বাবা। খুব কষ্টে আমার দু'পয়সার আয়ে চলে যেত কিন্তু চিকিৎসা বাবার ঠিক মতো হতো না। তার ওপর রাতে নৈশ স্কুলে পড়তাম। পড়ালেখাটা ছাড়তে পারতাম না, কেনো জানি সেটা আমার নেশা ছিল। করচৌধুরী সাহেবের সেই ভয়ানক মার--এখনও যেন পিঠে ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক কষ্টে কেটেছে চাকরিটা চলে যাবার পরবর্তী অনেকটা দিন। বাবা’ও মারা গেলেন সেই সময়। একের পর এক যাতনা। দাঁড়িয়া এলাকার ভাড়াবাড়ি ছেড়ে চলে গেলাম। কৈশোরের স্মৃতি কত এই এলাকার। অরূপ করচৌধুরীও তখন শ্রীমতী এলাকায় থাকতেন। ভাড়া থাকতেন একটা বড় বাড়িতে। শুনেছিলাম এখানে তার একটা কেনা জায়গাও আছে।

ভাড়াবাড়িটাতে গিয়ে অনেকদিন আগে একবার খুঁজেছিলাম। থাকেনা সে এখন আর। কেউ খোঁজও দিতে পারল না। তার কেনা জায়গাটা চিনতামও না। দোকানটা ছিল মাথুর চক্-এ। এখন আর নেই। সেখানে এখন সু-উচ্চ দালান উঠেছে। করচৌধুরীকে আমি খুঁজি পথে ঘাটে। এত এত মানুষ, তাকে কোথায় পাব? তাকে খুঁজে পেলে কি করতে পারব জানিনা। কিন্তু মনে হয় ঐ যাতনার স্মৃতিটা কিছুটা হলেও লাঘব হবে...
....বইটা দোকান বন্ধ করার সময় কোমরে গুঁজে নিয়েছিলাম। দোকানের সব বই দোকানেই প্রতিদিন একটু একটু করে পড়ে ফেলতাম অন্যদের অগোচরে সময়ের সুযোগে। করচৌধুরী সাহেবের আরও ব্যবসা ছিল। উনি কমই আসতেন। বইটা খুব টেনেছিল। চার পাতা পড়ে তাই লোভ সামলানো সম্ভব হয়নি। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতেই বৃষ্টি চলে এসেছিল। করচৌধুরী সেই সময়ই সে দিক দিয়ে যাবেন কে জানত। কাকতলীয় ঘটনা এই ভাবেই বোধহয় ঘটে।

করচৌধুরী কি এখনও এই এলাকায় থাকেন?

চার
-----
আমি ছন্দম্ কাহিনী-কথক...

রূপা কমই বলেছে। কানুশশীপুর থেকে রিক্সা নেওয়ার পর বুঝলাম রাস্তা কতটা ভয়াবহ। দাঁড়িয়ার কে.সি.পি. হাই স্কুল পর্যন্ত পাকা হয়েছে, তারপর পুরোটা কাঁচাপথ। কাদা থিকথিক করছে। থলথলে ক্ষীরের মোটা স্তর যেন। একটু পরপরই বড় বড় গর্ত। কেউ বুঝি দেখার নেই এ দেশে এসব। সবাই মেনে নিচ্ছে। রিকশাওয়ালার অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে। রিক্সাওয়ালার কষ্ট দেখে আমারও কষ্ট হচ্ছে। নেমে যাব কিনা ভাবলাম। কিন্তু তাতে কার লাভ, বরং ক্ষতিটাই বেশি, হাঁটার মত জায়গা তো নেই। পায়ে কাদা লাগবেই, রিকশাওয়ালাও ভাড়া থেকে বঞ্চিত হবে। কিন্তু বেচারা আর টানতে পারছে না।

একটু শুকনো মত বালুচর দেখে নেমেই গেলাম । পুরো ভাড়াই দিলাম। অনেকদিন পরে এলেও এদিকের রাস্তা ঘাট আমার চেনা মোটামুটি। মন্দির চত্বরের কাছাকাছি গিয়ে ফোন করলেই হবে। অদূরেই ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পেলাম। সময় খেয়াল ছিলনা। এতক্ষণে খেয়াল করে দেখলাম রূপার ফোন রাখার পর থেকে এখানে আসতে দু'ঘন্টারও বেশি লেগে গেলো।
মোড়ের মাথায় গিয়ে ফোন করলাম। এগিয়ে এলো যে জন সে, ভালোই সুন্দরী।
--চিনতে অসুবিধা হয় নি তো?
--না, না !!
--ঠিক যেমন ভেবেছিলাম লেখকমশাই ঠিক তেমনই দেখছি!!
--তাই? তা কি ভেবেছিলে শুনি?
--সেটা নয় আমার কাছেই থাক।
--আচ্ছা থাক, পরে শুনবো।
....গল্পে-গল্পে অনেক সময় অতিবাহিত হলো। কাছেই ছোট একটা খাল আছে, তার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে নানারকম গাছ-পাখি চিনলো ও চেনালো উভয়-উভয়ে। কতদিনের স্মৃতি আবার হৃদয়পুরের উজানে খেয়া বাইলো।
রূপার স্বামী লোকটি নাকি বেশ বড় ব্যবসায়ী। ওষুধ আর কাপড়ের ব্যবসা। আগে বইয়ের ব্যবসা ছিল। অনেক টাকা। তবুও রূপা অসুখী। কারণ বলতে চায়নি প্রথমে। পড়ে বাধ্য হয়েছিল বলতে, লোকটির সময়াভাব...
...রূপার প্রতি একটা সহানুভূতি জেগেছিল। কিন্তু রূপা সহানুভূতি চায়নি। সে মানসিক সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু আমার গল্প তাকে কেন টানে, সে কথা একবারও বলেনি। আমার খুব রাগ হয়েছিল।

প্রথম দর্শনে কি বলব, একটা জড়তা কাজ করবে সেটা বুঝেছিলাম। ভাবছিলাম একবার সামনে গিয়ে বলব, "আজ বলতেই হবে আমার গল্প তোমার ভাল লাগে কেন?"

কিন্তু বলা হলোনা। ফোনে সে বলেছিল দেখতে খুব একটা সুন্দর সে নয়। বয়স পঁয়ত্রিশ বছর। আমার সমবয়স্ক। আমাদের মধ্যে কমিটমেন্ট হয়েছিল আমরা সত্য গোপন করতে পারব তবে মিথ্যে বলতে পারবোনা। তাই রাগ হলো, সে মোটেও অসুন্দর নয়, বিশেষ ভাবে আকর্ষণীয় তো বটেই।

আমার রাগের কথায় সে হাসল। সত্যি তার হাসি সুন্দর। উজ্জ্বল বর্ণের মুখশ্রীতে সে দারুণ লাগছিল। যত্সামান্য সাজ সে নিয়েছিল, যদিও সেটা মানা ছিল। সে কথা রাখেনি। হালকা লিপস্টিক লাগানোর দক্ষতায় তার নৈপুণ্য সত্যই প্রশংসার্হ।

আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে অকপটে রূপা বলে উঠল, "আমি জানি পুরুষের কোন দৃষ্টি আমাকে খোঁজে।"
আমি একটু লজ্জিত হলাম। এটা আমার স্বভাব জাত।

--তোমার লজ্জিত হবার দরকার নেই,তোমাকে আমি এত নির্জনে, এত রিস্ক নিয়েও যে ডেকেছি আর এতটুকু দৃষ্টি দেওয়ার অধিকার দেবো না তা কি হয়।
আমি এইবার একটু আনইজি বোধ করি।

পাঁচ
-----
আমি ছন্দম্ কাহিনীকার....

হঠাত্ রূপার পার্সটা হাত ফস্কে কাদায় পড়ে গেলো। আমি তাড়াতাড়ি সেটাকে তুলে নিয়ে কাছেই একটা নলকূপে ধুতে যাবার আগে রূপা মোবাইল, টাকা, দরকারী কাগজ বার করার সময় দেখলাম মোবাইলের ওয়ালপেপারে....এত দিনের প্রচেষ্টা হঠাৎ সফলতার মুখ দেখল।

...আমি চিনেছি। ঠিকই চিনেছি। সোনালী ফ্রেমের ছবিতে রূপার সাথে বিয়ের সাজে যে লোকটি ঐ তো সেই লোক, ওকেই তো আমি খুঁজে ফিরছি আজ এত বছর। ঐ তো সেই আমার পুরোনো মনিব অরূপ করচৌধুরী সাহেব। চোখের সামনে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই। কিন্তু এত টাকার মালিক তো সে ছিলনা। এ দেশে অবশ্য তার মত মানুষের পক্ষে রাতারাতি বিশিষ্ট বণিক বনে যাওয়া খুব কঠিন নয়। সেই কিশোর কালে যখন তার দোকানে কাজ করতাম জানতাম তার একটা ওষুধের দোকানও ছিল, এমন আলাপ শুনতাম দোকানের অন্যান্য কর্মচারীদের কণ্ঠে। হয়তো সেটাই সত্যি হয়ে থাকবে।

কিন্তু এখন আমি কি করব। এতদিন খুঁজেছি। খুঁজে পেলে কি করব সেটা তো ভাবিনি। আমার প্রকাশিত গল্পগুলো তার সামনে নিয়ে ছুঁড়ে মারব। সে কী সেটার যোগ্য? সে কী আমার লেখক হওয়াকে আরও উপহাস করবে ? পনেরো বছর আগে এক সন্ধ্যায় যখন কি ভীষণ মারটাই না মেরেছিল। একটা মাত্র বই দোকান থেকে নিয়ে আসার কি করুণ শাস্তি। আমি তো বইটা ফেরতও দিতাম।
টানতে টানতে দোকানে নিয়ে গিয়েছিল। স্কেলের সপাৎ সপাৎ শব্দ...পিঠ কেটে রক্ত বেরিয়েছিল। বৃষ্টি ভেজা বইটা একটানে কোমর থেকে টেনে নিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে মেরেছিল। সে কি দুর্বিষহ গালাগালি। রাগ হচ্ছিল, বইটা রাস্তায় ফেলে দিল! এত সুন্দর একটা বই, প্রিয় লেখকের বই। লোকটা তার কালো মোটা ঠোঁটটাকে বেঁকিয়ে বলেছিল, ‘হারামীর ছেলে চুরি করতে শিখেছো, বই-পড়া দেখাচ্ছো, ফকিরের ছেলে লেখক হবে।যা দূর হয়ে যা, দোকান থেকে।কাল থেকে আর আসবি না !!’
--আমার পাওনাটা মিটিয়ে দিন !!
--কিসের পাওনা?-বলেই এক থাপ্পড়। বইটার দাম নেই।নষ্ট করলি যে?আগেও এমন ভাবে আরও কত বই নিয়েছিস,সব জেনেছি।
--আপনিই তো রাস্তায় ফেললেন !!
--বেরো বেরো!! চোর কোথাকার- বলে চুলের মুঠি ধরে এক ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিলেন....

...একটা বইয়ের দাম ছুঁড়ে মারার জিদ সেই কিশোর বয়সে মানায়। এখন তো পরিণত মন।
হাঁটতে হাঁটতে মূল রাস্তায় এসে পড়লাম।
--চলো ছন্দম্ ! ঐ হোটেলটায় কিছু খাওয়া যাক। কি খাবে বলো?
--আমি তো তোমার জন্য কিছুই আনতে পারিনি বন্ধূনি...
--বাঃ, দারুণ একটা অভিধায় ভূষিত করলে তো আমায়। তুমি এসেছো, লেখক। আর কি চাই। এই নাও এই ডায়েরিতে একটা স্মারক দিও অটোগ্রাফের সাথে। সেরা উপহার হবে।

ভাবলাম উপন্যাসের ডায়লগের মত সিনেমাটিক ভাবে কিছু বলি, কিন্তু বলতে ইচ্ছে হয় না। পরক্ষণেই আবার মনে হয়, করচৌধুরীই যদি এই রূপার স্বামী হয়, তবে সেই অতীতের প্রতিশোধ নেয়ার এই তো কম সুযোগ নয়। রূপা আমার প্রতি অনুরক্ত সেটা তো স্পষ্ট। আমি চাইলে তাকে আরও উদ্বেলিত করতে পারি। সেটা কি করচৌধুরীর জন্য শাস্তি স্বরূপ হবে না। কিংবা আরও একধাপ....

--কি ভাবছ লেখক?

--হুঁ, কিছু না, তোমায় দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাবুক হয়ে উঠছি।

--তাই নাকি ? নাকি আমায় দেখে খুব বিমর্ষ হয়ে উঠেছো, মনকে অন্যদিকে রেখে আমাকে এড়াতে চাইছ। চাইলে বলতে পার। খাবার রেডি হয়ে আছে, খেয়ে চলে যেতে পারো। এখনই খাবে নাকি?

--কোন্ খাবার? যা আজ মন-পানসীকে কানায় কানায় ভরিয়েছে?

--এইবার দেখি সত্যিকারের লেখকের মত কথা বলছো। বইয়ের সুর আর কথার সুর মিলছে। মোবাইলে তবে কেন এত গম্ভীর লাগে?

--তাই নাকি? আচ্ছা তোমার মোবাইলের ছবির লোকটিই কি তোমার স্বামী?

--হুঁ।

--নাম কি?

--কেন, চেনো নাকি?

--চিনতেও পারি।

--অরূপ করচৌধুরী।

মনে মনে ভাবলাম, বলে দেবো নাকি ইতিহাস...বলা ঠিক হবেনা...

ছয়
-----
আমি....সুন্দর এক বন্ধূনি-প্রাপক...

একটা সুন্দর দুপুর কাটল। বেশ গল্প করতে জানে রূপা। কিন্তু কিছুতেই আমার গল্প পড়ার রহস্য সে জানালো না। বলল, যদি এটা জানার জন্য কিছুদিন হলেও আমাকে সময় দাও। জোর কোরো না জানার জন্য। আমিই জানাবো একদিন।

ফেরার আগে বলেছিল, ছন্দম্ তুমি খুব ভালো । অন্তত আর দশটা পুরুষের মত তোমার মনটা নষ্ট হয়ে যায়নি।

এত বড় কম্প্লিমেন্টের পরে আর কি বন্ধু ছাড়া কিছু হওয়া যায়। অনেকের কাছে কম্প্লিমেন্টটাই বড় , একজন লেখকের কাছে তো বটেই।

...বাসায় ফিরতে ফিরতে বারবার রূপার মুখটা মনে পড়ছিল। সেই বৃষ্টি ভেজা কিশোর, বইয়ের পাতায় পাতায় বৃষ্টির জল...কিছুটা বোধহয় ভুলে থাকা যাচ্ছে। করচৌধুরীকে খুঁজে পেলাম। কি চরম কাকতালীয়। রূপার হাজব্যান্ড্ ! সত্য সেলুকাস ! মণি নদীর তীরে বৃষ্টির মাঝে আমি রূপাকে পেলাম চোখ বোজা কল্পনায়....

আমরা মানে আমি আর রূপা কী সত্যি একে অপরের সত্যি বন্ধু হতে পারব?

পুরো সন্ধ্যায় রূপাকে নিয়ে ভেবেছি। একবার কথা হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন রাতেই ওর বর ফেরে এই বাসায়। সে কারণে রাতে কথা বলেনা। তবে কথা দিয়েছে এখন থেকে যে সব রাতে বর আসবে না রূপা আমার সাথে কথা বলবে। আসলে রূপার সাথে কথা না বললে কিছু ভাল লাগেনা। মনের জট খোলে না। আটটার দিকে একবার কল করলাম , "জানালো ওর স্বামী আসছে, পথে আছে। রাতে ফোন করতে মানা করলো।"

বাইরে এখন ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। চোখ বন্ধ করতেই দেখলাম মণি নদীটির তীরে আমি আর রূপা ঝিরঝিরি বৃষ্টিতে হাঁটছি। আমরা হাসছি । নদীর ওপারে হারিয়ে যাচ্ছে নৌকাটা , নৌকায় সেই আমার কিশোর স্মৃতি। আমি মণি নদীকে আমার মাঝে ধারণ করতে চাইছি রূপার ক্ষণ-সাহচর্যের মাধ্যমে। আমার ঠোঁটটা নড়ে ওঠে, আমি বলে উঠি আপনমনে, যা আজ লিখে দিয়ে এসেছি বন্ধূনি রূপাকে--

"বন্ধু,
তোমার লাবণ্য-নক্ষত্র প্রতিচ্ছবি বৃষ্টিঝরা শান্ত ছায়ার মতো,
নিশিদিন ভেসে উঠে প্রকৃতির হৃদয় মাঝে বারবার।
এমন করে স্বপ্ন দেখতে চাইনি, তবুও তো হৃদয়
ভুবনজয়ী ভালোবাসার এক সুকঠিন আবেশে দীর্ঘায়িত হয়।

পৃথিবীর সমস্ত অস্তপারের সন্ধ্যাতারা ও আত্মার নির্যাস,
থেমে থেমে চলতে শুরু করে স্বপ্নের দীপ জ্বেলে অজানায়।
কাঠবিড়ালী, হরিণরা প্রখর কিরণে গাছের ছায়ায় আশ্বাস খোঁজে,
গভীর স্তব্ধ রাতে অথবা রূঢ় রৌদ্রে সীমান্ত সংলগ্ন নীড়ে দুঃস্থ হৃদয়।

পৃথিবীর প্রেম-প্রলুব্ধ আদমের চারদিকে অশনি সংকেত,
গান্ধর্বী কন্যারা দুঃস্বপ্নের ছায়ায় প্রতারিত করে,
বিকেলের রোদ কেড়ে নিয়ে জীবন থেকে,
হারিয়ে যায় নদীর জলে একরাশ অতৃপ্তি ঢেলে বুকে,
প্রেমের শীর্ষে জীবনটা কঠিন অঙ্গার করে একান্তে গোপনে।
বন্ধু, এসব জেনে দেয়ালে সাজানো ছবিটাও পরিহাস করে,
ভালোবাসার লাবণ্য-নক্ষত্র প্রতিচ্ছবি;
দখিনা হাওয়ার সাথে--
পর্দার আড়ালে এক মেরুদণ্ডী প্রাণীর মতো সর্বদাই পড়ে থাকে।"
---------------------ছন্দম্ ব্যানার্জী।