বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৫

ফল্গুধারা

ফল্গুধারা
-------------
কাহিনী - স্বপ্নসন্ধানী
---------------------------

আশিস্ সকালবেলা বেশ আয়েস করে খবরের কাগজ নিয়ে বসেছিলেন। পায়ের কাছে জিমি, চুপটি করে।
এমন সময় দীপা এসে বললেন, ‘একটু বাজারে যাবে? কয়েকটা জিনিস আনতে হবে।’
আশিস্ কাগজ থেকে মুখ না সরিয়েই বললেন, ‘উহুঁ এখন যেতে পারব না।আমাকে একটু পরেই বেরোতে হবে।এখন বাজারে গেলেই দেরী হয়ে যাবে।’
- ‘তোমাকে আবার কোথায় বেরোতে হবে?’
- ‘আছে দরকার আছে। ক’টা বাজলো?যাই স্নানটা সেরে নিই’, দীপাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই আশিস্ উঠে পড়লেন।
দীপা বেশ অবাকই হলেন।
আজকাল আশিসের ব্যস্ততা যেন একটু বেশীই বেড়েছে। কলেজ থেকে অবসর গ্রহণের পর কখনো এতটা চোখে পড়ে নি। সকাল-বিকেল বেরোচ্ছেন রোজ। ফিরছেনও দেরী করে। যখন বাড়িতে থাকছেন তখনো যেন অন্য কোনো জগতে বিচরণ করছেন। দীপা লক্ষ্য করেছেন বেশীর ভাগ সময়েই অন্যমনস্ক, যেন কি গভীর ভাবনায় মগ্ন।
আশিস্ বন্দ্যোপাধ্যায় কে যাঁরা অনেকদিন থেকে চেনেন না তাঁদের পক্ষে বোঝা শক্ত তিন-চার বছর আগেও আশিস্ ঠিক কি রকম ছিলেন। তাঁর বাতিকের কথা সর্বজনবিদিত ছিল। তিনি পরপর দু'বার হাত না ধুয়ে কোনো কিছু খেতেন না। ডেটল সাবান ছাড়া অন্য কোনো সাবানের প্রবেশ তাঁর বাড়িতে নিষিদ্ধ ছিল। কুকুর, বেড়াল থেকে শত হস্ত দূরে থাকতেন। যেসব বাড়িতে কুকুর, বেড়াল আছে সেসব বাড়িতে তিনি পারতপক্ষে জলগ্রহণ অবধি করতেন না। রাস্তার ধারের দোকান থেকে তেলেভাজা বা অন্য কোন খাবার খাওয়া, লেবুজল খাওয়া আর আত্মহত্যা করা তাঁর কাছে প্রায় সমার্থক ছিল। এ হেন আশিস্ও বদলেছেন, অনেক পরিবর্তন হয়েছে তাঁর। এটা ঘটেছিল ওনাদের ছেলে উদয়নের বিয়ের পর। তৃষ্ণার খুব কুকুর প্রীতি। তার বাড়িতে সে ছোটোবেলা থেকেই কুকুর দেখে অভ্যস্ত। এ বাড়িতে আসার কিছুদিন পরই সে একটা ল্যাব্রাডর রিট্রিভারের বাচ্চা নিয়ে এল। তার নাম রাখা হল জিমি। এতে আশিসের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু জিমির কি ক্ষমতা ছিল ঈশ্বরই জানেন আশিস্ পালটে গেলেন, জিমিকে পছন্দ করতে শুরু করলেন।
কিন্তু সে অন্য গল্প। আপাতত আশিসের ব্যস্ততা সবারই বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। আশিসের বাতিক কমেছে এতে বাড়ির সবাই খুশী বিশেষ করে দীপা কারণ ঠ্যালাটা তাঁকেই বেশী সামলাতে হত। কিন্ত এখনকার এই অতি ব্যস্ততার কারণও তাঁর অজানা। আশিস্ এমনিতেই কম কথার মানুষ, কাজেই দু একবার জিজ্ঞেস করেও বিশেষ কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় নি।
সন্ধ্যেবেলা ড্রয়িংরুমে বসে দীপা একা একাই এল্.ই.ডি. টি.ভি.তে স্টার জলসায় মনপসন্দ্ একটা সিরিয়াল দেখছিলেন। টি.ভি.টা চলছে বটে কিন্তু দীপার মন মাঝে মাঝেই সেখান থেকে ছুটে যাচ্ছে। আশিস্ বিকেলবেলা আবার বেরিয়ে গেছেন, বলে গেছেন ফিরতে দেরী হতে পারে।
উদয়ন, তৃষ্ণা ফিরল অফিস থেকে।
- ‘তোর বাবা তো সকালেও বেরিয়েছিল, আবার এখনো বাড়ি নেই। কোথায় যাচ্ছে বলে নি কিচ্ছু,’ দীপা ছেলেকে দেখে না বলে আর থাকতে পারলেন না।
- ‘মা তুমি অল্পতেই বড্ড টেনশন করো। কি হয়েছে বাবা বেরোচ্ছে তো? ভালোই তো বরং। মন-টন ভালো থাকবে। সারাদিন বাড়িতে থাকতে কারোর ভালো লাগে? আর থাকলেই বরং এটা হয় নি কেন, ওটা করো নি কেন শুরু করবে,’ উদয়ন মাকে পাত্তাই দিল না।
- ‘কিন্তু কোথায় যাচ্ছে তাই তো বলছে না! এত ব্যস্তই বা কেন? সকালে দোকানে যেতে বললাম, গেলো না, বেরোতে দেরী হয়ে যাবে বলে।’
- ‘কোথায় আর যাবে মা? কাছাকাছিই আছে কোথাও। বাবা তো বরাবরই মর্নিং ওয়াকে বেরোতো আর কলেজ থেকে ফিরে সন্ধ্যেবেলাতেও বেরোতো। তুমি এমন করছো না, সত্যি !’
দীপা বুঝলেন ছেলেকে বলা বৃথা, তাই চুপ করে গেলেন।
আশিস্ কিন্তু সেদিন তাড়াতাড়িই ফিরে এলেন। আশিস্ কে ঢুকতে দেখে জিমি যথারীতি দৌড়ে এসে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ডাক ছেড়ে আনন্দ প্রকাশ করল। এ বাড়িতে আশিস্ কেই সে সবচেয়ে বেশী পছন্দ করে ফেলেছে বোঝা যায়।
তৃষ্ণা শ্বশুরমশাইকে দেখে খুশী খুশী গলায় বলল, ‘শার্টটার রঙ ডীপ হয়েছে বলে প্রথমে তুমি খুঁতখুঁত করছিলে বাবা কিন্তু শার্টটা তোমায় কিন্তু দারুণ মানিয়েছে। যাই বলো তোমাকে কিন্তু এখনো বেশ স্মার্ট আর হ্যাণ্ডসাম্ লাগে বাবা !’
এই প্রশংসা বাক্য শুনে আশিস্ মুখে কিছু বললেন না, মৃদু হেসে পুত্রবধূর দিকে তাকালেন। তারপর আড়চোখে দীপাকে এক ঝলক দেখে নিয়ে "চক্ষে আমার তৃষ্ণা...." গুণগুণ করতে করতে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। পেছন পেছন জিমি।
যদিও শার্টটা তৃষ্ণার কিনে দেওয়া এবং প্রশংসাটা তারই বাবার সম্পর্কে কিন্তু তাও উদয়নের মনে সূক্ষ্ম ঈর্ষার উদ্রেক হল। সেও তো আজ তৃষ্ণার পছন্দ করা শার্ট পরেই অফিসে গেছিল, কই তখন তো তৃষ্ণা এতটা উচ্ছ্বসিত হয় নি! অবশ্য এ তো হবেই, আশ্চর্য আর কি! তৃষ্ণা আসার পর থেকে তার বাবা-মা যে সব কিছুতে তৃষ্ণারই পক্ষ নেয় সে কি আর উদয়ন লক্ষ্য করে নি। হায় রে স্মৃতি !
পরের দিন শনিবার। উদয়ন, তৃষ্ণার কলেজ ছুটি। সকাল থেকে তাই রান্নাবান্না, কাজকর্মের তেমন তাড়া নেই। কিন্তু আশিসের রুটিনের কোনো পরিবর্তন নেই। তিনি স্নান টান করে জলখাবার খেয়ে যথারীতি বেরিয়ে গেলেন। তখনো দীপাদের খাওয়াও শেষ হয় নি।
- ‘বাব্বা কি তাড়া! আবার গুনগুন করে গানও গাওয়া হচ্ছে,’ দীপা বেশ বিরক্ত আজ।
- ‘গান গাইছিল বাবা? কোন গানটা?’ খাওয়া থামিয়ে তৃষ্ণার হঠাৎ ঔত্সুক্য।
- ‘চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত, যদি তারে নাই চিনি গো, সেকি আমায় নেবে চিনে....।’
- ‘কোন্ গান জেনে তোমার কি হবে? আর তার সঙ্গে বাবার বেরোনোরই বা কি সম্পর্ক?’ উদয়ন এতক্ষণ এসবে কান না দিয়ে খেয়ে-দেয়ে উঠে খবরের কাগজে ডুবে ছিল, এবার আর না বলে পারল না।
- ‘আছে গো মশাই আছে ! সম্পর্ক আছে। মনের সঙ্গে; আমরা কখন কি করছি তা দিয়ে আমাদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। আমাদের মন যখন উৎফুল্ল থাকে তখন আমরা ব্রাইট কালারের জামাকাপড় বাছি, ডিপ্রেসড্ থাকলে ডাল কালারের। তেমন গানও। আমি কিছুদিন আগে 'সুস্থ' নামে একটা ম্যাগাজিনে একটা লেখা পড়েছিলাম এই বিষয় নিয়ে।’ - বললো তৃষ্ণা।
- ‘চমৎকার! কে কোথায় কি লিখল আর তুমিও তা বেদবাক্য বলে মেনে নিলে ! কত লোক কত কিছু লিখছে সব মানতে গেলে বেঁচে থাকাই তো মুশকিল হবে, বুঝলে? জিমি আসার পর প্রথম প্রথম বাবা কি বিরক্ত ছিল। বাড়িতে ঝামেলা লেগেই থাকত। এখন সব ঠিক আছে, বাবাও ব্যস্ত আছে কিছু নিয়ে, তোমাদের তাও পোষাচ্ছে না,’ উদয়ন বেশ রেগে রেগেই বলে যায়।
তখনকার মতো দীপা, তৃষ্ণা দুজনেই চুপ করলেন। কিন্তু আশিসের ব্যস্ততার কারণ না জানা পর্যন্ত যে দীপার শান্তি নেই তা বলাই বাহুল্য।
রবিবার সন্ধ্যেবেলা। আশিস্ তখনো ফেরেন নি। উদয়নও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়েছিল।
ফিরে এসে নিজে থেকেই দীপাকে বলল, ‘একটু আগে জিৎকাকুর সঙ্গে দেখা হল। বললেন, বাবা নাকি অ-নেকদিন ওনাদের সঙ্গে গল্প-টল্প করতে যায়ই না,’ তারপরেই দীপার টেনশন আরো বাড়তে পারে ভেবে হালকা সুরে বলল, ‘আমার মনে হয় বাবা আমাদের পুরোনো পাড়ার আড্ডায় যাচ্ছে। কিছুদিন আগে ওখানকার ঊষারঞ্জনজেঠু,নব্যেন্দুজেঠুরা এসে খুব ধরেছিল না।মনে নেই?’
দিন কাটতে থাকে। আশিস্ মনে হয় দীপার কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়ে খুব মজা পাচ্ছেন।
সেদিন দীপার দিদির বাড়ি পুজো ছিল, উনি সারাদিন ওখানেই ছিলেন। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরলেন।
- দাদাবাবু কোথায় গো, দিদি ?
বাড়ির বহুদিনের পুরোনো পরিচারিকা আরতি দি দরজা আটকাতে আটকাতে বলল, ‘দাদাবাবু তো একটুকুন আগেই বেইরে গ্যালো।’
দীপা কিছু না বলে মুখ গম্ভীর করে ভেতরে ঢুকে গেলেন।
তৃষ্ণা বাড়িতেই ছিল, দীপা ফিরেছে বুঝতে পেরে দৌড়ে এসে বলল, ‘জানেন মা ! আজও বেরোবার সময় বাবা গুনগুন করে গান গাইছিল।’
- ‘অ্যাঁ?’
- ‘হ্যাঁ। আজও চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত। ভালোবাসি ভালোবাসি, এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি...’ থেমে থেমে বলল তৃষ্ণা।
দীপা আর কিছু না বলে এক গ্লাস জল ঢকঢক করে খেয়ে ফেলে ওখানেই একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন।
বোমাটা ফাটল পরেরদিন সন্ধ্যেবেলা।
আশিস্ সেদিন বাড়িতেই, নিজের ঘরে নিবিষ্ট মনে বই পড়ছেন। উদয়ন আর তৃষ্ণা ফিরল অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে।
- ‘বাবার এত ব্যস্ততা কিসের জন্যে জানো? বাবা কি কাণ্ড করেছে শুনবে?’ উদয়নের গলায় বিস্ময়, উত্তেজনা সব কিছু রয়েছে।
- ‘কি কাণ্ড করেছে?’ দীপার গলা অজানা আশঙ্কায় কেমন যেন শুকিয়ে গেল।
- ‘বাবা একটা গানের ব্যাণ্ড ক্রিয়েট করেছে। সবাই বাবাদের সমবয়সী। কাল রবীন্দ্রসদনে ফার্স্ট শো ছিল। ব্যাণ্ডের নাম ফল্গুধারা। বাবা ফল্গুধারার একজন মেইন ভোকালিস্ট ও মাউথ অর্গানিস্ট। আজ কলেজ থেকে ফেরার সময় সায়নের সঙ্গে দেখা। আমাকে এই মারে তো সেই মারে। বলে তোর বাবা এত ভালো গান করে, গানের ব্যাণ্ডে আছে এসব কথা আমি ওদের কেন কখনো বলি নি। কি করে বলি যে আমিই জানতাম না আমার বাবা ব্যাণ্ডে গান গায় ! কাল নাকি বেশ ভালো লোক হয়েছিল। সবাই খুব অ্যাপ্রিশিয়েটও করেছে বাবাদের এই বয়েসে এই এনার্জি, এই এফর্টকে।’
দীপা শুধু যে বাকশক্তিরহিত তা নয়, বোধহয় চিন্তাশক্তিরহিতও। কি বলবেন কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। ইতিমধ্যে এসব কানে যেতে আশিস্ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। দীপা বসে বসেই দেখলেন, আগে না জানার অভিমান ভুলে ছেলেও বাবাকে খুব উৎসাহ দিচ্ছে, ব্যাণ্ড সম্পর্কে নানান কথা জিজ্ঞেস করছে, কারা আছে, কবে তৈরী হল ইত্যাদি ইত্যাদি। আর তৃষ্ণার তো খুশীর সীমা নেই। সে ফোন করে তার পরিচিত সবাইকে ফল্গুধারার কথা জানাতে ব্যস্ত। জিমি কি বুঝেছে বলা মুশকিল, কিন্তু সেও বার দুয়েক ঘেউ ঘেউ করে আর লেজ নেড়ে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে তার আনন্দ প্রকাশ করেছে। ব্যতিক্রম শুধু দীপা। তিনি একটা কথাও বলেন নি।
আস্তে আস্তে সবই জানা গেল। মাস কয়েক আগে এক ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে উটি বেড়াতে গিয়ে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ। তিনিও একই সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন, বাড়িও খুব দূরে নয় গড়িয়ায়। ব্যাণ্ড তৈরী এনারই পরিকল্পনা। কথাপ্রসঙ্গে সঙ্গীতপ্রীতির কথা আশিস্ও জানিয়েছিলেন। এরপর ফোন নম্বর বিনিময়, তারপর ফিরে এসে আবার যোগাযোগ এবং আস্তে আস্তে ফল্গুধারার পত্তন।
প্রাথমিক উচ্ছ্বাসপর্ব শেষ হলে দীপা উঠলেন, নিজের ঘরে গেলেন। এবার সঙ্গে আশিস্ও।
দীপা গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হঠাৎ এত গানের ইচ্ছে হল যে?’
- ‘হঠাৎ তো নয়। গান তো বরাবরই ভালোবাসি। স্কুলে, কলেজে গাইতাম আর হারমণিকা বাজাতামও। তার পরেও। কিন্তু কেউ যদি সব ভুলে যায় তো আমি কি করব?’
দীপা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আশিস্ কে দেখছেন। শেষ কথাটা যে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা বুঝতে অসুবিধে হল না। স্মৃতিশক্তির ওপর বিশেষ অত্যাচারও করতে হল না। চোখের সামনে ভেসে উঠল ছেঁড়া ছেঁড়া ছবি। তখন সবে দুজন পরিণয় সূত্রে বাঁধা পড়েছেন, কোনো প্রগলভ নিভৃতে আশিসের গলায় ‘ভালোবেসে সখি নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে…’ মনে পড়া মাত্রই মুখের ভাব একটু হলেও বদলালো। কিন্তু আশিস্ তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছেন বলে দীপা দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন।
- ‘আমাদের মতো সাধারণ সাংসারিক লোকের জীবনে শখই বলো আর ইচ্ছেই বলো – স-অব অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো’ বললেন আশিস্, ‘কর্তব্য, দায়িত্ব, কার্য সবকিছুর নীচে চাপা পড়ে থাকে। কখনো খনন করলে তবেই জেগে ওঠে।’
- ‘তা খননটা কে করলো শুনি? আমি তো কোমর বেঁধে কোনো কিছু হাতে নিয়ে নেমে পড়েছিলাম বলে মনে পড়ে না,’ দীপাও অভিমানে পিছু হটবার পাত্রী নন।
- ‘কোনো কিছু হাতে নিয়ে নামার কি দরকার? কারুর সামনে অন্য কারুর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলে কোনো কিছু নিয়ে নামার থেকে ঢের বেশী কাজ হয়।’
- ‘আমি আবার কখন কার প্রশংসা করলাম?’ এবার দীপা হতবাক্।
- ‘মনে করে দেখো। গতবার দুর্গাপুজোয় 'আলমগীর' নাটক দেখে তুমি সোমবাবুর প্রশংসা করো নি? এই বয়েসেও আপনি দেখালেন বটে, এত ভালো অভিনয় ইত্যাদি ইত্যাদি। তখনই আমি ভেবেছিলাম আমাকেও কিছু করে দেখাতে হবে।’
- ‘বাব্বা ! তখনই তুমি ঠিক করে ফেলেছিলে! কিন্তু আমাকে না বলার কারণটা জানতে পারি কি ?’
- ‘সা-রপ্রা-ইজ! গান আর বাজনার ইচ্ছে তো বরাবরই ছিল। যোগাযোগ হয়ে গেল উটি বেড়াতে গিয়ে। তারপর এতদিন কত কাণ্ডের পর তৈরী হল আমাদের ব্যাণ্ড ফল্গুধারা। নামটা কেমন হয়েছে বলো তো? শরীরের বয়স নিয়ে কে আর মাথা ঘামায়? মনটা ইয়ং থাকলেই হল। আর তাতে বয়ে চলবে না-পাওয়া ইচ্ছেগুলোর ফল্গুধারা ! কি বলো?’
- ‘তা তো বটেই,’ দীপার মুখে এছাড়া আর কথা জোগায় না।
আশিস্ যে একেবারে বিয়ের আগে যেমন অনুষ্ঠান করতেন তেমনই আবার স্টেজে গান গাইতে উঠে যাবেন এ উনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। তাও আবার ব্যাণ্ডে!
- ‘আরো সারপ্রাইজ আছে বুঝলে? সামনে সপ্তাহে আমরা একটা কম্পিটিশনে যাচ্ছি নজরুল মঞ্চে। বাংলা গানের ব্যাণ্ডের কম্পিটিশন। তার জন্যে একটু অন্য রকম ড্রেস দরকার।’
- ‘কম্পিটিশনে যাচ্ছ তোমরা? তার জন্যে আবার অন্যরকম ড্রেসও দরকার?’ দীপার বিস্ময় যেন আর শেষ হচ্ছে না।
- ‘আরে দেখো না ব্যাণ্ডের গায়ক-টায়ক রা কি রকম ঝকমকে সব জামাকাপড় পরে? ছেলের ঘরে দেখো নি কত সব দেশী বিদেশী গায়কদের ছবি টাঙানো ছিল? সেই রকম। এই দেখো,’ আশিস্ খুব সাবধানে একটা ব্যাগের মধ্যে থেকে বার করলেন সি-গ্রিন কালারের একটা পাঞ্জাবী, যার বুকে সাদা ফেব্রিক কালার দিয়ে আঁকা বাউল বেশে বিশ্বকবি।
- ‘কেমন হয়েছে এটা? এটাই পরব। বহুদিনের ইচ্ছে ছিল বুঝলে এরকম একখানা পাঞ্জাবী পরে স্টেজে উঠে বেশ জমিয়ে গান গাইব আর প্রিলিউড আর ইণ্টারলিউডে থাকবে হারমণিকার সুর।’
- ‘বলিহারি ইচ্ছে ! তো এবার আমরা শুনতে যেতে পারি কি? নাকি তাও বলতে না বোধহয় ?’ বলে ছদ্মরাগ দেখিয়ে দীপা রাতের খাওয়ার ব্যবস্থার তদারকি করতে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলেন।
যাওয়ার সময় কিন্তু তাঁর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয় আর খুশীর হাসি আশিসের চোখ এড়াল না। আনন্দে মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলেই ফেললেন- 'তা-তাও আবার বলতে হবে...'

শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৫

শেষ পরিণতি

শেষ পরিণতি
-------------------
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-----------------------------------------------



ঘরের বাইরে ট্যাক্সিটা এসে দাঁড়াতেই হুড়মুড় করে ছুটে এসে দরজা খুলে এগিয়ে এল শাশ্বতী।
"সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশ ওজনদার হয়েছিস কিন্তু"; শাশ্বতীর ছেলে ইমনকে আদর করতে করতে বাড়ীতে ঢুকেই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে একথা বলতে বলতেই থেমে গেল শ্রীপর্ণা। শ্রীপর্ণাকে হঠাৎ করে থেমে যেতে দেখে শাশ্বতীও অবাক হয়ে গেল। শ্রীপর্ণার ফর্সা মুখটা এতদিন বিদেশে বসবাসের ফলে আরও চকচকে আর ফর্সা হয়েছে। সেই ফর্সা মুখটা আচমকাই টকটকে লাল হয়ে উঠল কেন !
‘কি হল রে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?’
‘না না, ঠিক আছে, একটু জল দিবি?’
শাশ্বতী ফ্রিজ খুলে জল বের করে কাঁচের গ্লাসে ঢালছিল, সেই ফাঁকেই শ্রীপর্ণা বড় করে একটা শ্বাস নিল। নিজেকে সামলানোর এটাই সবথেকে সহজ উপায়।
‘ঠিক করে বল, শরীর ঠিক আছে তো?’ জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিতে দিতে উদ্বিগ্ন শাশ্বতী প্রশ্ন করলো।
‘হঠাৎ করে কেমন যেন মাথাটা ঘুরে গেল রে। একটু চোখ বন্ধ করে থাকি, হয়ত ঠিক হয়ে যাবে এক্ষুণি।’ কিছু ভেবে না পেয়ে একথাটা বলতে বলতে চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা রাখল শ্রীপর্ণা।
‘ইমন, টুপুরদিদিকে আর্যদত্ত দাদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দাও।’ বসার ঘরের কোণায় ভিডিও গেম নিয়ে ব্যস্ত যুবকের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল শাশ্বতী।
'আমার মিষ্টিমাসির ছেলে আশিস্ কে মনে আছে তো, তার ছেলে।খুব ভালো ছেলে।আই.আই.টি. ক্র্যাক করেছে এবার।' তারপর শ্রীপর্ণাকে নিয়ে শোওয়ার ঘরে এসে জানলার ভারী পর্দাগুলো সব টেনে ঘরটা অন্ধকার করে দিল শাশ্বতী। ‘তার চেয়ে ঘরে একটু শুয়ে থাক ! আমি লেবু চা বানাই, দেখ খেয়ে আরাম পাবি।’
মনে মনে শাশ্বতীকে অনেক ধন্যবাদ দিল শ্রীপর্ণা। এখন একটু আড়াল, একটু অন্ধকার আর একটু নিজস্ব সময় দরকার ছিল ওর। কি যে হল ! নিজেকে এই বয়সেও কেন যে কিছুতেই সামলাতে পারছে না ! পঁচিশটা বছর !! হা ! ভগবান !! ক্লান্তির নিঃশ্বাস ফেলে ও চোখ বন্ধ করল। শাশ্বতী দরজাটাও টেনে দিয়ে গিয়েছে। চোখ বন্ধ করতেই সেই দিনগুলো ছবির মত ফুটে উঠছে একটা একটা করে। শ্রীপর্ণা একা হবে কি করে !



মধুমাসের আগমন শুরু তখন কলকাতার বুকে। বইমেলা শুরু হয়েছে।ইউনিভার্সিটির ক্লাস বাঙ্ক করে কয়েকজন বন্ধু মিলে ধাঁ ময়দান।শীতের দুপুরের আমেজ গায়ে মাখতে মাখতে এ ষ্টল থেকে ও স্টল ঘোরাঘুরি।‘কি রে মাম্পু! ক্লাস কেটে এখানে!!' ডাক শুনে শাশ্বতী ঘুরে তাকিয়ে দেখে আশিস্,ওর মিষ্টিমণির ছেলে, যে প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে ইউনিভার্সিটির আলাদা ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করছে।"বাব্বা তুই! আমি ভাবলাম কে ডাকছে রে বাবা ডাকনাম ধরে!" সব বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল শাশ্বতী।এ মোনালিসা..এ জয়ন্তী..এ মেখলা..এ সুমন..এ শান্ত..আর এ শ্রীপর্ণা..ব্ল্যাক জিন্সের সাথে বটল্ গ্রিন শার্ট পরে আছে আশিস্..কাঁধে একটা লেদার অফিস ব্যাগ..সবার সাথে শেকহ্যাণ্ড করল একে একে...বেশ হইহই করে ঘোরা হল..একটা ক্যুইজ কনটেস্টে প্রাইজ জিতল আশিস্..দারুণ আনন্দ হল।
বন্ধুর ভাইয়ের ওই একদিনের অ্যাটিট্যুড দেখে তার প্রেমে পড়ল শ্রীপর্ণা। ফেরার সময় একই বাসে ফিরল দুজনে..দুজনকে বাসে তুলে দিয়ে যায় আশিস্ ।কত কথা জানতে ইচ্ছা করছিল..কিন্তু যদি কিছু ভাবে!! রাতে ঘুম নেই, দিনেও জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে শ্রীপর্ণা। একদিন সুযোগও এসেও গেল।ইউনিভার্সিটির ফ্রেশার্স ওয়েলকাম ছিল।সেদিন আশিস্ও এসেছিল শাশ্বতীর ইনভিটেশানে আর প্রচ্ছন্নভাবে শ্রীপর্ণার ঔত্সুক্যে। সেইদিন কাঁচা হলুদ শাড়ি পরা, সুন্দর করে সাজা শ্রীপর্ণাকে দেখে আশিসেরও চোখে ধাঁধা লেগে গেল। এ যেন শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতিতে রূপান্তর। আর তারপরেই প্রেম শুরু হল দু'জনের, এমন কি শাশ্বতীকেও লুকিয়ে দুজনের বাইরে দেখা করা। যদিও ইউনিভার্সিটির অনেকেই ওদের রসায়নটা বুঝে গিয়েছিল।বছরখানেক এভাবেই কাটল। ইউনিভার্সিটির গণ্ডী ছাড়াল শ্রীপর্ণা। কিন্তু আশিস্ সে বছরের সেমিষ্টারটা ক্লিয়ার করতে পারল না।সদ্য বাবা গত হয়েছেন।অনেকেই কানাঘুষোয় বললো শ্রীপর্ণার জন্যই নাকি....
এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে আজও আশিসের জন্য বুকের ভেতর এমন একটা আকুলি বিকুলি ঝড় আটকে আছে শাশ্বতী জানত না। বুঝতে পেরে নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছে শ্রীপর্ণা। শাশ্বতীর বাড়িতে ঢুকেই ওর চোখে পড়েছে এক বছর একুশের যুবক। নিবিষ্ট মনে  ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। হুবহু আশিসের চেহারা। দেখেই সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। প্রথমে তো ভেবেছিল বুঝি আশিস্ ই। সেই এলোমেলো একমাথা কোঁকড়া চুল। সুঠাম চেহারা। থেকে থেকে চশমাটা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ঠেলে তুলছে। মাথা স্থির হতে বুঝতে পারল তা কি করে হয়! ওরও তো এখন অনেকটা বয়েস হয়েছে। ওটা তাহলে আশিসের ছেলেই হবে! তখনই শাশ্বতী পরিচয়টা দিল।সপ্রতিভ টুপুর আলাপ করতে এগিয়ে গেল।



‘কিরে, শিপু কেমন লাগছে এখন?’ ঘরে ঢুকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল শাশ্বতী।
‘ঠিক আছি। টুপুর কি করছে রে?’ চায়ের কাপে ছোট চুমুক দিল শ্রীপর্ণা।
‘ওকে নিয়ে চিন্তা করিস না। ইমন আর আর্যর সঙ্গে দিব্যি পটে গেছে। আশিস আর মনীষা সারাদিনের জন্য দক্ষিণেশ্বর গেছে। ফিরতে ফিরতে রাত হবে। আজকালকার ছেলে, মন্দির দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে নেই তাই আর্যটা থেকে গেল। মুম্বই থেকে দু'সপ্তাহের জন্য এসে ওরা অনেক জায়গায় যায় তো। তো মিষ্টিমণি,মা আর ওরা গেছে। বাবা আর মিষ্টিমেসো চলে যাওয়ার পর দু'বোন মিলেই এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়।আর্য সব জায়গায় যেতেও চায় না। এই শোন না, সেদিন কি হল...’ গল্পের ঝুড়ি খুলে বসল শাশ্বতী।
প্রশ্ন না করেই উত্তর পেয়ে গেল শ্রীপর্ণা। প্রায় চার বছর পর ব্রাজিল থেকে দেশে এসেছে সে। আঠেরো বছরের মেয়ে টুপুর আর বর সোমদেবও এসেছে। শেষবার শ্রীপর্ণা একাই এসেছিল। যখন মা মারা গিয়েছিলেন। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন বাবাকে হারিয়ে মা আর ভাই-ই শ্রীপর্ণার কাছে সব ছিল। তাই মায়ের মৃত্যুসংবাদের খবর পেয়ে আর কারোর ছুটির জন্য অপেক্ষা না করে একাই চলে এসেছিল শ্রীপর্ণা। ভাই তখন বেঙ্গালুরুতে। কলকাতার পাট চুকিয়ে শেষ জীবনটা মা ওখানেই ভাই উচ্ছল, ভাজ মঞ্জীর আর ভাইপো ছোট্টুর সঙ্গে থেকেছেন। দেশে এলে ওখানেই আসে শ্রীপর্ণা। তবে কয়েকদিনের জন্য হলেও টুপুরকে নিয়ে দমদমে মামার বাড়িতে একবার ঢুঁ মেরে যায়। তখন শাশ্বতীর সঙ্গেও দেখা করে যায়। ফোনে নিয়মিত কথা হলেও মুখোমুখি বসে দেখা হওয়ার মজাই আলাদা। এবারও তাই এসেছে শ্রীপর্ণা।
শাশ্বতী কলকল করে অনেক কথা বলে গেলেও শ্রীপর্ণা শুধু ‘হুঁ, হাঁ’ করে চলেছে।
‘তোর ফোনটা দে তো, ওকে একবার ফোন করি, আমারটা রোমিং এ আছে।’ গল্পের মাঝে হঠাৎ খাপছাড়া ভাবেই বলে উঠল শ্রীপর্ণা।
‘ও, তাই বলি ! বরের জন্য মন খারাপ করছে? নে, কথা বল, আমি রান্নাঘর থেকে আসছি।’ মুচকি হেসে ফোনটা এগিয়ে দিল শাশ্বতী।
এরপর গল্প আর জমল না। টুপুর বরং অনেক খুশি। টুপুরের চোখে কি একটু মুগ্ধতা দেখল শ্রীপর্ণা? কে জানে, হবেও বা! খাওয়া দাওয়ার পর বিকেলের দিকে ‘আরেকদিন আসার চেষ্টা করবো’, বলে একটু তাড়াতাড়িই বেড়িয়ে পড়ল শ্রীপর্ণা।



রাতে শুতেই টুপুর ঘুমে কাদা। শ্রীপর্ণার ঘুম আসছে না। অনেকক্ষণ নিজের ফোনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে আবার মনে পড়ে যাচ্ছে সেই দিনগুলোর কথা। ফোনের স্ক্রিনে নম্বরটার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে সে, যেন আশিসের দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই অবশ হয়ে তাকিয়ে থাকা। প্রথম প্রেম, প্রথম হাতধরা, প্রথম চুমু। ঘরের হাল্কা নীল আলোয় নিজের ডান হাতের মণিবন্ধে লাল তিলটার দিকে তাকিয়ে সে এক অদ্ভুত শিরশিরানি হল ওর। আশিস্ ওই তিলটাতেই প্রথম চুমু দিয়েছিল। তখন আশিস্ কে একটু চোখের দেখা দেখার জন্য কি না করত ও। পাগল করা, মাতাল করা সেইদিনগুলো আজ কেমন যেন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে শ্রীপর্ণার। মনে হচ্ছে আবার যদি ফিরে পাওয়া যেত সেই দিনগুলো !
শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিন আশিস্ জানিয়েছিল, "আমায় ক্ষমা কোরো পর্ণা ! আমার পক্ষে আর এগোনো সম্ভব নয়। বাবা চলে যাওয়ার আগে সব জেনে গেছিলেন।আমিই জানিয়েছিলাম।ইণ্টারকাস্টে বিয়ে তিনি একদমই মেনে নেবেন না।তাকে বোঝাবার আর সুযোগ পাইনি।বাবা যেহেতু মানা করে গেছেন তাই মাও মেনে নেবেন না অন্য কাস্টের মেয়ে বিয়ে করলে। অনেক বুঝিয়েও কিচ্ছু ফল পাইনি বিলিভ মি পর্ণা।আর বাবা নেই যেখানে সেখানে মায়ের মতের বিরুদ্ধে কিভাবে এগোই বলো! তাই এই সম্পর্ক টেনে নিয়ে যাওয়ার কোন মানেই নেই।"
তার এক সপ্তাহ আগেই বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াতে গিয়ে আশিসের পাগল করা ভালোবাসাই পাথেয় হয়ে রইল । সেদিন দুপুরে কি পাগলামিই না করেছিল ওরা ! সম্পর্ক প্রায় শেষ, সেটা জেনেই যেন আশিস্ পাগলামিটা বেশী করেছিল আর তাতে সাড়া দিয়ে যেন শেষ বারের মত দুজন দুজনকে পাগলের মত আদর করেছিল। সেই উদ্দাম দিনটার কথা ভেবে আজও সারা শরীর শিউরে উঠল শ্রীপর্ণার। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। সময়ের পলি সব কিছুই পেলব করে দেয়। দিনগুলো তো ও প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। আজ আর্যদত্তই আবার সেইসব স্মৃতি উসকে দিল !
ফোনের দিকে তাকিয়ে কতটা সময় যে পেরিয়ে গেল শ্রীপর্ণা নিজেও জানে না।ফোন নম্বর,ফেসবুক আই.ডি.,হোয়াটস্অ্যাপ নম্বর সবই নিয়ে এসেছিল শাশ্বতীর কাছ থেকে আজ এক অজানা ঔত্সুক্যে। অনেকক্ষণ পরে টুপুরটা পাশ ফিরতেই চমক ভাঙল ওর। হাতটা বাড়িয়ে টুপুরের মাথায় একবার বুলিয়ে দিল শ্রীপর্ণা। মায়ের কোমরটা জড়িয়ে ধরল মেয়েটা।মেয়েটা এখনো কেমন মা-ন্যাওটা।ভাবলো একটা শেষ পরিণতি যা সবার পক্ষেই মঙ্গল,তাই করাই ভালো।তারপর একটা বড় শ্বাস টেনে আঙ্গুলটা ছুঁইয়ে দিল ডিলিট লেখা বাটনে....

শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৫

এক্সট্রা ম্যারাইটাল

এক্সট্রা ম্যারাইটাল
-------------------------
কাহিনীকার-স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
---------------------------------------------

ঋষিলা অপেক্ষা করছে। সন্ধে নামছে। অন্ধকার ঠেলে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রেটার ক্যালকাটার এই গলিতে ঢুকবে সে। পুণে থেকে আসছে। তার বাড়ীতেই উঠবে। দু’জনের গত একবছর যাবৎ প্রায় সবই হয়েছে, শুধু সামনাসামনি দেখাটাই হয়নি। ফেসবুকে যখন প্রথম কথা হয়, তখন তাকে আকৃষ্ট করেছিল "একস্ট্রা ম্যারাইটাল" নামটি। প্রোফাইলের ছবিটি এক কাউবয় পোষাক পরা এক মাচো পুরুষের। এরকম এক পুরুষের সঙ্গে কী বিষয়ে কথা বলা যায় ভাবতেই গেলো তার কয়েকদিন ! কিছুদিন এই সেই কথার পর ঋষিলা যৌনজীবন সম্পর্কে কথা বলার আভাস দিতেই সে নিজেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ঋষিলার নিজের যৌনসম্পর্কহীন জীবন বড় দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। শহরে এত যুবকের ভিড়, আর তার মতো সুন্দরী বিদুষী মেয়ের জন্য কোনো প্রেমিক জোটে না ! সত্যিই জোটে না। অংশুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার, সেটিও হয়েছিল বাবার ঠিক করে দেওয়ায়। কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু অংশু নিজের কেরিয়ার নিয়ে আর সেই সংক্রান্ত ঘনঘন ট্যুর নিয়েই এত মশগুল যে ঋষিলাকে দেওয়ার মতো কয়েকটি রাতের সময়টুকু ছাড়া আর কোন সময়ই নেই তার,তাও নিজের মর্জি-মাফিক।কিন্তু বাচ্চার কথা তুললেই অংশু খালি কেরিয়ারের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যায়।এক কলিগ শিমূলের সঙ্গে খুব গোপনে প্রায় একমাস মতো একটা সম্পর্ক ছিল ঋষিলার,শারীরিক নয়। কিন্তু তার বিয়ের পর ওই সম্পর্কটা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয় সে। ঋষিলা চায়নি ঘরে তরুণী স্ত্রীকে ডিচ্ করে তার সঙ্গে গোপনে শুতে আসুক সে। একটি প্রখ্যাত ইংরেজি দূরদর্শন চ্যানেলে চাকরি করে ঋষিলা। অনেকদিনের চাকরি। অনেক দায়িত্ব। কিন্তু কোনো অফিসের কোনো বোঝা সে বাড়ি বয়ে আনতে চায় না। বাড়িতে থাকতে চায় সে ভাবনাহীন। সামান্য কিছুক্ষণ সময় নিজের জন্য রাখতেই তো হয়, কিছুক্ষণই তো সময় ! অফিস তো অফিস, সে না থাকলেও অফিস থাকবে। অফিস থেকে ফিরে সে আগে একটা বই নিয়ে বসতো পড়তে। এখন ফেসবুক নিয়ে বসে। ফেসবুক যে কী ভয়ঙ্কর এক নেশার মতো! আসলে, ফেসবুক নয়, এক্সট্রা ম্যারাইটাল প্রতিদিন যে বলছে তার সঙ্গে বিছানায় সে কী কী করবে, কী করে তার সারা শরীরে চুমু খাবে, কী করে ঠোঁটে, বুকে আদর করবে আর তাকে ঘন ঘন শীর্ষসুখ দেবে… সেসব পড়ার নেশা। এই নেশাটা তাকে প্রচুর অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখন সে রাস্তাঘাটে বা অফিসের যুবকগুলোর দিকে আগের মতো চাই চাই চোখে তাকায় না। সে ঋষিলার দৈনন্দিন জীবনকে অনেক পূর্ণ এবং তৃপ্ত করেছে। মনে মনে সে কৃতজ্ঞ তার কাছে। ফেসবুকে সম্পর্কটা এখন আটকে নেই। দু’মাস যাবৎ প্রায় প্রতিদিন কথা হচ্ছে ফোনে, আর শেষ কয়েকদিন স্কাইপেতে দু’জনের সেক্সও ঘটেছে। একস্ট্রা ম্যারাইটালের আসল নাম রোহন, মহারাষ্ট্রীয়, আর্টিস্ট, বয়স বত্রিশ। এর চেয়ে চমৎকার জুটি আর কী হতে পারে! পুণে থেকে উড়ে এসে তার সঙ্গে সত্যিকার সেক্সের প্রস্তাবটি ঋষিলাই দিয়েছিল রোহনকে। শুধু তাই নয়, পুণে কলকাতা আসা যাওয়ার টিকিটও ইমেইল করেছিল। টিকিট পেয়ে ‘লেটস ফাক হোল উইক’ বলে লাফিয়ে উঠেছিল রোহন। রোহনকে ছুঁয়ে দেখতে চায় ঋষিলা। সত্যিকার মৈথুন চাই, হস্তমৈথুন শরীর আর নিতে চায় না।
সাতদিনের ছুটি নিয়েছে সে, আজ বিকেলেই শিমূল জিজ্ঞেস করেছে, ‘হঠাৎ এতদিনের ছুটি কেন? কোথাও যাচ্ছো?’ ঋষিলা হেসে বলেছে,
- ‘একস্ট্রা ম্যারাইটাল’ যাওয়ার জন্য মরিশাসে ফ্লাইট বুক করেছি। যাবি?
- ‘বিয়েটা না করলে ঠিক ঠিকই যেতাম। ঋষিলার ঠোঁটে একচিলতে হাসি। শিমূলের জন্য সেই আকর্ষণ আর নেই ঋষিলার, রোহন এসে শিমূলের জায়গা কবেই দখল করে নিয়েছে। শিমূলের বিয়ের পর রোহনের মতো একজন পুরুষেরই দরকার ছিল তার জীবনে, এরকম বানের জলের মতো কেউ, সব কষ্ট-স্মৃতি ভাসিয়ে নেবে, স্নিগ্ধ শীতল নতুনতা ছড়িয়ে তাকে আরও উজ্জ্বল করবে, যেন সে জন্ম নিল এইমাত্র, অতীত বলে কিছু ছিল না কখনও তার। শিমূল অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছে, ‘কী কারও প্রেমে পড়েছ নাকি, দেখতে আরও উজ্জ্বল হয়েছ।’ মিষ্টি হেসে ঋষিলা বলেছে, ‘এই, মুন কেমন আছে? চলছে তো সব ঠিকঠাক? বলে, শিমূলের উত্তরের জন্য না অপেক্ষা করেই অফিস থেকে বেরিয়ে গেছে ঋষিলা। প্রতিদিন যখন বেরোয় তার চেয়ে খানিক আগেই বেরিয়েছে। শরীর জুড়ে রোহন ডাকছে তাকে। সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে।
বাড়িতে এসে গান গাইতে গাইতে স্নান করেছে। এত সময় নিয়ে সে স্নান করে না খুব। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সেজেছে। পারফিউম মেখেছে। শোবার ঘরটা সাজিয়েছে রজনীগন্ধার স্টিকে। নতুন চাদর বিছিয়েছে বিছানায়। দুটো শুধু বালিশ ছিল, নতুন দুটো বালিশ যোগ করেছে। বড় বাড়ী। তিনটে শোবার ঘর। একটা অংশু আর তার। আরেকটা অতিথির জন্য। আরেকটা ফাঁকা। আরতিদি পুরোনো কাজের লোক। সে জিজ্ঞেস করেছে, ‘আজ দাদাবাবু আসছে নাকি গো, এত সাজগোজ করছ যে?’ শুনে বিরক্ত কণ্ঠে সে বলেছে, ‘তুমি যে দিদি কী আবোল-তাবোল বকো, ও এক্ষুণি হঠাত্ আসতে যাবে কেন?আমার কয়েকজন কলিগ আসবে !’
আরতিদি প্রচুর রান্না করেছে আজ।
মাটন বিরিয়ানি,কাশ্মীরী পোলাও,চিকেন টিক্কা,মুর্গ্ মসল্লম্,মটন হাণ্ডি কাবাব,ভেটকি-প্রণ মালাইকারী...ইত্যাদি। রোহন আর সে ক্যান্ডেল-লাইট ডিনার করবে। তারপর শোবার ঘরে চলে যাবে, দরজা বন্ধ করে দেবে ঘরের। জানালার পর্দাটা সরিয়ে দেওয়া। বিছানা থেকেই জানালার ওপারের চাঁদটা দেখতে পাবে। জ্যোৎস্নায় ঘর ভরে যাবে, আর ওই আলোয় তারা শরীরে শরীর ডুবিয়ে স্নান করবে সারা রাত। শোবার ঘরটায় ঋষিলা জুঁইয়ের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে রাখে। নিজের গায়েও সুগন্ধী। বাড়িটায় যেন ফুলের উৎসব হচ্ছে। হেমন্তর রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি চালিয়ে দেয়। ‘হৃদয়বাসনা পূর্ণ হলো’ গানটি বাজতে থাকে। সে গুনগুন করে গাইতে থাকে। কখনই খুব ভালো গাইতে জানে না। কিন্তু গান ভালোবাসতে জানে। ঋষিলা একটা নীল রঙের শাড়ি পরেছে। ইচ্ছে করেই খুব বড় গলার ব্লাউজ পরেছে। স্তনজোড়া উঁকি দিচ্ছে,তা দিক। লরিয়েলের কালো রঙ তার চুলে। সামান্যই পেকেছে যদিও, সে মুছে ফেলেছে সাদার চিহ্ন। সাঁইত্রিশের টান টান শরীর, কিন্তু চুলে পাকন, ঠিক মেলে না। এমনিতে কালো সাদায় তার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু রোহনের সঙ্গে সাতটা দিন ঘনিষ্ঠ সময় কাটাবে, বয়সের চিহ্নটিহ্ন এসে না হয় এই সাতটা দিন নাই জ্বালাক।
রোহন ফোন করেছে দমদমে নেমেই। রেড লেবেলের একটা বোতল আর দুটো গ্লাস এনে শোবার ঘরের খাটের পাশের টেবিলে রাখে ঋষিলা। এরকম অ্যাডভেঞ্চার আগে কখনও করেনি সে। একটা অচেনা মানুষের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হলো, তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কে যাওয়ার জন্যই সব আয়োজন দু’জন করছে, কোনো প্রেম হলো না, কেউ কারও জন্য "ভালোবাসি" শব্দটা উচ্চারণ করলো না, কিছুদিন মামুলি আলোচনার পর যৌনতা ছাড়া জগতের অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হলো না ! দু’জনের কিন্তু কারওরই মনে হচ্ছে না খুব বিচ্ছিরি কোনো কাজ তারা করছে। দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক। দু’জনই একা থাকে। শরীর চাইলে শরীর তারা তবে কেন মেলাবে না!
সকাল থেকেই শরীরে বান ডাকছে। ঋষিলার মনে হতে থাকে সে নিতান্তই ষোলো বছর বয়সী এক কিশোরী। না হয় সে ষোলো বছর বয়সীই। ষোলো বছর যখন বয়স, তখন সে কঠিন কঠিন বই পড়ে কাটিয়েছে, চল্লিশ বা পঞ্চাশ বয়সীরা যা করে। সেই ষোলোটা ফেরত পাওয়ার যদি সুযোগ হয়, তবে ফেরত সে নেবে না কেন! কাউকে তো দিব্যি দেয়নি যে ফেলে আসা কোনো বয়স সে কোনোদিন ফেরত নেবে না।
ঋষিলার কাছে রোহন সম্ভবত আস্ত একটি পুরুষ ছাড়া আর কিছু নয়। সে বলে-কয়েই সাতদিন শুতে আসছে তার সঙ্গে। শুধু শরীরের আকর্ষণকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে একটা সম্পর্ক। ঋষিলা ভাবে, সবসময় যে আগে মন, পরে শরীর হতে হবে তারই বা কী মানে? শরীর আগে, মন পরে হওয়াটাই বরং বেশি ভালো। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চয়ই রোহন ওকে জড়িয়ে ধরে গভীর করে চুমু খাবে। তারপর সোজা শোবার ঘরে। দৃশ্যগুলো কল্পনা করে সে। আবেগে চোখ বোজে। শরীরের নিভৃতে গর্জন করে সুখের স্রোত। আরতিদি রান্না করে চলে গেছে,সার্ভ করার জন্য থাকবে বলেছিলো,কিন্তু ঋষিলাই চায়নি সে থাকুক।অংশু তো তিনমাসের আগে ট্যুর থেকেই ফিরবে না।সকালে আর রাতে রুটিনলি দুবার কথা হয়।আরতিদিকে সাতদিনের ছুটি দিয়েছে ঋষিলা। আরতিদি ঋষিলার বিয়ের আগে থেকে এই বাড়িতে আছে। কিন্তু নিজের সংসারের চেয়েও মনিব-মনিবানির পরিবারকে বেশী আপন করে দেখে।

২.

ঠিক সাতটায় রোহন এল। ফোটো দেখে বা স্কাইপেতে দেখে যেমন অনুমান করেছিল, তার চেয়ে অন্যরকম, যতটুকু লম্বা ভেবেছিল, তার চেয়ে বরং খানিকটা বেশি, যতটা বাল্কি লাগছিল, তার চেয়েও স্লিম, যতটা সুদর্শন ভেবেছিল, তার চেয়েও বেশি সুদর্শন রোহন। দু’জনেই হাই-হ্যালো বলে হাত মেলাল। শোবার ঘরে নেওয়ার বদলে বসার ঘরে নিয়ে এল রোহনকে। দু’সোফায় মুখোমুখি বসল দু’জন। একটুখানি দৃষ্টি বিনিময়। একটুখানি হাসি দু’জনের ঠোঁটে। ঋষিলা বসে আছে রোহন উঠে এসে ঠিক স্কাইপেতে যেমন বলত, ‘ইউ লুক্ সো হট্ হানি। কাম অন্, লেটস্ হ্যাভ্ সেক্স’ বলে কিনা। রোহন নিজেই ক্যামেরাকে নামিয়ে দিত উরুসন্ধির দিকে আর ঋষিলাও খুলত বুকের কাপড়। দুটো যৌনকাতর নারী-পুরুষ আজ মুখোমুখি বসে আছে। দু’টো শরীরের বাসনা আজ পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে দু’জনের কথোপকথনে যৌনতার তিলমাত্র কিছু নেই।
- একটু জল খাবো।
- আই অ্যাম্ সরি। জল আগেই দেওয়া উচিত ছিল। চা বা কফি কিছু খাবে?
- না। আমি খাই না ওসব।
- তবে কি, হুইস্কি খাবে?
- হুইস্কি তো আমি খাই-ই না।
- ও
- ক’টার সময় রাতের খাবার খাও?
- ঠিক নেই। বেশ সুন্দর সাজানো তো বাড়িটা। এত বই কার? সব তোমার?
- হ্যাঁ আমার।
রোহন উঠে বইয়ের তাকগুলোর দিকে যায়, মগ্ন হয়ে বই দেখতে থাকে। অনেকক্ষণ কেটে যায় এভাবে। ঋষিলা জল এনে দিলে বই দেখতে দেখতেই জল খায়।
- ইফ ইউ ডোন্ট্ মাইন্ড্, আমি কি কিছু বই বের করতে পারি এখান থেকে?
- হ্যাঁ নিশ্চয়ই, গো এহেড।
রোহন তিনটে বই নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। সোফায় এসে বলল, তুমিও দেখছি জীবনানন্দের বই পছন্দ কর। বনলতা সেন পড়েছ?
ঋষিলা হেসে বলল, সেটা কে না পড়েছে?ওঁর শুধু তিনখণ্ড কবিতার বই-ই আছে সংগ্রহে।
- তোমার অসাধারণ কালেকশন।
- ক্লাসিকস্ বেশ কিছু আছে।
- ক্লাসিকসের কথা বাদ দাও। ওগুলো ছোটবেলায় পড়েছি। ইদানীং জয় গোস্বামী,শ্রীজাত ছাড়া কিছু ভালো লাগে না।
- আছে বেশ কটা- যেমন পাগলী তোমার সাথে।
চোখেমুখে খুশি উপচে ওঠে রোহনের।
- তুমি জয় গোস্বামীও পছন্দ কর? বাহ! কোনগুলো আছে বল না। ওনার শেষটা আমার এখনও পড়া হয়নি।
- আমার সবচেয়ে পছন্দ এটাই। পাগলী তোমার সাথে।
- ও বইটার তুলনা হয় না।
- বধ্যভূমি একাদশটা তো এখনও বেরোয়নি বোধহয়।
- এই অক্টোবরে বেরিয়েছে শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায়।
রোহনের মধ্যে একটা কিশোর বাস করে। দেখে ভালো লাগে ঋষিলার। ঋষিলার মতোই সে উজ্জ্বল উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে সময় সময়। বইয়ের গল্পে মেতে ওঠে রোহন। যেন দু’জনে কোনো বুক ক্লাবের মেম্বার। বইয়ের পছন্দে এত মিল আর কারও সঙ্গে নেই ঋষিলার। তারপর কথায় কথায় বেড়ানোর কথা উঠল, ভারতের কোথায় কোথায় কে গেছে। তাতেও মিল, দু’জনে বর্ণনা করতে থাকে দু’জনের পছন্দের জায়গাগুলোয় নিজেদের অভিজ্ঞতা। এক সময় খাবারের প্রসঙ্গ ওঠে, ওতেও মিল। দু’জনই বাঙালি খাবার পছন্দ করে।
দশটা বেজে যায় গল্প করতে করতে। জল ছাড়া কেউ আর কিছু পান করে না।মাঝে একবার মিরিণ্ডা জাতীয় সফ্টড্রিংক্স নিয়েছে রোহন। তারপর টেবিলে খাবার সাজিয়ে দেয়। না, মোমবাতি জ্বালানোর প্রয়োজন মনে করে না ঋষিলা। খেতে খেতে রোহন বলে, ‘বাহ, বেশ কম তেলে, কম মশলায় রান্না তো। আমার মা’র রান্নার মতো। ‘আরতিদি ভালো রাঁধে'। রান্নার বেশ প্রশংসা করল রোহন।ঋষিলা থালায় নিজে খাবার বেড়ে নিল। রোহনের খাওয়া বেশ পরিপাটি। পরিপূর্ণ ভদ্রলোক। দেখে বেশ ভালো লাগে তার। কলকাতায় কেন আজ অবধি তার বাড়িতেও এমন ভদ্রলোক সে দেখেনি।চারিদিকে ফেলে ছড়িয়ে। খেয়ে ওঠার পর রোহন বলল,
- কাল তোমায় ডিনারে নিয়ে যাব কেমন! কলকাতার সবচেয়ে ভালো বাঙালি খাবারের রেস্টুরেন্টে।
- তোমার মা কী কী রাঁধেন, শুধু মারাঠী রান্না, নাকি বাঙালি রান্নাও? রোহন অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে যে তার মা মারা গেছেন এক বছর হলো। সড়ক দুর্ঘটনায়। দু'ভাই মায়ের সঙ্গেই থাকত। বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে দাদা। গাড়িটা সেদিন চালাচ্ছিল রোহন নিজে। দাদার বাড়ি থেকে ডিনার খেয়ে ফিরছিল নিজেদের বাড়িতে। মদ্যপান করেছিল খুব। বোমার মতো একটা ট্রাক ছুটে আসছিল তার গাড়ির দিকে, দেখতে পায়নি। ট্রাক এসে ধাক্কা মারল, আর গাড়িটা গড়াতে গড়াতে খাদে পড়ে গেল। ওখানেই মারা যায় মা। রোহন চোট পেয়েছিল, তবে হাসপাতালে দিন কুড়ি থাকার পর তা সেরে যায়। সেদিনের পর থেকে রোহন আর মদ ছোঁয়নি। মায়ের কথায় মায়ের কথা আসে। ঋষিলাও মায়ের গল্পে যোগ দেয়।অনেকদিন ভুলে ছিল নিজের মাকে। আজ যেন মা তার সামনে এসে বসেছেন। স্মৃতির ঝাঁপি দুজনেই খুলে বসে। দুজনের চোখই ভিজে ওঠে। রোহন তার মায়ের প্রসঙ্গ না তুললে সম্ভবত এভাবেই ঋষিলা ভুলে থাকত মাকে। বারোটা বেজে যায়। রোহন বলে, ‘আমি কোথায় ঘুমোব?’
ঋষিলা কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর হেসে বলে, ‘একটু দাঁড়াও। গেস্টরুমের বিছানাটা ঠিক করে দিই। চাদরটা চেঞ্জ করে দিই। আমার ঘরে এক্সট্রা বালিশ আছে, দিয়ে দিই।’
রোহন আগে কখনও কলকাতায় আসেনি। ঋষিলা বলে, কাল তোমাকে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে নিয়ে যাব। আর প্যানোরামায়। তোমার ভালো লাগবে।
রোহন ‘যে জন আছে নির্জনে’ বইটি হাতে নিয়ে মিষ্টি হেসে বলে, ‘এই বইটা কি রাতে পড়ার জন্য নিতে পারি? এটা আমার পড়া হয়নি।’

৩.

যে কটা দিন ছিল রোহন, কিশোর-কিশোরীর মতো ঋষিলা আর রোহন কলকাতার রাস্তায় টই টই করে ঘুরেছে, রাস্তার ধারের তেলেভাজা থেকে "ভজহরি মান্না" র খাবার কিছু বাদ দেয়নি। হাতেটানা রিকশায় চড়েছে গঙ্গায় নৌকো চড়েছে, যেদিকে খুশি সেদিকে চলে গেছে। ঋষিলা ভুলে গেছে তার চাকরি-বাকরি, তার সংসার, তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। যেন সে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, সবার নাগালের বাইরে, কোনো অচেনা আকাশে উড়েছে। সত্যিকার ‘ভালোলাগা’ বোধহয় একেই বলে। ঋষিলাকে রোহন উপহার দিয়েছে দু’টো চমৎকার কিউরিও আর গণেশ পাইনের একটা পেইন্টিং। প্রথম একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, যার সঙ্গে ভাবনা চিন্তার প্রায় সম্পূর্ণই মিল পেল ঋষিলা। জীবনের অনেক কথা বলেছে সে রোহনকে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার কথা, শিমূলের কথা, একরাশ দুঃখ-সুখের কথা। সব মন দিয়ে শুনেছে রোহন। রোহনও বলেছে, তবে বলার চেয়ে রোহন শুনতেই বেশি পছন্দ করেছে। মাত্র ক’টা দিনে কী অসম্ভব আপন হয়ে উঠেছে রোহন। যেন রোহন তার ছোটবেলার কোনো বন্ধু। যেন রোহনের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর জুড়ে সে এক্কা-দোক্কা খেলেছে, মার্বেল লাট্টু খেলেছে, পুকুরে মাছ ধরেছে, ঘুড়ি উড়িয়েছে। মাঝে মধ্যে বিয়ের পরের অতীতের কোনো ঘটনা বলতে গিয়ে তার চোখে জল এসেছে। আলতো করে বুকে টেনে তাকে শান্ত করেছে রোহন। রোহনের ওইটুকু স্পর্শই পেয়েছে ঋষিলা গোটা সাতদিনে। চুমু খেতে একবার দু’বার চেয়েছিল, কিন্তু বারণ করেছে নিজেকে। ভেবেছে, রোহন তো বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু ভাবছে না।
রোহন চলে যায়, ঋষিলাকে দিয়ে যায় ঋষিলার শ্রেষ্ঠ সময়। ঋষিলার আর জিজ্ঞেস করা হয়নি, ফেসবুকে "এক্সট্রা ম্যারাইটাল" নামের আড়ালে রোহনের চরিত্র কেন তার ফেসবুকের বাইরের রোহনের চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত? জিজ্ঞেস করেনি, অনুমান করে নিয়েছে, মায়ের মৃত্যুর কারণে যে ভীষণ গ্লানি আর শোকে ভুগছে রোহন, তা থেকে মুক্তি পেতেই আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে, ভিন্ন চরিত্রে। ঋষিলা কেন আশ্রয় নিয়েছে ফেসবুকে! কিছু হয়ত তার ভেতরেও আছে, সে নিজেও জানে না। রোহন জানে কি? জিজ্ঞেস করা হয়নি রোহন জানে কি না। এ ক’দিনে একবারও ঋষিলার শরীরে বান ডাকেনি। শুধু মনেই ঝরেছে ফোঁটায় ফোঁটায় ভালোলাগার বৃষ্টি। ঋষিলার ফেসবুকের চরিত্রটা কি তার সত্যিকারের চরিত্র নয়! সে ভাবে, কোন রোহন সত্যিকারের রোহন! যে রোহনের সঙ্গে নেটে দেখা হয়, নাকি যে রক্তমাংসের রোহনের সঙ্গে বাড়িতে দেখা হলো! রক্তমাংসের রোহনই তো ফেসবুকের "এক্সট্রা ম্যারাইটাল", যার সঙ্গে রাতে রাতে তার শারীরিক উৎসব হয়। কত যে রহস্য একজন মানুষের ভেতর। সম্ভবত কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে বাস করে একজন মানুষের মধ্যে। একজন আরেকজনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
রোহনকে এয়ারপোর্টে "সি-অফ" করে যখন বাড়ি ফিরছিল, উদাস তাকিয়েছিল গাড়ির জানালায়, তখন এস্.এম্.এস্. আসে।
রোহন লিখেছে, "আই লাভ ইউ।এত সুন্দর একটা সম্পর্ক উপহার দেওয়ার জন্য।"
বুক কাঁপে ঋষিলার। তীব্র ভালো লাগা মন থেকে শরীরে ছড়িয়ে যায়।থরথর করে কাঁপা কাঁপা হাতে সে লিখল, "মি টু।"
শ্রাবণধারা দুচোখে।
গাড়ির পেনড্রাইভে সংরক্ষিত মোহরদির কণ্ঠে তখন বেজে চলেছে,‘চিরসখা হে ছেড়ো না মোরে…’

সোমবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৫

আত্ম-অতীত

আত্ম-অতীত
------------------
কাহিনীকার-স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
--------------------------------------------

বর্ষণ-ঝঞ্ঝামুখর রাত । না, কথাটা যথার্থ হলো না । বাইরে যা হচ্ছে তার নাম মহাপ্রলয় । সামনে প্রহরীর মতো কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছদুটি নুয়ে পড়েছে । আমগাছটাও গতাসু হয়েছে পশ্চিমের টিনের চালার ঘরের উপর । কোত্থেকে একটা টিন উড়ে এসে নতুন মোচা আসা কলাগাছটাকে চিরে দুভাগ করে দিল ।

এমন ঝড় বৃষ্টির রাতে আমাকে একা ফেলে সবাই চলে গেছে ! হতবিহ্বল আমি ছুটতে আরম্ভ করলাম । ছুটতে ছুটতে একসময় চলে এলাম একটা খোলা মাঠে । চিৎকার করে ডাকতে লাগলাম বিভিন্ন প্রিয়জনের নাম ধরে । কিন্তু বাতাসের গায়ে ধাক্কা পেয়ে বারবার ফিরে আসছিলো আমার চিৎকার ।

আবার ছুটতে শুরু করলাম । সামনে একটা গহীন সবুজ অরণ্য । এখানে আকাশ ছোঁয়া সব গাছ । দীর্ঘ থেকে
দীর্ঘতর বনপথ । আকাশ জুড়ে বাজছে ঝড়ের জগঝম্প; তবলার মত । তানপুরার মত জলে জলে শব্দ তুলছে বৃষ্টিসঙ্গীত । সবুজের বুক চিরে রক্তাক্ত পায়ে এসে থামলাম একটা প্রকান্ড বাড়ির দরজার সামনে । ভয়ে আড়ষ্ট অভিভূত আমি ক্রমাগত করাঘাত করতে করতে দরজায়। একসময় দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম ।
শান্ত সৌম্য চেহারার একজন বয়স্কা দাঁড়িয়ে দরজার ওপাশে । সাদা তাঁতের ওপর গাঢ় সবুজ শাল গায়ে । এমন বিমর্ষ অনবদ্য নীল চোখ, মজবুত চোয়াল, এমন সুগঠিত শরীর । যেন সামনে দাঁড়ানো কোন গ্রীক দেবী ।

- ভেতরে এসো কল্যাণী ।

এর আগেও অনেকে আমার নাম ধরে ডেকেছে আমাকে । কিন্তু একি অদ্ভুত অনুরণন তার কন্ঠস্বরে, একি সীমাহীন স্বপ্নজাগানো ধ্বনি ! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত বাড়ির ভেতরে চলে এলাম ।

ঢুকতেই মুখোমুখি একটা বড় আয়না । মৃদু আলোয় আয়নায় আমি আমার যেন একখন্ড সবুজ অবয়ব দেখলাম ।

হাজার বছরের বেশি আমি হেঁটেছি তার ছায়ার সঙ্গে মনে হল। খুব ইচ্ছে হলো তাকে বলি মনের এই কথাটা । কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না ।

- আপনি একাই থাকেন ?

চোখ তুলে তাকালো সে । মিষ্টি করে হাসলো । কি জানি কি অর্থ এই রহস্যময় হাসির ? একটু আগে যে ভয় আমাকে গ্রাস করে, বিমূঢ় করে রেখেছিলো, মনের কোণে এখন তার কোন অস্তিত্বই নেই । মনে হলো যা
কিছু ঘটছে এর সবকিছুই স্বাভাবিক ; পূর্বনির্ধারিত ।

- আমি জানতাম তুমি আসবে । তাই এতো আয়োজন ।
- আর কি কি জানতেন ?
- অনেক কিছু ।
- যেমন?
- প্রায় তোমার ইচ্ছে করে কোন গহীন অরণ্যে হারিয়ে যেতে । তোমার ইচ্ছে করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পৃথিবী দেখতে । একদিন সব কিছু ছেড়ে কোন এক উঁচু, অতিকায়, মহান এক পাহাড়ের টানে তুমি চলে যাবে বলে ভেবেছো।সে দিনটি হবে তোমার জন্মদিন ।
- তোমাকে কি এর আগেও আমি দেখেছি কোথাও ?
- দেখেছো । কোজাগরীর জ্যোৎস্না ভাসা রাতে, চৈত্রের ভয়ঙ্কর নির্জন দুপুরে, একাকীত্বে।প্রতিটা জন্মদিনে যখন তুমি শহরের সবচেয়ে উঁচু ছাদে বসে একা কাঁদতে । খুব সকালে তোমার জানালার গায়ে যে মেঘ জমতো, সে সব মেঘের গায়ে । একাকীত্বের বিষণ্ণতায় অনেকগুলো ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছিলে যখন।মনে হয়েছিলো, জীবনের সে কি অপার পাওয়া, সুখের কি অফুরন্ত সম্ভারময় এই জীবন । ভুলের অনুশোচনায় বারবার ইচ্ছে করছিলো পৃথিবীতে ফিরে আসতে । তখন জীবনে ফিরে আসার পথটা জুড়ে আমারই হাত আঁকড়েছিলে ।

এখন চিনতে পেরেছি তাকে । চিনতে পারার সাথে সাথে ভয়ঙ্কর একধরনের ভালোলাগা ছুঁয়ে গেলো আমাকে ।সে এত বেশিবার আমার সাথে হেঁটেছে, কথা বলেছে আমার ছায়ার সাথে;আমি ভুলে গেছি বাস্তব-অবাস্তব-স্বপ্নের পার্থক্য।

- তুমি কেমন করে এলে এখানে ?
- যেমন করে তুমি এসেছো । ইঁট-কাঠের কদর্য পৃথিবীতে একটু নিশ্বাসের জায়গা হয়নি । এক রত্তি সবুজের অভাবে মরে যায় যে হৃদয়, যে প্রাণ ছেড়ে আসে জীবনের হাত, তারা তোমার-আমার মত অরণ্যের সবুজে আসে পুনর্জনমে ।
....
.......
.........

- এই যে শুনুন ; শুনতে পাচ্ছেন ? ভিজে
গেলেন তো ! এই যে আপনাকে বলছি ...

এভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানি না । ট্রেনের জানালায় হাতের উপর চিবুক রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । বাইরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে । বাতাসে উড়ছে ভেজা বিস্রস্ত চুল । চোখে এখনো লেগে আছে সেই বিনোদিনী স্বপ্ন । হাজার রাতের অন্ধকার নেমেছে বাইরে, ভয়ঙ্কর কালো জলের মত স্থির । ছুটছে শুধু ট্রেন । ভাসছি কেবল আমি । ট্রেনের সাথে সাথে ছুটে চলছে বত্রিশটি বছরের অতীত । কিংবা অতীত খুলে দিয়েছে বর্তমানের দুয়ার ।

ছোটবেলায় খুব ছোট একটা বাড়িতে থাকতাম । সেখানে কোন বারান্দা, কোন ছাদ ছিল না, ছিল না একটু উঠানও । এসবের বদলে বাবার হাত-মায়ের আঁচলকে আকাশ ভেবে জড়িয়ে ধরে থাকতাম সারাক্ষণ । তাদের সাথে বৃষ্টির ফোঁটার মত অবিরাম ঝরতো আমার কথার মেঘমালা ।

বিয়ের পরে বড় একটা বাড়ীতে এলাম । এখানের সব কিছুই বেশি রকমের বড়, প্রয়োজনের তুলনায়। চারদিকে খোলা বারান্দা, দিগন্তের মত মস্ত বড় ছাদ। এতো কিছুর মাঝে ধীরে ধীরে আমি হারিয়ে ফেললাম সব পুরোনো । এতো বড় বাড়িতে একা ছুটোছুটি করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম । এতটুকু আমি, এক রত্তি , আকাশের মত বিরাট ছাদে বড্ড একা লাগতো আমার । আমার সমস্ত গল্প একে একে জমতে শুরু করলো আমার ঘরের দেয়ালে, জানালার কাঁচে, দামী আসবাবপত্রের স্তুপে ।

বিয়ে হয়েছে ছ'বছর হয়েছে । ও একটা কর্পোরেট ফার্ম চালায়। তাই ছুটি পায়না একদম ।

আমার সামনের সীটে যে মেয়েটি বসে আছে, সাধারণ একটা মেয়ে । কি সুখী চেহারা মেয়েটির !

আমাদের প্রকাণ্ড বাড়ি আমাকে কখনো সুখী করতে পারেনি । শহরের ব্যস্ততম সড়কের পাশে আকাশের কাছাকাছি একটা বিশাল ফ্ল্যাট আমাকে এতটুকু স্বস্তি দিতে পারেনি । ছোটবেলায় পাশের বাড়ির টুসির মতো একটা খেলনা গাড়ির খুব লোভ হয়েছিল । বাবা আমার
জন্মদিনের উপহার হিসেবে গাড়িটি কিনে দিয়েছিলেন । সেদিনের আনন্দের কথা আমার অহোরাত্র জানে । তারপর প্রতি বছর নতুন নতুন মডেলের গাড়ি কেনা হত আমার জন্য । কিন্তু সেই লাল-সবুজ খেলনা গাড়ি, আমার আনন্দ দেখে বাবার চোখের সেই মুগ্ধতা আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না । প্রায় রাতে বাবার কোলে গল্প শুনে গভীর আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে থাকার মত নিরবিচ্ছিন্ন ভালবাসার দিন-রাত আমাকে কেউ ফিরিয়ে দেবে না ।

দুঃখগুলো পেকে ঝুনো নারকেল হয়েও খসে পড়ে না কেন ? অথচ সুখের বেলায় ঠিক উল্টোটা । টুসটুসে হওয়ার আগেই অবেলায় আঁকশিতে হ্যাঁচকা টান । জীবন এমন কেন ? প্রাণটাকে একলা ফেলে সুখের হাত ধরে পালিয়ে যায় স্বার্থপরের মত ।

- কোথায় যাবেন আপনি ?

সামনের সীটে বসা মেয়েটি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । নিবিড়ভাবে তাকিয়ে দেখছে আমার অবয়ব । বাইরে যে ঝড় বইছে তার প্রলয় এলোমেলো করে দিচ্ছে আমার চুলের বিন্যাস ।ট্রেনের জানালাটা তারপরও বন্ধ করতে ইচ্ছে করছে না ।

- কি জানি? একেবারে দক্ষিণে গিয়ে থামবো । শুনেছি সাগরে পা ভেজালে মন শান্ত হয় ।

মেয়েটা অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছে। থাকুক, অবিশ্বাসের সম্মুখীন হলেই মানুষের বিশ্বাস দৃঢ় হয় । আমি আবার জানালার বাইরে মাথা বের করে দিয়ে বসলাম । এটা আমার দ্বিতীয় জীবন । কাল রাতের ঘটনার গ্লানি মুছে যেত যদি আমার প্রাণটা সতের তলায় নিঃশেষ হয়ে যেত। কিংবা পাখির পালকের মত উড়ে উড়ে মাটিতে এসে মিশত শরীরটা।
জানি না কি হলো আমার । মনে হলো মৃত্যু মানেই তো হারিয়ে যাওয়া । আড়াল হয়ে যাওয়া । অপরিচিত পৃথিবীতে জন্ম নেয়া । মন্দ কি, আমি যদি আর না ফিরি এই গুরুত্বহীন জগতে ।
অনেক সময় নিয়ে স্নান করলাম । শরীরের যেখানে যেখানে জানোয়ারের ছোঁয়া লেগেছে সেখানে ধুয়ে মুছে সাফ করার ব্যর্থ চেষ্টা । শাওয়ারের নীচে
কিছুক্ষণ মন হালকা করে কাঁদলাম । শেষ যেবার ভ্রমণে প্যারিস গিয়েছিলাম সেখান থেকে কিছু দামী সুগন্ধী কিনেছিলাম । সেগুলো সারা শরীরে ছড়িয়ে দিলাম । যেন সেই সমুদ্রপারের কাহিনী । জীবনানন্দের একটা কবিতা মনে পড়লো-

....যতবার মন ছিঁড়ে গেছে, হয়েছে দেহের মতো হৃদয় আহত,
যতবার উড়ে গেছে শাখা, পাতা পড়ে গেছে যত—
পৃথিবীর বন হয়ে — ঝড়ের গতির মতো হয়ে,
বিদ্যুতের মতো হয়ে আকাশের মেঘে ইতস্তত;
একবার মৃত্যু লয়ে — একবার জীবনের লয়ে
ঘূর্ণির মতন বয়ে যে বাতাসে ছেঁড়ে — তার মতো গেছি বয়ে !

কাল রাতে যে লোকটি আমার সারা শরীর তরতাজা গোলাপের পাঁপড়ি ছিঁড়ে চটকানোর মত রগড়েছে তার সরীসৃপীয় আঙুল আর কামার্ত দৃষ্টি দিয়ে, সে আমার স্বামীর ব্যবসায়ী বন্ধু । সে ফ্ল্যাটে এসেছিলো স্বামীর খোঁজে, যদিও সে জানত এইসময় সে থাকে না । সে জানত এখানে আমার শত চিত্কারেও কোন প্রতিকার হবে না । এর আগেও আমি তার কামনার্ত কুৎসিত দৃষ্টি দেখেছি । দেখেছি আমার বুকে তার দৃষ্টির লালা গড়াতে । আমি জেনে গেছি এই শহরের মানুষ আমার শরীরই দেখেছে কেবল।

বাইরে
তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে । আমার শরীর অনেকটাই ভিজে গেছে । হাওয়ার বেগে ছুটছে ট্রেন । আর ট্রেনের গতির বিপরীতে আমি ফেলে আসছি আমার অতীত ।

শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৫

স্বপ্নের ডানা

স্বপ্নের ডানা
----------------
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-----------------------------------------------

একমাত্র মেয়ে মৌ'কে নিয়ে বাবা মায়ের অনেক স্বপ্ন ! তাদের মেয়ে উচ্চ ডিগ্রী নিতে বিদেশে যাবে । তারপর দেশে এসে মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেবে । আর কি চাই বাবা মা হয়ে ! যেভাবেই হোক সুস্নাত পত্রনবীশ মেয়ে মৌ'কে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেনই । পড়াশুনা না করলে যে জীবন সুন্দর হয় না তা বাবা হয়ে সুস্নাত খুব ভাল করেই টের পেয়েছেন ।মামা-কাকা-দাদা আর অঢেল টাকা কোনটাই যে তার নেই ! আর তাই কোন রকমে বি.এস্.সি. পাশ করেও জীবন হয়েছে তার কাছে বড় বেশী বৈরী ! তাছাড়া বর্তমানে যে প্রতিযোগিতার মাঝে সবার বসবাস তাতে বাঁচতে হলে সবার সেরা হতে হবে,মেধা আর সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে ।তাহলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে কেউ আর আটকাতে পারবে না! মৌ সেই চার বছর বয়স থেকে পড়াশুনায় মনোনিবেশ করেছে । যদিও তার আগেই তিনে হাতে খড়ি হয়েছে ।কিন্তু তা ছিল পেন্সিলে , স্টাইলো তে, স্টেনসিলে শব্দ খেলার ছলে কিছুটা সময় কাটানো। সে গানও শিখছে সেই ছোট বেলা থেকেই! এখন রীতিমত স্কুলে যাওয়া এবং বাসায়ও প্রশিক্ষকের কাছে হাতে কলমে শিক্ষা নিতে হয় । খেলার সাথী বই, রেডিও শোনা আর সঙ্গীতে তালিম নেয়া । এসব কিছুই যেন স্বপ্নে রাঙা । যা বয়ে আনে প্রতিটা দিনই নতুন নতুন এক অনন্য আনন্দ !
পাখীর ডানায় ভর করে একে একে বছর টপকাতে থাকে মৌ ! সে এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে । সবকিছুতেই একশোতে একশো ! আর পরের পর বছর সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বিদ্যালয়ে যখন পুরস্কারের ঝুলি উপচে পড়তে থাকে সোনামণি মৌ-এর।বাবা মায়ের খুশি আর ধরে না।
....
.......
.........
এরই মাঝে একদিন অসুস্থতার কারণে সুস্নাতের এক কাকা যিনি ঝুমা মানে মৌ-এর মায়েরও এক মামা হন; তিনি বেশ কয়েক মাসের জন্য এসে মৌ'দের বাসায় এসে থাকবেন বলেন । মৌ-এর বাবা-মা তো দুজনেই খুব খুশী; কারণ, ভদ্রলোক ছিলেন রিটায়ার্ড গণিতের প্রফেসর।ভালোই হল উনি মাঝেমাঝে মৌ'কে একটু পড়া বুঝিয়ে দিতে পারবেন।মৌও খুব খুশী হয়েছে দাদুকে পেয়ে !
কিন্তু একদিন যখন মৌ গানের ক্লাসে যাচ্ছে তখন দাদুকে দেখল থমথমে মুখে বসে থাকতে।মৌ এর সামনেই তার বাবা-মাকে ডেকে বললেন, "শোনো ঝুমা-সুস্নাত; মৌ মামণি তোমাদের সন্তান অবশ্যই তোমরা তার ভালো বুঝবে কিন্তু এগুলো কি শেখাচ্ছো মেয়েকে? এসব শিখে কি লাভ ওর পরবর্তী জীবনে?তোমরা কি বংশের পরম্পরা ভাঙতে চাইছো? এইসব না শিখিয়ে, অন্য ভাল কিছু শেখাও বুঝলে ! এমনিতেই তো.....” ব্যস , তারপর থেকে তার বাবা-মা আর সাহস করেননি । দাদুও অনেক খুশি হয়েছেন । কোলের কাছটিতে বসিয়ে শুধু পড়াশোনা ছাড়া আর অন্য কোনদিকে মন না দিতে বুঝিয়ে বললেন সাথে পরীক্ষা দেবার জন্য মৌকে একটা দামী স্টাইলো পেন কিনে দিলেন। এখন শুধু মায়ের সাথে সাথে স্কুল , কোচিং আর বাসায় যাওয়া আসা করে মৌ !

মৌ এর বন্ধুরা যখন ড্রেস,কস্মেটিক পার্লার,মুভি,গেম অথবা ডিস্কভারি চ্যানেলের কোন একটা বিষয় নিয়ে তর্কে রত ! কিংবা কে কি কিনেছে ,কোথায় গিয়েছে ,কে কাকে কি উপহার দিয়েছে, সবকিছু নিয়ে একে একে সবাই মেতে ওঠে আড্ডায় । সে তখন নীরবে বইয়ের মাঝে মুখ লুকিয়ে কান খাড়া করে সব কিছু শুনে যায়।তার মাঝে কিছুটা ভয় কাজ করে; সেটা হল , বন্ধুরা বইয়ের বাইরের কোন বিষয়ে কিছু যদি তাকে জিজ্ঞাসা করে বসে , তাহলে সে কিছুই বলতে পারবে না ।মৌ ভাবে “ইসসস্ ওদের কত মজা,কত খেলনা আছে,কত ধরনের গেম আছে কিন্তু তার ...!”সবাই বাবা মায়ের সাথে ফ্যান্টাসি পার্কে যায় । পিত্জা , ম্যাক্, ফ্রাই কত কি খায় ! আর মৌ শুধু এসব বইয়ের মাঝে পড়ে! অবশ্য মাঝে মাঝে বাবা মায়ের সাথে নিজের দাদুর বাড়ীতে যায় , তবে সেখানেও বোঝা হয়ে ঠিকই সাথে থাকে বইয়ের ব্যাগ !

মৌ এর বাড়ীতে পড়াতে আসেন যে স্যার তিনি খুব ভাল ।দু'দিন পর পর কোন বিষয় বোঝাতে গিয়ে একটা করে ছোটদের গল্পের বই এনে দেন আর সে তা পড়া শেষ করে আবার স্যারকে দিয়ে দেয় ! মৌ ভাবে তার এই বর্ণহীন জীবনে গল্পের বই পড়েও তো সে অনেক জ্ঞানার্জন করছে ! হয়তো বা আধুনিকতার কিছু কিছু দিক তার অজানাই রয়ে গেছে । কিছুটা পিছনে পড়ে আছে সে ! কিন্তু তার যে কি হয়েছে এখন, শুধু পড়তে ভাল লাগে না।বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে,গল্প করতে ইচ্ছে করে ,সাজতে ইচ্ছে করে । অথচ এসব কিছুতেই সে অংশ নিতে পারবে না !
একদিন রেডিওতে পরপর কয়েকটা জোকস্ শুনে ভীষণ হাসছিলো মৌ। বাবা এসে তাই দেখে মৌকে বকা দিয়ে বলেছিলেন
-“যাও পড়তে বস ! সারাদিন শুধু রেডিও শোনা আর হি হি করে অহেতুক হাসা ! পড়াশুনা কিচ্ছু নেই ! এবার পরীক্ষায় লাড্ডু পাবে! লাড্ডু”। সেই থেকে আর রেডিও শুনতে সাহস করেনি মৌ । তারপর একদিন রেডিও শুনতে গিয়ে দেখে ব্যাটরী গুলো সব খুলে রাখা হয়েছে !

মৌ এর এক জন্মদিনে বাবা-মা সুন্দর জামা , জুতো কিনে দেয় আর স্যার তাকে একটা বারবি ডল উপহার দেয় ! একদিন সে পুতুলটাকে নিয়ে গুন্ গুন্ করে মায়ের মুখে শোনা একটা গান গাইছিল , ওমনি মা ঘরে ঢুকে পুতুলটা কেড়ে নিয়ে রেগে বলে
- “এত্ত বড়ো মেয়ে,এই বয়সে পুতুল খেলে ! এখন কি পুতুল খেলার সময় ! যাও লেখাপড়া কর !” মৌ ভেবেই পায়না সে আর কত লেখা পড়া করবে ! আগে যে কোন জিনিস দু একবার পড়লেই মনে রাখতে পারতো কিন্তু এখন কত পড়ে তবু মনে রাখতে পারে না ! কিন্তু বাবা মাকে এই কথা কোন ভাবেই বলা যাবে না , তাহলে তাঁরা তাকে খুব বকবে ।
এভাবেই মৌ কেবলমাত্র পাঠ্য বইয়ের আধিক্যতা অর্জন করে এবং বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে এক রকম কুণ্ঠা বোধ আর জড়তা নিয়ে বেড়ে ওঠে । এমন করেই পার হয়ে যায় তিনটি বসন্ত !
বসন্তের কথা মনে উদয় হতেই তার চোখে ভেসে ওঠে ছোটবেলার হলুদ শাড়ী , হলুদ গাঁদা , কৃষ্ণচূড়া ইত্যাদি ; তখনও তার ভুবন এতটা বেরঙ্ হয়নি। এখন এগুলো তার জীবনে সবই বইয়ের দৌলতে আর কান পেতে শোনা , তার পরম স্বপ্নবিলাস ! শুধুই কল্পনার সোনা ঝরা ফাগুনের দিন ! যার স্পর্শ এই নব যৌবন ক্ষণে অলৌকিক অদৃশ্য শক্তির আকর্ষণে মৌকে কি এক রোমাঞ্চকর সোপানের দিকে যেতে বড় বেশী কাছে টানে ! তার এই অনুভূতি যেন চোখের পাতায় লেখা , আর তাই সে সব সময় লজ্জা বোধ করে ।
ইদানীং বন্ধুরা নতুন বিষয় নিয়ে আলোচনায় মুখরিত ঝড় তোলে ! টাচ্ ফোন , কম্পিউটার , ফেসবুক , হোয়াট্সঅ্যাপ ,কার কতজন বন্ধু হয়েছে , কে কটা এস্.এম্.এস্. পেয়েছে ইত্যাদি।মৌ একদিন স্কুল থেকে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে
-“মা আমাকে একটা টাচ্ ফোন কিনে দেবে ?” মা যেন আকাশ থেকে পড়ে।
- “তোর সাহস কত বড়! এই বয়সে টাচ্ ফোন কেনার কথা বলিস !”
“কেন মা ? আমাকে তো কম্পিউটারের ক্লাস করতে হয় । টাচ্ ফোনে নাকি কম্পিউটারের মতই শেখা যায় আর কম্পিউটারও তো বাসায় নেই বলে আমি অন্যদের মত করে শিখতে পারছি না ,তাই নম্বরও...”। -গাল ফুলিয়ে কথাগুলো বলে মৌ ।
-“থাক ! এই একটা বিষয়ে কম নম্বর পেলে অসুবিধা নেই ! ঐ মরবার যন্ত্র বাসায় এনে কি শিখবে তা আমার ভালোই জানা আছে । পেপারে যা খবর বের হচ্ছে দিন দিন তা আর...” মা শেষের কথাগুলো বিড়বিড় করে বলে তাই কিছুই শুনতে পায়না মৌ ।তাঁর আর মোবাইলের কথাটা বলার সামান্যতম ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই হয় না কিন্তু মনে প্রশ্ন থেকেই যায় “কি আছে খবরের কাগজে?” পেপার থাকে বাবার কাছে ।মৌকে কেউ পেপারটা পর্যন্ত পড়তে দেয় না । বাবা বলে,
-“ পেপারে শুধু ধর্ষণ , মারামারি ,খুন , সড়ক দুর্ঘটনা এই সব দিয়ে ভরা ! টাকা দিয়ে আর ভয় ,আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা কিনতে চাই না ! সকালটাই শুরু হয় মন খারাপ দিয়ে । ভয় হয় , এই যে বাসা থেকে বের হচ্ছি সুস্থ ভাবে ফিরে আসতে পারবো তো ! মেয়েটার কোন বিপদ হবে নাতো...!” মাকে বলা কথাগুলো মনে বেশ গেঁথে আছে তার ।
কখনো কখনো অযাচিতভাবেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় মৌকে! সেদিন যেমন ক্লাসের বন্ধুরা শাহরুখ খানের ছবি “রা–ওয়ান” নিয়ে ভীষণ ভাবে অপমান করে তাকে ! ওরা ভাবে ওতো শাহরুখ খান কে, তাই জানে না । সেখানে “রা–ওয়ান” কি, তা কিভাবে জানবে ! স্যারের এনে দেওয়া কোন বইতে তো এই নিয়ে সে কখনো পড়েনি ! সবাই তাকে কেমন যেন ভাবে ! ত্বিষা তো মুখ ভেংচে বলেই ফেলল
- “ওহ মাই গড, শি ইজ সো ডাম্ব !শি ডাজন্ট ইভেন নো দ্য লিট্ল সিম্পল থিংস্, শিট...!” মুখ দিয়ে বিশ্রী শব্দ করে সে । এই কথার মাঝে ঘি ঢালে জিনিয়া
-“ ইউ নো হোয়াট - সি’জ সো এনোইং…..আই বেট শি ডাজন্ট ইভেন নো হু বিন লাদেন ইজ ...?! হা হা হা এবার কথার রেশ ধরে লেখা বলে
-“ ছিঃ ! দিস ষ্টুপিড গার্ল ডাজন্ট নো এনিথিং অ্যাবাউট দিস্ ওয়ার্ল্ড ! সেভ মি গড্...হি হি হি হা হা হা " সবাই সে হাসিতে যোগ দেয় ! মৌ কিছুই বলে না মাথা নীচু করে মুখ ঢেকে রাখে; প্রিয় গল্পের স্টাইলাস বই দিয়ে ! আসলেই সে “বিন লাদেন” কি জানে না ! সবার দুচোখের সীমানা জুড়ে বয়ে চলে রঙিন বর্ণমালা ! যা দেখলেই অনায়াসে পড়ে ফেলা সম্ভব ! কিন্তু তার....!! মাঝেমাঝে ডাক্তার আঙ্কেল কে যখন দেখাতে যায় তখন বাবা আর মা কে দেখে বিমর্ষ হয়ে থাকতে...সীসের মতো কিছু কথা গরম হয়ে ঢোকে তার কানে,"...আর কিছুদিন...."
তাই সে লজ্জা আর ভয়ে মাথা নীচু করে চোখ মাটিতে রেখে সবাইকে পাশ কাটিয়ে চলে । পাছে সবাই তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলে ।যদিও তার হরিণী দু’চোখ জুড়ে মোটা কাঁচের দেয়াল !

নিজেকে অনেক বেশী বেমানান মনে হয় এই স্কুলটাতে , এই জগতের সমবয়সী মানুষগুলোর সাথে ! দু একজন যে ব্যতিক্রম নেই টা নয় ,আছে । তবে তাঁরাও নীরব থাকে ঠিক মৌ এর মত করেই ! পড়াশোনার প্রতি একেবারেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে মৌ । ক্লাসের পরীক্ষাগুলোতে মৌ আগের মত একশোতে একশো পায়না ! বাবা মা , বাড়ীর স্যার এমন কি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও মৌকে বকতে থাকে ! তাকে নিয়ে তাঁদের সবার অনেক আশা ,অনেক স্বপ্ন ! হেডস্যার বাবাকে ফোন করে ডেকে এনে কি সব যেন বলে । আর তাই বাড়ীতে ফিরেই বাবা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে -
-ছিঃ ছিঃ ! কোনদিন ভাবিনি আমার মেয়ের কারণে আমাকে কেউ ডেকে নিয়ে বলবে যে , আপনার মেয়ে এমন রেজাল্ট করলে এই স্কুলে রাখা সম্ভব নয় !
একধরণের অপমানিত বোধ করেন সুস্নাতবাবু । ভীষণভাবে মন খারাপ করে থাকেন তিনি । মৌ এর সাথে সাথে তার মাকেও ভীষণভাবে বকাবকি করেন !
মৌ এর মনে হয় বাবা বা মা খাবার সময়েই যেন একটু অতিরিক্ত আদর করেন ! দুজনেই মুখে তুলে খাইয়ে দেন ! বাবা মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে পড়াশুনা করলে কি হবে , না করলেও তার ফল কতটা ভয়ংকর হবে তাই নিয়ে খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলেন । কিন্তু রাগারাগির পরে কেউ আর মৌকে খেতে ডাকেন না ! দুজনেরই কথা “পড়াশুনা তাঁদের মনের মত না করলে তাকে কেউ খেতেও দেবে না !” সেও রাগ করে আর খেতে যায়নি ! না খেয়ে নির্ঘুম রাত কাটায় । ওদিকে সুস্নাতবাবু ও ঝুমাদেবী দুজনেই খাওয়াদাওয়া রেখে , মেয়ের ভবিষ্যতের আশংকায় ভাষাহীন নীরবে দীর্ঘ রাত পাড়ি দেন ।

ইদানীং মৌ এর জানালার কাছে নাম না জানা একটা পাখি এসে বসে ! সে অনেক খুশি হয় । মৌ মন খুলে পাখির সাথে অনেক কথা বলে ! ভালোবেসে পাখীটার নাম দেয় ভোরাই ।সেও তাকে দেখতে আসে প্রতিদিন । স্কুলে যাবার আগে ও স্কুল থেকে এসেই মৌ খাবার নিয়ে অপেক্ষা করে প্রিয় বন্ধুটির জন্য ! ভোরাই মৌকে একটুও ভয় পায়না ! সে মৌ এর বিছানায় বসে ,আর মৌ হাত বুলিয়ে আদর করে দেয় ভোরাই এর গায়ে আর লেজটাতে ! কিছুটা ভাললাগে মৌ এর । কিছুদিন ধরে অকারণেই তার দমবন্ধ হয়ে মরে যাবার একটা তীব্র জ্বালা ছিল মনে,এখন তা কিছুটা উপশম হয়েছে ! নিভে আসছে তার চারপাশের আলো বুঝতে পেরেই মৌ বাবা মা যাতে বুঝতে পারে সে ক্লাসের পড়াশুনা করছে , তাই মনের সব না বলা কথাগুলো ছোট্ট ছোট্ট  স্টাইলো অক্ষরে জায়গা দেয় একটা খাতায় । এমনকি বাবা মায়ের অতিরঞ্জিত , অহেতুক শাসন , সামর্থ্য না থাকা স্বত্বেও কষ্ট করে অভিজাত স্কুলে ভর্তি করা , মৌ এর প্রতি বিশ্বাস নেই বলে সব সময় হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত থাকা , আরো অনেক বিষয় যা অন্য সবার ভাবনাকেও হার মানায় ! সব কথা অতি যত্নসহকারে সুন্দর করে লিখে রেখেছে ! এভাবেই তার শৈশব , কৈশোর সবকিছু শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য নিহিত থাকবে , এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না ! কিন্তু ভোরাইকে পেয়ে মৌ মনের অনুভূতি গুলো লিখতে ভুলে গেছে । সে এখন যেন এক বাধাহীন খুশীর ঝর্ণাধারা !

- “জানিস ভোরাই ! আমার না এত পড়তে ভাল লাগে না ! আমার সবার মত বেড়াতে ইচ্ছে করে , বাবা মায়ের হাত ধরে ফ্যান্টাসিয়াস-এর সব স্বাদ নিতে ইচ্ছে করে ! স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে ,আমিও তো বন্ধুদের মত বড় হয়েছি ! বাবা বলে আমাকে ডাক্তার হতে হবে । আর মা বলে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। কিন্তু জানিস -আমার না খুব শখ আমি একজন আর্টিস্ট হব ! সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকবো আর সারা দেশ ঘুরে ঘুরে অনেক অনেক ছবি তুলব ! প্রকৃতির লীলাভূমির সৌন্দর্য আমার হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখে ক্যানভাসে রং তুলির সজ্জায় জীবন দেব । নীলের মাঝে সাতরঙা ঘুড়ির ঢেউ খেলানো পালে সোনালী রোদের আলো ,আর ফুলের হাসিতে পৃথিবী সাজাবো ! কিন্তু কি করে তাই ভাবি! আমার জীবনে আলো যে খুবই অল্প !”কথাগুলো বলে হাঁপিয়ে যায় সে । আজ যেন বাঁধনহারার দিন ।অদম্য উৎফুল্লতার জোয়ারে মেঘের ভেলায় নেচে যায় মৌ! একটু দম নিয়ে আবার শুরু করে
-“সবাই যখন ইতিহাস ভুলে যাবার আদিমতায় মেতে উঠবে , আমার আঁকা ছবি তখন কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে ! এই দেখ আমি তোর ছবি এঁকেছি !” একটা কাগজ দেখিয়ে বলে “এই দেখ এইটা আমি আর আমার হাতের উপর এই দেখ দেখ , এইটা তুই বসে আছিস ! আমার যে তোর মত করে উড়তে ইচ্ছে করে !” মন এবার খারাপ হয়ে যায় ! মৌ এর কথার শব্দে ঘরে ঢোকে বাবা ! চিৎকার করে মাকে ডাকে
-“ঝুমা ! ঝুমা !” মা ঘরে ঢুকতেই বাবা রেগে বলে
-“এই পাখীটা কোথা থেকে এলো ! এই জন্য মেয়ে রেজাল্ট খারাপ করছে ! সারাদিন বাসায় থেকে কি কর ? একটা মেয়ে তার দিকেও খেয়াল দিতে পারো না ! সে পড়াশুনা বাদ দিয়ে কোথাকার একটা পাখীর সাথে বকবক করেই যাচ্ছে !" বাবাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই ভোরাই উড়ে চলে যায় । সেই সময়ই বাবা জানালাটা পর্দা দিয়ে ঢেকে দেয় , যেন পাখীটা আর না আসতে পারে । মৌ এর এখন আর কিছুই ভাল লাগে না । স্কুলে যেতে মন চায় না । ভোরাই এর জন্য আকুলতায় দিনগুলো হয় দীর্ঘায়িত ! নাওয়া-খাওয়া একরকম ছেড়েই দিয়েছে মৌ। উদাসী হাওয়ায় অনিচ্ছাকৃত ভাবেই সে তার ভারী মনটাকে বয়ে নিয়ে চলে !

কি ঝড় , অথবা বৃষ্টি , মৌ যেদিন থেকে স্কুলে যায় সেদিন থেকে আজ অব্দি একটা দিনও স্কুলে অনুপস্থিত থাকেনি ! স্কুলে ১০০% উপস্থিত থাকার সেরা সার্টিফিকেটটিও মৌ ই সব সময় পেয়ে এসেছে ! ভোরাই চলে যাওয়ার পরের সপ্তাহে একদিন সকালে মৌ এর খুব জ্বর এবং প্রচন্ড মাথায় ব্যথা ,তাই শুয়ে আছে । মা ঘরে ঢুকে তাকে শুয়ে থাকতে দেখে বলে ওঠে-
-“আরে তুই এখনো বিছানায় ! যা রেডি হয়ে স্কুলে যা”। কি এক অভিমানে কিছুই বলে না মৌ ! সে সত্যিই জ্বর নিয়ে স্কুলে যায় ।দুই ঘণ্টা যেতে না যেতেই এক  শিক্ষিকার ফোনে মৌ এর অস্বাভাবিক আচরণের ও চোখের যন্ত্রণার জন্য "চোখের আলো" নামক আই ফাউণ্ডেশনে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে,যেখানে মৌকে চোখ দেখাতে প্রায়ই যেতে হতো সেখানে বাবা-মা ছুটে যায় । রিকশায় করে যেতে যেতে ঝুমা আর সুস্নাত বুকের ধন মৌ এর জন্য অস্থির হয়ে ওঠে । দুজনেই সিদ্ধান্ত নেয় নাহ্ আর নয় ! এবার থেকে মৌ এর মতো করেই তারা মৌকে চলতে দেবে। মেয়েকে কষ্ট করে হলেও একটা ভাল স্কুলে দিয়েছে কিন্তু আর কিছুই তো করতে পারছে না মেয়েটার জন্য ! যে বেতন তা দিয়ে বাবা মাকে টাকা পাঠিয়ে, মৌ এর পড়াশোনার জন্য খরচ করে ,যা থাকে তাতে মাসের পঁচিশ দিনও সংসারের খরচ যায় না ।দুজনেরই বড় সাধ মেয়ে তাদের লেখাপড়া শিখে যেন নিজের পরিবারটাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করতে পারে ! দুজনেই মেয়ের দুশ্চিন্তায় বারবার ভগবানের কাছে দুহাত তুলে করুণা ভিক্ষা চায় , যেন মৌকে তিনি সুস্থ রাখেন । দুজনেই ফাউণ্ডেশনে পৌঁছে সোজা মৌ আছে সেই রুমে দৌড়ে যায় আর তখন দেখে মৌ ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে কি যেন বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলছে ! সুস্নাত আদর মাখা কণ্ঠে ডাকে-
-“মৌ মামণি ! মাগো...” হাতটা ধরতেই ছাড়িয়ে নেয় মৌ ! বাবা মাকে চিনতেই পারে না সে ! শুধুই ভোরাইকে খুঁজে বেড়ায় আর তার বুকের মাঝে যখের ধনের মত আঁকড়ে ধরে রাখা সেই স্টাইলাস নোটবুকটি । যার প্রতিটি পাতায় জায়গা করে নিয়েছে মৌ এর অপূর্ণ ভালোবাসা । সুপ্ত মনের চাওয়া-পাওয়া , রূপকথার কাহিনী ! সে কাল রাতেও শেষ দুটি লাইন লিখেছে-

"ভোরাই , আমিও তোর মত স্বাধীন হব
মুক্ত ডানা মেলে,বিশ্বজগত দেখে নেব !"

ডঃ ভোরা এগিয়ে আসেন,সুস্নাত আর ঝুমাকে দেখে বিষাদে দুদিকে মাথা নেড়ে বলে ওঠেন - "শি ইজ টোটালি ব্লাইণ্ড নাও".....

মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৫

সিদ্ধান্ত

সিদ্ধান্ত
-------
কাহিনীকার - স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
---------------------------------

ঐশী বড় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।
কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয় ! অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত একজন প্রফেসরের সঙ্গে ঐশীর বিয়ের কথা চলছে । আর এখানেই তার যত বিপত্তি ! যদিও সে আজও তার বাবার আদর্শে অবিচল, কিন্তু বিয়ের বেলায় বাবার মতের সাথে বনিবনা না হওয়ায় ভেতরে ভেতরে সে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে । অথচ বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দ্রোহের মানসিকতা কখনও সে পোষণ করবে না।সেও বাবার মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রী ধারী,গুণী ও ধৈর্য্যশীলা ।
....
......
ঐশীর জন্মের কয়েকদিন পরেই তার বাবা আশুতোষ বাবু শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে “রাষ্ট্রপতি পুরস্কার” পেয়েছিলেন বলে তিনি তাঁর মেয়ের নাম রেখেছিলেন ঐশী ,তাঁর স্ত্রী ঈশানী দেবীর নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। তার পরপরই আশুবাবুর কাছ থেকে তত্কালীন সরকার জনগণের জন্য আরও ভাল সেবা পাবার আশায় পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে অন্যত্র বদলী করে দিয়েছিল । সে কারণেই তাঁর সাথে শিক্ষা জগতের একটা ব্যবধান রচিত হয়ে গিয়েছিল । মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে শিক্ষা জগতের অপ্রত্যাশিত অবক্ষয়টা তিনি মোটেই আঁচ করতে পারেননি । বর্তমানে তাঁর বড় ছেলে শিবতোষের আচরণে তিনি কিছুটা হলেও বিব্রত এবং আশাহত !
....
.......
আশুবাবুর বড় দুই সন্তান, শিবতোষ এবং দেবতোষের ধারণা, তাদের বাবার সততার বিনিময়ে তাদের কাঙ্খিত প্রাপ্য থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে । বিশেষ করে, ঐশীর বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাদের মায়ের মৃত্যু তাদের মনে অনটনের স্মৃতিটা এখনও খচ্-খচ্ করে ব্যথা জাগায় । তাদের ধারণা, অনেক অর্থ যোগানোর সামর্থ্য থাকলে তাদের মায়ের মৃত্যুকে ঠেকানো যেত, যেটা ইচ্ছা করলেই বাবা পারতেন ! এই না পারার ব্যর্থতার জন্য তাদের বাবার সততাকেই তারা আজও দায়ী করে থাকে ! কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আজ অবধি ঐশী তার বাবাকে সব সময় এতটাই কাছে পেয়েছে যে, সে তার মায়ের অভাবটাকে কখনও বুঝতেই পারেনি, বরং কিছুটা বুঝতে শেখার পর থেকে তাদের জন্য তাদের বাবার ত্যাগটাকেই সে সবচেয়ে বেশী করে উপলব্ধি করেছে এবং যতই উপলব্ধি করেছে ততই বাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েছে ।
....
.......
একজন মহান শিক্ষকের সন্তান হিসেবে ঐশী তার বাবার জন্য দারুণ ভাবেই গর্বিত, কিন্তু তার বাবার মহান পেশার অবনমনকে আজ আর সে আগের মত মহৎ বলে মেনে নিতে পারছে না বলে মাঝে-মধ্যেই খুব হতাশায় ভোগে ! যদিও তার বাবার মনে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আজও সেই শ্রদ্ধাবোধ আগের মতই বিরাজমান । সে কারণেই তিনি তাঁর বড় ছেলেকে শিক্ষকতার প্রতি উৎসাহিত করেছিলেন এবং চেয়েছিলেন ছোট ছেলেও যেন এ পেশাতেই আত্মনিয়োগ করে । সেই সাথে মেয়ের বিয়েও তিনি একজন শিক্ষকের সাথে দেবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ।
.....
.......
শিবতোষ সবেমাত্র শিক্ষা জীবন শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বেড়িয়েছে । তখন তারই একজন সহপাঠী স্থানীয় রাজনীতির মাঠ কাঁপানো উঠতি নেতা ! তাদের বাড়ীর অনতিদূরেই শহরতলীতে একটা নতুন বি.এড্. কলেজ প্রতিষ্ঠার তোড়-জোড় চলছে । শিবতোষ চায়, সে সেই কলেজের সাধারণ কোন শিক্ষক হিসেবে নয়, একেবারে অধ্যক্ষ হিসেবেই যোগ দিয়ে কর্ম জীবন শুরু করতে ! তার বাবা আশুতোষবাবু খুবই একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ! আবালবৃদ্ধবণিতার সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে । আর শিবতোষ সে কারণেই তার বাবাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে নিজের অন্যায্য ইচ্ছা পূরণ করতে চায় ! আসলে দুর্বল মনের মানুষের আত্মবিশ্বাস যে কম হয়, শিবতোষই তার নিকৃষ্ট উদাহরণই বটে !
....
......
আশুবাবু বিষয়টাকে মোটেই ভাল ভাবে মেনে নিতে পারেন নি । তিনি চেয়েছিলেন, শিবতোষ আরও কিছুটা সময় নিয়ে ভাল ভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সরকারী কলেজের শিক্ষকতায় যোগদান করবে । তাতো হ’লোই না বরং তাঁর মত একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এমন একটা চাকরীর জন্য ছেলের পক্ষে সুপারিশ করতে গিয়ে খুবই ব্যথিত হলেন ! কারণ, তিনি এবং শিবতোষ দুজনেই জানতেন, উপরমহলে আজও তাঁর কথা কেউই ফেলতে পারবে না। তিনি জানতেন যে, তাঁর দুই পুত্রই তাদের মায়ের মৃত্যুর জন্য তাঁর আর্থিক সংকটকেই দায়ী করে । তাই তাঁর প্রতি তাদের অভিমান ও মনের ক্ষোভটাকে প্রশমিত করতেই তিনি এমন একটা অন্যায্য পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন !
....
......
ঐশী যতটাই গর্বিত তার বাবার জন্য, ঠিক ততটাই লজ্জিত তার বড় দুই ভাইয়ের জন্যও ! তার বড় ভাই শিবতোষের আয়ের চাইতে ব্যয়ের পাল্লাটা অনেক বেশী ভারী হওয়াটা মোটেই প্রত্যাশিত না । বিশেষ করে অধ্যক্ষ নামের সাথে কবি-সাহিত্যিক বিশেষণ টা যুক্ত করতে সে যে ভাবে অর্থের অপচয় করে, সেটা মোটেও দৃষ্টিনন্দন নয় ! ঐশী তার বড় ভাইয়ের পত্র-পত্রিকায় ছাপানো গল্প-কবিতাগুলো মাঝেমাঝে পড়ে । এইধরনের লেখা তার একেবারেই না-পসন্দ। তদুপরি শিবতোষ তার অপছন্দের একজন লেখককে হেয় করার জন্য, তার চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে, সেই লেখকের নামকে চরিত্র হিসাবে তৈরী করে এমন একটা গল্প লিখে পত্রিকায় প্রকাশ করলো, যাকে রীতিমত একটা পর্ণোগ্রাফী বলাই যুক্তিযুক্ত!
....
......
আর ছোট ভাই দেবতোষ ! সে তো আরও একধাপ এগিয়ে ! সে এখন মাঠের রাজনীতিতে নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টায় যেমন উৎসাহী তেমনি মনোযোগী ! সে মনে মনে প্রতিজ্ঞাই করেছে যে, সে এতদিন চৌত্রিশ বছর বিজয়ী অধুনা পরাজিতদের সাথে থেকে যেই আখের গোছাতে পারেনি, বর্তমান বিজয়ীদের সাথে থেকে সবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলবে ! নেতৃত্ব পাওয়ার ব্যাপারে সে তার বাবার নামকে ব্যবহার করে প্রতিপত্তি অর্জনের দৌড়ে সামিল হয়েছে বর্তমান ভোটে ! যা দেখে তাদের বাবা এখন শুধু বেদনাক্রান্তই নয়, ধরণীর প্রতি বীতশ্রদ্ধও হয়ে উঠেছেন ! সে কারণেই তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আদরের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে জাগতিক সংসার থেকে পালিয়ে বাঁচতে চান !
.....
.......
বরপক্ষ অনেকটা সময় ধরে ঐশীকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান ।বর বা কনের কারোরই ছবি না থাকার দরুণ আজ এই সামনাসামনি দেখাবার আয়োজন করা হয়েছে উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে।ঐশীর মনে এখনও সংশয় ! পাত্র ড: রমণীমোহন সেন তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের শিক্ষক ডঃ সেন নয় তো ! তখনই শুনেছিল, তিনি নাকি পি.এইচ্.ডি. করার জন্য দেশের বাইরে যাবেন । তিনিই ফিরে এসে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন নি তো ! নিজেকেই সে প্রশ্ন করে আবার স্বাভাবিক হবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । আবার ভাবছে, যদি তিনিই হয়ে থাকেন তাহলে কিভাবে বাবাকে বোঝাবে, ভেবে পাচ্ছে না । এমনই এলোমেলো ভাবনার মাঝে পাত্রপক্ষের সামনে এসে পাত্রের দিকে তাকাতেই ঐশীর সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেল ! মাথাটা একটা চক্কর দিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবার উপক্রম ! কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে সোফায় বসবার অনুমতি নিয়ে আর করুণাময়ের কৃপায় যে কোন ভাবেই হোক, এ যাত্রায় বেঁচে যাবার জন্য তাঁরই কাছে সাহায্য কামনা করতে করতে প্রায় টলতে টলতে সোফায় বসে পড়ল ।
- কি মামণি তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? পাত্রের বাবার উত্সুক জিজ্ঞাস্য।
- হুঁ - মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয় ঐশী।
- আচ্ছা, তুমি তাহলে ভেতরে গিয়ে রেস্ট নাও কেমন !
- আচ্ছা - বলে প্রতিনমস্কার জানিয়ে ভেতরে চলে আসে সে।
- আচ্ছা আশুবাবু........কথাবার্তা চলতেই থাকে....
....
.......
শোবার ঘরে এসে বসামাত্রই তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল তারই শিক্ষক রমণীমোহন সেনের সেই বিব্রত চেহারাটা । ঐশী তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের শেষ বর্ষের ছাত্রী আর সদ্য আগত রমণীমোহন সেন তাদেরই দারুণ হ্যান্ডসাম শিক্ষক । চূড়ান্ত পরীক্ষার আর বেশী বাকী নেই । ঐশীকে একদিন ক্লাসশেষে রমণীমোহন ডেকে বললেন,
- তোমাকে নিয়ে আমরা সবাই খুব আশাবাদী । তুমি এক সময় আমার বাড়িতে এসো, তোমাকে কিছু টিপস্ দেয়া উচিত্ বলে মনে করছি । - বলে তাঁর বাড়ির ঠিকানা লেখা কার্ডখানা এগিয়ে দেন।
অবশ্য ঐশী আসলে সবার মনেই আশা-জাগানিয়া ধরণেরই ছাত্রীও বটে । কথা মত ঐশী একদিন যাদবপুরে রমণীমোহন সেনের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই বাসীফুলের মত কুঁকড়ে যাওয়া তারই সহপাঠী সমাজতত্ত্বের আরেকজন ছাত্রী অনুশ্রীকে অবিন্যস্তভাবে রমণীমোহনের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে যেতে দেখে তার ভ্রু'টা কিছুটা কুঁচকে গিয়েছিল । কিন্তু কী মনে করে শেষ পর্যন্ত সে তার শিক্ষকের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেল ।
....
.......
কলিংবেল বাজাতে গিয়ে লোডশেডিং থাকায় নক করতে যেতেই ভেজিয়ে রাখা দরজাটা ঠেলা লেগে খুলে যেতেই রমণীমোহন সেন সামনে ঐশীকে দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়ে কি করবে ভেবে না পেয়ে শুধু তাকে বসতে বলে ত্রস্ত পায়ে ওয়াশ রুমের আড়ালে গিয়ে নিজেকে আড়াল করবার ব্যর্থ চেষ্টা করল মাত্র ।বসতে বসতে ঐশী বিছানায় এমন কিছু দেখে ফেলে, যা দেখার পর ঐশীর পক্ষে সেখানে আর এক মুহুর্তও অপেক্ষা করা সমীচীন ছিল না । ক্ষোভে-দুঃখে-ঘৃণায় তড়িত্গতিতে  রমণীমোহনের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে সে রাস্তায় নেমে এলো !
.....
........
এই সেই রমণীমোহন সেন যিনি ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করে আজ তারই সাথে বিয়ের গাঁটছড়া বাঁধতে এসেছেন ! একেই বলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ! মানুষ কতটা বে-শরম আর নির্লজ্জ হলে এমনি করে তার কদর্য চেহারাটা মানুষের সমাজে তুলে ধরতে পারে ! ঐশীর বাবাও শিক্ষক ছিলেন, যিনি তাঁর ছাত্র-ছাত্রীকে সন্তান ভেবেই তাদের সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন । আর এই রমণীমোহন সেনও শিক্ষক, যিনি স্বয়ং বিষবৃক্ষে পরিণত হয়ে সমাজকে সমাজতত্ত্বের পাঠ না দিয়ে ধ্বংসতত্ত্বের পাঠ দেওয়ার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন !
ঐশীর মনে আর কোন দ্বন্দ্ব নেই।মনে মনে তৈরী হয়ে সে তার আসল সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে....
ঐ তো তার বাবা আশুতোষবাবু পাত্রপক্ষকে বিদায় জানিয়ে এদিকেই আসছেন।
- কি রে ঐশী মা? শরীরটা এখন ভালো লাগছে তো মা? কেমন লাগলো পাত্রকে দেখে?
- বাবা ! তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে.....