বুধবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৬

আমার বিজয়া হলো সারা


আমার বিজয়া হলো সারা
------------------------------------------


স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-------------------------------------------


শরতের সকাল। 
সৌম্য শান্ত পরিবেশ। কুয়াশা ঘেরা উদিত সূর্যের নিশ্চল নীরবতা। কোন কোলাহল নেই। সকাল আটটা বাজে। অসীমের এখনও ঘুম ভাঙেনি। সোমা উঠে গেছে সেই সকালে। অসীম টের পায়নি। ক’টা দিন ছুটিতে ছিল। অনেকগুলো ফাইল জমা হয়ে আছে। অনেক সময় বাড়িতেও কাজ করতে হয়।
সামনে আবার দুর্গাপূজা। কেমন একটা উৎসব উৎসব আমেজ। বাকী কাজগুলো শেষ করতে হবে পূজার আগে।
সোমা বারণ করেছিল। এত রাত জেগে কাজ করার দরকার কি। কাল করলে হয়।
তা কি করে সম্ভব ? ক’ দিন পরই তো পূজার ছুটি।
সোমা আর দ্বিরুক্তি করেনি। পাশ বালিশটা বুকে নিয়ে শুয়ে পড়েছে। ইচ্ছে করে লাইটটা নিভিয়ে দিয়েছে সোমা। অসীম মৃদু হেসে রিডিং লাইট জ্বালিয়ে কাজে মনোযোগ দেয়।
সোমা ঘুমিয়ে পড়ে। অসীম কাজ শেষে বিছানায় যায়। সোমাকে বিরক্ত করেনি। শুধু কপালে আলতো করে একটা চুমু দেয়।
সকালে বিছানা ছাড়তে মন চাইছে না। তন্দ্রার ভাবটা রয়ে গেছে। মনে হচ্ছে ভোর হয়নি। বিছানায় একটা আঁশটে গন্ধ। প্রচুর ঘেমেছে দুজনেই। রাতে কখন যে বিদ্যুৎ চলে গেছে খেয়াল করেনি। ভ্যাপসা গরম। সোমা জেগে জেগে শাড়ীর আঁচলে শরীরের ঘাম মুছেছে। অসীমের কপালে জমে উঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম সযত্নে মুছে দিয়েছে। অসীম টের পায়নি।
নীচের তলার ভাড়ার ফ্ল্যাট বাড়ি। জানালার খুব কাছাকাছি সীমানাটা দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। জানালা খোলা থাকলেও বাইরের বাতাস খুব একটা প্রবেশ করতে পারেনা। অসীমের তন্দ্রাচ্ছন্ন জেগে থাকাটা পাশাপাশি কারও সান্নিধ্য পেতে চায়। অলস দেহটা বার কয়েক গড়াগড়ি খায়। পাশ বালিশটা বুকের মধ্যে চাপা পড়ে। মনে হয়েছিল সোমা। পরক্ষণে পঞ্চ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়। এ-তো সোমা নয়। ধেৎ শালা।
বার কয়েক ডাকল। সোমার তখন স্নান সারা হয়ে গেছে। তা না হলে জল পাওয়া যাবে না। সকাল দশটা পর্যন্ত মিউনিসিপ্যালিটির জল। তারপর বন্ধ। ছাড়বে আবার সেই বিকাল চারটা। বাড়িওয়ালাকে পাম্প বসাতে বলেও কোন ফল হয়নি। বেশী বলতে গেলে সোজা জবাব- না পোষালে বাড়ি ছেড়ে দিন। আপনারা পুরানো ভাড়াটিয়া। তাই এত কম ভাড়ায় থাকতে পারছেন।
অসীম বাড়ি ছাড়তে পারছে না একটা মাত্র কারণে। বর্তমানে বাড়ির যা বাজার, ভালো ঘরে থাকতে গেলে আর কিছু খেতে হবেনা। যা বেতন তাই লেগে যাবে।
সোমার চুলগুলো এখনো ভেজা। এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ। দু-হাতে গামছাটা টেনে ধরে কয়েকটা টান দিতেই কেমন ঢেউ খেলে যায়। সকালের চেহারাটা কমনীয়তায় ছেয়ে আছে। খুব সুন্দর লাগছে অসীমের।
সোমা ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করে- এতো চেঁচাচ্ছো কেন? সকাল আটটা বাজে। সে খেয়াল আছে। বাজারে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি ওঠো।
তোমাকে কতবার বলেছি উঠে যাবার সময় আমাকে জাগিয়ে দেবে। তা না আর এখন এসেছে হুকুম করতে, বাজারে যাও, স্নান কর।
- বাজারে যাবে না।
- না, শোন।
- কি?
- আহা! কাছে আসবে তো।
- আমার কাজ আছে। আগে বিছানা ছেড়ে ওঠো, তারপরে কথা।
সোমা বুঝতে পারে। এ অসীমের নিছক দুষ্টুমি। বদ খেয়াল জেগেছে। পাগল, এখন পালিয়ে বাঁচলেই হয়। সোমা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে সকালের হালকা প্রসাধন সেরে নেয়। মাথা আঁচড়ায়। সিঁথিতে সিঁদুর দেয়। লাল টকটকে সিঁদুর। বেশ লাগছে।
অসীম আবার কাছে ডাকে।
সোমা বিরক্ত হয়।
কাছে আসতে হবেনা। প্লিজ তাড়াতাড়ি ওঠো। ঘরে রান্নার কিছুই নেই।
- তবে কোনটাই হবেনা। না অফিস না রান্না।
পুরুষ মানুষ এমনই বে-শরম। যখন তখন গোঁ ধরে বসে। বিয়ে হয়েছে দশবছর হলো। কোন সন্তানাদি হয় নি এখনও।এখনও ছেলে মানুষের মত স্বভাব বদলায়নি। মাঝে মাঝে গভীর রাতেও লুডো নিয়ে বসতে হয় সোমাকে। প্রথম প্রথম খুব বিরক্ত হতো। এখন আর হয় না। নতুবা মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে বলবে- সোমা তুমি রবি ঠাকুরের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতাটা একটু শোনাও না প্লিজ। তোমার কণ্ঠে বেশ লাগে শুনতে।
আজি এ প্রভাতে রবির কর---- কেমনে পশিল প্রাণের পর---কেমনে পশিল------
অসীমের স্বভাবটা এরকমই। ছেলে মানুষের মত। যখন যা মনে আসবে তখন তাই করবে। সোমার সারা হৃদয় জুড়ে এই সহজ সরল মানুষটার একচ্ছত্র আধিপত্য। সোমা সুখী।
সোমা কাছে আসে। অসীম ভেজা চুলের গন্ধ নেয়। ইন্দ্রিয়গুলো কেমন যেন সজাগ হয়।
- তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। একটু সময় দেবে।
- ও এই কথা।
সোমাও চাল জানে। একেবারে পাকা দাবাড়ু–র মতো। ভাবছে কোন ধরনের জেদ চলবে না। তবে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। এ মুহূর্তে অত্যন্ত সুকৌশলে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। বলল-
- প্লিজ, লক্ষ্মীটি। তোমার অফিসের অনেক কাজ। কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। আমি তোমার মনের মতো করে সাজবো। তখন তোমার সব কথা শুনবো।
হার মানলো অসীম। তবে একেবারে ছাড় দেয়নি। গভীর আলিঙ্গনে চুমু খেয়েছে। আর বলেছে লাল ফিতা দিয়ে কলাবেণী বাঁধবে কিন্তু।
অসীম বিছানায় উঠে বসে জিজ্ঞাসা করে, বাজারটা বিকালে করলে হয়না। হাতে সময়ও নেই। একটা ওমলেট হলেই আমার চলবে।
- আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নাও। আমি রান্না ঘরে গেলাম।
আজ ছ’বছর ধরে সোমা আগলে রেখেছে অসীমকে। প্রেরণা যুগিয়েছে সবকিছুতে। যার ফলে অসীম উঠে আসতে পেরেছে একটা মধ্যবিত্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবন ধারায়। 
বিয়ের আগের জীবনটা ছিল অন্যরকম। পালহীন নৌকার মতো। জীবনের নানা অলিতে গলিতে বিচিত্র রহস্য। সেই রহস্যের জোয়ারে ভাসতে ভাসতেই একদিন সোমার সাথে পরিচয়। তারপর কিছুদিন ভালোলাগা। খুব বেশী সময় নেয়নি। কিছুদিনের মধ্যে পারিবারিক সম্মতিতে উভয়ের পরিণয়। আজ দু’জনেই পাল তোলা নৌকার দক্ষ মাঝি। সংসারে ছোট খাট অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। উভয়ে সহজে মেনে নেয়। ফলে সংসারে বড় ধরনের কোন বৈষম্য নেই। দু’জনেই সুখী। 
হাজিরা বইতে হাত দিয়ে ঘড়ি দেখল অসীম। পাঁচ মিনিট দেরী। ফাইলগুলো টেবিলে রেখে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
টেবিল চেয়ারে হালকা ধুলো জমে আছে। পিয়নের উপর রাগ হয়। কলিং বেল টেপে।
আজকাল সবাই ফাঁকিবাজ। কেউ কাজ করতে চায় না। সরকারী অফিসের চাকরী। মাস শেষে বেতন তো আসবে। নানা অনিয়মেও বেশ বহাল তবিয়তে টিঁকে থাকে। পিয়নদেরও কদর কম নয়। পাবলিক রিলেশন থাকলে তো কথাই নেই। আগে পিয়নকে বশ করে উঠে আসতে হয় উপরে। তবেই কার্যসিদ্ধি।
অসীম দু’বার বেল টিপল। তাতেও পিয়নের সাড়া নেই। তৃতীয়বার বেল টিপার পর অনন্ত ঘরে ঢোকে। দাঁড়িয়ে থাকে আদেশের প্রতীক্ষায়। তিনবার বেল টিপতে হলো। তাতে অসীমের সমস্ত ক্ষোভ জমা হলো অনন্তর উপর।
- কোথায় থাকো সারাক্ষণ। বার বার খোঁজ করেও হদিশ পাওয়া যায়না। টেবিলের ধুলো ময়লাগুলো কি চোখে পড়েনা। এটা তোমার কাজ। প্রথমে এসে সবার অফিস ঘর, টেবিল চেয়ার সব গুছিয়ে রাখা, পরিষ্কার করা। যত্ত সব।
- অনন্ত কিছুই বললো না। টেবিলের নীচের ড্রয়ার থেকে গামছা বের করে টেবিল পরিষ্কার করে দিল।
- আর শোন। কাল থেকে যেন এর ব্যতিক্রম না হয়।
- স্যার ব্যতিক্রম হবেনা। আমি বড় সাহেবের রুমে ছিলাম। তাই দেরী হয়ে গেল। অনন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল
- আচ্ছা যাও। আর এক কাপ চা দিয়ে যেও।
অনন্ত চলে গেলো। পাশে কমলেশবাবু টাইপ করছিলেন। কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে বললেন-এদেরকে চোখ না রাঙালে হয় না। বড় বজ্জাত। আর কথায় কথায় ইয়ার্কি করে।
অসীম কোন প্রত্যুত্তর করে না। কাজে মনোযোগ দেয়।
অনন্ত চা নিয়ে আসে। অসীম চায়ে চুমুক দেয়। সোমার কথা মনে হয়। দুপুরের রান্নার কথা মনে হয়। কিছুই তো নেই। কি খাবে সোমা। বাজার করে না আসার জন্য নিজের ভিতর একটা অপরাধবোধ কাজ করে।
বাজার আর কি করবে। জিনিষ পত্রের যা দাম। তাছাড়া সকালের বাজার। যেখানে যায় সেখানেই ভিড়। দীর্ঘ সময় নষ্ট। রজনীশের দোকানের মসলা টা ভালো। সোমা বেশ প্রশংসা করে। ওখানেও হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ। অসীমও ওর পার্মানেন্ট কাস্টমার। দীর্ঘ আধ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তারপর পাওয়া যায় সেই নির্ভেজাল গুঁড়ো মসলা। ভেজালে বাজার ছেয়ে গেছে। অথচ এই রজনীশের দোকানের মসলা টা আজও নির্ভেজাল।
চা খেয়ে অসীম বাথরুমে গিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। সোমার জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে। তা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
সোমা সব ম্যানেজ করতে পারবে। তার সে ক্যাপাসিটি আছে। প্রয়োজনে নুন-হলুদ-কালোজিরে দিয়েও খেয়ে নেবে। তবুও হাসি ম্লান হয় না। সবকিছুতে ভরসা করা যায় সোমার উপর।
বাথরুম থেকে ফিরে অসীম নীচের ড্রয়ারটা খোলে। তিনটে চিঠি জমা হয়েছে। সম্ভবতঃ কাল বিকেলে এসেছে। পিয়ন নিজেই ড্রয়ারের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে রেখেছে। লোকটার বুদ্ধি আছে বটে। দুটো চিঠি অসীমের নিজের নামে। একটা সোমার নামে। প্রেরকের ঠিকানা নেই। কিছুটা কৌতূহলও হচ্ছে। সম্ভবতঃ কোন বান্ধবী লিখেছে। কি লিখেছে? অফিসের কাজে সামান্য বিরতি নিয়ে নিজের চিঠি দুটো পড়ে নেয়।
একটা সুশীল লিখেছে বাগনান থেকে। অসীমের বাল্যবন্ধু। পূজার ছুটিতে বেড়াতে আসতে চায়। অসীমের আনন্দ হয়। অনেকদিন পর দু’বন্ধুর দেখা হবে। আড্ডা জমবে। কলেজ জীবনের সেই উচ্ছৃঙ্খল দিনগুলোর মত। সেও সংসারী হয়েছে। বউ নিয়ে আসছে। ভয়ও হচ্ছে আগেকার মত করে কি জমবে আগামীর আড্ডাটা।
দ্বিতীয় চিঠিটা এসেছে গ্রাম থেকে। অসীমের খুড়তুতো ভাই বকুল লিখেছে-
দাদা আমি ডিগ্রি পাশ করেছি। তুমি তো জানো আমাদের সংসারের অবস্থা। বর্তমানে বাবা খুব অসুস্থ। বোধ হয় বেশিদিন বাঁচবে না। বড়দা কোলকাতা নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিছুতেই যাবে না। বলে-বিমল গেছে যাক। আমি বাপ দাদার ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবো না। মরতে হয় এখানেই মরবো। তাতে আমার দুঃখ নেই। জানো দাদা, বাবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছি না এখানে। নিজেকে খুবই ছোট মনে হচ্ছে। এ মুহূর্তে একটা চাকরী আমার খুব প্রয়োজন। তোমার আশ্বাস পেলে আমি একবার কোলকাতা আসতে চাই। সম্ভব হলে পূজার ছুটিতে এসে বাবাকে দেখে যেও।
                              ---ইতি হতভাগা বকুল।
চিঠিটা বেশ ভাবিয়ে তুলেছে অসীমকে। গ্রামের বাড়ী গিয়ে কাকাকে দেখে আসা দরকার। অসীমের জীবনে কাকার ভূমিকা বাবার চেয়ে কম নয়। যখনই হোঁচট খেয়েছে তখনই সাহস যুগিয়েছে। এখন বয়স হয়েছে। হয়তো বাঁচবে না বেশীদিন। মৃত্যুর এই আসন্ন মুহূর্তটা খুবই কষ্টের।
সোমার চিঠিটা উল্টে পাল্টে দেখে অসীম। বেনামী চিঠি। সীলটাও ঝাপসা। বোঝা যাচ্ছেনা কোত্থেকে এসেছে। ছিঁড়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। বিবেকে বাধে। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। সোমার প্রতি প্রাণান্ত ভালোবাসা। তাই সন্দেহের উদ্রেক হয়। সব সন্দেহগুলো যেন এই চিঠির মধ্যে। না না। কি সব আবোল তাবোল ভাবছে। হয়তো কোন আত্মীয় কিংবা বান্ধবীর চিঠি। যতই ভাবছে ততই মনের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তা তাড়া করে বেড়াচ্ছে। অথচ পড়তেও পারছে না। যতক্ষণ সোমা চিঠিটা না পড়তে দেয়। অন্তত বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
অসীম চিঠিগুলো ড্রয়ারে রাখে। ফ্যানের গতিটা বাড়িয়ে দেয়। কাজে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করে। মন বসছে না। মনের উপর জোর চলে না। তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। গভীর ভালোবাসা মানুষকে এভাবে সন্দেহ প্রবণ করে তোলে। যা থেকে একটা মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অবশেষে বড় ধরনের কৈফিয়ত। জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
অফিস শেষ। তাড়াতাড়ি ফাইলপত্র গুছিয়ে নেয় অসীম। এলাকার বাসে উঠে পড়ে। খুবই ধীরে চলছে গাড়ীটা। প্রতিটা মুহূর্ত যেন এক একটা কাল। বাসায় পৌঁছে চিঠিটা সোমার হাতে দিতে হবে। কৌতূহল নিবৃত্ত করতে হবে। নয়তো অজানা সন্দেহে সোমার প্রতি মনটা ক্রমশঃ বিষিয়ে উঠছে। অসীমের মন সোমাকে প্রতারক ভাবছে। আর সহ্য হয় না। 
বাসের কন্ডাক্টরগুলোও কেমন ইতর। যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে প্যাসেঞ্জার নিচ্ছে। গাড়ীতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বাদুড়ঝোলা হয়ে আছে মানুষ। স্বল্প আয়ের লোকদের সস্তা বাহন। এছাড়া কোন উপায় নেই।
অসীমের ইচ্ছে করছে নেমে গিয়ে একটা ট্যাক্সি নেবে। তারও উপায় নেই। সোমার কড়ায় গণ্ডায় হিসাব। প্রতিদিন পঞ্চাশ টাকা। আপ ডাউন বাস ভাড়া কুড়ি টাকা। বাকীটা হাত খরচ। তাতে কুলোয় না। তবুও উপায় নেই। কোন রকমে ম্যানেজ করতে হয়। আজ দুপুরে খাওয়া হয়নি। হালকা টিফিন আর সিগারেট খেয়েছে। বাকী যা আছে তাতে ট্যাক্সির আশা করা যায়না। সুতরাং ড্রাইভারের মর্জির উপর নির্ভর করতে হবে।
সুন্দর করে সেজেছে সোমা। এই সাজটা শুধুমাত্র অসীমের জন্য। নিতান্ত ব্যক্তিগত এবং ইন্টার্নাল। বৈচিত্র্যময় শহরে এই সাজ মানায় না। একবারে গ্রামীণ পল্লীবধূর সাজ। এক কুচি করে বাঁদনি প্রিন্টের শাড়ী পরেছে। মাথায় লাল ফিতার কলাবেণী। কপালে লাল টিপ। সিঁদুরের বদলে লাল টিপটা খুব মানিয়েছে। এটা অসীমের খুবই পছন্দ। চঞ্চল চপল কিশোরী পল্লী বালিকার মত। সারাক্ষণ আদর করতে ইচ্ছে করে। নিষ্পাপ চেহারায় ফুটে উঠে আজন্ম ভালোবাসা। সবকিছু দিয়েও যেন কিছুই দেওয়া হয়নি। একটা অপূর্ণতা থেকে যায়।
অসীম ঘরে ঢোকে। সোমাকে দেখে সমস্ত অস্থিরতা উবে যায়। অসীমের মত করে সবকিছু সাজিয়ে রেখেছে সোমা। সোমা নিষ্পাপ। মিছে সন্দেহ হচ্ছিল। এবার অসীম নিজের কাছে লজ্জিত হল। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। সোমার চিবুক স্পর্শ করে বলল-বেশ মানিয়েছে তো। সত্যিই অপূর্ব।
- সত্যি?
- একশোবার সত্যি। ও হ্যাঁ, তোমার একটা চিঠি এসেছে।
- কে দিলো আবার?
- জানিনা, বেনামী চিঠি বুঝলে। নাম ধাম নেই। আমি তো ভয়ে অস্থির। না জানি কে আবার ভাগ বসাতে চাইছে।
- তুমি মিছে ভাবছো। এ বুড়ীকে নিয়ে কে আবার ভাগ বসাবে। তাছাড়া আমার সবকিছু তো একজনকে দেওয়া হয়ে গেছে।
- আর সেই একজনটা বুঝি আমি?
- কেন, কোন সন্দেহ আছে?
- শোন সোমা তোমার মত বউ যার ঘরে আছে সে কোনদিন সন্দেহমুক্ত থাকতে পারে না। ঠিক বলিনি?
- হয়েছে, হয়েছে। আর ফাজলামি করতে হবে না। হাত মুখ ধুয়ে এসো আমি চা দিচ্ছি।
- চিঠি পড়বে না?
- পরে পড়বো। আগে খেয়ে নাও। চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে দুপুরে খাওয়া হয়নি।
সোমা চিঠিটা ব্লাউজের ভিতর রেখে দেয়। অসমান বুকে ব্লাউজের চাপে পরে খানিকটা কুঁচকে গেছে চিঠিটা। অফিস থেকে ফিরে অসীমের এক কাপ চা হলেই যথেষ্ট। কদাচিৎ একটু মুড়ি অথবা একটা বিস্কুট। এ জন্য সোমার তিরস্কারও কম নয়। অসীম ঠাট্টা করে বলে- বেশী খেলে পিলে হয়। আজ শুধু চা হবে। সোমা গরম জল বসিয়ে চিঠিটা খোলে। খুব ছোট করে লেখা।
সোমা, 
সেদিনের বিজয়া যেভাবে শুরু হয়েছিল, আমি আজও সেই অনুভূতি নিয়ে বেঁচে আছি। আজীবন থাকবো। কেননা প্রতিবারই বিজয়া আসে। আমার অতীতটা মনে করিয়ে দেয়। সেদিনের সেই বিজয়ার তিথিটা কেন আমাকে এভাবে নাড়া দেয় জানিনা। সেদিন বিজয়া না হয়ে অন্য কোন দিন হলে বোধহয় ভালোই হতো। এভাবে হয়তো মনে পড়তো না। স্মৃতির আড়ালে তোমার মত আমিও হারাতে পারতাম। বিজয়া তো হারাবার নয়। বারে বারে ফিরে আসে। আমাকে কষ্ট দেয়। আসন্ন বিজয়া শুভ হোক।-            
                                                         --সৌম্য। 
সোমার কাছে সৌরভের নাম সৌম্য। সোমাই এই নাম দিয়েছিল।
চিঠির লাইন যতই ফুরিয়ে আসছে সোমার দৃষ্টি ততই ঝাপসা হয়ে আসছে। সৌম্য। সে তো অনেক পুরোনো স্মৃতি। বিয়ের পর মাঝে মধ্যে মনে হয়েছে সৌম্যর কথা। খুব একাকী কোন নিঃসঙ্গ মুহূর্তে।
যখন অতীতকে নিয়ে ভেবেছে তখন শুধু ক্ষণিকের জন্য সৌম্যর কথা মনে হয়েছে। কিংবা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে গুন গুন করে গান করতো তখন অবলীলায় এসে ধরা দিত সৌম্য। সে অনেক দিনের কথা। ইদানীং সাংসারিক ব্যস্ততা সবকিছু ভুলিয়ে দিয়েছে। শুধু প্রতি বিজয়ার আগে মোবাইলে এসএমএস আসতো-"ভালো থেকো"। ঘুরিয়ে ফোন করলে ইন্টার অ্যাক্টিভ ভয়েসে ভেসে আসতো,"দিস নাম্বার ইস ডাজ নট এগ্জিস্ট"।
গতবারের চিঠিটাও অসীম সোমার হাতে দিয়েছিল। তবে কার চিঠি, কে দিলো এসব কিছুই জিজ্ঞাসা করেনি। সেটা সোমার নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। 
এখন যদি অসীম কিছু জানতে চায় সোমা কি জবাব দেবে। সোমার অজান্তে চিঠিটা খসে পরে। ওভেনের উপর গরম জলগুলো ফুটছে টগবগ করে। চা পাতা দেওয়া হয়নি। খেয়াল ছিল না। সোমা চিঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দেয়। আঁচলে চোখ মোছে। চা তৈরি করে অসীমের জন্য।
চায়ে চুমুক দিয়ে অসীম জিজ্ঞাসা করে- কার চিঠি বললে না তো।
- আমার বান্ধবী অনিতা। বদ স্বামীর সাথে ঘর করতে পারছে না। ডিভোর্স করেছে। আবার নতুন জীবন শুরু করতে চায়। উপযুক্ত পাত্র পেলে বিয়ে করবে। ব্যর্থ ভাবে হাসতে চেষ্টা করে সোমা।
সোমার সহজ সরল ডাঁহা মিথ্যা কথাটা অসীম বিশ্বাস করে। জিজ্ঞাসা করে-
- তোমার কি মনে হয়? একজন বিবাহিতা মেয়েকে আবার কেউ বিয়ে করবে।
- না করার কি আছে। তাছাড়া অনিতা সুন্দরী, বাবার ধনসম্পদও আছে।
- তবে হয়তো সম্ভব। আজকাল সুন্দরের চেয়ে অর্থের প্রয়োজনটা বেশী। প্রথমটা বোনাস পয়েন্ট। আচ্ছা আমি যদি এরকম বদ হই তাহলে তুমি কি করতে?
- আমিও তাই করতাম।
- সত্যি?
- সত্যি নয়তো মিথ্যে। তুমি তো বদের গুরু। সারাক্ষণ জ্বালিয়ে ছাড়ো।
- তোমার ভালো লাগে না।
সোমা উঠে গিয়ে বাজারের থলেটা অসীমের হাতে দিয়ে বলে, খুব লাগে। প্লিজ এবার বাজারে যাও। নয়তো রান্না হবেনা লক্ষ্মীটি ।
সোমা চিঠিটা আবার পড়ে। কেন জানি বার বার পড়তে ইচ্ছে করছে। অতীতকে নিয়ে জলকেলি করছে জীবনটা। ঠোঁট চেপে কান্না আসছে। কাঁদতে পারছেনা। সোমার সবকিছু যেন এক জায়গায় বাঁধা পড়ে আছে।
সৌরভের যাযাবর জীবন। কখন কোথায় থাকে তার ঠিক নেই। অনেক চেষ্টা করেও তার নির্দিষ্ট ঠিকানা জোগাড় করতে পারেনি সোমা। সোমা জানে সৌরভ দেশপ্রেমিক। একই পথের পথিক ছিল দুজনে।পরে সৌরভ সশস্ত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেছে। এখন পলাতক। আইনের হাতকড়া ঝুলছে মাথার উপর। কোথাও আত্মগোপন করে আছে। খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। থানায় মামলা হয়েছে। সে মার্ডার কেসের আসামী। এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছে সোমার। এ পৃথিবীতে অবিশ্বাস্য ভাবে অনেক কিছুই ঘটে যায়। ঠিক তেমনটাই মনে হচ্ছে সোমার।
সেদিন বিরোধী পক্ষের কতগুলি গুণ্ডা দখল করতে এসেছিল পার্টি অফিস।আর সেইসময় ওদেরই একজনের ছোঁড়া বোমার আঘাতে ওদের একজন মারা যায়।আর পার্টি থেকে কায়দা করে বাকিদের বাঁচিয়ে বলির পাঁঠা করা হয় সৌরভকে।এ ঘটনা সোমা জানে।
সোমার বাবা উপরমহলে হাত থাকায় সোমাকে জামিন করিয়ে নিয়ে আসেন আর খুব শিগগিরি ই বিয়ের ব্যবস্থা করেন।
ছাত্র জীবনে বেশ ভালোই ছিল সৌরভ। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা মেধাবী ছাত্রের জীবন দীর্ঘদিন কেটেছে বেকারত্ব আর হতাশায়। বোঝাস্বরূপ মনে হয়েছে অভিশপ্ত জীবনটাকে। হঠাৎ করেই জীবনের গতি পাল্টালো। কিছু একটা করা দরকার জীবনের ব্যর্থতাকে ভুলে থাকার জন্য। নেমে আসল রাজপথে। সক্রিয় সশস্ত্র রাজনীতির অংশীদারিত্ব নিয়ে।
এটাও এক ধরনের মুক্তি। সংসারের কোন বন্ধন নেই। সারাক্ষণ মিছিল মিটিং। কখনও পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, রাইফেলের গুঁতো। টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ার গোলক ধাঁধায় জীবনের গতি হারালো। এই আর কি। বামপন্থী কি ডানপন্থী। রাজনীতিতে রাজপথে যা হয়।
সৌরভ সবকিছু ভুলেছে কাজের ব্যস্ততায়। অন্য একটা জীবনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিলিয়ে দিয়েছে। অথচ অতীতের একটি বিজয়ার স্মৃতি আজও অম্লান অক্ষয়। সে দিনটা আজও ভুলতে পারেনি। পূজার সময় আসলেই অতীত স্মৃতিটা তাড়া করে বেড়ায়। 
সৌরভের মনে পড়ে প্রতি বছর নিবারণ কাকার কাছ থেকে বিজয়া দশমীর দিন শান্তিজল শেষে ঘট বেষ্টনীর সুতোগুলো চেয়ে নিত । সোমা সুতোগুলো দিয়ে সুন্দর বেণী করে হাতে পরিয়ে দিত।
আর বিড়বিড় করে বলত, "হে মা দুর্গা, আমি যেন সারাজীবন ওকে এভাবে বেঁধে রাখতে পারি।"
"ক্কি কি বললে তুমি!!"
"কই কিছু বলি নি তো!!"
"আমি সব শুনেছি"
লজ্জায় সোমা দু'হাতে মুখ ঢেকে বলতো,"শুনেছো যখন তখন আবার জিজ্ঞেস কেন?"
প্রতি বছরই শারদ শশীর নির্মল আলোয় বিজয়া আসে। সে দিনটিই যেন জীবনের একটা বড় অধ্যায়। প্রতি বছরই শান্তিজল নেয় সৌরভ। তা সে যেখানে যে অবস্থানেই থাকুক না কেন।
আজ বিজয়া দশমী।
সাদা পাজামার সাথে হালকা বাদামী রংয়ের পাঞ্জাবী পরেছে সৌরভ। পূজা মণ্ডপের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে সৌরভ। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। মনের ভিতর একটা ভয় তাড়া করছে।
দেবী দশভুজার সামনে দাড়িয়ে সৌম্যকান্ত ব্রাহ্মণ উপস্থিত ভক্তদের দর্পণ বিসর্জন দিয়ে শান্তিজল দিচ্ছেন। দেবীর সামনে নাটমন্দিরের দুপাশে সারিবদ্ধভাবে বসেছে পুরুষ এবং মহিলারা। সৌরভ পুরুষদের সারির একপাশটায় বসেছে।
পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন।
"মহিষঘ্নি মহামায়ে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনী।
আয়ুরারোগ্যং বিজয়ং দেহি দেবি নমোহস্তুতে।।
ইয়ং সাংবাৎসরিকং পূজা যৎকৃতং দেবি তে ময়া সাঙ্গং ভবতু তৎ সর্বং পরিপূর্ণং তদস্তু মে।
বৎসরান্তে পুনরাগমনায় চ।
দ্যৌঃ শান্তিঃ অন্তরীক্ষং শান্তিঃ পৃথিবীং শান্তিঃ
"
সৌরভ প্রণাম করছে। এ জীবনকে ধিক্কার দিচ্ছে সৌরভ। ফিরে আসতে চাইছে স্বাভাবিক জীবনে। এখানে সৌরভরা শুধু ব্যবহৃত হচ্ছে। তাও নাটের গুরুর কাছে। প্রার্থনা জানায় দেবীর কাছে এই ধিক্কৃত জীবন নাশ কর মা।
শান্তিজল দেওয়া শেষ।
এখানে নিবারণ কাকা নেই। গ্রামে থাকলে নিবারণ কাকাকে বলতে হয়না। কয়েক পাক সুতো সৌরভের হাতে দিয়ে বলত-
- প্রতি বছর কি করিস রে ব্যাটা?
সৌরভ ডান হাতটা দেখিয়ে বলত-
- এই যে কাকা, হাতে পড়ি।
- তোর এত বিশ্বাস?
- শুধু বিশ্বাস নয় কাকা, এটা আমার ভালোবাসাও।
নিবারণ কাকা হাসত।
এখানে সৌরভের একজন বন্ধু ছাড়া আর সকলেই অপরিচিত। পরিচিত কাউকে খোঁজার সময় কিংবা ইচ্ছাও নেই। একজন স্বেচ্ছাসেবক মায়ের পুজোর জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে দিচ্ছে। এখনি হয়তো বরণ শুরু হবে।
সৌরভ ধীর পায়ে মায়ের বেদীর দিকে এগিয়ে গেল। ব্রাহ্মণের কাছে গিয়ে সৌরভ খুব আগ্রহ নিয়ে বলল-
- কাকা, আমাকে একটু ঘট বেষ্টনী সুতো দেবেন?
- কি করবে বাপু, বিস্ময়ের সাথে বললেন ব্রাহ্মণ।
- আমার লাগবে, দয়া করে দেবেন একটু সুতো।
- ঠিক আছে, এই নাও বলে ব্রাহ্মণ পুজোর পুষ্পপাত্র থেকে ঘট বেষ্টনী সুতোর কয়েকটা প্যাঁচ খুলে সৌরভের হাতে দিল।
সৌরভ সুতোগুলো হাতে নিয়ে মাকে হাতজোড় করে প্রণাম করল। বেড়িয়ে আসছে মণ্ডপ থেকে। সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে অনেকে কোলাকুলি করছে। ছোটরা প্রণাম করছে বড়দের। একটা ছোট ছেলে সৌরভকে এসে প্রণাম করল। সৌরভ ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। চোখে জল এলো সৌরভের। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। 
হঠাৎ একটা হৈ চৈ শুরু হল। সবাই পিছনে ফিরে তাকায়।
সাদা পোশাকধারী কয়েকজন পুলিশ। সৌরভকে ঘিরে ধরেছে। একজন পুলিশের হাতে হাতকড়া দুটো চকচক করছে। সবে শরতের মিষ্টি রোদ এসে প্রবেশ করেছে সারা মণ্ডপ জুড়ে।
সামনের সারিতে শান্তিজল নিচ্ছিল সোমা। সাথে অসীমও এসেছে। প্রণাম করে পেছনে তাকায় সোমা। জটলার মাঝখানে চোখ পড়ে। পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছে সৌরভ। তার চোখ দুটো স্থির। অপলক তাকিয়ে আছে দেবী প্রতিমার দিকে। আর কিছুক্ষণ পরেই তো দেবীর বরণ-বিসর্জন।
সোমা চিনতে পারে। প্রথমে বিস্মিত হয়। এখানে সৌম্য। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই সেদিনও যার হাতের লেখা চিঠি বার বার পড়তে ইচ্ছা করছিল। সেদিনের সেই বিজয়া দশমীর স্মৃতিটা স্পষ্ট মনে পড়ছে। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অতীতটাকে আজ সম্পূর্ণ নতুনভাবে অনুভব করতে পারছে।
সোমা ভীত হরিণীর মত ছটফট করছে। কাউকে কিছু বলতে পারছেনা। ইচ্ছে হচ্ছে এই মুহূর্তে সমস্ত পৃথিবীটাকে তছনছ করে দিতে। পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলতে ইচ্ছে করছে প্লিজ ওকে ছেড়ে দিন। ও নির্দোষ। আমি সোমা মুখার্জী ওর সহকর্মী,সাক্ষী দেবো।পারছে না। অসীম দাঁড়িয়ে আছে পাশে। অবলীলায় অসীমের কাছাকাছি আশ্রয় নেয় সোমা।
সৌরভ নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। সোমার চোখে চোখ পড়ে। সেই শান্ত শীতল মায়াময় চাহনি। শুধু সেদিনের মত কোন উদ্বেগ নেই, নেই কোন উৎকণ্ঠা। অথচ ভয়ে জর্জরিত।
সৌরভ বিচলিত। পুলিশের ভয়ে নয়। শুধু এই শুভক্ষণে শেষবারের মত সোমার সাথে দেখা হয়ে গেল। সোমা এখন সুখী। পাশাপাশি নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে দুজন। সৌরভ চোখ ফিরিয়ে নেয়। নিশ্চল দেহটাকে জোর করে দু’পা সামনে বাড়িয়ে বলল- চলুন।
শেষবেলায় মাইকটা আবার বাজতে শুরু করেছে। জগন্ময় মিত্রের চিঠির সেই অমর গান- "তুমি আজ কত দূরে----- আবার এসেছে বিজয়ার তিথি----- সাতটি বছর পরে---।"
সোমার খুব ইচ্ছে করছিল পুলিশগুলোকে অন্ততঃ একটিবার শেষ বারের মত অনুরোধ করতে যে ও নিদোর্ষ, প্লিজ ওকে ছেড়ে দিন। সোমা জড় পদার্থের মত ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। অসীম একবার ইঙ্গিত করল। চলো যাই। সোমার খেয়াল নেই।
গানটা শেষ পর্যন্ত শোনার খুব ইচ্ছা করছিল সৌরভের। সে কোথায় যাচ্ছে সে খেয়াল নেই। নিজের মনে বিড় বিড় করে গাইল-"আমার বিজয়া হয়ে গেলো সারা--- বুক ভরা বেদনাতে---।"
ততক্ষণ পুলিশের ভ্যানটা এগিয়ে চলেছে গন্তব্যে। সোমা নিজেকে আড়াল করে শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছল। আর একটু পরে প্রতিমা বিসর্জন। সোমা ফিরেও তাকায়নি। অসীমের সাথে রিক্সায় উঠে বসেছে সোমা। সামনে এগিয়ে চলছে রিক্সা। মাইকে গানটির আওয়াজ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছিল। 
কিছুদূর যেতেই অসীম রিক্সার হুডটা তুলে দেয়।
বিসর্জন শেষে পিছু ফিরতে নেই যে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন