সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৬

ভালো-বাসা

ভালো-বাসা
------------------
স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-------------------------------

--তুমি আমাকে ভালোবাসো তো নয়নদা?
–কি যে তুই বলিস না আঁচল?তুই না মাইরি দিন কে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিস!আগের মত দেখাও করিস না আর দেখা হলেও ওই এক কথা - "ভালোবাসো তো নয়ন দা?’,ধুস্ শ্লা--!!সরি!! মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল!
–রাগ কোরো না নয়ন দা। সামনের মাসে উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা না!! আচ্ছা বাবা আচ্ছা,ভুল হয়ে গেছে।এই কান মুলছি।আসলে চারিদিকের এত কথা তোমাকে নিয়ে কানে আসে যে……যাক গে যাক!আর রাগ কোরো না,প্লীজ বললাম তো ভুল হয়ে গেছে।
–ঠিক আছে,ঠিক আছে।বল এত জরুরি তলব কিসের?একেবারে মানকেকে দিয়ে ক্লাব থেকে ডেকে পাঠালি!কেসটা কি বলতো?ওদিকে অনেক কাজ ফেলে এসেছি।
–মা না তোমার সঙ্গে মিশতে বারণ করে দিয়েছে আর আমার বিয়ের জন্য ছেলে দেখতেও শুরু করে দিয়েছে।
–যাহ্‌ শ্লা!!এসব ড্রামা আবার কবে থেকে শুরু হল?এত জলদি সব ফাঁস করে দিলি মায়ের কাছে?
–না গো,আমি বলিনি গো।ওই যে ইরাবতী আছে না?ওর মায়ের সঙ্গে আমার মায়ের খুব বন্ধুত্ব।মনে হয় ওর মাই বলেছে আমার মাকে।ওই যেদিন আমরা নন্দনের ঝিলের ধারে বসেছিলাম।হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি ও আর আরেকটা ছেলে আমাদের সামনে দিয়েই চলে যাচ্ছে।রূপের দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না।গেল দুর্গাপুজোর সময় আমায় বলে কি নাএকটু বেশী করে হলুদ-টলুদ মাখ আঁচল।নইলে তুই যা কালো।শেষে না তোর নামটাকেই তোর মুখে গুঁজতে হয়!!হি--হি--হি--হি।
তাই আমি তোমাকে আর আমাকেই ওকে দেখাতে চেয়েছিলাম।তুমি দেখতে দেখতেই তো ও দেখে নিল আমাদের।
সেদিনই বুঝেছিলাম কিছু একটা ঝামেলা হবে কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে সেটা বুঝতে পারিনি।ওই মায়ের কাছে গিয়ে লাগিয়েছে।আর তারপর থেকেই কি বলবো তোমায় নয়ন দা,বাড়ীতে টেঁকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিশ্বাস করো আমার মনে হচ্ছে এখনি তোমার সঙ্গে পালিয়ে যাই অনেক অনেক দূরে।আর আমার ভালো লাগছে না গো,দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।বলো না গো নয়ন দা,কবে বিয়ে করবো আমরা?কবে বাঁধব আমাদের "ভালোবাসা"র ছোট্ট ঘর?
–আরে,হবে হবে!বললেই কি সঙ্গে সঙ্গে ঘর বাঁধা হয়ে যায় নাকি?ঘর কি আমার চৌদ্দ-গুষ্টির!যে বললেই হয়ে গেল!তার জন্য ওই যে ইংলিশে কি যেন বলে না,হ্যাঁ,প্রিপারেশন!প্রিপারেশনের দরকার আছে তো না কি?হবে হবে সব হবে।এখন থেকেই ঘ্যানঘ্যান করিস না তো কানের কাছে!যাক গে! তা কি বললো তোর মা?
–কি আর বলবে?বললো,”বখাটে ছেলেদের সাথে রাস্তায় রাস্তায় বেলেল্লাপনা করার চেয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া ঢের ভাল।অনেক হয়েছে পড়াশোনা!মন যখন অন্যদিকে গেছেই,এখন আর ওসব করে কোনো লাভ নেই।উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলে ভালো আর ফেল করলে তো আরো ভালো।তার চেয়ে বিয়ে দিয়ে দিলে জীবন,লোকলজ্জা দুই-ই বাঁচবে।মুখে চুনকালি পড়ার আগেই সাবধান হয়ে যাওয়া ভালো।না হলে এই তোর জন্যই তো সমাজে মুখ দেখাবার জো থাকবে না।লোকে তো গায়ে থু থু দেবে।সবাই জানে ওই নয়ন কেমন ছেলে!বুদ্ধি থাকলে কেউ ওই ছেলের সাথে প্রেম করে?মরবি,মরবি নিজেও মরবি আর আমাদেরও মারবি।বলি কি আছে টা কি ওর?না আছে রূপ আর না আছে গুণ!
এমনিতেই কালো বলে তিন জায়গায় সম্বন্ধ ভেঙে গেছে।”
–তা তুই কি বললি?
–বললাম,তাহলে তো বোঝোই যে আমি তোমাদের গলগ্রহ।আমিই বা কোন রূপবতী।আর সত্যি কথা যেটা তা হলো আমি নয়ন দাকে ছাড়া বাঁচব না।
শুনে মা বললো,”হ্যাঁ,তা আর বাঁচবে কেন?ওকে বিয়ে করলে এমনিই তুমি মরবে।ওই যে মেয়েটা,কি যেন নাম?
হ্যাঁ,অঞ্জলি,ওই ওর মতোই মরতে হবে তোমাকেও।
তোর ওই নয়ন দা,ওই শিউলি,অঞ্জলির মতোই তোর যৌবন চুষে খেয়ে তোকেও ওর লাইফ থেকে একদিন ছেঁটে ফেলবে,দেখিস!
তখন তোর ওই "ভালোবাসা" পালাবার পথ পাবে না।ওসব মতলব ছাড়ো!
আমি কালই তোর বাবাকে কলকাতায় তোর ছোটপিসির ওখানে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলবো।আর রুমাকেও বলবো যত শিগগির তোর জন্য ভালো ছেলে দেখতে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমার বিয়ে দিয়ে দেব আমরা।
প্রে---এএম?
তোমার প্রেম ঘুচিয়ে দেব আমি।
আচ্ছা,কি দেখেছিস বলতো তু-তু-ই ওই শ-শ-শয়তানটার মধ্যে?”
–আরিব্বাস!আমায় শয়তান বললো "উড বি শাঁসু মা"?তা তুই কি বললি শুনি?
–আমি বললাম,“ও তুমি বুঝবে না মা।আমি ওর মন দেখেছি,ওর অন্তর দেখেছি,ওর আমার প্রতি "ভালোবাসা" দেখেছি।আর তার কাছে বাইরের চেহারাটা কিছুই না।তাছাড়া ওর পরোপকারী মনটা দেখেও কি তোমরা ওকে বুঝতে পারো না?“
শুনে বললো,”ও ছাই দেখেছো!ইস,আমার বোকা-সোকা মেয়েটার কাঁচামাথাটা একেবারে চিবিয়ে খেয়েছে গো,হারামজাদা নয়ন টা!ওরে ও আঁচল,শোন মা,ও ছেলে একটুও ভাল না।একটু নিজের দিকটা দ্যাখ মা।ওর চেয়ে হাজার গুণ ভাল ছেলে তোর যোগ্য আমি তোর মা হয়ে বলছি।আমিও তো কালো ছিলাম।তোর বাবার কি আমাকে পছন্দ হয়নি?
এসব ছেড়ে এখন একটু ভালো করে মন দিয়ে পড়াশোনা কর মা।আর তো একটা মাস।তারপর আমি কথা দিচ্ছি নয়ন বাদে তোর আর যে কোন পছন্দের ছেলের সঙ্গেই আমি তোর বিয়ে দেব।“
আমি বললাম,”তা আর হয়না মা।আমি নয়ন দাকেই ভালোবাসি আর ওকেই বিয়ে করবো।দ্যাট ইস ফাইনাল।আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না।“
আর তাতেই মা রেগে মেগে আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলো।
–ওহ্!আরে,শিউলি আর অঞ্জলির কেসটা আলাদা ছিল।ওদের তো আমাদের অফিসে কাজ দেবার জন্য কোলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলাম।তুই তো জানিস আঁচল,অন্যের দুঃখে মন আমার কেমন কাঁদে।
শিউলিটাকে কোলকাতায় নিয়ে গিয়ে যেখানে থাকি সেখানে রেখে কাজের তদ্বিরের জন্য কয়েকদিন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে আর সেই সুযোগ বুঝে সে মাল আমাকেই ল্যাং মেরে বাড়িওয়ালার ছেলের সাথে পালালো।
আর অঞ্জলি!ও তো শালা নিজেই অফিসে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে চোর বদনাম নিয়ে মরলো গলায় দড়ি দিয়ে।কি লজ্জার কথা!!
তাতে আমার কি দোষ বলতো?
–আসলে কি বলো তো নানারকম কথা শুনে শুনে মায়ের মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ ঢুকে গেছে যে ওদের যা পরিণতি হয়েছে তার জন্য তুমিই দায়ী।যাই হোক,শিগগির কোন একটা ব্যবস্থা কর নয়ন দা?আমি তোমাকে ছাড়া একমুহুর্তও বাঁচব না গো!
আর সেদিন ইউরিন রিপোর্টও পজিটিভ এসেছে।যা করার জলদি করো নয়ন দা।
–অ্যাঁ-ক্কি বললি পজিটিভ এসেছে?এতবার বললাম "সহেলী" নে!!নিয়েছিলি?উফ্-ফ্!!
থাম,থাম মটকাটা ঠাণ্ডা করে ভাবতে দে তো!আচ্ছা শোন,পরে আমি মানকেকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে দেব।তুই এখন বাড়ী যা।

****************************************

--এটা তুমি কোথায় নিয়ে এলে আমায়?আমি অ্যাবর্শন করাবো না নয়নদা।আমাদের ভালোবাসার অঙ্কুরকে এভাবে নষ্ট হতে দেবো না আমি।কিছুতেই না।আচ্ছা তুমি কেন এমন উতলা হচ্ছ বল তো?ভালো কাজ পাওনি তো কি হয়েছে?তুমি যা পাও তাতেই আমাদের সোনামণিকে নিয়ে ঠিক চলে যাবে দেখো।
--কি যে জ্বালাতনে ফেলিস না আঁচল!!ঠিক আছে তোর যখন বাচ্চাটা নষ্ট করতে মন চাইছে না তখন থাক।দেখি কি ব্যবস্থা করতে পারি?কলকাতায় কালীঘাটেই গিয়ে না হয়--
--সত্যি-সত্যি বলছ নয়ন দা?উফ্ আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে !!
--আচ্ছা বাবা আচ্ছা!!আনন্দ পরে করিস।সামনে অনেক কাজ।মানকেকে আগেভাগে চলে যেতে বলতে হবে,সব বন্দোবস্ত করার জন্যে। আর শোন,একটা ছোট্ট ব্যাগে সব গোছগাছ করে রাখিস,কেমন?

*****************************************

অস্তগামী সূর্যের লালিমা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে আকাশের বুক থেকে।জানলা দিয়ে তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়েছিল শাঁওলী।তার মনে হচ্ছিল এসব তার পূর্ব জন্মের কথা।ঘোর কাটলো নূরজাহানের ডাকে।

–শাঁওলী দি,এ শাঁওলী দি,আখুনো তৈআরি হোসনি ?খোদ্দেররা তো সোব এলো বলে!!চল্,চল্,জলদি কোর।মাসী ভি তাড়া দিচ্ছে।

--বাব্বাহ্!! দেকিস নুরি!! শাঁওলীর যা ডিমাণ্ড বাজারে!! আমরা না আজও কলা চুসি বোসে বোসে!! হি-হি-হি-হি!!

হ্যাঁ,রাণীঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যমেধার উচ্চমাধ্যমিক পাশ-করা ছাত্রী আঁচল রায় আর এখন সে আঁচল নয়,সে এখন এখানকার মাসির দেওয়া ; খদ্দেরদের প্যায়ারের ”শাঁওলী” নামে পরিচিতা, নয়ন দা কালীঘাটে বিয়ে করে সেদিনই এখানে বেচে দেওয়ার পর এটাই এখন তার পরিচয়।
পরে পরিচয় হওয়ার পর জেনেছিল এখানেই অঞ্জলিও বিক্রী হয়ে সে রাতেই প্রথম খদ্দেরের হাতে ওঠার আগেই গলায় দড়ি দিয়ে মরে বেঁচেছিল আর শিউলি?তারও জায়গা হয়েছে আঁচল না,না,শাঁওলীরই মতো "সোনাগাছির" কোনো কোঠাবাড়ীতে।
বাচ্চাটা নাকি মরা জন্মেছিল!! কে জানে সত্যি কি না??
নাকি এই নরকেই কোথাও অন্য কোন মাসীর হাতে তৈরী হচ্ছে খদ্দের ধরার দালাল হতে বা খদ্দেরদের শরীরের কামনার আগুনে রোজ পুড়ে পুড়ে নিজের মায়ের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে।

সোমবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৬

আসবেই

                                            আসবেই...
                                          --------------
                                   স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্ 
                                ------------------------------
বারো নম্বর প্ল্যাটফর্মের পূর্ব পাশের সবুজ রঙ করা ওভারহেড ট্যাঙ্ক থেকে দিন রাত উপচে জল পড়ছেই। মফিজ অপলক তাকিয়ে থাকে উপচে পড়া জলের দিকে। ড্রেন দিয়ে বয়ে যাচ্ছে টলমলে স্বচ্ছ জল। খড়গপুর জংশনের সরকারী জল। একের পর এক ট্রেন আসছে। প্রয়োজনে জল ভরে নিচ্ছে। তাই কখনও জলের ট্যাঙ্ক যাতে খালি না হয়ে যায় সেদিকে কর্তৃপক্ষ সজাগ। কিন্তু জল যে অপচয় হচ্ছে সেদিকে কারও খেয়ালই নেই। 
এক-একটা দূরপাল্লার ট্রেন এসে থামছে আর রুটি-কলা-চা-পুরি-কফি ইত্যাদি বিক্রেতারা ছুটে যাচ্ছে জানালার কাছে। পিছনে আরেকজন বিক্রেতা হাঁকতে হাঁকতে যাচ্ছে -পানি বটল্, পানি বটল্... জানালায় হাত বাড়ানো যাত্রীর হাতে জলের বোতল তুলে দিয়ে তার দাম পকেটে ঢুকিয়ে ছুটে চলে অন্য আরেক ক্রেতার জানালায়। 
জল উপচে পড়া আর বোতলে জল বিক্রি করা, মফিজ এই দুটি দৃশ্য খুব উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে দেখে। কিছুক্ষণ পর পর নিজের অজান্তেই চিৎকার করে বলে উঠে -"হায় পানি!"
স্টেশনে পুরোনো দোকানদারেরা তার এই "পানির" গল্প অনেকেই জানে। স্টেশনে মফিজ "পানি পাগল" হিসেবে পরিচিত। একুশ বছর ধরে এই স্টেশনে আছে "পানি পাগল মফিজ"। বৃষ্টি নামলে সে খালি গায়ে সারাক্ষণ ভেজে যতক্ষণ না বৃষ্টি থামে। কেউ কেউ তাকে বৃষ্টিতেও ভিজে চিৎকার করে কাঁদতে শুনেছে। তখন তার চোখের জল বৃষ্টি এসে সযত্নে ধুইয়ে দিয়ে যায়।
খুব ভোরে মফিজ পিঠে একটা ছেঁড়া প্লাস্টিকের বস্তা নিয়ে শহরের পথে বের হয়। পথে পরে থাকা কাগজ, জল আর কোমল পানীয়র খালি প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে মোড়ের ভাঙাচোরার দোকানে বিক্রি করে কোন দিন পঞ্চাশ,কোন দিন আবার আশি-নব্বই টাকা পায়। তাতেই তার দিন চলে যায়।
লালমোহন স্টেশনের পুরনো দোকানদার। আগে বই-পত্রিকার দোকান ছিলো। মানুষ আগে স্টেশন থেকে প্রচুর বই কিনতো। শরৎ চন্দ্রের ছবি সহ শ্রীকান্ত, গৃহদাহ, শেষ প্রশ্ন,রবি ঠাকুরেরও বই থাকতো।এই বই গুলো সামনের সারিতে সাজানো থাকতো। আরও থাকতো ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়,অগ্রদূতের নাটকের বই। শীত শুরুর আগেই গ্রামের হাট-বাজারে, শহরের পাড়া-মহল্লায় ক্লাব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে যুবক থেকে বৃদ্ধ নাটকের মহড়ায় মেতে উঠতো। প্রচুর নাটকের বইও বিক্রি হতো তখন।
এখন আগের মতো বই বেচাকেনা হয় না। তাই লালমোহন এখন চা-জলখাবারের দোকান দিয়েছে। দিন রাত চব্বিশ ঘন্টাই চলে দোকান।সাথে তার পরিবার সাহায্য করে। লালমোহন এখন চা-বিস্কুট-কেক-লাড্ডু-পান-কলা-রুটি-(সিগারেট-বিড়ি লুকিয়ে) এই সব বিক্রি করে। দিনে দুই-চার বার মফিজ দোকানের চারপাশ ঝাঁট দেয়। বিনিময়ে মফিজকে চা-জলখাবার-দুবেলা ভাত খেতে দেয় লালমোহন। অবশ্য বিনা পয়সায় কোনদিনই মফিজ খায়নি তার কাছ থেকে।লালমোহন কত বারণ করেছে,তবুও প্রতিদিন তাকে পঞ্চাশ টাকা মফিজ দেবেই দেবে।রাতে দোকানের এক পাশেই একটা চটের বস্তা পেতে ঘুমোয় সে।লালমোহন তাকে একটা পুরোনো চাদর দিয়েছে।সেটাই গায়ে দিয়ে ঘুমোয় সে।

খড়গপুর বামাচরণ বিদ্যাপীঠের সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক স্বপ্নিল ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো বোঝে না। তার সহকর্মী অনেকেই টিউশনি করে ভালো রোজগার করছে। তার কাছে এই কাজ অনৈতিক মনে হলেও, অনেকেই "পলিটিক্যালি কারেক্ট" মনে করে তা করছে।অনেকেই একে আবার "চাটাই ব্যবসা","রোজকারের লক্ষ্মীপুজো" ইত্যাদি নানাবিধ অভিধায় ভূষিত করে থাকে।
মাস শেষে বেতনের টাকা থেকে বাড়ির লোন,এলআইসি,প্রভিডেণ্ট ফাণ্ড ইত্যাদি দেওয়ার পর যা থাকে তাতে চাল-ডাল-মাছ-সব্জিপাতির যোগান দিতে দিতেই শেষ। সেখান থেকে কাটছাঁট করে প্রতি মাসে বৃদ্ধা মায়ের হাতে কিছু টাকা তুলে দিতে হয়। 
স্বপ্নিলের সোয়া চার বয়সের বাচ্চা নয়নের ইদানীং মাছ-মাংসের প্রচুর চাহিদা। যোগান না দিতে পারলে বাবা হিসেবে তার মনে খুব কষ্ট হয়। নভেম্বর মাস শুরু হয়েছে, সামনেই পরীক্ষা। এই বয়সে আর কিছু তেমন না পারুক একটু খাঁটি দুধ খেতে দেওয়া খুবই দরকার।কিন্তু গরুর খাঁটি দুধ তো এখন প্রায় আর শহরাঞ্চলে মেলা-ই দুষ্কর।ওই "মাদার ডেয়ারি"ই ভরসা।
আজকাল বিজ্ঞাপন মানুষের মনে বাড়তি চাহিদার সৃষ্টি করছে। চাতুরীযুক্ত বিজ্ঞাপন মানুষের মগজে প্রতিদিন যোগ করছে নতুন নতুন অ-দরকারী পণ্যের বার্তা। পণ্যের দামের চাইতে বিজ্ঞাপনের খরচ বেশী। সেই খরচ আর লাভের অংশ যোগ করে তিনগুণ দামে পণ্য ঢুকছে ক্রেতার ঘরে। সরকারের কাছ থেকে নয় টাকায় গিগাবাইট কিনে বিশ চল্লিশ গুণ বেশী দামে ডাটাপ্যাক বিক্রি হচ্ছে। মিনিপ্যাক বিক্রি হচ্ছে শতগুণ বেশী দামে। অর্থাৎ তিন টাকার পণ্যে ছয় টাকার বিজ্ঞাপন যোগ হয়ে নয় টাকায় পণ্য কিনে ধন্য হয় ক্রেতা। এটাই নাকি আধুনিক অর্থনীতির নিয়ম।
স্বপ্নিল সেদিন ছেলে কানু(নয়নের ডাকনাম)কে পাশে নিয়ে টেলিভিশনে খবর দেখছিলো। খবরের বিরতিতে বিজ্ঞাপনে দেখায় আজকাল নাকি দুধের সাথে হরলিকস্ মিশিয়ে খাওয়াতে হয় সন্তানদের। এতে নাকি শরীরের সাথে মস্তিষ্কের সব চাহিদা পূরণ হয়।তাতে বাচ্চা হয় "আরো বেশী টলার-আরো বেশী শার্পার"। বিজ্ঞাপনের সময় স্বপ্নিল রিমোট চেপে অন্য চ্যানেলে চলে যায়। সেখানেও একই বিজ্ঞাপন দেখে সে একটু বিব্রত বোধ করে। ছেলে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা জানতে চাইছিলো কিন্তু মনে জোর পায়নি।
শুধু শুনল কানু বলছে, "এইতা খেলে আমি আলো বেছি বুদ্দিমান হয়ে দাবো!!"
স্বপ্নিল ঠিক করেছে এই মাসে সে ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনবে না। এই টাকায় ছেলের জন্য খুঁজে-পেতে খাঁটি দুধ আর সাথে হরলিকস্ কিনে দেবেই দেবে। খাঁটি দুধের সাথে হরলিকস্ খেয়ে শরীরে বাড়তি চাহিদা পূরণ হোক বা না হোক ছেলের মনের জোরটা তো অন্তত বাড়বে।

আজ দীপান্বিতা শ্যামাপূজা। চারিদিকে আলোর রোশনাই।অশুভকে বিনাশ করে শুভতে ফেরার দিন।কানু আর তার মা মণিমালা মিলে বাড়িটাকে খুব সুন্দর করে আলো দিয়ে সাজিয়েছে।রাতে দুজনে মিলে খুব বাজি পোড়াবে।মাঝে একদিন বাজার থেকে নানা ধরনের বাজি কিনে এনেছে মা-ছেলেতে মিলে।সন্ধ্যে হতে না হতেই মণিমালা সারা বাড়িটাকে মোমবাতি দিয়ে সাজিয়ে ফেললো।তারপর একটু পরে যখন সেগুলো জ্বালিয়ে দিলো তখন সেগুলোর সাথে আর সারাবাড়ি জুড়ে নানা বাহারী আলোয় এক অনির্বচনীয় আনন্দে ভরে উঠলো মন। বাজি পোড়াবার সময় কানুর কি আনন্দ-শুধু থেকে থেকে হাততালি দেয় আর বলে--"বাবা,বাবা দ্যাথো লকেট উই উলে দাত্থে--পুউউউউউউ ধাআআম্"।
স্বপ্নিল শুধু তাকিয়ে ওদের আনন্দ দেখে আর মনটা তার ভরে যায়।
একটু রাতে স্টেশনের পাশের ক্লাব শক্তি সংঘের পক্ষ থেকে শীতার্ত মানুষদের কম্বল বিতরণ করা হবে। ক্লাবের ছেলেরা চাঁদা তোলার ফাঁকে ফাঁকে শহরে ঘুরে ঘুরে প্রকৃত শীতার্ত মানুষদের একটি লিস্ট তৈরী করেছে।তাদেরই  হাতে কম্বল তুলে দেওয়া হবে।কম্বল বিতরণের জন্য তারা অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে মাষ্টারমশাই হিসেবে স্বপ্নিলকেও অনুরোধ করেছে।সে বারবার করে বারণ করেছিল যাবে না বলে,কিন্তু ক্লাবের প্রেসিডেণ্ট কোন কথাই শুনতে চাননি।
বাকিরা সবাই রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত।
সে রাজনীতি করে না।
এবার এইভাবে বোধহয় তাকে রাজনীতির আঙ্গিনায় আনার প্রচেষ্টা।
রাতে সংঘের অফিসে এসে লোকাল কেবল্ চ্যানেল এর গাড়ি, ভিডিও ক্যামেরা, মাইক্রোফোন হাতে সাংবাদিক দেখে একটু বিব্রত হয় স্বপ্নিল। এই সামান্য কাজ তাতে প্রচারের কি আছে? তার কথা কেউ গুরুত্ব দেয় না।
--এইটা আত্মপ্রচার না। মানুষকে এইসব কাজে উৎসাহিত করা। বুঝলেন মাষ্টারমশাই ?--বোঝাতে চান লোকাল উঠতি নেতা।হুঁ-হাঁ করে মাথা নাড়লেও স্বপ্নিল কোনও কথা বলে না।
পূজামণ্ডপের একটু সামনেই মঞ্চ করা হয়েছে।এক-এক করে নাম ডাকা হচ্ছে।একজন নেতা কম্বল হাতে তৈরী, ক্যামেরার লাইট জ্বলে উঠে। এক এক জন করে কম্বল হাতে এগিয়ে যায়। কেউ একজন ভিখারিণীর গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিচ্ছেন। ফুটপাতে শুয়ে থাকা এক পাগলও এসেছে।সেই পাগলের গায়ে কম্বল জড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য ধারণ করছে ক্যামেরা। স্বপ্নিলের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যায়। মঞ্চে চুপ করে বসে বসে সে যেন নাটকের এক-একটি দৃশ্য ধারণ করতে দেখছে। শহর ঘুরে তোলা নামের লিস্ট শেষ হতেই "আজ আমাদের এখানকার কম্বল বিতরণের পালা এখানেই শেষ,পরের কম্বল বিতরণ স্টেশনে শুয়ে থাকা সেইসব দুঃস্থ মানুষদের উদ্দেশ্যে" ঘোষক এই কথাগুলো ঘোষণা করতে না করতেই ষ্টেশনের দিক থেকে একটা উল্লাস-গর্জনের শব্দ ভেসে আসে।এইগুলো স্বপ্নিলকে দিতে হবে।বিতরণের নানা দৃশ্যধারণ করতে করতে ক্যামেরার সাথে সবাই এগিয়ে চলে রেল স্টেশনের দিকে। সেখানে কয়েকটি দৃশ্য ধারণ করার পর অনেক মানুষ,যারা কম্বল পায়নি তারা ঘিরে ফেলে তাদের।স্বপ্নিল দেখতে থাকে যেন শত শত নারী-পুরুষ-শিশু... মুহুর্তেই কম্বল শেষ হয়ে যায়। সেই হুড়োহুড়ি করার দৃশ্যটিও ক্যামেরাবন্দি করা হয়।
স্বপ্নিল, সংঘের সেক্রেটারির হাতে দায়িত্ব দিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে ঘটনাটা। এদের আত্মপ্রচারের চেষ্টা দেখে নিজেকে এমন মহৎ একটি কাজের সাথে যুক্ত ভাবতেও লজ্জা হচ্ছে। সবাই নিজের মুখটি ক্যামেরার আলোর সামনে তুলে ধরতে ব্যস্ত। রেল স্টেশনের সব দুঃস্থ মানুষ ঘিরে আছে ওদের। ওদের কাছে আর কম্বল নেই এই কথা কেউ বিশ্বাস করছে না। ক্ষোভে কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। একসময়ে তাদের "পরে দেওয়া হবে" বলে কোনমতে পালিয়ে বাঁচে সবাই। তাদের এই কর্মযজ্ঞের একজন সঙ্গী যে রয়ে গেছে সেদিকে তাদের খেয়ালই থাকে না।
স্বপ্নিল দূরে দাঁড়িয়ে একজন মানুষকে শুধু দেখতে পেলো, যে এই কম্বল পেতে হুড়োহুড়ির মধ্যে নেই। লোকটা হৈ-চৈ শুনে একটা ছেঁড়া চাদরের ভিতর থেকে একবার শুধু মাথাটা বের করে ধাক্কাধাক্কি কাড়াকাড়ির দৃশ্য দেখে আবার তার মাথা ঢেকে ফেলে।

পরের দিন রাতে বাড়ি ফেরার পথে স্বপ্নিল হরলিকস্ এর জন্য বরাদ্দ টাকা দিয়ে একটা কম্বল কেনে। রিক্সা নিয়ে রেল স্টেশনের সেই দোকানের পাশে শুয়ে থাকা মানুষটাকে খুঁজতে থাকে। 
খুঁজে না পেয়ে স্বপ্নিল দোকানদারের কাছে জানতে চায় -এখানে একটা লোক শুয়ে ছিল কাল রাতে... 
লালমোহন চোখ তুলে তাকিয়ে নমস্কার করে বলে -- নমস্কার স্যার। 
-- আপনি আমাকে চেনেন? স্বপ্নিল বলে। 
-- হ্যাঁ স্যার, আমার ছেলে আপনার স্কুলে পড়ে। আমিও স্যার আপনার বাড়ির কাছাকাছিই থাকি। বসুন স্যার। আপনি মনে হয় মফিজকে খুঁজছেন। এখনই আসবে। দোকানের নোংরা ঝাঁট দিয়ে দূরে ফেলতে গেছে।বাংলাদেশী স্যার।একটু ছিটিয়াল।এনজিও থেকে ওষুধ দিয়ে গেছে।পাগলামির।কাছে রেখে খাওয়াই।আর আতুর মানুষকে একটু যত্ন-আত্তি আর কি!!
মাঝে মাঝে কি যে হয় ওর।ওর হারানো বোনের জন্য খালি কাঁদে।আর জল দেখলে তো আরও বেশী করে কাঁদে।
-- এ-এই যে মফিজ তাড়াতাড়ি আয়।
স্বপ্নিল তাকিয়ে দেখে ময়লা জামা-কাপড় পরা একটা লোক, মুখে সামান্য খোঁচা দাড়ি একটা বালতি নিয়ে এগিয়ে আসছে।
মফিজ ময়লার বালতিটা রেখে ধোওয়া হাত গামছায় মুছতে থাকে। 
-- স্যার তোকে খুঁজছেন। লালমোহন বলে। 
-- নমছ্কার ছার। মফিজ বলে।
-- নমস্কার। "বসুন" বলে মফিজের হাত ধরে টেনে কাঠের বেঞ্চে বসায়।
-- ভালো আছেন? 
- হ ছার ভালা আচি। 
হাতের কম্বলটি মফিজের হাতে তুলে দিয়ে বলে,
-- এটা আপনার জন্য। 
-- স্যার একটা চা দিই? লালমোহন বলে। 
-- ঠিক আছে দিন, চিনি কম দিয়ে লিকার চা দিন।
চা খেতে খেতে মফিজকে জিজ্ঞেস করে স্বপ্নিল,
-- আপনার এ অবস্থা কেন? ওদেশে আত্মীয়স্বজন কে কোথায় থাকেন কিচ্ছু কি মনে পড়ে না আপনার?আপনার বোনেরই বা কি হয়েছে?
কিছুক্ষণ একটু চুপ করে মাথা নীচু করে থেকে চোখের জল ফেলতে থাকে সে।অনেক বাদে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে থাকে মফিজ। যে গল্পটি সে যার তার সাথে করে না। যাকে তার ভালো লাগে তার সাথে করে।
-- আত্তীয়ছজন কেউ নাই ছার।থাহার মইদ্যে ছিল এক বইন।সে আর আমি।এইইসব...
মা মারা জাওনের সমুয় বইনডার এট্টু মাতায় দোইষ দেকা দ্যায়।মাডারে আর আমারে খুপ ভালোবাইসতো তো।আব্বায় গ্যাছে তারও আগে।তো হগ্গলে কইল "মফিজ বইনডারে একবার ভেলুরে দেখায়া লইয়া আয়,আল্লায় রহম করলে তর বইন ঠিক হইয়্যা জাইব।"। তয় বইনরে লইয়া ঢাহায় পাসপুট করায়া ভেলুরে লইয়্যা যাইতাছিলাম।
আমার গেরামের বাড়ি গৌরীপুর। ঢাহার পোস্তগলায় একটা রড কারখানায় কাম করতাম। রাইত দিন কাম করতে অয় তাই ফেক্টরীর মালিক লেবারগর লেইগ্যা টিনের চালাঘর বানায়া দেয়। পরিবার লইয়াও থাহুন যায়। ঈদের পরবে ছুডি পাইয়্যা জমানো হগ্গল ট্যাহা লইয়্যা বুনরে লইয়্যা ভেলুর যাইতাছিলাম।
হাউরা অবদি কুনো সমইস্যা হয় নাই ছার।হাউরা থেইক্কা রেলগাড়ি ইহানে আইসা জিরাইতাসে। খুব ভোর বেলা না খাইয়া রেলগাড়িতে উঠসি তো, হুদাপ্যাট। গাড়ির থামনের টাইম পেরায় শ্যাষ। বইনডার মুখের দিগে চাইয়া দেহি মুখখান হুগ্না লাগতাছে।
খিদা লাগছে অই বুনি?--শরমে না কি মাতার তো ঠিহ নাই তাই কতা কয় না।
আমি জিগাইলাম -বুনি, রুটি-কলা খাবি?
হ্যায় মাতা নাইরা কয় -- হ খামু।
রুটি কলা কিইন্না বইনরে লইয়া খাইলাম। এট্টু বাদে আমার দিগে চাইয়া ডরাইয়া ডরাইয়া কয়,
-- পানি খামু...
-- পানি খাবি? এহন পানি কই পাই?তুই এই ছিটের মইধ্যেই বইয়া থাক্।কইও জাবি না কিন্তু। আমি পানি লইয়া আইতাছি।
আমার আতের কাপ্রের পুটলাডা আমার ছিটের উপ্রে রাইখ্যা পানি আইনতে নিচে নাইম্যা গ্যালাম। ইস্টিশনের ভিত্রে উই দিগে একডা চায়ের দোহান আছিলো। ঐ দোহানে গিয়া আমি  মগ দিয়া পানি খাইলাম আর পানির মগটা বুনির লেইগ্যা নিয়া আইতাছিলাম। তহন পিছে থেইক্কা আমারে ডাইক্কা শুইধ্ধ বাষায় কয় -অই মিঁয়া পানির মগ লইয়া কই যাও? এইহানে খারাইয়া পানি খাও। মগ নেওনের নিয়ম নাই। আমি আরেক দুহানে গেলাম হেইহানেও এহই নিয়ম। আমি দৌড় দিয়া ইস্টিশনের বাইরে গেলাম।
সবাই এহই কথা কয়। শেষে তিন টেহা দিয়া একটা পুরান গেলাস কিনলাম চায়ের দুহান থেইক্কা। গেলাসে পানি ভইরা ইস্টিশনে ডুইক্কা দেহি রেলগাড়ি ছাইড়া দিছে। আমি অনেকক্ষণ পিছনে পিছনে দৌড়াইলাম। আমি যতো দৌড়াই গাড়ি ততোই দূরে চইলা যায়। শ্যাষে আমি "বুনি রে, বুনি রে" কইরা অনেক কান্দাকাডি করলাম। পরে বারোডার লুকাল গাড়িতে পরের পর অনেক ইস্টিশানে যাইয়া নাইম্যা নাইম্যা বুনিরে অনেক খুঁজাখুঁজি করলাম। আমার বুনিরে পাইলাম না।
পরে বাতরুমে লুকাইয়া টিটি রে ফাঁকি দিয়া দিয়া ভেলুরে গিয়াও সাত দিন ভরা হেই শহরের রাস্তায় রাস্তায় খুঁজলাম। পাইলাম না। ------------
মাথা নাড়তে নাড়তে মফিজের কণ্ঠ ভিজে আসছে। কথা বলতে পারছে না। থেমে যায় মফিজ।
অবাক বিস্ময়ে শুনতে থাকা স্বপ্নিল জিজ্ঞাসা করে -- তারপর?
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে থাকে মফিজ -- তার পরে এইহানে ফিইরা আইলাম। আমার বুনি আমারে খুঁজতে খুঁজতে যদি এই ইস্টিশনে আয়ে? আমারে না পাইলে ও কতো কইষ্ট পাইবো,তাই না! আপ্নেই কন ছার কইষ্ট পাইবো না?
-- হ্যাঁ অবশ্যই কষ্ট পাবে। স্বপ্নিল বলে।
-- কিন্তু সে আছে কোথায় এতবছর ধরে?আদৌ বেঁচে আছে কি না?
-- কন কি ছার?চিৎকার করে ওঠে মফিজ।আছে আছে ঠিক বাঁইচ্যা আছে।
-- ঠিক আছে।তুমি তো অসুস্থ।ওষুধ গুলো ঠিকঠাক খেও।নইলে বুনিকে চিনবে কেমন করে?
-- আপনে জ্ঞানী মানুষ তাই বুঝলেন ছার।আমি আমার মায়ের অ্যাক প্যাডের বইনরে চিনুম না।আমারে মানুষে পাগলা মনে করে। আমি কিন্তু ছার পাগলা না। আমার মনে লয় ছার বুনি ঠিহই একদিন খুঁইজতে খুঁইজতে এই ইস্টিশনে আইবো। হেই আশাতেই ছার একুশ বছর ধইরা অপেক্কায় আছি ছার।অপেক্ষায় আছি।হুঁ-হুঁ-হুঁ- বুনি রে তুই কই গেলি বইন।ফিরা আয় ফিরা আয়--অবিশ্রান্ত ধারায় অশ্রুমুক্তো ঝরে পড়তে থাকে মফিজের দু চোখ থেকে।
স্বপ্নিল কি বলবে কিছু খুঁজে না পেয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে,লালমোহনকে নমস্কার করে ফিরে আসতে থাকে।

"গাড়ি নম্বর ১২৮৬৪, হাওড়া-যশবন্তপুর ফাস্ট এক্সপ্রেস;যশবন্তপুর থেকে হাওড়া যাওয়ার গাড়ি বারো নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে"--ঘোষিকার সুরেলা গলার রেশ মেলাতে না মেলাতেই ঝমঝম করে শব্দ তুলে স্টেশনে ঢুকল ট্রেনটি।হকার আর ক্যানভাসাররা দৌড়ল যে যার ব্যবসা করতে।মুহুর্তে সরগরম হয়ে উঠলো প্ল্যাটফর্মটি।
-- ভাইজান!! ভাইজান গো!! একটি মেয়েলী গলার চিৎকারে হঠাৎ চমকে ওঠে স্বপ্নিল।
কি হল রে বাবা!!
কারোর আবার কোন বিপদ-আপদ হল নাকি?
পেছন ফিরে দেখে একজন সম্ভ্রান্ত স্ত্রীলোক ও তার পেছনে লাগেজ হাতে নিয়ে আরও একজন মধ্যবয়স্ক লোক ট্রেন থেকে নেমে ছুটে যাচ্ছে লালমোহনের দোকানের দিকে।
কি ব্যাপার?
চারদিক থেকে লোকজন উৎসাহী হয়ে এগিয়ে আসতে থাকে।
-- রাণী,রাণী শোন কি করছো?-পুরুষটি বলতে থাকেন।
রাণী নামক স্ত্রীলোকটি কোনদিকে, কোন কথায় কান না দিয়ে সোজা গিয়ে দু'হাতে বেষ্টন করে ধরে মফিজকে।
ক্রন্দনরত মফিজও ঘটনার আকস্মিকতায় হঠাৎ হকচকিয়ে গেলেও তারপর মেয়েটির মুখটিকে দু'হাতে ভালোভাবে ধরে দেখে অঝোরে কেঁদেই চলেছে আর অস্ফুটে বলেই চলেছে,"আমি জানতাম,ঠিক জানতাম।"
আর রাণী তার স্বামীকে লক্ষ্য করে বলে চলেছে,"আমি বলেছিলাম ভাইজানরে আমি পাবোই।"
স্বপ্নিল,মফিজ,লালমোহন,বুনি ওরফে রাণী,রাণীর স্বামী চন্দ্রপাল আরও ষ্টেশনের নানা ব্যবসায়ী-হকার সবাই মিলে একসাথে বসেছে।সবাই ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক।কিন্তু কারোর আর বুঝতে বাকি নেই যে, এই রাণী-ই হল মফিজের সেই হারিয়ে যাওয়া বুনি।শুধু মফিজের মুখে কোন কথা নেই।সে একদৃষ্টিতে তার হারানো বোনকে দেখেই যাচ্ছে।
স্বপ্নিলই প্রথমে জিজ্ঞেস করে তার স্বামীকে,
আচ্ছা ভাই, আপনিই ঘটনাটা বলুন?কিভাবে কি হয়েছিল?
চন্দ্রপাল হেসে বলেন,সে অনেক ঘটনা।
চন্দ্রপালের বয়ান অনুসারে যা সবাই শুনল তা হল---
ট্রেন তো ছেড়ে দিল।বুনি তো প্রথমে অতটা বোঝেনি কি হচ্ছে।তারপর যখন বুঝতে পারলো তখন অনেক ষ্টেশন পার হয়ে গেছে।ও চিৎকার করে ভাইজান ,ভাইজান বলে কাঁদতে থাকে।কয়েকবার চলন্ত ট্রেন থেকে নামারও চেষ্টা করে,কিন্তু অন্যান্য লোকজন বাধা দেওয়ায় তাতে সফল হয় না।
ওই কম্পার্টমেণ্টেই একটু দূরেই ছিলেন রাজীববাবু আর ওনার স্ত্রী।ওনারা ওকে নিজেদের কাছে নিয়ে এসে বসান।সর্বক্ষণ আগলে আগলে রাখেন।রাজীববাবু চেন্নাইতে ব্যবসার কাজে যাচ্ছিলেন।ওনার বাড়ি কোলকাতার বড়বাজারে।রাজীববাবুর স্ত্রীকে বোধহয় একটু ভরসা পেয়ে বুনি আর সারা রাস্তা কিছু করেনি।
রাজীববাবু ওদের সব লাগেজ ঘেঁটে সব কাগজপত্র পড়ে বুঝতে পারেন বুনির চিকিৎসার করানোর কথা।তারপর তিনি নিজের উদ্যোগেই বুনির চিকিৎসার ভার নিজে তুলে নিয়ে ভেলোরে ভালোভাবে চিকিৎসা করিয়ে বুনিকে সুস্থ করে তোলেন।
এইভাবে কেটে যায় বছর পাঁচেক।
মফিজের ঐ কাপড়ের পোঁটলায় দুই ভাই-বোনের একটা ছবি ছিল।বুনি সুস্থ হওয়ার পরও ঐ ছবি দেখে খালি কাঁদতো।ওর এই অবস্থা দেখে ওনারা ঠিক করেন ওকে নিজেদের কাছেই রাখবেন নিজের বোন হিসেবে।ওর নতুন নাম তারা দেন রাণী।ওকে হিন্দুদের আচার ব্যবহার সব শেখান।এর মধ্যে রাণীকে রি-চেকআপ করাতে নিয়ে যাওয়ার সময় চন্দ্রপালের সাথে ওদের ট্রেনে আলাপ হয়।চন্দ্রপালের রাণীকে প্রথম দেখাতেই ভালো লাগে ও রাজীববাবুর ফোন নম্বর নিয়ে কিছুদিন বাদেই সে তাদের কাছে রাণীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়।চন্দ্রপালের বাড়ি ও ব্যবসার ক্ষেত্র দুই-ই ছিল ভুবনেশ্বরে।
রাজীববাবু কিন্তু চন্দ্রপালের কাছে কোন কথাই লুকোন নি।চন্দ্রপাল সব জেনে শুনেই রাণীকে গতবছর ভালোবেসে বিয়ে করে।
চন্দ্রপাল রাণীর এই ব্যথার কথাটা জানতো।তাই সে সব সময় স্ত্রীকে সঙ্গ দিয়ে গেছে,যদি মফিজকে খুঁজে পাওয়া যায়।কিন্তু রাণীর কিছুতেই কোন ষ্টেশনে মফিজ নেমে গিয়েছিল তা মনে পড়তো না।

আগামীকাল ভ্রাতৃদ্বিতীয়া।
রাণী তাই চন্দ্রপালের সাথে যাচ্ছে তার রাজীবদাদাকে ভাইফোঁটা দিতে,যা সে রাণী নাম ধারণ করার পর থেকে এ যাবৎ করে এসেছে।
আজ আল্লা বা ভগবান মেহেরবান বা কৃপা করেছেন বলেই বুনি ওরফে রাণী তার আসল দাদাকে খুঁজে পেল।ঘটনাটা শুনে উপস্থিত কারোরই চোখ শুকনো ছিল না।লালমোহন তো বলেই ফেললো,আজ আমাদের গরীবখানায় আপনাদের যেতেই হবে।সবাই তাতে সায় দিল।রাজীববাবুকে ফোন করে সব ঘটনা বলা হল।তিনিও সস্ত্রীক খড়গপুরে চলে এলেন।
আজ সবার মনেই খুব আনন্দ।
"পানি পাগল মফিজের" যেন আজ শাপমুক্তি ঘটলো।
খড়গপুর ষ্টেশন ব্যবসায়ী সমিতি চাঁদা তুলে একটা ছোটখাটো খাওয়া-দাওয়ার ও ব্যবস্থা করে ফেললো।

আজ ভাইফোঁটা।
মফিজকে ভালো করে পরিষ্কার করে স্নান করিয়ে ধুতি-পাঞ্জাবী পরিয়ে রাজীববাবুর পাশে বসিয়েছে রাণী।এইসব আচারে অনভ্যস্ত মফিজ খুব লজ্জা পাচ্ছিলো।কিন্তু রাণী,রাজীববাবু আর বাড়ির সবাই কোন কথা শোনেনই নি।আজ যে তার আসল দাদাকে সে ভাইফোঁটা দেবে।এ যে তার কত বড় প্রাপ্তি।রাজীববাবু আর চন্দ্রপাল মিলে ষ্টেশন ব্যবসায়ী সমিতির সকলকে,সপরিবারে নিমন্ত্রণ করেছে তাদের এখানে খাওয়া-দাওয়া করার জন্য।
রাণী নিজে গিয়ে স্বপ্নিলকে সপরিবারে নিমন্ত্রণ করে এসেছে ভাইফোঁটা দেবে বলে।
স্বপ্নিলের নিজের কোনও বোন বা দিদি না থাকায় ভাইফোঁটার দিনটা সে খুব কষ্ট পেত।
আজ সেও এক নতুন বোন পেল।
লালমোহনের বোন বা দিদি কেউ ছিল না।সেও ভাইফোঁটা পাবে শুনে আনন্দে ঘনঘন চোখ মুছছিল।
লালমোহনের বাড়ির সামনে আজ বিশাল প্যাণ্ডেল হয়েছে।
শহরের বড় ক্যাটারারকে খাবারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
লালমোহন,স্বপ্নিল,মফিজ আর রাজীববাবু পরপর বসে আছেন।
একে একে সবার কপালে অনামিকা দিয়ে চন্দনের ফোঁটা এঁকে দিতে দিতে রাণী মন্ত্র বলে চলে,
"যম-দুয়ারে দিয়ে কাঁটা,
বোন দেয় ভাইকে দ্বিতীয়ার ফোঁটা;
ফোঁটা দেই রে ভাই আমি,
যম-ঘরে না যাইও তুমি"
উলুধ্বনি আর শঙ্খের আওয়াজে মধুময় হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস।
সাম্প্রদায়িকতার ভেদাভেদ মুছে এ হেন ভ্রাতৃদ্বিতীয়া কেউ যে কখনো দেখেনি আগে।

বুধবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৬

প্রথম পাপ


প্রথম পাপ
----------------------

স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-------------------------------


মানুষের ভিতরে ভালো কিংবা মন্দ কেউ এক জন বাস করে। দ্বৈত চরিত্রের ধূর্ত অদৃশ্য এক মানব কিংবা দানব। কখনো ভালো কাজে বাঁধা দেয় কখনো খারাপ কাজে। কাজ শেষ হলে আবার উল্টো আচরণ করে। অনৈতিক কোন কাজে উৎসাহ যুগিয়ে বিপদে ফেলে পরে আবার তাচ্ছিল্য করে। ব্যঙ্গ করে। আগুনে তুষ ছিটোয়। জবাকে সে এভাবেই বিপদে ফেলেছে। জবা লড়ে যাচ্ছে তার সাথে। যুক্তি তর্ক করে জয়ী হওয়ার চেষ্টা করছে।
-স্বামীর সাথে দু'চারটে সত্যি গোপন করা কি খুব অন্যায়?
-হ্যাঁ অন্যায়, একশো ভাগ অন্যায়। জবা উত্তর দেয়।
-ভাব খানা এমন যে এর আগে আর একটাও সত্যি গোপন করিস নি!
-ঠিক তাই,এর আগে আর করিনি। এটাই প্রথম।
-বিয়ের আগে যখন প্রেম করতিস সেটা বলেছিস?
-হ্যাঁ বলেছি।
-তো এখন কি করতে চাস তুই?
-মরতে চাই।
-অন্যায়টা কি তোর কাছে এতই গুরুতর মনে হচ্ছে?
-হ্যাঁ,কাজটা পাপ হয়েছে।
-রাখ তোর পাপ! এমন পাপ সবাই করছে অহরহ!
-আমি কেন করবো?
-তুই কি স্বর্গের অধিবাসিনী? সত্যবাদিনী যুধিষ্ঠিরা?
-আমি তার চাইতেও দামী কিছু। আমি মানুষ। তাই আমার মরা উচিৎ।
রেল লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে জবা নিজের ভিতরের রহস্যময় চরিত্রটির সাথে এভাবেই তর্ক বিতর্ক করছিলো।
সে মরতে চায় অভিমানে নয় অনুতাপে। নিজের কৃতকর্মের শাস্তি। রেল লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে সিদ্ধান্তটা যখন মোটামুটি পাকা। এর পর যে ট্রেনটা আসবে তার চাকার নিচেই... সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। এমন সময় তলপেটে একটা তীব্র ব্যথায় হাত দিয়ে চেপে ধরে রেল লাইন থেকে সরে দাঁড়ায় জবা। এতোক্ষণ ধরে ভেবে চিন্তে যুক্তি তর্ক করে নেওয়া সিদ্ধান্ত মুহুর্তেই এলোমেলো হয়ে যায়। পেটে যে তার আরেক জন মানুষের অস্তিত্ব বেড়ে উঠছে। তিন মাস হয়নি এখনো। এই অনাগত সন্তানের বাবা তমাল। তার স্বামী। একে হত্যা করে নিজে মরার বিলাসী ইচ্ছে অন্যায় না শুধু, এ আরেক পাপ। 

পুরো ঘটনাটাই ছিলো আসলে খামখেয়ালী। ছেলেখেলায় এত বড় ভুল হয়ে যাবে তা আসলে জবা বুঝতে পারে নি। এক সময় অন্যের এমন অপকর্মের গল্প শুনে ছি ছি করতো, আর আজ কিনা নিজেই! ছিঃ...! 
স্বামী হিসাবে তমালের তুলনা হয় না। যখন যা চেয়েছে অথবা দরকারে-অদরকারেও উজাড় করে দিয়েছে তাকে ভোগ্যপণ্যের ডালি।এমনকি চার বছরের সংসার জীবনে এক বারও গায়ে হাত তোলেনি। বাজে কথা বলেনি কখনো রাগ হলেও। অভিমানে এক দুই দিন হয়তো কথা কম হয়েছে। তার পর সে আদরে আদরে কড়ায়-গণ্ডায় তা পুষিয়ে দিয়েছে। নিজের প্রতি ক্ষোভটা সেখানেই।
গত বছর দুই ধরে একটু ব্যস্ততা বেড়েছে। সময় কম দেয়। যখন চাকরী করতো তখন ছুটির দিনগুলো কতো আনন্দে কেটেছে। এখন ব্যবসা করে। ছুটির দিন বলে কিছু নেই। কিন্তু সংসারে কি স্বাচ্ছন্দ্য বাড়েনি? একটা ল্যাপটপ খুব শখ ছিলো। পুরোনো হোক তাওতো নিজেদের একটা গাড়ি। ভাড়ায় হোক একটা এ্যাপার্টমেন্টে নিজেদের গোছানো সংসার। তমাল এও বলেছে দু চারটা বছর ধৈর্য্য ধরলে নিজেদের একটা বাড়ী হবে। আর এরই মধ্যে কি না...
এই ল্যাপটপ যন্ত্রটাই সব কিছুর মূল! আরে, শুধু শুধু একে আবার দোষ দিচ্ছি কেন!যেই জল তৃষ্ণা মেটায় সেই জলে লাফিয়ে যদি আমি ডুবে মরি তার জন্য তো আর জল দায়ী না!
ফেসবুকে প্রায় বছর খানেক ধরে "তেপান্তর" নামে যুবকের সাথে পরিচয়। এর নাম আসলেই তেপান্তর কি না জানা নেই জবার। নিশ্চই ছদ্ম নাম। তেপান্তর আবার বাস্তবে মানুষের নাম হয় কি করে। যাই হোক ব্যক্তিগত বার্তায় সকাল দুপুর যোগাযোগে জবার প্রেমে পড়ে যায় ছেলেটি। দুষ্টুমির ছলে জবাও যে এক পা,দু পা এগোয় নি তা নয়। বাসায় একলা সময় কাটে না। মানুষ যখন একলা থাকে মন তখন স্বেচ্ছাচারী। নৈতিক অনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে যায়। তাই বলে শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা এতো দূর গড়াবে! 
ছয় মাস হয়ে গেছে তেপান্তর একটি বার জবাকে মুখোমুখি দেখার জন্য পাগল হয়ে গেছে। জবার স্বামী-সংসার আছে এই কথাটি পর্যন্ত মানতে চাইছে না। একটিবার শুধু দেখবে তার পর বাকী জীবন আর বিরক্ত করবে না জবাকে। জবা মনে মনে নিজেও যে মোহাচ্ছন্ন হয় নি তাও সে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না। 

তেপান্তর নিজে গাড়ি চালাচ্ছে। কারো মুখে কথা নেই। জবা যেমনটি ভেবেছিলো, কল্পনায় তেপান্তরের যেমন ছবি এঁকেছিলো বাস্তবে অনেক বেশী আকর্ষণীয়। চোখের ইশারায় যেন দুনিয়া জয় করতে সক্ষম। বয়স ত্রিশ-একত্রিশ। তার পাশে বরং নিজেকে বড় বেশী বেমানান লাগছে। গাড়ি নব্বই থেকে একশ কিলোমিটার গতিতে চলছে। জবা নির্বাক। এইটুকু বলার সাহস হচ্ছে না -আমাকে তো দেখলে এখন নামিয়ে দাও গাড়ি থেকে। কিংবা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাকে?
কিছু সময় আসে মানুষ নিজেকে রক্ষার অস্ত্র গুলো ব্যবহার করতে পারে না। শত্রু পক্ষের প্রবল শক্তির সামনে আত্মসমর্পণ তখন একমাত্র পথ। ভিতরের ধূর্ত দানবটি তখন ধরা দিতে ইন্ধন যোগায়। ভুলকে ভুল বলে মনে হয় না। ভুল শুদ্ধের তরল দুটি ভিন্ন রঙ একাকার হয় নীল সরোবরে। মানুষ লাফিয়ে ইচ্ছে মতো সাঁতার কাটে কেউ আবার ডুবে মরে। মরে আনন্দ পায়। এক বার মরে। বার বার মরে। 
গাড়ি শালবনীর বড় রাস্তা থেকে বাম দিকে বনের মধ্যে মোড় নেয়। ইটের সোলিং করা রাস্তায় তিন চার কিলোমিটার পথ । দু পাশে শালবন। একটা লোহার গেটের সামনে গাড়ি থামে। গাড়ির হর্ন বাজার সাথে সাথে গেট অটোমেটিক খুলে যায়।
ভিতরে ঢুকে গাড়ি পার্ক করে ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে পাশের দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে দেয় তেপান্তর। জবা রোবটের মতো নিজের হাতটা তুলে দেয় তেপান্তরের হাতে।
জবা মুগ্ধ হয়ে দেখছে চার দিক। এত সুন্দর জায়গা এর আগে দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না। এমন সুন্দর জায়গা শুধু মনে মনে কল্পনা করা যায়।
একটা ক্যানেল তার উপরে কাঠের সেতু। তার পর খোলা মাঠ। মাঠে মখমলের মতো সবুজ ঘাস। মাঠের বাম পাশে কংক্রিটের ব্লকে তৈরী পায়ে হাঁটা পথ। পথের দুই পাশে সোনালী দুরন্ত পরিপাটি ছেটে রাখা। শেষ প্রান্তে আড়াই তলা একটি সাহেবী ধাঁচের বাড়ি। জনশূন্য বাড়ী বলে মনে হচ্ছে। মাঠের উত্তরে সবুজে ঘেরা পুকুর। পুকুরের পূর্ব কোণে একটা ঘর উপরে টিনের চাল। ঘরের অর্ধেকটা পুকুরের উপর। দক্ষিণ দিকে বারান্দা। সামনে একটা ছোট্ট জলাধার মাঝখানে ফোয়ারা। পাথরে বাঁধাই করা চার পাশ। ঘরের সামনে লেখা আছে-"বৃষ্টি-বিলাস"।
জবা আড়াই তলা বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গেটে শুধু একজন দারোয়ানের দেখা পেয়েছে। নীচ তলায় তিন চারটি রুম, সামনে বিশাল একটা কাঁচের ঘর পর্দায় ঘেরা। ভিতরে কি আছে দেখা হয় নি। একটা প্যাঁচানো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে তেপান্তরের পিছনে পিছনে দোতলায় উঠে গেলো। ডানে বায়ে দুটি ঘর তার পর বিশাল আকারের আরেকটি রুম। চার পাশে ক্যাকটাস অর্কিড আরা দুর্লভ সংগ্রহে পূর্ণ এক সংগ্রহশালা। মাঝখানে বিছানা। এক পাশে ডাইনিং টেবিল। গোটা বিশেক পদের ফল আর রান্না করা নানা খাবারে সাজিয়ে রাখা টেবিল।
দক্ষিন দিকে কাঁচের দেয়াল দেখে বোঝার উপায় নেই তার পর আসলে কি আছে। তেপান্তর জবার হাত ধরে স্লাইডিং ডোর টেনে দেখিয়ে দেয় এটা ওয়াশ রুম।
জবা ভিতরে ঢুকে আরেক বার অবাক হয়। এই ওয়াশ রুমের চাইতে তাদের বেড রুমের সাইজ বেশ অনেকটা ছোট হবে। কি নেই এর মধ্যে!
ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই দেখে ডাইনিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তেপান্তর।যন্ত্রচালিতের মতো কিছু খেয়ে নিয়ে বেডরুমের দিকে তাকে নিয়ে যায় তেপান্তর।
বেডরুমের চারিদিকের দেওয়ালে সমুদ্রের ওয়ালপেপার।আর নীলচে ডিমড্ লাইট জ্বালানো।মিউজিক সিস্টেমে বাজছে বেটোফেনের "প্যাশন অফ মি"।কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছে জবার।আলতো করে কোলে তুলে নিল তেপান্তর।
এর পর জবা আর কিছু মনে করতে চাইছে না। মনে করতে চাইছে যা কিছু ঘটে গেছে সবই ছিলো কল্পনায়। অথচ সব কিছু ঘটে গেছে বাস্তবে, রক্ত মাংসের শরীরে শিরা উপশিরায়... কিন্তু ভিতরের জন্তুটা অত্যন্ত বিশ্রী ভাবে উপহাস করে যাচ্ছে। এখন আবার প্ররোচনা দিচ্ছে লুকিয়ে যেতে, গোপন করতে। এতক্ষণে জবা বুঝে গেছে সে যদি আবার জন্তুটার কথা শোনে তাহলে বার বার তাকে লালসার কাছে হার মানতে হবে। জবা হারতে চায় না বরং মরবে। কিন্তু এখন সে মরতেও পারছে না। মৃত্যুর এতোটা কাছে থেকে ফিরে আসায় এখন ভিতরের পশুটা উপহাস করছে। মরে যাওয়া যেন খুব সহজ ছিলো, বেঁচে থেকে বহুরূপী বদ চরিত্রের সাথে লড়ে জয়ী হওয়া বরং অনেক বেশী কঠিন। 

শালবনীর উত্তরদিকের চার নম্বর সেক্টরের পূর্ব পাশের রেল লাইন। একটা স্লিপার থেকে আরেকটা স্লিপার বেশ লম্বা করে পা ফেলতে হয়। এই কারণেই তল পেটের ব্যথাটা শুরু হতে পারে। এখন রেল লাইন ছেড়ে পাশ দিয়ে হাঁটছে জবা। পাথরের উপর পা ফেলতে ভয় লাগছে। পা পিছলে যেতে পারে। মাথাটাও দুলছে ডানে বাঁয়ে। বাড়ি সাত নম্বর রোড। হেঁটে গেলেও আট দশ মিনিট লাগবে। হেঁটে যাওয়ার মতো শক্তি নেই শরীরে। বাম দিকের গলিটা ঢুকে গেছে সেক্টরে। এখানে সব সময় দু চারটে রিক্সা দাঁড়িয়ে থাকে।এখন টোটোও হয়েছে। একটা টোটোয় উঠে বসে জবা বলে-"সাত নাম্বার রোড"।
বিকেল চারটায় কাজের মেয়েটা আসে। এখন পাঁচটা বাজে। এসে ফিরে গেছে হয়তো। ফাঁকা বাড়ি। দরজা খুলে বাসার ভিতরে ঢুকে ঘরের আসবাবপত্র দরজা জানালার পর্দা টিভি ফ্রিজ সব কিছুকে পর মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ঘরের এই সব জড় পদার্থ গুলোও ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে জবার দিকে। ক্লান্ত শরীরে চার হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে সাথে সাথে ঘুম নেমে আসে চোখে। 

কদিন ধরে জবার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। বেশী রাত না করে একটু আগেই চলে আসে তমাল। শরীর ভালো থাকলে এই অসময়ে ঘুমোতো না। অন্যমনস্ক লাগছে কিছু দিন ধরে। সংসারে নিজের অমনোযোগ এর জন্য দায়ী বলে মনে করছে তমাল।
বেল চেপে ঘুম ভাঙাতে হয় সে জন্যই একটা চাবি রেখেছে নিজের কাছে। বাসায় এসে স্নানটা সেরে বিছানায় ঘুমন্ত জবার পাশে বসে। ঘুমিয়ে থাকলে জবার মুখটা শিশুর মতো লাগে দেখতে। মাথায় হাত রেখে চুলে আঙ্গুল চালাতেই চোখ খোলে জবা। তমালকে দেখে চমকে উঠে। কিছুটা ভয় পায়। বার বার তেপান্তরের শরীরের শক্ত পেশীগুলো মনে ভেসে উঠে।
বিকেলে ডক্টর অরুণ চক্রবর্তী এসেছিলেন,ঘুমোচ্ছিলে তখন- তমাল বলে।
জবা কি উত্তর দেবে কিছুই মনে করতে পারছে না। ডক্টর কখন এসেছিলেন!
তমাল উত্তরের অপেক্ষায় না করেই বলে-ডক্টর  বলেছেন ভয়ের কিছু নেই। ক'দিনের জন্য কাছাকাছি কোথাও ঘুরে আসতে পরামর্শ দিলেন। ওঠো হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও। আর ব্যাগ গুছিয়ে নাও। সাত দিনের জন্য আমরা মন্দারমণি-তাজপুর-দীঘা যাচ্ছি। কাল সকালে বেরোবো দশটায়।
ব্যাগগুলো জবার বালিশের পাশে রেখে মুখ নীচু করে একটা চুমু দিয়ে আবার বলে - ওঠো।
জবা তেপান্তরের বনের বাংলোটার কথা ভুলতে পারছে না। কিছুতেই মন থেকে দূর করতে পারছে না সব কিছু। ঘটনার সত্যি মিথ্যে নিয়ে জবাব দিতে হয় মানুষের কাছে। নিজের পাপবোধের জবাব দিতে হয় নিজেকেই। এ আরো বেশী বিব্রতকর।
এতোক্ষণ জবা ভেবেছে অন্য কিছু কিন্তু অপলক চেয়েছিলো তমালের দিকে। তমাল বুঝতে পারে জবা মনে মনে একটু সাহায্য আশা করছে। দু'হাতে ধরে তুলে বসিয়ে দেয় বিছানায়। দুই ফোঁটা জল জবার গাল বেয়ে গড়িয়ে পরে।
হেসে তমাল আরেকটা চুমু দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে-ছিঃ! কেঁদো না।এখন থেকে দিনের সিংহভাগটাই কাটাবো তোমার সাথে মুনা।

রাতে ব্যাগ গুছিয়ে ল্যাপটপ অন করে জবা। অনলাইনে বসে একবার সিদ্ধান্ত নেয় তেপান্তরকে ফেসবুকে ব্লক করবে। সিদ্ধান্ত পাল্টে সে জবা রায় নামে ফেসবুক আই ডি স্থায়ী ভাবে বন্ধ করে দেয়। তমাল তাকে মুনা নামে ডাকে। নতুন আই ডি ওপেন করে। নাম দেয় তমালী-মুনা। এখানে একমাত্র বন্ধু থাকবে তমাল। তার আর ভার্চুয়াল বন্ধুর কোনো প্রয়োজন নেই। ভার্চুয়াল বন্ধু স্বেচ্ছাচারী মনের গোপন দরজায় অসময়ে টোকা দেয়। টার্ন অফ করে ল্যাপটপ লাগেজে ঢোকাতে যাবার সময় বাম হাতের ইনজেকশনের ব্যথাটা টনটন করে ওঠে । বিকেলে ডক্টর অরুণ তাহলে ঘুমের ইনজেকশন দিতেই এসেছিলেন....

আমার বিজয়া হলো সারা


আমার বিজয়া হলো সারা
------------------------------------------


স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-------------------------------------------


শরতের সকাল। 
সৌম্য শান্ত পরিবেশ। কুয়াশা ঘেরা উদিত সূর্যের নিশ্চল নীরবতা। কোন কোলাহল নেই। সকাল আটটা বাজে। অসীমের এখনও ঘুম ভাঙেনি। সোমা উঠে গেছে সেই সকালে। অসীম টের পায়নি। ক’টা দিন ছুটিতে ছিল। অনেকগুলো ফাইল জমা হয়ে আছে। অনেক সময় বাড়িতেও কাজ করতে হয়।
সামনে আবার দুর্গাপূজা। কেমন একটা উৎসব উৎসব আমেজ। বাকী কাজগুলো শেষ করতে হবে পূজার আগে।
সোমা বারণ করেছিল। এত রাত জেগে কাজ করার দরকার কি। কাল করলে হয়।
তা কি করে সম্ভব ? ক’ দিন পরই তো পূজার ছুটি।
সোমা আর দ্বিরুক্তি করেনি। পাশ বালিশটা বুকে নিয়ে শুয়ে পড়েছে। ইচ্ছে করে লাইটটা নিভিয়ে দিয়েছে সোমা। অসীম মৃদু হেসে রিডিং লাইট জ্বালিয়ে কাজে মনোযোগ দেয়।
সোমা ঘুমিয়ে পড়ে। অসীম কাজ শেষে বিছানায় যায়। সোমাকে বিরক্ত করেনি। শুধু কপালে আলতো করে একটা চুমু দেয়।
সকালে বিছানা ছাড়তে মন চাইছে না। তন্দ্রার ভাবটা রয়ে গেছে। মনে হচ্ছে ভোর হয়নি। বিছানায় একটা আঁশটে গন্ধ। প্রচুর ঘেমেছে দুজনেই। রাতে কখন যে বিদ্যুৎ চলে গেছে খেয়াল করেনি। ভ্যাপসা গরম। সোমা জেগে জেগে শাড়ীর আঁচলে শরীরের ঘাম মুছেছে। অসীমের কপালে জমে উঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম সযত্নে মুছে দিয়েছে। অসীম টের পায়নি।
নীচের তলার ভাড়ার ফ্ল্যাট বাড়ি। জানালার খুব কাছাকাছি সীমানাটা দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। জানালা খোলা থাকলেও বাইরের বাতাস খুব একটা প্রবেশ করতে পারেনা। অসীমের তন্দ্রাচ্ছন্ন জেগে থাকাটা পাশাপাশি কারও সান্নিধ্য পেতে চায়। অলস দেহটা বার কয়েক গড়াগড়ি খায়। পাশ বালিশটা বুকের মধ্যে চাপা পড়ে। মনে হয়েছিল সোমা। পরক্ষণে পঞ্চ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়। এ-তো সোমা নয়। ধেৎ শালা।
বার কয়েক ডাকল। সোমার তখন স্নান সারা হয়ে গেছে। তা না হলে জল পাওয়া যাবে না। সকাল দশটা পর্যন্ত মিউনিসিপ্যালিটির জল। তারপর বন্ধ। ছাড়বে আবার সেই বিকাল চারটা। বাড়িওয়ালাকে পাম্প বসাতে বলেও কোন ফল হয়নি। বেশী বলতে গেলে সোজা জবাব- না পোষালে বাড়ি ছেড়ে দিন। আপনারা পুরানো ভাড়াটিয়া। তাই এত কম ভাড়ায় থাকতে পারছেন।
অসীম বাড়ি ছাড়তে পারছে না একটা মাত্র কারণে। বর্তমানে বাড়ির যা বাজার, ভালো ঘরে থাকতে গেলে আর কিছু খেতে হবেনা। যা বেতন তাই লেগে যাবে।
সোমার চুলগুলো এখনো ভেজা। এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ। দু-হাতে গামছাটা টেনে ধরে কয়েকটা টান দিতেই কেমন ঢেউ খেলে যায়। সকালের চেহারাটা কমনীয়তায় ছেয়ে আছে। খুব সুন্দর লাগছে অসীমের।
সোমা ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করে- এতো চেঁচাচ্ছো কেন? সকাল আটটা বাজে। সে খেয়াল আছে। বাজারে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি ওঠো।
তোমাকে কতবার বলেছি উঠে যাবার সময় আমাকে জাগিয়ে দেবে। তা না আর এখন এসেছে হুকুম করতে, বাজারে যাও, স্নান কর।
- বাজারে যাবে না।
- না, শোন।
- কি?
- আহা! কাছে আসবে তো।
- আমার কাজ আছে। আগে বিছানা ছেড়ে ওঠো, তারপরে কথা।
সোমা বুঝতে পারে। এ অসীমের নিছক দুষ্টুমি। বদ খেয়াল জেগেছে। পাগল, এখন পালিয়ে বাঁচলেই হয়। সোমা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে সকালের হালকা প্রসাধন সেরে নেয়। মাথা আঁচড়ায়। সিঁথিতে সিঁদুর দেয়। লাল টকটকে সিঁদুর। বেশ লাগছে।
অসীম আবার কাছে ডাকে।
সোমা বিরক্ত হয়।
কাছে আসতে হবেনা। প্লিজ তাড়াতাড়ি ওঠো। ঘরে রান্নার কিছুই নেই।
- তবে কোনটাই হবেনা। না অফিস না রান্না।
পুরুষ মানুষ এমনই বে-শরম। যখন তখন গোঁ ধরে বসে। বিয়ে হয়েছে দশবছর হলো। কোন সন্তানাদি হয় নি এখনও।এখনও ছেলে মানুষের মত স্বভাব বদলায়নি। মাঝে মাঝে গভীর রাতেও লুডো নিয়ে বসতে হয় সোমাকে। প্রথম প্রথম খুব বিরক্ত হতো। এখন আর হয় না। নতুবা মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে বলবে- সোমা তুমি রবি ঠাকুরের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতাটা একটু শোনাও না প্লিজ। তোমার কণ্ঠে বেশ লাগে শুনতে।
আজি এ প্রভাতে রবির কর---- কেমনে পশিল প্রাণের পর---কেমনে পশিল------
অসীমের স্বভাবটা এরকমই। ছেলে মানুষের মত। যখন যা মনে আসবে তখন তাই করবে। সোমার সারা হৃদয় জুড়ে এই সহজ সরল মানুষটার একচ্ছত্র আধিপত্য। সোমা সুখী।
সোমা কাছে আসে। অসীম ভেজা চুলের গন্ধ নেয়। ইন্দ্রিয়গুলো কেমন যেন সজাগ হয়।
- তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। একটু সময় দেবে।
- ও এই কথা।
সোমাও চাল জানে। একেবারে পাকা দাবাড়ু–র মতো। ভাবছে কোন ধরনের জেদ চলবে না। তবে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। এ মুহূর্তে অত্যন্ত সুকৌশলে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। বলল-
- প্লিজ, লক্ষ্মীটি। তোমার অফিসের অনেক কাজ। কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। আমি তোমার মনের মতো করে সাজবো। তখন তোমার সব কথা শুনবো।
হার মানলো অসীম। তবে একেবারে ছাড় দেয়নি। গভীর আলিঙ্গনে চুমু খেয়েছে। আর বলেছে লাল ফিতা দিয়ে কলাবেণী বাঁধবে কিন্তু।
অসীম বিছানায় উঠে বসে জিজ্ঞাসা করে, বাজারটা বিকালে করলে হয়না। হাতে সময়ও নেই। একটা ওমলেট হলেই আমার চলবে।
- আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নাও। আমি রান্না ঘরে গেলাম।
আজ ছ’বছর ধরে সোমা আগলে রেখেছে অসীমকে। প্রেরণা যুগিয়েছে সবকিছুতে। যার ফলে অসীম উঠে আসতে পেরেছে একটা মধ্যবিত্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবন ধারায়। 
বিয়ের আগের জীবনটা ছিল অন্যরকম। পালহীন নৌকার মতো। জীবনের নানা অলিতে গলিতে বিচিত্র রহস্য। সেই রহস্যের জোয়ারে ভাসতে ভাসতেই একদিন সোমার সাথে পরিচয়। তারপর কিছুদিন ভালোলাগা। খুব বেশী সময় নেয়নি। কিছুদিনের মধ্যে পারিবারিক সম্মতিতে উভয়ের পরিণয়। আজ দু’জনেই পাল তোলা নৌকার দক্ষ মাঝি। সংসারে ছোট খাট অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। উভয়ে সহজে মেনে নেয়। ফলে সংসারে বড় ধরনের কোন বৈষম্য নেই। দু’জনেই সুখী। 
হাজিরা বইতে হাত দিয়ে ঘড়ি দেখল অসীম। পাঁচ মিনিট দেরী। ফাইলগুলো টেবিলে রেখে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
টেবিল চেয়ারে হালকা ধুলো জমে আছে। পিয়নের উপর রাগ হয়। কলিং বেল টেপে।
আজকাল সবাই ফাঁকিবাজ। কেউ কাজ করতে চায় না। সরকারী অফিসের চাকরী। মাস শেষে বেতন তো আসবে। নানা অনিয়মেও বেশ বহাল তবিয়তে টিঁকে থাকে। পিয়নদেরও কদর কম নয়। পাবলিক রিলেশন থাকলে তো কথাই নেই। আগে পিয়নকে বশ করে উঠে আসতে হয় উপরে। তবেই কার্যসিদ্ধি।
অসীম দু’বার বেল টিপল। তাতেও পিয়নের সাড়া নেই। তৃতীয়বার বেল টিপার পর অনন্ত ঘরে ঢোকে। দাঁড়িয়ে থাকে আদেশের প্রতীক্ষায়। তিনবার বেল টিপতে হলো। তাতে অসীমের সমস্ত ক্ষোভ জমা হলো অনন্তর উপর।
- কোথায় থাকো সারাক্ষণ। বার বার খোঁজ করেও হদিশ পাওয়া যায়না। টেবিলের ধুলো ময়লাগুলো কি চোখে পড়েনা। এটা তোমার কাজ। প্রথমে এসে সবার অফিস ঘর, টেবিল চেয়ার সব গুছিয়ে রাখা, পরিষ্কার করা। যত্ত সব।
- অনন্ত কিছুই বললো না। টেবিলের নীচের ড্রয়ার থেকে গামছা বের করে টেবিল পরিষ্কার করে দিল।
- আর শোন। কাল থেকে যেন এর ব্যতিক্রম না হয়।
- স্যার ব্যতিক্রম হবেনা। আমি বড় সাহেবের রুমে ছিলাম। তাই দেরী হয়ে গেল। অনন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল
- আচ্ছা যাও। আর এক কাপ চা দিয়ে যেও।
অনন্ত চলে গেলো। পাশে কমলেশবাবু টাইপ করছিলেন। কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে বললেন-এদেরকে চোখ না রাঙালে হয় না। বড় বজ্জাত। আর কথায় কথায় ইয়ার্কি করে।
অসীম কোন প্রত্যুত্তর করে না। কাজে মনোযোগ দেয়।
অনন্ত চা নিয়ে আসে। অসীম চায়ে চুমুক দেয়। সোমার কথা মনে হয়। দুপুরের রান্নার কথা মনে হয়। কিছুই তো নেই। কি খাবে সোমা। বাজার করে না আসার জন্য নিজের ভিতর একটা অপরাধবোধ কাজ করে।
বাজার আর কি করবে। জিনিষ পত্রের যা দাম। তাছাড়া সকালের বাজার। যেখানে যায় সেখানেই ভিড়। দীর্ঘ সময় নষ্ট। রজনীশের দোকানের মসলা টা ভালো। সোমা বেশ প্রশংসা করে। ওখানেও হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ। অসীমও ওর পার্মানেন্ট কাস্টমার। দীর্ঘ আধ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তারপর পাওয়া যায় সেই নির্ভেজাল গুঁড়ো মসলা। ভেজালে বাজার ছেয়ে গেছে। অথচ এই রজনীশের দোকানের মসলা টা আজও নির্ভেজাল।
চা খেয়ে অসীম বাথরুমে গিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। সোমার জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে। তা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
সোমা সব ম্যানেজ করতে পারবে। তার সে ক্যাপাসিটি আছে। প্রয়োজনে নুন-হলুদ-কালোজিরে দিয়েও খেয়ে নেবে। তবুও হাসি ম্লান হয় না। সবকিছুতে ভরসা করা যায় সোমার উপর।
বাথরুম থেকে ফিরে অসীম নীচের ড্রয়ারটা খোলে। তিনটে চিঠি জমা হয়েছে। সম্ভবতঃ কাল বিকেলে এসেছে। পিয়ন নিজেই ড্রয়ারের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে রেখেছে। লোকটার বুদ্ধি আছে বটে। দুটো চিঠি অসীমের নিজের নামে। একটা সোমার নামে। প্রেরকের ঠিকানা নেই। কিছুটা কৌতূহলও হচ্ছে। সম্ভবতঃ কোন বান্ধবী লিখেছে। কি লিখেছে? অফিসের কাজে সামান্য বিরতি নিয়ে নিজের চিঠি দুটো পড়ে নেয়।
একটা সুশীল লিখেছে বাগনান থেকে। অসীমের বাল্যবন্ধু। পূজার ছুটিতে বেড়াতে আসতে চায়। অসীমের আনন্দ হয়। অনেকদিন পর দু’বন্ধুর দেখা হবে। আড্ডা জমবে। কলেজ জীবনের সেই উচ্ছৃঙ্খল দিনগুলোর মত। সেও সংসারী হয়েছে। বউ নিয়ে আসছে। ভয়ও হচ্ছে আগেকার মত করে কি জমবে আগামীর আড্ডাটা।
দ্বিতীয় চিঠিটা এসেছে গ্রাম থেকে। অসীমের খুড়তুতো ভাই বকুল লিখেছে-
দাদা আমি ডিগ্রি পাশ করেছি। তুমি তো জানো আমাদের সংসারের অবস্থা। বর্তমানে বাবা খুব অসুস্থ। বোধ হয় বেশিদিন বাঁচবে না। বড়দা কোলকাতা নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিছুতেই যাবে না। বলে-বিমল গেছে যাক। আমি বাপ দাদার ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবো না। মরতে হয় এখানেই মরবো। তাতে আমার দুঃখ নেই। জানো দাদা, বাবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছি না এখানে। নিজেকে খুবই ছোট মনে হচ্ছে। এ মুহূর্তে একটা চাকরী আমার খুব প্রয়োজন। তোমার আশ্বাস পেলে আমি একবার কোলকাতা আসতে চাই। সম্ভব হলে পূজার ছুটিতে এসে বাবাকে দেখে যেও।
                              ---ইতি হতভাগা বকুল।
চিঠিটা বেশ ভাবিয়ে তুলেছে অসীমকে। গ্রামের বাড়ী গিয়ে কাকাকে দেখে আসা দরকার। অসীমের জীবনে কাকার ভূমিকা বাবার চেয়ে কম নয়। যখনই হোঁচট খেয়েছে তখনই সাহস যুগিয়েছে। এখন বয়স হয়েছে। হয়তো বাঁচবে না বেশীদিন। মৃত্যুর এই আসন্ন মুহূর্তটা খুবই কষ্টের।
সোমার চিঠিটা উল্টে পাল্টে দেখে অসীম। বেনামী চিঠি। সীলটাও ঝাপসা। বোঝা যাচ্ছেনা কোত্থেকে এসেছে। ছিঁড়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। বিবেকে বাধে। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। সোমার প্রতি প্রাণান্ত ভালোবাসা। তাই সন্দেহের উদ্রেক হয়। সব সন্দেহগুলো যেন এই চিঠির মধ্যে। না না। কি সব আবোল তাবোল ভাবছে। হয়তো কোন আত্মীয় কিংবা বান্ধবীর চিঠি। যতই ভাবছে ততই মনের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তা তাড়া করে বেড়াচ্ছে। অথচ পড়তেও পারছে না। যতক্ষণ সোমা চিঠিটা না পড়তে দেয়। অন্তত বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
অসীম চিঠিগুলো ড্রয়ারে রাখে। ফ্যানের গতিটা বাড়িয়ে দেয়। কাজে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করে। মন বসছে না। মনের উপর জোর চলে না। তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। গভীর ভালোবাসা মানুষকে এভাবে সন্দেহ প্রবণ করে তোলে। যা থেকে একটা মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অবশেষে বড় ধরনের কৈফিয়ত। জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
অফিস শেষ। তাড়াতাড়ি ফাইলপত্র গুছিয়ে নেয় অসীম। এলাকার বাসে উঠে পড়ে। খুবই ধীরে চলছে গাড়ীটা। প্রতিটা মুহূর্ত যেন এক একটা কাল। বাসায় পৌঁছে চিঠিটা সোমার হাতে দিতে হবে। কৌতূহল নিবৃত্ত করতে হবে। নয়তো অজানা সন্দেহে সোমার প্রতি মনটা ক্রমশঃ বিষিয়ে উঠছে। অসীমের মন সোমাকে প্রতারক ভাবছে। আর সহ্য হয় না। 
বাসের কন্ডাক্টরগুলোও কেমন ইতর। যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে প্যাসেঞ্জার নিচ্ছে। গাড়ীতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বাদুড়ঝোলা হয়ে আছে মানুষ। স্বল্প আয়ের লোকদের সস্তা বাহন। এছাড়া কোন উপায় নেই।
অসীমের ইচ্ছে করছে নেমে গিয়ে একটা ট্যাক্সি নেবে। তারও উপায় নেই। সোমার কড়ায় গণ্ডায় হিসাব। প্রতিদিন পঞ্চাশ টাকা। আপ ডাউন বাস ভাড়া কুড়ি টাকা। বাকীটা হাত খরচ। তাতে কুলোয় না। তবুও উপায় নেই। কোন রকমে ম্যানেজ করতে হয়। আজ দুপুরে খাওয়া হয়নি। হালকা টিফিন আর সিগারেট খেয়েছে। বাকী যা আছে তাতে ট্যাক্সির আশা করা যায়না। সুতরাং ড্রাইভারের মর্জির উপর নির্ভর করতে হবে।
সুন্দর করে সেজেছে সোমা। এই সাজটা শুধুমাত্র অসীমের জন্য। নিতান্ত ব্যক্তিগত এবং ইন্টার্নাল। বৈচিত্র্যময় শহরে এই সাজ মানায় না। একবারে গ্রামীণ পল্লীবধূর সাজ। এক কুচি করে বাঁদনি প্রিন্টের শাড়ী পরেছে। মাথায় লাল ফিতার কলাবেণী। কপালে লাল টিপ। সিঁদুরের বদলে লাল টিপটা খুব মানিয়েছে। এটা অসীমের খুবই পছন্দ। চঞ্চল চপল কিশোরী পল্লী বালিকার মত। সারাক্ষণ আদর করতে ইচ্ছে করে। নিষ্পাপ চেহারায় ফুটে উঠে আজন্ম ভালোবাসা। সবকিছু দিয়েও যেন কিছুই দেওয়া হয়নি। একটা অপূর্ণতা থেকে যায়।
অসীম ঘরে ঢোকে। সোমাকে দেখে সমস্ত অস্থিরতা উবে যায়। অসীমের মত করে সবকিছু সাজিয়ে রেখেছে সোমা। সোমা নিষ্পাপ। মিছে সন্দেহ হচ্ছিল। এবার অসীম নিজের কাছে লজ্জিত হল। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। সোমার চিবুক স্পর্শ করে বলল-বেশ মানিয়েছে তো। সত্যিই অপূর্ব।
- সত্যি?
- একশোবার সত্যি। ও হ্যাঁ, তোমার একটা চিঠি এসেছে।
- কে দিলো আবার?
- জানিনা, বেনামী চিঠি বুঝলে। নাম ধাম নেই। আমি তো ভয়ে অস্থির। না জানি কে আবার ভাগ বসাতে চাইছে।
- তুমি মিছে ভাবছো। এ বুড়ীকে নিয়ে কে আবার ভাগ বসাবে। তাছাড়া আমার সবকিছু তো একজনকে দেওয়া হয়ে গেছে।
- আর সেই একজনটা বুঝি আমি?
- কেন, কোন সন্দেহ আছে?
- শোন সোমা তোমার মত বউ যার ঘরে আছে সে কোনদিন সন্দেহমুক্ত থাকতে পারে না। ঠিক বলিনি?
- হয়েছে, হয়েছে। আর ফাজলামি করতে হবে না। হাত মুখ ধুয়ে এসো আমি চা দিচ্ছি।
- চিঠি পড়বে না?
- পরে পড়বো। আগে খেয়ে নাও। চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে দুপুরে খাওয়া হয়নি।
সোমা চিঠিটা ব্লাউজের ভিতর রেখে দেয়। অসমান বুকে ব্লাউজের চাপে পরে খানিকটা কুঁচকে গেছে চিঠিটা। অফিস থেকে ফিরে অসীমের এক কাপ চা হলেই যথেষ্ট। কদাচিৎ একটু মুড়ি অথবা একটা বিস্কুট। এ জন্য সোমার তিরস্কারও কম নয়। অসীম ঠাট্টা করে বলে- বেশী খেলে পিলে হয়। আজ শুধু চা হবে। সোমা গরম জল বসিয়ে চিঠিটা খোলে। খুব ছোট করে লেখা।
সোমা, 
সেদিনের বিজয়া যেভাবে শুরু হয়েছিল, আমি আজও সেই অনুভূতি নিয়ে বেঁচে আছি। আজীবন থাকবো। কেননা প্রতিবারই বিজয়া আসে। আমার অতীতটা মনে করিয়ে দেয়। সেদিনের সেই বিজয়ার তিথিটা কেন আমাকে এভাবে নাড়া দেয় জানিনা। সেদিন বিজয়া না হয়ে অন্য কোন দিন হলে বোধহয় ভালোই হতো। এভাবে হয়তো মনে পড়তো না। স্মৃতির আড়ালে তোমার মত আমিও হারাতে পারতাম। বিজয়া তো হারাবার নয়। বারে বারে ফিরে আসে। আমাকে কষ্ট দেয়। আসন্ন বিজয়া শুভ হোক।-            
                                                         --সৌম্য। 
সোমার কাছে সৌরভের নাম সৌম্য। সোমাই এই নাম দিয়েছিল।
চিঠির লাইন যতই ফুরিয়ে আসছে সোমার দৃষ্টি ততই ঝাপসা হয়ে আসছে। সৌম্য। সে তো অনেক পুরোনো স্মৃতি। বিয়ের পর মাঝে মধ্যে মনে হয়েছে সৌম্যর কথা। খুব একাকী কোন নিঃসঙ্গ মুহূর্তে।
যখন অতীতকে নিয়ে ভেবেছে তখন শুধু ক্ষণিকের জন্য সৌম্যর কথা মনে হয়েছে। কিংবা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে গুন গুন করে গান করতো তখন অবলীলায় এসে ধরা দিত সৌম্য। সে অনেক দিনের কথা। ইদানীং সাংসারিক ব্যস্ততা সবকিছু ভুলিয়ে দিয়েছে। শুধু প্রতি বিজয়ার আগে মোবাইলে এসএমএস আসতো-"ভালো থেকো"। ঘুরিয়ে ফোন করলে ইন্টার অ্যাক্টিভ ভয়েসে ভেসে আসতো,"দিস নাম্বার ইস ডাজ নট এগ্জিস্ট"।
গতবারের চিঠিটাও অসীম সোমার হাতে দিয়েছিল। তবে কার চিঠি, কে দিলো এসব কিছুই জিজ্ঞাসা করেনি। সেটা সোমার নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। 
এখন যদি অসীম কিছু জানতে চায় সোমা কি জবাব দেবে। সোমার অজান্তে চিঠিটা খসে পরে। ওভেনের উপর গরম জলগুলো ফুটছে টগবগ করে। চা পাতা দেওয়া হয়নি। খেয়াল ছিল না। সোমা চিঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দেয়। আঁচলে চোখ মোছে। চা তৈরি করে অসীমের জন্য।
চায়ে চুমুক দিয়ে অসীম জিজ্ঞাসা করে- কার চিঠি বললে না তো।
- আমার বান্ধবী অনিতা। বদ স্বামীর সাথে ঘর করতে পারছে না। ডিভোর্স করেছে। আবার নতুন জীবন শুরু করতে চায়। উপযুক্ত পাত্র পেলে বিয়ে করবে। ব্যর্থ ভাবে হাসতে চেষ্টা করে সোমা।
সোমার সহজ সরল ডাঁহা মিথ্যা কথাটা অসীম বিশ্বাস করে। জিজ্ঞাসা করে-
- তোমার কি মনে হয়? একজন বিবাহিতা মেয়েকে আবার কেউ বিয়ে করবে।
- না করার কি আছে। তাছাড়া অনিতা সুন্দরী, বাবার ধনসম্পদও আছে।
- তবে হয়তো সম্ভব। আজকাল সুন্দরের চেয়ে অর্থের প্রয়োজনটা বেশী। প্রথমটা বোনাস পয়েন্ট। আচ্ছা আমি যদি এরকম বদ হই তাহলে তুমি কি করতে?
- আমিও তাই করতাম।
- সত্যি?
- সত্যি নয়তো মিথ্যে। তুমি তো বদের গুরু। সারাক্ষণ জ্বালিয়ে ছাড়ো।
- তোমার ভালো লাগে না।
সোমা উঠে গিয়ে বাজারের থলেটা অসীমের হাতে দিয়ে বলে, খুব লাগে। প্লিজ এবার বাজারে যাও। নয়তো রান্না হবেনা লক্ষ্মীটি ।
সোমা চিঠিটা আবার পড়ে। কেন জানি বার বার পড়তে ইচ্ছে করছে। অতীতকে নিয়ে জলকেলি করছে জীবনটা। ঠোঁট চেপে কান্না আসছে। কাঁদতে পারছেনা। সোমার সবকিছু যেন এক জায়গায় বাঁধা পড়ে আছে।
সৌরভের যাযাবর জীবন। কখন কোথায় থাকে তার ঠিক নেই। অনেক চেষ্টা করেও তার নির্দিষ্ট ঠিকানা জোগাড় করতে পারেনি সোমা। সোমা জানে সৌরভ দেশপ্রেমিক। একই পথের পথিক ছিল দুজনে।পরে সৌরভ সশস্ত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেছে। এখন পলাতক। আইনের হাতকড়া ঝুলছে মাথার উপর। কোথাও আত্মগোপন করে আছে। খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। থানায় মামলা হয়েছে। সে মার্ডার কেসের আসামী। এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছে সোমার। এ পৃথিবীতে অবিশ্বাস্য ভাবে অনেক কিছুই ঘটে যায়। ঠিক তেমনটাই মনে হচ্ছে সোমার।
সেদিন বিরোধী পক্ষের কতগুলি গুণ্ডা দখল করতে এসেছিল পার্টি অফিস।আর সেইসময় ওদেরই একজনের ছোঁড়া বোমার আঘাতে ওদের একজন মারা যায়।আর পার্টি থেকে কায়দা করে বাকিদের বাঁচিয়ে বলির পাঁঠা করা হয় সৌরভকে।এ ঘটনা সোমা জানে।
সোমার বাবা উপরমহলে হাত থাকায় সোমাকে জামিন করিয়ে নিয়ে আসেন আর খুব শিগগিরি ই বিয়ের ব্যবস্থা করেন।
ছাত্র জীবনে বেশ ভালোই ছিল সৌরভ। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা মেধাবী ছাত্রের জীবন দীর্ঘদিন কেটেছে বেকারত্ব আর হতাশায়। বোঝাস্বরূপ মনে হয়েছে অভিশপ্ত জীবনটাকে। হঠাৎ করেই জীবনের গতি পাল্টালো। কিছু একটা করা দরকার জীবনের ব্যর্থতাকে ভুলে থাকার জন্য। নেমে আসল রাজপথে। সক্রিয় সশস্ত্র রাজনীতির অংশীদারিত্ব নিয়ে।
এটাও এক ধরনের মুক্তি। সংসারের কোন বন্ধন নেই। সারাক্ষণ মিছিল মিটিং। কখনও পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, রাইফেলের গুঁতো। টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ার গোলক ধাঁধায় জীবনের গতি হারালো। এই আর কি। বামপন্থী কি ডানপন্থী। রাজনীতিতে রাজপথে যা হয়।
সৌরভ সবকিছু ভুলেছে কাজের ব্যস্ততায়। অন্য একটা জীবনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিলিয়ে দিয়েছে। অথচ অতীতের একটি বিজয়ার স্মৃতি আজও অম্লান অক্ষয়। সে দিনটা আজও ভুলতে পারেনি। পূজার সময় আসলেই অতীত স্মৃতিটা তাড়া করে বেড়ায়। 
সৌরভের মনে পড়ে প্রতি বছর নিবারণ কাকার কাছ থেকে বিজয়া দশমীর দিন শান্তিজল শেষে ঘট বেষ্টনীর সুতোগুলো চেয়ে নিত । সোমা সুতোগুলো দিয়ে সুন্দর বেণী করে হাতে পরিয়ে দিত।
আর বিড়বিড় করে বলত, "হে মা দুর্গা, আমি যেন সারাজীবন ওকে এভাবে বেঁধে রাখতে পারি।"
"ক্কি কি বললে তুমি!!"
"কই কিছু বলি নি তো!!"
"আমি সব শুনেছি"
লজ্জায় সোমা দু'হাতে মুখ ঢেকে বলতো,"শুনেছো যখন তখন আবার জিজ্ঞেস কেন?"
প্রতি বছরই শারদ শশীর নির্মল আলোয় বিজয়া আসে। সে দিনটিই যেন জীবনের একটা বড় অধ্যায়। প্রতি বছরই শান্তিজল নেয় সৌরভ। তা সে যেখানে যে অবস্থানেই থাকুক না কেন।
আজ বিজয়া দশমী।
সাদা পাজামার সাথে হালকা বাদামী রংয়ের পাঞ্জাবী পরেছে সৌরভ। পূজা মণ্ডপের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে সৌরভ। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। মনের ভিতর একটা ভয় তাড়া করছে।
দেবী দশভুজার সামনে দাড়িয়ে সৌম্যকান্ত ব্রাহ্মণ উপস্থিত ভক্তদের দর্পণ বিসর্জন দিয়ে শান্তিজল দিচ্ছেন। দেবীর সামনে নাটমন্দিরের দুপাশে সারিবদ্ধভাবে বসেছে পুরুষ এবং মহিলারা। সৌরভ পুরুষদের সারির একপাশটায় বসেছে।
পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন।
"মহিষঘ্নি মহামায়ে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনী।
আয়ুরারোগ্যং বিজয়ং দেহি দেবি নমোহস্তুতে।।
ইয়ং সাংবাৎসরিকং পূজা যৎকৃতং দেবি তে ময়া সাঙ্গং ভবতু তৎ সর্বং পরিপূর্ণং তদস্তু মে।
বৎসরান্তে পুনরাগমনায় চ।
দ্যৌঃ শান্তিঃ অন্তরীক্ষং শান্তিঃ পৃথিবীং শান্তিঃ
"
সৌরভ প্রণাম করছে। এ জীবনকে ধিক্কার দিচ্ছে সৌরভ। ফিরে আসতে চাইছে স্বাভাবিক জীবনে। এখানে সৌরভরা শুধু ব্যবহৃত হচ্ছে। তাও নাটের গুরুর কাছে। প্রার্থনা জানায় দেবীর কাছে এই ধিক্কৃত জীবন নাশ কর মা।
শান্তিজল দেওয়া শেষ।
এখানে নিবারণ কাকা নেই। গ্রামে থাকলে নিবারণ কাকাকে বলতে হয়না। কয়েক পাক সুতো সৌরভের হাতে দিয়ে বলত-
- প্রতি বছর কি করিস রে ব্যাটা?
সৌরভ ডান হাতটা দেখিয়ে বলত-
- এই যে কাকা, হাতে পড়ি।
- তোর এত বিশ্বাস?
- শুধু বিশ্বাস নয় কাকা, এটা আমার ভালোবাসাও।
নিবারণ কাকা হাসত।
এখানে সৌরভের একজন বন্ধু ছাড়া আর সকলেই অপরিচিত। পরিচিত কাউকে খোঁজার সময় কিংবা ইচ্ছাও নেই। একজন স্বেচ্ছাসেবক মায়ের পুজোর জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে দিচ্ছে। এখনি হয়তো বরণ শুরু হবে।
সৌরভ ধীর পায়ে মায়ের বেদীর দিকে এগিয়ে গেল। ব্রাহ্মণের কাছে গিয়ে সৌরভ খুব আগ্রহ নিয়ে বলল-
- কাকা, আমাকে একটু ঘট বেষ্টনী সুতো দেবেন?
- কি করবে বাপু, বিস্ময়ের সাথে বললেন ব্রাহ্মণ।
- আমার লাগবে, দয়া করে দেবেন একটু সুতো।
- ঠিক আছে, এই নাও বলে ব্রাহ্মণ পুজোর পুষ্পপাত্র থেকে ঘট বেষ্টনী সুতোর কয়েকটা প্যাঁচ খুলে সৌরভের হাতে দিল।
সৌরভ সুতোগুলো হাতে নিয়ে মাকে হাতজোড় করে প্রণাম করল। বেড়িয়ে আসছে মণ্ডপ থেকে। সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে অনেকে কোলাকুলি করছে। ছোটরা প্রণাম করছে বড়দের। একটা ছোট ছেলে সৌরভকে এসে প্রণাম করল। সৌরভ ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। চোখে জল এলো সৌরভের। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। 
হঠাৎ একটা হৈ চৈ শুরু হল। সবাই পিছনে ফিরে তাকায়।
সাদা পোশাকধারী কয়েকজন পুলিশ। সৌরভকে ঘিরে ধরেছে। একজন পুলিশের হাতে হাতকড়া দুটো চকচক করছে। সবে শরতের মিষ্টি রোদ এসে প্রবেশ করেছে সারা মণ্ডপ জুড়ে।
সামনের সারিতে শান্তিজল নিচ্ছিল সোমা। সাথে অসীমও এসেছে। প্রণাম করে পেছনে তাকায় সোমা। জটলার মাঝখানে চোখ পড়ে। পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছে সৌরভ। তার চোখ দুটো স্থির। অপলক তাকিয়ে আছে দেবী প্রতিমার দিকে। আর কিছুক্ষণ পরেই তো দেবীর বরণ-বিসর্জন।
সোমা চিনতে পারে। প্রথমে বিস্মিত হয়। এখানে সৌম্য। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই সেদিনও যার হাতের লেখা চিঠি বার বার পড়তে ইচ্ছা করছিল। সেদিনের সেই বিজয়া দশমীর স্মৃতিটা স্পষ্ট মনে পড়ছে। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অতীতটাকে আজ সম্পূর্ণ নতুনভাবে অনুভব করতে পারছে।
সোমা ভীত হরিণীর মত ছটফট করছে। কাউকে কিছু বলতে পারছেনা। ইচ্ছে হচ্ছে এই মুহূর্তে সমস্ত পৃথিবীটাকে তছনছ করে দিতে। পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলতে ইচ্ছে করছে প্লিজ ওকে ছেড়ে দিন। ও নির্দোষ। আমি সোমা মুখার্জী ওর সহকর্মী,সাক্ষী দেবো।পারছে না। অসীম দাঁড়িয়ে আছে পাশে। অবলীলায় অসীমের কাছাকাছি আশ্রয় নেয় সোমা।
সৌরভ নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। সোমার চোখে চোখ পড়ে। সেই শান্ত শীতল মায়াময় চাহনি। শুধু সেদিনের মত কোন উদ্বেগ নেই, নেই কোন উৎকণ্ঠা। অথচ ভয়ে জর্জরিত।
সৌরভ বিচলিত। পুলিশের ভয়ে নয়। শুধু এই শুভক্ষণে শেষবারের মত সোমার সাথে দেখা হয়ে গেল। সোমা এখন সুখী। পাশাপাশি নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে দুজন। সৌরভ চোখ ফিরিয়ে নেয়। নিশ্চল দেহটাকে জোর করে দু’পা সামনে বাড়িয়ে বলল- চলুন।
শেষবেলায় মাইকটা আবার বাজতে শুরু করেছে। জগন্ময় মিত্রের চিঠির সেই অমর গান- "তুমি আজ কত দূরে----- আবার এসেছে বিজয়ার তিথি----- সাতটি বছর পরে---।"
সোমার খুব ইচ্ছে করছিল পুলিশগুলোকে অন্ততঃ একটিবার শেষ বারের মত অনুরোধ করতে যে ও নিদোর্ষ, প্লিজ ওকে ছেড়ে দিন। সোমা জড় পদার্থের মত ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। অসীম একবার ইঙ্গিত করল। চলো যাই। সোমার খেয়াল নেই।
গানটা শেষ পর্যন্ত শোনার খুব ইচ্ছা করছিল সৌরভের। সে কোথায় যাচ্ছে সে খেয়াল নেই। নিজের মনে বিড় বিড় করে গাইল-"আমার বিজয়া হয়ে গেলো সারা--- বুক ভরা বেদনাতে---।"
ততক্ষণ পুলিশের ভ্যানটা এগিয়ে চলেছে গন্তব্যে। সোমা নিজেকে আড়াল করে শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছল। আর একটু পরে প্রতিমা বিসর্জন। সোমা ফিরেও তাকায়নি। অসীমের সাথে রিক্সায় উঠে বসেছে সোমা। সামনে এগিয়ে চলছে রিক্সা। মাইকে গানটির আওয়াজ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছিল। 
কিছুদূর যেতেই অসীম রিক্সার হুডটা তুলে দেয়।
বিসর্জন শেষে পিছু ফিরতে নেই যে...

রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০১৬

চাওয়াতে পাওয়ার শেষ নয়

চাওয়াতে পাওয়ার শেষ নয়

____________________শিবাশিস্ আচার্য

ফ্ল্যাশব্যাক...অনেকদূর থেকে একটা আবছা অবয়ব "রুদ্র! রুদ্র!!" বলে ডাকছে..না চিনতে পারার একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা....আধো-ঘুমে অনেকগুলো দৃশ্য যেন পরপর চলে গেল রুদ্রের মাথায় ঝিলিক্ দিয়ে...কোন ঘটনাই যেন কোনোটার সাথে যোগ করা যাচ্ছে না...প্রত্যেকটাই যেন অদৃশ্য কোন সুতো দিয়ে বাঁধা...উদভ্রান্তের মতো চিৎকার করে জেগে ওঠে সে,"যাও! চলে যাও!! চলে যাও বলছি!!"...তারপর আবার গোঙাতে গোঙাতে ঝিমিয়ে পড়ে সে....
....
......
রুদ্রাশিস ভট্টাচার্য,একজন মনোরোগী..এটাই তার এখন একমাত্র পরিচয়...সারাদিন কি যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে সে...আর দুলে দুলে কাগজে যেন কি আঁকিবুঁকি কেটে চলে আপনমনে..
...
একমাত্র ছেলের এই অবস্থা দেখে চোখে আঁচল দেন কান্তিময়ী দেবী।প্রথম যখন ধরা পড়ে এ মনোবিকার,দিশেহারা হয়ে গেছিলেন তিনি।স্বামীকে হারিয়েছেন গত বছর!! আর এক বছরের মাথাতে এ কি ঘটনা!! অথচ...
....
....."কেমন দেখলেন ডাক্তারবাবু?আমার রুদ্র সুস্থ হয়ে যাবে তো?ও ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই....!!!"বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েন কান্তি দেবী।
ডঃ জুবিন মেহ্তার তত্ত্বাবধানে রয়েছে রুদ্র।অবাঙালি হলেও বাংলাটা ভালোই বোঝেন তিনি কর্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গে থাকার সুবাদে।অভয় দেন তিনি কান্তিদেবীকে।
"এটা খুবই সিম্পল কেস ম্যাডাম।ঘাবড়াবেন না।রুদ্রের কেস হিস্ট্রিটা দেখেছি আমি।একটা ঠিকঠাক কাউন্সেলিং দরকার ওর।সব ঠিক হয়ে যাবে।ওর এই ঘটনাটা যেদিন ঘটে,তার আগের ঘটনা ডিটেইলসে বলুন দেখি আরেকবার।"...
....রুদ্ধকণ্ঠে বলতে থাকেন কান্তি দেবী....
.......
......
.......
"রুদ্র! রুদ্র!! মাই পুওর বয়!! ডু ইউ হিয়ার মি, ডিয়ার ?"....
ওহ!! আবার সেই ডাক!!...
চোখটা এতো ভারী লাগছে কেনো?....
সামনে সাদা অ্যাপ্রন পরা কে যেন দাঁড়িয়ে!!...
নাঃ!!তাকাতে খুব কষ্ট হচ্ছে!!...
এ কি!! ওখানে কে দাঁড়িয়ে আছে?...
না!না!!তুমি এখানে কেনো?...
যাও!চলে যাও!!...
আই কান্ট টলারেট ইউ!!....
.....অদম্য এক আক্রোশে চিৎকার করতে থাকে রুদ্র।
সিস্টার!!সিস্টার!! হারি আপ!! পুশ হিম দ্যাট ইঞ্জেকশন্!!....
রুদ্র!!রুদ্র!! প্লীজ,কাম ডাউন!! কাম ডাউন!! মাই চাইল্ড!! ডোন্ট প্যানিক!! দেখো এখানে তুমি আর আমি ছাড়া কেউ নেই।প্লীজ রুদ্র,কো-অপারেট উইদ আস!!....
....আস্তে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে সে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
....
.....
ধীরপদে ডঃ মেহ্তা বেরিয়ে আসেন অবজার্ভিং রুম থেকে,যেখানে মোহাচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছে রুদ্র।নিজের অফিসে এসে পাইপটা ধরিয়ে রিভলভিং চেয়ারটায় বসে দূরের দিকে তাকান তিনি।
...
....
কি বিচিত্র মানুষের এই মন...কত আবেগ ই না জমা হয়ে আছে সেখানে...তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে কখনো বসন্তের হিল্লোল আবার কখনো বা বর্ষার বারিধারা একাকী মনে...মন-সামিয়ানার তলায় কখন যে কাকে বৃণিতে ইচ্ছা জাগে তা একমাত্র সে ই জানে..এই আবেগের তাড়নেই মন সুন্দরের পূজারী...
....
....
রুদ্র ও বোধকরি তার প্রিয় কারোর কাছে আঘাত পেয়েই আজ এই অবস্থায়।কান্তিদেবীর বক্তব্য ও কেস হিস্ট্রি কিন্তু তেমন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে না।সেদিন কান্তিদেবীর কথাতেও তো তেমন কিছু পাওয়া গেলো না!!...
....
.....
রুদ্রাশিস্ ভট্টাচার্য,প্রেসিডেন্সী কলেজের ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ছেলে...ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে ইংরাজীতে মাস্টার্স করতে আসা,বন্ধুদের প্রিয় একটি ছটফটে যুবক...কত না আনন্দের দিনগুলো...ক্লাসশেষে আড্ডা..কোনদিন নন্দন তো কোনদিন কফি-হাউস কোনদিন বা কলেজের নস্ট্যালজিক সিঁড়িতে বসে গান-মাউথ অর্গ্যানে তোলা সুর-আড্ডা-গল্প-চা-ঝালমুড়ি-বাদামভাজা...দিনগুলো রাজহাঁসের মতো ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছিলো...পড়াশোনা-বন্ধুবান্ধব-পরিজন নিয়েই কেটে যাচ্ছিল...
....
......
মাঝে মাঝে কান্তিদেবী লক্ষ্য করতেন রুদ্র কেমন যেন আনমনা...এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করলে "ও কিছু নয়" বলে হেসে উড়িয়ে দিতো..বেশি জোরাজুরি করলে যদি রেগে যায় সেই ভয়েও আর তেমন কিছু বলতেন না...
মাঝে স্বামী হঠাৎ গত হলেন...বাবার হঠাৎ এইভাবে চলে যাওয়াটা খুব বেজেছিল রুদ্রের বুকে...আরো অন্তর্মুখী হয়ে পড়ে সে...চোখে আঁধার দেখলেন কান্তিদেবী...শেষে ছেলেকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচার স্বপ্ন দেখলেন....ছেলের এইধরনের অন্তর্মুখীতা দেখে মাঝে ছেলেকে একদিন বলেছিলেন,"হ্যাঁ রে!! মাঝে মাঝে বন্ধুদের ও ডেকে গল্প করতে পারিস তো,নাকি?"রুদ্র হেসে উত্তর দিয়েছিলো,"এই মফস্বলে কেউ আসবে না মা!!!"..."কি জানি বাবা,আজকালকার ছেলেদের যে কি মতিগতি!!!ভাবেন তিনি...
.....
.......
সেইদিন ছিল পয়লা মে...মহাজাতি সদনে নচিকেতার প্রোগ্রাম দেখে ফিরবে বলে দুপুরের দিকে বেরিয়েছিলো রুদ্র...বিকেল থেকে বাঁধভাঙা বৃষ্টি..কি জানি ছাতা নিয়ে বেরিয়েছে কিনা?...রাত দশটায় কাঁপতে কাঁপতে বাড়ী ফিরলো রুদ্র..যা ভয় করেছিলাম একেবারে ভিজে ফিরেছে...শিগগির ছাড় জামা-কাপড়, ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে...আমি কিছু খাবো না মা, বাইরে খেয়ে এসেছি--বলতে বলতে নিজের ঘরে ঢুকে ঘরের দরজা দিয়ে দেয় সে...ওষুধ খাবি কিছু...না আছে এখানে..কেমন অস্বাভাবিক শোনাচ্ছে গলাটা..ভিজেছে বোধহয় তাই..যাইহোক ঘুমোক এখন...পরদিন সকালে ন'টা বেজে গেছে তাও রুদ্র দরজা খোলে না দেখে কান্তিদেবী দরজায় হাত দিয়ে ঠেলতেই...এ কি!!দরজা তো খোলা!!রুদ্র উঠলো কখন?...এ..এ..এ..কি রুদ্র!!কি হয়েছে তোর?এ রকম করছিস কেনো?...কি হয়েছে বল?..কি বিড়বিড় করছিস?..কি হয়েছে?...কাগজে কি এগুলো?...চোখ তোর লাল কেনো?...বল বাবা বল!!! কি হয়েছে?..তোর গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে!!!...ছেলেকে ধরে ঝাঁকাতে থাকেন তিনি....
....
.......
কিছুদূরে থাকেন ডঃ নন্দী।তার বাড়ীতে গিয়ে তার নাম ধরে ডাকতেই বেরিয়ে এল ওনার মেয়ে শ্রীপর্ণা।...আসুন আসুন কাকীমা..কি হয়েছে?এই মা-মরা মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই তার কাছ-ঘেঁষা।তাকে দেখেই কেঁদে ফেলেন...কি হবে মা শ্রী?...রুদ্র!!!...আর বলতে পারেন না তিনি কান্নার আবেগে...ডঃ নন্দীকে ঘটনাটা বলতেই তিনি চলে এলেন বাড়ীতে...ভালো করে চেক করে বললেন,"বৌদি!! ইট ক্যুড বি আ কেস অফ মেন্টাল ডিসব্যালেন্স..আমি আপাততঃ জ্বর কমাবার ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি...আপনি ইমিডিয়েট ডঃ মেহ্তার সাথে দেখা করুন...আমার দৃঢ় ধারণা উনিই এ ব্যাপারটা ভালো বুঝবেন ও ট্রিট করবেন....উনি একজন বিলেত ফেরত নামজাদা কাউন্সেলার...আপনি বেশি দেরী করবেন না,এই ফোন নম্বরে ফোন করে ইমিডিয়েট ওনার সাথে কনসাল্ট করুন..."
....
......
ডঃ !! শিগগির আসুন ! পেশেন্ট কেমন করছে!! --সিস্টারের ডাকে সংবিৎ ফিরলো ডঃ মেহ্তার।কেনো কি হয়েছে?চল তো দেখি!! ও মাই গড!! এতো মাসল্ ক্র্যাম্প হয়েছে..সিস্টার কুইক্!! হট-কোল্ড কম্প্রেস ইন হিস্ রিউম্যাটিক্স.. হারি আপ!!!!....
.....
কিছুক্ষণ বাদে সুস্থ হয়ে ওঠে রুদ্র।
....
......দিন যায়...একটু একটু করে ডঃ মেহ্তার চিকিৎসায় সাড়া দিতে থাকে রুদ্র।কিন্তু আসল সিম্পটমস্ টাই তো এখনো জানা বাকি!!!কি রহস্য লুকিয়ে আছে ঐ পয়লা মে দিনটিতে জানতে তো হবেই তাকে নইলে সম্পূর্ণ সুস্থ রুদ্র কোনদিনই হবে না।
...
....
রুদ্র! রুদ্র!! আমার কথা শুনতে পাচ্ছো তুমি?...ব..বলুন শু..শুনছি আধোঘুম জড়ানো গলায় বলে রুদ্র...তুমি মাউথ অর্গ্যান বাজাতে ভালোবাসো?...হ্যাঁ...আর কে ভালোবাসতো?...অ..নে..কেই...যেমন?..পর্..পর্...আহ্!! আমি বলতে পারছি না!!..আশার আলো দেখলেন ডঃ।
তাকে প্রথম কোথায় বাজিয়ে শোনাও?...ই..ডে..ন..!!প্রথম কোথায় দেখেছিলে তাকে?..ই..উ..নি..!!ব..ই..মে..লা..!!নন্..দ..ন!!...
নাঃ!! এখন থাক।বিকেলে তার বিশেষ শেখা বিদ্যাটা কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করবেন।তাতেই বোধকরি অনেক কাজ হবে।যতদূর বোঝা যাচ্ছে কেসটা নারীঘটিত।কিন্তু ঘটেছে টা কি রুদ্রের সাথে?প্রতারণা নাকি অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যাওয়া?কিন্তু রুদ্রের মতো ব্রাইট ফিউচার ছেলের ভাগ্যে...সত্যিই কবিরা ঠিকই বলেছেন,"প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে"..নাঃ ইন্টারেস্টিং...বিকেলেই চেষ্টা করে দেখতে হচ্ছে.....
.....
.......
Washington Medical School-এ পড়াশোনা করার সময় প্রফেসর Richard Osterlind-এর সাহচর্য ডঃ মেহ্তাকে এই বিদ্যাশিক্ষায় সহায়তা করেছিল।মনস্তত্ত্ববিদ্যা নিয়ে রিসার্চ করার সময় Neuro-Hypnotism-এর কিছু কৌশল তার আয়ত্ত্বে এসেছিল।সেই বিদ্যাই আজ তিনি রুদ্রের উপর প্রয়োগ করে জানবেন তার ঐ দিনের ইতিহাস।সম্মোহন করে মানুষের মনের পুরোনো দুঃখের কথা জেনে চিকিৎসা করাই এই বিদ্যার উদ্দেশ্য...এই কথাই একা একা বসে ভাবছিলেন ডঃ মেহ্তা...
...."মে আই কাম ইন ডঃ মেহ্তা?"রুদ্রের ডাকে হুঁশ ফিরলো ডাক্তারের..
"ও!! এসো এসো, রুদ্র!! আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম..."
রুদ্র ঘরে ঢুকে দেখলো রেস্টরুমটাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।ঘরের এককোণায় একটি ছোট্ট টুলে একগোছা টাট্কা রজনীগন্ধা ফুলদানিতে সাজানো রয়েছে।ঘরের আরেক কোণায় খুব সুন্দর গন্ধের ধূপকাঠি জ্বলছে।আর সেন্টার টেবিলে মোহময় রাগসঙ্গীতের মূর্চ্ছনা যেন মনকে কেমন আবিষ্ট করে দিচ্ছে...
ডঃ মেহ্তা উঠে গিয়ে রুদ্রকে ধরে একটি ইজিচেয়ারে বসিয়ে দিলেন...
"আজ কেমন লাগছে তোমার,রুদ্র?"
"আই ফিল মাচ বেটার ডঃ!!"
"ভেরী গুড!! আই নো দ্যাট ইউ উইল ওভারকাম দ্যাট হ্যাজার্ড!!"
"আমায় এখানে ডাকলেন কেন ডাক্তারবাবু?"
"এমনি গল্প করার জন্যে..!! কেন গল্প করতে তোমার ভালো লাগে না?"
"আমার জীবনের আবার গল্প..."
"কেন এই হতাশা?শেয়ার করবে আমার সাথে?বলো না শুনি?"
"কি লাভ শুনে?"
"তবুও শুনি না...বলো বলো!!"
"না!! থাক আমি উঠি এখন!!!"
....ঠিক এমনটাই হবে জানতেন ডঃ মেহ্তা....এই পেশেন্টরা একটু অ্যারোগেন্ট স্বভাবের হয়...চট্ করে উঠে গিয়ে রুদ্রের কাঁধে হাত রেখে বললেন,"উঠো না প্লীজ!! ঠিক আছে ঐসব কথা বাদ দাও।অন্য গল্প করি আমরা,কেমন!!"..রুদ্র বসল..."আচ্ছা রুদ্র,তুমি নাকি ভালো হারমোণিকা বাজাও?তোমার মা বলছিলেন!!"মাউথ অর্গ্যানের শুদ্ধরূপ শুনে রুদ্র নড়েচড়ে বসল..."ওই একটু আধটু আর কি!!"...শিখেছো কোথাও?....না না!! শখে বাজাই!!...বাবাকে তোমার মনে পড়ে?...প্লীজ ডঃ মেহ্তা!! লিভ দ্যাট ম্যাটার!! প্লীজ!!..ওকে!ওকে!! তোমার শরীর কি খারাপ লাগছে,মাই বয়?...রুদ্রের কাঁধ ধরে ইজিচেয়ারে আধশোয়া করিয়ে দিলেন ডঃ..একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো,রুদ্র!!...ঘুম আসছে না ডঃ মেহ্তা...আচ্ছা এই দোলকটার দিকে তাকাও,মাই বয়!!ঘুম এমনিতেই এসে যাবে...এই বলে ডঃ মেহ্তা রুদ্রের চোখের সামনে দোলাতে লাগলেন দোলকটা..আস্তে আস্তে ফুল আর ধূপের গন্ধে-মোহময় মূর্চ্ছনায় আর ডঃ মেহ্তার "ঘুমিয়ে পড়...ঘুমিয়ে পড়" বারবার বলতে বলতে দোলক দোলানোতে চোখের পাতা ভারী হয়ে ঘুম নেমে এলো রুদ্রের...
.....
.......
........
"রুদ্র!! রুদ্র!! আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?"কোন উত্তর না পেয়ে বিন্দুবিন্দু ঘাম দেখা দেয় ডাক্তারের কপালে...তাহলে কি তিনি অকৃতকার্য!!!....আবার চেষ্টা করলেন তিনি..রুদ্রের শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠল...ক্ষীণস্বর শোনা গেলো--- বলুন ডঃ মেহ্তা...হারমোণিকা শুনতে বেশী ভালোবাসতো কে?...মধুপর্ণা...পুরো নাম...মধুপর্ণা মেহ্তা...
!!!!
!!!!!!!
!!!!!!!!!!!কানে কে যেন গরম সীসে ঢেলে দিলো ডঃ মেহ্তার কানে!!!....আকাশ ফাটিয়ে কাছাকাছি কোথাও যেন বাজ পড়লো!!!...নাঃ অধৈর্য হলে চলবে না...এই সেই স্কাউন্ড্রেল!!!...বাগে পেয়েছি আজ!!...মধু-র জীবনটা তাহলে এ-ই নষ্ট করেছে!!...অঝোরে বৃষ্টি নামলো.....
!!!!!!
!!!!!!!!!
তোমার সাথে ওর কোথায় দেখা হয়েছিল?..ও ছিলো সাইকোলজির স্টুডেন্ট....প্রেসিডেন্সির ফেস্টে প্রথম দেখা... বান্ধবী শাশ্বতীর সাহায্যে প্রথম কথা হওয়া... চলে যেতে যেতে আবার ফিরে তাকানো... মায়াময় সেই দৃষ্টি... আবার দেখা বইমেলায়...সুখস্মৃতি.... প্রথম তিনটি শব্দের ম্যাজিকাল বাক্য বলা... চোখে চোখ রেখে হারিয়ে যাওয়া...
একসাথে কাটানো মুহূর্তগুলোতে মধুপর্ণা কখনো হাত ছাড়তে চাইতো না... বাচ্চাদের মতো সারাক্ষণ হাত ধরে থাকতো....আমি মাঝে মাঝে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করতাম,
- " সমস্যাটা কি তোমার ? এভাবে বাচ্চাদের মতো সারাক্ষণ হাত ধরে থেকে কি মজা পাও বলো তো ? "
মধু দু'হাতে মুখ ঢেকে বলত,
- " সেটা যদি বুঝতে ! "
- " তো বুঝিয়ে বল ! "
দু'হাতে আমার মুখটা ধরে নিজের দিকে ফেরাতো মধু...
তাকিয়ে রইতো কিছুক্ষণ... অপলক...
- " তোমাকে হারানোর ভয়টা সারাক্ষণ আমার মধ্যে কাজ করে। তুমি বোঝো না?"
মৃদু হেসে এলো চুলগুলো সরিয়ে বলতাম-এতো ভয় কিসের তোমার ? এই তো আমি আছি। একদম তোমার কাছে !
....কাঁদতে কাঁদতে বলতো,তুমি তো জানো না, দাদা আমাদের সম্পর্কটা মানবে না!! অমত করলে দুজনকেই খুন করাবে বলেছে!!! আমার খুব ভয় করছে রুদ্র, কি হবে?
- " তুমি আমায় ভালোবাসো তো, রুদ্র?
গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরতাম তাকে...অভয় দিতাম ওকে..ওঃ!! একবার জানোয়ারটাকে যদি হাতের কাছে পেতাম..
.....অস্থির হয়ে উঠলো রুদ্র...
.....না একটু সময় দিতে হবে রাস্কেলটাকে...
....ধীরে ধীরে জানতে হবে পয়লা মে র কাহিনী...
.....ফিরিয়ে আনলেন তাকে ধীরে ধীরে বাস্তবের জগতে...
....অঘোরে ঘুমোচ্ছে রুদ্র...
ঘুমোক....
পাশের ঘরে গিয়ে বসলেন পাইপ ধরিয়ে...
.....আজ মধুর সাথে শেষ কথাগুলো খুব মনে পড়ছে....
...মধু তুই ঐ চালচুলোহীনটার সাথে মিশবি না...বলে দিলাম...কি আছে ওর...আর যদি কোনদিন ওর সাথে তোকে দেখি বা কারোর কাছে শুনি তোদের মেলামেশার কথা তবে কিন্তু "অনার কিল" করতেও আমার বাধবে না....ডঃ মেহ্তার জামাই হবে ঐ ভ্যাগাবন্ড!!! নো ওয়ে!!!
....ঠং...ঠং....ঠং.... একটা তীক্ষ্ণ ধাতব আওয়াজে সংবিৎ ফিরলো ডঃ মেহ্তার...কি হলো...পড়ে গেলো নাকি...একি রুদ্র কোথায় গেলো,এই বৃষ্টিতে?....ফুলদানিটা হাওয়ায় পড়ে গেছিলো...তুলে রাখলেন ডঃ....যাকগে মরুক গে!! এখন অনেক কাজ ওনার..জন্মের শোধ তুলতে হবে ওর ওপর...ভুলে যাবেন তার সাথে রুদ্রের সম্পর্ক....ভুলে যাবেন রুদ্রের মাকে দেয়া কথা....তার বোনের জীবন নষ্টকারীর তার কাছে কোন ক্ষমা নেই.....
চরাচরে প্লাবন এনে দেওয়ার মতো বৃষ্টি ঝরছে আজ...ঠিক সেদিন যেমন ঝরেছিলো...মনের আগুন কই আজও তো নিভলো না তার...বৃষ্টিভেজা শহরের রাস্তায় কান্নাভেজা মনে একাকী হেঁটে চলেছে রুদ্র...মনের আকাশও যে তার আজ উথাল-পাথাল...নেমেছে সেখানেও বৃষ্টি...ঝরছে দু'চোখ বেয়ে...
দুপুরে আজ ডঃ মেহ্তার ল্যাবের টেবিলে যা দেখেছে সে...!!! এতো সহজে ভুলতেও যে পারছে না সে, সেইদিনের কথা...আজকের দৃশ্যের সাথেও...
...
..সমকালীন কবির কয়েকটি ভালোলাগা পংক্তি আজ বারবার তার স্মৃতিদুয়ারে কড়া নাড়ছে...যা তাদের দুজনেরই প্রিয়...
....
......"আয়ুহীন ধাতু মেখে ছুটে আসে তীর,অশনি ছোঁয়ার আগে ছুঁই তবে,মধু ও মুহূর্ত ভরা তোমার শরীর !!"
...
..কেন?..কেন?..কেন চলে গেলে মধু...আমাকে এমন নিঃস্ব করে দিয়ে...
...
....."জগতের মায়াডোরের বাঁধনে বেঁধে লাভ কি পেলে সই?/তোমা বিহনে এ শূন্য পরাণে কেমন কইরা রই !!!"..সহজিয়া আউলিয়া গানের স্মরণে তার মনের চিতা নেভাতে চাইলো সে...!!!
....
কিন্তু "ভ্রূ-পল্লবের আহ্বানে" যার সাথে চিরমিলন সংঘটিত হত "চন্দনের বনে"...সে যে আজ....নাহ্!! আর ভাবতে পারছে না রুদ্র !!
...
...."প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস্ তোরা,ভেঙেছিস্ ঘর-বাড়ি;
সে কথা কি আমি জীবনে-মরণে,কখনো ভুলিতে পারি?
আদিম হিংস্র মানবিকতার,যদি আমি কেউ হই;
স্বজন-হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবোই !!!"....
.....বৃষ্টির মধ্যেই কান্নাভেজা মনেই অদম্য প্রতিজ্ঞা করে সে....
...পৃ...থ্বী...রা...জ.... মে...হ্তা!! তুমি সাবধান !! ক্ষমা নেই তোমার !!...দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস্ করে বলে ওঠে সে...
..বৃষ্টিস্নাত অবস্থায় বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ায় সে।দরজায় নক্ করতেই...কে?..আমি রুদ্র...মা !!..রুদ্র!! এতো রা...তে!!! "তুমি দাঁড়াও কাকীমা!! আমি দেখছি!!" একটি যুবতীর রিণরিণে কণ্ঠ ভেসে আসে।
....."কে?"....আমি রুদ্র !!
....
......ম্যাজিক আই দিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে দরজা খোলে সে।...ওহ্!! শ্রীপর্ণা তুমি!!আমি ভাবলাম কে এলো আবার?....
....অবাক তো আমাদের হওয়ার কথা রুদ্রদা!!এই বৃষ্টিতে?কি ব্যাপার?
....তুই রিসার্চ ল্যাবে যাওয়ার পর থেকে ওই আমার কাছে থাকে...ছাড়্!! ছাড়্!! জামাকাপড়টা শিগগির ছাড়্ বাবা!!ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে..দাঁড়া, শুকনো জামাকাপড় দিই আগে...পরে শুনছি সব!!
..না মা !! সময় নেই!! এখুনি আমায় চলে যেতে হবে!! শ্রীপর্ণা তুমি তোমার বাবা আই মিন্ ডঃ অমিতাভ নন্দীকে নিয়ে পোলিস্ স্টেশনে খবর দাও যে মধুপর্ণা মেহ্তার রেপ্ অ্যাকিউসড্-দের ধরতে হলে ডঃ জুবিন মেহ্তার রিসার্চ ল্যাবে পৌঁছে যেতে....
.....
.......
...কি বলছিস্ রুদ্র?...কে মধুপর্ণা মেহ্তা?...কেই বা তার রেপ্ অ্যাকিউসড্?...কি যা-তা বকছো রুদ্রদা!!...আহ্!! আমি বাজে কথা বলছি না!!...তোমরা পোলিস্ নিয়ে জলদি এসো!!...
....
.......
...শোন্ বাবা শোন্!! রুদ্র!! রুদ্র!!...রুদ্রদা....রুদ্রদা...কি হবে রে শ্রী?...আমার খুব ভয় করছে যে,মা!! কি আবোল তাবোল বকে গেলো ও!!...ও যে ঠিক হয়ে আসছে ডঃ মেহ্তা তা আমায় গতকাল বলেছিলেন..কিন্তু আবার কি হলো?....
....
......
.....চলো না কাকীমা!! রুদ্রদা যা বলে গেলো,তাই করে দেখি....দাঁড়াও বাবাকে ডাকি...
.....কিছুক্ষণ পরে হন্তদন্ত হয়ে ডঃ নন্দী এলেন...কি হয়েছে বৌদি?...শ্রী বলছিলো রুদ্র নাকি এসে কি সব বলে গেছে?...আর পোলিস্ স্টেশনে যেতে বলে গেছে?...হ্যাঁ ঠাকুরপো...কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না....আহ্!! তোমরা এখনো চুপ করে বসে আছো...চলো চলো....তাড়া লাগায় শ্রীপর্ণা...
...আরে,এসো,এসো রুদ্র!! কোথায় গিয়েছিলে এই কুকুরভেজা বৃষ্টিতে?তুমি অসুস্থ এখন।ভিজলে শরীর খারাপ করবে যে!!
...আপনাকে অনেক ধন্যবাদ,ডঃ মেহ্তা আমার পূর্বজীবন ফিরিয়ে দেবার জন্য।কিন্তু কি লাভ হলো দু'টো জীবন নষ্ট করে দিয়ে বলুন?--দাঁতে দাঁত পিষে বললো রুদ্র।
....কি বলছো রুদ্র?...আমি কি করেছি?...মধুপর্ণার দাদা তো আপনি!!....আর আপনিই মধুকে খুন করিয়েছেন...কেন....কেন...বলুন?...কি অপরাধ ছিল আমাদের...
....এই দেখো!!আবার উল্টোপাল্টা কথা বলে!!নাহ্ আবার ঘুমের ইঞ্জেকশনটা দিতে হবে দেখছি!!
...নাহ্ ডঃ মেহ্তা তার আর দরকার হবে না।ইউ আর এ রেপ্ অ্যাকিউসড্!!....
...হোয়াট্ ননসেন্স!! কি পাগলের মতো প্রলাপ বকছো,রুদ্র!!কিভাবে আমি রেপ্ অ্যাকিউসড্ হলাম বল?....
....ঐ টেবিলের দিকে তাকান...বলুন ঐ নিষ্পাপ ফুলের মতো যে মেয়েটা...মধুপর্ণা...আপনার বোন নয়?...আপনি তাকে আপনার দুজন ওয়ার্ডবয় সুধীন আর আপ্পাকে দিয়ে রেপ্ করান নি?...তারপর আমাকেও তারা শেষ করতে চেয়েছিল কিন্তু আমাকে মারার আগে লোকজন এসে পড়ায় জানোয়ার দুটো পালিয়ে যায়।...আজও চোখে ভাসে কিভাবে আমাদের দুজনকে এম.জি.রোড মেট্রো স্টেশনের পাশের অন্ধকার গলিতে নিয়ে গিয়ে আমাকে দড়ি দিয়ে হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে রাস্তায় ফেলে রেখে আমার চোখের সামনে...ওহ্!! ভগবান!!...
...একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হাঁপায় রুদ্র।
....
......
..হ্যাঁ হ্যাঁ আমি-ই!!আমি-ই তোকে খুন করতে ওদের লাগিয়েছিলাম।তোর মতো একটা ভ্যাগাবন্ড-রাস্কেলের সাথে সম্পর্ক হওয়ার চেয়ে তোকে মেরে ফেলা অনেক ভালো মধুর কাছে,তাই মনে হয়েছিলো আমার।কিন্তু ওরা যে বলেছিলো মধুকে খুব কষ্ট দিয়ে তুই মেরেছিস।তুই মধুর শরীরকে জোর করে ভোগ করতে চেয়েছিলি না পেয়ে ওকে খুন করেছিস...
...না..না...মিথ্যে..মিথ্যে...ঐ জানোয়ার দুটো মধুর ওপর পাশবিক অত্যাচার করে শেষে প্রমাণ লোপাটের জন্য ওর গলার নলিটা কেটে দিয়েছিলো.....
.....তুই মিথ্যে বলছিস...হুঙ্কার দিয়ে ছুটে রুদ্রের দিকে ছুটে যান ডঃ মেহ্তা।
....স্টপ...আই সে...পোলিস্ অফিসার ঢোকেন ঘরে।
না,ডঃ মেহ্তা রুদ্র ঠিকই বলেছে।এরাই দুজন রেপিস্ট অ্যান্ড মার্ডারার...পালাবার সময় ধরা পড়েছে..আর জেরায় ওদের দোষ স্বীকার করেছে ,আরও আপনার নির্দেশেই যে ওরা এ কাজ করেছে তা বলেছে--হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় দুজন ওয়ার্ডবয়কে দেখিয়ে বলেন অফিসার..তাই ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট,ডঃ মেহ্তা ফর ভিকটিমাইজিং অ্যান্ড প্রোভোকিং রেপ্ অফ মিস্ মধুপর্ণা মেহ্তা..
..ক্রাইম ডাসন্ট পে ডঃ মেহ্তা--ধরা গলায় বলে রুদ্র।
...নো!!...নো!!...বলতে বলতে দু'হাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে মাথা নীচু করে বসে পড়েন ডঃ মেহ্তা।
...
.....
....এসো মা!!...এসো শ্রীপর্ণা!!..আসুন নন্দীকাকু...!!
...মা, তুমি আমায় জিজ্ঞাসা করেছিলে না,কে মধুপর্ণা মেহ্তা?...
..হ্যাঁ,রুদ্র!! কে সে?...আমি তাকে ভালোবাসতাম মা..বাসতাম কেন,আজও বাসি যে...
...সমস্ত ঘটনা প্রথম থেকে মা'কে বললো রুদ্র...
....
......
....পয়লা মে তারিখে আমরা দু'জনে অনুষ্ঠান দেখে গল্প করতে করতে এম.জি.রোডের দিকে আসছিলাম।ঠিক সে সময় মেট্রো স্টেশনের পাশে অন্ধকারে আমাদের দু'জনকে দু'জন লোক জোর করে ধরে পাশেই অন্ধকার-গলিতে নিয়ে যায় এবং আমার সামনেই আমার মধুকে....কান্নায় ভেঙে পড়ে রুদ্র।
শ্রীপর্ণা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে--কি করবে বলো,রুদ্রদা?দোষীরা তো সাজা পাবেই।মধুপর্ণার আত্মা শান্তি পাক...
....চোখ মুছে রুদ্র বললো--ডঃ মেহ্তার ওষুধে কয়েক সপ্তাহ আগে আমার ধীরে ধীরে পূর্বস্মৃতি ফিরে এসেছিলো।আজ বিকেলে আমি ডঃ-এর ল্যাবে যখন আসি তখন উনি ছিলেন না।হঠাৎ করে ল্যাবের অফিস টেবিলে মধুর ঐ ছবিটা দেখে আমার সব মনে পড়ে যায়।বুঝতে পারি ডঃ মেহ্তা-ই,মধুর দাদা পৃথ্বীরাজ মেহ্তা;যিনি জুবিন্ নামও ব্যবহার করেন।আমি মধুর কাছে ওনার পৃথ্বীরাজ নামটাই শুনি।এমন সময় দু'জন লোককে এ ঘরে ঢুকতে দেখে চমকে উঠি...এরাই যে তারা...আমি ভিতরের দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়ি...আর শুনতে পাই ওরা দুজন একে অপরকে বলছে,"ডাক্তারবাবু বোধহয় জানে না,ঐ রুদ্র-ই...হেঃ!..হেঃ!..হেঃ!"চোখ মারে দু'জন দু'জনকে!!!...ভাগ্যিস কাজশেষে বুদ্ধি করে রাজ্যের বাইরে ছিলাম এতদিন,নইলে ঠিক চিনে ফেলতো!!...ধুর!! ওতো পাগল এখন!!...ডাক্তারবাবুকে আগেও যেমন এর নামে সব দোষ দিয়েছি তেমন এখন আবার বললেই...বল হরি...হরি বোল্....হ্যা..হ্যাহ্...হ্যাহ্....হ্যা...করে হাসতে হাসতে চলে যায় তারা...আমিও নিষ্ফল আক্রোশে আড়াল থেকে বেড়িয়ে আসি..বিকেলে ডঃ-এর কাছে পুরোটা অভিনয় করি এবং সম্মোহনের ভান করে ওনার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে মধুর নাম উচ্চারণ করা মাত্র ওনার চমকে ওঠা দেখে স্যাংগুইন হই...ইনিই মধুর দাদা।তারপর তোমাদের কাছে যাই আর বাকিটা তো তোমরা জানোই!!!...
...হঠাৎ রুদ্র লাফিয়ে উঠে ডঃ মেহ্তাকে এলোপাথাড়ি চড় মারতে মারতে বলে,"আই শ্যাল কিল ইউ বাস্টার্ড!! তুই আমার মধুকে কেড়েছিস!!"...পোলিস অফিসার তাড়াতাড়ি ধরে ফেলেন রুদ্রকে আর বলেন,"আইন নিজের হাতে নিও না রুদ্র!! ওনার শাস্তি তো উনি পেয়েইছেন!!"...
....ধীরপায়ে এগিয়ে যায় রুদ্র মধুপর্ণার ছবিটির দিকে...
....ভাবে এই তো সেদিনের কথা--হাতে হাত রাখলে সখা,বাঁধলে দুটি হৃদয়/এমন তো হতে পারে বঁধু,চাওয়াতে পাওয়ার শেষ নয়...মধুর মুখে এই কথা শুনে ছদ্মকোপ দেখিয়েছিলো সে...আর আজ...থরথর করে কেঁপে উঠে হাউহাউ করে কেঁদে বলে ওঠে..."ফিরে আয় মধু...ফিরে আয়...তোকে ছাড়া তোর রুদ্র আজও অসহায়...পারলে রক্ষা করার ব্যর্থতায় ক্ষমা করিস আমায়..."
শ্রীপর্ণাকে এগিয়ে দিয়ে কান্তিময়ী দেবী আর ডঃ নন্দী ঘর ছেড়ে বাইরের দিকে এগিয়ে যান।সে এগিয়ে গিয়ে পিঠে হাত রাখে,"রুদ্র দা!! রুদ্র দা!! দেখো মধু তো তোমার ভালোবাসাতেই বেঁচে থাকবে।তুমি এভাবে ভেঙে পড়ো না প্লীস।শক্ত হও একটু।তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে কাকীমার কি হবে ভাবো?..ওঠো!!..ওঠো!!..দেখো দুঃখ তো থাকবেই জীবনে...তাকে নিয়েই তো এগোতে হবে আমাদের সবাইকে...জীবনের সব চাওয়াই যে পাওয়াতে শেষ হয় না...
...ধীরে ধীরে মাথা তোলে রুদ্র..কিন্তু শ্রীপর্ণা মধুর এভাবে মৃত্যুটা যে মানতে পারছি না!!...তা তো সভ্যসমাজের মানুষ কেউই মানতে পারবে না...কিন্তু পশু আর মানুষ নিয়েই তো সমাজ,তাই না!!...দেখো না!! আবার নতুন করে সব শুরু করা যায় না?তোমার কেরিয়ার তো এখনও মাঝপথে,রুদ্রদা!! চলো না!! আমরা সবাই মিলে একটা নতুন সুন্দর সকাল নিয়ে আসি!!আলো আমরা দেখবোই একদিন,আঁধারের শেষ যেখানে...কি পারবে না তুমি?...দেখো না চেষ্টা করে!!...ঠিক পারবেই....
....
......
.........
....পরদিন....আনন্দবাজার পত্রিকায়....
বিখ্যাত মনোরোগবিশেষজ্ঞ ডঃ জুবিন্ মেহ্তার শোচনীয় আত্মহত্যা
নিজস্ব সংবাদদাতা :
দক্ষিণ কোলকাতার নিজস্ব রিসার্চ ল্যাবে ডঃ জুবিন্ মেহ্তাকে "অনার কিলিং"-এর অপরাধে অভিযুক্ত করে গ্রেফ্তার করে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার সময় তার দুই ওয়ার্ডবয়ের ঘাড়ে তিনি পটাশিয়াম সায়নাইড ভরা ইঞ্জেকশন ফুটিয়ে দেন এবং তারপরেই নিজের ঘাড়েতেও ফুটিয়ে দেন।ঘটনাটি পুলিশের সামনে ঘটলেও ঘটনার আকস্মিকতায় সকলে এতটাই হতভম্ব হয়ে পড়েন যে তাকে বাধাদানের আগেই তিনি ঘটনাটি ঘটিয়ে ফেলেন।তড়িঘড়ি নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তিনজনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন।
................................................(বিস্তারিত খবর ভিতরে)