ভালো-বাসা
------------------
স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-------------------------------
--তুমি আমাকে ভালোবাসো তো নয়নদা?
–কি যে তুই বলিস না আঁচল?তুই না মাইরি দিন কে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিস!আগের মত দেখাও করিস না আর দেখা হলেও ওই এক কথা - "ভালোবাসো তো নয়ন দা?’,ধুস্ শ্লা--!!সরি!! মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল!
–রাগ কোরো না নয়ন দা। সামনের মাসে উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা না!! আচ্ছা বাবা আচ্ছা,ভুল হয়ে গেছে।এই কান মুলছি।আসলে চারিদিকের এত কথা তোমাকে নিয়ে কানে আসে যে……যাক গে যাক!আর রাগ কোরো না,প্লীজ বললাম তো ভুল হয়ে গেছে।
–ঠিক আছে,ঠিক আছে।বল এত জরুরি তলব কিসের?একেবারে মানকেকে দিয়ে ক্লাব থেকে ডেকে পাঠালি!কেসটা কি বলতো?ওদিকে অনেক কাজ ফেলে এসেছি।
–মা না তোমার সঙ্গে মিশতে বারণ করে দিয়েছে আর আমার বিয়ের জন্য ছেলে দেখতেও শুরু করে দিয়েছে।
–যাহ্ শ্লা!!এসব ড্রামা আবার কবে থেকে শুরু হল?এত জলদি সব ফাঁস করে দিলি মায়ের কাছে?
–না গো,আমি বলিনি গো।ওই যে ইরাবতী আছে না?ওর মায়ের সঙ্গে আমার মায়ের খুব বন্ধুত্ব।মনে হয় ওর মাই বলেছে আমার মাকে।ওই যেদিন আমরা নন্দনের ঝিলের ধারে বসেছিলাম।হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি ও আর আরেকটা ছেলে আমাদের সামনে দিয়েই চলে যাচ্ছে।রূপের দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না।গেল দুর্গাপুজোর সময় আমায় বলে কি নাএকটু বেশী করে হলুদ-টলুদ মাখ আঁচল।নইলে তুই যা কালো।শেষে না তোর নামটাকেই তোর মুখে গুঁজতে হয়!!হি--হি--হি--হি।
তাই আমি তোমাকে আর আমাকেই ওকে দেখাতে চেয়েছিলাম।তুমি দেখতে দেখতেই তো ও দেখে নিল আমাদের।
সেদিনই বুঝেছিলাম কিছু একটা ঝামেলা হবে কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে সেটা বুঝতে পারিনি।ওই মায়ের কাছে গিয়ে লাগিয়েছে।আর তারপর থেকেই কি বলবো তোমায় নয়ন দা,বাড়ীতে টেঁকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিশ্বাস করো আমার মনে হচ্ছে এখনি তোমার সঙ্গে পালিয়ে যাই অনেক অনেক দূরে।আর আমার ভালো লাগছে না গো,দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।বলো না গো নয়ন দা,কবে বিয়ে করবো আমরা?কবে বাঁধব আমাদের "ভালোবাসা"র ছোট্ট ঘর?
–আরে,হবে হবে!বললেই কি সঙ্গে সঙ্গে ঘর বাঁধা হয়ে যায় নাকি?ঘর কি আমার চৌদ্দ-গুষ্টির!যে বললেই হয়ে গেল!তার জন্য ওই যে ইংলিশে কি যেন বলে না,হ্যাঁ,প্রিপারেশন!প্রিপারেশনের দরকার আছে তো না কি?হবে হবে সব হবে।এখন থেকেই ঘ্যানঘ্যান করিস না তো কানের কাছে!যাক গে! তা কি বললো তোর মা?
–কি আর বলবে?বললো,”বখাটে ছেলেদের সাথে রাস্তায় রাস্তায় বেলেল্লাপনা করার চেয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া ঢের ভাল।অনেক হয়েছে পড়াশোনা!মন যখন অন্যদিকে গেছেই,এখন আর ওসব করে কোনো লাভ নেই।উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলে ভালো আর ফেল করলে তো আরো ভালো।তার চেয়ে বিয়ে দিয়ে দিলে জীবন,লোকলজ্জা দুই-ই বাঁচবে।মুখে চুনকালি পড়ার আগেই সাবধান হয়ে যাওয়া ভালো।না হলে এই তোর জন্যই তো সমাজে মুখ দেখাবার জো থাকবে না।লোকে তো গায়ে থু থু দেবে।সবাই জানে ওই নয়ন কেমন ছেলে!বুদ্ধি থাকলে কেউ ওই ছেলের সাথে প্রেম করে?মরবি,মরবি নিজেও মরবি আর আমাদেরও মারবি।বলি কি আছে টা কি ওর?না আছে রূপ আর না আছে গুণ!
এমনিতেই কালো বলে তিন জায়গায় সম্বন্ধ ভেঙে গেছে।”
–তা তুই কি বললি?
–বললাম,তাহলে তো বোঝোই যে আমি তোমাদের গলগ্রহ।আমিই বা কোন রূপবতী।আর সত্যি কথা যেটা তা হলো আমি নয়ন দাকে ছাড়া বাঁচব না।
শুনে মা বললো,”হ্যাঁ,তা আর বাঁচবে কেন?ওকে বিয়ে করলে এমনিই তুমি মরবে।ওই যে মেয়েটা,কি যেন নাম?
হ্যাঁ,অঞ্জলি,ওই ওর মতোই মরতে হবে তোমাকেও।
তোর ওই নয়ন দা,ওই শিউলি,অঞ্জলির মতোই তোর যৌবন চুষে খেয়ে তোকেও ওর লাইফ থেকে একদিন ছেঁটে ফেলবে,দেখিস!
তখন তোর ওই "ভালোবাসা" পালাবার পথ পাবে না।ওসব মতলব ছাড়ো!
আমি কালই তোর বাবাকে কলকাতায় তোর ছোটপিসির ওখানে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলবো।আর রুমাকেও বলবো যত শিগগির তোর জন্য ভালো ছেলে দেখতে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমার বিয়ে দিয়ে দেব আমরা।
প্রে---এএম?
তোমার প্রেম ঘুচিয়ে দেব আমি।
আচ্ছা,কি দেখেছিস বলতো তু-তু-ই ওই শ-শ-শয়তানটার মধ্যে?”
–আরিব্বাস!আমায় শয়তান বললো "উড বি শাঁসু মা"?তা তুই কি বললি শুনি?
–আমি বললাম,“ও তুমি বুঝবে না মা।আমি ওর মন দেখেছি,ওর অন্তর দেখেছি,ওর আমার প্রতি "ভালোবাসা" দেখেছি।আর তার কাছে বাইরের চেহারাটা কিছুই না।তাছাড়া ওর পরোপকারী মনটা দেখেও কি তোমরা ওকে বুঝতে পারো না?“
শুনে বললো,”ও ছাই দেখেছো!ইস,আমার বোকা-সোকা মেয়েটার কাঁচামাথাটা একেবারে চিবিয়ে খেয়েছে গো,হারামজাদা নয়ন টা!ওরে ও আঁচল,শোন মা,ও ছেলে একটুও ভাল না।একটু নিজের দিকটা দ্যাখ মা।ওর চেয়ে হাজার গুণ ভাল ছেলে তোর যোগ্য আমি তোর মা হয়ে বলছি।আমিও তো কালো ছিলাম।তোর বাবার কি আমাকে পছন্দ হয়নি?
এসব ছেড়ে এখন একটু ভালো করে মন দিয়ে পড়াশোনা কর মা।আর তো একটা মাস।তারপর আমি কথা দিচ্ছি নয়ন বাদে তোর আর যে কোন পছন্দের ছেলের সঙ্গেই আমি তোর বিয়ে দেব।“
আমি বললাম,”তা আর হয়না মা।আমি নয়ন দাকেই ভালোবাসি আর ওকেই বিয়ে করবো।দ্যাট ইস ফাইনাল।আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না।“
আর তাতেই মা রেগে মেগে আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলো।
–ওহ্!আরে,শিউলি আর অঞ্জলির কেসটা আলাদা ছিল।ওদের তো আমাদের অফিসে কাজ দেবার জন্য কোলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলাম।তুই তো জানিস আঁচল,অন্যের দুঃখে মন আমার কেমন কাঁদে।
শিউলিটাকে কোলকাতায় নিয়ে গিয়ে যেখানে থাকি সেখানে রেখে কাজের তদ্বিরের জন্য কয়েকদিন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে আর সেই সুযোগ বুঝে সে মাল আমাকেই ল্যাং মেরে বাড়িওয়ালার ছেলের সাথে পালালো।
আর অঞ্জলি!ও তো শালা নিজেই অফিসে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে চোর বদনাম নিয়ে মরলো গলায় দড়ি দিয়ে।কি লজ্জার কথা!!
তাতে আমার কি দোষ বলতো?
–আসলে কি বলো তো নানারকম কথা শুনে শুনে মায়ের মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ ঢুকে গেছে যে ওদের যা পরিণতি হয়েছে তার জন্য তুমিই দায়ী।যাই হোক,শিগগির কোন একটা ব্যবস্থা কর নয়ন দা?আমি তোমাকে ছাড়া একমুহুর্তও বাঁচব না গো!
আর সেদিন ইউরিন রিপোর্টও পজিটিভ এসেছে।যা করার জলদি করো নয়ন দা।
–অ্যাঁ-ক্কি বললি পজিটিভ এসেছে?এতবার বললাম "সহেলী" নে!!নিয়েছিলি?উফ্-ফ্!!
থাম,থাম মটকাটা ঠাণ্ডা করে ভাবতে দে তো!আচ্ছা শোন,পরে আমি মানকেকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে দেব।তুই এখন বাড়ী যা।
****************************************
--এটা তুমি কোথায় নিয়ে এলে আমায়?আমি অ্যাবর্শন করাবো না নয়নদা।আমাদের ভালোবাসার অঙ্কুরকে এভাবে নষ্ট হতে দেবো না আমি।কিছুতেই না।আচ্ছা তুমি কেন এমন উতলা হচ্ছ বল তো?ভালো কাজ পাওনি তো কি হয়েছে?তুমি যা পাও তাতেই আমাদের সোনামণিকে নিয়ে ঠিক চলে যাবে দেখো।
--কি যে জ্বালাতনে ফেলিস না আঁচল!!ঠিক আছে তোর যখন বাচ্চাটা নষ্ট করতে মন চাইছে না তখন থাক।দেখি কি ব্যবস্থা করতে পারি?কলকাতায় কালীঘাটেই গিয়ে না হয়--
--সত্যি-সত্যি বলছ নয়ন দা?উফ্ আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে !!
--আচ্ছা বাবা আচ্ছা!!আনন্দ পরে করিস।সামনে অনেক কাজ।মানকেকে আগেভাগে চলে যেতে বলতে হবে,সব বন্দোবস্ত করার জন্যে। আর শোন,একটা ছোট্ট ব্যাগে সব গোছগাছ করে রাখিস,কেমন?
*****************************************
অস্তগামী সূর্যের লালিমা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে আকাশের বুক থেকে।জানলা দিয়ে তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়েছিল শাঁওলী।তার মনে হচ্ছিল এসব তার পূর্ব জন্মের কথা।ঘোর কাটলো নূরজাহানের ডাকে।
–শাঁওলী দি,এ শাঁওলী দি,আখুনো তৈআরি হোসনি ?খোদ্দেররা তো সোব এলো বলে!!চল্,চল্,জলদি কোর।মাসী ভি তাড়া দিচ্ছে।
--বাব্বাহ্!! দেকিস নুরি!! শাঁওলীর যা ডিমাণ্ড বাজারে!! আমরা না আজও কলা চুসি বোসে বোসে!! হি-হি-হি-হি!!
হ্যাঁ,রাণীঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যমেধার উচ্চমাধ্যমিক পাশ-করা ছাত্রী আঁচল রায় আর এখন সে আঁচল নয়,সে এখন এখানকার মাসির দেওয়া ; খদ্দেরদের প্যায়ারের ”শাঁওলী” নামে পরিচিতা, নয়ন দা কালীঘাটে বিয়ে করে সেদিনই এখানে বেচে দেওয়ার পর এটাই এখন তার পরিচয়।
পরে পরিচয় হওয়ার পর জেনেছিল এখানেই অঞ্জলিও বিক্রী হয়ে সে রাতেই প্রথম খদ্দেরের হাতে ওঠার আগেই গলায় দড়ি দিয়ে মরে বেঁচেছিল আর শিউলি?তারও জায়গা হয়েছে আঁচল না,না,শাঁওলীরই মতো "সোনাগাছির" কোনো কোঠাবাড়ীতে।
বাচ্চাটা নাকি মরা জন্মেছিল!! কে জানে সত্যি কি না??
নাকি এই নরকেই কোথাও অন্য কোন মাসীর হাতে তৈরী হচ্ছে খদ্দের ধরার দালাল হতে বা খদ্দেরদের শরীরের কামনার আগুনে রোজ পুড়ে পুড়ে নিজের মায়ের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে।
------------------
স্বপ্নসন্ধানী শিবাশিস্
-------------------------------
--তুমি আমাকে ভালোবাসো তো নয়নদা?
–কি যে তুই বলিস না আঁচল?তুই না মাইরি দিন কে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিস!আগের মত দেখাও করিস না আর দেখা হলেও ওই এক কথা - "ভালোবাসো তো নয়ন দা?’,ধুস্ শ্লা--!!সরি!! মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল!
–রাগ কোরো না নয়ন দা। সামনের মাসে উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা না!! আচ্ছা বাবা আচ্ছা,ভুল হয়ে গেছে।এই কান মুলছি।আসলে চারিদিকের এত কথা তোমাকে নিয়ে কানে আসে যে……যাক গে যাক!আর রাগ কোরো না,প্লীজ বললাম তো ভুল হয়ে গেছে।
–ঠিক আছে,ঠিক আছে।বল এত জরুরি তলব কিসের?একেবারে মানকেকে দিয়ে ক্লাব থেকে ডেকে পাঠালি!কেসটা কি বলতো?ওদিকে অনেক কাজ ফেলে এসেছি।
–মা না তোমার সঙ্গে মিশতে বারণ করে দিয়েছে আর আমার বিয়ের জন্য ছেলে দেখতেও শুরু করে দিয়েছে।
–যাহ্ শ্লা!!এসব ড্রামা আবার কবে থেকে শুরু হল?এত জলদি সব ফাঁস করে দিলি মায়ের কাছে?
–না গো,আমি বলিনি গো।ওই যে ইরাবতী আছে না?ওর মায়ের সঙ্গে আমার মায়ের খুব বন্ধুত্ব।মনে হয় ওর মাই বলেছে আমার মাকে।ওই যেদিন আমরা নন্দনের ঝিলের ধারে বসেছিলাম।হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি ও আর আরেকটা ছেলে আমাদের সামনে দিয়েই চলে যাচ্ছে।রূপের দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না।গেল দুর্গাপুজোর সময় আমায় বলে কি নাএকটু বেশী করে হলুদ-টলুদ মাখ আঁচল।নইলে তুই যা কালো।শেষে না তোর নামটাকেই তোর মুখে গুঁজতে হয়!!হি--হি--হি--হি।
তাই আমি তোমাকে আর আমাকেই ওকে দেখাতে চেয়েছিলাম।তুমি দেখতে দেখতেই তো ও দেখে নিল আমাদের।
সেদিনই বুঝেছিলাম কিছু একটা ঝামেলা হবে কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে সেটা বুঝতে পারিনি।ওই মায়ের কাছে গিয়ে লাগিয়েছে।আর তারপর থেকেই কি বলবো তোমায় নয়ন দা,বাড়ীতে টেঁকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিশ্বাস করো আমার মনে হচ্ছে এখনি তোমার সঙ্গে পালিয়ে যাই অনেক অনেক দূরে।আর আমার ভালো লাগছে না গো,দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।বলো না গো নয়ন দা,কবে বিয়ে করবো আমরা?কবে বাঁধব আমাদের "ভালোবাসা"র ছোট্ট ঘর?
–আরে,হবে হবে!বললেই কি সঙ্গে সঙ্গে ঘর বাঁধা হয়ে যায় নাকি?ঘর কি আমার চৌদ্দ-গুষ্টির!যে বললেই হয়ে গেল!তার জন্য ওই যে ইংলিশে কি যেন বলে না,হ্যাঁ,প্রিপারেশন!প্রিপারেশনের দরকার আছে তো না কি?হবে হবে সব হবে।এখন থেকেই ঘ্যানঘ্যান করিস না তো কানের কাছে!যাক গে! তা কি বললো তোর মা?
–কি আর বলবে?বললো,”বখাটে ছেলেদের সাথে রাস্তায় রাস্তায় বেলেল্লাপনা করার চেয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া ঢের ভাল।অনেক হয়েছে পড়াশোনা!মন যখন অন্যদিকে গেছেই,এখন আর ওসব করে কোনো লাভ নেই।উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলে ভালো আর ফেল করলে তো আরো ভালো।তার চেয়ে বিয়ে দিয়ে দিলে জীবন,লোকলজ্জা দুই-ই বাঁচবে।মুখে চুনকালি পড়ার আগেই সাবধান হয়ে যাওয়া ভালো।না হলে এই তোর জন্যই তো সমাজে মুখ দেখাবার জো থাকবে না।লোকে তো গায়ে থু থু দেবে।সবাই জানে ওই নয়ন কেমন ছেলে!বুদ্ধি থাকলে কেউ ওই ছেলের সাথে প্রেম করে?মরবি,মরবি নিজেও মরবি আর আমাদেরও মারবি।বলি কি আছে টা কি ওর?না আছে রূপ আর না আছে গুণ!
এমনিতেই কালো বলে তিন জায়গায় সম্বন্ধ ভেঙে গেছে।”
–তা তুই কি বললি?
–বললাম,তাহলে তো বোঝোই যে আমি তোমাদের গলগ্রহ।আমিই বা কোন রূপবতী।আর সত্যি কথা যেটা তা হলো আমি নয়ন দাকে ছাড়া বাঁচব না।
শুনে মা বললো,”হ্যাঁ,তা আর বাঁচবে কেন?ওকে বিয়ে করলে এমনিই তুমি মরবে।ওই যে মেয়েটা,কি যেন নাম?
হ্যাঁ,অঞ্জলি,ওই ওর মতোই মরতে হবে তোমাকেও।
তোর ওই নয়ন দা,ওই শিউলি,অঞ্জলির মতোই তোর যৌবন চুষে খেয়ে তোকেও ওর লাইফ থেকে একদিন ছেঁটে ফেলবে,দেখিস!
তখন তোর ওই "ভালোবাসা" পালাবার পথ পাবে না।ওসব মতলব ছাড়ো!
আমি কালই তোর বাবাকে কলকাতায় তোর ছোটপিসির ওখানে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলবো।আর রুমাকেও বলবো যত শিগগির তোর জন্য ভালো ছেলে দেখতে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমার বিয়ে দিয়ে দেব আমরা।
প্রে---এএম?
তোমার প্রেম ঘুচিয়ে দেব আমি।
আচ্ছা,কি দেখেছিস বলতো তু-তু-ই ওই শ-শ-শয়তানটার মধ্যে?”
–আরিব্বাস!আমায় শয়তান বললো "উড বি শাঁসু মা"?তা তুই কি বললি শুনি?
–আমি বললাম,“ও তুমি বুঝবে না মা।আমি ওর মন দেখেছি,ওর অন্তর দেখেছি,ওর আমার প্রতি "ভালোবাসা" দেখেছি।আর তার কাছে বাইরের চেহারাটা কিছুই না।তাছাড়া ওর পরোপকারী মনটা দেখেও কি তোমরা ওকে বুঝতে পারো না?“
শুনে বললো,”ও ছাই দেখেছো!ইস,আমার বোকা-সোকা মেয়েটার কাঁচামাথাটা একেবারে চিবিয়ে খেয়েছে গো,হারামজাদা নয়ন টা!ওরে ও আঁচল,শোন মা,ও ছেলে একটুও ভাল না।একটু নিজের দিকটা দ্যাখ মা।ওর চেয়ে হাজার গুণ ভাল ছেলে তোর যোগ্য আমি তোর মা হয়ে বলছি।আমিও তো কালো ছিলাম।তোর বাবার কি আমাকে পছন্দ হয়নি?
এসব ছেড়ে এখন একটু ভালো করে মন দিয়ে পড়াশোনা কর মা।আর তো একটা মাস।তারপর আমি কথা দিচ্ছি নয়ন বাদে তোর আর যে কোন পছন্দের ছেলের সঙ্গেই আমি তোর বিয়ে দেব।“
আমি বললাম,”তা আর হয়না মা।আমি নয়ন দাকেই ভালোবাসি আর ওকেই বিয়ে করবো।দ্যাট ইস ফাইনাল।আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না।“
আর তাতেই মা রেগে মেগে আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলো।
–ওহ্!আরে,শিউলি আর অঞ্জলির কেসটা আলাদা ছিল।ওদের তো আমাদের অফিসে কাজ দেবার জন্য কোলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলাম।তুই তো জানিস আঁচল,অন্যের দুঃখে মন আমার কেমন কাঁদে।
শিউলিটাকে কোলকাতায় নিয়ে গিয়ে যেখানে থাকি সেখানে রেখে কাজের তদ্বিরের জন্য কয়েকদিন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে আর সেই সুযোগ বুঝে সে মাল আমাকেই ল্যাং মেরে বাড়িওয়ালার ছেলের সাথে পালালো।
আর অঞ্জলি!ও তো শালা নিজেই অফিসে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে চোর বদনাম নিয়ে মরলো গলায় দড়ি দিয়ে।কি লজ্জার কথা!!
তাতে আমার কি দোষ বলতো?
–আসলে কি বলো তো নানারকম কথা শুনে শুনে মায়ের মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ ঢুকে গেছে যে ওদের যা পরিণতি হয়েছে তার জন্য তুমিই দায়ী।যাই হোক,শিগগির কোন একটা ব্যবস্থা কর নয়ন দা?আমি তোমাকে ছাড়া একমুহুর্তও বাঁচব না গো!
আর সেদিন ইউরিন রিপোর্টও পজিটিভ এসেছে।যা করার জলদি করো নয়ন দা।
–অ্যাঁ-ক্কি বললি পজিটিভ এসেছে?এতবার বললাম "সহেলী" নে!!নিয়েছিলি?উফ্-ফ্!!
থাম,থাম মটকাটা ঠাণ্ডা করে ভাবতে দে তো!আচ্ছা শোন,পরে আমি মানকেকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে দেব।তুই এখন বাড়ী যা।
****************************************
--এটা তুমি কোথায় নিয়ে এলে আমায়?আমি অ্যাবর্শন করাবো না নয়নদা।আমাদের ভালোবাসার অঙ্কুরকে এভাবে নষ্ট হতে দেবো না আমি।কিছুতেই না।আচ্ছা তুমি কেন এমন উতলা হচ্ছ বল তো?ভালো কাজ পাওনি তো কি হয়েছে?তুমি যা পাও তাতেই আমাদের সোনামণিকে নিয়ে ঠিক চলে যাবে দেখো।
--কি যে জ্বালাতনে ফেলিস না আঁচল!!ঠিক আছে তোর যখন বাচ্চাটা নষ্ট করতে মন চাইছে না তখন থাক।দেখি কি ব্যবস্থা করতে পারি?কলকাতায় কালীঘাটেই গিয়ে না হয়--
--সত্যি-সত্যি বলছ নয়ন দা?উফ্ আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে !!
--আচ্ছা বাবা আচ্ছা!!আনন্দ পরে করিস।সামনে অনেক কাজ।মানকেকে আগেভাগে চলে যেতে বলতে হবে,সব বন্দোবস্ত করার জন্যে। আর শোন,একটা ছোট্ট ব্যাগে সব গোছগাছ করে রাখিস,কেমন?
*****************************************
অস্তগামী সূর্যের লালিমা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে আকাশের বুক থেকে।জানলা দিয়ে তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়েছিল শাঁওলী।তার মনে হচ্ছিল এসব তার পূর্ব জন্মের কথা।ঘোর কাটলো নূরজাহানের ডাকে।
–শাঁওলী দি,এ শাঁওলী দি,আখুনো তৈআরি হোসনি ?খোদ্দেররা তো সোব এলো বলে!!চল্,চল্,জলদি কোর।মাসী ভি তাড়া দিচ্ছে।
--বাব্বাহ্!! দেকিস নুরি!! শাঁওলীর যা ডিমাণ্ড বাজারে!! আমরা না আজও কলা চুসি বোসে বোসে!! হি-হি-হি-হি!!
হ্যাঁ,রাণীঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যমেধার উচ্চমাধ্যমিক পাশ-করা ছাত্রী আঁচল রায় আর এখন সে আঁচল নয়,সে এখন এখানকার মাসির দেওয়া ; খদ্দেরদের প্যায়ারের ”শাঁওলী” নামে পরিচিতা, নয়ন দা কালীঘাটে বিয়ে করে সেদিনই এখানে বেচে দেওয়ার পর এটাই এখন তার পরিচয়।
পরে পরিচয় হওয়ার পর জেনেছিল এখানেই অঞ্জলিও বিক্রী হয়ে সে রাতেই প্রথম খদ্দেরের হাতে ওঠার আগেই গলায় দড়ি দিয়ে মরে বেঁচেছিল আর শিউলি?তারও জায়গা হয়েছে আঁচল না,না,শাঁওলীরই মতো "সোনাগাছির" কোনো কোঠাবাড়ীতে।
বাচ্চাটা নাকি মরা জন্মেছিল!! কে জানে সত্যি কি না??
নাকি এই নরকেই কোথাও অন্য কোন মাসীর হাতে তৈরী হচ্ছে খদ্দের ধরার দালাল হতে বা খদ্দেরদের শরীরের কামনার আগুনে রোজ পুড়ে পুড়ে নিজের মায়ের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে।
